1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ৩৭

৩৭

৫ ফেব্রুয়ারি ১৭৫৭।

সবে ফিকে হতে শুরু করেছে রাতের অন্ধকার। কড়া শীতে জবুথুবু কলকাতা। মারাঠা ডিচের উপর সাঁকো পেরিয়ে সৈন্যসামন্ত নিয়ে ক্লাইভ পৌঁছলেন হালসিবাগানে।

কিন্তু কোথায় নবাবের শিবির? সামনে শুধু ধোঁয়ার আস্তরণ। দুর্ভেদ্য দেওয়াল তুলেছে কুয়াশা। চার-পাঁচ হাত দূরে কী আছে, কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। নিজের ক্যাপ্টেনরা কে কোথায় রয়েছে বুঝতে পারছেন না কর্নেল ক্লাইভ। এরই মধ্যে জোর গলায় তিনি হেঁকে উঠলেন, ‘অ্যাটাক! অ্যাটাক! ডেস্ট্রয় দ্য এনিমি!’

সঙ্গে সঙ্গে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ল ইংরেজ সেনা। তাক করল রাইফেল। এই ব্যাটেলিয়নের নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন আয়ারকুট। তিনি গর্জন করে উঠলেন, ‘ফায়ার!’

গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম!

আগুন ঝলসে উঠল সারি সারি ফ্লিন্টলক রাইফেলের মুখ থেকে। নবাবের শিবির আন্দাজ করে গুলি চালাতে শুরু করল ইংরেজরা। ভোরের কুয়াশায় মিশল বারুদের গন্ধ।

সহসা দূর থেকে শোনা গেল চিৎকার, চেঁচামেচি। এ চিৎকার আতঙ্কের ও ত্রাসের।

নবাবের শিবিরে ঘুমিয়ে থাকা ভোর জেগে উঠল গুলির শব্দে।

ধড়ফড় করে বিছানার ওম ছেড়ে উঠে নবাবের সেনাপতিরা বুঝল কোম্পানির ফৌজ তাদের আক্রমণ করেছে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আসছে এলোপাথাড়ি বুলেট। সকলে অপ্রস্তুত, ত্রস্ত, দিশেহারা। চারিদিকে হুড়োহুড়ি দৌড়োদৌড়ি। চোখের নিমেষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল বেশ কয়েকজন।

এরই মধ্যে সক্রিয় হয়ে উঠল ইংরেজদের ছ’টা ফিল্ডপিস কামান। গোলন্দাজ বাহিনীর নেতৃত্বে ক্যাপ্টেন পাই। মুহুর্মুহু কামানের গর্জনে কেঁপে উঠল হালসিবাগান। বিপক্ষকে প্রত্যাঘাতের সুযোগ দিতে চান না কর্নেল ক্লাইভ। আক্রমণের ঝাঁঝ ক্রমাগত বাড়িয়ে চললেন তিনি।

নিশানা আন্দাজ করে একটানা গোলা বর্ষণ। কোনওটা গিয়ে ধাক্কা খেল উমিচাঁদের হাভেলির গায়ে। কোনওটা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মড়মড় শব্দে গাছের ডাল ভাঙল। কোনওটা আছড়ে পড়ল নবাবের সেনা ছাউনির উপর।

বাতিস্তম্ভ উলটে গিয়ে কয়েকটা তাঁবুতে আগুন ধরে গেল। দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল তাঁবুর কানাত।

কুয়াশার আবরণের জন্য কর্নেলকে দেখতে পাচ্ছেন না তাঁর সেনা ও ক্যাপটেনরা। শুধু আড়াল থেকে শুনতে পাচ্ছেন তাঁর আবেগ ভরা হুঙ্কার, ‘অ্যাটাক! অ্যাটাক! ডেস্ট্রয় দ্য এনিমি।’

সাময়িক বিহ্বলতা দ্রুত কাটিয়ে উঠে পাল্টা আঘাত হানতে শুরু করল নবাবের ফৌজ। এ এক অদ্ভুত যুদ্ধ। দুপাশে দুই পক্ষ। মাঝে কুয়াশার দেওয়াল। কেউ কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। শুধু আন্দাজের উপর নির্ভর করে গোলা ছোড়াছুড়ি চলছে সমানে।

হঠাৎ হতচকিত হয়ে ইংরেজরা দেখল, নবাবের শিবিরের দিক থেকে উড়ে আসছে একের পর এক হাউই। দুমদাম করে ফাটছে চারিদিকে। আহত হল বেশ কয়েকজন ইংরেজ সেনা।

মাটিতে পড়ে কয়েকজন গোরা পল্টনকে কাতরাতে দেখে ক্যাপ্টেন পাইয়ের চোখদুটো হিংস্র শ্বাপদের মতো জ্বলে উঠল। সামান্য ব্যবধানে বসানো রয়েছে দুটো ফিল্ডপিস কামান। গোলন্দাজ বাহিনীকে আরও উত্তেজিত করে তোলার জন্য সমানে এক কামান থেকে আরেক কামানের কাছে ছুটোছুটি করতে করতে তিনিও ক্রমাগত চেঁচাতে লাগলেন, ‘ফায়ার! ফায়ার! ডেস্ট্রয় দ্য এনিমি।’

সহসা ইংরেজদের বারুদ বোঝাই গাড়ির উপর এসে পড়ল একটা হাউই। সঙ্গে সঙ্গে কান ফাটানো শব্দে বিস্ফোরণ। পাশেই ছিলেন ক্যাপ্টেন পাই। নিমেষে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল তাঁর দেহ। বারুদের গাড়ির কাছাকাছি থাকা আরও আটদশজন ইংরেজ সৈন্য প্রাণ হারাল। কুয়াশার সঙ্গে বিস্ফোরণের কালো ধোঁয়া মিশে দুপক্ষের মধ্যেকার অস্বচ্ছ দেওয়ালটাকে আরও জমাট করে তুলল।

এই বিস্ফোরণে ভীত হয়ে পড়ল ইংরেজ বাহিনী। বিশৃঙ্খলা দেখা দিল তাদের মধ্যে। বিস্তর ছুটোছুটি করে সেনাদের সংহত করলেন আয়ারকুট ও কিলপ্যাট্রিক।

এবারে সামনে এগোনোর হুকুম দিলেন কর্নেল ক্লাইভ।

খানিকদূর এগোনোর পরেই দ্রুতগামী ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনতে পেল ইংরেজবাহিনী। আচমকা যেন কুয়াশার দেওয়াল ফুড়ে তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ল নবাবের খাস রিসালার ইরানি হানাদারের দল। এ বাহিনী জবরদস্ত ঘোড়সওয়ার আহেদিদের নিয়ে গড়া। শোনা গেল তরোয়ালের ঝনঝনানি। দুপক্ষের মধ্যে মুখোমুখি লড়াই বেধে গেল। বেয়নেট বনাম তরোয়াল। বেশ কিছুক্ষণ ধরে চলল সেয়ানে সেয়ানে লড়াই।

কর্নেল ক্লাইভ পরিকল্পনা করেছিলেন আচমকা আক্রমণ করে নবাবকে তুলে নিয়ে যাবেন। এ পরিকল্পনা কখনোই সফল হওয়া সম্ভব ছিল না। কারণ নবাব সে রাতে হালসিবাগানে ছিলেন না। কোম্পানির দূতেরা পালিয়ে গিয়েছে। একথা রাতেই ফাঁস হয়ে গিয়েছিল। মোহনলালের কানে এ সংবাদ পৌঁছতেই তিনি ছুটে এলেন নবাবের কাছে।

সিরাজদ্দৌলা ঘুম থেকে উঠে এসে ত্রস্ত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন, ‘কী খবর মোহনলাল?’

মোহনলাল বললেন, ‘ইংরেজদের ইলচিরা ভেগেছে।’

সিরাজ বিরক্তির সঙ্গে শুধোলেন, ‘আমাদের সেপাই লস্কররা কী করছিল?’

‘এ নিয়ে কাল যাচ ইমতেহানি করা যাবে। আমার মনে হয় এখনই আপনার এই আস্তানা ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত।’

‘কিঁউ?’

‘একটা হুজ্জুতি হতে পারে।’

‘কোথায় যাব এই রাতে?’ প্রশ্ন করলেন সিরাজ।

মোহনলাল জবাবে বললেন, ‘কাছেই গোবিন্দরামের বাগানবাড়ি আছে। আমি সব বন্দোবস্ত করে ফেলেছি।’

এবারে কলকাতা এসে নিজের অনেক সেনাপতিরই মনের গতির তল পাচ্ছেন না সিরাজদ্দৌলা। তাঁকে গ্রাস করেছে কেমন যেন অজানা একটা ভয়। কর্নেল ক্লাইভের নাম মাহাত্ম্যও ভাবিয়ে তুলেছে। নিজের মনেই আর জোর দিয়ে বলতে পারছেন না, এই টোপিওয়ালাদের শায়েস্তা করতে আমার একপাটি পয়জারই কাফি। তার উপরে নবাব লক্ষ্য করছেন, গতবছর কলকাতা আক্রমণের সময় যে জোশ তাঁর সেনাবাহিনীর মধ্যে ছিল, এবারে সে জোশ উধাও।

দেওয়ানের প্রস্তাবে আপত্তি করলেন না নবাব। লুৎফাকে সঙ্গে নিয়ে সে রাতেই তিনি উমিচাঁদের হাভেলি ছেড়ে গোবিন্দরাম মিত্তিরের বাগানবাড়িতে চলে গেলেন।

এটা ক্লাইভের জানার কথা নয়। নবাবের আস্তানার সন্ধানে কুয়াশার মধ্যে সেনাবাহিনীসহ এগোতে গিয়ে পথ ভুল করল ইংরেজবাহিনী।

সকাল ন’টা নাগাদ কুয়াশা সরে গিয়ে চারিদিক বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠল। কর্নেল ক্লাইভ প্রমাদ গুনলেন। উমিচাঁদের বাগান ও হাভেলি ছেড়ে তিনি অনেকটা দক্ষিণে সরে গিয়ে একেবারে শত্রুপক্ষের ছাউনির মাঝখানে এসে পড়েছেন। তিন দিক থেকে ইংরেজবাহিনী শত্রুসেনা পরিবৃত।

প্রতিপক্ষ বিপদে পড়েছে বুঝতে পেরে ঝাঁপিয়ে পড়ল নবাবের ফৌজ।

গোলাগুলি ছুড়তে ছুড়তে মারাঠা ডিচের দিকে সরে যেতে লাগলেন ক্লাইভ। নিহত হল নবাবের অনেক সেনা। বিপক্ষের প্রতি আক্রমণে ইংরেজদের মধ্যে হতাহতের সংখ্যাও কম নয়।

নবাবের সৈন্য সংখ্যা অনেক বেশি। ঝাঁকে ঝাঁকে তারা ধেয়ে আসছে। ক্লাইভ বুঝলেন, এ অবস্থায় পিছু হটে পালানো ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

দক্ষিণে সরতে সরতে বাহিনীকে মারাঠা ডিচ পেরোনোর হুকুম দিলেন কর্নেল ক্লাইভ। শীতের মরসুমে খটখটে মারাঠা ডিচ প্রায় শুকনো। কিন্তু খাত অনেক গভীর। দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে মারাঠা ডিচের ঢাল বেয়ে নীচে নামতে লাগল ইংরেজ সেনারা।

পলায়নরত ইংরেজবাহিনীকে বাগের মধ্যে পেয়ে উপর থেকে কামান দাগতে লাগল নবাবের গোলন্দাজ বাহিনী। বাইশ জন ইংরেজ সেনা মারাঠা ডিচের মধ্যেই প্রাণ হারাল।

কয়েক ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী এক লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে মারাঠা ডিচের ওপারের ঢাল বেয়ে উঠে ফাঁকা ধানখেতের মধ্যে এসে পড়ল ইংরেজরা। নবাবের কামানের পাল্লার বাইরে চলে আসার জন্য মারাঠা ডিচ পেরিয়েও দ্রুত বাহিনী নিয়ে আরও দক্ষিণে সরতে লাগলেন ক্লাইভ।

ওদিকে জোশের সঙ্গে সামনে এগোতে গিয়ে নিজের নির্বুদ্ধিতায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল লরেন্স। ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। কোন দিকে যাবে ঠাহর করে উঠতে পারছে না। হঠাৎ লরেন্স দেখল তিনজন ঘোড়সওয়ার তিরবেগে ছুটে আসছে তাঁর দিকে।

গুলি ছুড়ল লরেন্স। এক ঘোড়সওয়ার লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। রাইফেলের দ্বিতীয় গুলিটাও লক্ষ্য ভেদ করল। মাথা গুঁড়িয়ে গেল আরেক সওয়ারির।

তৃতীয় সওয়ারি ঘোড়ার গতিবেগ বাড়িয়েছে। তার হাতে উন্মুক্ত তরবারি। তিন নম্বর গুলিটা ছুড়তে গিয়ে চমকে গেল লরেন্স। ট্রিগারে চাপ দিল। গুলি বেরোল না। শেষ হয়ে গিয়েছে গুলি। ভয়ে কেঁপে উঠল লরেন্স। চোখের সামনে যেন প্রত্যক্ষ করল মৃত্যুকে।

হঠাৎ লরেন্স ও ঘোড়সওয়ারের মাঝে ছুটে এল এক বোরখা পরা জেনানা। তার হাতে বল্লম। ঘোড়সওয়ার একেবারে কাছে এসে পড়েছে। ঘোড়সওয়ারকে লক্ষ্য করে গায়ের সব শক্তি দিয়ে বল্লমটা ছুঁড়ে দিল সেই জেনানা। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বল্লমটা গিয়ে বিঁধল ঘোড়ার গলায়। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল। সামনে দুপা তুলে দিয়ে ভূমির সঙ্গে প্রায় খাঁড়া ভাবে দাঁড়িয়ে পড়ে যন্ত্রণায় চিঁ-হি-হি-হি-হি করে চেচিয়ে উঠল ঘোড়াটা। আচমকা ঘোড়া এভাবে খাঁড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ায় টাল সামলাতে না পেরে ছিটকে পড়ল সওয়ারি।

সেই জেনানা ছুটে আসতে লাগল লরেন্সের দিকে। জেনানার দুঃসাহস দেখে ক্ষণিকের জন্য হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল লরেন্স।

হুশ ফিরল জেনানার চিৎকার শুনে, ‘পালান। সাহেব পালান।’

চমকে উঠল লরেন্স। এ যে হিরেমনের গলা। দ্রুত ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে সামনে ছুটে গিয়ে এক ঝটকায় হিরেমনকে তুলে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসাল লরেন্স। উত্তেজনায় ও ধকলে এলিয়ে পড়েছে হিরেমন। কোনওরকমে আঙুল তুলে সে দেখিয়ে দিল কোন দিকে যেতে হবে।

ঘোড়ার পেটে কষে লাথি মারল লরেন্স। মস্ত ওয়েলার ঘোড়াটা তিরবেগে ছুটে চলল মারাঠা ডিচের দিকে। ডিচের খাড়াই ঢাল বেয়ে দ্রুত নীচে নামতে গিয়ে পা হড়কে গেল ঘোড়ার। হিরেমন ও লরেন্স ঘোড়ার পিঠ থেকে ছিটকে পড়ল। মারাঠা ডিচের ঢাল বেয়ে নীচের দিকে গড়িয়ে পড়তে লাগল দুজনে। গড়িয়ে পড়ল ঘোড়াও।

জলশূন্য মারাঠা ডিচের ভিতরে বুনো ঘাসের ঝোপের মধ্যে গিয়ে পড়ল হিরেমন ও লরেন্স। এদিকটা একেবারে সুনসান। মাইল খানেক দূরে তখন ইংরেজবাহিনী মারাঠা ডিচ পেরিয়ে পালানোর জন্য তুমুল লড়াই করে চলেছে। দূর থেকে ভেসে আসছে গোলাগুলির আওয়াজ।

হাত পা ছড়ে গিয়েছে লরেন্সের। বুনো ঘাসের উপর দিয়ে গড়িয়ে আসায় চোট তেমন গভীর নয়। খাতের মধ্যে গড়িয়ে পড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে ওয়ালার ঘোড়াটাও। খানিক দূরে পড়ে রয়েছে হিরেমন। মুখের আগল সরে গিয়েছে। নিঃসাড় দেহ। কপালে হালকা আঘাতের চিহ্ন। হিরেমনের মুখের উপর ঝুঁকে পড়ল লরেন্স। শ্বাস পড়ছে হিরেমনের।

লরেন্সের চোখে পড়ল হাত দশেক দূরে একটা অগভীর খন্দের মধ্যে জমে রয়েছে খানিকটা নোংরা জল। তা থেকে পোকা খুটে খাচ্ছে কয়েকটা বক। লরেন্স ছুটে আসতেই তারা উড়ে পালাল।

সেই নোংরা জলই আঁজলা ভরে তুলে নিয়ে হিরেমনের মুখের উপর ছিটিয়ে দিল লরেন্স। কিছুক্ষণ এভাবে চেষ্টার পর হিরেমনের চোখের পাতা নড়ে উঠল। চোখ খুলল সে। তার উপরে ঝুঁকে পড়া মুখটা দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল সে।

হিরেমনের মুখটা চেপে ধরে লরেন্স বলল, ‘ভয় নেই। সুইটি। আমি লরেন্স।’

ভালো করে লরেন্সের মুখের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় হিরেমন বলল, ‘লরেন্স সাহেব! আপনি! আপনি ঠিক আছেন?’

‘ইয়েস মাই সুইটি। তুমি ওভাবে এসে না পড়লে আমি মরতাম। গুলি শেষ হয়ে গিয়েছিল। তোমার জন্যই আজ নতুন জীবন পেলাম।’

‘সবই নসিব সাহেব।’ হিরেমনের ঠোঁটের ফাকে মৃদু হাসির রেশ।

মুগ্ধ হয়ে হিরেমনের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল লরেন্স।

সহসা ঠোঁট কামড়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল হিরেমন। দুগাল বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

হিরেমনের কপালে চুম্বন করে লরেন্স বলল, ‘উই আর সেফ। আর তোমাকে হারাতে পারব না সুইটি। এবারে আমরা শাদি করব।’

দুই বাহু দিয়ে লরেন্সকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল হিরেমন।

মারাঠা ডিচের গর্ভে বুনোঝোপের মধ্যে এই দুই ভিনদেশিয় নরনারীর মিলনের দৃশ্য এক মনে দেখছিল শাদা মস্ত ওয়েলার ঘোড়াটা।

দুপুর বারোটা। বউবাজারের রাস্তা ধরে দ্রুত মার্চ করে সৈন্যসামন্তসহ ফোর্ট উইলিয়ামে ঢুকে পড়লেন রবার্ট ক্লাইভ। নবাবকে গ্রেপ্তার করে ধরে আনবেন বলে মধ্যরাতে হঠাৎই যে অভিযানের সূচনা তিনি করেছিলেন, তার অগৌরবজনক পরিসমাপ্তি ঘটল। নবাবের বাহিনীর সঙ্গে পেরে ওঠা শক্ত দেখে পিছু হটে পালিয়ে এলেন কর্নেল।

এই যুদ্ধে ইংরেজপক্ষে কয়েকজন সেনাপতিসহ মোট সাতান্ন জন মারা গিয়েছিল। আহত প্রায় দেড়শো জন। ক্লাইভের উপর প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলেন ড্রেক। হলওয়েল ও আরও অনেকে।

 মেজর কিলপ্যাট্রিক, ক্যাপ্টেন ওয়ালশ, আয়ারকুট এরাও সবাই তাঁদের কর্নেলের উপর যারপরনাই বিরক্ত। শুধু সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলার কথা ভেবে কর্নেলের উদ্দেশে এঁরা প্রশ্ন ছুড়ে দিতে পারছেন না—ভোর রাতের ওই হঠকারী অভিযান সত্যিই কি খুব জরুরি ছিল?

রজার ড্রেক গর্জন করে বললেন, ‘নাউ উই উইল বি রুইনড। এ জন্য আপনি টোট্যালি রেসপনসিবল।’

ক্লাইভ শান্ত ও গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করলেন, ‘হাউ? কী ভাবে?’

হলওয়েল বললেন, ‘কী ভাবে বুঝতে পারছেন না? আপনার অডাশিয়াস অ্যাক্টের জন্য নবাব এবারে শেষ করে দেবেন আমাদের।’

ক্লাইভ চোয়াল শক্ত করে বললেন, ‘আই অ্যাম নট অ্যা ফরচুন টেলার। ভবিষ্যতে কী হবে জানি না।’

‘ফার্স হুগলি। দেন হালসিবাগান। এসব ঘটনার পরেও নবাব রেহাই দেবেন আমাদের?’

হলওয়েলের প্রশ্নের জবাবে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন ক্লাইভ, ‘নবাবের ক্যাম্প অ্যাটাক করা ছাড়া আমাদের কাছে অন্য উপায় ছিল কী?’

ড্রেক বললেন, ‘নবাব ফৌজ নিয়ে কলকাতায় এসেছেন ঠিকই। বাট হি ডিড নট অ্যাটাক আস। সময় ছিল। আমরা তার কাছে মাফ চেয়ে নিগোশিয়েট করতে পারতাম।’

‘কী করতেন? নবাবের পা জড়িয়ে ধরতেন?’ মুচকি হেসে শুধোলেন ক্লাইভ।

‘দরকার হলে তাই করতাম। এদেশে তো এভাবেই এতকাল আমরা ব্যবসা করেছি।’

‘নবাব সিরাজদ্দৌলাকে আপনারা চেনেন না কেউ।’

‘আপনি চিনেছেন? সবে তো এসেছেন এদেশে।’ ড্রেকের গলায় ব্যঙ্গের সুর।

অটল আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দৃঢ় গলায় ক্লাইভ বললেন, ‘হ্যাঁ। বেশিদিন আমি এদেশে আসিনি, কথাটা ঠিকই, তবে সিরাজদ্দৌলার ক্যারেকটার আমি আপনাদের থেকে ঢের বেশি বুঝেছি। নিগোশিয়েট করার চেষ্টা আমি করেছিলাম। মিঃ স্ক্র্যাফটন ও ক্যাপটেন ওয়ালশকে আমি পাঠিয়েছিলাম হালসিবাগানে। আমাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চান না নবাব। তিনি চান যুদ্ধ। তাই নবাবের বিরুদ্ধে ফোর্স অ্যাপ্লাই করা ছাড়া আমাদের সামনে অন্য কোনও আর পথ ছিল না। আপনারা নবাবের পা জড়িয়ে ধরতে পারেন। তাতে কোনও লাভ হবে না।’

হলওয়েল বললেন, ‘কর্নেল, ইউ আর টকিং লাইক অ্যান ইনসেন! কত সৈন্য আছে আমাদের? নবাবকে গায়ের জোরে আটকাব, সে শক্তি কোথায় আমাদের?’

‘ইউ আর রাইট। মুখোমুখি লড়াইয়ে নবাবের ফৌজের সঙ্গে পেরে ওঠা ভেরি ডিফিকাল্ট। নবাবের ফোর্সের তুলনায় আমাদের স্ট্রেনথ কিছুই নয়। তাই সাডেন অ্যাটাকে নবাবকে আননার্ভড করে দিতে চেয়েছিলাম আমি। ইট ইস অ্যা স্ট্রাটেজি অফ ওয়ার। আপনারা বুঝবেন না।’

ব্যঙ্গের হাসি হেসে হলওয়েল বললেন, ‘এখন তো আমরাই আননার্ভড হয়ে পড়েছি।’

ড্রেক প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, ‘হোয়াট শ্যাল উই ডু নাউ? শ্যাল উই লিভ ক্যালকাটা টু অ্যাভয়েড লস অফ লাইফ?’

‘এতটা ভাবার সময় এখনও আসেনি।’ এই বলে বিরক্তির সঙ্গে গটমট করে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন ক্লাইভ। সে হাঁটার ভঙ্গিতে ধরা পড়ল অহংকার ও আত্মবিশ্বাস।

সন্ধের মুখে নিজের সৈন্যসামন্ত নিয়ে মার্চ করে ফিরে গেলেন বরানগরের ক্যাম্পে।

কর্নেল ক্লাইভ ভাঙেন তবু মচকান না। মনের মধ্যে একরাশ শঙ্কা। নানা দুশ্চিন্তায় তোলপাড় হচ্ছে মন। অথচ তাঁকে বাইরে থেকে দেখে সে কথা বোঝার উপায় নেই। দেহের ভঙ্গিতে সেই একই রকম ঔদ্ধত্য ও অহংকার। আত্মবিশ্বাস পাহাড়ের মতোই অটল।

বরানগরের ক্যাম্পে ঢুকেই নবকৃষ্ণকে তলব করলেন ক্লাইভ। শুধোলেন, ‘বলো তো মুনশি, হালসিবাগান অ্যাটাক করে আমি কী ভুল করেছি?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনি উচিত কাজই করেছেন হুজুর।’

‘ভেবে বলছ?’

‘এছাড়া অন্য কোনও উপায় ছিল কি?’

‘রাইট। তুমি ঠিকই বুঝেছ মুনশি। দ্যাট ওয়াজ দ্য অনলি ওয়ে। সামটাইমস অ্যাটাক ইজ দ্য বেস্ট ডিফেন্স। আমি নবাবকে ভয় পাওয়াতে চেয়েছিলাম।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘মনে হচ্ছে আপনার কৌশলে কাজ হয়েছে।’

‘কী করে বুঝলে?’ উৎসাহিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ জবাবে বললেন, ‘নবাব ভয় না পেলে এতক্ষণে তাঁর হাঁকডাক শোনা যেত।’

‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’

‘নবাবপক্ষের আনুমানিক হাজার খানেক সেপাই-আহেদি-সেনাপতি মারা গিয়েছে। আহত শ’তিনেক। এই খতেন নবাবের বেইজ্জতির পক্ষে কাফি নয় কি? ভয় না পেলে কোনও নবাব-বাদশা এই বেইজ্জতি মেনে নিয়ে কি চুপ করে বসে থাকতে পারে? এতক্ষণে তো কলকাতার কেল্লার উপর জোরদার হামলা শুরু হয়ে যাওয়ার কথা।’

‘গুড অবসারভেশন মুনশি। কাগজ নিয়ে এসো। আমি একটা চিঠি লিখব নবাবকে।’

ক্লাইভ লিখলেন, ‘আজ সকালে আপনার শিবির আক্রমণ করে দেখিয়ে দিয়ে এসেছি, ইংরেজরা ইচ্ছে করলে কী করতে পারে। অতএব আমাদের ইনসিগনিফিকেন্ট ফোর্স ভাববেন না। এমনটা ভাবলে আপনারই লোকসান।…’

চিঠিটা দ্রুত ফারসিতে তর্জমা করতে বসে গেলেন নবকৃষ্ণ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *