1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ২২

২২

ত্বরায় চলিল তরী তিলেক না রয়

চিৎপুর-সালিখা এড়াইয়া যায়।

বেতড়েতে উত্তরিল বেণিয়ার বালা,

কলিকাতা এড়াইল অবসান বেলা।

সুতানুটির ঘাটে জোব চার্নকের জাহাজ ভেড়ানোর প্রায় একশো বছর আগে কলিকাতা নামে অখ্যাত এক গ্রামের কথা চণ্ডীমঙ্গলে লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন কবিকঙ্কণ মুকুন্দরাম। গোবিন্দপুর বা সুতানুটির কথা তিনি লেখেননি।

আবুল ফজলের আইন-ই-আকবরিতেও কলিকাতার উল্লেখ আছে। এখানেও অনুপস্থিত গোবিন্দপুর ও সুতানুটি। এই দুই গ্রাম বয়সে কলিকাতার তুলনায় নবীন। গোবিন্দপুরে প্রথম বসতি স্থাপন করে শেঠ ও বসাকরা। সরস্বতী নদী মজে যাওয়ার পর তারা বেতড়ের বন্দরকে কেন্দ্র করে ব্যবসার আশায় সপ্তগ্রাম ছেড়ে গোবিন্দপুরে চলে আসে।

আগে বসতি পরে হাট। শেঠ-বসাকরাই সুতানুটিতে হাট বসায়। ১৬৬০ সালে তৈরি করা জনৈক ওলন্দাজ ভ্যান ডেন ব্রুকের মানচিত্রে সুতানুটির নাম আছে। ঐতিহাসিক নথিতে সেই প্রথম সুতানুটির নাম-পরিচিতি।

যাই হোক, ১৬৯০ সালের ২৪ আগস্ট সুতানুটির ঘাটে জাহাজ ভেড়ালেন জোব চার্নক। কলিকাতা, সুতানুটি ও গোবিন্দপুর নিয়ে গড়ে উঠল ইংরেজদের নতুন বাণিজ্য ঘাঁটি। তবে জমির উপর ইংরেজদের বৈধ অধিকার নেই। ভিন দেশে কারবার করতে এসে একপ্রকার জবরদখল করে বসে পড়া।

বুকে একরাশ শঙ্কা নিয়ে দিন কাটে ইংরেজদের। এই বুঝি নবাবের পেয়াদা এসে উচ্ছেদ করল। এইরকম একটা আবহে চিতুয়া ও বরদার জমিদার শোভা সিং-এর বিদ্রোহ থেকে নিজেদের রক্ষা করার অজুহাত দিয়ে ১৬৯৬ সালে ভাগীরথীর তীরে ইংরেজরা গড়ে তুলল কেল্লা। কেল্লার নাম ফোর্ট উইলিয়াম।

দুবছর পরে বাংলার শাসক হয়ে এলেন বাদশ ঔরঙ্গজেবের নাতি আজিম-উস-সান। তাঁকে ষোলো হাজার টাকা ঘুস দিয়ে কলিকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর এই তিনখানা গ্রাম কেনার অনুমতি আদায় করে নিল ইংরেজরা।

সাবর্ণ চৌধুরীরা ছিলেন কলকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুর-এই তিনটি গ্রামের জমিদার। এই বংশের উত্থান মানসিংহের সময়ে, প্রাণপুরুষ ছিলেন লক্ষ্মীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়। গোত্র সাবর্ণ। চৌধুরী-বাদশার কাছ থেকে পাওয়া খেতাব। লক্ষ্মীকান্তর উত্তরপুরুষরা সাবর্ণ চৌধুরী বলেই পরিচিত। সপ্তদশ শতকের শেষে তাঁদের অবস্থা পড়তির দিকে। শরিক অনেক। এই সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছ থেকে তিনটি গ্রামের স্বত্ব তেরোশো টাকায় কিনে নিল ইংরেজরা। বাংলার মাটিতে ইংরেজ বণিক সেই প্রথম বৈধ উপায়ে পা রাখার সুযোগ পেল।

কলিকাতা-সুতানুটি-গোবিন্দপুর-এই তিনটি গ্রামকে কেন্দ্র করে ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল শহর কলকাতা। সেই সঙ্গে ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ব্যবসা। রুজি-রোজগারের আশায় কলকাতায় এসে ভিড় করতে লাগল দিশি মানুষেরা। ইংরেজদের সঙ্গে তাদের কারবারের সম্পর্ক। এ কারবার ভাত জোগায়। তাই ইংরেজদের প্রতি দিশি মানুষদের টান বড় বেশি।

তিলে তিলে যখন গড়ে উঠছে শহর কলকাতা, তখন হঠাৎই এক কালান্তক আশ্বিনের ঝড়ে তছনছ হয়ে গেল সব। ১৭৩৭ সালের সেই ঝড়ে ভেঙে পড়ল সেন্ট অ্যানে গির্জার চূড়ো। কলকাতার ডেপুটি কালেক্টর গোবিন্দরাম মিত্র নির্মিত বিরাট উঁচু নবরত্ন মন্দিরও দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হল। গঙ্গার জল উপচে ভেসে গেল গোটা কলকাতা। সে এক চরম বিপর্যয়।

করাল প্রকৃতির সর্বগ্রাসী তাণ্ডবলীলা। তবু প্রাণের স্ফূর্তির অভাব নেই কলকাতায়। প্রলয়ের পর ফের শুরু হল সৃষ্টির সাধনা। সাহেবদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে আবার শহরটাকে গড়ে তুলতে লাগল দিশি মানুষেরাও। কলকাতা বাঁচলে সাহেবরা বাঁচবে। সাহেবরা বাঁচলে কোম্পানির ব্যবসা বাঁচবে। কোম্পানির ব্যবসা বাঁচলে খেয়েপরে বাঁচব- এই তাদের মনের কথা।

এই ঝড়ের আঘাত বছর দুয়েকের মধ্যে অনেকটা সামলে নিল কলকাতা। তারপর হঠাৎ একদিন আগুন জ্বলে উঠল গোটা বাংলায়। হানা দিল বর্গিরা। ভস্মীভূত হল গ্রামের পর গ্রাম। সেই সঙ্গে লুঠতরাজ, নারীধর্ষণ, নারকীয় হত্যা। প্রায় এক দশক ধরে চলল এই উৎপাত।

এই সময় রাতারাতি লোকজনে ভরে উঠল কলকাতা। বর্গিদের হাত থেকে বাঁচতে বর্ধমান, বীরভূম, মুর্শিদাবাদ, হুগলি, মেদিনীপুর ছেড়ে দলে দলে মানুষ এসে কলকাতায় ভিড় জমাতে লাগল। তাদের বিশ্বাস—কলকাতায় ইংরেজ আছে। তাদের কেল্লা আছে। কামান আছে। কলকাতায় গেলে প্রাণ বাঁচবে। নদী টপকে চট করে হানা দিতে পারবে না বর্গিরা। অতএব চলো কলকাতা।

প্রায় এক দশক ধরে বর্গিদের পিছনে ছুটোছুটি করতে গিয়ে জেরবার হয়ে গেলেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। অবশেষে তিনি সন্ধি করতে বাধ্য হলেন। সন্ধির শর্ত হিসেবে ওড়িশা প্রদেশের রাজস্ব আদায়ের অধিকার বর্গিদের হাতে তুলে দিলেন নবাব। ওড়িশা প্রদেশ থেকে ছিন্ন হয়ে বাংলার সঙ্গে যুক্ত হল মেদিনীপুর।

আলিবর্দির পরে মসনদে বসলেন তাঁর দৌহিত্র সিরাজদ্দৌলা। সিরাজ দেখলেন, ইংরেজ বণিক বেজায় ধূর্ত। এদের ঔদ্ধত্য সীমাহীন। এরা দস্তকের অপব্যবহার করে খুশি মতো ব্যবসা করে। শুল্ক ফাঁকি দেয়। প্রাপ্য আদায় করতে কালঘাম ছুটে যায় নিজামতের। এর উপরে আবার নবাবের অনুমতির তোয়াক্কা না করে কেল্লা মজবুত করে চলেছে ইংরেজ কোম্পানি। ছিল একখানা কেল্লা। বাগবাজারে পেরিন সাহেবের বাগানের কাছে চুপিসারে তারা আরেকখানা কেল্লা গড়ে তোলার ফন্দি আঁটছে।

ইংরেজদের সবক শেখাতে মস্তবড় সৈন্যবাহিনী নিয়ে কলকাতায় ছুটে এলেন সিরাজদ্দৌলা। মাটিতে মিশিয়ে দিলেন ইংরেজদের ঔদ্ধত্য। ভিটেমাটি ছাড়া হয়ে ফলতায় আশ্রয় নিল উদবাস্তু ইংরেজ। কলকাতার শাসক হলেন মানিকচাঁদ। কলকাতার নতুন নামকরণ হল আলিনগর।

আলিনগর না খালিনগর বোঝা দায়। ইংরেজরা চলে গেল। ফিকে হয়ে গেল কলকাতার সব জলুস। দিশি লোকেদের মুখ ভার। মনে আশঙ্কার মেঘ। কাজকারবার হারিয়ে সকলের ভিখিরি হওয়ার দশা। তার উপরে আছে কোতোয়ালের ভয়। মুখে কুলুপ আঁটল সকলে। তাদের ঝোঁক ইংরেজদের দিকে একথা প্রকাশ পেলেই গর্দান যাবে।

দিশি মানুষেরা সব যেন লুকিয়ে পড়ল কোথায়। মানিকচাঁদ দেখলেন তিনি এক প্রাণহীন নগরের রাজা। ইংরেজদের সঙ্গে কারবার করে যারা ধনকুবের, দিশি সমাজের যারা মাতব্বর, সেই লক্ষ্মীকান্ত ধর, উমিচাঁদ, দর্পনারায়ণ ঠাকুর, নীলমণি ঠাকুর, শোভারাম বসাক, রতন সরকার প্রমুখেরা চুপচাপ দিনবদলের অপেক্ষায় রইলেন, তলায় তলায় মদত যুগিয়ে যেতে লাগলেন ইংরেজদের।

বজবজের দুর্গ দখল ও মানিকচাঁদের পালিয়ে যাওয়ার খবরটা কানাকানি হতে হতে ছড়িয়ে পড়েছিল চারিদিকে। কেন্ট, টাইগার, সলিসবেরি, ব্রিজওয়াটার ও ওয়ালপোল এই পাঁচখানা বড় বড় জাহাজকে নদী তোলপাড় করে ফোর্ট উইলিয়ামের দিকে এগোতে দেখে উল্লাসে ফেটে পড়ল গোবিন্দপুরের মানুষজন। নদীর তীরে জড়ো হল শয়ে শয়ে লোক। আবেগে ফুটছে তারা। অনেকেই কলকাতার যুদ্ধের সময় সর্বস্বান্ত হয়েছিল। আজ যেন তাদের জ্বালা জুড়োনোর দিন।

দিশি মানুষদের উল্লাস জাহাজ থেকেই চোখে পড়েছিল অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের। তিনি অবাক চোখে দেখলেন, গঙ্গার পাড়ে দাঁড়িয়ে ইংল্যান্ডের পতাকা দুলিয়ে জাহাজগুলোকে অভিবাদন জানাচ্ছে নেটিভরা। গাছের ডালে কেউ কেউ বেঁধে দিয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকা। এদের কেউ অবশ্য সেদিন বোঝেনি ভাবীকালের গর্ভে কী লেখা রয়েছে। বোঝেনি ইংরেজরাও। বোঝেননি ক্লাইভ। বোঝেননি ওয়াটসন।

বজবজ থেকে মার্চ করে ফোর্ট উইলিয়ামে আসার পথে ভয় পেয়েছিলেন কর্নেল ক্লাইভ। যত কলকাতার দিকে এগোচ্ছেন, পথের দুপাশে জড়ো হচ্ছে মানুষ। সব মানিকচাঁদের প্রজা। এরা কি ইংরেজদের পথ আটকাতে চায়?

কর্নেল ক্লাইভ শুধোলেন, ‘এত লোকজন কেন মুনশি?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সব তামাশা দেখতে এসেছে। এদের চোখমুখগুলো ভালো করে খেয়াল করুন হুজুর। খুশিতে ভাসছে সকলে।’

‘কীসের খুশি?’

‘সাহেবরা কলকাতায় ফিরছে যে।’

কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ বুঝতে না পেরে কৌতূহলী চোখে নবকৃষ্ণর দিকে তাকালেন ক্লাইভ।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘কোম্পানির ব্যবসাকে ঘিরেই তো সবার রুটিরুজি। কলকাতায় ফিরতে চলেছে কোম্পানি। এরা খুশি হবে না?

ইংরেজদের কামানের গাড়ি দেখে উল্লাসে হইহই করে উঠল নেটিভরা।

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন কর্নেল ক্লাইভ।

ফোর্ট উইলিয়ামের বুরুজ থেকে নেমে গেল নিজামতের নিশান। উড়ল ইংল্যান্ডের ফ্ল্যাগ। উত্তুরে হাওয়ায় তরঙ্গায়িত হল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পতাকাও।

উৎসব শুরু হয়ে গেল কলকাতায়। ম্লান হয়ে গেল রাতের অন্ধকার। হঠাৎ যেন অকাল দেওয়ালি। হাজার হাজার মশালের আলোয় শহর কলকাতা ঝলমল করে উঠল। তাজ্জব বনে গেল সাহেবরাও।

লালদিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিলেন কর্নেল ক্লাইভ। যত দূর চোখ যাচ্ছে, শুধু দেখা যাচ্ছে মশালের আলো। সারা শহরেই নাকি এমন আলো জ্বলছে আজ। এ কাণ্ড ঘটিয়েছেন এক নেটিভ। তাঁর নাম নকু ধর। নব মুনশির মুখে শোনা কথা।

এই নিয়ে দ্বিতীয়বার গোটা কলকাতা আলোকিত করলেন নকু ধর। কয়েক বছর আগে তিনি এই শহর কলকাতাকে একবার আলোয় মুড়ে দিয়েছিলেন। সেদিন ছিল তাঁর একমাত্র মেয়ে পার্বতীর বিয়ে।

ধনকুবের লক্ষ্মীকান্ত ধর। লোকে বলে নকু ধর। তাঁর কড়ির জোর প্রবাদের মতো। কথায় কথায় ইংরেজরা ছুটে আসে তাঁর কাছে। ব্যবসার জন্য কর্জ করে লাখ লাখ টাকা। ইংরেজরা কলকাতায় ফিরে আসার আনন্দে আজ নকু ধরের বাড়িতে উৎসব। গোটা বাড়ি ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে। পালকির মেলা লেগে গিয়েছে তাঁর বসতবাটির সামনে।

কলকাতার গণ্যমান্য লোকেরা আমন্ত্রিত। এসেছেন দর্পনারায়ণ ঠাকুর, জয়রাম ঠাকুর, গোবিন্দরাম মিত্তির, শোভারাম বসাক, বৈষ্ণবদাস শেঠ, বারাণসী দাস—সবাই। এঁদের সকলেরই ভদ্রাসনে ছিল মা লক্ষ্মীর স্থায়ী বসত। ইংরেজরা কলকাতা ছেড়ে চলে যাওয়ায় কিছুদিনের জন্য চঞ্চলা হয়ে উঠেছিলেন মা লক্ষ্মী। ইংরেজরা ফিরে এসেছে। এবারে থিতু হবেন মা-এই শুভকামনায় আজকের এই ফূর্তি। নকু ধরের আমন্ত্রণে মুনশি নবকৃষ্ণও হাজির এই সভায়।

বসরার কার্পেটের উপর আরাম করে বসে, উজ্জ্বল সোনালি রঙের মসলিনের কাপড়ে মোড়া ঝালর দেওয়া তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে মদিরার পাত্র হাতে নবকৃষ্ণর উদ্দেশে নকু ধর বললেন, ‘তোমার তো আবার এসব চলে না।’

নবকৃষ্ণ সংকুচিত হয়ে বলেন, ‘আজ্ঞে না। গৃহে গোবিন্দ আছেন।’

‘বেশ বেশ। গৃহে গোবিন্দ। কেল্লায় কর্নেল ক্লাইভ। ঈশ্বর তোমার সহায়। কী বল?’

‘সবই আপনার আশীর্বাদ।’

‘আমি তো নিমিত্ত মাত্র।’

মালাইয়ের পাত্রে চুমুক দিয়ে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘তা বললে চলবে কেন কর্তাবাবু। আপনি আড়াল থেকে কড়ি না জোগালে কি আমি ফলতায় যেতে পারতাম, না কর্নেলের সঙ্গে আমার এত সহজে মোলাকাত হতো?’

নকু ধর বললেন, ‘কড়ি জোগালেই সব হয় না নবকেষ্ট। মুরদ থাকা চাই। তোমার বাপু তা আছে।’

‘আমার আর এমনকী বাহাদুরি কর্তাবাবু? আমার তো পেটের দায়ে কাজ। ষাট টাকা বেতনের মুনশি। তবে মুরদই বলুন কিংবা মরদই বলুন, সবেরই জিন্দা মূর্তি হলেন ক্লাইভ সাহেব।’

বৈষ্ণবদাস চিন্তিত গলায় বললেন, ‘ওদিকে এখন কী হচ্ছে কে জানে?’

‘ওদিকে বলতে?’ শুধোলেন নকু ধর।

‘কলকাতা বেদখল হয়েছে— এই খবর শুনলে নবাব কি চুপ করে থাকবেন?’

‘ফোঁস হয়তো একটু করবেন, তবে চিন্তা নেই। নবাবকে বশে রাখার ঢের উমেদার আছে দরবারে।’

জয়রাম ঠাকুর বললেন, ‘বলছেন এ কথা? তবু ভয় হয় ধরমশায়। যুদ্ধের হাঙ্গামায় কম ক্ষতি তো হয়নি সকলের। কি জানি এবার কী হবে?’

গোবিন্দ মিত্তির শুধোলেন, ‘ধরমশায়, শুনলাম আপনি নাকি ফরাসডাঙার তাঁতিদের লাখ তিনেক টাকার দাদন দিয়েছেন।’

নকু ধর বললেন, ‘ঠিকই শুনেছ ভায়া। সুতানুটিতে অত কাপড় বোনার লোক কোথায়? যুদ্ধের হাঙ্গামায় সব পালিয়েছে। এখন ফরাসডাঙাই ভরসা। এ বছরের অঘ্রানে মাল পাঠাব ইংল্যান্ডে।’

বারাণসী দাস বলে উঠলেন, ‘করেছেন কি দাদা? এই ঝক্কির বাজারে এত টাকার বিনিয়োগ? ফের যদি লড়াই বাঁধে?’

‘এক পাত্তর খাও বারাণসী। ভয়ডর কমবে।’

‘নবকেষ্টর মতোই আমিও যে ও রসে বঞ্চিত দাদা।’

নকু ধর বললেন, ‘তাহলে নদিয়ার কেষ্টচন্দরের মতো গানবাজনা শোনো। দিনরাত রসে টইটম্বুর থাকেন মহারাজ। মেজাজটা ধাতে রাখেন। তা তোমরা যদি সব মত করো তো এখানে একটা গানের আসর বসিয়ে দিই।’

বারাণসী দাস হেসে বললেন, ‘তা মন্দ নয়। পানের চেয়ে গান ভালো।’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘ভালো জমবে ঝুমুর কিংবা খেউড়।’

‘না হে তার চেয়েও রসালো জিনিস আছে। বিদ্যাসুন্দর পালাগান।’

গোবিন্দ মিত্তির প্রশ্ন করেন, ‘বিদ্যাসুন্দর পালাগান? লিখল কে?’

নকু ধর বললেন, ‘জান না? অবশ্যি না জানারই কথা। বছর দুয়েক হল। ও পালা লিখেছেন কৃষ্ণচন্দ্রের সভাকবি ভারতচন্দ্র। কৃষ্ণনগরের দরবারে নিয়মিত গাওয়া হয়। গায় নীলমণি সমাদ্দার। ছোকরা গায়ক। ইন্দ্র চৌধুরীর মুখে শুনলাম ও পালা রসে নাকি একেবারে টইটম্বুর। সব রসের সেরা রস—আদিরস।’ এই বলে ফের হেসে উঠলেন নকু ধর।

ইংরেজদের কলকাতায় ফিরে আসার ছোঁয়া লেগেছে গরানহাটাতেও। বেশ কয়েক মাস বাদে হঠাৎই যেন জমজমাট হয়ে উঠেছে ঝুপড়িগুলো। দেদার বিকোচ্ছে আতর, গোলাপজল আর বেলকুড়ির মালা। সস্তা দরের দিশি বেশ্যাদের ঘরে ঢুঁ মারছে বহুদিনের উপোসী সামান্য মাইনের গোরা পল্টন।

গরাণহাটার আলো-আঁধারি গলিতে ঘুরে বেড়াচ্ছে টিম লরেন্সও। সে খুঁজে বেড়াচ্ছে তার পিয়ারি হিরেমনকে।

গরানহাটার পতিতাপল্লির এক কোঠাবাড়ির সামনে এসে পালকি থেকে নামলেন রতন সরকার। লোকে বলে মাগির দালাল রতু সরকার। হেঁজিপেঁজি নয়, খুবসুরতিদের নিয়ে তার কারবার। ফোর্ট উইলিয়ামের সাহেবদের মেয়েছেলে জুগিয়েই রতু সরকার অঢেল টাকার মালিক।

রতন সরকারকে দেখে পথ ছেড়ে দেয় কোঠার দরজায় মোতায়েন রক্ষী। এই বাবুকে সে ভালো করেই চেনে। বাড়ির মালকিনের সাহেবমহলে খুব নামডাক। বরাত নিয়ে আসে রতুবাবু।

ভিতরে ঢুকেই হাঁক ছাড়েন রতন সরকার, ‘ওরে ঈশ্বরী তৈরি হলি?’

ভিতরের ঘর থেকে ঈশ্বরীর গলা শোনা যায়। ‘এই যে—যাই গো বাবু।’

‘চটপট কর। দেরি হলে ঘোর বেইজ্জতি হবে।’ ঘরের মধ্যে দিয়ে অস্থির ভাবে পায়চারি করতে থাকে রতন সরকার।

খানিকবাদে ঘরে ঢুকে ঈশ্বরী বলে, ‘নিজেই নিতে এয়েচেন? নাগর বুঝি খুব দামি?’

রতন সরকারের মুখে কথা সরে না। হাঁ করে চেয়ে থাকে ঈশ্বরীর দিকে।

মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো রূপ বটে মেয়েটার। সাধে কি মজেছে সাহেবরা? ঈশ্বরীর গায়ের রংটা একটু চাপা। গাল ভাঙা। মুখের গড়ন অনেকটা বিলিতি মেমসাহেবদের মতো। বুকের উপর সেঁটে রয়েছে চুমকি বসানো লাল কাঁচুলি। বাঁধন ছিড়ে উপচে পড়তে চাইছে বুকের যৌবনসম্ভার। উন্মুক্ত নাভির নীচ থেকে নেমে এসেছে রুপোলি রঙের স্বচ্ছ মসলিনের ঘাঘরা। চুলে বেলকুড়ির মালা। রতন সরকারের চোখ ঝলসে যায়।

‘বুকের দিকে চেয়ে কী দেখছ গো রতনবাবু?’ খিলখিল করে হেসে ওঠে ঈশ্বরী।

চোখের দৃষ্টি ঘুরিয়ে দিয়ে রতন সরকার বলে, ‘কথার ছিরি দেখ মাগির। আমি কী তোর নাগর নাকি?’

‘আমার নাগর হতে আপত্তি আছে?’

‘খুব হয়েছে। আর ছেনালি করতে হবে না। এবারে চল দেখি।’

‘কেল্লায় যেতে হবে নাকি?’

‘না। আমার বাগানবাড়িতে।’

‘ওরে বাবা! সে তো অনেকটা পথ। তা আজকের নাগরটি কে গো?’

‘তোর অত খতেনে দরকার কী? কাজ সেরে পয়সা বুঝে নিবি। ব্যাস হয়ে গেল।’

‘তোমার দস্তুরি এবার একটু কমাও রতুবাবু। আমার লোকসান হয়ে যাচ্ছে।’

‘কথা শিখেছিস বেশ।’

‘শিখব না? আজ গতর আছে তাই খাতির আছে। গতর যেদিন থাকবে না? সেদিন?’

‘এখন চল বাপু। হিস্যে নিয়ে আলোচনা পরে হবে।’

‘না, আগেই বলে কয়ে নেওয়া ভালো। অনেকটা পথ যাওয়া-আসা। আজ কিন্তু দুগুণ মজুরি চাই।’

‘বেশ তাই হবে। আর কথা বাড়াস নে। এবার চল।’

মোটা একটা কাশ্মীরি আলোয়ান গায়ে জড়িয়ে পর্দা ঢাকা ডুলিতে চেপে বসল ঈশ্বরী।

রাতের অন্ধকার ঘন কালো। কুয়াশা ভেজা। কুলকুল শব্দে বয়ে চলেছে গঙ্গা। কালো চাদরে মাথা মুড়ে কেন্ট জাহাজ থেকে দড়ির মই বেয়ে চুপিসারে নীচে নেমে এলেন ক্যাপটেন আয়ারকুট। চেপে বসলেন একখানা শালতিতে। দাঁড় বাইতে লাগল মাঝি।

খানিকবাদে তীরে এসে ভিড়ল শালতি। কাঠের পাটাতন বেয়ে নেমে এলেন আয়ারকুট। পাড়ে প্রস্তুত রয়েছে পালকি। আয়ারকুট পালকিতে চেপে বসতেই কাহারের দল পালকি কাঁধে তুলে নিয়ে ছুটে চলল দ্রুত। এ পালকি রতন সরকারের। পালকি বাহকেরা ভালো করেই জানে সাহেবকে কোথায় পৌঁছে দিতে হবে।

রতন সরকারের সুরম্য বাগানবাড়ির ভিতরে এসে থামে পালকি। ভিতর থেকে বেরিয়ে আসেন আয়ারকুট। রতন সরকার এগিয়ে এসে মাথা ঝুঁকিয়ে অভ্যর্থনা জানায়।

আয়ারকুট বলেন, ‘সব ঠিক আছে তো বাবু?’

‘বিলক্ষণ। আমার কথা পরে মিলিয়ে নেবেন সাহেব। এত বছর আপনাদের সঙ্গে কারবার করছি, আপনাদের রুচি বুঝি। এ মেয়ে একেবারে শাইনিং ডায়মন্ড। সুখ দেবে।’

‘বহুত আচ্ছা।’ এই বলে খোশ মেজাজে রতন সরকারের হাতে ছোট একটা চামড়ার থলে গুঁজে দেন আয়ারকুট। ‘আশরফি আছে। দিল খুশ হলে আরও দেব বাবু।’

অন্ধকারেও রতন সরকারের চোখদুটো লোভে চকচক করে ওঠে।

ঘরে ঢুকেই সেজবাতির আলোয় ঈশ্বরীকে দেখেই মাথা ঘুরে যায় আয়ারকুটের। ঈশ্বরীর গোটা শরীরটাকে তিনি চোখ দিয়ে লেহন করতে থাকেন।

ঈশ্বরী পেশাদারি ঢঙে এগিয়ে এসে আয়ারকুটের হাত ধরে বলে, ‘আসুন সাহেব।’

বহুদিন নারীসঙ্গ বিরহিত আয়ারকুট ঈশ্বরীকে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে তার চিবুক ছুঁয়ে বলেন, ‘তুমি খুবসুরত আছ বিবি।’

মরদকে কী করে মাতিয়ে দিতে হয় সে বিদ্যায় ঈশ্বরী দারুণ পটু। কামনা মদির একটা কটাক্ষ সে ছুড়ে দেয় সাহেবের দিকে। তার চোখের এক কায়দাতেই আয়ারকুট আবেগে ভেসে যান। ঈশ্বরীকে নিয়ে আছড়ে পড়েন নরম বিছানায়। ওদিকে দোর যে খোলা সেদিকে হুঁশ নেই।

বাইরে থেকে আলতো করে দোর বন্ধ করে দেন রতন সরকার। তার ঠোঁটে মুচকি হাসি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *