৩
ভালো ফ্যাসাদে পড়েছেন কৃষ্ণকান্ত।
হুগলির চকবাজার প্রায় ছেঁচে ফেলা হয়ে গেল, কিন্তু জিনিসটার হদিশ মিলছে না। বস্তুটি অবশ্য অসামান্য কিছু নয়, একটি বিশেষ ধরনের চামড়ার হ্যাট। দোকানিদের বোঝাতে বোঝাতে কৃষ্ণকান্তর মুখে ফেনা উঠে গিয়েছে। বাজারে হ্যাট অনেকই আছে। নানারকম সেসবের চেহারা, হরেকরকম নাম। কিন্তু মুশকিল হল, সাহেব যেমন চেয়েছেন, তেমনটি পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষ্ণকান্ত অনেক’দিন ধরেই ছোকরা সাহেবকে কাছের থেকে দেখছেন। সাহেব বেশ শৌখিন। পোশাকাশাকের ব্যাপারে ভীষণ পরিপাটি। সব কিছু তার মনের মতো হওয়া চাই। সে কোট হোক, জামা হোক, ব্রিচেস হোক বা হ্যাট হোক—পছন্দ না হলে সাহেব তা ব্যবহারই করবেন না। তাই যেমন তেমন একটা হ্যাট কিনে নিয়ে গিয়ে সাহেবকে বুঝ দেওয়ার চেষ্টা করে কোনও লাভ নেই।
নিজের প্রিয় হ্যাটটি সাহেব ফেলে এসেছেন কুঠিতে। মাঝপথে এসে সে কথা বলাতে কৃষ্ণকান্ত জোর গলায় বলেছিলেন, ‘ও নিয়ে ভাববেন না সাহেব, পথে হুগলির চকবাজার থেকে কিনে নেব।’ কিন্তু চকবাজারে কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি খুঁজে পাওয়া যে এমন দুরূহ হয়ে দাঁড়াবে, তা কৃষ্ণকান্ত কী করে আগাম জানবেন? কপালের ঘাম মোছেন কৃষ্ণকান্ত। ঘণ্টাখানেকের উপর হাঁটাহাঁটি করে ঘেমে নেয়ে একেবারে হেদিয়ে পড়েছেন।
পড়ন্ত বিকেলেও সূর্যের আঁচ বেশ কড়া। চকবাজার জমজমাট। ওলন্দাজ, ফরাসি, আরমানি, হাবশি, কাফ্রি, পারসি প্রভৃতি বিদেশি ও দেশি বণিকের ভিড় পথে। পথের দুপাশে হরেক কিসিমের পণ্যে পসরা সাজিয়ে বসে আছে কারবারিরা। খদ্দের ধরার জন্য তাদের হাঁকাহাঁকিতে কান পাতা দায়।
হাঁটতে হাঁটতে কৃষ্ণকান্ত বাজারের প্রায় শেষপ্রান্তে এসে পড়েছেন। পথের ধারে চবুতরার নীচে রকমারি জিনিসের পসরা নিয়ে বসা এক বৃদ্ধ ওলন্দাজের দোকানে বেশ কিছুক্ষণ ধরে একরাশ হ্যাট নাড়াচাড়া করার পর পছন্দের জিনিসটি না পেয়ে হতাশ হয়ে কৃষ্ণকান্ত ফেরার পথ ধরেন। কয়েক পা হাঁটতেই বাধা পড়ে।
‘বাবু শুনছেন?’
সুরেলা বামাকণ্ঠ শুনে চমকে ঘুরে তাকান কৃষ্ণকান্ত।
অদূরে দাঁড়িয়ে মুখে হাসির রেশ নিয়ে তাঁর দিকে চেয়ে আছে এক যুবতী। গায়ের রং শ্যামলা। কাটা কাটা চোখমুখ। নাকে রুপোর নথ। চোখে কাজল। ঠোঁট তাম্বুল রাঙা। ক্ষীণ কটি। নাভিদেশ উন্মুক্ত। পরনের শাড়ি বেশ ঝকমকে। গলায় রুপোর হার। মাথার খোঁপা থেকে ঝুলছে বেলফুলের মালা।
মেয়েটি যে স্বৈরিণী, সেটা বুঝে নিতে বহুঘাটের জল খাওয়া ঝানু কারবারি কৃষ্ণকান্তর কোনও অসুবিধা হয় না। কিন্তু কোথায় যেন একটা খটকা লাগে। কেমন যেন চেনা চেনা মুখশ্রী। আগে কোথাও দেখেছেন মেয়েটিকে? নাকি বিভিন্ন নগরের পথে দেহসম্ভার নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবতীদের একইরকম দেখায়।
কৃষ্ণকান্তকে হাঁ করে চেয়ে থাকতে দেখে খিলখিল করে হেসে উঠে মেয়েটি বলে, ‘কী দেখছেন অমন করে?’
অস্বস্তিতে পড়ে গিয়ে চোখ নামিয়ে নেন কৃষ্ণকান্ত।
‘যা খুঁজছেন, অমন জিনিস আমার কাছে একটা আছে। আপনার পছন্দ হলে নিতে পারেন।’
কৃষ্ণকান্ত ভুরু কুঁচকে শুধোন, ‘আমি কী খুঁজছি, তা জানলে কেমন করে?’
‘সেই কখন থেকে আপনার পিছে পিছে ঘুরছি। আপনি খেয়াল করেননি।’
বিরক্ত কৃষ্ণকান্ত কড়া গলায় বলে ওঠেন, ‘আমার পিছে ঘুরছ মানে? আমাকে কি তোমার নাগর ঠাওরেছ?’
‘না তা নয়। নাগর আমরা চিনি।’
‘তাহলে চাই কী তোমার?’
‘প্রয়োজনটা আমার নয় আপনার।’
‘মানে?’
‘বললাম তো যা খুঁজছেন, অমন জিনিস আমার কাছে আছে। একবার দেখতে পারেন।’
রেগে গিয়ে কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘আমাকে গোলা লোক পেয়েছ? তোমার মতো মাগ ঢের দেখেছি। এখানে সুবিধে হবে না। অন্য বাবু ধরো গে যাও।’
‘আপনি কাশিমবাজারের মানী লোক, পথে দাঁড়িয়ে বেশ্যার সঙ্গে কলহ করলে আপনার মান যাবে। আসুন আমার সঙ্গে।’ এই কথা বলে হাঁটতে শুরু করে মেয়েটি।
চমকে ওঠেন কৃষ্ণকান্ত। কাশিমবাজারের মানী লোক! হুগলির চকবাজারের এই সামান্য গণিকা চেনে তাঁকে? ধন্দে পড়ে যান কৃষ্ণকান্ত। কৈশোরে দেখা একজনের স্মৃতি মনের মধ্যে উঁকি দেয়। চেহারায় মিল বড় বেশি। এ কি সেই মেয়ে? না না তা কী করে সম্ভব? তার তো বিয়ে হয়েছিল কাটোয়ায়। অদম্য কৌতূহলে সম্মোহিতের মতো রহস্যময়ী গণিকার পিছু নেন কৃষ্ণকান্ত।
প্রশস্ত সড়ক ছেড়ে সরু একটা গলিপথে ঢুকে পড়ে মেয়েটি। ইট বিছানো পথ, নোংরা, অপরিষ্কার। রাস্তার দুপাশে চুন-সুড়কির গাঁথনি দেওয়া বাংলা ইটের ছোট ছোট ঘর। দরজায় দরজায় দাঁড়িয়ে রয়েছে অর্ধনগ্ন গণিকারা।
ইটের দেওয়ালওয়ালা ঘরগুলোর ফাঁকে জায়গা করে নিয়েছে কিছু দোকান। এসব দোকানে শরাব, আতর, আরক, নেশার গুলি সবই পাওয়া যায়। পথের পাশে ফুলের ডালা নিয়ে বসে আছে কয়েকজন পৃথুলা, যৌবন ঢলে পড়া মহিলা। কৃষ্ণকান্তকে দেখে তারা হেঁকে ওঠে, ‘পিয়ারীর জন্য নিয়ে যান বাবু, বেলকুড়ির মালা, লাল গুলাব।’
আতরওয়ালা হাঁকে, ‘আতর লিয়ে যান বাবু, পারসি মাল, আসলি চিজ।’
এসব উপেক্ষা করে সেই রহস্যময়ী মেয়েটির পিছু পিছু এগিয়ে চলেন কৃষ্ণকান্ত।
কুহকিনী দরজার আগল ঠেলে ঢুকে পড়ে একটা ঘরে। তাকে অনুসরণ করে সেই ঘরে প্রবেশ করেন কৃষ্ণকান্ত। মেঝের অর্ধেক জুড়ে পাতা রয়েছে ফরাশ। আয়েশ করার জন্য তাকিয়াও আছে। এ ঘরে আলো বিশেষ ঢোকে না। ঘরে ঢুকেই কৃষ্ণকান্ত চোখে অন্ধকার দেখেন, কুলুঙ্গিতে জ্বলতে থাকা মৃৎপ্রদীপের আলোয় খানিকবাদে চোখ সয়ে আসে।
মেয়েটি বলে, ‘বসুন বাবু। এই আমার ঘর।’
মাটির কুজো থেকে পিতলের ঘটিতে জল ঢেলে কৃষ্ণকান্তর দিকে এগিয়ে দেয় সে।
হ্যাটের খোঁজে তখন থেকে হাঁটাহাঁটি করে কৃষ্ণকান্তর বড় তেষ্টা পেয়েছে। গলায় ঢকঢক করে জল ঢেলে বলেন, ‘কী দেখাবে বলছিলে, বের করো। আমার তাড়া আছে।’
‘জানি। আপনি ব্যস্ত লোক। মানী লোক। এই পল্লিতে আপনাকে নিয়ে আসতে হল বলে অপরাধ নেবেন না।’
মাটিতে হাঁটু মুড়ে বসে টুকিটাকি সাংসারিক জিনিসে উপচে পড়া বেতের বড় একটা টুকরি হাতড়ে চামড়ার একটা হ্যাট বের করে মেয়েটি। যেমনটি খুঁজছিলেন, অবিকল সেইরকম একটা হ্যাট। জিনিসটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে উৎসাহের সঙ্গে কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘এমন জিনিসই তো খুঁজছিলাম।’
কৃষ্ণকান্তর সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে ফরাশের উপর বসে মেয়েটি বলে, ‘এক সাহেব প্রায়ই আসত আমার ঘরে। ভুল করে ফেলে গেছে।’
‘সে তো বুঝতেই পারছি। তা জিনিসটা তো বেশ শৌখিন। চামড়াটাও বেশ দামি বলে মালুম হচ্ছে। তোমার সেই কেষ্টঠাকুর জিনিসটা যদি ফেরত চায়?’
মেয়েটি আনত মুখে বলে, ‘আসবে না। বেঁচে আছে কিনা কে জানে? শুনেছি তো কলকাতার কেল্লার ভিতর অন্ধকূপে অনেকেই মরেছে। আর বাকিরা নবাবের ভয়ে কলকাতা ছেড়ে পালিয়েছে।’
অবাক হয়ে মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে কৃষ্ণকান্ত শুধোন, ইংরেজ সাহেব?
আনত চোখে কুহকিনী জবাব দেয়, ‘হুঁ।’
মেয়েটির মুখের দিকে চেয়ে থাকেন কৃষ্ণকান্ত। এই শ্যামাঙ্গীর নিটোল মুখের মধ্যে এমন কিছু রয়েছে, যা অনেক মরদেরই মাথা ঘুরিয়ে দিতে পারে। কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘সাহেব তো বেশ রসিক, কলকাতা ছেড়ে এদ্দুরে আসত?’
মুখ তুলে কৃষ্ণকান্তর দিকে চেয়ে মেয়েটি বলে, ‘আমি সুতানুটি থেকে পালিয়ে এসেছি। নবাবের সঙ্গে ইংরেজদের লড়াইয়ে শুধু তো গেরস্তের ঘর পোড়েনি, রাঁঢ়ের ঘরও পুড়েছে বাবু।’
ক্ষণেক চুপ করে থেকে, কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘এই হ্যাটের জন্য মূল্য কত দেব?’
‘কিছু লাগবে না। পড়ে পাওয়া জিনিস। এমনিই রয়েছে ঘরে। আপনি নিয়ে যান।’
‘তা কী করে হয়, কাঞ্চনমূল্যের আশাতেই তো আমার পিছু নিয়েছিলে তুমি।’
চকিতে মুখ তুলে কৃষ্ণকান্তর দিকে তাকায় মেয়েটি। চোখের ধারাল দৃষ্টি যেন কৃষ্ণকান্তকে এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়।
মুখ নামিয়ে নেয় মেয়েটি। শীতল কণ্ঠে বলে, ‘না, সে জন্য নয়।’
‘তবে পিছু নিয়েছিলে কেন?’
‘আপনি কাশিমবাজারের লোক। অনেক’দিন পর দেশের একজন মানুষের দেখা পেলাম তাই দুটো কথা বলার ইচ্ছে হল।’
চমকে ওঠেন কৃষ্ণকান্ত। হৃৎপিণ্ডের গতি দ্রুত হয়। মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে। কাশিমবাজার-সুতানুটি-হুগলি, কৃষ্ণকান্তর মনের মধ্যে সব কেমন যেন তালগোল পাকিয়ে যায়। বিস্ফারিত চোখে রহস্যময়ীর চোখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করেন, ‘তোমার দেশ কাশিমবাজারে?’
মেয়েটি উত্তর দেয়, ‘বাপের ঘর। আমার বাপ আপনাদের কাছারিতে কাজ করতেন।’
কৃষ্ণকান্তর কপাল ঘেমে ওঠে। ‘কী নাম তোমার বাবার?’
মেয়েটি শান্ত গলায় বলে, ‘গোবিন্দ ভটচায।’
উত্তেজিত হয়ে ওঠেন কৃষ্ণকান্ত। ‘তুমি, তুমি গোবিন্দ ভটচাযের মেয়ে? তুমি খুশি?’
‘খুব অবাক হচ্ছেন না?’
‘শুনেছিলাম তোমার বিয়ে হয়েছে কাটোয়ায়।’
‘ঠিকই শুনেছিলেন। বর্গির হাঙ্গামায় আমার কপাল পুড়েছে কান্তবাবু।’
‘তোমার স্বামী? তোমার শ্বশুরকুল?’
‘সবাই আছে। এখন তারা কাটোয়াতেই থাকে। বর্গির হানায় ভিটে ছেড়ে সবাই পালিয়ে গিয়েছিল। পরে ফিরেছে। শুনেছি আমার স্বামী ফের বে করেছে।’
‘তুমি ঘরে ফিরে যাওনি কেন?’
কেঁদে ওঠে খুশি হঠাৎ। ‘কী করে ফিরব কান্তবাবু? একদল মারাঠা দস্যু পথের উপর যাকে নষ্ট করেছে, তাকে ঘরের বউ করে ফিরিয়ে নেবে কে?’
নিরুত্তর হয়ে খুশির দিকে অপলক চোখে চেয়ে থাকেন কৃষ্ণকান্ত।
গোবিন্দ ভট্টাচার্য ছিলেন কৃষ্ণকান্তর বাবার কর্মচারী। খুশি ছিল তার বড় আদরের মেয়ে। গায়ের রং চাপা হলেও মুখখানা সুশ্রী। কৈশোরে একবার তাকে দেখেছিলেন কৃষ্ণকান্ত। ঝুলনযাত্রার দিনে ভট্টাচার্যমশায়ের সঙ্গে তাঁদের বাড়িতে এসেছিল খুশি। কয়েকমাস পরে কৃষ্ণকান্তর সঙ্গে খুশির বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন গোবিন্দ ভট্টাচার্য। সামান্য এক কর্মচারীর কালো মেয়ে হবে ঘরের বউ? কৃষ্ণকান্তর পিতা এ প্রস্তাব সঙ্গে সঙ্গে নাকচ করে দেন।
হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকে খুশি।
ওঠার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন কৃষ্ণকান্ত। তাঁকে এখন চুঁচড়োর জাহাজঘাটায় যেতে হবে। তবিল থেকে কয়েকটা রুপোর টাকা বের করে কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘হ্যাটের দামটা’
‘এমনি নিয়ে যান কান্তবাবু দাম দিতে হবে না।’
অস্বস্তিতে পড়েন কৃষ্ণকান্ত। ‘না, না তা কী করে হয়?’
‘কাশিমবাজারের একজন মানুষের সঙ্গে দুটো কথা কইতে পারলাম। এটাই ধরে নিন মূল্য।’
খুশির গলায় এমন একটা কিছু ছিল যে, হ্যাটের দাম নিয়ে আর কথা বাড়ালেন না কৃষ্ণকান্ত। দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, ‘খুশি, আমি তাহলে এখন আসি।’
মুখ তুলে কৃষ্ণকান্তর দিকে চেয়ে চোখের জল মুছে খুশি বলে, ‘খুশি নয় কান্তবাবু, আমার নাম হিরেমন।’
পতিতাপল্লির গলি থেকে বেরিয়ে এসে গঙ্গার ধারের পথ ধরে দ্রুত হাঁটতে থাকেন কৃষ্ণকান্ত। তিনি হিসেবি লোক। আবেগের দাস নন। খুশির করুণ কাহিনি মনকে সামান্য ভারাক্রান্ত করলেও, তেমনভাবে তোলপাড় করেনি। এসব নিয়ে ভাবাবেগে আকুল হওয়ার অবকাশ তাঁর নেই। ভেবে করবেনই বা কী? খুশি তো একা নয়। অভাগীদের একজন প্রতিনিধি মাত্র। বর্গির হাঙ্গামায় ভাগ্য পুড়িয়ে, সমাজ হারিয়ে বাংলার অনেক কুলবধূই ঠাঁই হয়েছে গণিকালয়ে। শরীরে কলঙ্কের দাগ চিরতরে মুছে দিতে আত্মহত্যা করেছে কেউ কেউ। সুবে বাংলার সামাজিক জীবনে এ এক চরম বিপর্যয়।
তবে মনে মনে খুশিকে অজস্র ধন্যবাদ দিলেন কৃষ্ণকান্ত। শেষপর্যন্ত খুশির জন্যই সাহেবের কাছে তাঁর মান থাকল। হ্যাটটি বেশ। চকচকে ভাবটা অটুট রয়েছে। অন্যের হাতফেরতা জিনিস বলে মনেই হয় না। সাহেবের কাছে নতুন বলেই চালিয়ে দেওয়া যাবে। দূর থেকে ষণ্ডেশ্বরের মন্দিরের ঘণ্টাধ্বনি ভেসে আসছে। হাঁটতে হাঁটতে চুঁচড়োর জাহাজঘাটায় এসে পৌঁছলেন কৃষ্ণকান্ত।
আলু, পেঁয়াজ, আদা, রসুনের বড় বড় বোঁচকা, চাল-ডাল-গম-লবণ-চিনির বড় বড় বস্তা, উলুপ দেওয়া হাঁড়িভর্তি নুনে জারানো ভেড়া, শুয়োরের মাংস, সরষের তেলের হাড়ি, গুড়ের নাগড়ি, বড় বড় খাঁচায় বন্দি মুরগি, ডাক-পাখি, ঘুঘু, টারকি ও আরও নানারকম আনাজ ঢিবি করে রাখা আছে জাহাজঘাটার বড় একটা চাতালের উপর। ঠেলাগাড়িতে চাপিয়ে সেসব নিয়ে জাহাজের খোলে ভরছে কুলিমজুরের দল। জিনিসপত্র তালিকার সঙ্গে মিলিয়ে মিলিয়ে ঠেলাগাড়িগুলো বোঝাই করাচ্ছে কয়েকজন সর্দার। ঘুরে ঘুরে কাজের তদারক করছে নীলকণ্ঠ। মাঝে মাঝে হাঁক ছাড়ছে, ‘ওরে তাড়াতাড়ি হাত চালা সব।’
‘জাহাজ ছাড়বে কবে?’ প্রশ্ন করলেন কৃষ্ণকান্ত।
অচেনা কৃষ্ণকান্তকে ইয়াদদস্ত করে নীলকণ্ঠ বলে, ‘কাল সকালে।’
কৃষ্ণকান্ত শুধোন, ‘পাড়ি দেবে কোথায়?’
‘সেসব মালিক জানে।’
‘লোকজনের উপর যেমন তম্বি করছ, তাতে তো তুমি মালিকের খাসলোক বলেই মালুম হচ্ছে। তুমি জানো না?’
এ কথার জবাব দেয় না নীলকণ্ঠ। কেমন যেন সন্দেহ হয় তার। কে এই উটকো লোকটা? গায়ে পড়ে কথা কইছে, নবাবের গুপ্তচর নয় তো? জাহাজের খোঁজে এর এত কী প্রয়োজন?
কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘মেলা খাবারদাবার ঠাসছ দেখছি জাহাজের খোলে? অনেকদূর পাড়ি দেবে বুঝি জাহাজ?’
‘এসব জেনে আপনার কী হবে?’
‘দরকার আছে বলেই তো শুধোচ্ছি। তোমার মালিকের সঙ্গে একবার দেখা করা যায়?’
‘বেশ তো চলুন।’
কৃষ্ণকান্ত জাহাজের ডেকের উপর আসতেই নীলকণ্ঠর চোখের ইশারায় দুজন পাইক এগিয়ে এসে বল্লম ঠেকায় কৃষ্ণকান্তর বুকে। আরেকজন এগিয়ে এসে নিমেষের মধ্যে হাত থেকে হ্যাটটা কেড়ে নিয়ে পিছমোড়া করে তাঁর দুহাত বেঁধে ফেলে। কৃষ্ণকান্তকে টেনে হিঁচড়ে তারা জাহাজের ভিতরে নিয়ে যায়। খুব দ্রুত ঘটে যায় গোটা ঘটনাটা।
জাহাজে নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন নবকৃষ্ণ। জাহাজে মাল বোঝাই করাতে গিয়ে সকাল থেকে বড় ধকল গিয়েছে। নীলকণ্ঠর হাতে কাজের দায়িত্ব দিয়ে একটু জিরিয়ে নিতে এসেছেন। এ কাজে নীলকণ্ঠকে সঙ্গে এনে বেশ সুবিধা হয়েছে নবকৃষ্ণর। ছেলেটি বেশ পরিশ্রমী। কাজ বোঝে। ভরসা করে দায়িত্ব দেওয়া যায়।
হঠাৎ গোলমালের শব্দ শুনে শশব্যস্ত হয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন নবকৃষ্ণ। হন্তদন্ত হয়ে নীলকণ্ঠকে তাঁর ঘরের দিকে আসতে দেখে শুধোন, ‘ব্যাপার কী হে কণ্ঠ? গোলযোগ কীসের?’
‘নবাবের গুপ্তচর, ধরে ফেলেছি মুনশিজি।’
‘নবাবের গুপ্তচর? বলছ কী? কোথায়?’
দশাসই চেহারার দুই পাইক বন্দি কৃষ্ণকান্তকে এনে হাজির করে নবকৃষ্ণর সামনে।
অবাক বিস্ময়ে কৃষ্ণকান্তর দিকে চেয়ে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘এ কি? কান্ত!’
ততোধিক আশ্চর্য হয়ে কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘নবমুনশি তুমি? তুমি এই জাহাজের কর্তা?’
‘ওর হাতের বাঁধন খুলে দাও নীলকণ্ঠ। তোমরা এখন এসো। এ আমার বিশেষ পরিচিত।’
বাঁধনমুক্ত হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা হ্যাটটি কুড়িয়ে নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘তোমার লোকেরা প্রায় আধমরা করে ছেড়েছে আমায়।’
‘তুমি এখানে? সাহেবদের মতো হ্যাট ধরেছ কবে থেকে?’
‘হ্যাট আমার নয়, সাহেবের।’
‘সাহেব মানে? কোন সাহেব?’
‘তোমার ছাত্র। ওয়ারেন হেস্টিংস।’
ভয়ানক চমকে ওঠেন নবকৃষ্ণ। ‘অ্যা? বলছ কী? কোথায় তিনি?’
‘বজরায়। এখান থেকে আধমাইল দূরে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে আমাদের বজরা। অনেক কষ্টে সাহেবকে নিয়ে কাশিমবাজার থেকে পালিয়ে এসেছি।’
‘বাপরে! আমি তো ভেবেছিলাম হেস্টিংস সাহেব বোধহয় কোতলই হয়ে গেছেন।’
‘ধরা পড়লে তাই হত। সাহেবের সঙ্গে আমিও মরতাম। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে সাহেবকে লুকিয়ে রেখেছিলাম আমার গৃহে। কয়েক’দিন আগে রাতের অন্ধকারে সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে বজরায় চড়ে পালিয়ে এসেছি। আজই সকালে পৌঁছেছি এখানে।’
‘হেস্টিংস সাহেবকে নিয়ে যাবে কোথায়?’ প্রশ্ন করেন নবকৃষ্ণ।
কৃষ্ণকান্ত বলেন, ‘শুনেছি, ইংরেজরা কলকাতা থেকে পালিয়ে গিয়ে নাকি ফলতায় আশ্রয় নিয়েছে। সাহেবকে সেখানে পৌঁছে দেওয়ার কথা। সুতানুটিতে বেজায় খানাতল্লাশি হচ্ছে বলে খবর পেলাম। আর এগোনোর সাহস হচ্ছে না। কিন্তু তুমি এখানে নবমুনশি? জাহাজ নিয়ে চলেছ কোথায়? চাকরি খুইয়ে ব্যবসা ধরেছ বুঝি?’
মৃদু হেসে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘ব্যাবসা? তা একপ্রকার ঠিকই বলেছ। ব্যবসাই বটে। ইংরেজরা বড় কষ্টে আছে ফলতায়। খাবারদাবারের অভাব। ফলতায় খাদ্যসামগ্রী নিয়ে যেতে হবে।’
কথাটা শুনে খুশিতে উচ্ছ্বসিত হয়ে কৃষ্ণকান্ত বলে ওঠেন, ‘জয় রাধামাধব! জয় গোবিন্দ! তুমি যাচ্ছ ফলতায়? তাহলে তো সাহেবের একটা হিল্লে হয়েই গেল।’
‘এ গোবিন্দেরই ইচ্ছে। তুমি নিশ্চিন্তে কাশিমবাজারে ফিরে যেতে পার কান্ত। হেস্টিংস সাহেবকে আমি নিরাপদে ফলতায় পৌঁছে দেব।
