৪৩
নিজামতের আদেশনামা অনুযায়ী তিনি হুগলির ফৌজদারের দেওয়ান। সাধারণ লোকে জানে তিনিই ফৌজদার। আসলে ভূতপূর্ব ফৌজদার অপসারিত হওয়ায় পর থেকে এই অতিরিক্ত দায়িত্ব সামলাচ্ছেন নন্দকুমার। এখনও কারও নামে হুগলির ফৌজদারির পরোয়ানা বেরোয়নি। নবাবের মনে কী ইচ্ছে আছে কে জানে। তবে এই পদটা পেতে নন্দকুমার খুবই আগ্রহী। এ নিয়ে মুর্শিদাবাদে কম তদ্বির তিনি করেননি তিনি কিন্তু ভাগ্যে শিঁকে ছিঁড়ছে কই?
ফৌজদারের পদে অভিষিক্ত হওয়া আর অন্য পদে থেকে ফৌজদারের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করা দুটোর মধ্যে সামাজিক মর্যাদায় আকাশ-পাতাল তফাত। একথা নিজামতের আমলাতন্ত্রের কাঠামোয় দীর্ঘদিন বিচরণকারী নন্দকুমার ভালোই বোঝেন। যোগ্যতা অনুযায়ী পদমর্যাদা তিনি পাচ্ছেন না। এ নিয়ে নন্দকুমারের আক্ষেপের শেষ নেই, মনে সুখ নেই।
নন্দকুমার আজকাল বিমর্ষ হয়ে থাকেন। ফারসি, সংস্কৃত ও বাংলায় তিনি সুপণ্ডিত। দক্ষ প্রশাসক। কম দিন হল না, নিজামতের নোকরি করছেন। হিজলি ও মহিষাদলে রাজস্ব আদায়ের আমিন হিসেবে আলিবর্দির শাসনকালের প্রথম দিকে তাঁর নোকরির শুরুয়াত। দীর্ঘদিন নিষ্ঠার সঙ্গে নিজামতের বিভিন্ন দায়িত্ব সামলেও এখন পর্যন্ত ফৌজদারের পদটাই পেলেন না। অথচ তাঁর চোখের সামনে দিয়ে কত অযোগ্য লোক কত কম বয়সে উঁচু উঁচু পদে বসে শাসনকার্য চালিয়ে যাচ্ছে।
এই তো মানিকচাঁদ-সেদিনও ছিল বর্ধমান রাজার গোমস্তা। নিজামতের নোকরিতে ঢুকল আলিবর্দির আমলের শেষ দিকে। একেবারে অযোগ্য লোক। রাতারাতি সে হয়ে গেল আলিনগরের ফৌজদার।
আজকাল একটা কথা বেশ বুঝতে পারেন নন্দকুমার। আমলাতন্ত্রের উপরের থাকে ওঠাটা এখন আর শুধু যোগ্যতার উপর নির্ভর করে না—স্তাবকতা আর অন্ধ আনুগত্যই সব। ঘুণ ধরেছে নিজামতের শাসন ব্যবস্থায়। ক্ষয়িষু� কঙ্কালসার চেহারাটা ক্রমশ প্রকট হয়ে পড়ছে। এ ব্যবস্থা আর বেশিদিন টিকবে বলে মনে হয় না।
এসব ভাবতে ভাবতে নন্দকুমার পথ হাঁটছিলেন। গঙ্গাস্নান সেরে ফিরছেন। প্রত্যহ ভোরে গঙ্গা স্নানে যাওয়া তাঁর বহুদিনের অভ্যেস।
গৃহের সামনে এসে আজ নন্দকুমার অবাক হলেন।
সদর দরজার বাইরে মাটিতে নামানো রয়েছে একটা বাহারি পালকি। অপেক্ষা করছে পালকিবাহকের দল ও আশাসোঁটা ধারী একদল সেপাই। নিশ্চয়ই গণ্যমান্য কেউ এসেছে। কে এল?
ছুটে এসে একজন দাখিলা জানাল, ‘হুজুর, বণিক চুড়োমণি উমিচাঁদ এসেছেন।’
ভুরু কুঁচকে যায় নন্দকুমারের। পোড় খাওয়া সন্দিগ্ধ মন উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। উমিচাঁদ হঠাৎ এই সাতসকালে কী ব্যাপার?
দাখিলা ফের বলল, ‘উনি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। বলছেন, আপনার সঙ্গে নাকি খুব জরুরি দরকার।’
গম্ভীর ভাবে নন্দকুমার বললেন, ‘দরবার ঘরে বসাও। আমি নারায়ণের সেবা সেরে আসছি।’
এই বলে অন্তঃপুরে চলে গেলেন নন্দকুমার।
হুগলির ফৌজদারের হাভেলির দরবারঘরের লাগোয়া অলিন্দে পায়চারি করছিলেন উমিচাঁদ। মনের মধ্যে প্রবল উৎকণ্ঠা। যে কাজে এসেছেন সে কাজে সফল হবেন কি? তাঁর প্রস্তাব শুনে নন্দকুমার যদি বেঁকে বসেন, তা হলে কর্নেল ক্লাইভের কাছে তাঁর ঘোর বেইজ্জতি হবে। আর সবকিছু যদি নবাবের কানে তোলেন নন্দকুমার তাহলে ওদিক থেকেও বিপদে পড়ার সম্ভাবনা।
গভীর সংকটে পড়ে গেলেন নন্দকুমার। ইংরেজরা চন্দননগর আক্রমণ করতে পারে এমন একটা কথা ভাসছিল বাতাসে। উমিচাঁদের মুখ থেকে যা শুনলেন তাতে তিনি এ বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত। ফরাসিদের সাহায্য করার জন্য নবাব তাঁর কাছে পাঠিয়েছেন আড়াই হাজার ঘোড়সওয়ার। কর্নেল ক্লাইভের সুবিধে করে দেওয়ার জন্য এই বাহিনীকে চন্দননগর না পাঠিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখতে হবে হুগলিতে—এই হল উমিচাঁদের সার কথা।
এ যদি মেনে নিতে হয় তাহলে নবাবের হুকুমত অগ্রাহ্য করতে হবে নন্দকুমারকে। নবাবের নির্দেশ উপেক্ষা করতে হবে তাঁকে। বিনিময়ে ফৌজদার পদের প্রলোভন। সেই সঙ্গে পনেরো হাজার তনখা ঘুষ।
উমিচাঁদজি বলেছেন, ইংরেজরা যদি পনেরো হাজার তনখা দিতে রাজি হয়, তাহলে এক গরিব ব্রাহ্মণ আপনার কাছে এসে বলবে, ”গুলাব কি ফুল তাজা হ্যায়।” আর আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে ব্রাহ্মণের হাতে একটা আশরফি উপহার দেবেন।’
মাথা ঘুরতে লাগল নন্দকুমারের। শাসকের উচিত রাজধর্ম পালন করা, আর্তকে রক্ষা করা। কিন্তু ফৌজদারের পদপ্রাপ্তির জন্য তাঁকে উলটো পথে হাঁটতে হবে। বিবেকের কাছে কী জবাব দেবেন নন্দকুমার?
রাত গভীর হয়েছে। চারিদিকে ঘন অন্ধকার। নিঝুম হয়ে পড়েছে হাভেলি। দোতলার অলিন্দে একা একা পায়চারি করে চলেছেন নন্দকুমার। কঠিন পরিস্থিতি। লড়াই নিজের সঙ্গে তাঁর নিজেরই। ফৌজদার পদপ্রাপ্তির মোহ কিছুতেই কাটিয়ে উঠতে পারছেন না তিনি। অন্যদিকে তার একটা অন্যায় কাজের জন্য বরবাদ হয়ে যাবে ফরাসিরা—একথা ভাবলে ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে তাঁর বিবেক।
কিন্তু আজকের দিনে ন্যায়পরায়ণতার কোনও মূল্য আছে কি? এ তো নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াই নয়, ভিনদেশি দুই বণিক গোষ্ঠীর লড়াই। ফরাসিরা যদি সত্যিই বরবাদ হয়ে যায়, তাতে কী এসে যায় তার?
যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও নিজামতে তিনি উঁচু পদ পাননি। কৌশলে যদি ফৌজদারের পদটা পাওয়া যায় তাতে অন্যায় কি আছে? মহাভারতে যুধিষ্ঠিরও তো কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিলেন। নানারকম যুক্তি সাজিয়ে মনকে বোঝানোর কসরত করতে থাকেন নন্দকুমার। বারবার তাঁকে হাতছানি দিচ্ছে ফৌজদারের পদটা।
কয়েকদিন পরে সকালবেলায় কাছারিবাড়ি যাওয়ার সময় রক্ষীদের ব্যুহ ভেদ করে আচমকা নন্দকুমারের পায়ে এসে পড়ল একজন গরিব লোক। উদলা গা। পরনে মলিন ধুতি। মাথার চুল উসকোখুশকো। একেবারে ভবঘুরেদের মতো চেহারা। গলায় পইতে দেখে নন্দকুমার বুঝলেন লোকটি ব্রাহ্মণ।
লোকটিকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য রক্ষীরা ছুটে এল। হাতের ইশারায় তাদের তফাতে যেতে বললেন নন্দকুমার। তিনি অনুভব করলেন তাঁর হৃৎপিণ্ড দ্রুত গতিতে ছুটতে লেগেছে। ভূমিষ্ঠ হয়ে নন্দকুমারকে প্রণাম জানিয়ে লোকটি উঠে দাঁড়াল।
নন্দকুমারের মুখে কোনও কথা নেই। তিনি একদৃষ্টে তার দিকে চেয়ে আছেন।
গরিব ব্রাহ্মণ জোড়হাত করে বলে উঠল, ‘হুজুর, গুলাব কি ফুল তাজা হ্যায়।’
সামনের দিকে দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত করল দরিদ্র ব্রাহ্মণ।
একটা আশরফি ব্রাহ্মণের হাতের তালুর উপর ফেললেন নন্দকুমার। তারপর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না নন্দকুমার। হনহন করে হেঁটে সামনে এগিয়ে গেলেন।
আশরফি তালুবন্দি করে ব্রাহ্মণ ছুটল ঘাটের দিকে। গাছপালার আড়ালে নির্জন একটা জায়গায় অপেক্ষা করছিল ডিঙি নৌকা। কিছু দূর নদী সাতরে ডিঙি নৌকোয় উঠল ব্রাহ্মণ। জলে ভিজে নকল চুলদাড়ির আঁঠা আলগা হয়ে গিয়েছে। সেসব জলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নৌকোয় চেপে বসল নীলকণ্ঠ।
ছইয়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে উৎকণ্ঠার সঙ্গে স্ট্রন শুধোল, ‘কাজ হাসিল হয়েছে?’
এক গাল হেসে ডান হাত প্রসারিত করল নীলকণ্ঠ। তার তালুর উপরে চকচক করছে নন্দকুমারের দেওয়া আশরফি।
