1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৪৪

৪৪

জাঁ ল-এর চিঠি পড়ে মুষড়ে পড়লেন গভর্নর রেনল্ট।

হুগলিতে আরও ফৌজ পাঠানোর জন্য নবাবের কাছে ল-সাহেবকে দরবার করতে বলেছিলেন রেনল্ট। যে আড়াই হাজার উজবেক ঘোড়সওয়ার হুগলিতে নবাব পাঠিয়েছেন তা ইংরেজদের হাতে আক্রান্ত হলে ফরাসিদের সাহায্য করার জন্য যথেষ্ট নয়।

জাঁ ল লিখেছেন, আরও ফৌজ পাঠাতে রাজি ছিলেন সিরাজদ্দৌলা। কিন্তু ব্যাপারটা ভেস্তে দিয়েছেন উমিচাঁদ ও জগৎশেঠ। নবাবকে এরা বুঝিয়েছেন মোটেই চন্দননগরে হামলার কোনও মতলব নেই ইংরেজদের। হুগলিতে এখন সেনা পাঠালে আলিনগরের সমঝোতাকে অমান্য করা হবে। এই যুক্তি মেনে হুগলিতে সেনা পাঠানোর হুকুমত নবাব ফিরিয়ে নিয়েছেন।

চিঠিতে ল আরও লিখেছেন জগৎশেঠ ও আরও অনেকে ইংরেজদের সাহায্য নিয়ে সিরাজদ্দৌলার পরিবর্তে অন্য কাউকে মসনদে বসাতে চান—এ কথা নবাবের গোচরে এনেছিলেন তিনি। জবাবে হেসে উঠে নবাব বলেছেন, ‘আপনি কি বেওকুফ? এই সব ঝুটমুট বাতে বিশ্বাস করছেন?’

মসিয়ে ল মনে করেন, দরবারের ষড়যন্ত্রের কথা সবই জানেন সিরাজদ্দৌলা। আপাতত তিনি না বোঝার ভান করে আছেন। এখন তিনি জগৎশেঠকে তোয়াজ করে চলছেন। কারণ, ইংরেজদের সঙ্গে জগৎশেঠের রিশতাদারি জবরদস্ত। আর নবাব ইংরেজদের ভয়ে ভীত। তাই এই মুহূর্তে নবাবের কাছ থেকে ফরাসিদের আর কোনও মদত পাওয়ার আশা না করাই ভালো।

কাগজ-কলম টেনে নিয়ে ল-এর চিঠির উত্তর লিখতে বসলেন রেনল্ট।

তিনি লিখলেন, ‘এই পরিস্থিতিতে একমাত্র আশার জায়গা মোহনলাল। আপনি মোহনলালের সঙ্গে দেখা করে গোটা বিষয়টা তাঁকে বুঝিয়ে বলুন। ক্লাইভ ও ওয়াটসনের আগ্রাসী মনোভাব, নবাবের পক্ষেও যে কতটা বিপজ্জনক সেটা বুঝতে পারলে আশা করি মোহনলাল নবাবের মত বদলাতে পারবেন।…’

ব্যক্তিগত সচিবকে ডেকে চিঠিটা দ্রুত কাশিমবাজারে পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে দুর্গের উত্তর-পূর্ব দিকের বুরুজের প্রশস্ত চাতালের উপর এসে দাঁড়ালেন রেনল্ট। নীচে থেকে ভেসে আসছে কুলি-মজুরদের কোলাহল। দুর্গের চারিদিকে পরিখা কাটা ও দেওয়াল গড়ে তোলার কাজ এখনও চলছে।

ইংরেজদের আক্রমণ ঠেকানোর জন্য এই প্রচেষ্টা যে সমুদ্রে বালির বাঁধ দেওয়ার সামিল, একথা অভিজ্ঞ পিয়েরে রেনল্ট বোঝেন। এত কসরত, এত মানুষের পরিশ্রমের বিনিময়ে সামান্য কিছু সময়ের জন্য হয়তো ঠেকিয়ে রাখা যাবে ইংরেজদের আক্রমণের ঢেউ। কিন্তু তারপর?

উপযুক্ত সংখ্যক সৈন্য নেই ফোর্ট অঁরলিওতে। বারবার চন্দননগরে সেনা পাঠানোর কথা লিখে পাঠানো সত্ত্বেও এ বিষয়ে কোনও গুরুত্ব দিল না পণ্ডিচেরি কাউন্সিল। এই চন্দননগর শহরটাকে বড় ভালোবাসেন পিয়েরে রেনল্ট। শহরটা কি তাঁর চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাবে?

নিকোলাস ও ফার্নিয়ের ইংরেজদের সঙ্গে শান্তি চুক্তির বিষয়ে কথা বলতে গিয়েছেন কলকাতায়। ইংরেজদের কি শুভ বুদ্ধির উদয় হবে? নিকোলাস ও ফার্নিয়ের কি কোনও সুসংবাদ নিয়ে ফিরবেন? অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভাবতে ভাগীরথীর নিস্তরঙ্গ জলের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন রেনল্ট। দুশ্চিন্তায় ভারী হয়ে আসছে মাথা। দু-আঙুলের ফাঁকে গোঁজা বার্মা চুরুট পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। গভর্নর সাহেবের হুঁশ নেই।

কেন্ট জাহাজের ডেকের উপর বসে ফরাসি দূত নিকোলাস, ফার্নিয়েরের সঙ্গে কথা বলছিলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। অ্যাডমিরালের হাতে ফরসির নল। পাশে চৌপাইয়ের উপর রাখা রয়েছে গড়গড়া। ইদানীং ওয়াটসন সাহেব অম্বুরি তামাকে মজেছেন।

নিকোলাস বললেন, ‘ইউরোপিয়ান নেশনসগুলোর মধ্যে গঙ্গায় শান্তি বজায় রাখার জন্য যে এগ্রিমেন্ট সাইন হয়েছিল, সেটা আপনাদের ও আমাদের মধ্যে রিনিউ করা যেতে পারে।’

ফার্নিয়ের বললেন, ‘উই ওয়ান্ট রিনিউয়াল অ্যান্ড র‌্যা টিফিকেশন অফ দ্যাট ট্রিটি।’

ভুরভুর করে খানিকটা ধোঁয়া ছেড়ে ওয়াটসন প্রশ্ন করলেন, ‘আপনারা সত্যিই শান্তি চান?’

‘অবশ্যই অ্যাডমিরাল।’ প্রায় একই সঙ্গে জোর দিয়ে বলে উঠলেন নিকোলাস ও ফার্নিয়ের।

‘তাহলে জেনারেল বুসি মাদ্রাজ থেকে ফ্লিট নিয়ে বাংলায় আসছেন কেন?’

ফার্নিয়ের বললেন, ‘এ কথা আপনারা শুনেছেন। আমরাও শুনেছি। জেনারেল বুসি যে নিশ্চিত বাংলায় আসছেন তেমন কোনও মেসেজ পণ্ডিচেরি থেকে আমাদের কাছে এখনও আসেনি। কাজেই জেনারেল বুসি যে আসছেনই, সেকথা জোর দিয়ে বলা যায় না।’

মাটির দিকে চেয়ে ফুড়ুক ফুড়ুক করে কয়েকবার ফরসির নলে টান দিলেন ওয়াটসন। তারপর জুত করে ধোঁয়া ছেড়ে শুধোলেন, ‘আপনারা কি পণ্ডিচেরি কাউন্সিলের অথরাইজড রিপ্রেসেন্টেটিভ?’

প্রশ্নটা শুনে দমে গেলেন নিকোলাস ও ফার্নিয়ের। ফার্নিয়ের জিগ্যেস করলেন, ‘এ প্রশ্ন কেন?’

ওয়াটসন বললেন, ‘দেখুন আমি ও কর্নেল ক্লাইভ বাংলায় এসেছি আমাদের মাদ্রাজ কাউন্সিলের অর্ডারে। আমরা এখানে যাই সিদ্ধান্ত নিই না কেন সেটা মাদ্রাজ কাউন্সিল মেনে নেবে। কিন্তু আপনারা যদি কোনও এগ্রিমেন্টে সই করেন, সেটা আপনাদের পণ্ডিচেরি কাউন্সিল মানবে তো?’

ফার্নিয়ের ও নিকোলাস দুজনেই থতমত খেয়ে ঢোঁক গিললেন।

অপ্রস্তুত গলায় নিকোলাস বললেন, ‘আমাদের গভর্নরের সই করা কাগজ পণ্ডিচেরি কাউন্সিল যে মানবে সেটা আমরা জোর দিয়ে বলতে পারি না।’

সশব্দে হেসে উঠে ওয়াটসন বললেন, ‘ও মাই গড। তাহলে আপনারা পিস ট্রিটি অন গ্যাঞ্জেস র‌্যা টিফাই-এর বিষয়ে কথা বলতে এসেছেন কেন?’

নিকোলাস অপ্রতিভ গলায় বললেন, ‘বিষয়টা বাংলা নিয়ে। এখানে চন্দননগরের গভর্নর রেনল্ট সাহেবের ডিসিশনই চূড়ান্ত।’

এবারে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ওয়াটসন বললেন, ‘একেবারে ছেলেমানুষের মতো কথা বলছেন আপনারা। চন্দননগরের ফ্রেঞ্চ গভর্নরের সঙ্গে আমরা না হয় পিস ট্রিটি সাইন করলাম, কিন্তু জেনারেল বুসি এসে যদি বলেন, চন্দননগরের গভর্নরের সাইন করা ট্রিটি তিনি মানেন না, তিনি এসেছেন পণ্ডিচেরি কাউন্সিলের অর্ডারে। তখন কী হবে?’

ওয়াটসনের যুক্তি অকাট্য। ফার্নিয়ের ও নিকোলাসের মুখে কোনও কথা জোগাল না।

‘শুনুন, নবাব পারমিশন না দিলে বাংলায় আমাদের সঙ্গে আপনাদের লড়াই হতে পারে না। আপনারা বরং নবাবের কাছে দরবার করুন।’ এই বলে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। আলোচনার আর অবকাশ রইল না।

নিকোলাস ও ফার্নিয়ের একরাশ হতাশা নিয়ে কেন্ট জাহাজ থেকে নেমে এসে নিজেদের বজরায় চড়ে বসলেন।

ফরাসি দূতেদের সঙ্গে শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা ভেস্তে গিয়েছে। এতে কর্নেল ক্লাইভ খুব খুশি। প্রথম থেকেই তিনি এসবের বিরোধী ছিলেন। ক্লাইভ চান লড়াই। চন্দননগরের ফরাসিদের বিনাশ। এখনই ঝড়ের গতিতে চন্দননগর আক্রমণ করে ফরাসিদের পিঁপড়ের মতো টিপে মারা যায়। কিছুদিন বাদে সত্যিই যদি ফরাসি জেনারেল বুসি বাংলায় এসে পড়েন, আর নবাব যদি ফরাসিদের সঙ্গে যোগ দেন তাহলে পরিস্থিতি অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াবে।

এখনই সৈন্যসামন্ত নিয়ে চন্দননগরের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়তে চাইছেন কর্নেল ক্লাইভ। কিন্তু এ প্রস্তাবে কিছুতেই অ্যাডমিরালকে রাজি করাতে পারছেন না।

আশ্চর্য লোক এই অ্যাডমিরাল সাহেব। সময় বিশেষে তাঁর মধ্যে নীতিবোধ জেগে ওঠে। চন্দননগরে হামলার কথা উঠলেই তিনি বলছেন, এভাবে নবাবের রাজত্বে, তাঁর অনুমতি ছাড়া কোথাও হাঙ্গামা পাকানো যায় না। নবাব অনুমতি দিলে তবেই তিনি চন্দননগরের পথে পা বাড়াবেন। এই গোঁ ধরে বসে আছেন।

ভিতরে ভিতরে রাগে ফুঁসছেন কর্নেল ক্লাইভ। জোর গলায় কিছু বলতে পারছেন না অ্যাডমিরালকে। এই লোকটার পাহাড়ের মতো ইগো। রেগেমেগে তিনি যদি জাহাজ ও তাঁর সৈন্যসামন্ত নিয়ে বাংলা থেকে সরে পড়েন, তাহলে গভীর সমস্যায় পড়বে ইংরেজরা। এমনিতেই তিনি ফিরে গেলেও কারও কিছু বলার নেই। দক্ষিণে ফরাসিদের সঙ্গে লড়াইয়ের কথা ভেবে মাদ্রাজ কাউন্সিল ফিরে আসার জন্য তাগাদা দিচ্ছে ক্লাইভ ও ওয়াটসনকে।

হাতে সময় ভীষণ কম। খুব বেশি দিন আর মাদ্রাজ কাউন্সিলের আদেশকে উপেক্ষা করা যাবে না। অতএব যা করতে হবে, খুব দ্রুত। দুই ফরাসি দূতের সঙ্গে শান্তি চুক্তির আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর চন্দননগরের বিষয়ে একটা চূড়ান্ত হেস্তনেস্ত করার জন্য সিলেক্ট কমিটির মিটিং ডাকলেন ক্লাইভ।

অস্বস্তিতে পড়লেন ওয়াটসন। সব সদস্যই যুদ্ধ চাইছেন। রক্ষণশীল হলওয়েল ও ড্রেকও চন্দননগর আক্রমণের পক্ষে। বোম্বে থেকে কয়েক প্ল্যাটুন সেনা কলকাতায় আসায় ইংরেজদের মনে বল-ভরসা আরও বেড়েছে। ফরাসিদের দুরমুশ করার জন্য মুখিয়ে রয়েছে সবাই।

ওয়াটসন সকলের কথাবার্তা শোনার পর প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা আমাদের হাতে এখন যা ফোর্স রয়েছে তাতে কি আমরা সহজে ফরাসিদের হারাতে পারব?’

সকলেই হই হই করে বলে উঠল, ‘ফোর্ট অঁরলিও গুঁড়িয়ে দেব মাটিতে। ফরাসিরা বাংলায় আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না কোনওদিন।’

হাতে ধরে রাখা বিয়ারের মগটা ঠকাস শব্দে টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে ওয়াটসন বললেন, ‘বেশ আমিও তাহলে যুদ্ধ চাই।’

অ্যাডমিরালের এ কথায় উচ্ছ্বসিত হয়ে তাঁর পাশে বসে থাকা কর্নেল ক্লাইভ করমর্দন করার জন্য নিজের ডান হাতটা বাড়াতে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ওয়াটসন বলে উঠলেন, ‘কিন্তু নবাবের অনুমতি ছাড়া চন্দননগরে হামলা করাটা ভীষণ আনএথিকাল কাজ হয়ে যাবে। আমার মনে হয় চন্দননগর আক্রমণের অনুমতি চেয়ে ফের আমরা একটা চিঠি লিখতে পারি নবাবকে। আশা করি নবাব অনুমতি দেবেন।’

কিওপ্যাট্রিক শুধোলেন, ‘এমন অনুমতি কি নবাব দিতে পারেন?’

 ‘দেখাই যাক না! আর একটু অপেক্ষা করতে ক্ষতি কী? নবাব অনুমতি দিলে কেউ বলতে পারবে না, চন্দননগর অ্যাটাক করে আমরা কোনও আনএথিকাল কাজ করেছি।’

ক্লাইভ ঠিক করে ফেলেছিলেন আগামীকালই তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন ফের বেঁকে বসায় হতাশায় হাতে ধরা বিয়ারের মগটা মাটিতে আছাড় মারতে ইচ্ছে করছিল ক্লাইভের। তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, ‘এথিকসের সওয়াল যুদ্ধের ক্ষেত্রে চলে না। আর এথিকস মানতে গেলে যুদ্ধই করা যায় না।’

‘ইউ মাস্ট রিমেম্বার যে আমরা এক মহান জাতি। আমরা যা খুশি করতে পারি না।’

ক্লাইভ এবারে বেশ উত্তেজিত গলায় বললেন, ‘অ্যাডমিরাল আপনি কেন বুঝতে পারছেন না, এখনই যদি ফরাসিদের ডেস্ট্রয় করতে না পারি আমরা, ভবিষ্যতে বড় বিপদ হতে পারে কোম্পানির। জেনারেল বুসি ফ্লিট নিয়ে এসে পড়লে উই মে ফেস ডিবাকল। ক্যান উই স্পেন্ড আওয়ার ইন্টারেস্ট অন এথিকস?’

ক্লাইভের কথার কোনও জবাব না দিয়ে গুম হয়ে বসে রইলেন ওয়াটসন।

ক্লাইভ বললেন, ‘আর একটা প্রশ্ন আছে আমার, আপনি বলতে পারেন ইউরোপের কোন দেশ ন্যায়নীতি মেনে ইস্টে ব্যবসা বিস্তার করেছে?’

‘লেট মি রাইট ওয়ান মোর লেটার টু নবাব।’ গম্ভীর গলায় এই কথা বলে কুরসি ছেড়ে উঠে মিটিংরুম থেকে বেরিয়ে গেলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন।

কলকাতা থেকে ফেরার পর দেওয়ান মোহনলাল মজে রয়েছেন শরাব ও খুশবু বাইয়ের সৌগন্ধে। মোরাদবাগ প্যালেস জুড়ে এখন শুধু উৎসবের আমেজ। হররোজই সন্ধের পরে মেহফিল বসছে।

মাথার উপর বেলজিয়াম কাচের ঝাড়বাতি। গাঢ় লাল রঙের ইস্পাহানি গালিচার উপরে বসে মোহময়ী ভঙ্গিতে গেয়ে চলেছে খুশবু বাই। ঝড় উঠছে তবলার বোলে, সারেঙ্গির সুরে।

বিলিতি শরাবের নেশায় জড়িয়ে যাচ্ছে মোহনলালের গলা। থেকে থেকেই তিনি বলে উঠছেন, ‘বহুত আচ্ছা বিবিজান। বহুত খুব।’ মোসাহেবরাও ধুয়ো ধরছে, ‘কেয়াবাৎ! কেয়াবাৎ!’

কিন্তু আজ নিজের গান কেমন যেন বেসুরো ঠেকছে খুশবুর কানে। কথা ও সুরের তালমিল হচ্ছে না। আসলে গত কয়েকদিন ধরে খুসবুর মনটা বড় অস্থির হয়ে রয়েছে। মেজাজ শরিফ নেই।

সেদিন বিকেলে মনসুরগঞ্জের মান্ডির দিয়ে আসার সময় সহসা যেন খুন ছলকে উঠেছিল খুশবুর বুকে। আক্রমকে ফুল কিনতে পাঠিয়ে পালকিতে বসে চিকের আড়াল থেকে সে পথের ধারে ফুলের পসরা নিয়ে বসা যুবকটিকে গভীর মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করেছিল। সেই যুবকটিকে যে বসির খাঁ, এ নিয়ে খুশবুর মনে কোনও সন্দেহ নেই।

সেই দুঃস্বপ্নের রাতে হাবসি সেপাইরা বসিরকে ছুড়ে ফেলেছিল নদীর জলে। বসির মরেনি! বেঁচে আছে! আল্লার বহুত মেহেরবানি।

সোনার পিঁজরা ছেড়ে খোলা আসমানে উড়তে চেয়েছিল খুশবু বাই। কিন্তু ফের সে ধরা পড়ে খাঁচায়। হারিয়ে যায় তার আসলি পেয়ার সারেঙ্গিবাদক বসির খাঁ। শেষমেষ হারেমেই জীবনের বরবাদি। একথা মেনে নিয়েছিল খুশবু। কিন্তু বসিরের দেখা পাওয়ার পর থেকে অসম্ভব চঞ্চল হয়ে উঠেছে খুশবুর দিল। আজাদ চিড়িয়ার মতো ডানা মেলে দূর আসমানে উড়ে যাওয়ার খোয়াব ভর করেছে তার দু-চোখের পাতায়। এসব ভাবতে ভাবতে থেকে থেকেই আনমনা হয়ে যাচ্ছে খুশবু। কিছুতেই যেন গানের ছন্দ সে আজ খুঁজে পাচ্ছে না।

একদৃষ্টিতে খুশবুর দিকে চেয়ে আছে আক্রম। খুশবুর বুক, কোমর, নাভি অঞ্চলে ঘুরে বেড়াচ্ছে তার দৃষ্টি। দুচোখে জ্বলছে লালচের আগুন। গানবাজনায় তার তেমন আগ্রহ নেই। দু-চোখ দিয়ে সে গিলছে খুশবুর শরীরটাকে।

আক্রমের উপর চোখ পড়তেই তীব্র ঘৃণায় চোখ সরিয়ে নিয়ে বুকের উপর ওড়না টেনে কাঁচুলি আড়াল করল খুশবু বাই। থামিয়ে দিল গান। থমকে গেল সারেঙ্গি ও তবলা।

মোহনলাল জড়ানো গলায় আদুরে ঢঙে শুধোলেন, ‘থামলে কেন বিবিজান?’

‘গোস্তাকি মাফ করুন হুজুর। তবিয়ত আচ্ছা নেই। আজ রেহাই দিন।’

‘ঠিক হ্যায়। আজ ছোড় দো। ঘরে গিয়ে আরাম কর পিয়ারি।’

মোহনলালকে তসলিম জানিয়ে রংমহল থেকে বিদায় নেয় খুশবু বাই।

মোরাদবাগ প্যালেসের বিরাট চৌহদ্দির ভিতরেই এক প্রান্তে ছোট্ট একটা দোতলা হাভেলিতে থাকে খুশবু বাই। রংমহল থেকে বেশ খানিকটা পথ হেঁটে যেতে হয়। ঘন অন্ধকার পথ দিয়ে হনহন করে হেঁটে চলে খুশবু। মোহনলালের আদেশে তাকে এগিয়ে দিতে পিছন পিছন অভ্রের মশাল হাতে আসছে আক্রম।

দেওয়ান মোহনলাল আক্রমকে ইদানীং নিযুক্ত করেছেন খুশবুর দেহরক্ষীর কাজে। এই সুযোগে কারণে-অকারণে মাঝেমধ্যেই খুশবুর হাভেলিতে হানা দেয় আক্রম। সে কী চায় তা বোঝে খুশবু। তীব্র ঘৃণায় তার গা-হাত-পা চিড়বিড় করে ওঠে।

ঘরে ঢুকে দোর আটকাতে গিয়ে বাধা পেল খুশবু। দরজা আগলে দাঁড়াল আক্রম। নেশায় তার শরীরটা টলছে।

খুশবু বলে, ‘রাত হয়েছে। ঘরে যাও আক্রম।’

‘আমার উপর তোমার এত নফরতি কেন খুশবু? আক্রমের সুখা দিলের উপর তোমার পেয়ার কি একটু বারিষ হয়ে ঝরে পড়তে পারে না?’

এ কথার জবাব না দিয়ে জোর করে দরজা বন্ধ করতে যায় খুশবু। ফের বাধা দেয় আক্রম।

রাত গভীর হয়েছে। ঘুমিয়ে পড়েছে গোলাম, বাঁদিরা। কোনওদিনই এসময় ফেরা হয় না খুশবুর। সে রংমহল থেকে ফেরে ভোরের আলো ফোটার পর। মালকিন রাতে ফিরবে না দেখে গোলাম, বাঁদিরা নিশ্চিন্তে ঘুমোয়। আশেপাশে কেউ নেই। আক্রমের আচরণ দেখে ভয় করতে থাকে খুশবুর।

সে বলে, ‘কী চাও আক্রম?’

‘তোমাকে চাই পিয়ারি। তোমার মতো ইতনা খুবসুরত জেনানা কভি দেখিনি আমি। স্রিফ একটা রাতের জন্যেও কি তোমাকে পেতে পারি না আমি?’ আক্রমের কথার ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট।

ভয়ে কয়েক পা পিছিয়ে আসে খুশবু।

ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে আক্রমের। হঠাৎ খুশবুর হাত ধরে এক ঝটকায় তাকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে জোর করে চুম্বন করতে যায় আক্রম। চিৎকার করে ওঠে খুশবু বাই। আঙুলের লম্বা নখগুলো দিয়ে আক্রমের গাল চিরে দেয়।

রাতের স্তব্ধতার মধ্যে খুশবুর আর্তনাদ ভয়ংকর জোরে বাজে আক্রমের কানে। মোরাদবাগ প্যালেসের বিভিন্ন জায়গায় মোতায়েন আছে রাতপাহারাদারেরা। তারা চিৎকার শুনে ছুটে আসতে পারে। ঘাবড়ে গিয়ে খুশবুকে ছেড়ে দিয়ে দু-পা পিছিয়ে আসে আক্রম। অসম্ভব জ্বালা করছে গালটা। গালে হাত দিয়ে আক্রম টের পায় খুন ঝরছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *