৪৬
চোখের সামনে যেন অন্ধকার দেখলেন সিরাজদ্দৌলা। দিল্লি ও আগ্রা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে যিনি খোদ মোগল বাদশার গর্ব ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন, জয় করেছেন কাশ্মীর ও পঞ্জাব, নাদির শা যাঁর সম্বন্ধে বলেছিলেন, ইরান, তুরান, হিন্দুস্তানে এর সমকক্ষ লোক আমি দেখিনি সেই আহম্মদ শাহ আবদালি পাটনার পথে!
সিরাজদ্দৌলার পা কাঁপতে লাগল। কলেবরে অতিকায় তাঁর যে ফৌজ কলকাতায় গিয়ে কয়েকশো মাত্র ফিরিঙ্গি সেনার হাতে নাকাল হয়ে ফিরেছে, তাদের মনোবল এখন তলানিতে। এই ফৌজ নিয়ে আবদালির মোকাবিলা কী করে করবেন তিনি?
মোহনলাল, রায়দুর্লভ, মিরজাফরসহ অন্যান্য সেনাপতিদের জরুরি তলব করলেন নবাব। আবদালির আগমন সংবাদ রীতিমতো ত্রাসের সঞ্চার করল সবার মনে। নবাব নিজেও ভয়ে কাঁপছেন। আবদালিকে ঠেকানোর জন্য এখনই পাটনা অভিমুখে একটা ফৌজ রওনা করিয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু কে যাবে ফৌজ নিয়ে। সেনাপতিরা সবাই এ ওর মুখের দিকে তাকাচ্ছে। বুক দুরু দুরু করছে সকলের। কার উপরে নেমে আসবে ফৌজ নিয়ে আবদালির মুখোমুখি হওয়ার হুকুমত!
মোহনলাল বললেন, ‘আবদালির মোকাবিলা করার জন্য আমরা কোম্পানির ফৌজের মদত চাইতে পারি। গোরা পল্টনরা জঙ্গবাজির ময়দানে জবরদস্ত।’
কথাটা মনে ধরল নবাবের। ক্লাইভ ও ওয়াটসনের উদ্দেশে লেখা দুটো পৃথক চিঠি উইলিয়াম ওয়াটসের হাতে ধরিয়ে দিলেন নবাব। দুটো চিঠির বয়ান একই রকম।
নবাব লিখলেন, ‘…আবদালি পাটনার দিকে আসছেন। তার মোকাবিলা করার জন্য আমাকে পাটনায় যেতে হবে। এই সময় ফৌজসহ আপনি যদি আমার সঙ্গে যোগ দেন তাহলে খুব খুশি হব। এই অভিযানে আপনার মদতের কিম্মত হিসেবে আপনার ফৌজের জন্য হর মাহিনা আমি এক লাখ তনখা দেব।…’
নবাবের চিঠি পড়ে উল্লাসে ফেটে পড়লেন ক্লাইভ। ফুরফুরে মেজাজে চকমকি পাথর ঠুকে পাইপে আগুন দিয়ে মেজর কিলপ্যাট্রিককে ডেকে পাঠালেন ক্লাইভ। নবকৃষ্ণকেও তলব করলেন।
কিলপ্যাট্রিক এসে স্যালুট করতেই নবাবের চিঠিটা তার দিকে এগিয়ে দিলেন ক্লাইভ।
চিঠিতে চোখ বুলিয়ে ভুরু কুঁচকে কিলপ্যাট্রিক শুধোলেন, ‘শ্যুড উই প্রসিড টু হেল্প নবাব?’
ঠোঁটের ফাঁকে চতুর হাসির আভাস নিয়ে বললেন, ‘হোয়াটস ইওর ওপিনিয়ন জেমস?’
কিলপ্যাট্রিকের মনে সংশয়ে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘নবাবের প্রোপোসাল অ্যাকসেপ্ট করা কি উচিত হবে?’
‘হোয়াই নট?’
‘জেনারেল বুসি যদি এসে পড়েন?’
বাতাসে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘গতকালই আমি খবর পেয়েছি, এখনও বালাসোরে বুসির জাহাজের দেখা নেই। কাজেই আপাতত বুসিকে নিয়ে আমাদের ওয়ারিড না হলেও চলবে। আমার মনে হয় ইট ইজ অ্যা গোল্ডেন অপারচুনিটি টু অ্যাটাক চন্দননগর।’
নবাবের চিঠির সঙ্গে চন্দননগর আক্রমণের যে কী সম্পর্ক তা বুঝে উঠতে পারলেন না কিলপ্যাট্রিক। তিনি বললেন, ‘কিন্তু নবাব তো পাটনায় যাওয়ার কথা লিখেছেন!’
কাঁধ ঝাঁকিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘দ্যাট ইজ ট্রু।’
‘কিন্তু আপনি যে চন্দননগর আক্রমণের কথা বলছিলেন—’
আলোচনায় ছেদ পড়ল। এই সময় নবকৃষ্ণ ঘরের দরজায় দেখা দিয়ে বলেন, ‘সেলাম হুজুর।’
হাসি মুখে উষ্ণ গলায় ক্লাইভ বললেন, ‘গুড মর্নিং।’
‘ভেরি গুড মর্নিং স্যার।’
‘কাল রাতে নবাবের একটা চিঠি এসেছে নবকিসেন। রিপ্লাই দিতে হবে।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘হুজুরের শরিফ মেজাজ দেখে মনে হচ্ছে চন্দননগরে হামলার পারমিশন দিয়েছেন নবাব। তাই তো?’
‘একরকম পারমিশনই বলা যায়।’
অবাক হয়ে ক্লাইভের মুখের দিকে তাকালেন কিলপ্যাট্রিক।
ক্লাইভ ঘরের মধ্যে দৃপ্ত পায়ে পায়চারি করতে করতে বললেন, ‘আবদালি পাটনার দিকে আসছেন। আমার ও আমার ফৌজের মদত চেয়েছেন নবাব।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আর কী? কাজ তো প্রায় হাসিল। এবার ফৌজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই তো হয় হুজুর। তারপর চাপ বাড়িয়ে চন্দননগরে হামলার হুকুমত আদায় করে নিলেই হল।’
নবকৃষ্ণর পিঠ চাপড়ে দিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ব্রিলিয়ান্ট মুনশি। ইউ আর ভেরি ক্লেভার।’
জোড় হাত হয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সবই আপনাকে দেখে শেখা হুজুর। আপনি আমার প্রভু। মাই লর্ড। জয় গোবিন্দ!’
এবারে কিলপ্যাট্রিকের উদ্দেশে ক্লাইভ বললেন, ‘নাউ জেমস, আই থিংক এভরিথিং ইজ ক্লিয়ার টু ইউ। কালই আমি বেরিয়ে পড়তে চাই।’
‘ওকে স্যার। বাট আই ওয়ান্ট টু রেইজ ওয়ান পয়েন্ট। দ্য শিপ কামবারল্যান্ড ক্রসড বালাসোর। কয়েকটা দিন অপেক্ষা করলে আর একটু বেশি ফোর্স নিয়ে আমরা এগোতে পারি।’
‘আমার হাতে অত সময় নেই জেমস। ক্যালকাটা রিচ করার পর কামবারল্যান্ড জাহাজটাকে চন্দননগরের দিকে পাঠিয়ে দিলেই হবে।’
‘ওকে স্যার।’
কিলপ্যাট্রিক বিদায় নেওয়ার পর নবকৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে চিঠির মুসাবিদ করতে বসলেন কর্নেল ক্লাইভ। তিনি লিখলেন, ‘…আমার উমিদ ছিল বাংলায় শান্তি বজায় রাখার জন্য ফরাসিদের সঙ্গে আমাদের একটা সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। কিন্তু চন্দননগরের ফরাসিরা যদি বলে, তাদের দস্তখত করা আহাদনামা পণ্ডিচেরি কাউন্সিল মানবে কিনা তার ঠিক নেই, তাদের সঙ্গে কী করে সমঝোতা করা সম্ভব? আমরা যা চাই, তা তুরন্ত বাস্তবায়িত করার মুরদ আমাদের আছে কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, চন্দননগরের ফরাসিদের তা নেই। এ নিয়ে আক্ষেপ করে আর কী হবে?
মসিয়ে বুসি যুদ্ধজাহাজ নিয়ে এসে পড়লে সর্বনাশ হবে আমাদের। এই আশঙ্কা থাকা সত্ত্বেও আপনার সঙ্গে দোস্তির মজবুরি মেটাতে আমি ফৌজ নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। এই চিঠি আপনি যখন পাবেন, আমি তখন চন্দননগরের পথে। ফরাসিদের শহরের কাছে গিয়ে ছাউনি ফেলে আমি অপেক্ষা করব। তবে আপনি পরেশান হবেন না। আপনার হুকুমত ছাড়া আমি চন্দননগরে কোনও হাঙ্গামা বাধাব না। মনে রাখবেন, বুসি এসে পড়ার আগে ফরাসি কলোনি ধ্বংস করা আমাদের খুবই দরকার। তাহলে নিশ্চিন্ত মনে আপনার সঙ্গে আমি পাটনা বা দিল্লি যেখানেই হোক না কেন যেতে পারব। আশা করি আপনি চন্দননগরে হামলা করার হুকুমত আপনি দেবেন।’
এই চিঠি নবাবকে পাঠিয়ে দিয়েই দ্রুত বরানগরের ক্যাম্প গোটানোর হুকুম দিলেন ক্লাইভ। খবর ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে—আবদালির বিরুদ্ধে নবাবকে সাহায্য করতে ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে যাচ্ছেন ক্লাইভ। মেজর কিলপ্যাট্রিকের নেতৃত্বে সৈন্যরা পায়ে হেঁটে চলল। কামান ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে জাহাজে চড়ে বসলেন কর্নেল ক্লাইভ।
চন্দননগর খুব দূরে নয়। নবাবের পরোয়ানা ছাড়া অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে কলকাতা থেকে নড়ানো যাবে না। অ্যাডমিরাল তাঁর জাহাজগুলো নিয়ে পাশে না দাঁড়ালে চন্দননগর জয় করা যাবে না। তবে কর্নেল ক্লাইভ প্রত্যয়ী—নবাবের পরোয়ানা আসবেই। অপেক্ষা করতে হবে। তাই তড়িঘড়ি চন্দননগরে পৌঁছে কোনও লাভ নেই। কোম্পানির ফৌজ এগোতে লাগল ধীর গতিতে।
ওদিকে নবাব সিরাজদ্দৌলার চিঠির জবাবে অ্যাডমিরাল ওয়াটসন লিখলেন, ‘আপনি পাটনায় যুদ্ধ করতে যাচ্ছেন, আমাদের সাহায্য চেয়েছেন, কিন্তু কী করে আমাদের শত্রুকে পিছনে রেখে আপনার সঙ্গে আমি এগিয়ে যাব? জেনারেল বুসি যখন কলকাতায় এসে পৌঁছবেন, আমরা তখন হয়তো আপনার সঙ্গে অনেক দূরে এগিয়ে গিয়েছি। এতে যে আমাদের সর্বনাশ হবে। জেনারেল বুসি দখল করে নেবেন কলকাতা। তার চেয়ে আপনি জলদি একটা পরোয়ানা লিখে দিন। যাতে চন্দননগরের ফরাসিদের বিনাশ করে আমরা নিশ্চিন্তে আপনার সঙ্গে যোগ দিতে পারি। এর বেশি কী আর লিখব?’
এই চিঠি পাঠিয়ে দিয়ে কলকাতায় গ্যাঁট হয়ে বসে রইলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। যুদ্ধের নেশায় তাঁরও রক্ত তখন গরম হতে শুরু করেছে। তবে নবাবের পরোয়ানা ছাড়া কিছুতেই চন্দননগরের দিকে তিনি এগোবেন না। কলকাতায় বসে তিনি নবাবের চিঠির প্রতীক্ষা করতে লাগলেন।
ক্লাইভ ফৌজ নিয়ে আসছেন চন্দননগরের দিকে। পৌঁছে গিয়েছেন শ্রীরামপুরে। ত্রস্ত হয়ে পড়ল ফরাসি কাউন্সিল। ক্লাইভকে চিঠি লিখে এই অভিযানের কারণ জানতে চাইলেন গভর্নর রেনল্ট। জবাবে ক্লাইভ জানালেন, ‘…আপনাদের সঙ্গে লড়াই বাধানোর কোনও ইচ্ছে আমার নেই। আবদালিকে ঠেকাতে নবাব ফৌজ নিয়ে পাটনায় যেতে চান। আমাদের মদত চেয়েছেন। তাই আমরা আপাতত মুর্শিদাবাদে চলেছি।…’
এই চিঠি পেয়ে আশা ও আশঙ্কায় দুলতে লাগলেন চন্দননগরের গভর্নর পিয়েরে রেনল্ট।
মোরাদবাগ প্যালেসে হোলি উৎসবের মজলিশ যখন শেষ হল, রাত তখন গভীর। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চরাচর। জাফরির ফাঁক দিয়ে রঙমহলের কাশ্মীরি গালিচার উপর এসে পড়েছে নরম জ্যোৎস্না। নিভু নিভু বাতিদানে অভ্রের আলো। মোসাহেবের দল বিদায় নিয়েছে। রংমহলে মুখোমুখি মোহনলাল ও খুশবু বাই।
হাঁটুতে থুতনি রেখে অপরূপ ভঙ্গিমায় বসে রয়েছে খুশবু। তার মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছেন মোহনলাল। নেশায় চোখদুটো ঢুলু ঢুলু। সামনে রাখা রুপোর সুরাপাত্র উৎকৃষ্ট মদিরায় পরিপূর্ণ।
‘তুমি খুবসুরত পিয়ারি। বহুত সুন্দর।’
চোখ নামিয়ে বাঁ-হাতের অনামিকার বড় হিরের আংটির দিকে তাকায় খুশবু। তারপরেই চোখ চলে যায় পাশে পড়ে থাকা শরাবে পূর্ণ পাত্রের দিকে।
‘দূরে কেন? কাছে এসো বিবিজান। শরমের কী আছে? দেওয়ান মোহনলাল তোমার আশিক। এই সুবে বাংলায় তোমার চেয়ে খুশনসিবি আওরাত আর কে আছে বলতে পারো?’ নেশার ঘোরে জড়িয়ে যায় মোহনলালের কথাগুলো।
খুশবু লজ্জাবনত মুখে ওড়নার কিনারা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে থাকে। বুকের মধ্যে প্রকাণ্ড এক সংশয়ে। কাজটা কি হাসিল করতে পারবে সে? কোমরের কাছে পেশোয়াজের ভিতরে গোঁজা আছে শিশিটা। মুখে কর্কের ছিপি আলতো করে আঁটা। যাতে এক হাতের কারসাজিতে ছিপিটা চট করে খুলে ফেলা যায়।
‘কাছে এসো পিয়ারি। আর একটু বাদেই তো রাত ফুরিয়ে যাবে।’ এই বলে খুশবুর হাত ধরে এক ঝটকায় তাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করলেন মোহনলাল। জড় পদার্থের মতো আলিঙ্গনে ধরা দিল খুশবু।
মোহনলাল মুখ নামিয়ে নিয়ে প্রগাঢ় চুম্বনে লিপ্ত হলেন। খুশবুর ঠোঁটদুটো যেন বিষাক্ত কীটের দংশনে জ্বলে গেল। দেওয়ান মোহনলালের বুকে জ্বলছে কামনার আগুন। খুশবুর শরীরের ঘ্রাণে তিনি মাতাল হয়ে উঠেছেন।
কোমরে চেপে বসা পেশোয়াজের বাঁধনের আড়ালে থাকা শিশিটা দ্রুত বের করে ফেলল খুশবু। হাতড়ে সুরার পাত্র খুঁজে নিয়ে নিমেষে ছিপি খুলে শিশির তরলটা ঢেলে দিল সুরার পাত্রে। তারপরে শিশিটা আবার পেশোয়াজের ভিতরে ঢুকিয়ে রাখল। গোটা কাজটা মিটে গেল চোখের পলকে।
মোহনলাল এসবের কিছু টের পেলেন না। তখনও দেওয়ানজির ঠোঁটদুটো খুশবুর ঠোঁটের উপরে চেপে বসে আছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে খুশবুর। খানিকবাদে মুখ তুললেন মোহনলাল। খুশবু হাঁপাতে লাগল। দ্রুত ওঠানামা করতে লাগল বুকটা।
‘তুমি আমার বাগিচার সবচেয়ে খুশবুদার গুলাব।’ এই বলে, সুরার পাত্রটা এবারে হাতে তুলে নিলেন মোহনলাল।
অতি দ্রুত পড়তে লাগল খুশবুর নিঃশ্বাস।
এক লম্বা চুমুকে সুরার পাত্র খালি করে দিলেন মোহনলাল। শিথিল হাতে পাত্রটাকে নামিয়ে রাখলেন গালিচার উপর। উলটে গেল পাত্রটা।
খুশবুর বুকের ভিতরে কেউ যেন হাতুড়ি পিটিয়ে চলেছে। প্রবল উৎকণ্ঠার সঙ্গে সে চেয়ে রইল মোহনলালের দিকে।
চক্কর দিয়ে উঠল মোহনলালের মাথাটা। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে হয়ে আসছে। মোহনলাল ভাবলেন জমাট বাঁধছে নেশা। এ নেশার নাম খুশবু বাই। সবেগে তিনি খুশবুকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে তার কাঁচুলির বাঁধনটা আলগা করার কোশিস করলেন। কিন্তু তার হাতদুটো কেমন যেন অসাড় হয়ে এল। গালিচার উপরে টলে পড়ে গেলেন দেওয়ানজি। তার বাহুবন্ধনে আবদ্ধ খুশবুও হুমড়ি খেয়ে পড়ল।
নিজামুদ্দিনের দোকান থেকে সংগ্রহ করা আতরের ছোট একটা শিশি ভর্তি সাপের বিষ খুশবুকে দিয়ে গিয়েছিল বসির খাঁ। পুরোটাই খুশবু ঢেলে দিয়েছে দেওয়ানজির সুরার পাত্রে।
সাড় নেই দেওয়ানজির শরীরে। নিঃশ্বাস পড়ছে খুব ধীরে। মোহনলালের শিথিল হাতদুটোর বন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে উঠে দাঁড়াল খুশবু বাই। মোরাদবাগ প্যালেস নিঝুম। জায়গায় জায়গায় জ্বলতে থাকা দেওয়ালগিরির আলো নিস্তেজ হয়ে আসছে। রাত পোহাতে আর বেশি বাকি নেই। খুশবু দ্রুত পায়ের ঘুঙুরদুটো খুলে কাপড়ে শক্ত করে মুড়ে নিল, যাতে শব্দ না হয়। রংমহল থেকে বেরিয়ে এসে বাগানের পথ ধরে ছুটতে লাগল সে।
ওদিকে অস্থির হয়ে উঠেছে বসির। খুশবু আসছে না কেন? তাহলে কি সে হাসিল করতে পারল না কাজটা? ধরা পড়ে গেল? প্রবল অস্থিরতায় রংমহলের দিকে এগোতে লাগল বসির। হঠাৎ তার চোখে পড়ল এক ছায়ামূর্তি দ্রুত এগিয়ে আসছে তার দিকে। চলনছন্দ দেখেই বসির চিনতে পারল খুশবুকে।
হুঁশ নেই প্রায়। দিগ্বদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটছে খুশবু। ছুটতে ছুটতে এসে বসিরের গায়ে ধাক্কা খেয়ে হুশ ফিরল তার। চমকে উঠল সে। বসির তাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ভয় নেই খুশবু। আমি বসির।’
‘চলো পালাই।’
‘কাজ হাসিল হয়েছে?’
হাঁপাতে হাঁপাতে খুশবু সংক্ষেপে বলল, ‘হুঁ।’
মোরাদবাগ প্যালেসের চৌহদ্দির দক্ষিণপ্রান্তের দিকে সাবধানে এগিয়ে চলল, খুশবু ও বসির। ওদিকে প্যালেস থেকে বাইরে বেরোনোর একটা গোপন পথ আছে। সকলে জানে না। এ পথের হদিশ বসিরকে দিয়েছে নিজামুদ্দিনের জিগরি দোস্ত কাশিম আলি, মোরাদবাগ প্যালেসে মোতায়েন থাকা পেয়াদাদের পান্ডা।
চরাচর চন্দ্রমায় মাখামাখি। শেষ রাতের বাতাসে হিমের মৃদু পরশ। খুশির তসবিরের মতো সুনহারি এক জিন্দেগির তালাশে এই দোজখ থেকে বেরোনোর গোপন পথের খোঁজে বসিরের পিছু পিছু এগিয়ে চলল খুশবু। এক ছায়ামূর্তি যে চোরের মতো তাদের পিছু নিয়েছে সেটা তারা কেউই টের পেল না।
সামনেই নদীর চর। অদূরে ঘাট। নিঃশব্দে হন হন করে হাঁটতে লাগল খুশবু ও বসির।
‘দাঁড়াও।’
হঠাৎ পিছন থেকে জোরালো এই হাঁক শুনে চমকে গিয়ে ঘুরে তাকিয়ে লোকটাকে দেখে শিউরে উঠল দুজনে। দোল পূর্ণিমার চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় লোকটাকে স্পষ্ট চেনা যাচ্ছে। তরোয়াল হাতে দুজনের মুখোমুখি এসে দাঁড়াল আক্রম। বাঘের চোখের মতো জ্বলজ্বল করছে তার চোখদুটো। আক্রম গর্জন করে উঠল, ‘এই তাহলে আশনাইয়ের কহানি! তাই ভাবি সেদিন এই নাচনেওয়ালির ফুল খরিদের এত তাগিদ কেন? বড়ি আজিব বাত—মোহনলালের পিয়ারি ভাগছে এক মামুলি ফুলওয়ালার সঙ্গে। অ্যাঁ?’
এই বলে বিশ্রি ভাবে হেসে উঠল আক্রম।
খুশবু বলে, ‘দোহাই আক্রম। ছেড়ে দাও আমাদের। আমাদের বাঁচতে দাও।’
‘তুমি তো বাঁচবে পিয়ারি। জরুর বাঁচবে। এখন থেকে আমার বাগিচার গুলাব হয়ে বাঁচবে। কয়েদ হয়ে থাকবে চার দেওয়ালের ভিতরে। কেউ জানবে না। কিন্তু তোমার এই আশিকের কী হবে?’
আগুন ঝরানো চোখে বসিরের দিকে চেয়ে আক্রম বলে উঠল, ‘শালা পথের ভিখারি কুত্তা…ইতনা হিম্মত? আক্রমের চোখের সামনে দিয়ে তুমি ইতনা কিমতি গুলাব নিয়ে ভেগে যাবে?’
এই বলে চকিতে তরোয়াল উঁচিয়ে ধরে আক্রম।
‘ব-সি-র!’ চেঁচিয়ে ওঠে খুশবু বাই।
সহসা রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে গর্জে উঠল বন্দুক। নিমেষে নদীর চরের উপর লুটিয়ে পড়ে আক্রমের নিথর দেহ। বসন্তের হিমের পরশ মাখা শীতল রুপোলি বালুচর রক্তে ভেসে যায়। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় খুশবু।
খানিক দূরে বালির ঢিবির আড়াল থেকে দৃশ্যমান হয় এক ঘোড়সওয়ার। এগিয়ে এসে সওয়ারি লাফ দিয়ে ঘোড়ার পিঠ থেকে নামে।
বসির কুর্নিশ জানিয়ে বলে, ‘সেলাম নিজামুদ্দিন চাচা। বহুত সুক্রিয়া।’
পিস্তলটা কুর্তার ভিতরের খাপে ঢুকিয়ে আক্রমের নিথর দেহটার দিকে ঘৃণার চোখে চেয়ে একদলা থুতু ফেলে নিজামুদ্দিন। তারপর বসির ও খুশবুর সামনে এসে দাঁড়ায়। মাথা ঝুঁকিয়ে তসলিম জানায় খুশবু।
খুশবুর চিবুক ছুয়ে নিজামুদ্দিন বলে, ‘এমন খুবসুরত বিবি কোত্থেকে জোটালি রে হতভাগা?’
বসির বলে, ‘সবই আল্লার মেহেরবানি চাচা।’
দৃষ্টি শূন্যে ভাসিয়ে নিজামুদ্দিন বলে, ‘আলিবর্দির নাতি মির্জা ও ইয়ারদোস্তেরা মজা লোটার জন্য উলটে দিয়েছিল নৌকা। মোহনলালও ছিল সেই দলে। জলে ডুবে মরে আমার বিবি। এসব তো তোকে বলেছি বসির, বলিনি একটা কথা। আমার বিবির ভিতরে তখন একটা জিন্দা জান বেড়ে উঠছিল। লেড়কি হয়ে পয়দা হলে, সে হয়তো খুশবুর মতোই খুবসুরত হতো।’ ধরে আসে নিজামুদ্দিনের গলা। চোখের জল মোছে নিজামুদ্দিন। কাছেই কোথাও করুণ সুরে ডেকে ওঠে একটা রাতজাগা পাখি।
মুহূর্তে নিজের আবেগ সামলে মন শক্ত করে নিজামুদ্দিন বলে, ‘যা বসির, খুশবুকে নিয়ে দূরে কোথাও পালিয়ে যা। নিজামতের তানাশাহি শেষ হবে শিগগিরই। শুনতে পাচ্ছি আবদালি আসছেন পাটনার দিকে। ভেঙে পড়বে হিরাঝিল, চেহেলসেতুনের দম্ভ। আমার বুকের জ্বালা জুড়োবে সেদিন। যা-যা আর দেরি করিস না পালিয়ে যা।’
‘আসি চাচা। ফির মুলাকাত হবে। আদাব।’ বলল খুশবু।
ঘাটে বাঁধা আছে বজরা। বসির ও খুশবু দ্রুত এগিয়ে যায় ঘাটের দিকে। একদৃষ্টে সেদিকে চেয়ে থাকে নিজামুদ্দিন।
