৩৬
হাবসি সৈন্যটা শক্ত করে তার মুখ চেপে ধরেছে। দম বন্ধ হয়ে আসছে হিরেমনের। সে গায়ের সর্বশক্তি দিয়ে মুখের উপর জানোয়ারের থাবার মতো চেপে বসা হাতটা সরানোর চেষ্টা করেও এতটুকু সুবিধে করতে পারে না। লোকটার গায়ে যেন অসুরের মতো জোর। হিরেমনের চোখ ফেটে জল বেরিয়ে আসে। মনের মধ্যে ভেসে ওঠে বর্গিদের হাতে গণধর্ষিতা হওয়ার করুণ স্মৃতি।
হিরেমনের মুখের কাছে হাবসি সৈন্যটা মুখ নামিয়ে আনতেই প্রবল ঘৃণায় লোকটার দাড়ি খামচে ধরে জোরে হ্যাঁচকা একটা টান দেয় হিরেমন।
লোকটা যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠে মৃদু আওয়াজ করে, ‘উঃ!’ বাহুবন্ধন শিথিল হয়ে যায়।
হিরেমন বাঁধনমুক্ত হয়ে হাঁপাতে থাকে। দুচোখে বিস্ময়। লোকটার দাড়ির খানিকটা গাল থেকে উপড়ে গিয়ে উঠে এসেছে তার হাতে।
চাপা গলায় লোকটা বলে, ‘চিল্লাও মাত হিরেমন। মাই সুইটি। আমি লরেন্স।’
খুব পরিচিত গলার আওয়াজ। কথার ভঙ্গিও চেনা। হিরেমনের সারা শরীরে কেমন যেন একটা ঝাঁকুনি লাগে। সে থরথর করে কেঁপে ওঠে। হাতের প্রদীপ মাটিতে পড়ে নিভে গিয়েছে আগেই। অন্ধকারে মুখটা ভালো দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু গলার আওয়াজ শুনে টিম লরেন্সকে চিনতে কোনও অসুবিধা হয় না হিরেমনের। অস্ফুট স্বরে সে বলে, ‘লরেন্স সাহেব!’
‘ইয়েস মাই সুইটি।’
‘আপনি এখানে?’
‘হাবসি সেনার জালসাজিসে নবাবের ফৌজের খবর নিতে এসেছিলাম। তুমি কী করে এখানে এলে সুইটি?’
‘সে অনেক লম্বা কহানি।’
‘অন্ধকারে কোথায় যাচ্ছিলে?’
‘বাঁদিমহলে।’
‘তুমি নবাবের বাঁদি?’ বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করে লরেন্স।
‘নবাবের নয়, লুৎফা বেগমের।’
হঠাৎ আবেগে হিরেমনকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে লরেন্স। হিরেমন ব্যস্ত গলায় বলে, ‘করছেন কী সাহেব? ছাড়ুন আমাকে। কেউ এসে পড়বে।’
লরেন্স বলে, ‘চলো আমার সঙ্গে। এখনই সঙ্গে করে নিয়ে যাব তোমায়। আমরা শাদি করব।’
সেই ছেলেমানুষি আবদারের ভঙ্গি—আমরা শাদি করব। আনন্দে চোখে জল এসে যায় হিরেমনের। লরেন্স সাহেব সত্যিই ভালোবাসে তাকে। ক্ষণিকের জন্য হিরেমন সুখস্বপ্নে বিভোর হয়ে যায়। মনের মধ্যে আঁকতে থকে খুশির তসবির। পর মুহূর্তেই হুঁশিয়ার হয় সে। হাবসি সৈন্যের জালসাজিসে গুপ্তচরবৃত্তি করতে এসেছে লরেন্স। ধরা পড়লে যে দুজনেরই গর্দান যাবে।
লরেন্স ফের ব্যাকুল গলায় বলে, ‘তুমি আমার বিবি। এখানে বাঁদি হয়ে থাকবে কেন? চলো আমার সঙ্গে। তোমার খোঁজ পেয়েছি—এ আমার খুশনসিব।’
‘জায়গায় জায়গায় পাহারা আছে। ধরা পড়লে জান যাবে।’
হঠাৎ দূরে দেখা যায় আলোর শিখা। শোনা যায় পায়ের শব্দ। আলোর শিখা ও পায়ের শব্দ দ্রুত এগিয়ে আসছে। রাত পাহারায় থাকা কোনও এক পেয়াদা হুংকার ছাড়ে, ‘কৌন হ্যায়?’
চমকে উঠে ছুটে পালায় হিরেমন। দ্রুত মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে লরেন্স। বিপদ বুঝে সেও আঁধারে গা ঢাকা দেয়।
কাউকে দেখতে না পেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে লস্কর। কৌতূহলী চোখদুটো ঘুরতে থাকে চারিদিকে। হঠাৎ তার নজর যায় অদূরে বুনো ঝোপের দিকে। ঝোপটা দুলছে। লোকটার একহাতে বল্লম, আরেক হাতে মশাল। লোকটা ঝোপের দিকে এগিয়ে যেতেই পিছন থেকে কেউ আঘাত করে তার মাথায়। অস্ফূট শব্দ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে পেয়াদা। চেতনা হারায়।
পাহারাদারের মশাল আর বল্লমটা কুড়িয়ে নিয়ে স্ট্রন চাপা গলায় বলে, ‘চলে আসুন সাহেব।’
ঝোপের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে লরেন্স। তার মুখের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলে স্ট্রন। লরেন্সের মুখের আধখানা দাড়ি নেই।
স্ট্রন বলে, ‘ওই জেনানা দেখছি বহুত জাঁহাবাজ! আপনার দাড়ি খুলে নিয়েছে।’
আলোয়ানে ঘোমটার মতো করে মাথাটা মুড়ে নিয়ে লরেন্স গম্ভীর গলায় বলে, ‘হুঁ।’
পাহারাদারের ভঙ্গিতেই মাটিতে বল্লম ঠুকে মশাল হাতে ধীর গতিতে হাঁটতে শুরু করে স্ট্রন। লরেন্স তার পিছু নেয়। উমিচাঁদের হাভেলির চৌহদ্দির বাইরে চলে এসে ঘোড়ার পিঠে চেপে বসে। অন্ধকারের মধ্যে দুটো ঘোড়া পাশাপাশি ছুটে চলে বরানগরের দিকে।
স্ট্রন প্রশ্ন করে, ‘হু ওয়াজ দ্যাট গার্ল?’
‘আমার বিবি।’ অন্যমনস্ক ভাবে উত্তর দেয় লরেন্স।
ভয়ানক বিস্মিত গলায় স্ট্রন প্রশ্ন করে, ‘ইওর গার্লফ্রেন্ড?’
ঘোড়ার খুরের জোরালো শব্দের সঙ্গে মিশে যায় স্ট্রনের কথা। লরেন্স শুনতে পায় না।
বাতিস্তম্ভে জ্বলছে উজ্জ্বল আলো। তাঁবুর ভিতরটা বেশ গরম ও আরামদায়ক। মোটা গালিচার উপর ফরাস পেতে আলাদা আলাদা তিনটে বিছানা সাজানো রয়েছে। একই তাঁবুর ভিতরে তিন জনের রাত্রিবাসের আয়োজন।
উমিচাঁদ বললেন, ‘এই আপনাদের তাঁবু। আয়েশ করুন। রাতের খানা এখানেই পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
হতাশ হয়ে ধপ করে ফরাসের উপর বসে পড়ে ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ। সন্ধির আলোচনা করতে এসে যে এমন ফ্যাসাদে পড়তে হবে, তা তাঁরা কল্পনাও করতে পারেননি। তিনজনেরই থেকে থেকে মনে পড়ছে রণজিৎ রায়ের কথা, ‘পারেন তো ভেগে যান।’
খানিক বাদে রাতের আহার দিয়ে যায় একজন আবদার। শত্রু শিবিরে রাত্রিবাস। মনের মধ্যে গুম খুন হয়ে যাওয়ার আতঙ্ক। আহারের রুচি নেই তিনজনের কারওরই। তবে কেউ যাতে তাঁদের মনের হদিশ টের না পায় সে জন্য কোনওরকমে রাতের আহার সারলেন ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ। কিছুক্ষণ পর সেই আবদার এসে এঁটো বাসনপত্রগুলো নিয়ে গেল।
আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়লেন কর্নেল ক্লাইভের তিন দূত। ঘুমের ভান করে বালাপোশ মুড়ি দিয়ে তাঁরা মড়ার মতো পড়ে রইলেন।
স্ক্র্যাফটন ভাবছিলেন রণজিৎ রায়ের কথাগুলো—সন্ধি করতে চান না নবাব। কামানের গাড়ি এসে পৌঁছয়নি, তাই সন্ধির কথা বলে ভুলিয়ে রাখছেন ইংরেজদের। কামানের গাড়ি এসে পড়লেই তিনি যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। ষাট হাজার পদাতিক। চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার। নবাব এবারে ইংরেজদের একেবারে শেষ করে দিয়ে যাবেন। অবিলম্বে কথাগুলো জানানো দরকার কর্নেলকে। কিন্তু উপায় কী?
রাত গভীর হচ্ছে। তাঁবুর বাইরে থেকে মানুষের কথাবার্তা হাঁটাচলার যে আওয়াজ ভেসে আসছিল, ধীরে ধীরে তা থেমে গেল। নিঝুম হয়ে পড়ল নবাবের শিবির। দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসার ক্লান্তিতে নবাবের গোটা শিবির মাঘের এই শীতের রাতে আলোয়ান, বালাপোষ ও আগেনগারের আগুনের ওমে ঘুমিয়ে একেবারে কাদা। মানুষের সাড়াশব্দ নেই। শুধু শোনা যাচ্ছে একটানা ঝিঁঝির ডাক। মাঝে মাঝে হুক্কাহুয়া রবে ডেকে উঠছে শিয়াল। কখনও কখনও ব্যস্ত গলায় কর্কশ আওয়াজ করছে রাতজাগা অচেনা পাখি। পায়চারি করতে করতে মাটিতে বল্লম ঠুকছে রাত পাহারায় থাকা লস্করেরা।
উঠে বসে চিলমনের পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকালেন স্ক্র্যাফটন। অন্ধকারের বুক চিরে জায়গায় জায়গায় জেগে রয়েছে বাতিদানের আলো।
স্ক্র্যাফটন চাপা গলায় ওয়ালশ ও নবকৃষ্ণকে ডাকলেন। উঠে বসলেন দুজনেই।
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘এবারে পালাতে হবে আমাদের।’
তাঁবুর থেকে বেরোতে গিয়েই বাধা পড়ল। তাঁবুর ঠিক বাইরে বাতিস্তম্ভে জ্বলছে মশাল। তাঁবুর দরজার দিকে পিঠ করে বসে বসে চাঁদরে মাথা মুড়ে ঘুমে ঢুলছে একজন রক্ষী। পাশে পড়ে রয়েছে তার বল্লম। সন্তর্পণে বল্লমটা সরিয়ে নিলেন ওয়ালশ। রক্ষী টেরও পেল না। পিছন থেকে আচমকা রক্ষীর মুখ চেপে ধরে এক ঝটকায় তাকে তাঁবুর ভিতরে টেনে নিয়ে এলেন স্ক্র্যাফটন। ঘুম চটকে গিয়ে বেজায় ঘাবড়ে গেল রক্ষী। বিপদে পড়েছে টের পেয়ে ভয়ে তার চোখদুটো যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
রক্ষীর মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে ওয়ালশ বললেন, ‘টুঁ শব্দটি কোরো না ভায়া। মারা পড়বে।’
ওয়ালশ ও স্ক্র্যাফটন দ্রুত রক্ষীর হাত-পা-মুখ বেধে শুইয়ে দিলেন বিছানায়। তার গায়ের উপর একটা বালাপোশ চড়িয়ে দিয়ে চাপা গলায় নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এবারে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে পড় দেখি বাপু।’
তাঁবুর বাইরে অদূরে একটা গাছের নীচে বাঁধা ছিল ঘোড়াগুলো। তিনজনে দ্রুত চেপে বসলেন ঘোড়ার পিঠে। চোখের নিমেষে ঘোড়া হাঁকিয়ে উমিচাঁদের হাভেলি থেকে বেরিয়ে গেলেন তিনজন। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ শুনতে পেল পাহারায় থাকা এক লস্কর। ঘোড়া দাবড়ানোর শব্দে তার ঘুম চটকে গিয়েছিল। অনেক আহেদি-মনসবদারই রাতবিরেতে অজানা ঠিকানায় অভিসারে যায়। তাই এ নিয়ে পাহারাদার বড় একটা মাথা ঘামাল না। পাশে মাটিতে গাঁথা রয়েছে মশাল। গাছের গায়ে হেলান দিয়ে, রেজাইয়ে মাথা মুড়ে সে আবার ঢুলতে লাগল।
উমিচাঁদের হাভেলি থেকে বেশ কিছুটা দূরে এসে ঘাম দিয়ে যেন জ্বর ছাড়ল স্ক্র্যাফটনের। না-কেউ পিছু নেয়নি।
ঘোড়া হাঁকিয়ে বরানগরের দিকে তিরবেগে ছুটে চললেন স্ক্র্যাফটন, ওয়ালশ ও নবকৃষ্ণ।
বেলজিয়ান গ্লাসের বাহারি আধারের ভিতর পুড়ছে মোটা মোমবাতি। ফৌজি ছাউনির ঘণ্টাঘড়ি জানাল রাত এগারোটা। ঘুম নেই ক্লাইভের চোখে। তাঁবুর ভিতরে মেঝেতে পাতা গালিচার উপর অস্থির ভাবে পায়চারি করতে করতে প্রশ্ন করলেন, ‘ইস ইট ট্রু?’
লরেন্স উত্তর দিল, ‘ইয়েস স্যার।’
বিস্মিত কণ্ঠে প্রশ্ন করলেন কর্নেল, ‘সত্যি বলছ? অত কন্টিনজেন্ট নেই নবাবের সঙ্গে?’
‘নো স্যার। এ সব আমরা নিজের কানে শুনে এসেছি।’ জবাব দিল স্ট্রন।
লরেন্স যোগ করল, ‘সিক্সটি থাউজ্যান্ড ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ফরটি থাউজ্যান্ড ক্যাভালোরি —অ্যাবসার্ড ফিগার।’
‘ভেরি গুড।’
‘উই ক্যান এক্সপেক্ট ওয়ান থার্ড অফ দ্যাট নাম্বার।’ বলল লরেন্স।
নিজের মসৃণ গালে হাত বোলাতে লাগলেন কর্নেল ক্লাইভ। মনে মনে বললেন ওই সংখ্যার সৈন্যই আমাদের বে অফ বেঙ্গল পার করিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।
লরেন্স বলল, ‘মনে হল, মোস্ট অফ দ্য কন্টিনজেন্ট আর নট প্রপারলি ট্রেইন্ড।’
‘গুড ইনফরমেশন।’
কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘স্ক্র্যাফটন ও ওয়ালশ ফিরছে না কেন? ইট ইজ অলরেডি টু লেট।’
ক্লাইভ বললেন, ‘আমিও সেই কথাই ভাবছি।’
আয়ারকুট চিন্তিত গলায় বললেন, ‘আফটার হুগলি ইনসিডেন্ট ক্যান উই এক্সপেক্ট গুড জেসচার ফ্রম নবাব?’
আয়ারকুটের এ প্রশ্ন শুনে বুক কেঁপে উঠল ক্লাইভের। তিনি সন্ধি করার জন্য দূত পাঠিয়েছেন। তাদের কি প্রতিহিংসার বশে কয়েদ করতে পারেন নবাব? আর ভাবতে পারলেন না কর্নেল ক্লাইভ। অস্থির ভাবে পায়চারি করতে লাগলেন।
খানিকবাদে নিশুত রাতের নিস্তব্ধতা ছিন্ন করে শোনা গেল ঘোড়ার খুরের টগবগ শব্দ। উৎকর্ণ হয়ে উঠলেন ক্লাইভ। থেমে গেল শব্দটা। একটু পরেই ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকলেন, স্ক্র্যাফটন, ওয়ালশ ও নবকৃষ্ণ।
ভয়ানক উত্তেজনায় স্ক্র্যাফটনের কাছে ছুটে এলেন ক্লাইভ। ‘কী ব্যাপার? এত দেরি কেন? বল কী কথা হল?’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘পিস ট্রিটির বিষয়ে নবাবের সঙ্গে কোনও কথা হয়নি।’
অবাক হয়ে ক্লাইভ প্রশ্ন করেন, ‘স্ট্রেঞ্জ! এতক্ষণ কোথায় ছিলে তোমরা?’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘হুজুর কোনওরকমে জানে বেঁচে এসেছি।’
কৌতূহলী চোখে নবমুনশির দিকে তাকালেন ক্লাইভ।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘নবাবের সঙ্গে দেখা হয়েছে আমাদের। তিনি বললেন, আহাদনামার বিষয়ে কাল কথা হবে।’
‘তারপর?’
‘নবাব হুকুম করলেন, উমিচাঁদের হাভেলিতেই রাতে থাকতে হবে আমাদের। ভয়ে হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছিল হুজুর। ভাবলাম, রাতেই বুঝি নবাবের জহ্লাদরা কোতল করবে আমাদের। প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পালিয়ে এসেছি। একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। সমঝোতার আলোচনা করে কোনও লাভ হত বলে মনে হয় না।’
‘কেন এ কথা বলছ মুন্সি?’
‘জগৎশেঠের দেওয়ান রণজিৎ রায়ের মুখে শুনলাম, নবাবের কামানের গাড়িগুলো এখনও এসে পৌঁছয়নি। সেগুলো এসে পড়লেই নবাব কেল্লা আক্রমণ করবেন। তিনি সমঝোতা চান না।’
‘হুম!’ চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর মুখে আবার পায়চারি করতে লাগলেন ক্লাইভ।
হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে কর্নেল বললেন, ‘মিঃ লরেন্স—’
‘ইয়েস স্যার!’
‘সিক্সটি থাউজ্যান্ড ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ফরটি থাউজ্যান্ড ক্যাভালোরি—ইস অ্যান অ্যাবসার্ড ফিগার। রাইট?’
‘ইয়েস স্যার!’
‘চলো আমরা এখনই নবাবের ক্যাম্প অ্যাটাক করব।’
চমকে উঠল সকলে। কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘এখন? এই রাতে?’
‘ইয়েস। নবাবের ফৌজ রেডি নয়। কামানের সব গাড়ি এখনও আসেনি। দিস ইস দ্য মোস্ট অপারচুন মোমেন্ট টু অ্যাটাক নবাবস ক্যাম্প। নবাবকে কিডন্যাপ করে নিয়ে আসব আমরা। দেন গেম ওভার। সমঝোতা সহজেই হয়ে যাবে।’
ক্লাইভের পরিকল্পনা শুনে আঁতকে উঠলেন, কিলপ্যাট্রিক, আয়ারকুট ও কিং। যত সহজে কথাটা বলছেন কর্নেল ক্লাইভ, কাজটা মোটেই অত সহজ নয়। গভীর রাতে হঠাৎ এভাবে যুদ্ধযাত্রা যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ একপ্রকারের জুয়া খেলা। কিন্তু কর্নেলকে ভালো করেই চেনেন তাঁর মেজর ও ক্যাপ্টেনরা। তিনি যখন মনে করেছেন, রাতেই নবাবের শিবির আক্রমণ করবেন, তখন তা করেই ছাড়বেন। কেউ তাঁকে নিরস্ত করতে পারবে না।
আর কথা না বাড়িয়ে কিলপ্যাট্রিক, ওয়ালশ ও স্ক্র্যাফটন দ্রুত চলে গেলেন সেনা সাজাতে।
ক্লাইভের একটা চিরকুট নিয়ে আয়ারকুট ছুটলেন গঙ্গার দিকে। কর্নেল ক্লাইভের স্থলবাহিনীর সঙ্গে যাতে সবসময় তালমিল বজায় থাকে সেই জন্য বরানগরের ঘাটেই জাহাজগুলোকে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন অ্যাডমিরাল। নিজে থাকেন কেন্ট জাহাজে।
ঘুম থেকে উঠে এসে প্রবল বিরক্তির সঙ্গে ওয়াটসন শুধোলেন, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড?’
আয়ারকুট বললেন, ‘কর্নেল ক্লাইভ এখনই আপনার ফৌজ থেকে সিক্স হান্ড্রেড সোলজার চাইছেন।’
প্রায় ধমকে উঠলেন ওয়াটসন, ‘হোয়াট?’
‘সিক্স হান্ড্রেড সোলজার। রাইট নাউ।’
‘ফর হোয়াট পারপাস?’ ফের গর্জন করলেন ওয়াটসন।
‘কর্নেল এখনই নবাবের ক্যাম্প অ্যাটাক করতে চান।’
‘হ্যাজ হি গান ম্যাড?’
‘আপনি তো জানেনই স্যার লোকটার নেচার। কারও কথা শুনবেন না। এই যে নোট লিখে আপনাকে রিকোয়েস্ট করেছেন।’
চিরকুটে চোখ বুলিয়ে তিরিক্ষি মেজাজে ওয়াটসন বললেন, ‘আমি কিন্তু এই ডিসিশনের মধ্যে নেই। কর্নেল যা করতে চাইছেন তাঁর সাকসেস বা ফেইলিওরের কোনও দায় নেই আমার। কর্নেল সেনা চাইছেন, আমি দিয়ে দিচ্ছি।’
ক্যাপ্টেন স্পেককে ডেকে দুশো সেনা সহ কর্নেল ক্লাইভকে মদত দেওয়ার হুকুম দিলেন অ্যাডমিরাল। তারপর একরাশ বিরক্তি নিয়ে নিজের কেবিনে ঢুকে ধড়াম করে দরজা বন্ধ করে দিলেন।
পাঁচশো গোরা পল্টন, ছশো জাহাজি গোরা, আটশো দেশি সেপাই, জনা চল্লিশেক ঘোড়সওয়ার। এছাড়া সঙ্গে রয়েছে কামান ও বারুদের গাড়ি। ফিল্ডপিস কামান ছ’টা।
বরানগর থেকে হালসিবাগানের দিকে কুচ করা শুরু করলেন কর্নেল ক্লাইভ। সঙ্গে মেজর কিলপ্যাট্রিক, ক্যাপ্টেন আয়ারকুট, ওয়ালশ, স্পেক, কিং ও পাই।
ক্লাইভ এমনভাবে সেনা সাজালেন যাতে সেনাবাহিনীকে খুব লম্বা বলে মনে হয়। পাশাপাশি তিনজন হাঁটতে লাগল। বাহিনীর একেবারে সামনে ও পিছনে দিশি সেপাইরা। মাঝখানে গোরা সৈন্য।
রাত দেড়টা। মাঘ মাসের শীত। অন্ধকার ও কুয়াশার জবরদস্ত যুগলবন্দি। গোটা বিশ্বচরাচরই যেন ঢাকা পড়েছে অস্বচ্ছ আস্তরণে। শুধু শোনা যাচ্ছে ফৌজি চলনের ঐকতান—নির্দিষ্ট ছন্দে এগিয়ে চলা ভারী জুতোর শব্দ, কামানের গাড়ির চাকার ঘড়ঘড় আওয়াজ, ঘোড়ার খুরের টগবগ ধ্বনি। ঘুম ভেঙে জেগে উঠল আশেপাশের গ্রামের মানুষ। এই রাতদুপুরে এত হইচই কীসের ঠিক বুঝে উঠতে পারল না তারা। পাঁচ হাত দূরের জিনিসও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। শুধু চোখে পড়ছে কুয়াশার মোড়কে ঢাকা অসংখ্য মশালের অনুজ্জ্বল আবছা আলো।
