৩৫
হালসিবাগানে উমিচাঁদের হাভেলি। নবাব-বাদশাদের প্রাসাদের মতোই আড়েবহরে বিশাল। সরু ইট, বেলেপাথর ও শ্বেতপাথরের যুগলবন্দিতে তৈরি বাহিরমহল, অন্দরমহল, কাছারিবাড়ি, নাচঘর, অতিথিনিবাস—এসব বিরাট এলাকা নিয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এইসব দালানগুলোকে ঘিরে রয়েছে ঘন সবুজ লন এবং দিশি ও বিলিতি গাছপালা দিয়ে যত্ন করে সাজানো বাগান। বাগানের মধ্যে জায়গায় জায়গায় রয়েছে শ্বেতপাথরের মর্মর মূর্তি। বাড়ির চৌহদ্দিতে প্রবেশের মুখে বিরাট সিংহদরজা। তার উপরে নহবতখানা। সেখান থেকে ভেসে আসছে সানাইয়ের সুর।
১৭৫৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি।
বিকেলের দিকে নবাব সিরাজদ্দৌলা এসে পৌঁছেছেন হালসিবাগানে উমিচাঁদের এই বাড়িতে। গৃহের অতিথি নবাব। আদর আপ্যায়নের আয়োজন সব ঠিকঠাক আছে কি না তা সরেজমিনে দেখে নেওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করছেন গৃহকর্তা উমিচাঁদ। অবশ্য তাঁর বড় একটা করার কিছু নেই। নবাবের খাস গোলাম, বাঁদি, আবদার, দাখিলারা গোটা বাড়ির দখল নিয়ে নিয়েছে।
সন্ধে নেমেছে। মাঘের হিমে ভেজা আঁধারে ঢাকা পড়েছে শহর কলকাতা। হালসিবাগানে আলোর বন্যা। বাতিস্তম্ভে পুড়তে থাকা অভ্রের পাত ছড়াচ্ছে শাদা নরম আলো। সেই সঙ্গে অজস্র দীপবর্তিকার উষ্ণ হলদে আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে চারিদিক। উমিচাঁদের হাভেলির বাগানের সবুজ লনে খাটানো হয়েছে সারি সারি তাঁবু। এগুলো নবাবের প্রধান প্রধান সেনাপতিদের জন্য।
হাজার হাজার সেপাই-লস্কর, আহেদিদের ছাউনি, হাতিশাল, আস্তাবল, গোশালা, উটের আস্তানা, বারুদঘর, রসদঘর, রসুইঘর সব মিলিয়ে নবাবের বিরাট বাহিনী ছড়িয়ে পড়েছে হালসিবাগান থেকে পুবের জলা পর্যন্ত। এই বিস্তীর্ণ এলাকা মশালের আলোয় ছয়লাপ। মানুষ ও জানোয়ারের কলকলানিতে মুখর।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এসে ক্লান্ত সেপাই লস্করেরা মশালের আলোর চারিদিকে গোল হয়ে বসে জিরিয়ে নিচ্ছে। জায়গায় জায়গায় জটলা।
হাবসি সেপাইয়ের ছদ্মবেশে সেপাই-লস্করদের আস্তানার অলিগলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে স্ট্রন ও লরেন্স। দুজনেরই গায়ে ভুষো কালির প্রলেপ। মুখে আঠা দিয়ে লাগানো পেল্লায় পাকানো গোঁফ ও ঘন দাড়ি। মাথার মস্ত পাগড়ি কপালের প্রায় অর্ধেক ঢেকে রেখেছে। দুজনেই গায়ে পেঁচিয়ে রেখেছে মোটা কালো আলোয়ান।
থেকে থেকে পা বদলাচ্ছে, লেজের ছিপটি দিয়ে দাবনায় বসা মাছি তাড়াচ্ছে তাগড়াই চেহারার সব ইরানি ঘোড়া। শীতে আরাম দিতে তাদের গলা থেকে পিঠ পর্যন্ত মোটা চটের ছালা দিয়ে পেঁচিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আস্তাবল এলাকার চারিদিকে এলোমেলো ভাবে ঘুরতে ঘুরতে ঘোড়ার গুনতি করছিল স্ট্রন ও লরেন্স। অদূরে কাঠের আগুনকে ঘিরে বসে রয়েছে তিনজন সেপাই। ঘাড় ঘুরিয়ে লরেন্স ও স্ট্রনকে দেখতে পেয়ে একজন হেঁকে বলে, ‘ও ভাইয়া কী করছ ওখানে?’
লরেন্স উত্তর দেয়, ‘ঘোড়াগুলোর গায়ে চাপান দেওয়া হয়েছে কি না দেখছিলাম। আজ ঠান্ডা জবরদস্ত।’ এদেশে বেশ কয়েক বছর থেকে ফারসিটা দিব্যি রপ্ত করেছে লরেন্স।
‘ওসব ছাড়ো ভাই। নবাবের জন্য জানকবুলের কসম খেয়েছ বলে কি মস্তি করতে নেই? এদিকে এসো। বিলিতি শরাবে গলা ভেজাও। এসো এসো।’
তিন সেপাইয়ের পাশে গিয়ে বসে পড়ে লরেন্স ও স্ট্রন।
তিন সেপাইয়ের নেশা বেশ চড়েছে। তিনজনের মধ্যে একজন একটু বয়স্ক। প্রত্যেকেরই হাতে শরাব ভর্তি মাটির খোরা। সামনে শালপাতার উপর রাখা রয়েছে তেল চপচপে ভাজা মাংস। পাশে রয়েছে কুজো। শরাবে ভরা।
‘গলা ভেজাবে নাকি একটু?’
একজন সেপাইয়ের এই প্রশ্নের উত্তরে মাথা ঝাঁকিয়ে সম্মতি জানায় স্ট্রন। সে সদ্য এসেছে এই দেশে। দিশি ভাষায় সড়গড় নয়। তাই তার কথা বলা বারণ।
নতুন একটা খোরায় শরাব ঢেলে এক সেপাই স্ট্রনের দিকে বাড়িয়ে দেয়। ‘মৌজ করে খাও ভাইয়া। এ মনসবদারের মাল। কিমতি চিজ। ঝেড়ে দিয়েছি।’ এই বলে তৃপ্তির হাসি হাসে বয়স্ক সেপাই।
লম্বা একটা চুমুক দেয় স্ট্রন। তারপর ভাজা মাংস মুখে ফেলে চিবোতে থাকে।
লরেন্সের উদ্দেশে এক সেপাই বলে, ‘তুমি?’
‘শরাব ভালো লাগে না।’
‘তুমি তো আজব লস্কর হে! ফৌজে নোকরি কর, শরাব ছোও না।’
লরেন্স মুচকি হেসে একটুকরো মাংস মুখে ফেলে চিবোতে থাকে।
‘কোন রিসালায় আছ?’
‘রায়দুর্লভের রিসালায়।’ উত্তর দেয় লরেন্স।
‘তোমরা?’
‘মিরজাফরের লস্কর। এবারের লড়াইয়ে খতরা আছে।’
লরেন্স বলে, ‘লড়াই মানেই তো খতরা।’
‘গেলবার কলকাতায় এসেছিলে?’
‘না।’
‘সেবারে মস্তি ছিল। মেলা লুঠপাট করেছি। এবারে মরা শহর। লুঠপাটের মওকা নেই। কিন্তু খতরা জেয়াদা।’
‘কেন চাচা?’ লরেন্স প্রশ্ন করে।
‘তেলেঙ্গানা থেকে কোম্পানির ফৌজ এসেছে। বড় পাল্লার কামান এনেছে। গৌড়ের তরমুজের চেয়েও বড় বড় গোলা। তার উপর শুনছি দুই বহুত জঙ্গবাজ সাহেব এসেছে। হুগলির কী হাল করেছে, আসার সময় চোখে দেখনি? আরে ভাইয়া, জবরদস্ত তাগদবাজ না হলে নবাবের ঘাঁটি কেউ তছনছ করে? রায়দুর্লভ বল, আর মিরজাফর বল বা মোহনলালই বল—সবাই ভয়ে কাঁপছে। বুঝলে হে আমি সমসের খাঁ। নবাব আলিবর্দি খাঁর সময় থেকে ফৌজে কাম করছি। তিন কুড়ি উমর হতে চলল। সব জানি। সব বুঝি।’ এই বলে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে শরাবের খোরা উজাড় করে দেয় সমসের খাঁ।’
লরেন্স বলে, ‘ভয়ের কি আছে? কোম্পানির পল্টন জেয়াদা নেই। আমাদের ষাট হাজার পদাতিক, চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার আছে।’
সমসের খাঁ বলে, ‘ধুর ধুর। তোমরা দেখছি একেবারে আনপঢ়। বেওকুফ আদমি। ফৌজের হালহকিকত কিচ্ছু জান না। ষাট হাজার পদাতিক আর চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার —ও তো কাগজের হিসেব।’
লরেন্স অবাক হয়ে শুধায়, ‘মানে?’
‘রিসালায় জেয়াদা পদাতিক জেয়াদা সওয়ারি দেখিয়ে মনসবদাররা টাকা চোরি করে। কাগজের হিসেবে পনেরো হাজার আদমি আছে মিরজাফরের রিসালায়। ইয়ে এক রঙ্গিলা খোয়াব। মেরেকেটে পাঁচ হাজার আদমি আছে ময়দানে। বাকি মনসবদারদেরও একই হাল।’
পাশ থেকে একজন সেপাই বলে, ‘জেয়াদা সওয়ারি কাগজে দেখিয়ে নবাবকে উল্লু বানায় মনসবদারেরা।’
একথা শুনে স্ট্রন ও লরেন্সের চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। নিজের প্রতিক্রিয়া সামলে নিয়ে লরেন্স বলে, ‘এসব বিশ্বাস হয় না চাচা।’
‘সমসের খাঁ ইমানদার আদমি—ঝুটমুট বলে না। বিশ্বাস না হয় তো নিজে গুণতি করে দেখো।’
হঠাৎ ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা যায়। মশালের আলো হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছে একদল ঘোড়সওয়ার।
সমসের খাঁ বলে, ‘এই ব্বাপ! মিরমদনজি এদিকে আসছেন। শরাবের খোরা হাতে গুলতানি করতে দেখলে চাবুক হাকড়াবেন। পালাও!’
দুদ্দাড় করে পালিয়ে যায় তিন সেপাই। অন্ধকারে গা ঢাকা দেয় লরেন্স ও স্ট্রন।
ক্লাইভের স্বাক্ষর করা চিরকুট একজন দাখিলা উমিচাঁদের হাতে পৌঁছে দিতেই সদর দেউড়িতে তিনি ছুটে এসে বললেন, ‘আমার হাভেলির দেউড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন আপনারা? কী লজ্জার কথা। আসুন আসুন। ভিতরে আসুন।’
স্ক্র্যাফটন বলেন, ‘সেলাম উমিচাঁদজি!’
‘সেলাম সাহেব!’
‘কর্নেল যুদ্ধ চান না। উই ওয়ান্ট টু সাইন অ্যা পিস ট্রিটি উইথ নবাব।’
‘ইয়ে তো বহুত বড়িয়া বাত। আমার হাভেলি কলকাতায়, কারবার কলকাতায়। এখানে লড়াই-ঝামেলা হলে তো আমারই লোকসান।’
‘নবাবের সঙ্গে আমাদের কথা বলিয়ে দিতে হবে। উই ওয়ান্ট টু টক অ্যাবাউট পিস ট্রিটি।’ বললেন স্ক্র্যাফটন।
‘বেশ তো। বাগানে দরবার বসেছে। আসুন কথা বলিয়ে দিচ্ছি।’
আলোছায়ায় ঢাকা পথ ধরে উমিচাঁদের পিছু নেন ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ। খানিকদূর হেঁটে এসে তারা থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন।
দূর থেকে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সিরাজদ্দৌলাকে। মাথার উপর সোনা ও রুপোর সুতোয় বোনা ঝলমলে চন্দ্রাতপ চারকোনায় নকশাকাটা কনকদণ্ডের সঙ্গে বাধা রয়েছে। প্রত্যেকটি কনকদণ্ডের পাশে রয়েছে শ্বেতপাথরের বাতি স্তম্ভ। তাতে পুড়ছে অভ্রের পাত। সেই আলোয় ঝলমল করছে দরবার। নবাব বসে আছেন মসনদে। লাল মসলিনে মোড়া তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে। নবাব যখন সচল হন মসনদও তাঁর সঙ্গে চলতে থাকে।
নবাবের উষ্ণীষের হিরে ঝলমল করছে আলোয়। ঝকমক করছে মুক্তোর হার, গলা থেকে বুক পর্যন্ত ঝুলতে থাকা রংবেরঙের মূল্যবান পাথরের মালা। নবাবের দুপাশে বাহারি সুজনিতে মোড়া মোটা ফরাসের উপর হাঁটু মুড়ে বসে রয়েছেন ওমরাহ ও সেনাপতিরা। তাঁরা রণসাজে সজ্জিত। মাথায় শিরস্ত্রাণ, বুকে লোহার বর্ম আঁটা। কোমর থেকে ঝুলছে তরবারি।
নবাবের সামনে সুদৃশ্য রুপোর রেকাবির উপরে রাখা কাঠের পুস্তকদানিতে রয়েছে ঝলমলে জরির কাপড়ে মোড়া একখানা কিতাব। পাশে ধুপ জ্বলছে। সুগন্ধে ম ম করছে বাতাস। ওমরাহ, সেনাপতিদের মধ্যে অনেকে উঠে এসে কিতাব ছুঁয়ে মন্ত্রের মতো কী বলে যাচ্ছে সেটা বুঝতে না পেরে নবকৃষ্ণের দিকে তাকালেন ওয়ালশ ও স্ক্র্যাফটন।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘নবাবের মুসলিম সেনাপতিরা কোরান ছুঁয়ে লড়াইয়ে জানকবুলের কসম খাচ্ছে। ওই যে একেবারে মাঝে যিনি কোরানের উপর হাত রেখেছেন, মুখে চাপদাড়ি—উনি মিরজাফর। নবাবের বাঁ পাশে বসে আছেন মহারাজা মোহনলাল। ডানদিকে রায়দুর্লভ।’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘শেঠজিও পৌঁছে গিয়েছেন দেখছি।’
রায়দুর্লভের পাশে আসর আলো করে বসে আছেন জগৎশেঠ।
উমিচাঁদ বেশ কিছুটা এগিয়ে গিয়েছিলেন। ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণকে থমকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে আবার পিছিয়ে এসে শুধোলেন, ‘দাঁড়িয়ে পড়লেন যে?’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘এই খোলা দরবারে সকলের সামনে আমরা নবাবের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করতে চাই না। উই ওয়ান্ট টু ডিসকাস প্রাইভেটলি।’
‘ঠিক আছে। আপনারা এখানে অপেক্ষা করুন।’ এই বলে উমিচাঁদ এগিয়ে গেলেন দরবারের দিকে।
ঝাঁকড়া একটা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে রইলেন ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ।
দুটো মাঝারি আকারের তামার রেকাবি নিয়ে সিরাজদ্দৌলার দিকে এগিয়ে গেল দুইজন দাখিলা।
উঠে দাঁড়ালেন জগৎশেঠ ও রায়দুর্লভ। দাখিলাদের হাত থেকে সেই তামার পাত্র হাতে নিয়ে নবাবের সামনে এসে দাঁড়ালেন দুজনে। মাথা ঝুঁকিয়ে কিছু বলতে লাগলেন।
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এরাও জানকবুলের কসম খাচ্ছেন। এ দুজন হিন্দু তাই কায়দা আলাদা। হাতে ধরে আছেন তামার পাত্র। তাতে রয়েছে গঙ্গাজল আর তুলসীপাতা।’
মাথা নাড়ালেন স্ক্র্যাফটন। বুঝলেন ব্যাপারটা। কলকাতার মেয়রস কোর্টে হিন্দু সাক্ষীরা ঠিক একই কায়দায় ওথ নেয়।
এর পরে সেনাপতি ও ওমরাহরা সব উঠে দাঁড়ালেন। একে একে নবাবের সামনে এসে কদমবুসি করতে লাগলেন। উমিচাঁদ নবাবকে তসলিম জানিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেন। কিছু একটা বললেন। তারপর আদাব জানাতে জানাতে পিছিয়ে এলেন।
একটু পরে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন উমিচাঁদ। বললেন, ‘নবাব তলব করেছেন আপনাদের।’
স্ক্র্যাফটন একান্তে কথা বলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু নবাব এখানেই তলব করে বসায় কিছু করার নেই তার। নবাবের হুকুম তামিল না করাটা বেসহবত কাণ্ড। অগত্যা উমিচাঁদের পিছু নিলেন ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ।
নবাবের সামনে গিয়ে তিনজন কুর্নিশ করলেন। বেশ রোমাঞ্চ অনুভব করছিলেন নবকৃষ্ণ। এত কাছের থেকে নবাব সিরাজদ্দৌলাকে তিনি আগে কখনও দেখেননি।
উমিচাঁদই তিনজনকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। ‘জাঁহাপনা, ইনি লিউক স্ক্র্যাফটন। কর্নেল ক্লাইভের দূত। একসময় ঢাকার কুঠিয়াল ছিলেন। ইনি ক্যাপ্টেন ওয়ালশ। ফৌজি। আর এ হল নবকৃষ্ণ। কর্নেল ক্লাইভের মুনশি।’
তিনজনকে ইয়াদদস্ত করলেন সিরাজদ্দৌলা। তারপর বললেন, ‘বলুন আপনাদের খাস বাত কী আছে?’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘হুজুর, কোম্পানি আপনার সঙ্গে লড়াই চায় না। ইংরেজরা এক মহান জাতি। উই আর ইন ফেভার অফ পিস। কর্নেল ক্লাইভ আপনার সঙ্গে সমঝোতা করতে চান।’
নিজের অজান্তেই স্বস্তির একটা নিঃশ্বাস ফেললেন সিরাজদ্দৌলা। তিনি যা চেয়েছিলেন তাই হতে চলেছে। হুগলিতে কোম্পানির বেতমিজ কাণ্ডকারখানার জবাব দিতে তিনি ফৌজ নিয়ে ধেয়ে এসেছেন কলকাতায়। কেউ তাকে ডরপোক বলতে পারবে না। তাঁর বাহিনী দেখে ভয় পেয়েছে ইংরেজ কোম্পানি। তাই ব্যস্ত হয়ে ছুটে এসেছে সমঝোতার বিষয়ে বাতচিত করতে। শেষ পর্যন্ত জিত হল তাঁরই।
নবাব গম্ভীরভাবে বললেন, ‘আপনাদের সুমতি হয়েছে জেনে খুশি হলাম।’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘হুজুর আমরা সমঝোতার বিষয়ে আপনার সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চাই।’
সিরাজদ্দৌলা উঠে দাঁড়ালেন। গোটা দরবার উঠে দাঁড়াল। নবাব বললেন, ‘কাল কথা হবে। আজ রাতে এখানেই মুসাফিরখানায় আপনারা থাকুন। সমঝোতার শর্তগুলো মুসাবিদা করুন। কাল সকালে সেসব মহারাজা মোহনলালকে দেখাবেন। তার পরে আমি আপনাদের সঙ্গে কথা বলব।’
হুকুমের সুরে এই কথাগুলো বলে সিরাজদ্দৌলা আর দাঁড়ালেন না। দরবার ছেড়ে চলে গেলেন। সকলেই তাঁর পিছু নিল। দাখিলারা এসে বাতিস্তম্ভগুলো নিয়ে চলে গেল। যেখানে দরবার বসেছিল সেই আলোকোজ্জ্বল জায়গাটায় নিমেষে আঁধার নেমে এল।
চিন্তিত মুখে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘নাউ উই আর ইন অ্যা স্যুপ।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সত্যিই হুজুর ভাবনার বিষয়। এই শত্রু শিবিরে রাত্রিবাস করার প্রস্তাবটা বড় বিপজ্জনক। নবাব আদৌ কাল সমঝোতা নিয়ে আলোচনা করবেন কি না ঠিক নেই। মাঝখান থেকে রাতে আমরা না কোতল হয়ে যাই।’
ওয়ালশ বললেন, ‘হোয়াট শ্যুড উই ডু নাউ?’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘নবাব যখন হুকুম করে গিয়েছেন, আপাতত মুসাফিরখানায় যাওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় নেই আমাদের। দেখা যাক কী হয়। সবই গোবিন্দের ইচ্ছা।’
‘কী? সমঝোতা নিয়ে বাতচিত হল আপনাদের?’ কৌতুকের ভঙ্গিতে করা এই প্রশ্ন শুনে চমকে ঘুরে তাকালেন তিনজনেই। অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে এল একজন। মাথা আলোয়ানে মোড়া।
নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘কে?’
‘রণজিৎ রায়। জগৎশেঠজির দেওয়ান।’ মাথায় দেওয়া চাঁদরের ঘোমটা সরালেন রণজিৎ রায়।
স্ক্র্যাফটন জিগ্যেস করলেন, ‘কখন পৌঁছলেন?’
‘সাঁঝবেলায়। সমঝোতার বিষয়ে নবাবের সঙ্গে কথা হল আপনাদের?’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘ডিসকাশন তো কিছু হয়নি। কাল হবে।’
মুচকি হেসে চাপা গলায় রণজিৎ রায় বললেন, ‘আমি ভাবতাম কোম্পানির সাহেবরা খুব হুঁশিয়ার আদমি। এখন তো দেখছি আপনাদের মতো বেউকুফ আর কেউ নেই।’
ওয়ালশ ভুরু কুঁচকে শুধোলেন, ‘আমাদের বেওকুফ বলছেন?’
‘নয়তো কী? নবাবের চালটা বুঝলেন না আপনারা?’
‘চাল বলতে?’ শুধোলেন স্ক্র্যাফটন।
‘নবাব মোটেই সমঝোতা চান না। কামানের সবকটা গাড়ি এখনও আসেনি। তাই আপনাদের সমঝোতার আশা দিয়ে ভুলিয়ে রাখছেন নবাব। কামানের গাড়িগুলো এসে পড়লেই নবাব কলকাতা আক্রমণ করবেন। ষাট হাজার পদাতিক। চল্লিশ হাজার ঘোড়সওয়ার। নবাব এবারে আপনাদের আর জিন্দা ছাড়বেন না।’
দূর থেকে কয়েকজন লোক আলো নিয়ে এদিকে আসছে।
গলা আরও খাটো করে রণজিৎ রায় বললেন, ‘শুনলাম, রাতে মুসাফিরখানায় থাকার হুকুম হয়েছে আপনাদের উপর। খুব সাবধানে। পারেন তো ভেগে যান।’
স্ক্র্যাফটন সন্ত্রস্ত কণ্ঠে শুধোলেন, ‘কেন বলছেন এ কথা?’
‘এখানে এসে হয়তো নবাবের ফৌজের বিষয়ে অনেক জানকারি হয়েছে আপনাদের। আপনারা জিন্দা ফিরলে কর্নেল ক্লাইভ অনেক কিছু জেনে ফেলবেন। নবাব কি চাইবেন আপনারা জিন্দা ফিরে যান?’
এই বলে রণজিৎ রায় আর দাঁড়ালেন না। ফের চাদরে মাথা মুড়ে দ্রুত মিলিয়ে গেলেন অন্ধকারে।
ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণের বুক কেঁপে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে এসে পড়লেন উমিচাঁদ। তার সঙ্গে দুইজন দাখিলা। তাদের হাতে আলো।
উমিচাঁদ বললেন, ‘আরে আপনারা এখানেই দাঁড়িয়ে আছেন? আমি কখন থেকে ঢুনছি আপনাদের। বড়িয়া একটা তাঁবুর ব্যবস্থা করেছি আপনাদের জন্য। খানা ভি বহুত আচ্ছা। আসুন।’
উমিচাঁদকে অনুসরণ করলেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও এগোতে লাগলেন, ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ।
হিরেমন কয়েকদিনের মধ্যেই লুৎফাবেগমের মন জয় করে নিয়েছে। কাজেকর্মে খুবই চটপটে ও বুদ্ধিমতী এই বাঁদিকে নিজের মহলে বহাল রেখেছে লুৎফা।
নবাব ও বেগম শুতে যাওয়ার পর, রাতের বাঁদি-দাখিলারা কাজে যোগ দেওয়ার পর ছুটি মিলল হিরেমনের। সে হাতে একটা রেড়ির তেলের দীপ নিয়ে বাঁদিমহলে ফিরছিল। হাভেলি থেকে বাঁদিমহলের ছাউনি বেশ খানিকটা দূরে, হাভেলির পিছন দিকে। বুনোঝোপের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে গিয়েছে সরু পথ। হিরেমন হেঁটে চলে।
রাত বেশ গভীর হয়েছে। সন্ধের দিকে চারিদিকেই জ্বলছিল অসংখ্য মশাল। সেগুলোর বেশিরভাগই নিভে গিয়েছে। এখনও যে কয়েকটা জ্বলছে সেগুলো প্রায় নিভু নিভু। নবাবের সেনা ছাউনি প্রায় নিস্তব্ধ। কাছেই কোথাও শেয়াল ডাকছে। মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে রাতপাহারার লস্করদের মাটিতে বল্লম ঠোকার শব্দ।
ঘন অন্ধকারে হিরেমনের গা ছমছম করতে থাকে। দ্রুত হাঁটতে থাকে সে। ভূতপ্রেত, অশরীরীতে ভয় নেই হিরেমনের। তার ভয় মানুষের চেহারার জানোয়ারকে। এই কয়েকদিনে সেপাই-লস্কর থেকে শুরু করে আহেদি, মনসবদার অনেকেই লোভী চোখে তাকে জরিপ করেছে। শুধু লুৎফা বেগমের বাঁদি বলে কেউ হাত বাড়াতে সাহস করেনি। এই মানুষগুলোর চোখের দৃষ্টি ভয়ংকর শ্বাপদের মতো। মারাঠা দস্যুদের চোখেও একইরকম চাহনি দেখেছিল হিরেমন।
হঠাৎ অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে এক হাবসি সেপাই হিরেমনের পথ আটকে দাঁড়ায়। রেড়ির তেলের আলোয় লোকটাকে দৈত্যের মতো দেখায়। কুচকুচে কালো গায়ের রং। তার মধ্যে মুখ ভর্তি গোঁফ দাড়ি। চোখদুটো জ্বলজ্বল করছে।
ভয়ে চিৎকার করে উঠতে যায় হিরেমন। সহসা সেই হাবসি সেপাই ঝাঁপিয়ে পড়ে তার মুখটা চেপে ধরে। হিরেমনের হাত থেকে জ্বলন্ত প্রদীপটা মাটিতে পড়ে গিয়ে নিভে যায়।
