৩৯
ক্লাইভ যা চেয়েছিলেন তাই পেয়ে গেলেন। যে যুদ্ধে নিশ্চিত পরাজয়ের সম্ভাবনা সেই যুদ্ধ থেকে রেহাই। সমঝোতা ইংরেজদের শর্তে। একেবারে পড়ে পাওয়া ষোলোআনা।
কিলপ্যাট্রিক, আয়ারকুট, স্ক্র্যাফটন, ওয়ালশ, পাই, বার্কার—এরা সবাই বুঝেছিলেন সিচুয়েশন ইস ভেরি টাফ। এদের সবার মনে ভয় ধরিয়েছিল নবাবের ফৌজের বিশাল আকৃতি। শঙ্কায় বুক কাঁপছিল সকলের। ‘লেট আস অ্যাটাক নবাবস ক্যাম্প রাইট নাউ’—মাঝরাতে হঠাৎই কর্নেলের এই হুকুম শুনে তাঁর মেজর ও ক্যাপ্টেনরা চমকে উঠেছিলেন। এদের মনে হয়েছিল, মাত্রাতিরিক্ত ঝুঁকি নিচ্ছেন কর্নেল ক্লাইভ। যেচে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছেন আগুনে।
কিন্তু কুয়াশাবৃত ভোরের ওই অভিযান যে পুরো পরিস্থিতিতে এভাবে ইংরেজদের অনুকূলে ঘুরিয়ে দেবে তা কেউই কল্পনা করতে পারেননি। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ঝটিকা আক্রমণে নবাব ও তাঁর গোটা বাহিনীকে ভয় পাইয়ে বাজিমাত করলেন কর্নেল ক্লাইভ। অসামান্য কৌশল। মেজর ও ক্যাপ্টেনরা তাঁদের কর্নেলের সামরিক প্রতিভা ও উপস্থিত বুদ্ধি দেখে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন।
৯ ফেব্রুয়ারি, ১৭৫৭। সাক্ষরিত হল আলিনগরের সন্ধি। নবাবের হয়ে আহাদনামায় স্বাক্ষর করলেন, মিরজাফর ও রায়দুর্লভ।
সমঝোতার মূল শর্তগুলো ছিল মোটামুটি এইরকম—ফারুখসিয়ারের ফরমান অনুযায়ী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় ব্যবসা বাণিজ্য করতে পারবে। কলকাতা সংলগ্ন আটত্রিশটি গ্রাম কিনতে পারবে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তারা নিজেদের ইচ্ছে মতো দুর্গ সংস্কার করতে পারবে। টাঁকশাল বানিয়ে ছাপাতে পারবে মুদ্রা। এই মুদ্রায় বাটা লাগবে না। কোম্পানির যে সমস্ত কুঠি নবাব দখল করেছিলেন, সেগুলো তিনি ছেড়ে দেবেন। এছাড়াও ১৭৫৬ সালের কলকাতার যুদ্ধে শহরের যে ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল, তার ক্ষতিপূরণ দেবেন নবাব।…আর কী চাই?
সন্ধির শর্তগুলো নিয়ে দুপক্ষে দরকষাকষি চলেছিল দুতিনদিন ধরে। নবাবের সঙ্গে রণজিৎ রায় ও উমিচাঁদের মাধ্যমে কথা চালাচালি করছিলেন ক্লাইভ। অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের মনে হয়েছিল, দ্য হোল প্রসেস ইস অ্যা হোক্স। ধোঁকা দিচ্ছেন নবাব। সমঝোতার নামে ড্রামাবাজি করছেন। আসলে নিজের এনফোর্সমেন্ট আরও বাড়িয়ে নেওয়ার জন্য সময় কিনছেন তিনি। ক’দিন পরেই ইংরেজদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়বেন।
এ আশঙ্কা যে ক্লাইভের মনে একেবারে উঁকি দেয়নি তা নয়। নবাবের গড়িমসি ভাব গভীর চিন্তায় ফেলেছিল তাঁকেও। ধন্দে পড়েছিলেন তিনি—শেষ পর্যন্ত সমঝোতা করবেন তো নবাব? নাকি অ্যাডমিরালের আশঙ্কাই সত্যি বলে প্রমাণিত হবে?
পেত্রস আরাটুন ও উমিচাঁদের মারফত নবাব শিবিরের যে সমস্ত খবরাখবর ক্লাইভ নিয়মিত পাচ্ছিলেন, তাতে তাঁর মনে হয়েছিল, নবাবের অধিকাংশ সেনাপতি সমঝোতার পক্ষে। ভয় পেয়েছেন নবাব নিজেও। শুধু মোহনলাল চাইছেন যুদ্ধ। তাই দোলাচলে রয়েছেন নবাব।
দেখতে দেখতে হালসিবাগান অভিযানের পর তিন দিন পেরিয়ে গেল।
৯ ফেব্রুয়ারি। সকালে ক্লাইভ খবর পেলেন এখনও চুক্তিপত্রে সাক্ষরের সম্মতি দেননি নবাব। বেশ হতাশ হয়ে পড়লেন তিনি।
এদিকে মাদ্রাজ থেকে এসেছে গভর্নর পিগট সাহেবের চিঠি। এ চিঠির কথা ক্লাইভ কাউকে জানাননি। পিগট সাহেব যা লিখেছেন, তা বেশ উদ্বেগজনক। ইংরেজদের সঙ্গে ফরাসিদের যুদ্ধ বেঁধেছে ইউরোপে। মাদ্রাজ থেকে ফরাসি জেনারেল বুসি জাহাজ নিয়ে বাংলায় আসতে পারেন। চন্দননগর হয়ে একথা নিশ্চয়ই নবাবের কানে গিয়েছে। নবাব কি সমঝোতার কথা বলে ইংরেজদের ভুলিয়ে রেখে জেনারেল বুসির জন্য অপেক্ষা করছেন? ফরাসিরা নবাবের পক্ষে যোগ দিলে চরম সর্বনাশ হবে ইংরেজদের।
দুপুরের দিকে ইজিচেয়ারে শুয়ে এইসব নানা আশঙ্কার কথা ভাবতে ভাবতে ক্লাইভের তন্দ্রা এসে গিয়েছিল। একটা অদ্ভুত শব্দ শুনে ধড়ফড় করে জেগে উঠলেন তিনি। আঁতকে উঠলেন। সর্বনাশ! এ যে হাতির ডাকের আওয়াজ! হাতি এল কোত্থেকে? নবাবের ফৌজ তবে কি বরানগরের এই ক্যাম্পের উপর হামলা করল?
ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসে স্তম্ভিত হয়ে গেলেন ক্লাইভ। তাঁর ক্যাম্পের বাইরে দাঁড়িয়ে আছে মস্ত একটা হাতি। আকৃতি পাহাড়ের মতো। হাতির কপালে রং দিয়ে সুন্দর নকশা আঁকা। পিঠের উপর বসে আছে মাহুত। শুঁড় উচিয়ে মাথা দোলাচ্ছে হাতিটা আর ডাক ছাড়ছে থেকে থেকে। হাতির দুপাশে দাঁড়িয়ে আছেন উমিচাঁদ ও রণজিৎ রায়। হাতির পিছনে একদল গোলাম-দাখিলা, পালকি, বেহারা। ব্যাপারটা কী বুঝে উঠতে পারলেন না ক্লাইভ।
কর্নেলের হতচকিত হওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন উমিচাঁদ ও রণজিৎ রায় দুজনেই। আঙুল তুলে ভিকট্রি চিহ্ন দেখিয়ে রণজিৎ রায় বললেন, ‘আহাদনামা সই হয়েছে।’
কথাটা শুনেই ক্লাইভের মনে খুশির বান ডাকল। নিজের প্রতিক্রিয়াকে সংযত করে মুচকি হেসে ক্লাইভ বললেন, ‘ভেরি গুড। উই আর অলওয়েজ ইন ফেভার অফ পিস, সেটা খানিকটা দেরিতে হলেও বুঝেছেন নবাব। কিন্তু হাতি কীসের জন্য?’
উমিচাদঁ বললেন, ‘আপনার জন্য ভেট। নবাব পাঠিয়েছেন। হিন্দুস্থানে দোস্তির শুরুয়াতের এই হল দস্তুর।’
রণজিৎ রায় যোগ করলেন, ‘হাতির নাম রুস্তম। পাকড়াও করা হয়েছিল রংপুরের জঙ্গলমহল থেকে। সাংঘাতিক জঙ্গি হাতি ছিল রুস্তম। পোষ মানাতে বহুত পরেশান হয়েছে। এখন একেবারে শান্ত।’
এগিয়ে গিয়ে হাতির শুঁড়ে হাত বোলালেন ক্লাইভ। বললেন, ‘ভেরি নাইস গিফট। প্লিস কনভে মাই থ্যাঙ্কস টু নবাব।’
রণজিৎ রায়ের ইশারায় পিছন থেকে এগিয়ে এল দুজন দাখিলা। তাদের হাতে ধরা রুপোর বড় একটা রেকাবির উপর রাখা রয়েছে বাহারি উষ্ণীষ ও মসলিনের রোব।
‘এসব আবার কী?’
‘আপনাকে খেলাত দিয়ে সম্মান জানিয়েছেন নবাব।’ এই বলে কর্নেলের মাথায় উষ্ণীষ পরিয়ে দিলেন রণজিৎ রায়। গায়ে জড়িয়ে দিলেন রোব। ক্লাইভের পরনে ছিল হাঁটু অবধি লম্বা কোট ও ব্রিচেস। পা পর্যন্ত লম্বা জরির সূক্ষ্ম কাজ করা আবরোয়ান মসলিনের রোবে ঢাকা পড়ে গেল সেসব। তরন্দাম মসলিন দিয়ে তৈরি উষ্ণীষের গায়ে সুতো দিয়ে বসানো রয়েছে হিরে ও মণিমুক্তো।
ক্লাইভ হালকা মেজাজে মুখে হাসি এনে বললেন, ‘অ্যাম আই লুকিং লাইক অ্যা ক্লাউন?’
উমিচাঁদ হেসে বললেন, ‘নো স্যার! আপনাকে নবাব-বাদশা বলেই মালুম হচ্ছে।’
রণজিৎ রায় একটা পাকানো কাগজ কর্নেলের হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘এই হল আলিনগরের আহাদনামা। নবাবের নির্দেশে স্বাক্ষর করেছেন মিরজাফর ও রায়দুর্লভ।’
কাগজটা খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলেন ক্লাইভ। ইংরেজদের পাঠানো সর্বশেষ ড্রাফটেরই নীচে রয়েছে রায়দুর্লভ ও মিরজাফরের সিলমোহর ও স্বাক্ষর। কোম্পানি যা দাবি করেছিল, তার সবই মঞ্জুর করেছেন নবাব। খুশিতে ক্লাইভের মুখটা ঝলমল করে উঠল।
হঠাৎ শাঁখের আওয়াজ শুনে ঘুরে তাকালেন ক্লাইভ।
এগিয়ে এলেন নবকৃষ্ণ। তাঁর হাতে মস্ত একটা শাঁখ।
নবকৃষ্ণ মুচকি হেসে ক্লাইভের উদ্দেশে বললেন, ‘আমাদের শাস্ত্রে বলে শঙ্খধ্বনি শুভ। আপনার ও নবাবের দোস্তি অক্ষয় হোক হুজুর।’
‘আপনার সাবিৎ জঙ্গ নাম সার্থক। ভোর রাতে অ্যায়সা ঝটকা দিলেন যে নবাব ও তাবড় তাবড় সেনাপতিরা ভয়ে কুপোকাত।’—এই বলে লঘু মেজাজে হেসে উঠলেন রণজিৎ রায়।
সে হাসিতে যোগ দিলেন উমিচাঁদও।
মাথার উপর থেকে মস্ত চাপ নেমে যাওয়ায় ক্লাইভের মনটাও হালকা হয়ে উঠেছে। এক ছেলেমানুষি বুদ্ধি চেপে বসল তাঁর মাথায়। নবকৃষ্ণর হাত থেকে শাঁখটা নিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘মুনশি ক্যান আই ট্রাই টু প্লে দিস মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট?’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘জরুর হুজুর! শাঁখ বাজিয়ে কোম্পানির সঙ্গে নবাবের দোস্তির শুভ শুরুয়াত ঘোষণা করুন। জয় গোবিন্দ।’
শাঁখটা হাতে নিয়ে অনেক কসরত করলেন নবাব। গাল ফুলিয়ে ফুঁ দিলেন অনেকবার। একটুও শব্দ বেরোল না। নিজের এই অক্ষমতায় হেসে উঠে ক্লাইভ বললেন, ‘ইট ইস নট সো ইজি।’
উমিচাঁদ ঠাট্টার মেজাজে শুধোলেন, ‘নবাবের সঙ্গে কোম্পানির দোস্তি কি নাজুক হল?’
ক্লাইভ মুচকি হেসে বললেন, ‘দিস ইজ অ্যা মিলিয়ন ডলার কোয়েশ্চেন।’
তারাগুলো ঝকঝক করছে আকাশের গায়ে। যেন অসংখ্য হিরের কুচি থেকে ঠিকরে বেরোচ্ছে আলো। বরানগর ক্যাম্পের লনে খোলা আকাশের নীচে ডেক চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছেন ক্লাইভ। সামনে আগুন জ্বলছে। আগুনকে ঘিরে বৃত্তাকারে বসে আছেন, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, হলওয়েল, ড্রেক, কিলপ্যাট্রিক, ওয়াটস, ওয়ালশ ও আয়ারকুট। প্রত্যেকের কুরসির সামনে রয়েছে চৌপাই। তার উপরে রুপোর রেকাবিতে রাখা রয়েছে ভেড়ার মাংসের রোস্ট, ক্লারেটের ডিকান্টার ও বেলজিয়ান কাট গ্লাসের পানপাত্র।
গতকাল ক্লাইভের হাতে এসেছে আলিনগরের আহাদনামা। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে সেই বিষয়ে জরুরি মিটিং ডেকেছেন ক্লাইভ।
হলওয়েল গোমড়া মুখে বললেন, ‘এই ট্রিটি সাইন করে কী লাভ হল আমাদের?’
পানপাত্র হাতে তুলে নিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘লাভ হয়নি বলছেন?’
‘আপনি নিজেই বলুন না—ব্ল্যাকহোল ট্রাজেডির কমপেনসেশনের কথা কোথায় ট্রিটিতে?’
‘কোম্পানি যা পেল সেটা আপনার কম মনে হচ্ছে?’ প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।
ড্রেক বললেন, ‘ট্রিটি মিনস, উই বোড ডাউন আওয়ার হেড ইন ফ্রন্ট অফ নবাব।’
অবাক চোখে ড্রেকের দিকে তাকালেন কিলপ্যাট্রিক। ভাবলেন, এই ড্রেক সাহেব তো অদ্ভুত লোক। দুদিন আগেও নবাবের ভয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন। হঠাৎ হালসিবাগান আক্রমণ করার জন্য কর্নেলের কড়া সমালোচনা করেছিলেন। এখন যুদ্ধ হল না বলে আফশোস করছেন? এর একমাত্র কাজ কি কর্নেলের বিরোধিতা করা?
মুচকি হেসে মাংসের একটা টুকরো মুখে ফেলে ক্লাইভ বললেন, ‘এতদিন তো এভাবেই চলছিল আপনাদের। কোম্পানির পলিসিও তো তাই ছিল। বো ডাউন অ্যান্ড এক্সপ্যান্ড বিজনেস।’
ড্রেক বললেন, ‘নবাব আউস্টেড আস ফ্রম ক্যালকাটা। তার রিভেঞ্জ আমরা নিতে পারলাম কোথায়? ব্ল্যাক হোল ট্রাজেডি গোটা ইংলিশ নেশনের হিউমিলিয়েশন। তার প্রতিকার কোথায়?’
কাট গ্লাসের পানপাত্রে চুমুক দিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘কোম্পানি ক্যান রিসিউম বিজনেস। ক্যান সেট আপ মিন্ট। ক্যান স্ট্রেনদেন ফোর্ট উইলিয়াম। এত সবের পরেও আপনি খুশি নন?’
‘কিন্তু রিভেঞ্জ কোথায়?’
ক্লাইভ গম্ভীর গলায় জবাব দিলেন, ‘উইদাউট মেজর ব্লাডশেড কোম্পানি যা পেল আপাতত সেটা নিয়েই খুশি থাকুন। রিভেঞ্জ সময়মতো নেওয়া যাবে।’
বড় একটুকরো মাংস কাঁটা চামচে গেঁথে ওয়াটসন বললেন, ‘রিভেঞ্জ আমরা এখনও নিতে পারি। শুনতে পাচ্ছি দিন দুয়েকের মধ্যেই নবাব তাঁর ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশে রওনা দেবেন। সাডেনলি পিছন থেকে নবাবকে অ্যাটাক করা যায়।’
ড্রেক উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘দিস ইস অ্যা গুড প্রোপোসাল।’
একটা জ্বলন্ত কাঠি দিয়ে পাইপে আগুন ধরিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘আমার মনে হয় নবাবকে নিয়ে পরে ভাবনা চিন্তা করা যাবে। আপাতত জেনারেল বুসিকে নিয়ে ভাবা দরকার।’
ওয়াটসন প্রশ্ন করলেন, ‘ফ্রেঞ্চ জেনারেল বুসি? হাউ হি কামস ইন দিস সিন?’
পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘হি ইস ভেরি মাচ দেয়ার ইন দিস সিন। নবাবকে নিয়ে ব্যস্ত থাকায় একটা কথা আমি আপনাদের জানাইনি, মাদ্রাজ থেকে একটা চিঠি পেয়েছি আমি। ইউরোপে ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে আমাদের লড়াই বেধে গিয়েছে। জেনারেল বুসি ফ্লিট নিয়ে বেঙ্গলে আসতে পারেন।’
উপস্থিত সকলেই চমকে উঠলেন এ কথা শুনে।
হলওয়েল বললেন, ‘চন্দননগরের ফ্রেঞ্চরা তো তাহলে নবাবের সঙ্গে টাই আপ করতে পারে।’
ক্লাইভ বললেন, ‘সে ভয় ছিল। এখন নেই। কারণ আলিনগরের ট্রিটি। এই জন্যই আমি সমঝোতার জন্য এত মরিয়া হয়ে উঠেছিলাম।’
ডিকান্টার টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে ওয়াটসন বললেন, ‘নবাব যদি ট্রিটি ডিসওবে করেন?’
‘করবেন না।’
‘কী করে জোর দিয়ে বলছেন?’ প্রশ্ন করলেন ওয়াটসন।
গভীর প্রত্যয়ের সঙ্গে ক্লাইভ বললেন, ‘নবাবের জেনারেলরা এমন কাজ করতে দেবেন না। ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নবাব যদি আমাদের খতম করার প্ল্যান করেন আর সে কাজে তিনি যদি সাকসেসফুল হন, তাহলে বেঙ্গলে আনচ্যালেঞ্জড হয়ে উঠবেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। নবাবের বেশির ভাগ জেনারেলই এটা চান না।’
হলওয়েল বললেন, ‘বাট ইট ইস অ্যা স্পেকুলেশন।’
‘স্পেকুলেশন হলেও এটাই সত্যি।’
ড্রেক বললেন, ‘আমাদের ইমিডিয়েটলি চন্দননগর অ্যাটাক করা উচিত।’
ক্লাইভ মাথা নেড়ে বললেন, ‘আমারও তাই মত। খুব দ্রুত ফ্রেঞ্চ পাওয়ারকে ডেস্ট্রয় করে দিতে পারলে নবাবের সঙ্গে তাদের হাত মেলানোর কোনও পসিবিলিটিই আর থাকবে না।’
ওয়াটসন বললেন, ‘চন্দননগর অ্যাটাক করতে হলে তো নবাবের কনসেন্ট দরকার।’
‘রাইট। সেটা পেতে বোধহয় খুব একটা অসুবিধা হবে না। ট্রিটিতে একটা ক্লজ আছে। আমাদের যারা ফ্রেন্ড, তারা নবাবেরও ফ্রেন্ড। আর আমাদের যারা এনিমি, তারা নবাবেরও এনিমি। ফ্রেঞ্চদের সঙ্গে আমাদের লড়াই বেধেছে। ফ্রেঞ্চরা আমাদের এনিমি। কাজেই নবাবেরও এনিমি।’
ক্লাইভের যুক্তি শুনে ওয়াটসন মাথা নেড়ে বললেন, ‘উঁহু, দিস ইজ নট এনাফ। সিরাজদ্দৌলা সুবা বাংলার নবাব। তাঁর এলাকায় কোথাও হামলা করতে গেলে তাঁর ডাইরেক্ট এনডোর্সমেন্ট দরকার।’
‘সেটা ঠিকই। ট্রিটির ক্লজ কোট করে চন্দননগরে হামলার অনুমতি চেয়ে আমরা চিঠি দিতে পারি নবাবকে। তবে এখনই নয়। নবাব আগে কলকাতা ছেড়ে মুর্শিদাবাদে পৌঁছন, তারপরে না হয় চিঠি লেখা যাবে।’
ক্লাইভের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাশ হয়ে গেল মিটিঙে।
পরের দিন ঘুম থেকে উঠেই ক্লাইভ শুনলেন উমিচাঁদ এসে অপেক্ষা করছেন তাঁর জন্য। চিন্তায় পড়ে গেলেন ক্লাইভ। খুব গুরুতর কোনও বিষয় না থাকলে এই সাতসকালে বরানগরের ক্যাম্পে উমিচাঁদের হানা দেওয়ার কথা নয়। যাই হোক দ্রুত ফ্রেশ হয়ে উমিচাঁদকে নিজের অফিস ঘরে ডেকে নিলেন তিনি।
উমিচাঁদ বললেন, ‘গুড মর্নিং কর্নেল সাহেব।’
‘গুড মর্নিং। বলুন কী খবর আছে?’
‘নবাব আহাদনামার সব শর্ত কড়া ভাবে মানতে চান।’
‘ইয়ে তো আচ্ছা বাত।’
উমিচাঁদ টেবিলের দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে বললেন, ‘নবাব চান মুর্শিদাবাদ দরবারে এখন থেকে আপনাদের একজন প্রতিনিধি থাকবেন। আহাদনামার সব শর্ত ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না তিনি দেখভালো করবেন।’
‘ইট ইস অ্যা গুড প্রোপোসাল। বাট নবাবের দিক থেকেও একজন ডেডিকেটেড রিপ্রেসেন্টেটিভ থাকা উচিত।’বললেন ক্লাইভ।
‘আমি থাকব। নবাবের খায়েশ—আমাকে মুর্শিদাবাদে যেতে হবে।’
‘ওয়ান্ডারফুল। আপনি তো আমাদেরই লোক আছেন।’ এই বলে হেসে ফেললেন ক্লাইভ।
‘সামলে কথা বলুন হুজুর। এ বাত ফাঁস হলে আমার গর্দান যাবে। আমি চিরকালই আপনাদের গোলাম। আপনারা তকলিফ দিয়েছিলেন আমায়। নবাবের ধারণা আপনাদের উপর আমার বহুত গুসসা। তাই হালে তিনি খুব বিশ্বাস করেন আমায়।’ এই বলে এক চোখ টিপে মুচকি হাসলেন উমিচাঁদ।
কৌতুকের ছলে ক্লাইভ বললেন, ‘আপনি একটা ডেঞ্জারাস লোক।’
‘বলতে চান ভেরি ক্লেভার? তাই তো? ক্লেভার না হলে কারবার চলে? কোম্পানির ব্যবসার ফের শুরুয়াত হতে চলেছে সুবা বাংলায়। আপনাদের সঙ্গে সওদা করেই আমার রুটিরুজি। আমি আপনাদের উপর গুসসা করে বসে থাকলে তো আমারই লোকসান। তাই নয় কি?’
‘কফি চলে আপনার?’
‘জরুর। আজ ঠান্ডাটাও মস্ত আছে।’
একজন আর্দালিকে ডেকে কফি দিতে বললেন ক্লাইভ।
উমিচাঁদ বললেন, ‘এবারে কাজের কথায় আসি। নবাব একটা চিঠি দিয়েছেন আপনাকে। নবাব চান, কোম্পানির তরফ থেকে মুর্শিদাবাদ দরবারে প্রতিনিধি হিসেবে থাকুন ওয়াটস সাহেব। অনেক’দিন তিনি কাশিমবাজারে ছিলেন। কোর্ট ল্যাঙ্গোয়েজ ভালোই বোঝেন। কাল রওনা দেবেন নবাব। তাঁর খায়েশ, কালই যেন ওয়াটস সাহেব ওনার সঙ্গে মুর্শিদাবাদ যাত্রা করেন।’
মুচকি হেসে ক্লাইভ বললেন, ‘মঞ্জুর।’
উমিচাঁদ চলে যাওয়ার পর উইলিয়াম ওয়াটসের উদ্দেশে দ্রুত একটা নোট লিখলেন ক্লাইভ। সেটা নিয়ে ঘোড়সওয়ার ছুটল কলকাতায়।
সকালের রোদ গায়ে মেখে খুশ মেজাজে টেন্টের সামনের লনে পায়চারি করতে লাগলেন ক্লাইভ। নবাবের উদ্দেশে মনে মনে বললেন, ‘থ্যাঙ্কস অ্যা লট নবাব। বহুত সুক্রিয়া। উইলিয়াম ওয়াটসকে দরবারে থাকার সুযোগ করে দিয়ে আমার বিরাট উপকার করলেন আপনি। আপনার দরবারের সব খবর পৌঁছে যাবে আমার কাছে। ওয়াটসের সঙ্গে থাকল ক্লেভার উমিচাঁদ। পরবর্তী গেমপ্ল্যান চক আউট করতে খুব সুবিধা হবে আমার। থ্যাঙ্ক ইউ ওয়ান্স এগেইন। সত্যিই আপনি আমার দোস্ত আছেন।’
কল্পনায় ভাসতে ভাসতে অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলেন ক্লাইভ। গলঘন্টের ঠুংঠাং শব্দ শুনে মুখ ঘোরালেন। অদূরে রাশি রাশি কলাগাছের গুঁড়ি এক মনে সাবাড় করে চলেছে রুস্তম। বড় আগ্রাসী খিদে হাতিটার। রুস্তমের পরিচর্যা ঠিক মতো হচ্ছে কি না তা সরেজমিনে দেখতে তার দিকে এগিয়ে গেলেন ক্লাইভ।
