২৭
মনসুরগঞ্জে সিরাজদ্দৌলার প্রাসাদের থেকে ক্রোশখানেক দূরে মোরাদবাগ প্যালেস ঠিক যেন একখণ্ড বেহেস্ত। বিরাট বড় চৌহদ্দির মাঝখানে শ্বেতপাথরের তৈরি চমৎকার একখানা হাভেলি। চারিদিকে রকমারি ফুল ও ফলের বাগান, ফোয়ারা দিয়ে সাজানো। বাগানের মধ্যে দিয়ে পাথর বাঁধানো পথ এঁকেবেঁকে চলে গিয়েছে সদর দরওয়াজা পর্যন্ত।
পথের দুপাশে হেলেদুলে বেড়ে উঠেছে আঙুরলতার ঝোপ। সবুজ পাতার মাঝে কালো আঙুরের থোকা খুবসুরত এক বুঁটিদার নকশা। গুলাববাগ ভরে আছে বসরার লাল গুলাবে। বাগানের মাঝে ছড়িয়ে থাকা একাধিক চবুতরার শ্বেতপাথরের স্তম্ভকে বেড় দিয়ে সুশৃঙ্খল ভাবে উপরে উঠেছে মাধবীলতা। চবুতরার ছাদ ঢেকেছে সবুজ পাতায়। সাদা-লাল ফুলে।
মোরাদবাগ প্যালেসের পুবপ্রান্ত ছুঁয়ে চলে গিয়েছে গঙ্গা। উওরে, দক্ষিণে ও পশ্চিমে এই প্যালেসকে ঘিরে ধরেছে ছোট একটা ঝিল। প্রাকারের চারকোনায় বুরুজের উপর সতর্ক দৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে আছে হাতিয়ারবন্দ রক্ষী। একসময় নবাবের মেহমানরা এখানে এসে উঠতেন। মোরাদবাগের সুরম্য এই প্রাসাদ এখন মোহনলালের বসতবাটি।
মহারাজা মোহনলাল নবাব সিরাজদ্দৌলার বচপনকালের দোস্ত। বাংলার দেওয়ান। এই কাশ্মীরি যুবকের কিম্মত এখন নবাবের কাছে সব থেকে বেশি। প্রয়োজনে যে কোনও সময় তলব করলেই যাতে কাছে পাওয়া যায়, সেই কারণে দেওয়ানকে আরও কাছে নিয়ে এলেন নবাব। পূর্ণিয়া জয়ের খুশিতে মোরাদবাগ প্যালেস তোফা দিলেন দোস্তকে।
পাঁচহাজারি মনসবদার মোহনলাল এখন মুর্শিদাবাদ দরবারের ক্ষমতার অলিন্দে সব থেকে সাড়াজাগানো নাম। আড়ালে যারা বলেন আজনবি ভুঁইফোড় এক কাশ্মীরি, তারাই প্রতিদিন নিয়ম করে দরবারে এসে মোহনলালকে কুর্নিশ জানান।
‘সেলাম দেওয়ানজি! সহি সালামত। খুশ তবিয়ত থাকুন হুজুর। শ’বরষ জিন্দা থাকুন।’
কয়েক বছর আগেও যাকে চকবাজারের পথে আর পাঁচজন মামুলি ইনসানের মতো ঘুরতে দেখেছে রাজধানীর ওমরাহ থেকে আমআতরফ মানুষ, সেই মোহনলাল আজ দেশের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। নবাব সিরাজদ্দৌলার পরম ভরসার স্থল। নবাব তাঁকে দিয়েছেন পাঁচহাজারি মনসব, মহারাজা খেতাব, পূর্ণিয়ার শাসনভার ও মোরাদবাগ প্যালেস।
নিজের পাঁচ বছরের নাবালক পুত্র শ্রীমন্তলালের নামে পূর্ণিয়ার শাসন জারি করে, কয়েকজন যোগ্য আমলার হাতে শাসনকার্য দেখাশোনার ভার দিয়ে মোহনলাল ফিরে এসেছেন মুর্শিদাবাদে। নবাবের ইচ্ছায় চকবাজারের হাভেলি ছেড়ে পরিবার নিয়ে সদ্য উঠে এসেছেন মোরাদবাগ প্যালেসে। গঙ্গার পুবপাড়ের আবাস ছেড়ে চলে এসেছেন পশ্চিমে।
আলিবর্দির এন্তেকালের পর গত সাত-আট মাস ধরে বাংলার মসনদকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক উত্তেজনা, তামাম বাংলাকে তপ্ত করে রেখেছিল, তা এখন জুড়িয়ে এসেছে। মসনদের উপর সিরাজদ্দৌলার অধিকার প্রশ্নাতীত ভাবে প্রতিষ্ঠিত। গা-ঢাকা দিয়েছে সাজিশের কারবারিরা। আপাতত কোনও ঝুটঝামেলা নেই।
জীবনকে রঙ্গিলা করে তোলার এই তো ফুরসত!
রঙ্গিলা হয়ে উঠলেন মোহনলালও। খুশির রং লাগল তাঁর মনে। এই খুশির নাম খুশবু বাই। একদা শওকত জঙ্গের পিয়ারি এখন মোহনলালের বেশখ বুলবুল, মোরাদবাগের রংমহলের আগুন। খুবসুরত এই তয়ফাওয়ালির পেশোয়াজের ঘূর্ণিতে কামনার মাদকতা, বাদলকিনারি ওড়নার আড়াল থেকে ছুড়ে দেওয়া কটাক্ষে দিলজখমের কসম। দেওয়ান মোহনলাল বেসামাল।
খুশবু বাই সুখ চেয়েছিল। চেয়েছিল নিশ্চিন্ত এক জীবন। যেখানে হররোজ রোটি জোটানোর চিন্তা নেই। উত্তর ভারত থেকে মুজরোর সন্ধানে মুর্শিদাবাদে আসার পথে মণিহারিতে খুশবু বাইয়ের মোলাকাত হয়েছিল শওকত জঙ্গের সঙ্গে। তারপরই পূর্ণিয়ার হারেমে ঠাঁই হল খুশবুর। সব রকমের পার্থিব সুখ ও নিশ্চিন্ত জীবনের সন্ধান মিলল তুরন্ত।
সারেঙ্গিবাদক বসির খাঁর সঙ্গে খুশবু বাইয়ের জানকারি অনেকদিনের। বসির খাঁর প্রেমে কাতর চোখদুটোর দিকে আগে ভালো করে কখনও তাকানোর অবকাশ হয়নি খুশবুর। তার কাছ থেকে কেবল অবজ্ঞা ও তাচ্ছিল্য পেয়ে এসেছে বসির খাঁ। হঠাৎ একদিন খুশবু বাইয়ের নজরে পড়ল বসিরের চোখ দুটো। সে চোখ আশিকের। লালচের বেদরদি আগুন নেই তাতে। আছে মাশুকার জন্য নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দেওয়ার সাচ্ছা ওয়াদা। হারেমের জওহরে ততদিনে নীল হয়ে উঠেছে খুশবু। সারা অঙ্গে বিষম জ্বালা। হারেম এক দোজখ। পেয়ার সেখানে ঝুটা। এতদিনে আসলি পেয়ারের সন্ধান পেল খুশবু বাই। বুঝল, আসলি পেয়ার বহুত কিমতি চিজ।
সোনার পিঁজরার চিড়িয়া যেমন খোলা আসমানে উড়তে চায়, তেমনই হারেমের দিওয়ার ভেঙে নতুন জীবনের খোঁজে উড়তে চাইল খুশবু বাই। শওকত জঙ্গের মওতের পর মওকা মিলল। পূর্ণিয়ায় ডামাডোলের অবকাশে বসির খাঁর হাত ধরে পথে নেমে এল খুশবু। নতুন জীবন খরিদের কড়ি হিসেবে সে সঙ্গে নিয়েছিল একটা রত্নপেটিকা। হিরে-জহরত-চুনি-পান্নায় বোঝাই। এসবই শওকত জঙ্গের দেওয়া উপহার।
গরিবের মেহনত চুরি করে নবাবি। সেই নবাবিরই সামান্য জলুস নিয়ে খুশবু বাই ও বসির খাঁ বিরাট বড় হিন্দুস্থানের কোনও এক দেহাতে ছোট্ট একটা ঘর বাঁধার আশায় রাতের অন্ধকারে বজরায় চড়ে গঙ্গায় ভেসে পড়ল। বজরা দ্রুত এগিয়ে চলল উত্তরমুখে।
খুশবু বাইয়ের চোখে ঘুম নেই। ঘুম নেই বসির খাঁর চোখেও। বজরার কক্ষের ভিতরে রেড়ির তেলের অনুজ্জ্বল আলোয় সে চেয়ে থাকে খুশবুর নিটোল মুখখানার দিকে। টিকালো নাকে হিরের নাকছাবি ক্ষীণ আলোতেও ঝলমল করছে। ভিতরে ভিতরে কেমন যেন কেঁপে ওঠে বসির খাঁ। এই খুবসুরত জেনানার খসম হতে চলেছে সে? ছোটে নবাব শওকত জঙ্গের পিয়ারি খুশবু বাই তার বিবি? সে কি পারবে এই হুরিকে আগলে রাখতে?
বসির খাঁর মুখপানে চেয়ে খুশবু বলে, ‘কী দেখছ বসির?’
‘তোমাকে দেখছি।’
খুশবুর কটাক্ষে বিদ্যুৎ ঝলকায়। ‘নতুন দেখছ বুঝি?’
‘তুমি বেহেস্তের হুরি। ফেরেস্তার মতো সুন্দর।’
‘খুব হয়েছে।’ মেহেন্দিতে রাঙানো তর্জনী দিয়ে বসির খাঁর গালে ঠোনা মারে খুশবু- ‘এ কথা শুনে শুনে আমার কান পচে গেছে।’
শায়েরের মতো সুন্দর দুই চোখে খুশবুর মুখপানে চেয়ে বসির খাঁ বলে, ‘আমাকে কেন এত ভালোবাসলে খুশবু?’
বসির খাঁর মাথার ঝাঁকড়া চুলগুলো নরম আঙুল বুলিয়ে নেড়েচেড়ে দিয়ে খুশবু বলে, ‘তোমার পেয়ার সাচ্ছা বলে।’
‘শুধু তাই?’
‘একজন আওরাত তো তাই চায়। চায় এক মরদ, যে তাকে জিন্দেগিভর ভালোবাসবে। তুমি আমার সেই মরদ, আমার আশিক।’ খুশবু বাই বসির খাঁর বুকে মাথা রেখে বলে, ‘আমাকে আগলে রেখো বসির।’
বসির খাঁ মিষ্টি করে হেসে বলে, ‘তোমাকে আগলে রাখা কি সোজা কথা? তুমি বেহেস্তের গুলাব। তাগদবাজরা আমার বুক থেকে উপড়ে নিতে চাইবে তোমায়। তখন?’
বসির খাঁর ঠোঁটের সামনে তর্জনী ঠেকিয়ে খুশবু বাই বলে, ‘থাক ওসব কথা। আমরা চলে যাব অনেক দূরে। হিন্দুস্থানের কোনও এক অজানা দেহাতে ঘর বাঁধব।’
বসির খাঁ শুধোয়, ‘কিন্তু তোমার দেখভাল? আমি শুধু সারেঙ্গি বাজাতে জানি। রোটি জোগাবে কে?’
‘হিন্দুস্থানের পথে পথে নাচ দেখাব আমি। তুমি সারেঙ্গি বাজাবে। লোকে যে রুপেয়া ছুড়ে দেবে তাতেই চলে যাবে আমাদের।’ খোয়াবের এক রঙিন তসবির ভেসে ওঠে খুশবু বাইয়ের চোখে।
‘ইয়ে তো বহুত খতরনক বাত।’ বসির খাঁ হাসে।
‘কেন? নবাবের রংমহলের থেকে আম আদমির দরবার খারাপ কী?’
‘তুমি পথে পথে নাচলে আমার জিন্দেগি বেবাক বরবাদ হয়ে যাবে।’
চোখ পাকিয়ে রাগের ছদ্ম ভঙ্গিমায় খুশবু বাই বলে, ‘বরবাদ হয়ে যাবে? তুমি বুঝি আমায় বোরখা পরিয়ে ঘরেলু বিবি বানাতে চাও?’
সোহাগ মেশানো গলায় খুশবু বাইয়ের চিবুক ছুঁয়ে বসির খাঁ বলে, ‘তা নয় খুশবু। তুমি পথে নাচলে কি হবে জানো?’
‘কী হবে?’
‘বেহেস্তের গুলাব তাগদবাজদের নজরে পড়বে। তাদের দিল জখম হবে। খুন ছলকে উঠবে। তারা তোমাকে লুঠ করে তাদের বাগিচার বুলবুল বানানোর কোশিস করবে।’
কনুই দিয়ে বসিরের গায়ে ঠ্যালা দিয়ে খুশবু বাই বলে, ‘ধ্যাৎ! যত ফাজলামি।’
‘ইয়ে সচ বাত। তোমাকে দেখলে কোন মরদের দিমাক ঠিক থাকবে বল? আমাকে সারেঙ্গি ছেড়ে ফেলে হাতিয়ার ধরতে হবে।’
খুশবু চোখ বড় বড় করে বলে, ‘হাতিয়ার ধরবে?’
খুশবু বাইকে জড়িয়ে ধরে বসির খাঁ বলে, ‘ধরব না? জান থাকতে তোমাকে আমি হারাতে পারব না বিবিজান।’
কিছু একটা বলতে গিয়ে আর কথা বলার ফুরসত পায় না খুশবু। তার ঠোঁটে ঠোঁট রাখে বসির খাঁ। মুখের ভিতরে লবণাক্ত স্বাদ অমৃত মনে হয় খুশবুর।
হঠাৎ দুলে ওঠে বজরা। বাইরে শোনা যায় কোলাহল। মানুষের আর্তনাদ। সুখ স্বপ্ন ভেঙে যায়। বসির খাঁ ও খুশবু বাই ত্রস্ত হয়ে পড়ে। বাইরে থেকে কেউ ঘন ঘন আঘাত করছে কক্ষের বন্ধ দরজার উপর।
বসির খাঁ ভীত গলায় বলে, ‘হার্মাদ।’
কেঁপে ওঠে খুশবু বাই। ‘কী হবে বসির?’
সহসা ভেঙে পড়ে দরজাটা। ঝড়ের গতিতে বজরার কক্ষের ভিতরে ঢুকে আসে কয়েকজন হাবসি সেপাই। তারা এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে বসির খাঁর উপর। তাকে টেনে হিঁচড়ে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। চিৎকার করে খুশবু কেঁদে ওঠে। আরশিগুঁড়ো হয়ে ঘরময় যেন ছড়িয়ে পড়ে সদ্য গড়ে ওঠা খুশির তসবির।
ধাক্কা মেরে বসির খাঁকে গঙ্গায় ফেলে দেয় একজন হাবসি সেপাইরা। ঠান্ডা কালো জলে তলিয়ে যেতে থাকে বসির খাঁ।
খুশবু বাইয়ের দিকে এগিয়ে আসে দৈত্যের মতো চেহারার এক মরদ। লোকটাকে চিনতে পারে খুশবু। শওকত জঙ্গের দরবারের সামান্য এক আফগান ওমরাহ। কামনার আগুনে ধক ধক করে জ্বলছে তার চোখদুটো। হলদে দাঁত বের করে সে হেসে বলে, ‘ডরো মাত বিবিজান।’
এগিয়ে এসে খুশবুর চিকন কোমরটা ধরে লোকটা একঝটকায় তাকে শূন্যে তুলে নেয়। ভয়ে জ্ঞান হারায় খুশবু।
সহসা আর্তনাদ করে ওঠে আফগান ওমরাহ। হাত শিথিল হয়ে যায় তার। হুড়মুড় করে বজরার কাঠের মেঝের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ে সে। খুশবু ছিটকে পড়ে মাটিতে।
নিমেষে নিথর হয়ে যায় দৈত্যাকৃতির দেহটা। তার পিঠে একটা ছোরা আমূল গেঁথে গিয়েছে। শুধু জেগে রয়েছে হাতির দাঁতের কারুকাজ করা বাঁট। চরাচর ভাসিয়ে দেওয়া চন্দ্রমা গায়ে মেখে বজরার কক্ষের খোলা দরজায় এসে দাঁড়ায় এক রাজপুরুষ।
পূর্ণিয়ার জঙ ফতে করেই এক পরোয়ানায় মোহনলালকে পূর্ণিয়ার শাসক হিসেবে ঘোষণা করেছেন সিরাজদ্দৌলা। ঢোল শোহরতের মাধ্যমে সে পরোয়ানা ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে।
‘…মওত হয়েছে শওকত জঙ্গের। পূর্ণিয়ার শাসনভার মোহনলালের হাতে। দেওয়ানজি নিজের পুত্র শ্রীমন্তলালের নামে পূর্ণিয়ার শাসন জারি রাখার হুকুম দিয়েছেন…।’
সাতসকালেই পূর্ণিয়ার দুর্গে এসে মোহনলালকে কুর্নিশ জানাল ফৌজদার রাসবিহারী সিং।
‘সেলাম হুজুর। সহি সলামত। হুজুরের জন্য নজর এনেছে বান্দা।’
দুধে খুরমা ভিজিয়ে নাস্তা সারছিলেন মোহনলাল। মুখ তুলে বললেন, ‘নজর?’
‘এক খুবসুরত আওরত। শওকত জঙ্গের বাগিচার খুশবুদার গুলাব—খুশবু বাই।’
কৌতূহলী চোখে রাসবিহারীর দিকে তাকালেন মোহনলাল।
‘বাঁদিকে হুজুরের মোবারকে পেশ করি?’
‘জরুর।’
খানিকবাদে বোরখা পরিহিতা খুশবু বাইকে মোহনলালের সামনে নিয়ে এলেন রাসবিহারী।
সামনে এগিয়ে এসে কচি কলাপাতা রঙের মসলিনের ঘুঙ্ঘুট সরালেন মোহনলাল। দেওয়ানজির চোখের সামনে গোটা দুনিয়া যেন আলোয় ঝলমল করে উঠল।
আজাদি চেয়েছিল খুশবু বাই। ফের বাঁধা পড়ল সোনার পিঁজরায়। মোরাদবাগ প্যালেসের রংমহলে। রাত গভীর হয়। ম্লান হয়ে আসে দেওয়ালগিরির আলো। মার্বেল পাথরের স্তম্ভের উপর অভ্রের পাত জ্বলা আলোও নিভু নিভু। রাশি রাশি রাতপোকা পুড়ে কালো হয়ে পড়ে আছে আলোকশিখাকে ঘিরে। খুশবু বাই গেয়ে চলেছে।
একসময় মেহফিল শেষ হয়। ক্লান্ত খুশবু বাই নিজের কক্ষে বিশ্রাম নিতে চলে যায়। ইয়ারবকশির দল ফিরে যায় ঘরে।
মোরাদবাগ প্যালেসের খোলা ছাতের উপর এসে দাঁড়ালেন মোহনলাল।
ছাতের একপ্রান্তে আলসেতে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে হিরা। মোহনলালের ভগিনী। শীতল চন্দ্রমায় হিরার বিষণ্ণ সুন্দর মুখটা দেখে মোহনলালের মনটা হঠাৎ ব্যথায় ভরে ওঠে।
গভীর মমতায় ভগিনীর পিঠে হাত রেখে মোহনলাল বললেন, ‘হিরা! ঘুমোওনি বহেন?’
‘নিন্দ আসছে না বড়ে ভাইয়া।’
‘ঘরে যাও। শ্রীমন্ত একা একা শুয়ে আছে। হঠাৎ ঘুম ভেঙে তোমায় না দেখলে ও ভয় পাবে।’
‘শ্রীমন্তকে তুমি পূর্ণিয়ার নাজিম করলে কেন?’
‘তুমি খুশি হওনি বহেন?’
‘কুরসি মানেই তো সাজিসি আর দুশমনি।’
‘তাতে কী? আজ না হয় শ্রীমন্ত পাঁচ সাল উমরের এক মাসুম লেড়কা, লেকিন একদিন তো সে জোয়ান হবে। আরও বড় বড় খেতাব পাবে। মনসব পাবে। নবাবি রিয়াসতে বচপনকাল থেকেই তো এসবের শুরুয়াত হয়।’
‘তুমি কি চাও শ্রীমন্ত নিজামতের নোকরি করুক?’
অবাক গলায় মোহনলাল বলেন, ‘করবে না? কী বলছ তুমি বহেন? নসিব সাথ দিলে একদিন হয়তো সে -‘
‘থাক বড়ে ভাইয়া। শ্রীমন্তকে তুমি দূরে কোথাও পাঠিয়ে দাও। এই হিন্দুস্থানে ও আমআদমির মতো মেহনত করে বাঁচুক। শান্তিতে থাকুক। নিজামত এক গুণাহ। এর ছায়া তুমি শ্রীমন্তর উপর পড়তে দিও না।’ হিরা ব্যকুল হয়ে ওঠে। গলায় বেজে ওঠে ব্যথার করুণ সুর।
‘বহেন, সকলেই তাগদ চায়, চায় তাজ আর তনখা। কাশ্মীর থেকে নসিবের খোঁজে এদেশে আমরা যখন এসেছিলাম, কী ছিল আমাদের? মামুলি এক বেরোজগার ইনসান। হররোজ রোটি জোটে না। তারপর মির্জার সঙ্গে দোস্তি। নিজামতের নোকরি। তা থেকেই তো আজকের এই রওশন।’
‘তোমার রওশন। আমার বরবাদি বড়ে ভাইয়া।’
‘বহেন!’
নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে হিরা।
দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোহনলাল বলেন, ‘সব কিছুর জন্যে আমিই দায়ী বহেন।’
চোখের জল মুছে হিরা বলে, ‘না, দায়ী আমার বদনসিব। আমি না হয় শেষ হয়ে গেছি ভাইয়া। কিন্তু তুমি শ্রীমন্তর জীবনটা বরবাদ কর না।’
‘শ্রীমন্তকে নিয়ে আমার ভাবনা তোমার চেয়ে কম কিছু নয়। তুমি দেখে নিও বহেন যখন সময় আসবে শ্রীমন্তর ন্যায্য অধিকার আমি বুঝে নেব। মোহনলাল জিন্দা থাকতে শ্রীমন্তর কোনও ক্ষতি কেউ করতে পারবে না।’
‘আমার ভয় তোমাদের নবাবকে। তোমার দোস্ত সিরাজকে।’
‘তাকে তুমি রহেম কর বহেন।’
হিরা উত্তেজিত হয়ে বলে ওঠে, ‘রহেম করব? ছমাসের এক মাসুম বাচ্চাকে ওভাবে যে—তুমি ভুলে গেছ বড়ে ভাইয়া?’
মোহনলাল বলেন, ‘সিরাজ মাফ চেয়েছিল আমার হাতদুটো ধরে। আজ সে নবাব। তোমার বড়ে ভাইয়া মোহনলালের মদতে তার মসনদ আজ মজবুত। শ্রীমন্তকে নিয়ে কীসের এত ভাবনা তোমার? সিরাজও তো শ্রীমন্তর ভালো চায়। আমি শ্রীমন্তকে পূর্ণিয়ার নাজিম করেছি সিরাজের খোয়ায়িশে।’
হিরা চুপ করে আকাশের দিকে চেয়ে থাকে।
ক্ষণিকের স্তব্ধতার পর মোহনলাল বলেন, ‘ভগবানের উপর বিশ্বাস রাখো বহেন। একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। যাও—ঘরে যাও।’
ঘরে এসে হিরা দেখে মেহগিনি কাঠের মস্ত পালঙ্কে ঘুমিয়ে আছে শ্রীমন্তলাল। সরে গিয়েছে গায়ের বালাপোশ। দ্রুত বালাপোশটা শ্রীমন্তর গায়ের উপর টেনে দিয়ে পালঙ্কে গা এলিয়ে দেয় হিরা। একজন দাখিলা এসে অভ্রের পাতের আলোটা সরিয়ে নিয়ে যায়। হিরা বুকের কাছে টেনে নেয় শ্রীমন্তকে। পরম মমতায় হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়। ঘুমের ঘোরে শ্রীমন্তলাল জড়িয়ে ধরে তার হিরাবুয়াকে।
পরের দিন সকালে মোহনলালের ঘুম ভাঙল অনেক দেরিতে। একজন দাখিলা এসে বলল, জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ এসেছেন দেখা করতে। সঙ্গে মহারাজ স্বরূপচাঁদ ও আলিনগরের ফৌজদার মানিকচাঁদ। কথাটা শুনে ভাঁজ পড়ল মোহনলালের কপালে।
খানিকবাদে তৈরি হয়ে নীচে নেমে এলেন মোহনলাল। দরবার ঘরে ঢুকতেই মাথা ঝুঁকিয়ে দেওয়ানজিকে কুর্নিশ জানালেন মহাতপচাঁদ, স্বরূপচাঁদ ও মানিকচাঁদ।
‘সেলাম হুজুর। সহি সালামত।’
‘বাত কী আছে শেঠজি?’
মহাতপচাঁদ বললেন, ‘বাত বহুত গহেরা। আলিনগর হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে।’
চমকে উঠে মোহনলাল বললেন, ‘কী? আলিনগরে ওয়াপস এসেছে কোম্পানি? আপনি কী করছিলেন?’
মানিকচাঁদের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে ধমকে ওঠেন মোহনলাল।
মানিকচাঁদ জোড়হাত হয়ে বললেন, ‘আমি বহুত কোশিস করেছিলাম জনাব। লেকিন দক্ষিণ থেকে কোম্পানি বহুত বড়া ফৌজ নিয়ে এসেছে। সঙ্গে দরিয়া কাঁপানো নওয়ারা। এসেছেন জঙ্গবাজ খতরনক আদমি ক্লাইভ।
‘সাবিৎ জঙ্গ?’ প্রশ্ন করেন মোহনলাল।
‘জি হুজুর। আমাদের ফৌজ বেইজ্জত হয়েছে। আমি কোনওরকমে জান নিয়ে পালিয়ে এসেছি।’
স্বরূপচাঁদ বললেন, ‘ইংরেজ কোম্পানিকে ফির একবার সবক শেখানো দরকার হুজুর। নবাবের এই বেইজ্জতি বরদাস্ত করা যায় না। এর মাশুল তাদের দিতে হবে।’
মহাতপচাঁদ বললেন, ‘নবাব রাজধানীতে নেই। তাই মানিকচাঁদজিকে নিয়ে ছুটে এলাম আপনার কাছে। এখনই নবাবকে পৌঁছে দেওয়া উচিত এই খবর।’
মোহনলালের মুখের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে রইলেন মহাতপচাঁদ ও স্বরূপচাঁদ।
মোহনলালের মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ। মনের খুশির রেশ লুকিয়ে জগৎশেঠ মহাতপচাঁদ মনে মনে বলে উঠলেন, ‘জয় গোবিন্দজি। খেল জমেছে। দরবার কি সিয়াসত ফির নমকিন হো গিয়া।’
