২৬
ব্রিজওয়াটারকে ঘিরে জলে ভাসছে গুটিকয় শালতি। তাতে কয়েকজন গোরা পল্টন। মনে হচ্ছে তারা সবাই খুব ব্যস্ত। দূরবিনে চোখ রেখে ক্লাইভ দেখলেন, একটা শালতির উপরে দাঁড়িয়ে আছেন কিলপ্যাট্রিক। তাঁর মুখোমুখি আরেকটা শালতির উপরে কিং ও আয়ারকুট। সকলে ঝুঁকে পড়ে, জাহাজের সামনের দিকে তারা গভীর মনোযোগের সঙ্গে কী যেন পর্যবেক্ষণ করছেন।
দূরবিন চোখে জাহাজের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে জলযাত্রায় অভিজ্ঞ ক্লাইভ বুঝলেন সমস্যাটা কী? একদিকে সামান্য হেলে আছে জাহাজটা। ব্রিজওয়াটার আটকে গিয়েছে বালুচরে।
সর্বনাশ!
হুগলি অভিযানে যে এমন বাধা আসতে পারে তা তিনি কল্পনাই করেননি। প্রবল বিরক্তি ও হতাশায় ডান হাতের মুঠি দিয়ে বাঁহাতের তালুতে ঘুষি মারলেন কর্নেল ক্লাইভ। মস্ত ভুল হয়ে গিয়েছে। কলকাতা থেকে হুগলি পর্যন্ত নেভিগেবল রুট ভালো চেনে এমন একজন অভিজ্ঞ পাইলটকে পাঠানো উচিত ছিল ব্রিজওয়াটারের সঙ্গে। কেউ খেয়াল করেনি বিষয়টা। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কী করে সকলের নজর এড়িয়ে গেল?
ক্লাইভ বললেন, ‘আমি একবার জাহাজের কাছে যেতে চাই। মিঃ আরাটুন আপনি কি একটা কান্ট্রি বোট জোগাড় করতে পারবেন?’
‘সিওর স্যার। পাশেই বোটম্যানদের একটা গ্রাম আছে।’
আরাটুন ও লরেন্স ছুটল বোটের সন্ধানে।
নদীতে এখন ভাঁটার টান। দূরবিনে চোখ লাগিয়ে ওয়ালশ বললেন, ‘দ্য শিপ ইজ প্রিকেরিয়াসলি টিল্টেড।’
ক্লাইভ বললেন, ‘হুঁ। ভেরি ডেঞ্জারাস। রিকভার করার চান্স ফিফটি ফিফটি। জোয়ার এলে ফের ভেসে উঠতে পারে জাহাজ, আবার আরও কাত হয়ে ডুবতেও পারে।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এ যে বড় ভাবনার কথা হুজুর।’
ক্লাইভ বললেন, ‘ব্রিজওয়াটার জবরদস্ত জাহাজ। সাউথে অনেক যুদ্ধ জিতিয়েছে। জাহাজডুবি হলে সর্বনাশ হবে আমাদের। কুড়িটা কামান, দুটো মর্টার, কয়েকশো পিপে বারুদ সব জলে ডুববে। এমনিতেই আমাদের রসদের খুব অভাব। লোকে আমাকে বলবে স্টুপিড। ইডিয়ট। একজন এক্সপিরিয়েন্সড পাইলট ছাড়া আমি জাহাজ পাঠিয়েছি হুগলিতে। কী করে এই ভুলটা করলাম। দিস ক্যাসুয়াল অ্যাপ্রোচ মে কজ অ্যা বিগ ডিজাস্টার।’
একেবারে অস্থির হয়ে পড়লেন কর্নেল ক্লাইভ। বারবার গলায় ঝোলানো দূরবিনটা চোখে লাগিয়ে জাহাজটাকে দেখতে লাগলেন।
ওয়ালশ আকাশের দিকে মুখ তুলে বিড়বিড় করে বললেন, ‘গড সেভ দ্য কিং।’
ক্লাইভের চিন্তিত মুখের দিকে চেয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আশা তো এখনও আছে হুজুর। আপনি বললন ফিফটি ফিফটি। দেখবেন গোবিন্দের ইচ্ছেয় সব ঠিক হয়ে যাবে।’
‘নসিব কি সবসময় সাথ দেয় নবকিসেন? টাইড হাইট, উইন্ড স্পিড, কারেন্ট ডাইরেকশন এসব কিছুর উপর নির্ভর করছে ব্রিজওয়াটারের ফেট। এই ফ্যাক্টরগুলোর কোনওটাই আমার হাতে নেই। অনলি গড ক্যান সেভ আস।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘জল আজ বেশি ফুলবে। আজ অমাবস্যা। নিউ মুন।’
হঠাৎ যেন খানিকটা আশার আলো দেখতে পেলেন ক্লাইভ। চকিতে নবকৃষ্ণের দিকে চেয়ে বললেন, ‘রিয়েলি?’
‘আধ ঘণ্টার মধ্যেই জোয়ার আসবে।’
স্বগতোক্তির ভঙ্গিতে ক্লাইভ বললেন, ‘নিউ মুন। ইটস অ্যা গুড সাইন।’
নবকৃষ্ণ বললেন, ‘ভাববেন না হুজুর। হরি আপনার সহায়।’
‘হু ইজ হ্যারি?’
‘হ্যারি নয় হজুর, হরি। আমার গোবিন্দ। কপালে হাত ঠেকিয়ে নবকৃষ্ণ বললেন, জয়গোবিন্দ। এযাত্রা উদ্ধার কর প্রভু।’
বড়সড় একটা ডিঙি নৌকো দ্রুত এগিয়ে এল পাড়ের কাছে। দাঁড় বাইছে দুজন মাঝি। নৌকোয় পেত্রস আরাটুন ও লরেন্স। প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে চারিদিক। কাছেই কোথাও শেয়াল ডাকছে। মাঝিরা কাঠের পাটাতন পেতে দিতেই ক্লাইভ, ওয়ালশ, নবকৃষ্ণ ও স্ট্রন, চেপে বসলেন ডিঙি নৌকোয়। ক্লাইভের ডিঙি নৌকো দ্রুত এগিয়ে চলল ব্রিজওয়াটারের দিকে।
নিজের পিস্তল থেকে শূন্যে একবার ফায়ার করলেন ওয়ালশ।
গুলির শব্দ শুনে ঘুরে তাকিয়ে কিলপ্যাট্রিক, কিং ও আয়ারকুট দেখলেন, এগিয়ে আসছে একটা ডিঙিনৌকো। গলুইয়ের উপর দাঁড়িয়ে আছেন ক্লাইভ। আবছা আলোতেও কর্নেলকে চিনতে অসুবিধা হল না, মেজর কিলপ্যাট্রিক ও দুই ক্যাপটেনের। ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে গেলেন তাঁরা।
ব্রিজওয়াটারের কাছাকাছি ডিঙিনৌকোটা আসতেই বিস্ফারিত চোখে কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘কর্নেল আপনি?’
ক্লাইভ বললেন, ‘ক্যাম্পের জায়গা খুঁজতে এদিকে এসেছিলাম। নদীর পাড়ে এসে দেখি তোমরা বিপদে পড়েছ।’
‘এখানে যে জলের ডেপথ এত কম কে জানত। অ্যা বিগ স্যান্ড হাম্প। টাইড লেভেল নামতেই আটকে গেল জাহাজ।’
ক্লাইভ বললেন, ‘ইট ইস অ্যা কলোসাল ব্লান্ডার। আমাদের উচিত ছিল একজন এক্সপার্ট পাইলট সঙ্গে নেওয়া।’
‘ইয়েস স্যার।’
আয়ারকুট বললেন, ‘শিপ ইস অলরেডি অ্যারাউন্ড টেন ডিগ্রি টিল্টেড।’
‘যে করেই হোক বাঁচাতে হবে ব্রিজওয়াটারকে। টুডে ইস নিউ মুন। ওয়াটার লেভেল আজ অনেকটা হাই হবে। সেটা একটা মস্ত ভরসা।’ বললেন ক্লাইভ।
হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠলেন নবকৃষ্ণ। ‘হুজুর জোয়ার আসছে।’
ক্লাইভ দেখলেন, বদলে গিয়েছে জলের স্রোতের অভিমুখ। তিনি বললেন, ‘চলো জাহাজে উঠে পড়া যাক। দ্রুত একবার মেশিন রুমে যেতে হবে।’
দড়ির মই বেয়ে সকলে উঠে পড়লেন জাহাজে। জোয়ার বেশ তেজি। নদীর জল দ্রুত বাড়ছে। দুপাশের চর এলাকা ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছে জলে। ক্লাইভ ছুটে এলেন মেশিনরুমে। কুলি-মজুর-কারিগর-জাহাজের ক্যাপটেন সকলে মিলে বালির চরে ঠেকে যাওয়া জাহাজটাকে বের করে আনার জন্য জাহাজকে পিছন দিকে ঠেলার প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।
ক্যাপটেনের পাশে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নানারকম নির্দেশ দিয়ে ক্লাইভ চলে এলেন ডেকে। চকমকি পাথর ঠুকে পাইপ ধরালেন। ঘন ঘন ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন।
উত্তেজনায় সুস্থির হয়ে একজায়গায় দাঁড়াতে পারছেন না কর্নেল। অস্থির ভাবে পায়চারি করে চলেছেন। ঘন অন্ধকার নেমে এসেছে চারিদিকে। আকাশ ও নদী যেন ভুষো কালিতে মাখামাখি। পৃথকভাবে চেনা যাচ্ছে না তাদের। শুধু শোনা যাচ্ছে জলস্রোতের শব্দ। অনেক দূরে দূরে অন্ধকারের বুকে তারার মতো মিটমিট করছে মাছমারাদের নৌকোর বিন্দু বিন্দু আলো। জাহাজের ডেকে বাতিদানের আলোগুলো জ্বলে উঠেছে।
ক্লাইভের মনে উৎকণ্ঠার মেঘ। কড়া শীতের মধ্যেও ডেকে দাঁড়িয়ে তিনি ঘামছেন।
হঠাৎ থরথর করে কেঁপে উঠল ব্রিজওয়াটার। আরও যেন বেশি কাত হয়ে পড়ল। প্রমাদ গুনলেন ক্লাইভ। ডুবছে। নির্ঘাত ডুবছে ইংরেজ দম্ভের প্রতীক এই জাহাজ।
ক্লাইভ নিজের মনে বলে উঠলেন—রবার্ট ক্লাইভ ইতিহাস বলবে তুমি মহামূর্খ। কেন এভাবে অজানা নদীপথে দুম করে জাহাজ পাঠালে? ইংরেজ শিবিরে সবাই এই বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করবে তোমাকেই। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কৈফিয়ত চাইবে তোমার কাছে। কীভাবে করলে এই আহাম্মকি? উপযুক্ত প্রস্তুতি ছাড়া বেপরোয়া অ্যাডভেঞ্চারের নেশা কী ভয়ানক বিপদ ডেকে আনতে পারে এবারে বোঝ তুমি।
সহসা এক ঝটকায় প্রায় তিরিশ ডিগ্রি ঘুরে গেল জাহাজ। টালমাটাল হয়ে প্রায় পড়ে যাচ্ছিলেন কর্নেল। পালের একটা খুঁটি আঁকড়ে ধরে সামলে নিলেন নিজেকে। তারপরেই ফৌজিদের প্রবল হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল চারিদিক। ঘুরে যাওয়ার সময় ব্রিজওয়াটার যে তীব্র তরঙ্গ সৃষ্টি করল নদীতে তার ধাক্কায় শালতিগুলো চলে গেল বেশ কিছুটা দূরে। সশব্দে ঢেউ গিয়ে ধাক্কা খেল নদীর পাড়ে। ডেকের উপর ছুটে এলেন কিলপ্যাট্রিক, আয়ারকুট ও কিং।
উচ্ছ্বসিত গলায় কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘উই আর আউট অফ ডেঞ্জার কর্নেল। ব্রিজওয়াটার ভেসে উঠেছে। জাহাজের তেমন কোনও ক্ষতি হয়নি।’
নবকৃষ্ণ চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘জয়গোবিন্দ!’
আয়ারকুট বললেন, ‘গড রেসকিউড আস। ইটস অ্যা মিরাকল।’
প্রবল উৎকণ্ঠায় ক্লাইভের শ্বাসপ্রশ্বাস প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছিল, এই খুশির খবর শুনে তিনি শিশুর মতো উচ্ছ্বসিত হয়ে কিলপ্যাট্রিককে জড়িয়ে ধরলেন বুকে। তারপরে কোমরের খাপ থেকে নিজের পিস্তলটা হাতে নিয়ে পরপর তিনবার ফায়ার করলেন শূন্যে।
চরম বিপর্যয়ের মুখ থেকে এভাবে ফিরে আসায় প্রবল জোশ এসেছে জাহাজিদের মধ্যে। সকলের খুশির বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে ব্রিজওয়াটার সামনের দিকের তিনটে কামান পরপর গর্জন করে উঠল।
গুড়ুম! গুড়ুম! গুড়ুম! ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল রাতের নিস্তব্ধতা। পৌষের সন্ধের কুয়াশা ভেজা বাতাসে মিশল বারুদের গন্ধ।
সাফল্যের এই উন্মাদনা খানিকটা থিতিয়ে যাওয়ার পর কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘দিস রিভার ইস ভেরি ডেঞ্জারাস। সেফ নেভিগেশন রুট আমাদের জানা নেই। আমি আর এগোনোর সাহস পাচ্ছি না কর্নেল।’
চিন্তিত মুখে ক্লাইভ বললেন, ‘দ্যাটস ট্রু। কিন্তু কী করা যায় এখন?’
পেত্রস আরাটুন বলে উঠল, ‘উপায় একটা আছে স্যার।’
কর্নেল ক্লাইভ অবাক হয়ে পেত্রস আরাটুনের মুখের দিকে তাকালেন। মশালের আলোয় আরাটুনের চোখের নীল মণিদুটো চকচক করছে। ঠোঁটের কোণে খল হাসির রেশ।
কিছুক্ষণ পর দশবারোজন সশস্ত্র গোরা পল্টন সঙ্গে নিয়ে আয়ারকুট ও কিলপ্যাট্রিক একটা সুলুপে চড়ে ভেসে চললেন উত্তরদিকে। স্ট্রনকেও তাদের সঙ্গে পাঠিয়ে দিলেন ক্লাইভ।
আড়িয়াদহের কাছে নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটা মালবাহী ডাচ জাহাজ। কড়া শীত। গভীর রাত। জাহাজিরা প্রায় সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে। নিজের কেবিনে বসে লণ্ঠনের আলোয় ভাগীরথীর নেভিগেবল ম্যাপে একমনে চোখ বোলাচ্ছেন জাহাজের ক্যাপটেন টমাস বেল। তাঁর বাঁহাতের দুআঙুলের ফাঁকে গোজা রয়েছে বার্মা চুরুট। বিয়ারের বড় মগটা অর্ধেক ভরতি। টেবিলের উপর রয়েছে হাতে তৈরি জোয়ারভাটার চার্ট। জলের গভীরতা কখন কোথায় কত হবে, টমাস একমনে তা হিসেব করে চলেছেন।
অনেকদিন হয়ে গেল, টমাস বেল জাহাজ নিয়ে এই নদী বেয়ে হুগলি বন্দর থেকে মাদ্রাজে যাতায়াত করছেন। তবু এই নদীকে তাঁর খুব ভয়। হুগলি থেকে গঙ্গাসাগর—কম জাহাজডুবি হয়নি এই নদীতে। নেভিগেবল রুটটা ফের একবার ঝালিয়ে নিচ্ছেন টমাস। এই টাইডাল রিভারে সামান্য ভুল করলেই মস্ত বিপর্যয়ের ভয়।
হঠাৎ টোকা পড়ল দরজায়।
চুরুটটা আঙুলে গোঁজা অবস্থাতেই চেয়ার ছেড়ে উঠে কেবিনের দরজা খুলে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলেন টমাস বেল। হাত থেকে খসে গেল চুরুট। হাত উপরে তুলে কয়েক পা পিছিয়ে এলেন টমাস। কড়া শীতেও দরদর করে ঘেমে উঠলেন।
কেবিনে ঢুকে পড়লেন কিলপ্যাট্রিক ও আয়ারকুট। কিলপ্যাট্রিকের হাতে পিস্তল। আয়ারকুট সন্তর্পণে কেবিনের দরজাটা ভেজিয়ে দিলেন। টমাস বুঝলেন, পাইরেটসদের পাল্লায় পড়েছেন।
কিলপ্যাট্রিক চাপা গলায় বললেন, ‘এই রিভারের নেভিগেশন ম্যাপটা কোথায়?’
চোখের ইশারায় টেবিলটা দেখালেন টমাস বেল।
আয়ারকুট ছুটে গিয়ে ম্যাপটা ভাঁজ করে তাঁর কোটের পকেটে ঢুকিয়ে নিলেন।
টমাস বেলের কেমন যেন খটকা লাগল। হুগলি রিভারের নেভিগেশন ম্যাপ এমন কিছু মহার্ঘ্য বস্তু নয়। আজ থেকে অনেক’দিন আগেই ডেনিশ-ফ্রেঞ্চ-ডাচ-ইংলিশ সব বিদেশি বণিকরাই নিজের নিজের উদ্যোগে এই ম্যাপ তৈরি করে নিয়েছে। পাইরেটসরা নদীর অলিগলি আরও ভালো চেনে। হঠাৎ এই পাইরেটসদের ম্যাপটা প্রয়োজন হল কেন?
টমাস বেল প্রশ্ন শুধোলেন, ‘আপনারা কারা?’
কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘তা জেনে কী হবে আপনার? কোনও গোলমাল করার চেষ্টা করলে মরবেন। আমাদের সঙ্গে যেতে হবে আপনাকে।
‘কোথায়?’ ভয়ে টমাস বেলের চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চাইছে।
কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘ভয় নেই। কাজটা ভালোয় ভালোয় করে দিলে আপনাকে প্রাণে মারব না।’
নিমেষের মধ্যে টমাস বেলের মুখ বেঁধে ফেললেন আয়ারকুট। তারপর কোমরের খাপ থেকে পিস্তলটা বের করে বললেন, ‘আসুন আমাদের সঙ্গে।’
কেবিন থেকে বেরোতেই টমাস বেলকে এক ঝটকায় কাঁধে তুলে নিল স্ট্রন। টমাস কোনও প্রতিবাদ করলেন না। কিলপ্যাট্রিক ও আয়ারকুট দুজনেই তাঁর দিকে পিস্তল তাক করে রেখেছেন। টমাস বেলকে কাঁধে ফেলে এক হাতে দড়ির মই ধরে দ্রুত নীচে নেমে এল স্ট্রন। চড়ে বসল সুলুপে। কিলপ্যাট্রিক ও আয়ারকুটও দ্রুত নেমে এসে সুলুপে উঠে পড়লেন। নিমেষে উজান বেয়ে দক্ষিণমুখে দ্রুত এগিয়ে চলল সুলুপ।
গোটা ঘটনাটা চরম পেশাদারিত্বের সঙ্গে ঘটে গেল খুব দ্রুত। ডাচ জাহাজের আরোহীরা কেউ জানতেও পারল না। কড়া শীতের রাতে তারা সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শুধু হাত-পা-মুখ বাঁধা অবস্থায় ডেকের উপরে পড়ে রইল ডাচ জাহাজের দুই রাতপাহারাদার। আগেই তাদের ঘায়েল করেছিল স্ট্রন।
ক্লাইভের সামনে টমাস বেলকে হাজির করে তাঁর মুখের বাঁধন খুলে দিলেন আয়ারকুট।
ক্লাইভে উদ্দেশে কিলপ্যাট্রিক মুচকি হেসে বললেন, ‘অপারেশন সাকসেসফুল স্যার।’
বাঁধনমুক্ত হয়ে হাঁপাচ্ছেন টমাস বেল। চেয়ার ছেড়ে উঠে এসে ক্লাইভ বললেন, ‘সরি, এত রাতে আপনাকে একটু কষ্ট দিতে হল। হোয়াটস ইওর নেম?’
বিহ্বল চোখমুখ করে টমাস বললেন, ‘আমি টমাস বেল। আপনি?’
‘কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ।’
নামটা শুনে চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল টমাসের। কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। বহুশ্রুত এই নাম। বছর সাতেক হয়ে গেল ডাচদের জাহাজ চালিয়ে নিয়ে চুঁচুড়া থেকে মাদ্রাজ যাতায়াত করছেন টমাস। দক্ষিণে অনেকের মুখেই সে শুনেছে, কর্নেল ক্লাইভ বাহাদুর যোদ্ধা।
ইংরেজদের ব্যবসা পুনরুদ্ধারের জন্য ক্লাইভ বাংলায় এসেছেন, ফোর্ট উইলিয়াম আবার দখল করে নিয়েছে ইংরেজরা—এসব কথা পৌঁছে গিয়েছে চুঁচুড়ায়। টমাস বেল জানেন সবই। কিন্তু ডাচদের সঙ্গে তো ইংরেজদের তেমন কোনও বিরোধ নেই। তাঁকে এভাবে ধরে নিয়ে আসলেন কেন কর্নেল ক্লাইভ? কী মতলব তাঁর?
ক্লাইভ বললেন, ‘মিঃ বেল, শুনেছি আপনি অনেকদিন জাহাজ নিয়ে হুগলি থেকে মাদ্রাজ যাতায়াত করছেন।’
ঢোঁক গিলে টমাস বলল, ‘ইয়েস স্যার।’
‘আই থিঙ্ক ইউ নো দ্য রিভার ভেরি ওয়েল।’
‘ইয়েস স্যার।’
ক্লাইভ বললেন, ‘কিডন্যাপ করে আপনাকে এখানে আনার জন্য আমি সত্যিই খুব দুঃখিত। কোনও ভয় নেই আপনার। শুধু হুগলি যাওয়ার সেফ নেভিগেশন রুটটা আমাদের দেখিয়ে দিতে হবে। হুগলি পৌঁছেই আপনাকে আমরা ছেড়ে দেব।’
টমাস বেল দুম করে প্রশ্ন করে বসে, ‘আপনারা হুগলি যাচ্ছেন কেন?’
ক্লাইভ মুচকি হেসে বলেন, ‘এসব জেনে কী হবে আপনার? জাহাজটাকে নিরাপদে হুগলি পাঠানো দরকার। আপনার হেল্প চাই।’
হুগলি নবাবের ঘাঁটি। নিজামতের শাসনে চলে। নবাবের সঙ্গে গোলমাল পাকিয়েছে ইংরেজরা। এখন যুদ্ধজাহাজ নিয়ে চলেছে হুগলির দিকে। তাহলে কি—মনে মনে অংকটা মিলিয়ে ফেললেন টমাস বেল। ইংরেজদের হুগলি অভিযানের উদ্দেশ্য তাঁর কাছে জলের মতো স্পষ্ট হয়ে উঠল।
ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন টমাস। তিনি ডাচ জাহাজের নাবিক। নবাব ও ইংরেজদের গোলমালের মধ্যে ইংরেজদের মদত দেওয়ার অর্থ এই ঝামেলায় ডাচদেরও জড়িয়ে দেওয়া। এর ফলে টমাসকে ভবিষ্যতে অনেক বড় বিপদে পড়তে হতে পারে। তিনি বললেন, ‘এক্সকিউজ মি স্যার। আমাদের গভর্নরের পারমিশন ছাড়া—’
টমাসকে বাধা দিয়ে ক্লাইভ বলে উঠলেন, ‘হান্ড্রেড আশরফি পাবেন আপনি।’
‘কিন্তু স্যার?’
কর্নেল ক্লাইভ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘মিঃ বেল আমার হাতে বেশি সময় নেই। হয় আপনি আমাদের সাহায্য করবেন, না হলে আজ রাতেই আমরা আপনার জাহাজ উড়িয়ে দেব। ব্রিজওয়াটার কুড়ি কামানের জাহাজ।’
ভয়ে টমাস বেলের মুখ সাদা হয়ে গেল।
ক্লাইভ বললেন, ‘শুধু তাই নয়, আপনিও মরবেন।’
কিছুক্ষণ মাটির দিকে চেয়ে রইলেন টমাস। তারপর মুখ তুলে অসহায় চোখে ক্লাইভের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ওকে স্যার।’
‘ভেরি গুড।’
ঠিক হল পরের দিন খুব ভোরে যাত্রা শুরু করবে ব্রিজওয়াটার। জাহাজকে পথ দেখিয়ে হুগলি নিয়ে যাবে টমাস। ব্রিজওয়াটার থেকে নেমে এসে ডিঙি নৌকোয় চেপে বসলেন ক্লাইভ। সঙ্গে নবকৃষ্ণ, স্ট্রন ও লরেন্স।
রাত গভীর। জোলো বাতাসে শীতের কামড় বড় তীব্র। সূচীভেদ্য অন্ধকারের মধ্যে কুয়াশার আবরণ ভেদ করে ডাঙার দিকে ছুটে চলল ক্লাইভের ডিঙি নৌকো।
