1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৪৮

৪৮

নবাবের পরোয়ানা হাতে পেয়ে রায়দুর্লভের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল। ফৌজ নিয়ে চন্দননগরে গিয়ে ক্লাইভ ও ওয়াটসনের বিরুদ্ধে লড়তে হবে তাঁকে? এত সেনাপতি থাকতে তাঁর উপরেই নজর পড়ল নবাবের? বিমর্ষ হয়ে নিজের নসিবকেই দোষারোপ করতে লাগলেন রায়দুর্লভ।

শেষ পর্যন্ত নবাবের হুকুম তামিল করবেন তো রায়দুর্লভ? আশা ও আশঙ্কাতে দুলতে থাকা জাঁ ল কাশিমবাজার থেকে ফের ছুটে এলেন মুর্শিদাবাদে। রায়দুর্লভকে বললেন, ‘জনাব আপনিই আমাদের পরিত্রাতা। জবরদস্ত একটা লড়াই দিয়ে এ যাত্রা ইংরেজদের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করুন। আপনাকে আমরা দুলাখ টাকা দেব।’

না! দুলাখ টাকার প্রলোভন সত্ত্বেও সাহসী হয়ে উঠতে পারলেন না রায়দুর্লভ। ক্লাইভের ভয়ে তিনি কাঁপছেন। কলকাতার যুদ্ধের টাটকা স্মৃতি দুঃস্বপ্নের মতো তাঁকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।

বারুদের গন্ধমাখা শীতের সেই ভোর। কুয়াশার পর্দা ভেদ করে এসে পড়া একের পর এক গোলার আঘাতে তছনছ হয়ে যাচ্ছে হালসিবাগানে নবাবের সেনাছাউনি। চারিদিকে হাহাকার। সেপাইরা রক্তাক্ত হয়ে লুটিয়ে পড়ছে মাটিতে। রেজাইয়ের ওম ছেড়ে উঠে ঠান্ডায় কাঁপতে কাঁপতে প্রায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় রায়দুর্লভ ছুটছেন নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। দূর থেকে ভেসে আসছে কর্নেল ক্লাইভের হুংকার, ‘ফায়ার! ফায়ার! কিল দ্য এনিমি।’

 নবাবের গোটা ফৌজ যাঁর হাতে নাকাল হয়েছে, সেই সাবিত জঙ্গ কর্নেল ক্লাইভের মুখোমুখি জঙ্গবাজির ময়দানে গিয়ে দাঁড়াতে হবে তাঁকে? বড় অসহায় বোধ করলেন রায়দুর্লভ। নবাবের হুকুম তো আর অমান্য করা যায় না! কাজেই সেপাই-লস্কর, হাতি-ঘোড়া নিয়ে হাঁকডাক ছেড়ে তিনি হুগলির পথে বেরিয়ে পড়লেন। তবে চলতে লাগলেন খুব ধীর গতিতে। মনে প্রাণে চাইছেন তাঁর গন্তব্যে পৌঁছনোর আগেই যেন চন্দননগরের যুদ্ধটা শেষ হয়ে যায়।

পথেই রায়দুর্লভের হাতে এসে পৌঁছল ক্লাইভের একটা চিঠি। ‘…শুনলাম আপনি ফৌজ নিয়ে হুগলির দিকে আসছেন। দোস্ত হিসেবে আসছেন না আমাদের সঙ্গে দুশমনি করতে আসছেন তা আমি জানি না। যদি আপনার মতলব দুশমনি হয়, তাহলে হুগলির পথেই আমার একদল সেপাইয়ের সঙ্গে মোলাকাত হবে আপনার—বাকিটা আপনি নিজে বুঝে নিন…’

স্পষ্টতই হুমকি। এই চিঠি পেয়ে রায়দুর্লভের বুক শুকিয়ে গেল। পলাশিতে তাঁবু গেড়ে বসে পড়লেন। হুগলির দিকে আর এগোনোর সাহস হল না।

আবদালি আপাতত আসছেন না বাংলার দিকে। তিনি আফগানিস্তানে ফিরে যাচ্ছেন।

 দূতের মুখে এই সংবাদ শুনে অনেকটা চাপ মুক্ত হলেন সিরাজদ্দৌলা। এই খুশির খবর কর্নেল ক্লাইভকে জানানোর জন্য চিঠি লিখতে বসে গেলেন—’আপনি শুনলে হয়তো খুশি হবেন যে আমাকে পাটনা যেতে হচ্ছে না। আবদালি ফিরে যাচ্ছেন। এখনই তাঁর বাংলায় আসার কোনও ইমকান নেই। মালুম হচ্ছে—এ আপনার সঙ্গে আমার রিস্তেদারির উপর খোদার রেহেমত। এখনই আপনাকে মুর্শিদাবাদে আসার তকলিফ পোহাতে হবে না। আপনি কলকাতায় ফিরে যান। যদি ভবিষ্যতে প্রয়োজন হয়, আমি ফির আপনাকে তলব করব।’

এই চিঠি ক্লাইভের হাতে এসে যখন পৌঁছল তখন শুরু হয়ে গিয়েছে চন্দননগরের যুদ্ধ। দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ফোর্ট অঁরলিওর দিকে ধেয়ে আসছে ইংরেজরা। গোলার আঘাতে ভেঙে পড়ছে ঘরবাড়ি। শহরের নিরীহ মানুষজন ঘর গেরস্তালি ছেড়ে এক কাপড়ে পালাচ্ছে। ফরাসি রমণীরা নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে চুঁচুড়ার দিকে।

কোম্পানির বাগান থেকে ফোর্ট অঁরলিও যাওয়ার পথে জায়গায় জায়গায় ফরাসিদের সেনা চৌকি। ফরাসিদের প্রতিরোধের বেড়াকে চুরমার করে সামনে এগোনোর জন্য মেজর কিলপ্যাট্রিক ও ক্যাপ্টেন আয়ারকুটের নেতৃত্বে আক্রমণ শানাচ্ছে ইংরেজরা। জবাব দিচ্ছে ফরাসিরাও। দুর্গের দিক থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে গোলাগুলি।

এই গোলাগুলির ঝাঁঝ উপেক্ষা করে বেআব্রু পথের উপর দিয়ে সামনে এগোন কঠিন। কিলপ্যাট্রিক ও আয়ারকুট পথের দুপাশে ঝোপের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রেখে গুলি ছুড়তে ছুড়তে বাহিনী নিয়ে এগোতে লাগলেন। এবারে অসুবিধায় পড়ল ফরাসি সেনারা। ঝোপের আড়াল থেকে ছুটে আসছে বিপক্ষের গুলিগোলা। কিন্তু শত্রুকে নিশানা করা যাচ্ছে না।

নিজেদের আড়াল করে ফরাসিদের দুর্গের পঞ্চাশ গজের মধ্যে কয়েকটি বাড়ির দখল নিয়ে নিল ইংরেজদের ফৌজ। তুমুল গুলিবর্ষণ শুরু করল কেল্লার উপরে।

এমন সময় আয়ারকুটের কাছে খবর পাঠালেন ক্লাইভ। ‘কুইকলি সেন্ড সাম সোলজারস টু মি। আমি দুর্গের সদর দরজার উপর হামলা করতে চাই।’

তাঁর বাহিনী থেকে বেশ কিছু সেপাইকে ক্লাইভের কাছে যাওয়ার হুকুম দিলেন আয়ারকুট। ইংরেজদের বড় একটা দল ফিরে চলেছে বুঝতে পেরে সাহস করে সেনা-চৌকি ছেড়ে ঝটিকা আক্রমণের উদ্দেশে সামনে এগিয়ে আসতে লাগল ফরাসি সেনারা।

প্রমাদ গুণলেন আয়ারকুট সঙ্গে রয়েছে মাত্র জনা পঞ্চাশেক সৈন্য। দ্রুত তাদেরকে বেশ কয়েকটা দলে ভাগ করে দিয়ে তিন দিক থেকে ফরাসিদের ঘিরে ধরে আক্রমণ শানানোর হুকুম দিলেন কুশলী আয়ারকুট। ঘণ্টাখানেকের তীব্র লড়াইয়ের পর পিছু হটতে বাধ্য হল ফরাসি সেনারা।

ফুরিয়ে আসছে দিনের আলো। সেদিনের মতো লড়াই থামল। ফাল্গুন শেষের গরমে এমন রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে দুপক্ষই শ্রান্ত। গ্রেনেড বিস্ফোরণে আগুন ধরে গিয়েছে ফোর্ট অঁরলিওর কাছেই বেশ কয়েকটি বাড়িতে। সন্ধের আঁধারে দাউ দাউ করে জ্বলছে চন্দননগর।

পরের দিন মর্টার থেকে দুর্গের উপর ক্রমাগত শেল ছুড়তে লাগলেন ক্লাইভ। ফোর্ট অঁরলিওর আশেপাশের সব ঘরবাড়ি ইংরেজদের দখলে চলে এসেছে। ফ্লিন্টলক রাইফেল হাতে ইংরেজ সৈন্যরা বাড়িগুলির ছাত থেকে দুর্গের উপরে সমানে গুলিবর্ষণ করে চলেছে। দিন ফুরোল। রাত নামল। কোনও বিরাম নেই। একনাগাড়ে আক্রমণ শানিয়ে গেলেন ক্লাইভ।

শূন্যে উড়ে গিয়ে প্রাকার টপকে ফোর্ট অঁরলিওর ভিতরে গিয়ে পড়ল কতকগুলি লোহার তির। সুঁচালো ফলার মুখে আটকানো রয়েছে চিরকুট। সেই সব চিরকুটে লেখা রয়েছে—ফরাসিদের মধ্যে যারা এসে ইংরেজ পক্ষে যোগ দেবে তারা পুরস্কৃত হবে। প্রলোভন দেখালেন ক্লাইভ। ফরাসিদের দল ভাঙানোর এই উদ্দেশ্য সফল হল কিছুটা।

রাতের অন্ধকারে চুপিসাড়ে ফোর্ট অঁরলিও ছেড়ে পালিয়ে এসে ক্লাইভের সঙ্গে দেখা করলেন চার্লস কোসার্দ দে তেরানে নামে এক ফরাসি সামরিক অফিসার।

রীতিমতো দক্ষ অফিসার ছিলেন তেরানে। ভারতের দক্ষিণ উপকূলে সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। দেশের হয়ে লড়তে গিয়ে খুইয়েছেন একটা হাত। একদা দেশের প্রতি যিনি ছিলেন নিবেদিত প্রাণ সেই তেরানে বিশ্বাসঘাতকতা করলেন।

ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েলকাম মসিয়ে। ওয়েলকাম ইন আওয়ার ক্যাম্প।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।’

‘আপনি কীভাবে সাহায্য করতে পারেন আমাদের?’ প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।

তেরানে জবাবে বললেন, ‘আপনারা উদ্দেশ্যহীন ভাবে ফায়ার করছেন। এভাবে কেল্লার দেওয়াল ভাঙতে অনেক সময় লাগবে আপনাদের। ফোর্টের কোনদিকের ওয়াল উইক আছে, আমি দেখিয়ে দিতে পারি।’

‘সো কাইন্ড অফ ইউ।’

বিষণ্ণ চিত্তে তেরানে হঠাৎ বলে উঠলেন, ‘আমাদের অনেক অফিসার মারা গিয়েছে। সকলেই তো পেটের তাগিদে এদেশে এসেছিল। এদের দোষ কোথায়?’ গলা বুজে এল তেরানের।

তেরানের কথার করুণ সুরে কেমন যেন হতচকিত হয়ে গিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘এমন কিন্তু আমি চাইনি। আই সেন্ট অ্যা লেটার টু ইওর গভর্নর। সারেন্ডার করতে বলেছিলাম।’

‘জানি।’

আত্মপক্ষ সমর্থনের ভঙ্গিতে ক্লাইভ বললেন, ‘মসিয়ে রেনল্ট প্রথমেই স্যারেন্ডার করলে এই ক্যালামিটি হতো না। আমাদের লসও তো বড় একটা কম নয়। উই অলসো লস্ট মেনি অফ আওয়ার কলিগস।’

তেরানে বললেন, ‘আপনাদের স্ট্রেনথ অনেক বেশি। জিতবেন আপনারাই। এই অসম লড়াইয়ের কোনও মানে নেই। একথাটাই আমরা অনেকে মসিয়ে রেনল্টকে বোঝাতে পারিনি। আমরা স্যারেন্ডার করার পক্ষেই ছিলাম। গভর্নরের জেদের জন্যই আজ এই হাল। কেউ মারা গিয়েছে। কেউ হাত বা পা হারিয়ে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছে। আমাদের ডক্টর নেই। মেডিসিন নেই। আমার কলিগসদের এই আনবিয়ারেবল সাফারিংস আমি সহ্য করতে পারছি না। আপনি দ্রুত এমন একটা কিছু করুন, যাতে গভর্নর রেনল্ট স্যারেন্ডার করতে বাধ্য হন। যুদ্ধটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়।’

ঠোঁটের কোনায় পাইপ গুঁজে ক্লাইভ বললেন, ‘আমিও তাই চাইছি।’

‘আপনাদের ফ্লিটগুলোকে কাজে না লাগালে লড়াই সহজে শেষ হবে না।’

মাথা ঝাঁকিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘রাইট। কিন্তু, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কেন মাইল খানেক দক্ষিণে থমকে দাঁড়িয়ে আছেন আপনি জানেন নিশ্চয়ই।’

‘জানি। কেল্লার কাছে জাহাজ চলাচলের প্যাসেজে আমাদের কয়েকটা জাহাজকে ডুবিয়ে রেখে প্যাসেজ ব্লক করা হয়েছে।’

‘দ্যাটস নট অল। ইওর গভর্নর অলসো চেইনড দ্য রিভার।’

‘রাইট।’

‘তাহলে কী ভাবে এগোবেন অ্যাডমিরাল?’ প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।

তেরানে বললেন, ‘আমাদের জাহাজ যাতে বেরিয়ে যেতে পারে সেই জন্য একটা গোপন পথ আছে। সেটা আমি দেখিয়ে দিতে পারি। সেই পথ দিয়ে ঢুকে পড়তে পারেন অ্যাডমিরাল।’

‘সপ্লেনডিড।’ উচ্ছ্বসিত হয়ে তেরেনাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন ক্লাইভ।

দুর্গের কাছেই জবরদখল করা একটা বাড়িতে ক্লাইভের আস্তানা। ঘরে জ্বলছে রেড়ির তেলের আলো। সেই আলোতেই একখণ্ড কাগজের উপরে ম্যাপ আঁকতে বসলেন কোসার্দ তেরানে। ঝুঁকে পড়ে কাগজের উপর ফুটে উঠতে থাকা রেখাগুলোকে প্রবল কৌতূহলের সঙ্গে বোঝার চেষ্টা করছেন, ক্লাইভ, আয়ারকুট ও কিলপ্যাট্রিক। কিছুক্ষণের মধ্যেই তেরানে চমৎকার ভাবে ম্যাপ এঁকে দেখিয়ে দিলেন কীভাবে নদীর নীচের লোহার শিকল ও ডুবো জাহাজ এড়িয়ে ইংরেজদের জাহাজ ফোর্ট অঁরলিওর মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াতে পারে।

তেরানের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে ক্লাইভ বললেন, ‘থ্যাঙ্কস অ্যা লট মসিয়ে। ইউ উইল বি অ্যাডিকোয়েটলি রিওয়ার্ডেড উইথ মানি। আই অ্যাম অলসো অফারিং ইউ অ্যা জব ইন মাই আর্মি।’

তেরানে বললেন, ‘নো স্যার। আর যুদ্ধ নয়। সাউথে লড়াই করতে গিয়ে আমার একটা হাত গেছে। এবারে প্রাণটা যাবে। আমি ফ্রান্সে ফিরে যেতে চাই। ওয়ান্ট টু স্পেন্ড গুড টাইম উইথ মাই ফ্যামিলি। আই ওয়ান্ট ফাইভ থাউস্যান্ড ডলার ফর হেল্পিং ইউ।’

পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে খোশমেজাজে ক্লাইভ বললেন, ‘এগ্রিড।’

পরের দিন দুর্গের কাছেই একটা বাড়ির দেওয়ালের আড়াল থেকে কেল্লার দক্ষিণ-পূর্বের বুরুজের দিকে প্রবল উৎসাহে পাঁচটা চব্বিশ-পাউন্ডার কামান থেকে গোলা দাগতে লাগল ইংরেজবাহিনী।

রেনল্ট সহজে আত্মসমর্পণ করার লোক নন। সীমিত শক্তি নিয়েই তিনি প্রতিরোধ গড়ে তুলে যথেষ্ট বেগ দিয়ে চলেছেন ইংরেজদের। মসিয়ে রেনল্টের আত্মসম্মান বোধ অত্যন্ত তীব্র। ইংরেজ ঔদ্ধত্যের কাছে তিনি সহজে মাথা নোয়াবেন না। এই মতাদর্শের লোকের সংখ্যা এখনও ফরাসি শিবিরে এখনও বেশ কয়েকজন রয়েছেন। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন মসিয়ে সিনফ্রে।

দুর্গের কাছেই ঘরবাড়ি দখল করে গড়ে তোলা ইংরেজ ঘাঁটির উপর প্রবল উদ্যমে গোলা দাগতে শুরু করলেন সিনফ্রে। তিনি চন্দননগর কাউন্সিলের সচিব। একই সঙ্গে দুর্গের গোলন্দাজবাহিনীর প্রধান। সিনফ্রের ছোড়া গোলার আঘাতে হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ল ইংরেজদের ঘাঁটির পাশেই একটা বাড়ির বারান্দা। ভেঙে পড়া বারান্দার ইট-পাথরের টুকরো ঝরনার মতো আছড়ে পড়ল ইংরেজদের ঘাঁটির উপর। ধ্বংস স্তূপের নীচে চাপা পড়ে মারা গেলেন দুজন ইংরেজ অফিসার। আহত হল অনেকে। বরবাদ হয়ে গেল পাঁচটা কামান।

পরের দিন, ২৩ মার্চ ১৭৫৭ সাল। তেরানের বলে দেওয়া পথ দিয়ে নিরাপদে ইংরেজদের নৌবহর কেল্লার মুখোমুখি এসে দাঁড়াল। উত্তর-পূর্বের বুরুজের মুখোমুখি অ্যাঙ্কর করল টাইগার। এর কিছুটা দক্ষিণে থাকবে কেন্ট আর দক্ষিণপূর্ব বুরুজের মুখোমুখি নোঙর ফেলবে সলিসবেরি। তিনটি জাহাজ একই সঙ্গে গোলাবর্ষণ করবে কেল্লার উপর- এমনই ছিল পরিকল্পনা। কেন্টের নেতৃত্বে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। টাইগারের নেতৃত্বে অ্যাডমিরাল পোকক। আর সলিসবেরির নেতৃত্বে ক্যাপটেন মার্টিন।

ভাঁটার টানে কেন্ট সরে গেল বেশ কিছুটা দক্ষিণে। একেবারে দক্ষিণ-পূর্ব বুরুজের কাছাকাছি। ফলে সলিসবেরিকে সরে যেতে হল আরও দক্ষিণে। কেল্লা থেকে বেশ কিছুটা দূরে। যার ফলে এই লড়াইয়ে সলিসবেরি যুদ্ধজাহাজটির কোনও ভূমিকা থাকল না।

ভোর বেলা। সবে তখন সূর্য উঠেছে। কেন্ট ও টাইগার—এই দুটি জাহাজ গোলা ছুড়তে শুরু করল ফোর্ট অঁরলিওর উপরে। ছত্রিশ পাউন্ডার কামানগুলোর গর্জনে কেঁপে উঠল গোটা চন্দননগর। বাতাস বারুদের গন্ধে ভারী। ইংরেজদের স্থলবাহিনীও তখন একই সঙ্গে আক্রমণ শানাচ্ছে। কেল্লার দিকে সমানে কামান দেগে চলেছেন কর্নেল ক্লাইভ।

চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত ফরাসিরাও। ফরাসিদের যুদ্ধ জাহাজ সেন্ট কনটেস্ট থেকে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের জাহাজ কেন্টের উপর জোরাল আক্রমণ শুরু করলেন ফ্রেঞ্চ কম্যান্ডার মসিয়ে দেভিগনেস। ক্ষতিগ্রস্ত হল কেন্ট। ভেঙে পড়ল তার বেশ কয়েকটা মাস্তুল। গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়তে লাগল ওয়াটসনের নৌবাহিনীর একের পর এক সৈন্য।

দূরবিনে চোখ রেখে ওয়াটসনকে নজর করে বন্দুক দাগলেন দেভিগনেস। একটা মাস্তুল হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ছে তার মাথার উপরে। নিমেষে সরে গেলেন অ্যাডমিরাল। দেভিগনেসের ছোড়া গুলি অ্যাডমিরালের কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে আপার ডেকের উপরে রাখা বারুদের পিপেকে ফুটো করে দিল। সঙ্গে সঙ্গে বিস্ফোরণ। প্রচণ্ড শব্দ ও ঝাঁকুনিতে একদিকে ছিটকে পড়লেন অ্যাডমিরাল। কেন্ট জাহাজের আপার ডেকে আগুন ধরে গেল।

আগুন! আগুন! প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল কেন্টের জাহাজিদের মধ্যে। একদল লোককে নিয়ে ছুটে এসে প্রবল দুঃসাহসিকতার সঙ্গে আগুন নেভালেন লেফটেন্যান্ট ব্রেয়ারটন। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন চারিদিক। বারুদ পোড়া বিষাক্ত ধোঁয়ায় সকলের দম আটকে আসারে জোগাড়। নদীর বুকে ধোঁয়ার মস্ত কুণ্ডলী দেখে হাসি ফুটল দেভিগনেসের মুখে। নিশ্চয়ই বরবাদ হয়ে গিয়েছে ইংরেজদের ঔদ্ধত্যের প্রতীক কেন্ট।

কেন্ট জাহাজ জুড়ে তখন চরম বিশৃঙ্খলা। আগুন লেগে ডুবতে চলেছে জাহাজ- এই মনে করে সৈনিকদের অনেকে প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে নৌকো নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ছে জলে। রণে ভঙ্গ দিচ্ছে ইংরেজ সেনারা। ঘোর বিপদে পড়েছে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের জাহাজ কেন্ট। এটা বুঝতে পেরে আক্রমণের ঝাঁঝ আরও বাড়ালেন দেভিগনেস।

অসহায় বোধ করলেন ওয়াটসন। এখনও বরবাদ হয়নি কেন্ট। এই জাহাজ নিয়ে দিব্যি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু ইংরেজ নৌ সেনারা যে ভয়ে পালিয়ে যেতে চাইছে। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন সেনাদের ফিরিয়ে আনার জন্য মরিয়া হয়ে হাঁকডাক করতে লাগলেন।

কাপুরুষ এই ইংরেজ সৈনিকদের দেখে রাগে জ্বলে উঠলেন ব্রেয়ারটন। রক্ত ঝরছে কপাল থেকে। আগুন নেভাতে গিয়ে পুড়েছে ডান হাতের বড় একটা অংশ। দগদগ করছে পোড়া ঘা। গায়ে অসম্ভব জ্বলুনি। সেই অবস্থাতেই গলার শির ফুলিয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন ব্রেয়ারটন—’আর ইউ ব্রাইটনস? ইউ ইংলিশমেন অ্যান্ড ফ্লাই ফ্রম ডেঞ্জার? ফর শেম, ফর শেম!’

ব্রেয়ারটনের এই তিরস্কারে কাজ হল। পলায়নরত সেনারা ফিরে আসতে লাগল জাহাজে। ব্রেয়ারটনের কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রচণ্ড লড়াই শুরু করল তারা। ইংরেজদের গোলার আঘাতে অকেজো হয়ে পড়ল ফরাসিদের জাহাজ সেন্ট কনটেস্ট।

ঘন ঘন আছড়ে পড়া গোলার আঘাতে ভেঙে পড়তে লাগল ফোর্ট অঁরলিওর দেওয়াল, ছাতের প্রাচীর। ভেঙে পড়ছে কেল্লার বুরুজগুলো। বুরুজের উপরে বসানো ফরাসিদের কামানগুলো একের পর এক আছড়ে পড়ছে মাটিতে। চুরমার হয়ে যাচ্ছে ফরাসিদের গর্বের প্রতীক ফোর্ট অঁরলিও। দুপুর বারোটা নাগাদ দেখা গেল কেল্লার দিক থেকে আর গোলাগুলির শব্দ নেই। কর্নেল ক্লাইভ তার বাহিনী নিয়ে কেল্লার ভিতরে ঢুকে পড়ার জন্য প্রস্তুত হলেন।

রেনল্ট বুঝলেন আর কোনও প্রতিরোধের চেষ্টা করে লাভ নেই। ড্রাম বাজিয়ে, পতাকা উড়িয়ে আত্মসমর্পণের বার্তা দিলেন তিনি। যুদ্ধের ধকলে পরিশ্রান্ত ইংরেজরাও হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। শান্তির পতাকা হাতে দুর্গে গিয়ে ঢুকলেন আয়ারকুট ও ব্রেয়ারটন। দ্রুত প্রস্তুত হল শান্তিচুক্তির খসড়া।

সেই খসড়া চুক্তি হাতে নিয়ে কর্নেল ক্লাইভ ও অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে দিয়ে স্বাক্ষর করানোর জন্য ছুটলেন আয়ারকুট। শর্তগুলো পড়ে দুজনেই সন্তুষ্ট হয়ে সই করলেন। চুক্তিপত্র অনুযায়ী প্যারোলে ছাড়া পেল ফরাসি সেনা অফিসারেরা। বন্দি করা হল ফরাসি সৈনিকদের। ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সিভিল অফিসারদের অনুমতি দেওয়া হল, তারা যেখানে ইচ্ছে সেখানে যেতে পারে।

২৩ মার্চ বিকেল তিনটে নাগাদ একদল সৈন্যসামন্ত নিয়ে ফোর্ট অঁরলিওর দখল নিলেন আয়ারকুট। ১৩ মার্চ যে যুদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন কর্নেল ক্লাইভ, সেই যুদ্ধ শেষ হল।

ফরাসিদের আত্মসমর্পণের পূর্বে ফোর্ট অঁরলিও থেকে পালিয়ে গিয়েছিল একদল সৈন্য। কিছুতেই ইংরেজদের সামনে মাথা নত করবে না এঁরা। এঁদের জাত্যাভিমান বড় প্রবল। রাতের অন্ধকারে এই পলাতক ফরাসি সৈনিকের দল ঘোড়া দাবড়ে ছুটে চলল কাশিমবাজারের দিকে। একেবারে সামনে চোয়াল শক্ত করে তির বেগে ঘোড়া ছুটিয়ে চললেন এদের দলপতি। তাঁর নাম মসিয়ে সিনফ্রে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *