1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ২৫

২৫

দড়িতে টান পড়ল। অনেক উঁচুতে মাস্তুলের সঙ্গে বাঁধা পিতলের মস্ত ঘণ্টাটা বেজে উঠল—ঢংঢংঢং। নড়েচড়ে উঠল ব্রিজওয়াটার—কুড়িটা কামান ও দুটো মর্টারে সজ্জিত জবরদস্ত যুদ্ধজাহাজ। আরোহী একশো সত্তরজন গোরা পল্টন, দুশোজন তেলেঙ্গানার সিপাই।

ব্রিজওয়াটারের পিছনে সারিবদ্ধ ভাবে যাত্রা শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে বেশ কয়েকটি সুলুপ। ফৌজিদের জন্য রসদে বোঝাই। যুদ্ধজাহাজের দুপাশে বাঁধা রয়েছে অনেকগুলো শালতি। সৈন্যদের জল থেকে ডাঙায় নামানোর জন্য এগুলির প্রয়োজন। ডেকের উপর উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন এই অভিযানের সেনাপতি মেজর কিলপ্যাট্রিক ও তার দুই সহকারী—ক্যাপটেন কিং ও ক্যাপটেন আয়ারকুট।

১৭৫৭ সালের ৫ জানুয়ারি। ভোরবেলা। কুয়াশা নেই। সদ্য ঘুম থেকে ওঠা সূর্য ডিমের কুসুমের মতো লালচে। ভাগীরথীতে জোয়ার এসেছে। খালাসিরা অত্যন্ত ব্যস্ততার সঙ্গে গুটিয়ে নিচ্ছে লোহার শিকল। নোঙর তুলছে ব্রিজওয়াটার।

ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গের জাহাজঘাটায় দাঁড়িয়ে আছেন কর্নেল ক্লাইভ, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন, রজার ড্রেক, হলওয়েল, ওয়ালস, স্ক্র্যাফটন, ওয়াটস, কালেট, ক্রুটেনডন এবং কোম্পানির আরও অনেক হোমরাচোমরা। ক্লাইভ ও ওয়াটসন, দুজনে একসঙ্গে পতাকা নেড়ে যাত্রা শুরুর সংকেত দিলেন। জাহাজের ডেকের উপর ফৌজি-ব্যান্ডে বেজে উঠল রুল ব্রিটানিয়া। জল কেটে উত্তরমুখে এগিয়ে চলল ব্রিজওয়াটার।

এই অভিযান কর্নেল ক্লাইভ ও ওয়াটসনের যৌথ পরিকল্পনা। সিলেক্ট কমিটির মিটিংয়ে এই প্রস্তাব শুনে রজার ড্রেক ও হলওয়েল এবারেও আঁতকে উঠেছিলেন। কলকাতায় ইংরেজরা ফিরে এসেছে। একথা শুনে নবাব এমনিতেই রুষ্ট হবেন। তার উপরে এখনই পায়ে পা বাঁধিয়ে নবাবের সঙ্গে ফের একটা ঝামেলায় জড়ানোর দরকার কী? আলাপ-আলোচনা, উৎকোচ, পেশকাশ—এসবের মাধ্যমেই তো নবাবের সঙ্গে সম্পর্কটাকে মেরামত করে নেওয়া যায়! চিরকালই তো এদেশে কোম্পানি এই উপায়ে কাজ হাসিল করেছে। এসব কথা মনের মধ্যে আলোড়ন তুললেও গতকালের সিলেক্ট কমিটির মিটিংয়ে টুঁ শব্দটি করেননি ড্রেক ও হলওয়েল।

ফলতায় এসে পনেরো দিনের মধ্যে ক্লাইভ ও ওয়াটসন যেভাবে ইংরেজদের কলকাতায় ফিরিয়ে আনলেন তাতে এই দুই যুদ্ধবাজ সেনাপতির কর্তৃত্ব প্রায় সকলেই মেনে নিয়েছে। প্রতিশোধের আগুন জ্বলছে এখন সবার চোখেমুখে। এই পরিস্থিতিতে ক্লাইভ ও ওয়াটসনের বিরোধিতা করার অর্থ ইংরেজ শিবিরে নিতান্ত সংখ্যালঘু হয়ে পড়া। এমনিতেই ভিতু ও কোন্দলবাজ বলে যথেষ্ট বদনাম কিনেছেন ড্রেক ও হলওয়েল। তাঁরা সকলের কাছে নিজেদের আর অপ্রিয় করে তুলতে চান না। ক্লাইভ ও ওয়াটসনের প্রস্তাব তাই বিনা বাধায় পাশ হয়ে গেল সিলেক্ট কমিটিতে।

ফোর্ট উইলিয়াম দখল আর কলকাতায় ফিরে আসাই তো সব নয়, অবিলম্বে বাংলার সব কুঠিতে ইংরেজদের ব্যবসা ফের চালু করার পরোয়ানা আদায় করতে হবে নবাবের কাছ থেকে। উশুল করে নিতে হবে কলকাতা যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ। হাত কচলে, মাথা ঝুঁকিয়ে, অনুরোধ-উপরোধ আর নয়, সব কিছু আদায় করে নিতে হবে গায়ের জোরে। চোখ রাঙিয়ে। এই হল ক্লাইভ ও ওয়াটসনের দর্শন।

তাই ফোর্ট উইলিয়াম দখল করেই ক্লাইভ ও ওয়াটসন পৃথকভাবে দুটো চিঠি লিখে যুদ্ধ ঘোষণা করে দিলেন সিরাজদ্দৌলার বিরুদ্ধে। সে চিঠি নবাবকে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য পৌঁছে দেওয়া হল হুগলির ফৌজদারের দেওয়ান নন্দকুমারের কাছে। এতেও মন শান্ত হল না দুই যুদ্ধবাজ সেনাপতির। নবাবের উত্তর আসার আগেই তাঁরা হুগলি আক্রমণের পরিকল্পনা সিলেক্ট কমিটিতে পাশ করিয়ে নিলেন।

কলকাতা ছেড়ে উত্তরমুখে এগিয়ে চললে শ্রীরামপুরে ডেনিশদের কলোনি। চন্দননগরে রয়েছে ফরাসিরা। চুঁচুড়ায় ওলন্দাজদের আস্তানা। তারপরে হুগলি, নবাবের শাসনাধীন। কলকাতার উত্তরে হুগলিই নিজামতের কানুনে চলা প্রথম বড় শহর। ফৌজদারের ঘাঁটি। ঝটিকা আক্রমণে হুগলি শহরকে তছনছ করে দিয়ে নবাবকে একটা কড়া বার্তা দিতে চান ক্লাইভ ও ওয়াটসন। তাই ব্রিজওয়াটার যুদ্ধজাহাজ নিয়ে কিলপ্যাট্রিক, কিং ও আয়ারকুটের হুগলি অভিমুখে যাত্রা।

ব্রিজওয়াটারকে যাত্রা করিয়ে দিয়ে কেল্লায় ফিরে এসে নবকৃষ্ণকে ডেকে পাঠালেন ক্লাইভ। ছুটে এসে সেলাম ঠুকে নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘ডেকেছেন হুজুর?’

ক্লাইভ বললেন, ‘চলো শহরটা ঘুরে দেখা যাক। ফৌজ নিয়ে ক্যাম্প করার জন্য জুতসই একটা জায়গা চাই।’

‘পেরিন সাহেবের বাগান আপনার পছন্দ হতে পারে।’

ক্লাইভ বললেন, ‘কাল হেস্টিংসও বলছিল সে কথা। চলো দেখে আসি। তার আগে শহরের পুব দিকের সীমানাটা বুঝে নিতে চাই।’

কিছুক্ষণ বাদে লালদিঘির উত্তরের মাটির পথ ধরে পুবপানে ছুটে চলল একটা ছোটখাটো ঘোড়সওয়ার বাহিনী। সামনে কর্নেল ক্লাইভ। তাঁর একপাশে রয়েছেন নবকৃষ্ণ। আরেকপাশে ক্যাপ্টেন ওয়ালশ। পিছনে ঘোড়ার পিঠে স্ট্রন ও নীলকণ্ঠ। একেবারে পিছনে দশজন বন্দুকধারী ঘোড়সওয়ার।

নবকৃষ্ণ গলা তুলে বললেন, ‘হুজুর, ওই যে মেয়রস কোর্ট।’

গভীর মনোযোগের সঙ্গে পথের দুধার দেখতে দেখতে চলেছেন কর্নেল ক্লাইভ। এই পথটা বেশ মনোরম। দুপাশে রয়েছে বড় বড় গাছপালা। এই রাস্তা একদম সিধে চলে গিয়েছে শহরের পুব প্রান্তে, মারাঠা ডিচ পর্যন্ত।

ক্লাইভের চোখে পড়ছে রাস্তার পাশে অনেক ভাঙা কোঠাবাড়ি। কোনও বাড়িরই প্রায় জানলা-দরজা নেই। কোনওটা আবার সামনের দেওয়াল খসে একেবারে বেআব্রু। মেঝে ফুঁড়ে উঠেছে আগাছা, বুনো ঝোপ। ঘোড়ার খুরের শব্দ পেয়ে ছুটে পালিয়ে গেল কয়েকটা শেয়াল। যুদ্ধে অভিজ্ঞ কর্নেল ক্লাইভ বুঝলেন এই পরিত্যক্ত বাড়িগুলি সবই নবাবের কলকাতা আক্রমণের ক্ষতচিহ্ন।

নবমুনশি বললেন, ‘এইখানে হুজুর বাজার বসে। হপ্তায় দুদিন।’

জায়গাটা একটা চারমাথার মোড়। যে রাস্তা ধরে তিনি পুব দিকে চলেছেন, সেই রাস্তাকে অতিক্রম করে উত্তর থেকে দক্ষিণে চলে গিয়েছে একটা চওড়া মেঠো রাস্তা। ক্লাইভ দেখলেন, গোলপাতায় ছাওয়া বেশ কিছু অস্থায়ী দোকানঘর রয়েছে দুই রাস্তারই আশপাশের অনেকটা অংশ জুড়ে। ঘোড়ার রাশ টেনে ধরলেন ক্লাইভ। থেমে পড়ল ঘোড়সওয়ার বাহিনী। বাজার বসেছে আজ। জায়গায় জায়গায় খদ্দের আর ব্যাপারিদের জটলা।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এ বাজার বসিয়েছেন লালমোহন শেঠ। বিগ মার্চেন্ট। কোম্পানির সঙ্গেও অনেক সওদা করেছেন একসময়ে। লালবাবুর বাজার। লোকে বলে লালবাজার।’

‘আর এই রাস্তাটা মুনশি?’ শুধোলেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ জবাব দেন, ‘কেউ বলে চিৎপুরের রাস্তা। কেউ বলে কালীঘাটের রাস্তা। উত্তরে এ রাস্তা পেরিন সাহেবের বাগান পর্যন্ত গিয়েছে। তারপর চিৎপুরের খাল। ওই খাল পার হয়ে কলকাতায় ঢুকেছিলেন নবাব। উত্তরমুখে এ পথের আশপাশ দিয়েই দিশি লোকেদের বসবাস।’

‘আর দক্ষিণে?’

‘এদিকটা লোকবসতি কম। মাঝে পড়ে চৌরঙ্গিনাথের জঙ্গল। ঠাঙাড়ে-ডাকাতের ভয়। তবু লোক চলাচল কম নয়। এটাই কালীঘাটে যাওয়ার একমাত্র পথ।’

‘কালীঘাটে কী আছে?’

 ‘হোলি প্লেস স্যার। অলমাইটি গডেস কালীর মন্দির। একদিন মায়ের প্রসাদি ফুল এনে দেব আপনাকে। কপালে ঠেকিয়ে যা চাইবেন তাই পাবেন। মা খুব জাগ্রত।’

মুচকি হেসে ক্লাইভ বললেন, ‘আর তোমার গোবিন্দ?’

কপালে হাত ঠেকিয়ে নবমুনশি বলেন, ‘জয়গোবিন্দ। গোবিন্দের ইচ্ছেতেই তো আপনার দেখা পেয়েছি সাহেব। আমাদের শাস্ত্রে বলে যে গোবিন্দ, সেই কালী।’

অবাক হয়ে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘তার মানে?’

‘একই দেহে গড ও গডেস।’

ক্লাইভ মাথা নেড়ে বলেন, ‘ভেরি কমপ্লেক্স থট।’

‘এসব বিষয়ে ওয়ারেন হেস্টিংস সাহেবের খুব আগ্রহ। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জানতে চান।’

‘ওয়ারেন ইস অ্যা লার্নেড চ্যাপ। ভেরি ব্রাইট। নট লাইক মি।’

নবকৃষ্ণ বিগিলিত হয়ে বললেন, ‘কে বলে এসব কথা? আপনি স্যার ব্রাইটেস্ট।’

ক্লাইভ বললেন, ‘চলো সামনে এগোনো যাক।’

ফের এগোতে থাকে ঘোড়সওয়ার বাহিনী। খানিকবাদে রাস্তার শেষ মাথায় এসে থমকে দাঁড়িয়ে পড়েন ক্লাইভ। আর যাওয়ার জায়গা নেই সামনে মারাঠা খাত। তারপরে যতদূর চোখ যাচ্ছে শুধু জলা আর জঙ্গল। মাঝে মাঝে দ্বীপের মতো জেগে আছে ডাঙা। নবকৃষ্ণ দূরের একটা ডাঙা এলাকার দিকে দিকে আঙুল তুলে বললেন, ওই জায়গার নাম শিয়ালদহ। তার ওপাশে উলটোডিঙি।

ঘোড়া থেকে নেমে কর্নেল ক্লাইভ একটা মস্ত বটগাছের নীচে এসে দাঁড়ালেন।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এই গাছের নীচে বসে কারবারিদের সঙ্গে আলোচনা করতেন জোব চার্নক। বৈঠক বসাতেন চার্নক সাহেব, তাই লোকে বলে বৈঠকখানা। কলকাতার যুদ্ধের সময়, এখানে ঘাঁটি গেড়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন নবাব। এখানে দাঁড়িয়ে সোজা পশ্চিমে তাকান হুজুর। কেল্লাটা আবছা দেখা যাচ্ছে।’

গলায় ঝোলানো দূরবিনে চোখ রাখলেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘কলকাতা এসে নবাব প্রথমে উঠেছিলেন উমিচাঁদজির বাগানবাড়িতে।’

‘কে উমিচাঁদ?’

‘ভেরি বিগ মার্চেন্ট। হালসিবাগানে বাড়ি। বিগ হাউস।’

‘উমিচাঁদ কি নবাবের ট্রাস্টেড ম্যান?’

 ‘যখন যেদিকে সুবিধে সেদিকে ঝুঁকে পড়েন উমিচাঁদজি। ভেরি ক্লেভার। মুর্শিদাবাদের দরবারের ওমরাহদের সঙ্গে ওর বেশ জান-পহেচান আছে।’ এবারে গলা খাটো করে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘একে হুজুর হাতে রাখা ভালো। দরকার মতো কাজে লাগাতে পারবেন।’

দূরবিন থেকে চোখ নামিয়ে ক্লাইভ আড় চোখে একবার চাইলেন। সে দৃষ্টি প্রশংসার।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘এখান থেকে সামান্য উত্তরে খালের উপর একটা নড়বড়ে সাঁকো আছে। সেই সাঁকো পার হয়ে সহজে উমিচাঁদের বাগানবাড়ি থেকে এখানে চলে আসা যায়। নবাব ওই পথেই এখানে এসেছিলেন।’

পিঠে বাঁধা বাঁশের খাপের ভিতর থেকে গোটানো একটা কাগজ বের করে চারকোলের টুকরো দিয়ে দ্রুত যোগ চিহ্নের মতো কেল্লা থেকে বৈঠকখানা পর্যন্ত রাস্তা ও চিৎপুরের রাস্তাটা এঁকে ফেললেন ওয়ালশ। মারাঠা ডিচটাও চিহ্নিত করলেন। তারপরে নবকৃষ্ণের কথা শুনে কোথায় কোন জায়গা সেগুলো আন্দাজ অনুযায়ী বসাতে লাগলেন কাগজের উপর। অল্প সময়ের মধ্যে শহরের একটা হাতনকশা খসড়া ম্যাপ খাড়া করে ফেললেন ক্যাপটেন ওয়ালশ।

ম্যাপে চোখ বুলিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েলডান। এবার ঘুরতে ঘুরতে ম্যাপের সঙ্গে জায়গাগুলো মিলিয়ে প্রয়োজন মতো কারেকশন করে নিলেই শহরের একটা পারফেক্ট স্কেচ ম্যাপ তৈরি হয়ে যাবে। চলো নবকিসেন এবার পেরিন সাহেবের বাগানবাড়ির দিকে যাওয়া যাক।’

টগবগ টগবগ শব্দে ধুলো উড়িয়ে দ্রুত কেল্লা অভিমুখে ছুটে চলল ঘোড়সওয়ার বাহিনী। লালবাজারের মোড় থেকে থেকে ডানদিকে বেঁকে চিৎপুরের রাস্তা ধরে এগোতে লাগল তারা। ক্লাইভ দেখলেন, এ রাস্তা বেশ জমজমাট। উটে টানা গাড়ি, গো-গাড়ি, পালকি, ঝাঁকামুটে, পথচারী দিশি মানুষ, কুলি, মজুর, কারবার সব মিলিয়ে এ পথ বেশ জমজমাট। দিশি লোকেদের পরনে খাটো ধুতি, মাথায় পাগড়ি, গায়ে তুষের সস্তা র‌্যার জড়ানো। কনকনে উত্তুরে হাওয়ার দাপটে শীত এখন বেশ জাঁকাল।

একটানা ঘোড়া দাবড়ে কলুটোলা, বড়বাজার, চিৎপুরের শ্মশান, বটতলা, আহিরীটোলা, কুমোরটুলি ছাড়িয়ে বাগবাজারে পেরিন সাহেবের বাগান বাড়িতে এসে পৌঁছলেন কর্নেল ক্লাইভ। চমৎকার বাগান। মরশুমি ফুলে ভরে রয়েছে। বেশ বড়সড় একটা বাড়ি রয়েছে বাগানের একপ্রান্তে। সে বাড়ির দক্ষিণে ও পশ্চিমে মস্ত খোলা বারান্দা। পশ্চিমের বারান্দা থেকে সিঁড়ি নেমে গিয়েছে নদী পর্যন্ত। বাগানের উত্তরে চিৎপুরের খাল। খালের ওপাশে ফের শুরু হয়েছে রাস্তা। চলে গিয়েছে বাঁকিপুর পর্যন্ত।

কর্নেল ক্লাইভকে দেখে এগিয়ে এলেন কোম্পানির জুনিয়র মোস্ট রাইটার টিম লরেন্স ও এক তরুণ। ক্লাইভের অপরিচিত এই তরুণটির গায়ের রং সাহেবদের মতোই লালচে। বড় জুলপি। মাথায় হ্যাট। গায়ে প্রায় পা পর্যন্ত লম্বা পশমি কোট। ক্লাইভকে দেখে মাথা ঝুঁকিয়ে সওগাত জানালেন তিনি।

টিম লরেন্সকে দেখে ক্লাইভ বললেন, ‘তুমি এখানে?’

লরেন্স বলল, ‘কাল এসেছি। মেরি ম্যাডাম ও হেস্টিংস স্যার পাঠিয়েছেন। আপনার এখানে আসার কথা তাই।’

 ‘কাল একবার ওয়ারেনকে বলেছিলাম, অ্যাবাউট টুডেজ ভিসিট।’

ওয়ালশ বললেন, ‘লরেন্স ইস ভেরি ক্লোস টু মেরি অ্যান্ড ওয়ারেন। মেরি ওকে ভাইয়ের মতোই ভালোবাসে।’

রসিকতা করে ক্লাইভ বললেন, ‘দ্যাট মিনস ইউ আর ব্রাদার-ইন-ল অফ ওয়ারেন হেস্টিংস ইন কোম্পানিস সার্ভিস।’

মুচকি হেসে লরেন্স বলল, ‘আপনার যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, মেরি ম্যাডাম বিশেষ করে দেখতে বলেছেন।’

‘হাউ মেরি ইস রিলেটেড টু দিস গার্ডেন?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘মেরি ম্যাডাম এখন এই বাগানের মালকিন।’

‘তাই নাকি?’

‘ইয়েস স্যার। মাথা ঝাঁকিয়ে বলল লরেন্স।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘জাহাজি চার্লস পেরিন এই বাগান ও বাড়ি তৈরি করেছিলেন। পরে নিলামে এই বাগান কিনেছিলেন হলওয়েল সাহেব। তিনি এই বাগান বিক্রি করলে কিনে নেন ফ্রেডরিক স্কট। মেরি ম্যাডামের বাবা। স্কট সাহেব মারা গিয়েছেন গেল বছরে। কাজেই বাগানের মালিক এখন তাই মেরি ম্যাডাম।’

ক্লাইভ মুচকি হেসে বললেন, ‘ওয়ারেন হেস্টিংস বেশ করিৎকর্মা ছেলে। এদেশে এসে শুরুতেই বাগান সমেত একটি খাসা মেমসাহেব পাকড়াও করে ফেলেছে। এ ছোকরা অনেকদূর যাবে।’

লরেন্স বলল, ‘আপনার লাঞ্চ রেডি আছে।’

‘ভেরি গুড।’

সঙ্গের তরুণটিকে দেখিয়ে লরেন্স বলল,’অবশ্য আমাকে কিছু করতে হয়নি। হি অ্যারেঞ্জড এভরিথিং।’

নিজের পরিচয় দিয়ে তরুণটি বলল, ‘আমি পেত্রস আরাটুন। আরমেনিয়ান।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘রিচ বিজনেসম্যান। ফলতায় নিয়মিত রসদ পাঠাতে ইনিও যথেষ্ট মদত দিয়েছিলেন। দুপুরে এখানে আপনার আহারের সব ব্যবস্থা করার জন্য একেই খবর পাঠিয়েছিলাম। আরাটুন সাহেবই গত ছমাস ধরে বাগানটা দেখভাল করে সাজিয়ে গুছিয়ে রেখেছেন।’

ক্লাইভের উদ্দেশে পেত্রস আরাটুন বলল, ‘আপনার জন্য জবরদস্ত মোগলাই খানা বানিয়েছি হুজুর। বেলেহাসের মালখোবা, দুম্বার দোপেঁয়াজা আর শাহি পরোটা। নবকিসেন বলছিল, শুকনো মাংস খেয়ে খেয়ে আপনার অরুচি ধরে গিয়েছে।’

ক্লাইভ বললেন, ‘নবকিসেন ইস ভেরি এফিসিয়েন্ট। সব বিষয়ে খেয়াল রাখে।’

নবকৃষ্ণ গলে পড়ে বলেন, ‘প্রেইজ করে লজ্জা দেবেন না স্যার। আমি আপনার শ্রীচরণে নিবেদিত। মোস্ট ওবিডিয়েন্ট সারভেন্ট।’

আহারের পর পেরিন সাহাবের বাগানের উত্তরপ্রান্তে এক গাছের তলায় এসে দাঁড়ালেন ক্লাইভ। কাছেই রয়েছে একটা বুরুজ। শ্যাওলা ধরেছে ইটের গায়ে।

লরেন্স বলল, ‘এটা বানানো হয় ক্যালকাটা ওয়ারের ঠিক আগে। এখানে কামান বসানো হয়েছিল। শহরে ঢোকার মুখে এখান থেকেই নবাবকে রেজিস্ট করার চেষ্টা হয়।’

পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘রং ডিসিশন। এই অবধি এসে পড়লে তো নবাব শহরেই প্রায় ঢুকে পড়লেন। নবাবকে আটকানোর জন্য আরও নর্থে যেতে হবে।’

নবকৃষ্ণ চিন্তিত মুখে বললেন, ‘ভেবেছিলাম ক্যাম্প করার জন্য পেরিন সাহেবের বাগান আপনার পছন্দ হবে।’

‘না মুনশি। আরও উত্তরে যেতে হবে। ইট ইস নট দ্য রাইট প্লেস।’

‘খাল পেরিয়ে ঘোড়া নিয়ে ওপারে যেতে হবে হুজুর।’

‘আমি এখনই যেতে চাই।’

আরাটুন বলল, ‘তবে এখন ওপারে গেলে ফোর্ট উইলিয়ামে ফিরতে আপনার অনেক রাত হয়ে যাবে।’

বাগানবাড়িটির দিকে আঙুল দেখিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘রাতে আজ এখানেই হল্ট করব। মিঃ লরেন্স, থাকার ব্যবস্থা আছে এখানে?’

লরেন্স বলল, ‘অবশ্যই স্যার। আপনার কোনও অসুবিধা হবে না। আপনি এখানে থাকলে মেরি ম্যাডাম ও হেস্টিংস স্যার খুব খুশি হবেন।’

‘ওকে। লেটস গো।’

চিৎপুরের খালপাড়ে দাঁড়িয়ে ব্যস্তসমস্ত ভাবে মাঝিমাল্লাদের উপর হম্বিতম্বি করে অল্প সময়েই খালের ঘাটে নৌকো লাগিয়ে ফেলল পেত্রস আরাটুন। মালবাহী বেশ বড় বড় তিনটে নৌকো পাশাপাশি রেখে জোড়া লাগানো আছে। উপরে বেশ বড়সড় চাতালের মতো বাঁশের পাটাতন। ঘোড়া সমেত অনায়াসেই খাল পেরিয়ে ওপারে গেলেন ক্লাইভ। সঙ্গে ওয়ালশ, রাসেল, আরাটুন, স্ট্রন, নবকৃষ্ণ ও চারজন দেহরক্ষী।

দুপাশে বেশ ঘনঝোপ ও মাঝখানে এবড়ো-খেবড়ো মেঠো রাস্তা। ধুলো উড়িয়ে বাঁকিপুরের দিকে ছুটে চলল ঘোড়সওয়ার বাহিনী। কিছুদূর এগোনোর পর ক্লাইভের চোখে পড়ল পথের বাঁদিকে সামান্য উঁচু মতো মেঠো জমি। তার উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঝোপঝাড়—ফুটখানেকের বেশি উঁচু নয়। ঘোড়ার রাশ টেনে ধরে নেমে পড়লেন ক্লাইভ।

পাইপটা ঠোঁটের কোণে গুঁজে কিছুক্ষণ মাঠের দিকে চেয়ে রইলেন একদৃষ্টে। তারপর চকমকি পাথর ঠুকে পাইপ ধরিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘দিস ইস দ্য রাইট প্লেস। আমি এখানেই ক্যাম্প করব।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সাহেব এ জায়গার নাম বরানগর। একসময় এর কাছেই ডাচদের মাংস শুকোনোর ফ্যাক্টরি ছিল।’

নবাবের সঙ্গে ফের লড়াই লাগলে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের সাহায্য যাতে দ্রুত পাওয়া যায়, সেই কারণে ক্যাম্পের জায়গাটা নদীর কাছাকাছি হওয়া জরুরি।

কর্নেল ক্লাইভ প্রশ্ন করলেন, ‘হাউ ফার ইস রিভার?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘মাইল খানেকের মধ্যেই নদী।’

ওয়ালশের উদ্দেশে ক্লাইভ বললেন, ‘চলো- নদীর পথটা দেখে আসি।’

সরু পথ দুপাশে বেশ ঘন জঙ্গল। নদীর পাড়ে পৌঁছে ভয়ানক আশ্চর্য হয়ে গেলেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ, ওয়ালশ, লরেন্সও হাঁ হয়ে গেল।

দাঁড়িয়ে আছে ব্রিজওয়াটার। নোঙর ফেলা রয়েছে। ব্যাপার কী? সেই কোন সকালে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে ছেড়েছে জাহাজ। বেলা মরে আসছে। এতক্ষণে তো ব্রিজওয়াটারের হুগলি পৌঁছে যাওয়ার কথা! জাহাজ এখানে দাঁড়িয়ে আছে কেন?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *