1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৪৫

৪৫

অবসন্ন হয়ে পড়ে খুশবু। হাঁপাতে থাকে। ক্লান্তিতে ভেঙে আসছে তার শরীর। টলতে টলতে দেওয়ালের গায়ে লাগানো মস্ত বেলজিয়াম কাচের আরশির সামনে এসে সে দাঁড়ায়। রূপের জলুসে গোটা আরশি যেন নিমেষে রংদার হয়ে যায়। ঝলমল করে ওঠে।

আসমানি ওড়নার গায়ে ঝিকমিক করছে সলমা আর চুমকি। ময়ূরকণ্ঠী রঙের কাঁচুলি আবৃত করে রেখেছে বক্ষের যৌবনসম্ভার। এখনও অমলিন মায়াবী দুই চোখে সুরমার প্রলেপ, ঠোঁটের লালি। উন্মুক্ত নাভির তলদেশ থেকে প্রায় পা পর্যন্ত নেমে এসেছে নীল দরিয়ার রঙের আবরোয়ানের ঘাঘরা। ঘাঘরার নীচে পায়ের সঙ্গে এঁটে বসেছে জরি বসানো শাদা পেশোয়াজ। ক্ষীণ কটিদেশে শোভা পাচ্ছে চন্দ্রহার। বেহস্তের কোনও হুরীর তসবির যেন ফুটে ওঠে আরশিতে। এই দেহটাকে গায়ের জোর খাটিয়ে ভোগ করতে চেয়েছিল আক্রম। বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। একথা ভাবতেই খুশবুর শিরায় শিরায় ছড়িয়ে পড়ে তীব্র নফরতি।

নিজের দু-হাতের আঙুলগুলো সামনে মেলে ধরে খুশবু। গানের আসরে তার এই দশ আঙুলের মুদ্রার কত না কদরদারি। কিন্তু এই আঙুলগুলোর যে এত জোর তা সে নিজেও জানত না। এই আঙুলেই আক্রমের গাল চিরে দিয়েছে সে। কামিনে শয়েতানটার গা থেকে খুন ঝরিয়েছে। আক্রমের অপ্রস্তুত, ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া মুখটা মনে পড়তেই ফের একবার আপনমনে হেসে ওঠে খুশবু। হাসলে বড় অপূর্ব দেখায় তাকে।

হাসতে হাসতে হঠাৎই খুশবুর চোখদুটো জ্বালা করে ওঠে। হাসি বদলে যায় কান্নায়। মনে পড়ে যায় বসিরের কথা। আরশির সামনে থেকে সরে এসে ছুটে গিয়ে পালঙ্কের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে খুশবু। বালিশে মুখ গুঁজে ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকে।

কেউ কড়া নাড়ে দরজায়।

কান্না থামিয়ে ত্রস্ত হয়ে পড়ে খুশবু। পালঙ্কের উপর সোজা হয়ে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে দরজার দিকে তাকায়।

ফের কড়া নাড়ার শব্দ। অতি সাবধানে, সন্তর্পণে।

নির্ঘাত আক্রম। জানোয়ারটা আবার এসেছে তার শরীরের লোভে। আগুনের শিখার মতো দপ করে জ্বলে ওঠে খুশবু। শয়তানটাকে আজ শেষই করে দেবে সে। তারপর নসিবে যা আছে তাই হবে। দেওয়ালের গায়ে ঝুলতে থাকা বিরছা কুড়োলটা হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরে খুশবু দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে যায়। দরজার আগল খুলে পাল্লাটা ঈষৎ ফাঁক করে দরজার পাশে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায় অপেক্ষা করতে থাকে।

আগন্তুক ঘরে ঢুকে কাউকে দেখতে না পেয়ে থমকে দাঁড়ায়। তার মাথাটা আলোয়ানে মোড়া। কুড়োলটা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে যায় খুশবু। বিপদ টের পেয়ে আগন্তুক চকিতে ঘুরে গিয়ে তার হাতটা চেপে ধরে। নরম হাতের মুঠো শিথিল হয়ে বিরছা কুড়োলটা সশব্দে আছড়ে পড়ে মাটিতে।

আগন্তুক বলে ওঠে, ‘খুশবু! করছ কী? মরে যেতাম যে!’

দেওয়ালগিরির আলোয় খুশবু এবারে স্পষ্ট চিনতে পারে আগন্তুককে। বিস্ফারিত চোখে আগন্তুকের দিকে চেয়ে অস্ফুট স্বরে সে বলে ‘ব-সি-র!’

দ্রুত ছুটে গিয়ে দরজা বন্ধ করে আগল তুলে দেয় বসির খাঁ।

বিস্ময়ে হতভম্ব খুশবুর ঠোঁট কাপতে থাকে। ‘ব-সি-র—’

‘হ্যাঁ খুশবু। আমি বসির। তোমার কাছেই কেবল এই নামটা বেঁচে আছে। সবাই আমাকে এখন ফুলের কারবারি করিম খাঁ বলে জানে।’

‘তুমি—’ কথা হারিয়ে যায় খুশবু বাইয়ের। বসিরের বুকে ঝাপিয়ে পড়ে কাঁদতে থাকে। প্রবল আবেগে খুশবুকে চওড়া বুকের মধ্যে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বসির খাঁ। তার চোখ দিয়েও জল গড়িয়ে পড়ে।

কান্না থামিয়ে মুখ তোলে খুশবু বাই। ধেবড়ে গিয়েছে কপালের বিন্দিয়া। চোখের সুরমা। খুশবুর চিবুক ছুঁয়ে বসির বলে, ‘তুমি এখনও আমাকে এত ভালোবাস? আমাকে ভোলনি খুশবু?’

‘ভুলব কী করে বসির? কসবি হলেও আমি যে এক আওরাত। তুমি আমার আসলি পেয়ার। সেদিন মনসুরগঞ্জের মান্ডিতে একবার দেখেই তোমাকে চিনেছি। সারেঙ্গির সুরেই সেদিন তুমি ধরা পড়েছিলে আমার কাছে। আল্লার বহুত মেহেরবানি তুমি জিন্দা আছ।’

সে রাতে কী করে যে আমি বেঁচেছি জানি না। ঠান্ডা জলে সাঁতার কাটতে কাটতে অসাড় হয়ে আসছিল হাত পা। জ্ঞান হারালাম। পরের দিন সকালে চোখ মেলতে দেখি চরের উপর পড়ে আছি। মাথার উপরে খোলা আসমান।

ফের ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে খুশবু বলে, ‘ভেবেছিলাম তুমি হারিয়ে গেছ চিরকালের মতো।’

‘হয়তো তোমাকে ফিরে পাব বলেই জিন্দা আছি। তোমাকে হারিয়ে দিওয়ানা হয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে আসি মুর্শিদাবাদে।’

নকশাদার রেশমি রুমালে চোখের জল মুছে খুশবু শুধোয়, ‘আমার খোঁজ পেলে কী করে?’

মুচকি হেসে বসির বলে, ‘তুমি খুশবুদার গুলাব। এর সৌগন্ধ কি ছুপিয়ে রাখা যায়? ফুল খরিদ করতে এসেছিল আক্রম। তার মুখেই শুনি তোমার নাম—দেওয়ানজির বাগিচার গুলাব খুশবু বাই।’

সংকুচিত হয়ে আনত চোখে খুশবু বলে, ‘আমায় ভুল বুঝ না বসির।’

‘ভুল বুঝব কেন খুশবু? এ আমাদের বদকিসমতি।’

খুশবু শুধোয়, ‘আক্রমকে তুমি চিনলে কেমন করে?’

চোয়াল শক্ত করে বসির বলে, ‘ওই শয়তানটা আমার জিন্দেগি বরবাদ করে দিয়েছিল প্রায়।’

উৎকণ্ঠা ফুটে ওঠে খুশবুর গলায়। ‘কীভাবে?’

‘পেট চালাতে আমি ফুলের কারবার শুরু করি। আক্রম ও তার শাগরেদদের হুকুমত ছাড়া চকবাজারে কেউ সওদা করতে পারে না। প্রথমেই মোটা টাকা দিয়ে তাদের কাছ থেকে পরোয়ানা নিতে হয়। এ আমি জানব কেমন করে? ওদের হুকুমত ছাড়া ফুলের সওদা নিয়ে চকবাজারে বসার জন্য একদিন দলবল নিয়ে এসে আমায় বেদম মারধর করে আক্রম।’

শিউরে উঠে খুশবু শুধোয়, ‘তারপর?’

‘মরেই যেতাম। যদি না নিজামুদ্দিনচাচা থাকত।’

‘নিজামুদ্দিনচাচা কে?’

‘বহুত আচ্ছা আদমি। চকবাজারে আতর-মিঠাইয়ের কারবারি। নিজামুদ্দিনচাচাই ওদের হাত থেকে আমাকে বাঁচায়।’

‘আক্রম একটা শয়তান। ইবলিশের বাচ্চা। ওর নজর আমার শরীরটার উপর।’

‘জেনানা হল এদের কাছে শরীরের আরাম। তোমাকে কলাকারের ইজ্জত দেবে কে?’

‘আজই এখান থেকে পালাতে চাই আমি। তোমার সঙ্গে নিয়ে চল আমাকে।’

‘হঠাৎ করে এভাবে তোমাকে নিয়ে পালাতে গেলে দুজনেই ধরা পড়ব।’

অতি বাস্তব কথা। আবেগের বশে খেয়াল হয়নি খুশবুর। এখানে বসিরের বেশিক্ষণ থাকাও যে নিরাপদ নয়। ধরা পড়লে গর্দান যাবে।

খুশবু প্রশ্ন করে, ‘পাহারা এড়িয়ে মোরাদবাগ প্যালেসে তুমি ঢুকলে কেমন করে?’

‘পশ্চিম দিকের দরওয়াজার এক পাহারাদার নিজামুদ্দিনচাচার জিগরি দোস্ত। তার দয়ায় ঢুকেছি।’ জবাব দেয় বসির।

খুশবু এবারে আশার আলো দেখতে পেয়ে মরিয়া হয়ে বলে, ‘তাহলে আর ভাবনা কী? নিয়ে চল আমাকে।’

‘কয়েকটা দিন সবুর কর পিয়ারি। ঠিক তোমাকে নিয়ে যাব আমি। তবে যাওয়ার আগে আমরা এই নিজামতকে জোর ঝটকা দিয়ে যাব। তুমি, আমি, নিজামুদ্দিনচাচা— আমাদের মতো আরও অনেক আমআদমি নিজামতের তাগদবাজদের বদখেয়ালের শিকার। এবার বদলা নেওয়ার পালা।’

শেষ কথাগুলো বলার সময় পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে বসিরের চোয়াল। দুচোখে প্রতিহিংসার আগুন ঝলকায়।

একদৃষ্টে বসিরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে খুশবু। এ যেন সেই নাজুক সারেঙ্গিবাদক বসির নয়, কোনও বাগি শাহজাদা বসে আছে তার সামনে। অল্প কয়েকদিনে কত বদলে গিয়েছে বসির। যে ভাবে সে কথা কইছে, তা কেবল আশিয়ানার রঙে ছোপানো নয়। সায়েরের মতো কল্পনায় সাজানো বয়েত নয়। ঠিক যেন জোশে ভরপুর কাবিল এক মরদের উমিদ—ভরসা করা যায়।

‘কী দেখছ অমন করে?’ বসিরের ঠোঁটের কোনায় হাসি ফুটে ওঠে।

‘ইয়াদদস্ত করছি। তুমি সেই সারেঙ্গিবাদক বসির খাঁ? না কি কোনও বাগি শাহজাদা?’

বসির হেসে বলে, ‘এ দুনিয়া আজিব ময়দান। নাজুক ইনসানকেও ঘা দিয়ে পোক্ত করে দেয়। নসিব, নিয়তি এখানে ঘর বদলায়। আমার উপর ভরসা রাখো খুশবু।’

বসিরের বুকে মাথা রেখে খুশবু বলে, ‘তুমিই আমার আসলি পেয়ার। আমার খোয়াবের শাহজাদা। তোমার উপর ভরসা না রেখে পারি?’

বসির বলে, ‘দুদিন পরে হোলি। সেদিন জোরদার মেহফিল হবে মোরাদবাগ প্যালেসে। ওই দিন রাতে ছোট্ট একটা কাজ করতে হবে তোমাকে। পারবে তো?’

আয়ত বড় বড় দুই চোখে বসিরের দিকে চেয়ে থাকে খুশবু।

জোব্বার ভিতরে হাত ঢুকিয়ে তরল ভর্তি ছোট্ট একটা শিশি বের করে বসির খাঁ।

বসন্তের বাতাসে আরামের হিম, খুশির আমেজ। দুদিন পরেই হোলি। মুর্শিদাবাদে বহুকাল ধরেই জাঁকজমকের সঙ্গে পালিত হয়ে আসছে হিন্দুদের এই উৎসব। ধর্মীয় অনুষঙ্গ বাদ দিয়ে মুসলমান আমির ওমরাহরাও এই উৎসবের আমেজে গা ভাসিয়ে দেন। খানাপিনা, আমোদ-আহ্লাদ, মেহফিল-মজলিসে মেতে ওঠে বাংলার রাজধানী।

এ সময়ে মুজরোর ফরমায়েস নিয়ে আগ্রা, লখনউ, বেনারস থেকে বাইজিরা দলে দলে হাজির হয় মুর্শিদাবাদে। রইস আদমিদের কুঠি থেকে ভেসে আসে ঘুঙুরের ঝুমঝুমানি। মুজরোর হাসি-হররা। চকবাজারে দেদার বিকোয় আতর, গুলাবজল, আবির, গুলাল। রুপোর তবকে মোড়া লাড্ডু, গাজরের হালুয়া ও রকমারি মিঠাইয়ের সম্ভারে সেজে ওঠে মিঠাইওয়ালাদের দোকানগুলো।

হোলিতে হিরাঝিলের প্রাসাদও উৎসবের খুশিতে ভেসে যায়। ফুলে আর দেওদার পাতায় সেজে ওঠে প্রাসাদ। বিরাট বড় বড় চৌবাচ্চার জলে মেশানো হয় রং। হাসিনাদের নিয়ে হোলি খেলায় মাতেন নবাব। সিক্ত, রঙিন সুন্দরীদের নিয়ে ফূর্তিতে ভাসেন। সঙ্গে থাকে ভাঙ আর সিদ্ধির শরবত।

প্রতিবছরের মতো এবারেও হিরাঝিলে হোলি মানানোর তোড়জোড় চলছিল জোরকদমে। কিন্তু হঠাৎই নবাবের মনের হোলির সব রং মুছে দিয়েছে আজ সকালের অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের একটা চিঠি।

ওয়াটসন সাহেব লিখেছেন, ‘…আপনার পরামর্শ মতো ফরাসিদের সঙ্গে সমঝোতা করার উদ্যোগ আমরা নিয়েছিলাম। এ বিষয়ে আমাদের আন্তরিকতার কোনও অভাব ছিল না। শুনলাম, ফরাসিদের উকিল আপনাকে বুঝিয়েছে যে আমরা সমঝোতা চাই না। আপনারও বোধ হয় সেরকমই ধারণা হয়েছে।

‘একটা কথা আপনার জেনে রাখা উচিত, সমঝোতাপত্র চূড়ান্ত হয়ে যাওয়ার পরেও কেন তাতে দস্তখত হয়নি। আমি ও কর্নেল ক্লাইভ এখানে যা সিদ্ধান্তই নিই না কেন, সেটা মাদ্রাজ কাউন্সিল মেনে নেবে। এটা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি। কিন্তু চন্দননগরের ফরাসিরা যদি বলে—তারা কোনও আহাদনামায় দস্তখত করলে পণ্ডিচেরি কাউন্সিল যে তা মানবেই, তা তারা জোর দিয়ে বলতে পারবে না, তাহলে তাদের আমরা বিশ্বাস করব কেমন করে?

‘আপনার সঙ্গে আমাদের সমঝোতা হয়েছে। আপনি আমাদের দোস্ত। ফরাসিরা আমাদের দুশমন, অতএব তারা আপনারও দুশমন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, আপনি আমাদের সঙ্গে দোস্তের মতো আচরণ করছেন না। আমাদের দুশমন ফরাসিদের সাহায্য করার জন্য নন্দকুমারের কাছে আপনি টাকা পাঠিয়েছেন বলে শুনেছি। শুধু তাই নয়, আড়াই হাজার আহেদিকেও আপনি হুগলিতে পাঠিয়ে দিয়েছেন। আমাদের দুশমনের সঙ্গে আপনার কীসের রিশতাদারি?

‘এবারে তাই আমি আপনাকে স্পষ্ট লিখতে বাধ্য হচ্ছি যে, বাংলায় শান্তিরক্ষা করা যদি আপনার উদ্দেশ্য হয়, তাহলে আগামী দশ দিনের মধ্যে আলিনগরের সুলেনামার শর্ত অনুযায়ী আমাদের সব দাবিদাওয়া আপনি মিটিয়ে দেবেন। অন্যথায় আপনার দেশে এমন আগুন আমরা জ্বালাব যে গঙ্গার সব জল ঢেলেও সে আগুন আপনি নেভাতে পারবেন না। বোম্বে থেকে আমাদের আরও অনেক সৈন্য এসেছে। প্রয়োজন হলে আমরা আরও যুদ্ধজাহাজ ও সৈন্য নিয়ে আসব।…’

চিঠিটা পড়ে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সিরাজদ্দৌলা। এই ইংরেজ বণিকরা যে ঠিক কী চায় তা বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। এই তো সেদিন আলিনগরের সমঝোতায় সই করে বাংলায় শান্তি বজায় রাখার অঙ্গীকার করল—এরই মধ্যে আবার গোলমাল পাকাতে চাইছে?

ইংরেজরা তার প্রজা। ফরাসিরাও তার প্রজা। ফরাসিরা যদি ইংরেজদের হাতে আক্রান্ত হওয়ার ভয়ে নবাবের সাহায্য চায়, তিনি কি মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারেন? কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে ইংরেজদের বিরুদ্ধে ফরাসিদের তিনি মদত দিচ্ছেন, আলিনগরের সুলেনামা অমান্য করতে চাইছেন। বাংলায় যাতে নতুন করে আগুন জ্বলে না ওঠে সে জন্য তো তাঁর চেষ্টার ত্রুটি নেই। তিনিই তো ইংরেজদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার জন্য গভর্নর রেনল্টকে বলেছিলেন কলকাতায় দূত পাঠাতে।

ফরাসিদের উপর একটু বিরক্তও বোধ করলেন নবাব। এ আবার কেমন কথা? ফরাসিদের কোনও একজন যদি শান্তির আহাদনামায় সই করে, তবে আরেকজন তা মানবে না? সত্যিই কি ইংরেজ-ফরাসি এই দুই পক্ষ নিজেদের মধ্যে শান্তি বজায় রাখতে চায়?

অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের চিঠির শেষের ছত্র রীতিমতো ক্ষুব্ধ করেছে নবাবকে। কার্যত হুমকি দিয়েছেন ওয়াটসন সাহেব। এর কি কোনও প্রয়োজন ছিল?

দলবল সমেত নবাব সবে ফিরেছেন মুর্শিদাবাদে। যাত্রাপথের ধকল এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি সকলে। ক’দিন পরেই হোলি উৎসব। হিন্দু আমিন, গোমস্তা, মুৎসুদ্দি, সবাই হোলির খুশিতে মেতে রয়েছে। নিজামতের কাজ-কারবার চলছে ঢিলেঢালা ভাবে। কলকাতা থেকে ফিরে কাজের তেমন সময় পাওয়া গেল কোথায় যে এর মধ্যে ইংরেজদের দাবিদাওয়া সব মিটিয়ে দেওয়া যাবে?

তাছাড়া আলিনগরের সুলেনামা স্বাক্ষরিত হওয়ার পর সবে তো এক মাস অতিবাহিত হয়েছে। এরই মধ্যে পাওনাগন্ডার দাবি জানিয়ে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের এমন কড়া চিঠি লেখার অর্থ কী?

 নিজের অন্তরকে ভালোভাবেই জানেন সিরাজদ্দৌলা। আলিনগরের সুলেনামায় ইংরেজদের যে সুযোগ-সুবিধা দেবেন বলে তিনি কড়ার করেছেন, তা পূরণ না করার মতো কোনও দূরভিসন্ধি তাঁর নেই।

উইলিয়াম ওয়াটসকে ডেকে পাঠালেন সিরাজদ্দৌলা।

ওয়াটস এসে তসলিম জানাতেই অ্যাডমিরালের চিঠিটা ওয়াটসের দিকে এগিয়ে দিয়ে নবাব বললেন, ‘এ চিঠির অর্থ কী ওয়াটস সাহেব?’

চিঠিটায় চোখ বুলিয়ে ওয়াটস বললেন, ‘হুজুর এতে কসুর কী হল আমাদের?’

‘আপনারা কি চন্দননগর আক্রমণের অজুহাত খাড়া করতে চাইছেন?’

মাথা ঝুঁকিয়ে বিনয়ের সঙ্গে ওয়াটস বললেন, ‘হুজুর আমরা ইমানদার জাত। আপনার দেশে আপনার অনুমতি ছাড়া আমরা লড়াই ঝগড়া বাধাতে পারি না।’

‘আপনাদের কি মনে হয় নবাব ইমানদার ইনসান নন?’

নবাবের গম্ভীর মুখের দিকে তাকিয়ে ওয়াটস ভয়ে ভয়ে শুধোলেন, ‘একথা বলছেন কেন?’

সিরাজদ্দৌলা ক্ষোভ উগরে দিইয়ে বললেন, ‘এক মাহিনাও হয়নি আলিনগরের সুলেনামা দস্তখত হয়েছে। এরই মধ্যে আপনাদের দাবি পূরণের জন্য এমন চিঠি কি নবাবের বেইজ্জতি নয়। আমার আচরণ দেখে আপনাদের কি মনে হয়েছে যে আমি আলিনগরের সুলেনামার বেইজ্জতি করতে চাই?’

‘গোস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। ফরাসিদের সঙ্গে আপনার দোস্তি বোধহয় ওয়াটসন সাহেবের গুসসার কারণ।’

‘এ আপনাদের গলত শিকায়ত। ফরাসিরা আমার দোস্ত নয়। আপনারা আমার প্রজা। ফরাসিরাও আমার প্রজা।’

‘লেকিন হুজুর ফরাসিদের মদত দেওয়ার জন্য হুগলিতে সেনা পাঠিয়েছেন আপনি।’

সিরাজদ্দৌলা এবার হুংকার দিয়ে বলে উঠলেন, ‘ইয়ে ঝুট বাত। হুগলি নিজামতের হুকুমতে চলে। সেখানে সেনা পাঠাতেই পারি আমি।’

নবাবের মেজাজের উত্তাপে থতমত খেয়ে নরম গলায় ওয়াটস বললেন, ‘আমাদের দিকটাও তো ভেবে দেখবেন হুজুর। সুবে বাংলায় আমাদের সওদা বন্ধ করেছেন আপনি। সুবে বাংলার বিভিন্ন কুঠির মালপত্র আমরা এখনও ফেরত পাইনি। আমাদের বহুত লোকসান হয়েছে ও হচ্ছে। হুজুর আমরা আপনার প্রজা। প্রজাদের তকলিফ মেটানো তো আপনার কাজ। আলিনগরের সুলেনামা মোতাবেক আমাদের সব দাবি আপনি ঝটপট মিটিয়ে দিলেই তো আর কোনও ঝামেলা থাকে না।’

‘বেশ। কলকাতার কাছে কোন আটত্রিশটা গ্রাম আপনারা কিনতে চান—তালিকা দাখিল করুন। আমি পরোয়ানা লিখে দিচ্ছি।’

‘বহুত সুক্রিয়া।’

‘আমি জগৎশেঠ মহাতপচাঁদজিকে বলে দিচ্ছি কালই যেন আপনার হাতে বিশ হাজার মোহর তুলে দেন। খেসারতের বাকি টাকা আমি কিছুদিন বাদে মিটিয়ে দেব।

মাথা ঝুঁকিয়ে তসলিম জানিয়ে ওয়াটস বললেন, ‘হুজুর বহুত মেহেরবান।’

‘আমিন, মুৎসুদ্দি, গোমস্তারা অনেকে হোলি নিয়ে মেতে আছে। হোলির পরেই আপনাদের কুঠির মালপত্র সব আপনারা পেয়ে যাবেন।’

ওয়াটস ফের মাথা ঝোঁকালেন। ‘হুজুর বহুত মেহেরবান। এসব কিছু আমি আজই ওয়াটসন সাহেবকে লিখে জানাচ্ছি।’

এবারে প্রায় মিনতির সুরে নবাব বললেন, ‘আপনাদের কাছে আমার একান্ত অনুরোধ—বাংলায় আপনারা আগুন জ্বালাবেন না।’

‘আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন হুজুর।’

বিদায় নিলেন ওয়াটস।

গুপ্তচর নারান সিং এসে একটা কাগজ নবাবের হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘বেনারস থেকে এক কাসিদ পাঠিয়েছে।’

দ্রুত কাগজটা চোখের সামনে মেলে ধরলেন সিরাজ। তীব্র আতঙ্ক ফুটে উঠল নবাবের চোখেমুখে। কাসিদ লিখেছে, আহম্মদ শাহ আবদালি পাটনার দিকে এগিয়ে আসছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *