৩৪
হাতে ফ্লিন্টলক রাইফেল। কনুইতে ভর দিয়ে দ্রুত বুকে হেঁটে চলেছে জনা পঞ্চাশেক দিশি যুবক। ফৌজি ট্রেনিং চলছে বরানগরের মাঠে। ট্রেনিং দিচ্ছেন ক্যাপ্টেন আয়ারকুট। পাইপ মুখে গম্ভীর ভাবে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে অবজার্ভ করছেন কর্নেল ক্লাইভ।
মনে মনে এই দিশি যুবকদের তারিফ করলেন কর্নেল। অল্পদিনের মধ্যেই অত্যাধুনিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির সঙ্গে বেশ মানিয়ে নিয়েছে এরা। ছেলেগুলো বুদ্ধিমানও বটে। যুদ্ধের কলাকৌশল শিখে নিচ্ছে খুব দ্রুত।
কিলপ্যাট্রিককে হুগলি অভিযানে পাঠানোর সঙ্গে সঙ্গেই নবাবের কড়া প্রতিক্রিয়া ও যুদ্ধের কথা ভেবে নেটিভদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন একটা রেজিমেন্ট গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছিলেন কর্নেল ক্লাইভ। লোক জোগাড় করতে অসুবিধা হয়নি। কোম্পানির ফৌজে চাকরি। মাইনে মন্দ নয়। অনেকেই উৎসাহের সঙ্গে ছুটে এল। এদের মধ্যে থেকে মজবুত চেহারার সাহসী ছেলেদের বাছাই করে নিলেন কর্নেল ক্লাইভ। উদ্দেশ্য, দ্রুত দক্ষ সেনার সংখ্যা বাড়িয়ে নেওয়া। ঠিক একই কায়দায় তেলেঙ্গানার দেশি সেপাইদের ট্রেনিং দিয়ে মনের মতো করে গড়ে নিয়েছিলেন ক্লাইভ।
বাংলায় দিশি লোকেদের নিয়ে গড়ে তোলা এই বাহিনীর নাম হল লাল পল্টন। এই নাম দিলেন স্বয়ং কর্নেল ক্লাইভ। প্রায় শ’দুয়েক লোক নিয়ে গড়ে তোলা বাহিনী। সকাল থেকে চলছে কড়া অনুশীলন। বন্দুক হাতে কনুইয়ে ভর দিয়ে বুকে হেঁটে চলেছে এক দল শিক্ষানবিস সেপাই। পিঠে মস্ত বোঁচকা নিয়ে ছুটোছুটি করছে আরেক দল। ঘোড়া দাবড়ে মাঠে চক্কর কাটছে বেশ কয়েকজন।
ক্যাম্পের একপ্রান্তে জঙ্গলের ধারে চাঁদমারি অনুশীলন করছে অন্য আরেকটা দল। বেশ কিছুটা দূরে দাঁড় করানো আছে পরপর দশ বারোটা লোহার খাম্বা। প্রত্যেক খাম্বার গায়ে আটকানো লোহার পাতের উপর রংবেরঙের বৃত্ত আকা। ফ্লিন্টলক রাইফেল থেকে গুলি ছুড়ছে প্রশিক্ষণরত সেপাইরা। সড়গড় করে নিচ্ছে হাতের নিশানা।
ঠং-ঠং- ঠং!
পরপর তিনবার বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রে পর পর তিনবার গুলি লাগাল নীলকণ্ঠ। সেও নাম লিখিয়েছে ফৌজে। উপভোগ করছে এই প্রশিক্ষণ। ফৌজের উত্তাপ।
পিছন থেকে তার পিঠ চাপড়ে কর্নেল বললেন, ‘ভেরি গুড।’
ঘুরে তাকিয়ে কর্নেলকে স্যালুট করল নীলকণ্ঠ। একেবারে পেশাদারি কায়দা।
খুশি হলেন ক্লাইভ। ফৌজি আদবকায়দা এ ছোকরা দিব্যি রপ্ত করে ফেলেছে। মুচকি হেসে কর্নেল বললেন, ‘ক্যারি অন।’
অল্প সময়ের মধ্যে এত ছেলেকে ট্রেনিং দিয়ে তৈরি করে নেওয়া বেশ কঠিন কাজ। এটা ভালোই জানেন কর্নেল। তাঁর ক্যাপ্টেনরা অসাধ্যসাধন করেছে। নবাবের সেনাবাহিনী সম্বন্ধে যা আন্দাজ ক্লাইভ পেয়েছেন, তাতে বুঝেছেন নবাবের বাহিনীর বেশিরভাগ সৈন্যই অপেশাদারি। আধুনিক যুদ্ধের কায়দাকানুন তাদের জানা নেই। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দুশো সৈন্য অনায়াসে বিপক্ষের দু-চারহাজার আনপঢ় সেনাকে ঘায়েল করে দিতে পারে। সত্যিই যদি যুদ্ধ বাধে তাহলে এই লাল পল্টন কোম্পানির সম্পদ হয়ে উঠবে—এই ভেবে বেশ স্বস্তি বোধ করলেন কর্নেল ক্লাইভ।
হঠাৎ একজন আর্দালি ছুটতে ছুটতে এসে কর্নেলকে স্যালুট করলেন। তার হাতে একটা চিঠি। আর্দালি জানাল, এ চিঠি মাদ্রাজের ডাকে এসেছে। খামের উপর লেখা আছে আরজেন্ট।
আর্দালির হাত থেকে চিঠিটা প্রায় ছিনিয়ে নিলেন কর্নেল ক্লাইভ। ফোর্ট সেন্ট জর্জের গভর্নর পিগট সাহেব লিখেছেন এই চিঠি। দ্রুত খামটা খুলে চিঠিটা পড়তে লাগলেন কর্নেল। তাঁর মুখটা গম্ভীর হয়ে গেল।
পিগট সাহেব লিখেছেন, ইউরোপে ইংল্যান্ডের সঙ্গে ফ্রান্সের লড়াই বেঁধে গিয়েছে। দক্ষিণ ভারতে ইংরেজদের সঙ্গে ফরাসিদের মধ্যে যুদ্ধ লাগতে পারে যে-কোনও সময়। ক্লাইভ ও ওয়াটসন যেন অবিলম্বে সৈনসামন্ত নিয়ে মাদ্রাজে ফিরে আসেন।
চিঠিটা ভাঁজ করে নিজের লম্বা কোটের পকেটে রাখলেন কর্নেল। তারপর দ্রুত ফিরে গেলেন নিজের ক্যাম্প অফিসে।
পিগট সাহেবের চিঠির উত্তরে ক্লাইভ লিখলেন, ‘ফোর্ট উইলিয়াম পুনর্দখল হয়েছে। তবে এখানেই আমি থেমে থাকিনি। হুগলি শহর তছনছ করে দিয়েছি। এতে নবাবের সৈন্যদলের মধ্যে ত্রাসের সঞ্চার করা গিয়েছে। নবাবের দরবারের বিক্ষুব্ধ গোষ্ঠীর লোকেরা যাতে আমাদের সঙ্গে হাত মেলায় সেই জন্য হুগলি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দিয়ে আমাদের শক্তি প্রদর্শন অপরিহার্য হয়ে পড়েছিল। নবাব সৈন্য নিয়ে ফের কলকাতায় আসছেন। নবাবের সঙ্গে আর একটা লড়াই আসন্ন। বাংলার বিষয়ে একটা হেস্তনেস্ত না করে আমার পক্ষে এখনই মাদ্রাজে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।’
মাদ্রাজগামী ডাক-জাহাজে চিঠিটা পাঠিয়ে দিয়ে খোলা আকাশের নীচে পায়চারি করতে লাগলেন ক্লাইভ। মনের মধ্যে একরাশ দুশ্চিন্তা। ইউরোপে ইঙ্গ-ফরাসি যুদ্ধ লেগেছে এ খবর শুনলে চন্দননগরের ফরাসিরা নবাবের দলে ঝুঁকে পড়বে। নবাবের সঙ্গে ফরাসিরা যোগ দিলে পরিস্থিতি খুব ঘোরালো হয়ে উঠবে। যে করেই হোক থামাতে হবে আসন্ন এই যুদ্ধ। খুব দ্রুত সমঝোতা করতে হবে নবাবের সঙ্গে। এই উদ্দেশেই তিনি ত্রিবেণীতে পাঠিয়েছেন ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণকে। তারা কি আলোচনা চালিয়ে ফৌজ নিয়ে কলকাতা আসা থেকে নবাবকে বিরত করতে পারবে?
নবাবের কাফেলা মানেই বিশাল এক লটবহর। নবাবের বাহিনী যেখানে ছাউনি ফেলে তার বিস্তৃতি হয় প্রায় দশ মাইল এলাকা জুড়ে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা যাওয়ার পথে তাঁবু ফেলা, তাঁবু গোটানো, সব সরঞ্জাম সামলে নিয়ে চলা বিরাট ঝকমারির কাজ। এতে অনেকটা সময় লেগে যায়।
কয়েকজন সেনাপতি ও হাজার পনেরো জবরদস্ত সৈন্য সঙ্গে নিয়ে নবাব এগিয়ে চলেন খুব দ্রুত। কামানের গাড়ি, রসদের গাড়ি, বারুদের গাড়ি, সব কিছু সামলে নিয়ে ফৌজের বাকি অংশ আসতে থাকে একটু তফাতে। গন্তব্য স্থলের কাছে গিয়ে একদিন কি দুদিনের ব্যবধানে গোটা বাহিনী একসঙ্গে মিলিত হয়।
বাঁশবেড়িয়া থেকে গঙ্গা পেরিয়ে কলকাতার দিকে দ্রুত এগোতে লাগলেন নবাব। সঙ্গে মোহনলাল, মিরমদন, মিরজাফর, রায়দুর্লভ ও অন্য প্রধান সেনাপতিরা। সঙ্গে পনেরো হাজার বাছাই করা সৈন্য। বাকিরা কামানের গাড়ি, রসদের গাড়ি, বারুদের গাড়ি সব সামলে আসছে বেশ খানিকটা পিছনে।
সেনাবাহিনীর একেবারে পিছনে আসছেন জগৎশেঠ। সঙ্গে দেওয়ান রণজিৎ রায়, জগৎশেঠের দেহরক্ষী দলের প্রধান মনসবদার ইয়ার লতিফ খান ও এক হাজার সেনা। ত্রিবেণী এসে সান্নিপাতিক জ্বরে পড়েছিলেন জগৎশেঠ। বাধ্য হয়ে কয়েক’দিন বিশ্রাম নিতে হয়েছে। তাই পিছিয়ে পড়েছেন। নবাবের সঙ্গে সঙ্গে এগোতে পারেননি।
বাঁকিপুর ছাড়িয়ে নীলগঞ্জের পথ ধরে বারাসাতে এসে পৌঁছলেন সিরাজদ্দৌলা। আর মাত্র কয়েক ঘণ্টার পথ। আজ সন্ধের মধ্যেই হালসিবাগানে উমিচাঁদের হাভেলিতে পৌঁছে যাওয়ার কথা। যত কলকাতার দিকে এগোচ্ছেন তত দুশ্চিন্তা চেপে বসছে নবাবের মনে। আবেগের বশে আর ঝোঁকের মাথায় সিরাজ বেরিয়ে পড়েছেন কলকাতার পথে। এখন মনে হচ্ছে আম্মিজান ও নানিবেগমের কথা শুনে কলকাতা না এসে মুর্শিদাবাদে বসে কড়া কড়া চিঠি লিখে ইংরেজদের চাপে রাখলেই ভালো হত। অনেকগুলো বিষয় সিরাজদ্দৌলার মনটাকে চঞ্চল করে তুলেছে।
আগেরবারে কলকাতা অভিযানের সময় ইংরেজদের শক্তি সম্বন্ধে সম্যক ওয়াকিবহাল ছিলেন নবাব। এবারে খানিকটা ধোঁয়াশার মধ্যে রয়েছেন। কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়াটসন যে কতটা শক্তি ধরেন, এ নিয়ে স্পষ্ট ধারণা নেই সিরাজদ্দৌলার। নানারকম পরস্পর বিরোধী মতামতে তিনি বিভ্রান্ত।
গেল বছরে যে জোশ তিনি দেখেছিলেন নিজের সেনাবাহিনীর মধ্যে, এবারে সে জোশ যেন উধাও। নবাব যুদ্ধে যেতে বলেছেন তাই যেন দায়ে ঠেকে যুদ্ধে চলেছে সেনারা। অবশ্য মোহনলাল, মিরমদন, ও তাঁদের বাহিনীর কথা আলাদা। ইংরেজদের দুঃসাহসিক হুগলি অভিযান সত্যি সত্যিই বেশ খানিকটা সন্ত্রস্ত করে তুলেছে নবাবের বাহিনীর বড় একটা অংশকে।
এর উপরে নবাবের গুপ্তচর বাহিনী খবর এনেছে, আগ্রা ও দিল্লি লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছেন আফগান সুলতান আহম্মদ শাহ আবদালি। উত্তর ভারতে আগুন জ্বলছে। শোনা যাচ্ছে বাংলায় হানা দিতে পারেন আবদালি। ত্রিবেণীতে বসে এই খবরটা পেয়েছেন নবাব। এই সময় মুর্শিদাবাদ ছেড়ে সেনাবাহিনী নিয়ে কলকাতায় যাওয়া বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ।
ত্রিবেণী ছাড়িয়ে এসে নবাবগঞ্জে পৌঁছে উমিচাঁদের আর একটা চিঠি পেলেন নবাব। উমিচাঁদ লিখেছেন, হুজুর খবর পাচ্ছি আবদালি হানা দিতে পারেন বাংলায়। এসময় মুর্শিদাবাদ থেকে খুব দূরে থাকা উচিত হবে না আপনার। আপনি সন্ধির প্রস্তাব দিয়ে একটা চিঠি দিন কোম্পানিকে। তাদের প্রতিক্রিয়ার জন্য অপেক্ষা করুন। কলকাতার দিকে আপাতত এগোবেন না। আপনার শর্ত অনুযায়ী কোম্পানি যদি আপোশে বিষয়টা মিটমাট করে নেয় তাহলে খুবই ভালো। জিত হবে আপনার। আর আবদালি যদি বাংলার দিকে এগিয়ে আসেন, আপনিও ফৌজ নিয়ে তুরন্ত মুর্শিদাবাদে ফিরতে পারবেন।
উমিচাঁদের এই চিঠি পেয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন সিরাজদ্দৌলা। দুম করে একটা চিঠি লিখে পেত্রস আরাটুনের মারফত পাঠিয়ে দিলেন কর্নেল ক্লাইভকে।
নবাব লিখলেন, আপনারা হুগলিতে লুঠপাট করেছেন। এটা মোটেও বণিকসুলভ আচরণ নয়। আপনাদের এই বেতমিজি আমাকে ফৌজ নিয়ে কলকাতার দিকে কুচ করতে বাধ্য করেছে। তবে অন্যান্য ভিনদেশি বণিকদের মতো আপনারা যদি শুধু ব্যবসা বাণিজ্যে নিজেদের নিয়োজিত রাখেন তাহলে আপনাদের ব্যবসার অধিকার ফিরিয়ে দিতে আমার কোনও আপত্তি নেই। এদেশে ব্যবসা করতে হলে আমার কানুন অনুযায়ী চলতে হবে আপনাদের। এই প্রস্তাবে আপনারা যদি রাজি থাকেন, তবে আপনার প্রতিনিধি দলকে আমার কাছে পাঠিয়ে দিয়ে সমঝোতার বিষয়ে আলোচনার পথ খোলা রাখতে পারেন। আমার শর্ত আপনারা মেনে নিলে আমি ফৌজ নিয়ে ফিরে যাব। গত বছরের যুদ্ধে আপনাদের যে লোকসান হয়েছে, তার খেসারতের বিষয়েও ভেবে দেখব।
ভয়ানক অস্থিরচিত্ত হয়ে পড়েছেন সিরাজদ্দৌলা।
চিঠিটা পাঠিয়েই তিনি আফশোস করতে লাগলেন—হায় আল্লা! কেন এই চিঠি লিখলাম? তামাম দুনিয়া মনে করবে নবাব সিরাজদ্দৌলা ডরপোক। নালায়েক। মাদ্রাজ থেকে আসা কোম্পানির ফৌজের ভয়ে আমি সমঝোতা করতে চাইছি। আমি জোর গলায় অনেককে বলেছি এই টোপিওয়ালা ইংরেজদের শায়েস্তা করতে আমার একপাটি পয়জারই কাফি। এরপরে তো ইংরেজরা তামাশা করবে আমাকে নিয়ে। না! কর্নেল ক্লাইভের জবাবের জন্য অপেক্ষা করব না আমি। ফৌজ নিয়ে এগিয়ে যাব। কোম্পানি যদি সমঝোতা করতে চায় তো কথা হবে কলকাতাতে বসেই। আর যাই হোক কেউ আমাকে ডরপোক বলতে পারবে না।
বারাসত ছাড়িয়ে এগিয়ে চললেন সিরাজদ্দৌলা।
হুগলি নদী বেয়ে ত্রিবেণীর দিকে তিরবেগে এগিয়ে চলেছে ওয়ালশ ও স্ক্র্যাফটনের নৌকা। নবাব যে ত্রিবেণী ছাড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে এসেছেন, এ সংবাদ তাদের জানা নেই।
নবাবগঞ্জের কাছে এসে নবকৃষ্ণর চোখে পড়ল, নদীর পাড়ে বেশ কিছু সংখ্যক তাঁবু। মজুরের দল তাঁবুর কানাত খুলে খুঁটি উপড়ে নিচ্ছে।
দূরবিন চোখে লাগিয়ে স্ক্র্যাফটন দেখলেন, দশ পনেরোখানা গো-গাড়ির প্রত্যেকটার উপর বসানো রয়েছে কামান। গাড়িগুলোর সঙ্গে জোতা তাগড়াই চেহারার সব বলদ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জাবর কাটছে। গোটা বিশেক হাতির দলকে সারিবদ্ধ করে দাঁড় করাচ্ছে মাহুতেরা। নদীর তীরে সবুজ বুনো ঝোপ ধ্বংস করে চলেছে উটের একটা কাতার। গঙ্গার তীরে নোঙর করে আছে মস্ত একটা বজরা ও কয়েক খানা নৌকা। বজরার মাথায় উড়ছে নিজামতের নিশান।
স্ক্র্যাফটন শুধোলেন, ‘ব্যাপার কী বলো তো মুনশি। এ তো মনে হচ্ছে নবাবের ফৌজ।’
দূরবিন চোখে লাগিয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আজ্ঞে স্যার ঠিকই আন্দাজ করেছেন।’
ওয়ালশ বললেন, ‘সর্বনাশ। নবাব তো কলকাতার খুব কাছে এসে পড়েছেন।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘ভালোই হয়েছে। আমাদের আর উজিয়ে ত্রিবেণী পর্যন্ত যেতে হবে না।’
বহরদারদের উদ্দেশে নবমুনশি বললেন, ‘নৌকো পাড়ে লাগাও।’
ওয়ালস, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ নৌকো থেকে নামতেই দেখেন ঘাটের দিকে এগিয়ে আসছে একটা ঝালরদার পালকি। পালকির পিছনে পদচারীদের একটা দল। সেই দলের মধ্যে রয়েছেন জগৎশেঠের দেওয়ান রণজিৎ রায়।
বাহকেরা ঘাটে পালকি থামাতেই পালকির ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ।
শেঠজিকে দেখে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘সেলাম শেঠজি।’
স্ক্র্যাফটনকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে উঠে জগৎশেঠ শুধোলেন, ‘স্ক্র্যাফটন সাহেব না?’
মুচকি হেসে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘ইয়েস।’
জগৎশেঠের বিস্ময় কাটতে চায় না। ‘আপনি এখানে?’
‘উই ওয়ান্ট টু মিট নবাব।’
‘নবাব তো দুদিন আগে এ জায়গা ছেড়ে চলে গিয়েছেন। এতক্ষণে হয়তো হালসিবাগানে উমিচাঁদের হাভেলিতে পৌঁছেও গিয়েছেন।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সর্বনাশ। আর ফৌজ?’
রণজিৎ রায় বললেন, ‘ফৌজের বড় অংশই চলে গিয়েছে নবাবের সঙ্গে। কিছু হাতি, উট আর কামানের গাড়ি আর হাজার পাঁচেক লস্কর পড়ে রয়েছে। সেগুলো এখনই রওনা হয়ে যাবে।’
‘আপনি কোথায় যাচ্ছেন?’ প্রশ্ন করলেন ক্যাপ্টেন ওয়ালশ।
ভারী অবাক হওয়ার মতো মুখচোখ করে জগৎশেঠ বললেন, ‘কেন? কলকাতায় যাচ্ছি।’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘স্ট্রেঞ্জ! আপনি ফৌজের একেবারে পিছনে?’
মুচকি হেসে জগৎশেঠ বললেন, ‘তবিয়ত আচ্ছা নেই। একটু জিরিয়ে নিচ্ছিলাম।’
রণজিৎ রায় শুধোলেন, ‘আপনারা মনে হচ্ছে নবাবের সঙ্গে দেখা করার জন্য খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন?’
মহাতপচাঁদ শুধোলেন, ‘খাস বাত কী আছে?’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘আপনি হয়তো আমাদের হেল্প করতে পারবেন শেঠজি।’
‘এ ভাবে ঘাটে দাঁড়িয়ে কথা বলা মুশকিল। বজরায় আসুন।’
বিলাসবহুল বজরা। ভিতরে ফরাসপাতা বিরাট দরবার কক্ষ। দেওয়াল ও ছাত রুপোর পাতে মোড়া। তার উপর লতাপাতার নকশা দেখার মতো। ছাত থেকে ঝুলছে বহু মূল্যবান ঝাড়বাতি।
জগৎশেঠ বললেন, ‘বলুন, আপনারা কী মদত চান?’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘আমরা যুদ্ধ চাই না শেঠজি। এ যুদ্ধ থামাতে হবে।’
জগৎশেঠ অবাক হয়ে শুধোলেন, ‘তার মানে? কী বলতে চাইছেন?’
স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘উই ওয়ান্ট পিস। আমরা কারবারি। যুদ্ধবাজ নই।’
‘কিন্তু গোলমাল তো পাকালেন আপনারাই। হুগলিতে আগুন লাগালেন কেন?’
‘নবাব গতবছর আমাদের কতটা তকলিফ দিয়েছেন ভাবুন? আমরা বদলা নেব না?’
চোখ গোল্লা করে জগৎশেঠ বললেন, ‘এই যে বললেন আপনারা শান্তি চান।’
কথার খেই হারিয়ে খাবি খেতে লাগলেন স্ক্র্যাফটন।
নবকৃষ্ণ বলে ওঠেন, ‘পরপর অন্যায় ঘটলে কোম্পানি কি করে চুপ করে থাকে হুজুর? তবে একথা ঠিক যে যুদ্ধবিগ্রহে দেশটা একেবারে ধবংস হয়ে যাক, এটা মোটেই চাইছে না কোম্পানি।’
স্ক্র্যাফটন ফের কথার সূত্র খুঁজে পেয়ে বললেন, ‘রাইট। অনেক জুলুম হয়েছে আমাদের উপর। নবাবের কলকাতা আক্রমণের ফলে আমাদের কত লোকসান হয়েছে আপনি ভেবে দেখুন। থিংক অ্যাবাউট ব্ল্যাকহোল ট্রাজেডি। এত কিছুর পরেও উই ওয়ান্ট টু সাইন অ্যা পিস ট্রিটি উইথ নবাব।
রণজিৎ রায় শুধোলেন, ‘হুগলিতে যা কাণ্ড ঘটিয়েছেন আপনারা, এর পরেও কি নবাব আপনাদের কথা শুনবেন?’
জগৎশেঠ দুম করে প্রশ্ন করে বসলেন, ‘আপনারা কি নবাবের ফৌজকে ভয় পাচ্ছেন?’
মাথা ঝাঁকিয়ে ওয়ালশ বললেন, ‘উই আর নট অ্যাফ্রেড। সাউথে কর্নেল ক্লাইভ নবাবের চেয়েও অনেক পাওয়ারফুল এনিমির সঙ্গে লড়েছেন। কামেয়াব হয়েছেন। কর্নেল চান না বেঙ্গলে কোনও ক্রুয়েলটি দেখাতে।’
ওয়ালশের কথার সঙ্গে স্ক্র্যাফটন যোগ করলেন, ‘আমাদের সব কথা নবাবকে বুঝিয়ে বলা চাই। আপনি বলবেন।’
মহাতপচাঁদ বললেন, ‘দেখুন, কলকাতায় পৌঁছতে আমার কিছুটা দেরি হতে পারে। নবাব কলকাতা পৌঁছে গেলেই হয়তো লড়াই বেঁধে যাবে। আপনাদের উপর ভয়ানক চটে আছেন নবাব। লড়াই যদি থামাতে চান তবে আপনারা এখনই হালসিবাগানে হাজির হয়ে নবাবের সঙ্গে সরাসরি কথা বলুন। একমাত্র তিনি ছাড়া এ লড়াই থামানোর ক্ষমতা কারও নেই।’
ওয়ালশ, স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণ বিদায় নিতেই রণজিৎ রায় বললেন, ‘ক্লাইভ সাহেব তো মনে হচ্ছে কাগুজে বাঘ। নবাবের ফৌজের কথা শুনেই ঘাবড়ে গিয়ে সমঝোতার জন্য লোক পাঠিয়েছেন।’
‘তাই তো মনে হচ্ছে।’ হতাশ গলায় বললেন জগৎশেঠ।
‘এরা নবাবের কাছে গিয়ে সমঝোতার জন্য দরবার করলে জিত হবে নবাবের।’
জগৎশেঠ বললেন, ‘নবাব সর্বশক্তিমান হয়ে উঠবেন। মুর্শিদাবাদ ফিরে হাতে মাথা কাটবেন। আমরা একেবারে বরবাদ হয়ে যাব। পরিস্থিতি খুব ঘোরালো হয়ে উঠছে দেওয়ানজি। নবাবকে লড়াইয়ের ময়দানে ফেলে বেইজ্জত না করতে পারলে আমাদের কোনও আশা নেই। মিরজাফর, রায়দুর্লভের মনের খবর আমি জানি। এ লড়াই বন্ধ হলে চলবে না। সমঝোতার কোশিস ভেস্তে দিতে হবে। বহরদারদের দ্রুত দাঁড় বাইতে বলুন। আমাদের তাড়াতাড়ি হালসিবাগানে পৌঁছতে হবে।’
বিকেলের দিকে ক্লান্ত হয়ে বরানগরের ক্যাম্পে ফিরে এলেন স্ক্র্যাফটন, ওয়ালশ ও নবকৃষ্ণ। তাদের দেখেই উৎকন্ঠার সঙ্গে ক্লাইভ শুধোলেন খবর কী?
হতাশার সঙ্গে মাথা নেড়ে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘নবাবের সঙ্গে দেখা হয়নি। তিনি খুব সম্ভবত হালসিবাগানে পৌঁছে গিয়েছেন।’
স্ক্র্যাফটনের পিঠে আলতো চাপড় মেরে ক্লাইভ বললেন, ‘ডোন্ট বি ফ্রাস্ট্রেটেড। নবাবের একটা চিঠি আমি পেয়েছি। তিনি যুদ্ধ চান না। আমাদের সঙ্গে সমঝোতা করতে চাইছেন।’
স্ক্র্যাফটন উৎসাহের সঙ্গে বললেন, ‘রিয়েলি?’
ক্লাইভ বললেন, ‘ইয়েস। ইট ইস অ্যা গোল্ডেন অপারচুনিটি ফর আস। তোমাদের এখনই হালসিবাগানে যেতে হবে। আমি সমঝোতা চাই আমাদের শর্তে।’
কিছুক্ষণ পর হালসিবাগানে উমিচাঁদের বাড়ির উদ্দেশে ছুটে চলল পাঁচজন ঘোড়সওয়ার। স্ক্র্যাফটন, ওয়ালশ, নবকৃষ্ণর সঙ্গে এবারে ক্লাইভের নির্দেশে চলল টিম লরেন্স ও স্ট্রন। সন্ধির আলোচনার পাশাপাশি নবাবের বাহিনীর শক্তি যে ঠিক কতটা সে বিষয়ে সঠিক ধারণা চাইছেন ক্লাইভ। তিনি এই গুপ্তচরবৃত্তির দায়িত্ব দিয়েছেন লরেন্স ও স্ট্রনের উপর।
স্ট্রন ও লরেন্স চলেছে ওয়ালশ স্ক্র্যাফটন ও নবকৃষ্ণর সঙ্গে খানিকটা তফাত বজায় রেখে। তাদের দুজনেরই বেশবাস হাবসি সৈন্যদের মতো।
অন্ধকার নামছে। একটু পরেই কালো চাঁদরে মাথা মুড়বে কলকাতা।
