৪৭
ক্লাইভ ও ওয়াটসনের চিঠি প্রায় একই সঙ্গে সিরাজদ্দৌলার হাতে এসে পড়ল। এই দুই যুদ্ধবাজ সেনাপতির যুগপৎ পত্রবোমায় বেশ চাপে পড়ে গেলেন নবাব।
আবদালির বিরুদ্ধে নবাবকে সাহায্য করার জন্য ফৌজ নিয়ে এগিয়ে আসছেন ক্লাইভ। তবে নবাবের পক্ষে যোগ দেওয়ার শর্ত হিসেবে তিনি চন্দননগরে হামলার ইজাজত চান। অ্যাডমিরাল ওয়াটসনেরও এই একই মত। তিনি অবশ্য এখনও কলকাতা ছেড়ে নড়েননি। নবাবের কাছ থেকে ফরাসিদের কলোনিতে হামলার অনুমতি পেলে তবে তিনি জাহাজ নিয়ে হুগলি নদী বেয়ে এগিয়ে আসবেন।
মুষড়ে পড়লেন নবাব। চন্দননগর আক্রমণের জন্য গোঁ ধরে রয়েছে ইংরেজরা। কিছুতেই তাদের নিরস্ত করা যাচ্ছে না। তাদের শর্ত না মানলে গোরা পল্টনের মদত মিলবে না। ওদিকে এগিয়ে আসছেন আবদালি।
এই দুঃসময়ে কী করবেন নবাব? ক্লাইভ ও ওয়াটসনের চিঠির উত্তর দিতে গিয়ে মানসিক উৎকণ্ঠায় তিনি ভাষা হারিয়ে ফেলছেন বারবার। চিঠির মুসাবিদা করতে গিয়ে কাটাকুটি হচ্ছে বিস্তর। শ্রুতিলিখনে চৌখস মুনশি পরেশান। এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে চিঠির বয়ান। আগের কথার সঙ্গে পরের কথার সাযুজ্য থাকছে না। অনেক কসরত ও বেশ কিছু কাগজ নষ্ট করার পর শেষ হল চিঠিটা।
ক্লাইভ ও ওয়াটসনের উদ্দেশে নবাব লিখলেন, ‘আপনারা লিখেছেন, আপনাদের বহুত কোশিস সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত ফরাসিদের সঙ্গে সমঝোতা হল না। সুলেনামা তৈয়ার ছিল, কিন্তু ফরাসিদের দুই ইলচি আপনাদের জানায় তাদের দস্তখত করা সুলেনামা পণ্ডিচেরি কাউন্সিল যে মানবে, তার জিম্মেদারি তারা নিতে পারবে না। সত্যিই এ বড় আজিব বাত! একজন ফরাসির দস্তখত করা কাগজ আরেকজন ফরাসি মানবে কিনা ঠিক নেই—এই যদি তাদের ইমানদারির নমুনা হয়, তাহলে কীভাবে তাদের উপর ভরসা করা যায়?
‘তবে একটা কথা ইয়াদ রাখবেন, আপনারা যেমন আমার প্রজা তেমনি ফরাসিরাও আমার প্রজা। আপনাদের হামলার ভয়ে তারা সুরক্ষা চেয়েছিল আমার কাছে। আমার জমিনে আমার প্রজাদের মধ্যে লড়াই বাধুক, আমার দেশে ফির একবার আগুন জ্বলে উঠুক—তা আমি চাই না। ফরাসিদের সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য আপনাদের অনুরোধ করেছিলাম ঠিকই, লেকিন আমি ফরাসিদের দোস্ত, তাদের মদত দিতে চাই—এই ভেবে আমার উপর যেন ঝুটা ইলজাম আনবেন না।’
এই অবধি লিখে নবাব থামলেন। চিঠিতে কাটাকুটি হয়েছে অনেকবার। বারংবার কলমের আঁচড়ে কিছু কিছু জায়গা প্রায় অপাঠ্য হয়ে পড়েছে। পরিষ্কার করে চিঠিটা আর একবার লিখে আনার জন্য মুনশিকে হুকুম দিলেন নবাব।
মুনশি কাছারিঘরে আসতেই তার সমুখে গিয়ে হাজির হলেন উমিচাঁদ, সঙ্গে উইলিয়াম ওয়াটস।
আশরফি ভর্তি একটা চামড়ার ছোট খেরিয়া ঝনাৎ করে ফরাসের উপর নামিয়ে রেখে চোখ নাচিয়ে উমিচাঁদ বললেন, ‘আজ কিন্তু কাজটা হাসিল চাই মুনশিজি।’
দ্রুত খেরিয়াটা আড়াল করে পান চিবোতে চিবোতে সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়লেন মুনশি। তারপর নিজের জায়গা ছেড়ে উঠে এসে সন্তর্পণে ঘরের দরজা বন্ধ করে দিলেন।
হিরাঝিলের অলিন্দে আরামকেদারায় শুয়ে অপেক্ষা করছিলেন নবাব। অস্থির চিত্তে ঘন ঘন টান দিচ্ছেন হাতে ধরা ফরসির নলে। চারিদিক অম্বুরি তামাকের গন্ধে আমোদিত।
গোটানো রয়েছে অলিন্দের চিলমন। দূরে রুপোলি ফিতের মতো বয়ে চলেছে ভাগীরথী। অলিন্দ থেকে দিব্যি দেখা যাচ্ছে। নদীর চরে ওড়াউড়ি করে একগাদা পাখি খুশি মানাচ্ছে। নবাবের নজরে পড়ল ছোট একটা পণ্যবাহী জাহাজ। জল কেটে চলেছে আজিমগঞ্জের দিকে। তার মাথায় উড়ছে ফরাসিদের নিশান।
‘হুজুর!’
দাখিলার গলার আওয়াজ শুনে মুখ ঘোরালেন নবাব। চোখের দৃষ্টি দূর থেকে নিকটে এনে শুধোলেন, ‘চিঠি এনেছ?’
‘জি হুজুর!’
নবাব ভাবছিলেন ক্লাইভ ও ওয়াটসনকে লেখা চিঠির কথা। স্বাক্ষর করে চিঠিটা দ্রুত পাঠাতে হবে চন্দননগর ও কলকাতায়।
দাখিলা বলল, ‘মোরাদবাগ প্যালেস থেকে হিরা বেগম এই চিঠি পাঠিয়েছেন।’
‘হিরা বেগম!’
সিরাজের বুকটা কেমন যেন ছাৎ করে উঠল। মোহনলালের বোন হিরা একসময়ে বেহেস্তের গুলাব হয়ে ফুটেছিল সিরাজের জীবনে। সে বেশ কয়েকবছর আগের কথা। হিরা ছিল সিরাজের জীবনের রওশন। তারপর হঠাৎই একদিন একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে সুনহারি এক আশনাইয়ের তাল কাটল। বহুদিন হিরার সঙ্গে কোনও যোগাযোগ নেই সিরাজের।
জীবনের চরম এক আনন্দের মুহূর্ত সিরাজকে উপহার দিয়েছিল হিরা। সেই আনন্দই হয়ে উঠল বিষাদের কারণ। আলিবর্দি তখন বেঁচে। তাঁর খায়েশেই সিরাজের জীবন থেকে দূরে চলে যেতে হল হিরাকে। বড় অন্যায় হয়েছে হিরার সঙ্গে—একটা অপরাধবোধ সিরাজকে আজও তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। এতদিন পরে আজ হঠাৎ চিঠি লিখল কেন হিরা? কী বলতে চায় সে?
চিন্তিত মুখে দাখিলার হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে তাতে চোখ বুলিয়ে চমকে উঠলেন নবাব। তাঁর বুক কাঁপতে লাগল। না। অতীতের কোনও কথা তোলেনি হিরা। সে লিখেছে তার বড়ে ভাই মোহনলালের কথা।
‘আপনার দোস্ত, সুবে বাংলার দেওয়ান, আমার বড়ে ভাইয়া মোহনলালের বহুত বিমার। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারছেন না। গত তিন দিন ধরে প্রায় হুঁশ নেই। কবিরাজ মশায়ের ধারণা পানীয়ের সঙ্গে জওহর মিশিয়ে কেউ আপনার দোস্তকে খুন করতে চেয়েছিল। জানি না এ ঘটনার সঙ্গে কোনও যোগ আছে কিনা—মোরাদবাগ প্যালেস থেকে পালিয়ে গিয়েছে খুশবু বাই। বড়ে ভাইয়ার বহুত পেয়ারের এক আদমি আক্রম খুন হয়েছে। তার গুলিবিদ্ধ মুদ্দত পাওয়া গিয়েছে নদীর চরে। নানা দুশ্চিন্তায় আমি পরেশান হয়ে পড়েছি। আপনি একবার এলে ভালো হয়।’
হাত কাঁপতে লাগল সিরাজদ্দৌলার। বিষ দেওয়া হয়েছে মোহনলালকে? তবে কী অন্তর্ঘাত? বর্তমানের এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে মোহনলালের কিছু একটা হয়ে গেলে নবাব অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়বেন। তাঁর বিরোধী পক্ষের হাত আরও শক্ত হবে। নড়বড় করতে থাকা এই নিজামতে মোহনলালের চেয়ে লড়াকু, দক্ষ সেনাপতি আর কেই বা আছে?
মোরাদবাগ প্যালেসে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে তাঞ্জাম প্রস্তুত করার নির্দেশ দিলেন। নবাব খানদানের হেকিম হাদি খানকেও তাঁর সঙ্গে যাওয়ার জন্য এত্তেলা দিলেন।
হুকুম নিয়ে চলে গেল হুকুমবরদার।
এই সময় চিঠির প্রতিলিপি হাতে নিয়ে নবাবের সামনে হাজির হল মুনশি।
চিঠিটা হাতে নিয়েই দস্তখত করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন নবাব। চিঠির বয়ানে আর চোখ বোলালেন না। চিঠিটা স্বাক্ষর করেই তাঁকে মোরাদবাগ প্যালেসে ছুটতে হবে। মোহনলালের খবরটা শুনে ভয়ানক অস্থির হয়ে পড়েছেন নবাব।
ময়ূরের পালকের কলমটা কালিতে ডুবিয়ে দ্রুত দস্তখত করে চিঠিটা মুনশির হাতে তুলে দিয়েই ব্যস্ততার সঙ্গে নীচে নেমে গেলেন নবাব। হিরাঝিল প্রাসাদের সদর দরজায় প্রস্তুত হয়ে আছে তাঞ্জাম। অপেক্ষা করছে কাহারের দল ও দেহরক্ষীরা। নবাবের হুকুমে হাজির হেকিম হাদি খানও।
দপ্তরে এসে চিঠির উপর নবাবের সিলমোহরের ছাপ দিয়ে হাসি মুখে চিঠিটা ওয়াটসের হাতে তুলে দিলেন মুনশি। উমিচাঁদ খুশি হয়ে তার হাতে আরও দুটো আশরফি গুঁজে দিলেন।
হিরাঝিল প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে এসে উল্লাসে ফেটে পড়লেন ওয়াটস ও উমিচাঁদ। নবাব জানতেই পারলেন না তাঁর চিঠির বয়ান বদলে গিয়েছে। আশরফির মাহাত্ম্যে নবাবের তৈরি করা খসড়ার নীচে ওয়াটসের নির্দেশ মতো মুনশি জুড়ে দিয়েছে আরও কয়েকটি কথা।
‘তোমাদের পয়লা নম্বর দুশমনও যদি প্রাণভিক্ষা চায় তোমরা কি তা বিবেচনা করবে না? তার সরলতায় যদি সন্দেহ না থাকে তুমি কি তখন তাকে রহেম কর না? অবশ্য যদি আন্দিসা থাকে তখন আলগ বাত। এক্ষেত্রে যেমন বোঝ, তেমন আচরণ কর।’ এর ঠিক নীচে নবাবের সাক্ষর ও সিলমোহর।
‘যেমন বোঝ তেমন আচরণ কর’ এই কথাটাকেই তো চন্দননগরে হামলার অনুমতি হিসেবে ধরে নেওয়া যায়। উইলিয়াম ওয়াটস আনন্দে আত্মহারা।
কাশিমবাজারের কুঠিতে ফিরেই ক্লাইভ ও ওয়াটসনকে চিঠি লিখতে বসে গেলেন ওয়াটস। ‘আই ওয়ান্ট টু শেয়ার উইথ ইউ অ্যা ভেরি গুড নিউজ…’
ওয়াটসের চিঠি নিয়ে দ্রুতগামী ঘোড়সওয়ার কাসিদ ছুটল ছুটল চন্দননগর ও কলকাতার দিকে।
ততক্ষণে শ্রীরামপুর ছেড়ে আরও এগিয়ে এসেছেন কর্নেল ক্লাইভ। সেনাছাউনি পড়েছে চন্দননগরের উপকণ্ঠে ফরাসিদের সুরম্য বাগানে। স্থানীয় লোকে বলে কোম্পানির বাগান। ওয়াটসের চিঠি পেয়ে উল্লসিত হয়ে উঠলেন ক্লাইভ। ‘যেমন বোঝ, তেমন আচরণ কর’ ধূর্ত ক্লাইভের মতে সার্টেনলি দিস ইজ অ্যান এনডোর্সমেন্ট টু অ্যাটাক চন্দননগর।
গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম! প্রবল হর্ষে শূন্যে তোপ দাগল ক্লাইভের ফৌজ।
সাঁঝবেলায় হঠাৎই এরকম দানবীয় শব্দ শুনে প্রবল আতঙ্কে নীড় ছেড়ে আকাশে চক্কর খেতে লাগল ফরাসিদের বাগানের নিরীহ পাখিগুলো।
কেন্ট জাহাজও কলকাতায় গঙ্গার বুকে দাঁড়িয়ে কামান দাগল খুশিতে।
পাইলটদের ডেকে নোঙর তোলার আদেশ দিলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। নড়েচড়ে উঠল জাহাজগুলো।
ঝিম মেরে পড়ে থাকা অতিকায় সরীসৃপের দল যেন সচল হল শিকারের আশায়। চলো চন্দননগর! গঙ্গার জল কেটে উত্তর দিকে এগিয়ে চলল পাঁচটি জাহাজ—কেন্ট, টাইগার, সলিসবেরি, ব্রিজওয়াটার ও কিংফিসার।
মোরাদবাগ প্যালেস জুড়ে বিষাদের ছায়া। দেওয়ান মোহনলাল শয্যাশায়ী। প্রায় বেহুঁশ। তিন দিন হয়ে গেল। নির্জীব হয়ে পড়ে রয়েছেন বিছানায়। বৃদ্ধ কবিরাজ বসে আছেন পালঙ্কের পাশে কুরসির উপরে। তাঁর মুখে দুশ্চিন্তার রেখা। থেকে থেকে দেওয়ানজির নাড়ি টিপে দেখছেন। নাড়ির গতি অতি ক্ষীণ। মোহনলালের চোখ বন্ধ। বুকটা সামান্য ওঠানামা করছে। দেওয়ানজির গায়ের গৌরবর্ণ কেমন যেন কালচে মেরে গিয়েছে। কবিরাজের মতে বিষক্রিয়ায় দূষিত হয়েছে রক্ত। তিন দিন অতিবাহিত হলেও সংকট যে পুরো কেটে গিয়েছে তা এখনই তিনি জোর দিয়ে বলতে পারছেন না।
ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে দ্রুত মোরাদবাগ প্যালেসের অন্দরে প্রবেশ করলেন জাঁ ল। রেনল্ট সাহেব চিঠি পাঠিয়েছেন চন্দননগর থেকে। শহরের উপকণ্ঠে, কোম্পানির বাগানে ফৌজ নিয়ে ছাউনি ফেলেছেন কর্নেল ক্লাইভ। হাতে সময় খুব কম। ফরাসিদের সাহায্যের জন্য বড় একটা ফৌজ মুর্শিদাবাদ থেকে অবিলম্বে চন্দননগরে পাঠানো দরকার। নবাবকে বলে যখন কাজ হচ্ছে না, তখন শেষ ভরসা মোহনলাল। চন্দননগর থেকে ফরাসিরা উৎখাত হয়ে গেলে নবাবের যে কী বিপদ হতে পারে সেটা নবাব না বুঝলেও দেওয়ানসাহেব হয়তো বুঝবেন।
এইসব কথা মোহনলালকে খুলে বলার জন্য সাতসকালে কাশিমবাজার থেকে মোরাদবাগ প্যালেসে ছুটে এসেছেন মসিয়ে ল। দেওয়ানজি যে শয্যাশায়ী তা তিনি জানতেন না। খবরটা শুনে মুষড়ে পড়লেন। প্যালেসের অন্দরে প্রবেশ করে মোহনলালের শয্যার পাশে এসে দাঁড়ালেন জাঁ ল।
মেহগিনি কাঠের পালঙ্কে চিৎ হয়ে শুয়ে আছেন সুবে বাংলার দেওয়ান। বুক অবধি নকশাদার মসলিনের চাদরে ঢাকা। যার সঙ্গে অত্যন্ত জরুরি আলোচনা সারতে ছুটে এসেছেন জাঁ ল, তার আজ কথা বলারই ক্ষমতা নেই। সত্যিই দুর্ভাগ্য ফরাসিদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে।
বেশ কিছুক্ষণ মোহনলালের দিকে এক দৃষ্টে চেয়ে রইলেন জাঁ ল। পালঙ্কের বাজু ধরে মলিন মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে হিরা।
‘কী করে এমন হল?’ ঘরের নীরবতা ভেঙে প্রশ্ন করলেন ল।
বৃদ্ধ কবিরাজ একবার মুখ তুলে ল সাহেবের দিকে তাকালেন। বললেন, ‘রক্তে বিষক্রিয়া। অনেকটা বিষ ঢুকেছে শরীরে।’
চমকে উঠলেন ল সাহেব। নির্ঘাত কেউ বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করতে চেয়েছিল মোহনলালকে।
মাথাটা নামিয়ে মোহলনলালের কানের কাছে মুখ নিয়ে হিরা ডাকলেন, ‘বড়ে ভাইয়া! কাশিমবাজার থেকে ল-সাহেব এসেছেন।’
অনেক কষ্টে চোখ খুলে ঘোলাটে দৃষ্টিতে তাকালেন মোহনলাল। মুখ ঘুরিয়ে একবার ল-এর দিকে তাকালেন। ফের বন্ধ হয়ে গেল চোখের পাতা। চোখের পাতা খুলে রাখার মতোও শক্তিও নেই মোহনলালের শরীরে।
কিছুক্ষণ পর একরাশ হতাশা নিয়ে মোহনলালের শয়েনকক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন জাঁ ল।
নবাবের তাঞ্জাম এসে থামল মোরাদবাগ প্যালেসের দেউড়িতে। নবাব এসেছেন। নিমেষে চঞ্চল হয়ে উঠল গোটা প্যালেস।
প্রাসাদের বাগানে টাট্টুঘোড়ার পিঠে চেপে ঘুরছিল শ্রীমন্তলাল—মোহনলালের পাঁচ বছরের শিশুপুত্র। পাশে পাশে ঘোড়ার রাশ ধরে হাঁটছে একজন সহিস। ঘোড়ার পিছন পিছন হাঁটছে বল্লম হাতে এক পেয়াদা।
নবাবের তাঞ্জাম দেখে ত্রস্ত হয়ে পড়ল সহিস ও পেয়াদা। দ্রুত শ্রীমন্তলালকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামিয়ে দিল সহিস। হলই না হয় শ্রীমন্তলাল নেহাতই শিশু, তবুও নবাবের সামনে ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা বেসহবত কাণ্ড।
এগিয়ে গিয়ে শ্রীমন্তলালকে কোলে তুলে নিলেন নবাব। অস্বস্তিতে কেমন যেন আড়ষ্ট হয়ে গেল শ্রীমন্তলাল।
‘ঘোড়ার পিঠে চেপে ঘুরছিলে?’ প্রশ্ন করলেন নবাব।
মাথা ঝাঁকিয়ে জবাব দিল শ্রীমন্তলাল।
তার কপালে চুমু খেয়ে নবাব বললেন, ‘বেশ বেটা। ঘোরো।’
শ্রীমন্তলালকে ফের টাট্টুর পিঠে বসিয়ে দিলেন নবাব।
প্রাসাদের অন্দরে যাওয়ার জন্য নবাব পা বাড়াতেই পিছন থেকে শ্রীমন্ত প্রশ্ন করল, ‘পিতাজির দুশমন কে?’
নবাব ঘুরে আবার এগিয়ে এলেন শ্রীমন্তের কাছে।
‘পিতাজির দুশমন কে? তুমি তো নবাব। জানো না?’
পিতার অসুখে উদ্বিগ্ন এই শিশুর প্রশ্ন শুনে জল এসে গেল সিরাজের চোখে।
শ্রীমন্তর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে সিরাজ বললেন, ‘জানি না বেটা।’
‘পিতাজিকে খুন করতে চায় কে?’
‘কে বললে তোমাকে এসব কথা?’
‘হিরা বুয়া একজনকে বলছিল। আমি শুনেছি।’
‘তোমার পিতাজি ভালো হয়ে যাবে বেটা। গদ্দারি যে করেছে আমি তাকে খুঁজে বের করে সাজা দেব।’ এই বলে শ্রীমন্তর কপালে আবার চুমু খেলেন সিরাজদ্দৌলা।
দোতলার অলিন্দে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল হিরা। তার চোখের কোণ থেকে মুক্তোর দানার মতো এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল।
হেকিম হাদি খানকে সঙ্গে নিয়ে মোহনলালের শয্যার পাশে এসে দাঁড়ালেন সিরাজদ্দৌলা। হাদি খান অনেকক্ষণ ধরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলেন মোহনলালকে। ঘরের এক কোনায় গিয়ে চিকিৎসারত কবিরাজের সঙ্গে আলোচনা করলেন।
নবাব শুধোলেন, ‘কী বুঝলেন হেকিমসাহেব?’
হাদি খান বললেন, ‘দেওয়ানজির খুনে জওহর মিশেছে। দাওয়াই ইলাজ সব ঠিকই আছে হুজুর। সেরে উঠবেন। তবে সময় লাগবে।’
সেরে উঠবেন মোহনলাল। নবাবের বুকের উপর থেকে যেন পাষাণভার নেমে গেল। মোহনলালের শয্যার পাশে হাঁটু মুড়ে বসলেন নবাব। মাথায় হাত বুলিয়ে মনে মনে বললেন, ‘সেরে ওঠো দোস্ত। তোমার জান মেরে লিয়ে বহুত কিমতি। আজ আমি ঘরে বাইরে বহুত পরেশানির মধ্যে রয়েছি। তুমি ছাড়া ভরসা করার মতো কেউ যে আমার নেই। জলদি সেরে ওঠো দোস্ত।’
উঠে দাঁড়িয়ে ধীর পায়ে মোহনলালের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলেন নবাব। দূরে অলিন্দের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে হিরা। তার দৃষ্টি বাগানের দিকে। নীচ থেকে ভেসে আসছে টাট্টুঘোড়ার ছন্দবদ্ধ খুরের আওয়াজ। শ্রীমন্তলালের কলকলানি। হিরার দিকে এগিয়ে গেলেন নবাব।
‘হিরা!’
মুখ ঘুরিয়ে নবাবকে দেখতে পেয়ে তসলিম জানাল হিরা।
‘কেমন আছ তুমি?’ শুধোলেন নবাব।
‘ভালো।’ শীতল গলায় সংক্ষিপ্ত উত্তর দিল হিরা। তারপর শুধোল, ‘ভাইয়াকে কেমন দেখলেন?’
‘চিন্তা কোরো না। হেকিম হাদি খান বলছেন ভালো হয়ে যাবে। সময় লাগবে সেরে উঠতে।’
আনত চোখে মাটির দিকে চেয়ে থাকে হিরা। বহুদিন পর হিরার সঙ্গে মুখোমুখি দেখা। আরও কথা বলতে ইচ্ছে করছে সিরাজের। কিন্তু কী বলবেন কথা খুঁজে পাচ্ছেন না।
ক্ষণিকের অস্বস্তিকর স্তব্ধতা কাটিয়ে উঠে নবাব বললেন, ‘আমি আসি। শ্রীমন্তর খেয়াল রেখো।’ কথাটা বলে আর দাঁড়ালেন না নবাব। নীচে নামার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলেন। হিরার হিমশীতল ব্যবহার ক্ষতবিক্ষত করে দিয়েছে তাঁর হৃদয়কে। সেখান থেকে খুন ঝরছে।
চলে যাচ্ছেন নবাব। এবারে চোখ তুলে চাইল হিরা। নবাবের অপসৃয়মান চেহারাটার দিকে চেয়ে রইল একদৃষ্টে। জল এল তার চোখে। কেঁপে উঠল নরম ঠোঁট দুটো। নিজেকে আর সামলাতে পারল না হিরা। এক ছুটে চলে গেল অন্দরমহলে। পালঙ্কের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে কান্নায় ভেঙে পড়ল।
মোরাদবাগ প্যালেস থেকে বেরিয়ে এসে তাঞ্জামে উঠতে যাবেন সিরাজদ্দৌলা, ছুটে এসে তার সামনে জোড় হাত হয়ে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন জাঁ ল। কাশিমবাজারের ফরাসি কুঠি প্রধানের এই নাটকীয় আচরণ দেখে খানিকটা থতমত খেয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা।
ল কাতর কণ্ঠে বললেন, ‘হুজুর আপনি সুবে বাংলার মালিক। আপনি ছাড়া আর কার কাছে যাব আমরা? দোহাই হুজুর আমাদের বাঁচান। চন্দননগরের কাছে ছাউনি ফেলেছেন কর্নেল ক্লাইভ। আপনি এখনই সেনা না পাঠালে আমরা যে একেবারে শেষ হয়ে যাব।’
মসিয়ে ল-কে ইয়াদদস্ত করে নবাব বললেন, ‘বেশ। ফৌজ নিয়ে চন্দননগরে যাবেন রায়দুর্লভ। আমি আজই হুকুমজারি করছি।
‘হুজুর বহুত মেহেরবান।’ আবেগে কেঁদে ফেললেন জাঁ ল।
মোরাদবাগ প্যালেস ছেড়ে বেরিয়ে গেল নবাবের তাঞ্জাম। ছুটে চলল হিরাঝিল প্রাসাদের দিকে।
