১৬
মুর্শিদাবাদের বাতাসে গুমোট ভাব। চকবাজার থমথমে। অলিগলিতে কানাকানি, ফিসফাস। সকলের মধ্যেই একটা কী হয় কী হয় ভাব।
রোজ যেভাবে চকবাজারের দিনরাত্রি আবর্তিত হয় সেভাবেই সব চলছে। নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম নেই। কিন্তু কোথায় যেন একটা জোশের অভাব। আসলে সবার মন পড়ে রয়েছে অন্য জায়গায়। ওমরাহ থেকে জমিদার, বেনিয়ান থেকে সাধারণ মানুষ উৎকর্ণ হয়ে আছে সবাই। গরমাগরম খবরের আশায় নিজামত কেল্লার আশেপাশে ঘুরঘুর করছে অনেকে।
পূর্ণিয়ার যুদ্ধক্ষেত্র থেকে মুর্শিদাবাদে এখনও কোনও খবর এসে পৌঁছয়নি। চকবাজারের বাতাসে উড়ছে নানারকম গুজব। গুলতানিতে মশগুল অনেকে। এই সুযোগে যুদ্ধ নিয়ে নানারকম ঝুটা সমাচার ছড়িয়ে দিয়ে ফায়দা লুটছে জুয়ার কারবারিরা। কেউ বলছে সিরাজদ্দৌলা জঙ্গ ফতে করেছেন, আবার কেউ বলছে এ খবর গলত। জঙ্গ ফতে করেছেন শওকত জঙ্গ। মুর্শিদাবাদে এসে পড়লেন বলে। এখন তিনি শহর থেকে দশ মঞ্জেল দূরে।
নিজামত কেল্লার বুরুজের উপর আকাশের দিকে মুখ তুলে থমকে রয়েছে তোপের নল। সবসময় সতর্ক হয়ে রয়েছে তোপদার। দৃষ্টি দূরের দিকে। পূর্ণিয়ার দিক থেকে ছুটে আসা কোনও ঘোড়সওয়ার ওয়াকেনবীশের হাতের নিশানটা দেখলেই জানা যাবে যুদ্ধের ফলাফল। সঙ্গে সঙ্গে আগুন দিতে হবে বারুদে। ঘন ঘন গর্জন করবে কামান। নিজামত কেল্লা সেলাম জানাবে বিজয়ী নবাবকে। সিরাজদ্দৌলা বা শওকত জঙ্গ, জয় কার হল সেটা গৌণ বিষয়। নিজামত কেল্লার তোপধ্বনি কেবল বোঝে মসনদের প্রতি আনুগত্য। তোপদারও বোঝে তাই। ইনসান নয়, মসনদই শেষ কথা।
নিজামতের নোকরি যারা করে তাদের উৎকণ্ঠা সব থেকে বেশি। এদের অনেকেই সিরাজকে নবাব হিসেবে চায় না। শওকত জঙ্গের জিত হলে খুশি হবে এরা। আর যদি ফল উলটো হয়, তাদের কী পরিণতি হবে সেই ভয়েই কাঁটা হয়ে আছে একদল লোক।
সিরাজদ্দৌলার সঙ্গে অনেক প্রবীণ ওমরাহের সম্পর্কটা এখন কেমন তা চকবাজারে আতরের সামান্য কারবারিও জানে। নিজামতের কোনও কিছুই আজকাল গোপন থাকে না। সব খবর ছড়িয়ে পড়ে কেল্লার চার দেওয়ালের বাইরে।
নিজামত কেল্লার অন্দরমহলে স্বস্তিতে নেই আলিবর্দির বেগম শরফ উন্নেসা। অস্থির হয়ে আছে তাঁর মন। থেকে থেকেই অলিন্দে এসে দাঁড়াচ্ছেন। কোনও ঘোড়সওয়ার নজরে এলেই চঞ্চল হয়ে উঠছেন। পূর্ণিয়ার খবর নিয়ে ওয়াকেনবীশ এসে পৌঁছল নাকি?
সিরাজ বনাম শওকত জঙ্গ। এ লড়াই শরফ উন্নেসার আদরের দুই নাতির। সিরাজ তাঁর ছোট মেয়ে আমিনার বেটা। মেজো মেয়ে ময়মানার বেটা শওকত। প্রায় পিঠোপিঠি দুই ভাই। দুজনকে নিয়ে কতই না খুশির তসবির জমে রয়েছে দিদিমার বুকে।
এই নিজামত কেল্লার ভিতরেই ছুটোছুটি করে খেলে বেড়াত সিরাজ ও শওকত। ফুলের মতো দুটি শিশু। মাঝে মাঝে ছুটে এসে এরা ঝাঁপিয়ে পড়ত দিদিমার বুকে। রাতে বিছানায় শুয়ে কহানি শোনার জন্য আবদার করত। কখনও কখনও দিবানের পাশে চৌকির উপর রাখা বিশ্রামরত আলিবর্দির মাথার উষ্ণীষটা নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত খুদে দুই ভাইয়ের মধ্যে।
শরফ উন্নেসা বলতেন, ‘এ উষ্ণীষ বাংলার নবাবের। এ নিয়ে খেলা করতে নেই!’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। এই খেলা থেকে নিরস্ত করার জন্য শরফ উন্নেসা ছুটে গেলে উষ্ণীষটা নানি বেগমের দিকে ছুড়ে দিয়ে ছুটে পালাত দুই ভাই।
এ দৃশ্য দেখে শিশুর সারল্যে হেসে উঠতেন নবাব আলিবর্দি খাঁ। পরে উষ্ণীষটা হাতে নিয়ে গম্ভীর হয়ে নবাব বলতেন, ‘বেগম একদিন এরা জওয়ান হবে। জওয়ানির দিনে সত্যিই এরা যদি এই উষ্ণীষের জন্য লড়াই করে?’
‘আপনি থাকতে তা হবে না জাঁহাপনা।’
‘ইনসান কি চিরকাল জিন্দা থাকে বেগম? আমি যখন থাকব না তখন যদি’
নবাবকে বাধা দিয়ে শরফ উন্নেসা বলেন, ‘থাক। ও কথা বলতে নেই।’
নিজামত কেল্লার অলিন্দে দাঁড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন শরফ উন্নেসা। খোশবাগের মাটিতে চিরবিশ্রামে রয়েছেন আলিবর্দি খাঁ। পয়গম্বরের কোলে আশ্রয় নিয়েছেন পরম নিশ্চিন্তে। এই কঠিন দুনিয়ায় রেখে গিয়েছেন তাঁর বেগমকে।
দিনগুলো ছিল বড় কষ্টের। বৈভব ছিল না। তবু শান্তি ছিল মনে। আলিবর্দি তখন সহায় সম্বলহীন। শরফ উন্নেসার কোলে সবে এসেছে মেহেরুন্নিসা। আলিবর্দি ও শরফ উন্নেসার প্রথম সন্তান। ঔরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর আলিবর্দি সপরিবারে চলে এলেন কটকে।
মুর্শিদকুলির দামাদ সুজাউদ্দিন তখন কটকের শাসক। তিনি আলিবর্দির দুঃসম্পর্কের আত্মীয়। সেদিন বেদৌলত, বেসাহারা আলিবর্দিকে আশ্রয় দিয়েছিলেন সুজাউদ্দিন। নিজামতের নোকরিতে নিযুক্ত করে তাঁর রুটিরুজির বন্দোবস্ত করে দিয়েছিলেন।
আলিবর্দি ছিলেন কামিল ইনসান। অল্প দিনের মধ্যেই তিনি নিজের যোগ্যতায় সুজাউদ্দিনের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠলেন। মুর্শিদকুলির মৃত্যুর পর বাংলার মসনদে বসলেন সুজাউদ্দিন। তাঁর হাত ধরে আলিবর্দির উন্নতি হল খুব দ্রুত। প্রথমে রাজমহলের ফৌজদার, তার পরে পাটনার ডেপুটি সুবাদার। গর্বে বুক ফুলে উঠল শরফ উন্নেসার। মনে মনে খোদাতালাকে অনেক সুকরিয়া জানালেন।
সুজাউদ্দিনের এন্তেকাল হল। দুর্দিনের সহায়, মনিব সুজাউদ্দিনের পুত্র সরফরাজ খাঁকে হত্যা করে বাংলার মসনদের দখল নিলেন আলিবর্দি খাঁ। কয়েক বছর আগেও যিনি ছিলেন নিঃস্ব, বাংলার অগণিত আমআতরফ মানুষের একজন, সেই আলিবর্দি হয়ে গেলেন বাংলার নবাব। শরফ উন্নেসা নবাব বেগম। সেদিন সরফরাজ জননী জেনেতুন্নেসার করুণ আর্তনাদ তেমন করে তো নাড়া দেয়নি শরফ উন্নেসাকে। তিনি কি সেদিন নবাব বেগম হয়ে সুনহারি খোয়াবে বুঁদ হয়েছিলেন?
পাপ! পাপ! মহাপাপ! গুণাহ! মনিবপুত্রকে হত্যার পাপ। সেই পাপের কিমত কি আজ একটু একটু করে মিটিয়ে দিতে হবে শরফ উন্নেসাকে? আলিবর্দির এন্তেকাল হয়েছে এক বছরও পার হয়নি। এর মধ্যেই যেন নড়বড় করতে শুরু করেছে নবাবির কাঠামোটা। পরিত্যক্ত জীর্ণ প্রাসাদের মতো পলেস্তারা খসে ইট, পাথর বেরিয়ে পড়ছে। ধীরে ধীরে অচল হয়ে পড়ছে শাসনব্যবস্থা। বিচক্ষণ শরফ উন্নেসা দিব্যি বুঝতে পারেন।
পারবে কি সিরাজ নড়বড়ে কাঠামোটাকে ফের শক্ত হাতে গড়ে তুলতে? এখনও সে অপরিণত যুবক। রাজনীতির মারপ্যাঁচ ততটা বোঝে না। জেদি, একগুঁয়ে। একেবারে ছেলেমানুষের মতো। এই তো মাত্র বছর সতেরো আগেকার কথা। সেদিন ঠিক সিরাজের মতোই অপরিণত যুবক ছিলেন মুর্শিদকুলির নাতি সরফরাজ খাঁ। দেশি বেনিয়ান, জমিদার ও দরবারের ওমরাহদের ষড়যন্ত্রে মদত দিয়ে গিরিয়ার মাটিতে জঙ্গ ফতে করেছিলেন আলিবর্দি খাঁ। গিরিয়ার মাটি লাল হয়েছিল সরফরাজের রক্তে। নিথর দেহটা নিয়ে চেহেল সেতুনে চুপিসাড়ে ফিরে এসেছিল নিহত নবাবের প্রিয় হাতি। বুক চাপড়ে কেঁদে উঠেছিলেন নবাব জননী জেনেতুন্নেসা।
ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস! আলিবর্দির নাতি মসনদে বসার সঙ্গে সঙ্গে বেনিয়ান-জমিদার-ওমরাদের মিলিত সেই দলটা মুর্শিদাবাদে ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এরা সিরাজকে চায় না। বিষ ঢেলেছে শওকতের কানে। অল্পে তুষ্ট নালায়েক শওকতের মনে জাগিয়ে তুলেছে মসনদের লালচ। দুই ভাইকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে জঙ্গবাজির ময়দানে।
হায় আল্লা! শরফ উন্নেসা কী করে সইবেন তাঁর কোনও এক নাতির মাটি নেওয়ার সংবাদ? কী করে সহ্য করবেন আমিনা বা ময়মানার সন্তান হারানোর বুকফাঁটা আর্তনাদ?
সত্যিই মসনদ বড় বিষাক্ত চিজ! মসনদ তাগদ দেয়, বৈভব দেয়, হুকুম করার অহংকার দেয়, পার্থিব সুখ দেয়। কেবল শান্তি দেয় না।
সন্ধে নামছে মুর্শিদাবাদে। চকবাজারে হইহল্লা, আলোর রোশনাইয়ের খামতি নেই। নিজামত কেল্লার অন্দরমহলে দেওয়ালগিরির আলোগুলো যন্ত্রের মতো একের পর এক জ্বেলে চলেছে বাঁদিবান্দার দল। শরফ উন্নেসা ফিরে চললেন নিজের কক্ষে।
‘মুখের উপর কথা? জিভ ছিঁড়ে নেব হারামজাদি। শরাব নিয়ে আয়!’ চিৎকার করে ওঠেন ঘসেটি বেগম।
ঘসেটি বেগমের হাতের কাঁটাওয়ালা চাবুকটা সপাং করে এসে পড়ে বাঁদির পিঠে। রক্ত ঝরে। যন্ত্রণায় চিৎকার করে ওঠে কাঁচা উমরের মেয়েটা। অল্প কিছুদিন হল খেজুরির দাসবাজার থেকে চালান হয়ে এসেছে চেহেলসেতুনের অন্দরে। এখনও নবাবি রীত-রিসালা ভালো বোঝে না।
‘মেহেরুন্নিসা!’
আরেকবার চাবুকটা তুলতে গিয়ে থমকে যান ঘসেটি বেগম। সুরমা লাগানো নেশাগ্রস্ত ঢুলু ঢুলু চোখে শরফ উন্নেসাকে ইয়াদদস্ত করে ঘসেটি বেগম বলে ওঠেন, ‘কে? ওঃ! নানি বেগম! এখনও দেখছি গলায় বেশ জোশ আছে?’
‘মেয়েটাকে মারছিস কেন তুই? কী হয়েছে?’
বেলজিয়ান কাটগ্লাসের শূন্য পাত্রটা তুলে ধরে দেখিয়ে ঘসেটি বেগম বলে ওঠেন, ‘শরাব নেই। স-অ-অ-ব শেষ। হারামজাদিকে বললাম শরাবের বোতল নিয়ে আয়। বলে কি না নানি বেগম মানা করেছেন। কথাটা সত্যি নাকি?’
শরফ উন্নেসার চোখের ইশারায় ত্রস্ত হরিণীর মতো ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে যায় বাঁদি। শরফ উন্নেসা বলেন, ‘হ্যাঁ! আমি বলেছি। তুই শরাব পেলি কোথায়?’
‘এ তো আর নবাব আলিবর্দির চেহেলসেতুন নয়, তুমি কৈফিয়ত চাওয়ার কে?’
‘তোকে না নিষেধ করেছি শরাব ছুঁতে?’
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ঘসেটি বেগম বলেন, ‘হুকুম? নানি বেগমের হুকুম?’
‘তোর তবিয়ত ঠিক নেই। শরাব ছুঁতে মানা করেছেন হেকিম সাহেব। তোর ভালোর জন্যই বলছি।’
‘ভালো? ঘসেটি বেগমের ভালো কে চায়? কে আছে তাঁর?’
‘বেটি- আমি তোর আম্মিজান!’
‘উঁহু! তুমি বেগম শরফ উন্নেসা। এক খুশনসিব আওরত।’
‘কী বলছিস তুই মেহের?’
‘গলত বাত বলছি কি? আগে নবাব বেগম ছিলে। এখন নানি বেগম হয়েছ। পূর্ণিয়ার আখবরাত কিছু পেলে?
‘না। মনটা আমার অশান্ত হয়ে আছে।’
‘পূর্ণিয়ায় শওকতের জিত হবে। তোমার পেয়ারের নাতি মির্জা জিন্দা ফিরবে না।’
‘মেহের!’
‘চমকে গেলে যে? কুত্তির আওলাদ মির্জা মরবে শওকতের হাতে।’
‘কী বলছিস তুই? আমিনা তোর বহিন। মির্জা তার বেটা!’
‘শওকতও আমার আর এক বহিনের বেটা? তুমি কি শওকতের মওত চাও?’
কেঁপে ওঠেন শরফ উন্নেসা। বলেন, ‘চুপ কর মেহের। চুপ কর। সিরাজ বা শওকত কারও মওতই আমি চাই না।’
তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে ঘসেটি বেগম বলেন, ‘তাহলে কী চাও? সিরাজ জঙ্গ ফতে করুক আর শওকত জিন্দেগিভর আমার মতো বরবাদ হয়ে যাক? কয়েদ হয়ে থাকুক? আর তুমি? পেয়ারের নাতির নানি বেগম হয়ে সুনহরা খোয়াব দেখবে, চেহেলসেতুনে দিনরাত হবে তোমার মর্জিতে তাই তো? বাঃ বহুত খুব। বুড়ি মাগি—তোমার লালচের দেখছি শেষ নেই।’
‘মেহের! থাম বেটি থাম।’
‘সহি বাত গায়ে জ্বালা ধরায় জানি।’
‘আমার উপর, আমিনার উপর, সিরাজের উপর তোর কেন এই নফরতি?
‘জানো না? তোমরা সবাই বেবাক বরবাদ করে দিয়েছ ঘসেটি বেগমকে।’
‘ঝুট বাত! তুই মির্জাকে অনেক তকলিফ দিয়েছিস। তবুও মির্জা তোকে জিন্দা রেখেছে।’
বিদ্রুপের ঢঙে ঘসেটি বলেন, ‘তো? বহুত মেহেরবানি তোমার মির্জার।’
‘মেহেরবানি নয়?’
ফুঁসে উঠে ঘসেটি বেগম বলেন, ‘তামাম বাংলার আমআতরাফ আদমি জানে নবাব আলিবর্দির বড়ি বেটি বেসাহারা, বেদৌলত, বদনসিব এক জেনানা। চেহেলসেতুনে কয়েদ হয়ে থাকা মামুলি এক আওরাত। এর চেয়ে শরম কি বাত আর কী হতে পারে?’
‘মির্জা তোকে ইমান দিয়ে চেহেলসেতুনে রেখেছে। তুই বাংলার নবাবের রিস্তেদার। তাঁর খালা। কেন বেচারা মির্জার উপর তোর এই নফরতি? তাঁকে নবাব বলে মেনে নিতে তোর অসুবিধা কোথায়?’
‘ঘসেটি বেগম কারও কারও কাছে শির ঝোঁকাতে জানে না। সে চায় তাগদ, জোশ, রওশন। আর এসবই দেয় মসনদ।’
‘মসনদ শান্তি দেয় কি?’
‘জানি না। জানতে চাইও না।’
গলা ধরে আসে ঘসেটি বেগমের। তিনি বলতে থাকেন, ‘তুমি অনেক কিছু পেয়েছ আম্মিজান। নবাব বেগম ছিলে নানি বেগম হয়েছ। আমিনার বেটা মসনদ পেয়েছে। আমিনা এখন নবাবের আম্মিজান। কিন্তু আমি কী পেলাম বলো তো? খসমের পেয়ার পাইনি। আমাকে ছেড়ে ভগবাইয়ের রূপে মজল তোমার বড়ে দামাদ। তবুও আজ সে বেঁচে থাকলে হয়তো মসনদের দখল নিতে পারত। আমি নবাব-বেগম হতাম। এক্রামকে দত্তক নিলাম। সেও চলে গেল অকালে। দুশমনি! সবাই দুশমনি করেছে আমার সঙ্গে। দুশমনি করেছেন খোদাতালাও। আমাকে সন্তান পেটে ধরার ক্ষমতা দেননি। আমায় আম্মিজান বলে কেউ ডাকেনি। আজ যদি আমার বেটা থাকত, তাহলে সে হয়তো বসত বাংলার মসনদে। আর আমি? নবাবের আম্মিজান—।’
হঠাৎ কান্নায় ভেঙে পড়েন ঘসেটি বেগম। ইস্পাহানি লাল গালিচার উপর উপুড় হয়ে পড়ে ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকেন।
কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন শরফ উন্নেসা। তারপর ফিরে আসেন নিজের কক্ষে। বাতিদানে রেড়ির তেল ঢেলে দিয়ে যায় একজন বাঁদি। চড়া আলো শরফ উন্নেসার চোখে কেমন যেন অসহ্য বলে মনে হয়। বাঁদিকে ডেকে হুকুম করেন বাতিদানটা সরিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য।
বিছানায় গা এলিয়ে দেন শরফ উন্নেসা। অলিন্দ দিয়ে দেখা যাচ্ছে খোলা আসমান। অন্ধকার আকাশে চাঁদ আজ আধখানা। খানিকবাদে নিজামত কেল্লার বুরুজ থেকে গর্জন করে ওঠে তোপ। শরফ উন্নেসা ছুটে যান অলিন্দের কাছে।
চকবাজার থেকে ভেসে আসছে পটকা ফাটার শব্দ। ঘন ঘন গর্জন করছে নিজামত কেল্লার কামান। শরফ উন্নেসার মন চঞ্চল হয়ে ওঠে।
সহসা ঝড়ের গতিতে শরফ উন্নেসার কক্ষে প্রবেশ করেন আমিনা বেগম। চোখেমুখে খুশির উচ্ছ্বাস। আমিনা বেগমকে দেখে তড়িঘড়ি বাতিদান নিয়ে ছুটে আসে বাইরে অপেক্ষারত বাঁদি।
ঝরনা হয়ে ঝরে পড়ার খুশিতে আমিনা বেগম বলেন, ‘খবর শুনেছ আম্মিজান? পূর্ণিয়ায় জঙ্গ ফতে করেছে আমার মির্জা। মওত হয়েছে শওকতের। একটু আগে কসিদ এসে পৌঁছেছে।’ এই বলে ফের খুশির উচ্ছ্বাসে ঘর থেকে বেরিয়ে যান আমিনা বেগম।
শরফ উন্নেসার দু-চোখে জলের ধারা নেমে আসে। এ অশ্রু হর্ষের না বিষাদের? নানি বেগমের জানা নেই। জিত হয়েছে সিরাজের। মওত হয়েছে শওকতের। এ সংবাদ সুখের না দুঃখের নানি বেগম জানেন না। আকাশের দিকে মুখ তুলে উত্তর খোঁজেন খোদাতালার কাছে।
কালো আকাশের বুক চিরে আলোর বিচিত্র নকশা তৈরি করতে থাকে আতশবাজি। চকবাজার ভেসে যায় উৎসবের আনন্দে।
