৩৮
‘আ-ট-শো?’ বিস্ফারিত চোখে প্রশ্ন করলেন সিরাজদ্দৌলা।
মোহনলাল জবাব দিলেন, ‘জি হুজুর। আটশো সেপাই ও লস্করের মওত হয়েছে। জখম হয়েছে করিব পাঁচশো জন।’
সিরাজদ্দৌলার কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল।
মোহনলাল তাঁর হাতে ধরা কাগজটা দেখে বললেন, ‘ঘোড়া বরবাদ হয়েছে পঞ্চাশটা। পাঁচটা বেহেদর, দুটো রাজতুম হাতির হিসেব মিলছে না।’
এবারে বিস্ফোরণ ঘটল গোবিন্দরাম মিত্তিরের বাগানবাড়ির মজলিশ ঘরে। এখানে আজ নবাবের দরবার বসেছে। সিরাজদ্দৌলা গর্জন করে বললেল, ‘এই ছোটা লড়াইয়ে ইতনা গহেরা লোকসান?’
মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন মোহনলাল।
হঠাৎ মিরজাফরকে ইয়াদদস্ত করে কৈফিয়ত চাওয়ার ঢঙে সিরাজ বললেন, ‘দিললাগি করতে এসেছেন আপনারা জঙ্গবাজির ময়দানে? এতকাল নিজামতের নুন খেয়েছেন, এখন নিমকহারামি করছেন?’
সরাসরি গদ্দারির ইলজাম। সিরাজদ্দৌলার চোখের আগুনে দৃষ্টি মিরজাফর ও রায়দুর্লভের উপর ঘোরাফেরা করতে লাগল। ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছেন নবাব। বাঁদি, বান্দা, দাখিলা, আমির, ওমরাহ সবাই ত্রস্ত। থমথম করছে গোটা দরবার। সিরাজের গরম মেজাজের তাপে ঝলসে যাওয়ার আশঙ্কায় সন্ত্রস্ত দুই প্রবীণ সেনাপতি।
গতকালের লড়াইয়ে গদ্দারি তাঁরা করেননি। একথা সত্য। ইংরেজরা যে ওভাবে আক্রমণ হানতে পারে তা ছিল মিরজাফর, রায়দুর্লভ ও অন্য সেনাপতিদের কল্পনারও অতীত।
কর্নেল ক্লাইভের ওই দুঃসাহসিক অভিযান কার্যত ত্রাসের সঞ্চার করেছে নবাবের গোটা বাহিনীর মধ্যে। গতকাল সকালের কথা ভাবলে সেনাপতিদের অনেকেই ভয়ে কেঁপে উঠছেন। এদের অনেকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন সাক্ষাৎ মৃত্যুকে। অল্পের জন্য জানে বেঁচেছেন মিরজাফর। গোলার আঘাতে বাতিদান উলটে আগুন ধরে গিয়েছিল তাঁর তাঁবুতে।
অপমানিত হয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন মিরজাফর ও রায়দুর্লভ। মেজাজ হারিয়ে ফের গর্জন করে উঠলেন নবাব, ‘আপনাদের জুতা মারা উচিত।’
নবাবের অহংবোধে মারাত্মক আঘাত হেনেছেন কর্নেল ক্লাইভ।
নবাব কলকাতা এসেছিলেন খুশ মেজাজে। এবারের লড়াই যে এতটা কঠিন হবে তার আগাম আন্দাজ তিনি পাননি। গতবছরে কলকাতার যুদ্ধটা সিরাজ জিতেছিলেন অনায়াসে। খড়কুটোর মতো উড়ে গিয়েছিল ইংরেজরা। নবাবপক্ষে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল নগন্য। শরিফ মেজাজে মুর্শিদাবাদে ফিরে গিয়ে নবাব ফলাও করে বলেছিলেন, এই টোপিওয়ালা ইংরেজদের শায়েস্তা করতে আমার একপাটি পয়জারই কাফি। ফৌজের কোনও প্রয়োজন নেই।
যাদের সম্বন্ধে নবাবের এমন ধারণা ছিল, তারা মাত্র কয়েক ঘণ্টার লড়াইয়ে নিকেষ করে দিয়েছে নবাবের আটশো সেনা, পঞ্চাশটা ঘোড়া, সাতটা হাতি। গহেরা চোট নিয়ে একেবারে বরবাদ হয়ে গিয়েছে আরও পাঁচশো সেপাই-লস্কর। এটা হজম করতে তকলিফ হচ্ছে সিরাজদ্দৌলার। একথা তিনি বিলক্ষণ বুঝতে পারছেন যে তাঁর বাহিনী কঠিন প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করার অনুপযুক্ত।
ক্ষিপ্ত কণ্ঠে নবাব বললেন, ‘আমি ভরসা করেছিলাম আপনাদের উপর, আপনারা বেইজ্জত করলেন আমাকে। আপনারা নিমকহারাম। বেইমান।’
মিরজাফর ক্ষীণ গলায় জবাব দিলেন, ‘হুজুর—আমি ইমানদার আদমি। নিমকহারামি করতে পারি না। ইয়ে ইলজাম ঝুটা। আমাদের সেপাইরা ঘামাসান লড়াই করেছে।’
‘ফির অ্যায়সা ঝটকা?’
রায়দুর্লভ বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ বহুত খতরনক আদমি।’
‘ইয়ে সহি বাত। সাবিৎ জঙ্গ ক্লাইভ লড়াইয়ের কোনও কানুন মানেন না।’
‘খামোশ!’ চিৎকার করে উঠলেন নবাব। তারপর বললেন, ‘রাতে ভেগে গেল কোম্পানির ইলচি। পাহারায় ইতনা আদমি—ফির কী করে ভাগল?’
রায়দুর্লভ মৃদু কণ্ঠে বললেন, ‘এতে আমাদের কসুর কী আছে হুজুর?’
সিরাজ চোখ বড় বড় করে বললেন, ‘আজিব বাত! কসুর তাহলে কার? আমার?’
মিরজাফর বললেন, ‘পাহারায় মোতায়েন লস্কর নিন্দ গিয়েছিল।’
জ্বলন্ত চোখে মিরজাফরের দিকে চেয়ে সিরাজ বললেন, ‘আপনি তো মির বকশি! এ বাত বলতে শরম হচ্ছে না আপনার? ফৌজিদের কেমন দেখভাল করেন আপনি?’
জবাব খুঁজে না পেয়ে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন মিরজাফর।
রায়দুর্লভ বললেন, ‘আমাদের সেপাইরা তৈয়ার থাকলে ইতনা লোকসান হত না।’
‘কেন লড়াইয়ের জন্য তৈয়ার ছিল না ফৌজ? দেওয়ানজি তো হুঁশিয়ার করেছিলেন আপনাদের। করেননি?’
মিরজাফর বললেন, ‘করেছিলেন।’
‘ফির কিঁউ তৈয়ার ছিল না সেপাই-লস্করের দল?’
মিরজাফর অসহায় গলায় বললেন, ‘রহেম করুন হুজুর। খোদার কসম খেয়ে বলছি আপনাকে বেকায়দায় ফেলার কোনও মতলব ছিল না আমার। এখনও নেই। কর্নেল ক্লাইভ এক ধুরন্ধর আদমি। লড়াইয়ের সহবত মানেন না। রাতের আন্ধেরায় এমন হামলার কথা কভি শুনেছেন আপনি? এমন হাঙ্গামা যে হতে পারে ভাবতেই পারিনি। খুদ আপনি কি আন্দাজ করতে পেরেছিলেন হুজুর?’
এবারে খানিকটা দমে গেলেন নবাব। কী বলবেন, কথা খুঁজে পেলেন না। কর্নেল ক্লাইভের এই দুঃসাহসিক অভিযানে তিনিও বিস্মিত। সমঝোতার কথা বলতে দূত পাঠালেন কর্নেল। তারপরেও রাতদুপুরে হঠাৎ এমন হাড়হিম করা হামলা? এমন হামলার কহানি তামাম দুনিয়ার তুজুগ ঘেঁটেও বড় একটা পাওয়া যাবে না। কর্নেল ক্লাইভের মনের গতির আন্দাজ পাওয়া সত্যিই কঠিন।
রায়দুর্লভ বললেন, ‘হুজুর, ওই বেসহবত হামলার ধাক্কা সামলে নিয়েও কিন্তু কড়া জবাব দিয়েছে আমাদের আমাদের ফৌজ। লড়াই ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন কর্নেল ক্লাইভ। জিত হয়েছে আমাদের। দুটো কামান ফেলে গিয়েছে কোম্পানির পল্টন। আপনি যদি হুকুম করেন, আমরা এখনই হামলা করে ফোর্ট উইলিয়াম কেল্লা মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারি। সবক শেখাতে পারি বেতমিজ টোপিওয়ালাদের।’
দরবারে প্রবেশ করে নবাবকে তসলিম জানিয়ে জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ বললেন, ‘জাঁহাপনা সালামত। শও সাল জিন্দা থাকুন হুজুর।’
‘খাস বাত কী আছে শেঠজি?’ শুধোলেন নবাব।
‘কর্নেল ক্লাইভ একটা চিঠি পাঠিয়েছেন হুজুর।’ এই বলে মুখবন্ধ একটা লেফাফা নবাবের হাতে তুলে দিলেন জগৎশেঠ।
একটা ছুরি দিয়ে নিজেই লেফাফার মুখ ছিড়ে চিঠিটা পড়তে লাগলেন নবাব। তাঁর কপালে দুশ্চিন্তার রেখা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
কর্নেল ক্লাইভ লিখেছেন, ‘…আপনার ছাউনিতে হামলা করে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি ইংরেজরা ইচ্ছে করলে কী করতে পারে। অতএব আমাদের নালায়েক ভাববেন না। এমনটা ভাবলে আপনারই লোকসান। তবে যুদ্ধ আমাদের পেশা নয়। মজবুরিও নয়। আমরা কারবারি লোক। শান্তি চাই। বাংলায় আগুন জ্বালানোর খায়েশ আমাদের নেই। আমাদের দাবিগুলোর বিষয়ে ভেবে দেখবেন। আপনি সমঝদার আদমি। বেওকুফ নন। …’
এই অবধি পড়ে গম্ভীর মুখে চিঠিটা ভাঁজ করে লেফাফার মধ্যে ঢুকিয়ে রাখলেন সিরাজদ্দৌলা। চিঠির বিষয়ে কারও কাছে কিছু ভাঙলেন না।
নবাবের দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মুখটা দেখে খুশি হলেন জগৎশেঠ। মনে মনে কর্নেল ক্লাইভকে সেলাম জানিয়ে বললেন, ‘সাবিৎ জঙ্গ—আপনি সত্যিই কামিল ইনসান। জবরদস্ত ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছেন নবাবের মনে। বহুত বহুত সুক্রিয়া।’
জগৎশেঠের দিকে তাকিয়ে নবাব প্রশ্ন করলেন, ‘আর কোয়ি বাত?’
জগৎশেঠ বললেন, ‘আরেকটা চিঠি আছে হুজুর। মথুরা থেকে এক কাসিদ এ চিঠি পাঠিয়েছে।’
‘মথুরা থেকে?’ ভুরু কুচকে গেল সিরাজদ্দৌলার।
‘জি হুজুর। আহম্মদ শাহ আবদালি মথুরা শহর লুঠপাট করে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছেন। বাংলার দিকে আসতে পারেন।’
কোনও কথা বললেন না নবাব। মসনদ ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দরবার থেকে বেরিয়ে গেলেন।
জগৎশেঠের সঙ্গে চোখাচোখি হল, রায়দুর্লভ ও মিরজাফরের। দুজনের চোখেই ঝিলিক দিচ্ছে খুশি। এঁরা বুঝতে পারছেন নবাব এবারে বেশ ফাঁপরে পড়েছেন।
রায়দুর্লভও মনে মনে বললেন, ‘সলামত থাকুন, ক্লাইভ সাহেব। শও সাল জিন্দা থাকুন। এখন আপনিই আমাদের ভরসা।’
কিছুক্ষণ পরে মোহনলাল ও উমিচাঁদকে একান্তে ডেকে পাঠালেন নবাব। ইদানীং সিরাজদ্দৌলা মনে করেন উমিচাঁদ তাঁর বড় সুহৃদ। মোহনলালের মতোই পরম শুভানুধ্যায়ী।
নবাব প্রশ্ন করলেন, ‘এখন কী করা যায় উমিচাঁদজি?’
উমিচাঁদ হাত কচলে বললেন, ‘হুজুর ইয়ে সচ বাত—কর্নেল ক্লাইভ খতরনক আদমি। এমন বেসহবত লড়াইয়ের কথা আগে তো কখনও শুনিনি। যা হাঙ্গামা বাধিয়েছিল কোম্পানি, তাতে আপনারও বিপদ হতে পারত। জানেন হুজুর, একটা গোলা আমার তাঁবু ফুঁড়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। কোনওরকমে বেঁচে গিয়েছি। বেসহবত, বেতমিজ এই কোম্পানির ফৌজের নাগালের মধ্যে আপনার না থাকাই ভালো। এদের হামলা করার সময়-অসময় নেই।’
‘মতলব?’
‘আপনি এখান থেকে তাঁবু গুটিয়ে নিয়ে পিছিয়ে যান।’
মোহনলালের দিকে তাকালেন নবাব।
মোহনলাল বললেন, ‘আমারও তাই মনে হয় হুজুর। আপনি কিছুটা দূরে থাকুন।’
উমিচাঁদ হেসে বললেন, ‘দেওয়ানজি বুঝদার আদমি।’
‘তবে আমি ফৌজ নিয়ে কলকাতার কেল্লার উপর হামলা করতে চাই হুজুর। টোপিওয়ালাদের বেতমিজির বদলা নিতে চাই। আপনি ইজাজত দিন।’
মোহনলালের এই প্রস্তাব শুনে প্রমাদ গুণলেন উমিচাঁদ। ইংরেজদের সঙ্গে সওদা করে উমিচাঁদ অঢেল টাকার মালিক। সুবা বাংলায় কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ থাকায় তাঁর বিস্তর লোকসান হচ্ছে। কোম্পানির ব্যবসার ফির শুরুয়াত হওয়াটা খুব জরুরি। অনেকটা নরম হয়েছেন নবাব। তাঁর সঙ্গে কোম্পানির গোলমালটা যখন প্রায় মিটে আসার মুখে তখন ফের যুদ্ধের জিগির তুলে মোহনলাল বিষয়টাকে আবার ঘোরাল করে তুলতে চাইছেন। মোহনলালের উপর উমিচাঁদ বিরক্ত হলেন। তবে মুখে কিছু বললেন না। কৌতূহলের সঙ্গে নবাবের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রইলেন।
নবাব বললেন, ‘না মোহনলাল। হামলার জরুরত নেই।’
মোহনলাল মরিয়া হয়ে বললেন, ‘আপনি ভেবে দেখুন হুজুর। পাল্টা হামলায় টোপিওয়ালাদের দুরমুশ না করলে আপনার চরম বেইজ্জতি হবে।’
সিরাজ বললেন, ‘সাবিৎ জঙ্গের তাগদ সম্বন্ধে আমাদের কোনও আন্দাজ নেই। তার উপরে আবদালি হানা দিতে পারেন বাংলায়। এখন ফৌজ নিয়ে মুর্শিদাবাদে ফেরাটা জরুরি। আর আবদালি যদি সত্যিই হামলা করেন, তখন তাঁকে ঠেকাতে কোম্পানির মদত লাগবে। আমি কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা চাই।’
নবাবের এ কথায় খুশি হলেন না মোহনলাল।
উমিচাঁদের ঠোঁটের কোনায় হাসি ফুটল। সমঝোতা মানে সুবা বাংলায় কোম্পানির কারবারের ফির শুরুয়াত—উমিচাঁদের গৃহে মা লক্ষ্মীর সচল হওয়া।
নবাব হুকুম করলেন, ‘তাঁবু গুটিয়ে নিতে বল মোহনলাল।’
উমিচাঁদ বললেন, ‘হুজুর পিছিয়ে আপনি দমদমে চলে যান। ও জায়গাটা নিরাপদ হবে।’
উমিচাঁদ ও মোহনলাল বিদায় নিতেই জগৎশেঠকে ফের তলব করলেন নবাব।
জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে তসলিম করে বললেন, ‘সেলাম হুজুর। সহি সালামত।’
নবাব বললেন, ‘ইংরেজ কোম্পানি তো আপনার দোস্ত আছে শেঠজি।’
হঠাৎ যেন জগৎশেঠ কেমন একটা ঝাঁকুনি খেলেন। নবাবের হঠাৎ এই তলবের মতলব কী? এই যাচ-ইমতেহানি কেন? স্নায়ু টানটান হয়ে উঠল জগৎশেঠের। তবে মুখে হাসি এনে বললেন, ‘এ আবার আমার উপর কী ঝুটমুট ইলজাম লাগাচ্ছেন হুজুর?’
‘ঝুট না সচ?’ জগৎশেঠের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন নবাব।
মনের উত্তেজনা দমন করে সহজ গলায় জগৎশেঠ বললেন, ‘আমি কারবারি হুজুর। কোম্পানির সঙ্গে আমার কারবারির রিশতা। তারা আমার দোস্ত কেন হবে?’
নবাব বললেন, ‘সাবিৎ জঙ্গ পছন্দ করেন আপনাকে। আপনার মাধ্যমে সমঝোতার আলোচনা চান। এই চিঠিতে লিখেছেন।’
নবাবের হাতে ক্লাইভের সেই চিঠি। এ চিঠি নবাবের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য লেফাফায় মুড়ে জগৎশেঠের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন পেত্রস আরাটুন।
‘এতে আমার কসুর হল কোথায় হুজুর?’
সিরাজদ্দৌলা মুচকি হেসে বললেন, ‘আপনার উপর কোনও ইলজাম লাগাচ্ছি না আমি। কোম্পানির সঙ্গে আপনার জান-পহচান আছে। আপনি ক্লাইভ সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।’
‘মতলব?’
‘আমি সমঝোতা চাই।’
পোড় খাওয়া কারবারি জগৎশেঠ বুঝলেন, ভয় পেয়েছেন নবাব। তবুও নবাবকে একবার ভালো করে বাজিয়ে দেখার জন্য কপট রাগ দেখিয়ে তিনি বললেন, ‘এমন বেসহবত হামলার পরেও সমঝোতা? বেতমিজ ওই টোপিওয়ালাদের উপর হামলা করুন হুজুর। আপনার বেইজ্জতি—আমাদের সবার বেইজ্জতি।’
‘না শেঠজি। আমি সমঝোতা চাই। আপনি চিঠি লিখুন ক্লাইভ সাহেবকে। আজই। কোম্পানির কী কী দাবি আছে, তা তারা লিখে জানাক।’
এই বলে আর দাঁড়ালেন না সিরাজদ্দৌলা। অন্দরমহলে চলে গেলেন।
জগৎশেঠের মনটা আনন্দে উড়তে লাগল। কুয়াশামাখা ভোরে ঝটিকা আক্রমণ করে কামাল করে দিয়েছেন কর্নেল ক্লাইভ। ভয় পেয়েছেন নবাব। তাঁবু গুটিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছেন দমদমে। কোম্পানির সঙ্গে সমঝোতা করতে চলেছেন। আলিবর্দির নাতির জমানায় শেঠ পরিবারের বরবাদি আসন্ন ভেবে যে মানসিক যন্ত্রণায় ভুগছিলেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ, তার ইলাজ তিনি যেন হঠাৎ খুঁজে পেলেন। সেই ইলাজের নাম কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ।
অন্দরমহলে ঢুকে মস্ত একটা জানলার পাশে এসে দাঁড়ালেন সিরাজদ্দৌলা। উদাস ভাবে চেয়ে রইলেন উন্মুক্ত নীল আকাশের দিকে। নবাবের মনের সব রং, জলুস একদিনেই কেমন যেন বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে।
ইংরেজদের বাংলা থেকে তাড়ানোর সংকল্প নিয়ে নবাব এসেছিলেন কলকাতায়। ফিরতে হচ্ছে বেইজ্জত হয়ে। মান খুইয়ে। বজবজের কেল্লা, মেটিয়াবুরুজের কেল্লা, শিবপুরের কেল্লা আগেই হাতছাড়া হয়েছে। বেদখল হয়েছে ফোর্ট উইলিয়াম, আলিনগর। হুগলি জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিল কোম্পানির ফৌজ। এত ঢাকঢোল পিটিয়ে বিরাট এক কাফেলাসহ কলকাতা অভিযানে এসে এদের শায়েস্তা করতে পারলেন না সিরাজদ্দৌলা।
থেকে থেকে নবাবের মনটা ভীষণ অস্থির হয়ে উঠছে। ভাবছেন এখনই হুকুম করবেন—তাঁবু গুটিয়ে পিছিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। ডরপোক নয় বাংলার নবাব। চলো জোরদার হামলা করব ফোর্ট উইলিয়ামের উপর। চুরমার করে দেব কোম্পানির দেমাক।
পরক্ষণেই তাঁর মনের পর্দায় ভেসে উঠল ভোরের সেই ছবি। মুহুর্মুহু আছড়ে পড়ছে গোলা। কুয়াশার পর্দা ভেদ করে ছুটে আসা বুলেটে বিদ্ধ হয়ে কাতরাচ্ছে সেপাই-লস্করেরা। নবাবের বাহিনীর কাছে কর্নেল ক্লাইভ এখন এক বিভীষিকা। নবাব বুঝতে পারছেন, মুখে হামলা করার কথা বললেও ভীত হয়ে পড়েছেন তাঁর সেনাপতিরা। তিনি নিজেও কি ভীত নন?
লুৎফা এসে নবাবের পাশে দাঁড়াল।
নবাব বললেন, ‘আমি হেরে গেলাম লুৎফা।’
নরম সুরে লুৎফা বলল, ‘লড়াই হল কোথায়, যে হারজিতের সওয়াল আসবে!’
‘আমি তাঁবু গুটিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছি। সমঝোতা করছি কোম্পানির সঙ্গে। এ তো কোম্পানির কাছে একরকমের শির ঝোঁকানো।’
‘ইয়ে গলত বাত। আপনি নন মেহের, শির ঝুঁকিয়েছে কোম্পানি। লড়াই ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছেন সাবিৎ জঙ্গ। তিনি ভয় পেয়েছেন। তাই সমঝোতা করতে চাইছেন।’
‘না লুৎফা। জিত হল ক্লাইভ সাহেবের। এক বেসহবত হামলায় উনি ভয় ধরিয়ে দিয়েছেন আমার সেনাপতিদের মনে। ভয় পেয়েছে সেপাইরাও। এই ডরপোক বাহিনী নিয়ে লড়াই করা যায় না।’ হতাশায় দীর্ঘশ্বাস ফেললেন সিরাজদ্দৌলা।
সিরাজের বুকে মাথা রেখে লুৎফা বলে, ‘যারা লড়াইয়ের সহবত মানে না তাদের সঙ্গে লড়াই না করাই উচিত। যা হয়েছে তা ভালোই হয়েছে মেহের। চলুন আমরা মুর্শিদাবাদে ফিরে যাই। আপনি তামাম সুবা বাংলার নবাব। একদল কারবারির সঙ্গে ময়দানে লড়াই করা আপনাকে মানায় না।’
নানি বেগম, ‘আম্মিজানও বলেছিলেন একই কথা। নানি বেগম চেয়েছিলেন আমি অন্য কৌশলে ইংরেজদের ঢিট করি। আমি যে কৌশল অত বুঝি না লুৎফা।’
লুৎফা বলল, ‘এখন এসব কথা থাক মেহের। আপনি পরেসান হয়ে পড়েছেন। চলুন বিশ্রাম করবেন।’
দুটো ঘোড়া এসে থামল ইংরেজদের বরানগরের ক্যাম্পে।
ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে এলেন দুই সওয়ারি। একজন পেত্রস আরাটুন। অন্যজন জগৎশেঠের দেওয়ান রণজিৎ রায়। তাঁবুর সামনে দুপুরের রোদ গায়ে মেখে আয়েস করছিলেন কর্নেল ক্লাইভ। হাতে গড়গড়ার নল। অম্বুরি তামাকের গন্ধে চারিদিক আমোদিত।
হাসি মুখে এগিয়ে এলেন পেত্রস আরাটুন।
ফরসির নল সরিয়ে রেখে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘মিঃ আরাটুন। আই অ্যাম এক্সপেক্টিং সাম গুড নিউজ। ইস ইট কারেক্ট?’
‘ইয়েস স্যার।’
‘সঙ্গে কে?’
‘ইনি রণজিৎ রায়। জগৎশেঠের দেওয়ান।’
‘হ্যালো!’ বলে রণজিৎ রায়ের সঙ্গে করমর্দন করলেন ক্লাইভ।
আরাটুন বললেন, ‘আপনারই জিত হল কর্নেল সাহেব। নবাবের জবানে আপনি একজন ডেঞ্জারাস এনিমি। আপনার কাছাকাছি থাকা ঠিক নয়। তাই তাঁবু গুটিয়ে হালসিবাগান থেকে দমদমে চলে যাচ্ছেন নবাব।’
‘রিয়েলি?’ খুশি ক্লাইভের মুখে ঝিলিক দেয়।
‘বিলকুল। অ্যাট ডন নবাবের ক্যাম্প অ্যাটাক—রিয়েলি দ্যাট ওয়াজ অ্যা মাস্টার স্ট্রোক।’
মুচকি হাসি হাসলেন ক্লাইভ।
আরাটুন উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘নবাব আপনাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চান। রণজিৎ রায় নবাবের চিঠি নিয়ে এসেছেন।’
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন ক্লাইভ। হ্যান্ডস অফ গড এবারেও বাঁচিয়ে দিল তাঁকে। বুক থেকে যেন নেমে গেল পাষাণভার। মুখের হাসি চওড়া হল।
