1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ২৯

২৯

ফলতার উদ্বাস্তু শিবিরে ভালোবাসায় বাঁধা পড়া দুজনের। তারপরে বিয়ে।

হোগলার বেড়ায় ঘেরা চারপাশ, মাথায় গোলপাতার ছাউনি, সুন্দরী গাছের গুঁড়ি কেটে বানানো পবিত্র ক্রুশ চিহ্ন—এমনই ছিল ফলতার উদ্বাস্তু শিবিরে ইংরেজদের অস্থায়ী চার্চ। সেখানেই বিয়েটা সেরে নিয়েছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস ও মেরি বুকানন। অন্ধকূপে নিহত ক্যাপ্টেন বুকাননের বিধবা পত্নী মেরি বুকানন এখন মেরি হেস্টিংস।

মেরির বাবা ক্যাপ্টেন কুক ছিলেন বিরাট ধনী। দেহ রেখেছেন কলকাতা যুদ্ধের কয়েক মাস আগে। উত্তরাধিকার সূত্রে মেরি অতুল ঐশ্বর্যের মালকিন হয়েছেন।

ওয়ারেন হেস্টিংস এখন তাই অনেকেরই ঈর্ষার পাত্র। কলকাতায় বসে এমন বিত্তশালী, সুন্দরী নীলনয়না কজন সাহেবের ভাগ্যে জোটে? অনেকে আড়ালে ফিসফাস করে, এ ছোকরা দেখছি একেবারে নবাব হওয়ার ভাগ্য নিয়ে জন্মেছে।

ফলতায় বিয়েটা হয়েছিল অনাড়ম্বরে। তবে পরিস্থিতি অনুকূল হলে জাঁকাল একটা রিসেপশন পার্টির প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন হেস্টিংস ও মেরি দুজনেই। একদিন ঘরোয়া আড্ডায় উইলিয়াম ওয়াটসের ঘরনি প্রসঙ্গটা তুলে বললেন, ‘পার্টিটা দিচ্ছ কবে ওয়ারেন? আমরা একটু ফূর্তি করব না? প্রিন্সেসকে পেয়ে সব ভুলে গেলে নাকি?’

লাজুক হাসি হেসে ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘বেশ তো ম্যাডাম আপনি একটা দিন ঠিক করে দিন।’

উইলিয়াম ওয়াটস পাইপ ধরিয়ে বললেন, ‘ওদের একটু সময় দাও বিবি। কাশিমবাজার থেকে পালিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে ওয়ারেন। কলকাতায় ওর ঘরবাড়ি নেই। লালদিঘির পাড়ে মেরির বাবার বিউটিফুল বাংলোটা নবাবের সোলজাররা ডেসট্রয় করে দিয়ে গেছে। এখন বেচারারা পার্টি অ্যারেঞ্জ করবে কোথায়?’

মেরি হেস্টিংস মৃদু গলায় বললেন, ‘পার্টিটা আমাদের বাগবাজারের বাগানে হতে পারে।’

বিবি ওয়াটস জোর দিয়ে বললেন, ‘উঁহু! পেরিন পয়েন্ট ফার অ্যাওয়ে। আমাদের বাংলো সবার জন্যেই খুব কনভিনিয়েন্ট হবে। পার্টি হবে আমাদের বাংলোর লনে।’

হেস্টিংস মাথা ঝুঁকিয়ে বললেন, ‘ইটস আওয়ার প্লেজার ম্যাডাম।’

ফলতা থেকে কলকাতায় ফিরে উইলিয়াম ওয়াটসের বাংলোয় এসে উঠেছেন হেস্টিংস দম্পতি। ভাড়াবাড়ির সন্ধান করছিলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। মেরির ইচ্ছে ছিল বাগবাজারের বাগানবাড়িতে গিয়ে ওঠা। হেস্টিংস রাজি হননি। সত্যিই পেরিন পয়েন্ট কলকাতার সাহেবপাড়া থেকে বড্ড দূর হয়ে যায়। বিবি ওয়াটস একরকম জোর করে ওয়ারেন ও মেরিকে নিজেদের বাংলোয় নিয়ে এলেন। এই মহিলার আন্তরিকতায় কোনও খাদ নেই।

ওয়াটস পরিবারের সঙ্গে ওয়ারেন হেস্টিংসের ঘনিষ্ঠতা অনেকদিনের। কাশিমবাজার কুঠিতে হেস্টিংস ছিলেন রাইটার, ওয়াটস কুঠির অধ্যক্ষ। তবে পদের এই বৈষম্য মেলামেশার ক্ষেত্রে বাধা হয়নি। উইলিয়াম ওয়াটস আমুদে লোক। নিজে খেতে ভালোবাসেন। লোককে খাওয়াতে ভালোবাসেন। বিবি ওয়াটসও দারুণ ফূর্তিবাজ লেডি। আমোদ, হইচই, হুল্লোড়—এসব খুব পছন্দ করেন। কাশিমবাজারে ওয়াটস সাহেবের বাংলোয় প্রায়ই লেগে থাকত নৈশভোজ। ডিনার পার্টিতে আমন্ত্রিত মেমসাহেব মহলে খুবই পপুলার ছিলেন পঁচিশ বছরের সুদর্শন যুবক ওয়ারেন হেস্টিংস। বিবি ওয়াটস বিশেষ স্নেহ করতেন তাঁকে।

ফোর্ট উইলিয়ামের উত্তর পশ্চিম কোণে উইলিয়াম ওয়াটসের বাংলো বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে অবস্থিত। ঘন সবুজ গালিচার মতো বিরাট বড় লন গাছপালার বেড় দিয়ে সুন্দর করে সাজানো। লনের মাঝে খাটানো হয়েছে বাহারি বড়সড় একটা চাঁদোয়া। চারিদিকে বসানো হয়েছে শ্বেতপাথরের অনেক বাতিস্তম্ভ। তাতে জ্বলছে মশাল। কড়া শীতে গা গরম রাখার জন্য লনের চার কোনায় বড় বড় আগেনগারের আগুনও আলোকিত করে তুলেছে বাগানকে। জায়গায় জায়গায় পিতলের বড় কানা উঁচু রেকাবিতে সাজানো রয়েছে সুগন্ধি ফুল।

ফুলের গন্ধে, মোহময় আলোছায়ায় ঠিক যেন এক খণ্ড স্বর্গ হয়ে উঠেছে উইলিয়াম ওয়াটসের বাংলোর লন। ব্যস্ত হয়ে ছুটোছুটি করে বেড়াচ্ছেন বাংলোর মালকিন বিবি ওয়াটস। তাঁদের বাংলোয় আজ মেরি ও ওয়ারেন হেস্টিংসের রিসেপশন পার্টি।

চাঁদোয়ার নীচে এক প্রান্তে সাজানো হয়েছে মার্বেলের টপওয়ালা মেহগিনি কাঠের বাহারি লম্বা টেবিল। তার উপরে রুপোর পাত্রে রাখা সুস্বাদু খাবারদাবার থেকে ধোঁয়া উড়ছে। গরম জলের ডেকচির উপর রুপোর আধারগুলো চাপিয়ে খাবারদাবার উষ্ণ রাখার কোশিস করে চলেছে খানসামার দল।

বাগানের এক কোনার দিকে খাটানো হয়েছে ছোটখাটো আর একটা চাঁদোয়া। এর নীচে বারকাউন্টার। চকচকে পালিশ করা টেবিলের উপর সাজানো রয়েছে রকমারি মদের বোতল।

লনে প্রবেশ করার মুখে ফুল ও দেওদার পাতায় সাজানো তোরণদ্বারের সামনে দাঁড়িয়ে অতিথিদের স্বাগত জানাচ্ছেন হেস্টিংস দম্পতি।

মেরি পরেছে কনুই পর্যন্ত ফ্রিল দেওয়া হাতাওয়ালা আকাশি নীল রঙের উলের গাউন। গাউনের বাহারি প্লিট মেরির কোমর থেকে ঝরনার মতো নেমে এসেছে নীচে। মেরির মাথায় ম্যাচ করা লেস ক্যাপ। দুহাতে কনুই পর্যন্ত স্কিন টাইট সাদা গ্লাভস। পায়ে হিল তোলা জুতো।

ওয়ারেন হেস্টিংসের পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা গাঢ় বাদামি রঙের কোট ও ব্রিচেস। পায়ে সিল্কের মোজা। চামড়ার জুতো। মাথায় উপর দিকে কানা উঁচু তেকোনা টুপি। বর-কনে দুজনকেই অপূর্ব মানিয়েছে।

ফলতায় দুঃস্বপ্নের দিনগুলো কাটিয়ে কলকাতায় ফেরার পর এই প্রথম ইংরেজদের বড়সড় গেটটুগেদার। ওয়ারেন হেস্টিংসের ম্যারেজ রিসেপশন, একই সঙ্গে কলকাতায় ফেরার উল্লাস। সাহেবরা সব আজ খুশিতে মেতেছে। খ্রিসমাস ভালো কাটেনি তাদের। সে সময় জুড়ে চলেছে ফলতা থেকে কলকাতায় ফেরার লড়াই। নতুন বছরের প্রথম দিনে ফোর্ট উইলিয়ামের মাথায় উড়েছিল ইউনিয়ন জ্যাক। যুদ্ধের ধকলে ক্লান্ত ইংরেজরা গুছিয়ে ফূর্তি করার ফুরসত পায়নি।

মেরি ও ওয়ারেন হেস্টিংস সুখী হোক—১৭৫৭ সালটা ইংরেজদের ভালো কাটুক এই যুগপৎ শুভকামনায় আজ এই আনন্দের উৎসব। উইলিয়াম ওয়াটসের বাংলোর বাগানে ফূর্তির ফোয়ারা। ফলতায় ভালো মদ জোটেনি। তাই বার কাউন্টারের আশেপাশে ভিড় বড্ড বেশি। নিমেষে উড়ে যাচ্ছে বোতলের পর বোতল।

শুকনো মাদকদ্রব্যও আছে। তামাকের সঙ্গে মেশানো হয়েছে গঞ্জিকা। হুকোবরদাররা গড়গড়া হাতে ঘুরছে। ফরসির নল মুখে পুরে ভুরভুর করে টানছে সাহেবরা। অবশ্য খাঁটি অম্বুরি তামাকও রয়েছে। সব মিলিয়ে এলাহি আয়োজন।

কাশিমবাজার আক্রমণ করে সিরাজদ্দৌলা পরিবারসহ উইলিয়াম ওয়াটসকে বন্দি করেছিলেন। সিরাজের নানি বেগম শরফ উন্নেসার কাছে আশ্রয় পেয়ে ইজ্জত বেঁচেছিল বিবি ওয়াটসের। বন্দি নারী চিরকালই ভোগ্য বস্তু। অনেক ওমরাহেরই লোভ হয়েছিল খুবসুরৎ নীলনয়নার উপর। তাঁকে আগলে রেখেছিলেন শরফ উন্নেসা—সিরাজের নানি বেগম। আদর করে বিবি ওয়াটসকে তিনি বেগমসাহেবা বলে ডাকতেন। মাসখানেক হারেমে কাটানোর পর নানি বেগমেরই মদতে হারেম থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন বিবি ওয়াটস।

মুর্শিদাবাদে থাকাকালীন হারেমের জেনানাদের কাছ থেকে বিবি ওয়াটস একটি নেশা বেশ রপ্ত করে নিয়েছিলেন। সেটা হল ভাঙ। ঘরোয়া পার্টিতে চমক দিতে পছন্দ করেন ওয়াটস সাহেবের ঘরনি। এই পার্টিতে তিনি ভাঙের শরবতের ব্যবস্থাও রেখেছেন। সামনে দাঁড়িয়ে থেকে এক অভিজ্ঞ আবদারকে দিয়ে তিনি তৈরি করিয়েছেন এই শরবত।

এক জায়গায় দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন রজার ড্রেক, হলওয়েল ও উইলিয়াম ওয়াটস। কর্নেল ক্লাইভের বিষয়ে কথা হচ্ছিল তাঁদের। অদূরে একটা টেবিলে একা একা বসে আছেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। আড্ডা, পাঁচজনের সঙ্গে মেলামেশা একেবারেই ধাতে সয় না অ্যাডমিরালের। তাঁর প্রিয় সঙ্গী বিয়ার। চুপচাপ তিনি একের পর এক ম্যাসওয়ানস বিয়ারের বোতল শেষ করে চলেছেন। সেই সঙ্গে উড়িয়ে যাচ্ছেন চুরুটের ধোঁয়া।

হলওয়েল বললেন, ‘কর্নেলের বরানগরে ক্যাম্প করার যে কী কারণ তা আমি বুঝি না।’

উইলিয়াম ওয়াটস বললেন, ‘দ্যাটস অ্যা স্ট্রাটেজিক লোকেশন।’

রজার ড্রেক বললেন, ‘ন্যাস্টি প্লেস। শুনলাম কর্নেলের একজন সোলজার ক্যাম্প ফেলার সময় ওয়াইল্ড বোরের অ্যাটাকে ইনজিওরড হয়েছে।’

হলওয়েল বললেন, ‘ওই জঙ্গলে পড়ে থেকে লাভ কী হবে কর্নেলের? নবাবের আর্মির যা স্ট্রেনথ, তারা ফের যদি কলকাতায় আসে, তার ঝাঁঝ কি কর্নেল সামলাতে পারবেন? কত সোলজার আছে আমাদের?’

হলওয়েলের কথায় সায় দিয়ে রজার ড্রেক বললেন, ‘হুগলি অ্যাটাক ইস অলসো অ্যা সুইসাইডাল ডিসিশন। হুগলিতেই না ডিব্যাকল হয়। ফৌজদারের সঙ্গেই তো অ্যারাউন্ড থ্রি থাউজ্যান্ড সোলজার রয়েছে।’

‘হুগলি অ্যাটাকের অডাসিটি টলারেট করবেন না নবাব। তিনি ফের কলকাতায় এলে সকলের এই ফেস্টিভ মুড বজায় থাকবে কি? চিঠি লেখালেখি করে নবাবের সঙ্গে গোলমালটা মিটিয়ে নিলেই তো হত।’ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কথাগুলো বললেন ড্রেক।

পাশে এসে দাঁড়ানো আবদারের উপর নজর পড়ল হলওয়েলের। আবদারের হাতে রেকাবির উপর রাখা স্বচ্ছ বেলজিয়াম গ্লাসে সাদাটে পানীয় দেখে হলওয়েল শুধোলেন, ‘হোয়াট ইস দিস?’

ওয়াটস বললেন, ‘দিশি শরাব। ট্রাই করতে পারেন। দিস ইস স্পেশ্যালি প্রিপেয়ারড বাই মাই বেটার হাফ। মুর্শিদাবাদের রেসিপি। হারেমে খুব পপুলার।’

রজার ড্রেক বললেন, ‘ও রিয়েলি? আই উইল অলসো ট্রাই।’

আবদারের হাতে ধরা রেকাবি থেকে ড্রেক ও ওয়াটস দুটো গেলাস তুলে নিলেন।

চুমুক দিয়ে হলওয়েল বললেন, ‘নাইস। ইটস নাথিং বাট মিল্কশেক।’

‘রাইট। মিল্ক মিক্সড উইথ ড্রাই ফ্রুটস, সুগার অ্যান্ড লিভস অফ ক্যানাবিস।’

‘নাইস টেস্ট। এবারে একচুমুকে গেলাস সাবাড় করে দিলেন ড্রেক ও হলওয়েল দুজনেই।’

‘গুড হেলদি ড্রিঙ্ক। আমি আরও চাই।’ এই বলে হলওয়েল হাঁক দিলেন, ‘আবদার—’

ওয়াটস বললেন, ‘এটা ভালো। বাট টু মাচ নট গুড ফর হেলথ।’

এই উপদেশে কান না দিয়ে পর পর বেশ কয়েক গেলাস খেয়ে ফেললেন ড্রেক ও হলওয়েল। উইলিয়াম ওয়াটসের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল। তিনি দেখলেন, ড্রেক ও হলওয়েল দুজনে দুজনের সঙ্গে সমানে করমর্দন করে যাচ্ছেন, আর এ ওর পিঠ চাপড়াচ্ছেন। মৌতাত বেশ জমেছে। দুজনেই ক্যালকাটা কাউন্সিলের সিনিয়র মেম্বার। পার্টিতে উপস্থিত জুনিয়ারদের সামনে এবারে কী কাণ্ড ঘটাবেন কে জানে? বিপদ বুঝে ওয়াটস ছুটলেন হেস্টিংস ও স্ক্র্যাফটনকে ডাকতে। তাঁর একার পক্ষে এই দুই মহারথীকে সামলানো সম্ভব নয়।

একটু দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। ড্রেক ও হলওয়েলের আচরণ তাঁর কাছে কেমন যেন স্ট্রেঞ্জ ঠেকল। তিনি চেয়ার ছেড়ে উঠে এগিয়ে এসে শুধোলেন, হেই জেন্টলম্যান, হোয়াট হ্যাপেনড?

‘হ্যা-ল-ল-ও মিঃ ওয়াটসন। হাউ আর ইউ?’ হলওয়েলের এই হেঁড়ে গলার আওয়াজ শুনে আশেপাশে ছোট ছোট দলে বিভক্ত, গল্পগুজবে মত্ত, সাহেব-মেমরা ঘুরে তাকালেন। হলওয়েলের মেজাজটা পালকের মতো হালকা হয়ে গিয়েছে। সজোরে অ্যাডমিরালের পিঠে চপেটাঘাত করে বললেন, ‘মিঃ ওয়াটসন এনজয় দ্য পার্টি।’

অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। তিনি রাজার প্রতিনিধি। কোম্পানির একজন কর্মচারী কিনা তাঁর পিঠে চাপড় মেরে মশকরা করছে! তাও আবার এত ছেলে ছোকরার সামনে?

ভুরু কুঁচকে বিরক্তির সঙ্গে ওয়াটসন বললেন, ‘জেন্টলম্যান, বিহেভ প্রপারলি!’

এই কথা শুনে হ্যা-হ্যা-হ্যা করে আকর্ণ হাসি হাসতে লাগলেন, রজার ড্রেক ও হলওয়েল। হাসি আর থামতেই চায় না।

সকলের নজর পড়েছে ওই দিকে। যে যার চেয়ার ছেড়ে তামাশা দেখতে ছুটছে।

ওয়াটসনের রুক্ষ মেজাজ দেখে প্রমাদ গুণলেন বিবি ওয়াটস। হলওয়েল ও ড্রেক সাহেব কী করছেন, তা তাঁরা বুঝতেও পারছেন না। এর জন্য দায়ী ভাঙের শরবত।

রাগে ফেটে পড়লেন ওয়াটসন, ‘হোয়াট ইস ইওর প্রবলেম? এমন জোকারের মতো হাসছেন কেন আপনারা?’

রজার ড্রেক বললেন, ‘টু মাচ মিল্কশেক ইস নট গুড ফর হেলথ। হ্যা-হ্যা-হ্যা!’

হলওয়েলও হাসতে লাগলেন, ‘হ্যা-হ্যা-হ্যা!’

হাসতে হাসতে হলওয়েল ও ড্রেক এ ওর গায়ে ঢলে পড়তে লাগলেন। ওয়াটসন রাগে সিংহের মতো ফুঁসতে লাগলেন। তিনি ভাবলেন এরা বোধহয় তাঁকে নিয়ে মশকরা করছে। তিনি রনংদেহী মেজাজে মুঠি বাগিয়ে দুজনের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ার উদ্যোগ করতেই তাঁকে দুদিক থেকে টেনে ধরলেন ওয়াটস, স্ক্র্যাফটন ও হেস্টিংস। ঠিক তখনই চমকে উঠল সবাই।

নদীর দিক থেকে ভেসে এল কামানের গর্জন। পর পর তিনবার।

রজার ড্রেক চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘অ্যালার্ট! নবাব অ্যাটাকড ক্যালকাটা এগেইন।’

হলওয়েল ও ড্রেক দুজনেই ছুটে পালাতে গিয়ে উলটে পড়লেন মাটিতে। ভাঙের কড়া নেশায় দুজনের আর মাটি ছেড়ে ওঠার ক্ষমতা নেই। আবদার, দাখিলার দল ছুটে এসে ধরাধরি করে দুই বড় সাহেবকে নিয়ে গেল ওয়াটসের বাংলোর ভিতরে।

ড্রেক ও হলওয়েলের কী হল, সেদিকে নজর নেই কারও। কামানের আওয়াজ ভয় ধরিয়েছে অনেকের মনে। সত্যিই ফের নবাব এসে পড়লেন নাকি?

বিষয়টা কি সরেজমিনে দেখতে অনেকেই মশাল হাতে ছুটল গঙ্গার দিকে। গঙ্গার পাড়ে গিয়ে উদ্বেগ কেটে গেল সকলের। পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় মাখামাখি গঙ্গার কালো জলে হলদে ছোপ। নদীর জল তোলপাড় করে এগিয়ে আসছে ব্রিজওয়াটার। জাহাজের পাশাপাশি দাঁড় বেয়ে এগিয়ে আসছে বড় একটা বজরা।

খানিকবাদে বজরা এসে ভিড়ল উইলিয়াম ওয়াটসের কুঠির ঘাটে। বজরা থেকে নেমে এলেন কর্নেল ক্লাইভ। সঙ্গে কিলপ্যাট্রিক, আয়ারকুট, কিং, স্ট্রন ও নবকৃষ্ণ।’

ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘ওয়েলকাম স্যার।’

‘সরি ওয়ারেন। আমার আসতে একটু দেরি হয়ে গেল। বললেন ক্লাইভ।’

মেরি হেস্টিংস বললেন, ‘রাত এমন কিছু বেশি হয়নি।’

ক্লাইভ মজা করে বললেন, ‘খাবারদাবার ফুরিয়ে যায়নি বলছ?’

বিবি ওয়াটস বললেন, ‘সব মজুত আছে।’

হাঁটতে হাঁটতে ক্লাইভ বলতে লাগলেন, ‘এখানে আসব বলে বিকেলের দিকে যখন বজরায় উঠতে যাচ্ছি, তখন দেখলাম দূরে দেখা যাচ্ছে ব্রিজওয়াটারকে। রিটার্নিং ব্যাক ফ্রম হুগলি। আই ওয়াজ অ্যাংশাস অ্যাবাউট হুগলি এক্সপিডিশন। কোনও খবর পাইনি। জাহাজটাকে থামালাম। কিলপ্যাট্রিক, আয়ারকুট ও কিংকে তুলে নিলাম বজরায়। হুগলি এক্সপিডিশনের কহানি শুনতে শুনতে এতটা পথ এলাম।’

উইলিয়াম ওয়াটসের বাড়ির লনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালেন কর্নেল ক্লাইভ। সম্মান দিয়ে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনকে ডেকে নিলেন তাঁর পাশে। ভাঙের শরবত খেয়ে যে কাণ্ড ঘটিয়েছিলেন রজার ড্রেক ও হলওয়েল, তারপর থেকে গুম হয়েছিলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। তখনও ভিতরে ভিতরে রাগে ফুঁসছিলেন। কর্নেল ক্লাইভের কাছ থেকে খাতির পেয়ে তাঁর রাগটা কমল।

ক্লাইভ বললেন, ‘আমাদের দুজনের তরফ থেকে আপনাদের সবাইকে একটা গুড নিউজ দেওয়ার আছে। মেজর কিলপ্যাট্রিক, ক্যাপ্টেন আয়ারকুট ও ক্যাপ্টেন কিং খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তছনছ করে দিয়েছে হুগলি শহর ও বন্দর। নবাবের বিরুদ্ধে এই আমাদের বদলা নেওয়ার শুরু।’

সকলে উল্লাসে হইহই করে উঠল।

ওয়ারেন হেস্টিংসের উদ্দেশে ক্লাইভ বললেন, ‘চমৎকার অ্যারেঞ্জমেন্ট করেছ। কিন্তু মিউজিক কোথায়?’

‘আছে স্যার। ফৌজির ব্যান্ডেই গান বাজছিল এতক্ষণ। ওরা বোধ হয় টায়ার্ড হয়ে পড়েছে। আমি দেখছি।’

‘না না, তোমাকে ব্যস্ত হবে না। ওহে মিঃ স্ট্রন তুমি তো বাহাদুর ট্রাম্পেট বাজিয়ে। পার্টিটা একটু জমিয়ে দাও দেখি।’

উৎসাহের সঙ্গে স্ট্রন বলল, ‘সিওর স্যার।’

সন্ধে থেকে গান বাজিয়ে সত্যিই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ফৌজি ব্যান্ডের বাজিয়েরা। ট্রাম্পেটটা তুলে নিয়ে সুরের তুফান তুলল স্ট্রন। একেবারে রক্তে দোলা লাগানো সুর। ক্লান্তি ঝেড়ে লেগে পড়ল বাকি বাজিয়েরাও। ফের শুরু হয়ে গেল তুমুল নাচগান। আকাশের দিকে উড়ে যেতে লাগল একের পর এক হাউই। সেগুলো উপরে গিয়ে নকশাদার আলোয় ভরে দিতে লাগল রাতের আকাশকে।

মেরি ও ওয়ারেন হেস্টিংসের রিসেপশন, কলকাতায় ইংরেজদের ফিরে আসা, হুগলিবিজয় সব খুশি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল উইলিয়াম ওয়াটসের বাংলোর লনে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *