1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ২১

২১

গটমট করে হেঁটে এসে ক্লাইভের বাহিনীর সামনে থাকা দিশি সেপাইরা ঢুকতে গেল ফোর্ট উইলিয়ামের ভিতরে। তাদের দিকে বেয়নেট উঁচিয়ে ধরল কেল্লার প্রবেশ দ্বারে মজুত গোরা পল্টন।

‘হল্ট। হল্ট। স্টপ হিয়ার।’

থমকে গেল দিশি সেপাইরা। আক্কেল গুড়ুম তাদের। ব্যাপার কী? কেল্লায় ঢোকার পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের বাহিনীর ফৌজিরা। কিন্তু কেন?

কেল্লার প্রবেশ দ্বারের মাথায় উড়ছে কোম্পানির নিশান। এর অর্থ হল, কেল্লা এখন কোম্পানির কবজায়। স্থলবাহিনী পৌঁছনোর আগেই ফোর্ট উইলিয়ামের দখল নিয়েছেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। তাহলে ভিতরে যেতে বাধা কোথায়? থতমত খেয়ে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল দিশি সেপাইয়ের দল।

পিছন থেকে ভেসে এল মেজর কিলপ্যাট্রিকের হুঙ্কার। ‘মুভ অ্যাহেড। সামনে এগোও।’

কয়েক কদম এগোতেই গোরা পল্টনের বেয়নেটের খোঁচা খেয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল কয়েকজন দিশি সেপাই। দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি বেঁধে যাওয়ার উপক্রম।

পিছন থেকে ছুটে এলেন মেজর কিলপ্যাট্রিক। ভয়ানক উত্তেজিত।

‘করছ কী তোমরা? আর ইউ ক্রেজি?’

মেজরের ধমক খেয়ে সংযত হল দুই পক্ষ। তবে জনা পনেরো কুড়ি গোরা পল্টন ঘন সন্নিবিষ্ট হয়ে কেল্লার দরজা আগলে রাখল। হাতে বন্দুক। মাথা নীচু। পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল তারা। কেল্লার ভিতরে কাউকে তারা যেতে দেবে না। এটা তাদের দেহের ভাষায় পরিষ্কার।

চোখ পাকিয়ে গর্জন করে উঠলেন কিলপ্যাট্রিক, ‘হোয়াট হ্যাপেনড?’

জনৈক সৈনিক জবাব দিল, ‘কেল্লা দখল করেছেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন।’

‘সো হোয়াট? তোমরা কেল্লায় ঢোকার পথ আটকে রেখেছ কেন?’ মেজর কিলপ্যাট্রিকের গলার স্বর আরও এক পর্দা চড়ে গেল।

‘অ্যাডমিরাল স্যারের অর্ডার।’

‘হোয়াট?’

শান্ত গলায় দ্বাররক্ষী জবাব দিল, ‘ওয়াটসন স্যারের পারমিশন ছাড়া কারও কেল্লার ভিতরে ঢোকা নিষেধ।’

‘হোয়াট ননসেন্স আর ইউ টকিং?’ রাগে ফেটে পড়লেন মেজর কিলপ্যাট্রিক।

‘ট্রু স্যার। আমাদের কাজ উপরওয়ালাদের অর্ডার ক্যারি আউট করা।’

দাঁতে দাঁত চেপে কিলপ্যাট্রিক বললেন, ‘গেট আউট অফ দ্য ওয়ে। সরে যাও।’

‘সরি স্যার। কেল্লায় ঢুকতে গেলে আপনাকে অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের অর্ডার দেখাতে হবে।’

‘কোথায় আছেন অ্যাডমিরাল?’

‘কেন্ট জাহাজে। তবে আপনি ক্যাপ্টেন আয়ারকুটের সঙ্গে কথা বলতে পারেন। তিনি এখন কেল্লার গভর্নর।’

‘আই উইল হ্যাং ইউ বাস্টার্ড!’ এই বলে মেজাজ হারিয়ে আলাপরত পল্টনকে এক থাপ্পড় কষিয়ে বসলেন মেজর কিলপ্যাট্রিক। সঙ্গে সঙ্গে কেল্লার পাহারায় নিযুক্ত অন্যান্য গোরা পল্টনরাও বন্দুক উঁচিয়ে ধরল। কিলপ্যাট্রিকের সমর্থনে দিশি সিপাইরা হইহই করে উঠল।

‘স্টপ দিস।’

ভারী গলার ধমক শুনে চমকে উঠল দুই পক্ষ। জুতোর শব্দ তুলে এগিয়ে এলেন কর্নেল ক্লাইভ। ওয়াটসনের সেনাদের মুখোমুখি এসে দাঁড়ালেন তিনি।

কর্নেল ক্লাইভের প্রখর ব্যক্তিত্বের সামনে ভেঙে পড়ল ওয়াটসনের হুকুম তামিলে নিযুক্ত পল্টনদের প্রতিরোধ। চুরমার হয়ে গেল কেল্লায় কাউকে ঢুকতে না দেওয়ার অনমনীয় মনোভাব।

স্থলবাহিনীর কম্যান্ডার-ইন-চিফ কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। শুধু নামটারই ওজন পদমর্যাদার চেয়ে অনেক বেশি। গোরা পল্টনরা স্যালুট জানিয়ে সরে দাঁড়াল। কর্নেল ক্লাইভ ফোর্ট উইলিয়ামের ভিতরে ঢুকলেন। পিছনে তাঁর বাহিনী। এদের সঙ্গে মিশে গিয়ে হলওয়েল ও রজার ড্রেকও ঢুকে পড়লেন কেল্লায়।

কর্নেল ক্লাইভ দাঁড়িয়ে আছেন কেল্লার ভিতরে। দৌড়ে এলেন আয়ারকুট।

এই অনভিপ্রেত ঝুটঝামেলায় তিতিবিরক্ত ক্লাইভের মেজাজটা কেল্লার ভিতরে এসে আরও খিঁচড়ে গিয়েছে। কেল্লার সব ঘরের দরজায় লাগানো রয়েছে বড় বড় হুড়কো। দরজার সামনে পাহারা দিচ্ছে ওয়াটসনের ফৌজের বন্দুকধারী পল্টন। এরা কর্নেলকে স্যালুট জানাল বটে কিন্তু সেসব কেমন যেন দায়সারা গোছের। ক্লাইভের আগমনে এরা যেন যথেষ্ট বিব্রত। নীরব দৃষ্টিতে যেন বলতে চাইছে—এখান থেকে আপনি চলে যান কর্নেল। ফোর্ট উইলিয়ামে আপনি ব্রাত্য। ফোর্ট উইলিয়ামের কোনও ঘরে প্রবেশাধিকার নেই আপনার। আমাদের মাফ করুন। আমরা হুকুমের দাস।

রাগে ফুঁসতে লাগলেন ক্লাইভ। বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে শুধোলেন, ‘হোয়াটস গোয়িং অন?’

কর্নেলের মেজাজের উত্তাপ টের পেয়ে থতমত খেয়ে আয়ারকুট বললেন, ‘সরি স্যার। আমি শুধু অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের অর্ডার ক্যারি আউট করছি।’

‘কী অর্ডার?’

‘এই যে রিটন মেমো।’

আয়ারকুটের হাত থেকে কাগজটা নিয়ে চোখ বোলালেন কর্নেল। লাল মুখটা রাগে আরও লাল হয়ে উঠল। কাগজটা দলা পাকিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়ে আয়ারকুটের উদ্দেশে হুকুমের সুরে ক্লাইভ বললেন, ‘কেল্লার ঘরগুলো খুলে দাও। আমার সোলজাররা ক্লান্ত। দে নিড রেস্ট।’

‘আমায় মাফ করবেন স্যার। কী করে অ্যাডমিরালের রিটেন মেমো ইগনোর করব?’

‘আমি বলছি। তাই করবে।’

‘বাট আর্মির ডিসিপ্লিন?’

‘ডিসিপ্লিন? ডিসিপ্লিনের মানে বোঝ? নবাবের সঙ্গে লড়াই করতে এসে ন্যাভালো ফোর্স হাতাহাতি বাঁধিয়েছে ল্যান্ড ফোর্সের সঙ্গে। ওয়ান্ডারফুল। ইস ইট ডিসিপ্লিন?’

আয়ারকুট নিষ্প্রভ গলায় বলার চেষ্টা করল, ‘কেল্লা দখল করেছেন অ্যাডমিরাল। তাই—’

আয়ারকুটকে বাধা দিয়ে হলওয়েল বলে উঠলেন, ‘তাই তিনি যা খুশি তাই করতে পারেন? বেঙ্গল এক্সপিডিশনের কম্যান্ডার—ইন—চিফ কর্নেল ক্লাইভ। তাঁকে এভাবে ডিফেম করা যায় না।’

পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে আড় চোখে একবার হলওয়েলের দিকে তাকালেন ক্লাইভ।

ড্রেক বললেন, ‘আমি ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর। এ কেল্লা কোম্পানির। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কী করে কেল্লা নিজের দখলে রাখতে পারেন? দিস ইজ আনএথিকাল।’

কাতর কণ্ঠে আয়ারকুট বললেন, ‘প্যারডন মি স্যার। প্লিস স্যার আপনারা অ্যাডমিরালের সঙ্গে একবার কথা বলুন।’

‘ঘরগুলোর চাবি আমাকে দাও।’ আগুন ঝরানো দুই চোখে আয়ারকুটের দিকে তাকিয়ে বরফের মতো শীতল গলায় হুকুম করলেন ক্লাইভ।

‘প্লিজ স্যার! অ্যাডমিরাল কেন্ট জাহাজে রয়েছেন। আপনি একবার অন্তত—’

‘আই অ্যাম নট অ্যা সারভেন্ট অফ চার্লস ওয়াটসন।’ প্রচণ্ড জোরে ধমকে উঠলেন কর্নেল ক্লাইভ। ডানা ঝাপটে উড়ে গেল এক ঝাঁক পায়রা। চমকে উঠল আশাপাশের সবাই। রাগে কাঁপতে লাগলেন ক্লাইভ। কর্নেলের এই উগ্র মূর্তি দেখে আয়ারকুটের মুখ সাদা হয়ে গেল ভয়ে।

কর্নেল ক্লাইভ ফের গর্জন করে উঠলেন, ‘তোমার সাহস দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি মিঃ আয়ারকুট। ইচ্ছে করলে আমি তোমাকে অ্যারেস্ট করতে পারি। মাদ্রাজ কাউন্সিল সেই ক্ষমতা আমাকে দিয়েছে। কাজেই আশা করি তুমি নিজেকে বিপদে ফেলতে চাইবে না। ঘরের চাবিগুলো আমাকে দাও।’

আর কথা বাড়ানোর সাহস হল না আয়ারকুটের। চাবির গোছা ক্লাইভের হাতে তুলে দিয়ে সুলুপে চেপে কেন্ট জাহাজের উদ্দেশে তিনি নদীতে ভেসে পড়লেন। ঘটনা পরম্পরা এখনই অ্যাডমিরালকে জানানো দরকার। তিনি কড়া নির্দেশ দিয়ে গিয়েছেন, তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ যেন কেল্লায় না ঢোকে। কর্নেল ক্লাইভ একরকম জোর করে ঢুকে পড়েছেন কেল্লায়। তাঁর হাতে কেল্লার চাবি তুলে দিতে আয়ারকুট বাধ্য হয়েছেন। একথা শুনলে অ্যাডমিরাল আবার কী মূর্তি ধারণ করবেন কে জানে? দুই বড় সাহেবের গোলমালের মধ্যে পড়ে তাঁর প্রাণটা না আজ যায়।

সূর্য অস্ত যাচ্ছে। পশ্চিমাকাশ রাঙা। ডেকচেয়ারে বসে বিয়ারের মগ হাতে বিকেল শেষে নদীর রূপ উপভোগ করছিলেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। একেবারে ভগ্নদূতের মতো বিদ্ধবস্ত চেহারায় তাঁর সামনে হাজির হলেন আয়ারকুট। স্যালুট জানিয়ে বললেন, ‘স্যার!’

প্রাকৃতিক শোভায় মশগুল হয়েছিলেন ওয়াটসন। আয়ারকুটের গলা শুনে মুখ ঘোরালেন। আয়ারকুটকে আপাদমস্তক জরিপ করে ভুরু কুঁচকে শুধোলেন, ‘কী হয়েছে?’

‘সোলজারদের নিয়ে কেল্লায় জোর করে ঢুকে পড়েছেন কর্নেল ক্লাইভ।’

‘হোয়াট? তুমি কী করছিলে?’

‘আই ট্রায়েড মাই বেস্ট। আপনার অর্ডারের কথা বললাম। তবু কর্নেল শুনলেন না।’

‘রাবিশ। তোমরা সব ওয়ার্থলেস।’ সশব্দে বিয়ারের মগটা কাঠের টেবিলের উপর নামিয়ে রাখলেন ওয়াটসন। তারপর চেয়ার ছেড়ে দুমদুম করে হেঁটে গিয়ে নিজের কেবিনে ঢুকে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন আয়ারকুট। টুপি খুলে মাথা চুলকোতে লাগলেন।

কিছুক্ষণ পর কেবিনের দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন ওয়াটসন। হাতে একটা কাগজ। আয়ারকুটের উদ্দেশে বললেন, ‘যাও এটা গিয়ে কর্নেল ক্লাইভকে দেখাও।’

‘ইয়েস স্যার।’

সুলুপে চড়ে পাড়ে এসে উঠলেন আয়ারকুট। হাতে ধরা রয়েছে কর্নেল ক্লাইভের উদ্দেশে অ্যাডমিরালের লেখা চিঠিখানা। চিঠিতে একবার চোখ বুলিয়ে হাড় হিম হয়ে গিয়েছে আয়ারকুটের। এ চিঠি পড়ে নির্ঘাত রাগে ফেটে পড়বেন ক্লাইভ। কেল্লার দখল নিয়ে দুই বড় সাহেবের মধ্যে ডুয়েল না বেঁধে যায়।

কেল্লায় ঢুকে চিঠিখানা কর্নেলের হাতে তুলে দিয়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেলেন আয়ারকুট।

কর্নেল ক্লাইভের উদ্দেশে অ্যাডমিরাল লিখেছেন, আপনি হতে পারেন স্থলবাহিনীর কম্যান্ডার-ইন-চিফ, তা বলে যে-কেল্লা আমি দখল করেছি, সেই কেল্লায় আপনি জোর করে প্রবেশ করতে পারেন না। আপনি এখনই আপনার সৈন্যসামন্ত নিয়ে কেল্লা ছেড়ে চলে যান, না হলে পরিণতি মারাত্মক হবে।

চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দিয়ে ক্লাইভ হাঁক দিলেন, ‘মিঃ আয়ারকুট!’

ইষ্টনাম জপতে জপতে ক্লাইভের সামনে এলেন আয়ারকুট। ভাবলেন, এবার বোধ হয় গর্দান গেল তার।

কোমরে ঝুলতে থাকা তরোয়ালের বাঁটে হাত রেখে ক্লাইভ বললেন, ‘অ্যাডমিরালকে গিয়ে তুমি বল, কনসিকোয়েন্স যাই হোক না কেন আমি কেল্লা ছেড়ে যাব না।’

‘ইয়েস স্যার।’ কথাটা বলেই ক্লাইভের সামনে থেকে ছুটে পালালেন আয়ারকুট। ফের ছুটলেন কেন্ট জাহাজের উদ্দেশে। ব্যাপারটা ক্রমশ ঘোরালো হয়ে উঠছে দেখে আয়ারকুটের সঙ্গে গেলেন রজার ড্রেক, হলওয়েল ও কলকাতা কাউন্সিলের আরেক সদস্য রিচার্ড বিচার। সকলে মিলে অ্যাডমিরালকে বুঝিয়ে যদি একটা মিটমাটের রাস্তা বের করা যায়।

প্রবল উত্তেজিত হয়ে কেল্লার প্রশস্ত চাতালের উপর পায়চারি করতে লাগলেন ক্লাইভ। আশেপাশে সবাই চুপ। কারও মুখে কোনও কথা নেই। মেজর কিলপ্যাট্রিক ও ক্লাইভের বাহিনীর অন্যান্য ক্যাপ্টেনরা স্তম্ভিত। মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রয়েছে নবকৃষ্ণ।

মনের মধ্যে আগুন জ্বলছে ক্লাইভের। সারা গায়ে অপমানের জ্বালা। তিনি কখনোই চাননি যে এমন উদ্ভট সঙ্কটের উদ্রেক হোক। এ ব্যাপারে তাঁর তো কোনও দোষ নেই। অ্যাডমিরাল ওয়াটসন যদি পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝামেলা বাঁধাতে চান, গোটা আর্মির সামনে তাঁকে অপদস্থ করতে চান সেটা কি চুপ করে তিনি মেনে নিতে পারেন? অ্যাডমিরালের দাবি মেনে তিনি পিছু হটলে কী বার্তা যেত তাঁর অধীনস্থ অফিসারদের মধ্যে? তাদের মনোবল ভাঙত না কি?

সামনে পড়ে রয়েছে অনেক কাজ। নবাব সিরাজদ্দৌলা যখন শুনবেন কলকাতা হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে, তখন তিনি কি চুপ করে থাকবেন? সৈন্যসামন্ত নিয়ে ফের হয়তো ধেয়ে আসবেন কলকাতায়। এখন কি নিজেদের মধ্যে কলহ করার সময়?

আমার কেল্লা! আমার কেল্লা! বলে অ্যাডমিরালের অমন হামলে পড়ার হয়েছেটা কী? ফোর্ট উইলিয়াম দখল করে ইংরেজদের কলকাতা থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। সেই ফোর্ট উইলিয়াম পুনরুদ্ধার হয়েছে। কেল্লার মালিক কোম্পানি। খানিকটা নির্বোধ, মাথামোটা গোছের লোক হলেও মাদ্রাজ কাউন্সিলের আদেশ মোতাবেক ফোর্ট উইলিয়ামের গভর্নর এখনও রজার ড্রেক। তাঁর হাতে কেল্লার চাবি তুলে দিতে হবে। এটা কি অ্যাডমিরাল ওয়াটসন বুঝতে পারছেন না?

ক্লাইভ জানেন, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন তাঁকে বড় একটা পছন্দ করেন না। সব বিষয়ে তিনি তাঁকে টেক্কা দিতে চান। অ্যাডমিরাল কথায় কথায় বুঝিয়ে দেন তিনি রাজার প্রতিনিধি। কোম্পানি নিয়ে তাঁর কোনও মাথাব্যথা নেই। রাজার হুকুমে তিনি এদেশে এসেছেন। অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের ইগো পাহাড়ের মতো। লোকটাকে বিশ্বাস নেই। এই মনকষাকষির অজুহাতে যদি তাঁর সৈন্যসামন্ত ও জাহাজগুলো নিয়ে অ্যাডমিরাল এই সময় বেঙ্গল থেকে সরে পড়েন তাহলে অথই জলে পড়বে ইংরেজরা। এই বিষয়টা ক্লাইভকে ভাবিয়ে তুলল। কিন্তু এই সমস্যা থেকে সম্মান নিয়ে বেরিয়ে আসার পথ কোথায়?

হাঁটতে হাঁটতে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন কর্নেল ক্লাইভ। হাঁক দিলেন, ‘মুনশি!’

‘হুজুর!’ ক্লাইভের ডাক শুনে ছুটে গেলেন নবকৃষ্ণ।

ক্লাইভ বললেন, ‘তোমাকে আমি খুব ইন্টেলিজেন্ট লোক বলে মনে করি নবকিসেন।’

মাথা ঝুঁকিয়ে নবকৃষ্ণ বলেন, ‘আই অ্যাম অবলাইজড।’

‘এখন কী করা যায়? কী মনে হয় তোমার?’

‘হুজুর এ আপনাদের ভিতরের বিষয়। আমি নগণ্য মানুষ। এ ব্যাপারে কিছু বলা আমার সাজে না। আপনি শুধোলেন বলে বলছি, অ্যাডমিরাল ওয়াটসন লোক সুবিধের নয়।’

মুচকি হেসে গায়ের ঝাল মেটাতে ক্লাইভ বললেন, ‘ওয়েল সেইড।’

‘তবে আপনি ওয়াইজ ম্যান।’

নবকৃষ্ণর চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ, ‘কী বলতে চাও?’

‘গোলমালটা দ্রুত মিটিয়ে ফেলা উচিত।’

‘গোলমাল তো আমি বাঁধাইনি।’

বিলক্ষণ ঠিক হুজুর। অ্যাডমিরালের ছেলেমানুষি জেদই সব অনিষ্টের মূলে। তবে কথা হল গিয়ে ছেলেমানুষকে ভোলানো খুব সহজ।

কৌতূহলী চোখে নবকৃষ্ণর দিকে চেয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনি মানুষ হিসেবে অ্যাডমিরালের চেয়ে অনেক বড়। কিন্তু দরকারে একটু খাটো হতে অসুবিধে কোথায়?’

‘ইউ মিন কম্প্রোমাইজ?’

‘কম্প্রোমাইজ নয় হুজুর, কৌশল। আপনারা যাকে বলেন স্ট্রাটেজি। কিন্তু সাহেব আপনি কি সত্যিই সৈন্যসামন্ত নিয়ে এই কেল্লার ভিতরে থাকতে চান?’

‘নট অ্যাট অল। আমার দেশের এই কোয়ারেলসাম স্টুপিড লোকগুলোর সঙ্গে আমি কিছুতেই অ্যাডজাস্ট করতে পারব না।’

‘এই কথাটাই আপনার মুখ থেকে শুনতে চাইছিলাম হুজুর। কলকাতা শহরের আশেপাশে ঢের ভালো ভালো থাকার জায়গা আছে। আমি খুঁজে দেব। নিরিবিলিতে নিজের মতো থাকবেন। ব্যাস তাহলে তো সব কিছুর সুরাহা হয়ে গেল।’

ক্লাইভ অবাক হয়ে প্রশ্ন করলেন, ‘কী ভাবে? হাউ?’

‘ওয়াটসন সাহেবের একরাশ ইগো। তিনি চান ইগোর তুষ্টি। সেই কাজটা করে আপনি কেল্লা থেকে সরে পড়ুন। নবাবের সঙ্গে লড়তে গেলে অ্যাডমিরালের সাহায্য আপনার লাগবে।’

হঠাৎ বিউগলের শব্দ শোনা গেল।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘মনে হচ্ছে অ্যাডমিরাল সাহেব আসছেন। এবার নিজের মতো করে ব্যাপারটা সামলে নিন হুজুর।’

মুচকি হেসে সম্মতিসূচক মাথা নাড়লেন ক্লাইভ।

অ্যাডমিরাল ওয়াটসন কেল্লার ভিতরে ঢুকলেন। সঙ্গে আয়ারকুট, ড্রেক, হলওয়েল ও বিচার। পিছনে তাঁর সশস্ত্র বাহিনী। চোখের ইশারায় নিজের সেনাদের হাতিয়ার ওঠাতে নিষেধ করে উচ্ছ্বসিত গলায় ক্লাইভ বলে উঠলেন, ‘ওয়েলকাম অ্যাডমিরাল। মোস্ট ওয়েলকাম। আমি আপনার জন্যেই ওয়েট করছিলাম। দেখে নিন আপনার কেল্লা অক্ষত আছে কিনা।’

কর্নেল ক্লাইভের কণ্ঠের আর্দ্রতায় কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন ওয়াটসন।

এগিয়ে এসে অ্যাডমিরালের সঙ্গে করমর্দন করলেন ক্লাইভ। তারপর সকলের উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললেন, ‘লিসন এভরিবডি। এই ফোর্ট ক্যাপচার করেছেন অ্যাডমিরাল ওয়াটসন। পুরো ক্রেডিট তাঁর। হি ইজ আওয়ার ন্যাশনাল হিরো। চার্লস ওয়াটসনের মতো এবল অ্যাডমিরাল আর কোনও দেশে আছে কিনা, এ নিয়ে আমার সন্দেহ আছে। ফোর্ট উইলিয়ামের চাবি অ্যাডমিরালের হাতে তুলে দিয়ে আমি তাঁকে সম্মান জানাতে চাই।’ এই বলে ফোর্ট উইলিয়ামের চাবি অ্যাডমিরাল ওয়াটসনের হাতে তুলে দিলেন ক্লাইভ।

যুদ্ধং দেহী মনোভাব নিয়ে এসেছিলেন ওয়াটসন। ক্লাইভের এই কথায় গলে জল হয়ে গেলেন তিনি। মুখের ভাষায় ফুটে উঠল পরিতৃপ্তি। কর্নেল ক্লাইভ জনসমক্ষে এভাবে স্বীকৃতি দিচ্ছেন তাঁকে। আর কী চাই? ওয়াটসন বললেন, ‘কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ একজন ব্রেভ ওয়ারিয়র। উই আর প্রাউড অফ হিম। কলকাতায় কোম্পানিকে ফিরিয়ে আনার জন্য তাঁর কন্টিবিউশন মনে রাখবে ইতিহাস। আমি কর্নেলকে বলব, আপনি আপনার সৈন্যদের নিয়ে কেল্লাতেই থাকুন। আমি জলে যুদ্ধ করা লোক—কেন্ট জাহাজই আমার হেভেন।’

আড়ালে দাঁড়িয়ে মুখ টিপে হাসলেন নবকৃষ্ণ।

ক্লাইভ বললেন, ‘নো অ্যাডমিরাল। নবাব আবার হানা দিতে পারেন কলকাতায়। তাই শহরে ঢোকার মুখে নর্থে কোনও একটা জায়গায় আমি ক্যাম্প করতে চাই।’

‘তাহলে কেল্লার চাবি?’

‘আপনি মিঃ ড্রেকের হাতে তুলে দিন।’ বললেন কর্নেল ক্লাইভ।

এই মুহূর্তটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন রজার ড্রেক। তিনি প্রায় ছোঁ মেরে চাবির গোছা ওয়াটসনের হাত থেকে কেড়ে নিলেন।

চাবির গোছা শূন্যে ছুড়ে দিয়ে ফের লুফে নিয়ে ড্রেক সাহেব উল্লসিত কণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘আই অ্যাম রজার ড্রেক। গভর্নর অফ ফোর্ট উইলিয়াম।’

ক্লাইভ ও ওয়াটসন একসঙ্গে হাততালি দিয়ে উঠলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *