১৪
আদিগঙ্গা দিয়ে বয়ে চলেছে ছোটোখাট এক নৌবহর। চারটে বড় বজরা, দশ-বারোখানা সুলুপ। একেবারে মাঝখানের মস্ত বজরার মাথায় উড়ছে নিজামতের পতাকা। এ বজরা আলিনগরের মহারাজা মানিকচাঁদের। কালীঘাটে মায়ের পুজো দিয়ে ফিরছেন। সঙ্গে পরিবার।
সামনে ও পিছনের সুলুপগুলিতে আছে পাইক বরকন্দাজ, লোকলস্কর, পাচক, আবদার। আদিগঙ্গা বেয়ে হুগলি নদী ধরে পরিবারকে মূলাজোড়ে পৌঁছে দিয়ে মানিকচাঁদ আলিনগরে ফিরবেন। মূলাজোড়ে বিরাট উঁচু প্রাকারে ঘেরা দুর্গের মতো সুরক্ষিত বিশাল এক হাভেলি তৈরি করেছেন মানিকচাঁদ। এখন থেকে তাঁর পরিবার সেখানেই থাকবে। মানিকচাঁদের অন্তরঙ্গ অমাত্যরা জানে আলিনগরের জলহাওয়া রানিমার সহ্য হচ্ছে না, তাই হাওয়াবদলের আয়োজন। কিন্তু আসল কারণটা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
মাসছয়েক আগে কলকাতা থেকে ইংরেজদের বিতাড়িত করেছেন নবাব সিরাজদ্দৌলা। হালে কলকাতার শাসক হয়ে বসলেও এই শহরের সঙ্গে মানিকচাঁদের জানপহেচান অনেকদিনের। বেলভেডিয়ারে বর্ধমান রাজার কাছারিতে গোমস্তার কাজ করতেন তিনি। চোখের সামনে দেখেছেন কত দ্রুত রং বদলাচ্ছে এই শহরটা। ইংরেজদের জমজমাট ব্যবসাই ছিল শহরের জোশ। লোকসংখ্যা বাড়ছিল ধীরে ধীরে। বর্গি আক্রমণের সময় সহসা লোকে লোকারণ্য হয়ে উঠল। বর্গির ভয়ে হুগলি, বর্ধমান, মেদিনীপুর ছেড়ে মানুষজন এসে ভিড় করতে লাগল কলকাতায়। এসব মানিকচাঁদ দুচোখ ভরে দেখেছেন।
মানিকচাঁদের অবাক লাগত। কী এক আশ্চর্য জাদু যেন আছে কলকাতার জলহাওয়ায়। বর্গির ভয়ে যারা রাতারাতি ভিড় জমিয়েছিল এই শহরে, বর্গিহাঙ্গামা থামলেও তাদের অনেকেই আর ফিরে গেল না গাঁয়ে। কিন্তু কলকাতায় বিপদ তো কম নেই। পথ চলতে ডাকাতের ভয়। রাতবিরেতে লোকালয়ে হানা দেয় বাঘ। লোকে আগুন জ্বেলে হল্লা করে বাঘ তাড়ায়। সহসা ঝোপের থেকে বেরিয়ে এসে পথ চলতি মানুষকে এফোঁড়-ওফোড় করে দেয় দাঁতাল বুনো শুয়োর। পথের পাশে জলায় ঘাপটি মেরে থাকে কুমির। জলার বদ্ধ জলে নিশ্চিন্তে বেড়ে ওঠে ম্যালেরিয়ার মশা। মারণ জ্বরে নিমেষে নিকেশ হয়ে যায় এক-একটা পাড়া। প্রতি পদেই বিপদের আশঙ্কা, তবু মানুষ মজল কলকাতায়।
বর্গি হাঙ্গামা মিটে যাওয়ার পর বর্ধমান রাজার গোমস্তাগিরি ছেড়ে মানিকচাঁদ নিজামতের নোকরিতে যোগ দিলেন। নবাব আলিবর্দি খাঁ তখন রোগশয্যায় শায়িত।
বুদ্ধিমান মানিকচাঁদ ঢুকে পড়লেন সিরাজদ্দৌলার ঘনিষ্ঠ বৃত্তে। কলকাতার যুদ্ধের পর নবাবের এক হুকুমে হয়ে গেলেন কলকাতার রাজা। এতটা উন্নতি মানিকচাঁদ নিজেও প্রত্যাশা করেননি।
ইংরেজরা এখনও কলকাতার আশা ছাড়েনি। জগৎশেঠ, উমিচাঁদ, খোজা ওয়াজিদের মতো দাপুটে দেশি বণিকদের মাধ্যমে নবাবের মন গলানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে সমানে। মাদ্রাজ থেকে সৈন্য আনানোর কোশিস করছে ইংরেজরা। নিজেদের হালহকিকত জানাতে ফলতা থেকে মাদ্রাজে গিয়েছেন লেবাম ও ম্যানিংহাম নামে দুই সাহেব। এসব খবর নিয়ে এসেছিল মানিকচাঁদের অত্যন্ত বিশ্বস্ত গুপ্তচর রাধাকৃষ্ণ মল্লিক। আবার কি তবে যুদ্ধ বাধবে?
দুশ্চিন্তার কথা হল, কয়েক’দিন আগে মাদ্রাজ থেকে ফেরা এক দেশি বণিকের মুখে মানিকচাঁদ শুনেছেন মাদ্রাজের কেল্লা থেকে সৈন্যসামন্তসহ ফলতায় আসছেন ক্লাইভ ও ওয়াটসন। রাধাকৃষ্ণ মল্লিককে ফলতার দিকে কড়া নজর রাখতে বলেছেন মানিকচাঁদ। ইংরেজদের জাহাজ এলেই তিনি যেন সঙ্গে সঙ্গে খবর পান।
মানিকচাঁদের কেবলই মনে হচ্ছে কলকাতার আকাশে ফের একটা অশান্তির মেঘ ঘনিয়ে আসছে। ইংরেজরা কলকাতা আক্রমণ করলে প্রথম ধাক্কাটা তাঁর ওপরেই আসবে। তাই তিনি পরিবারকে পাঠিয়ে দিচ্ছেন মূলাজোড়ে। সঞ্চিত ধনসম্পদও সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন সেখানে। যুদ্ধের আগুনে নিমেষে সব হারাতে হতে পারে। মানিকচাঁদের বজরায় আছে গোটা পনেরো জালার আকারের বড় বড় পিতলের কলসি। সেগুলোর অর্ধেক হিরে-জহরত, সোনাদানায় ঠাসা। কলসির বাকি অর্ধেক সুগন্ধি চালে ভর্তি। বজরায় ভুরভুর করছে চালের গন্ধ। বহরদার ও সঙ্গের লোকজন জানে মহারাজা মানিকচাঁদ আবাদ অঞ্চলের উৎকৃষ্ট চাল নিয়ে যাচ্ছেন মূলাজোড়ের বাড়িতে।
পৌষের ঠান্ডা বাতাস গায়ে সুঁচের মতো বিঁধছে। দুপুরের রোদ্দুরে তেজ নেই। আলোয়ানটা গায়ে ভালো করে জড়িয়ে নিলেন মানিকচাঁদ। বসে আছেন বজরার ছাতে, আরামকেদারায়। একজন আবদার এসে পান দিয়ে গেল। অদূরে বল্লম হাতে দাঁড়িয়ে আছে একজন পেয়াদা। হাতের ইশারায় চলে যেতে বললেন তাকে।
মানিকচাঁদের মনটা বড় উতলা হয়ে আছে। সামনে কারও উপস্থিতি ভালো লাগছে না।
পূর্ণিয়ায় শওকত জঙ্গের সঙ্গে যুদ্ধ করতে গিয়েছেন নবাব। যুদ্ধের কী ফয়সালা হল? মানিকচাঁদের জানা নেই। এখনও কোনও খবর আসেনি কলকাতায়। শওকত জঙ্গের জয় হলে ঝক্কিটা কম। ইংরেজরা সহজেই ফিরে আসবে কলকাতায়। যুদ্ধ এড়ানো যাবে।
সিরাজদ্দৌলার জয় হলে পরিস্থিতি ঘোরালো হয়ে উঠবে। নবাবের গোঁ বড্ড বেশি। উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, খোজা ওয়াজিদ এরা কি পারবে ইংরেজদের বিষয়ে নবাবের মনটা নরম করতে? এর মধ্যে যদি মাদ্রাজ থেকে জাহাজ এসে পড়ে আর ইংরেজরা যদি কলকাতা আক্রমণ করে বসে?
যুদ্ধ মানিকচাঁদ কোনওদিন করেননি। যুদ্ধের কলাকৌশলও তাঁর তেমন জানা নেই। একটাই যুদ্ধ দেখেছেন চোখে। সেটা কলকাতার যুদ্ধ। গোলাগুলি তাঁকে ছুড়তে হয়নি, দূর থেকে শুধু আস্ফালন করেছেন। কিন্তু এবারে লড়াই বাধলে তো নবাবকে তুষ্ট রাখতে সামনে থেকে লড়তেই হবে তাঁকে। যুদ্ধ এড়িয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ করলে নবাব তাঁর গর্দান নেবেন। দুদিক থেকেই বিপদের আশঙ্কা। অস্থির হয়ে পড়েন মানিকচাঁদ। তাঁর অবস্থাটা এখন জলে কুমির ডাঙায় বাঘ পরিবৃত্ত অসহায় মানুষের মতো।
এসব নানা কথা ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে এসেছিল মানিকচাঁদের। মাঝিমাল্লাদের হইচই শুনে জেগে উঠলেন। পাড়ের দিকে চোখ গেল। আদিগঙ্গার চরে জল খেতে এসেছিল একটি হরিণ। চরায় মড়ার মতো পড়ে থাকা একটি কুমির পা কামড়ে ধরেছে হরিণটির। দুটি জন্তুতে চলছে তুমুল লড়াই। হরিণটি শিং দিয়ে খোঁচানোর চেষ্টা করছে সরীসৃপটিকে। কুমিরের চোয়ালের বজ্র আঁটুনি থেকে পা-টা ছাড়িয়ে নিতে চাইছে। কুমিরটা তাকে টেনে নিয়ে যেতে চাইছে জলের দিকে।
বজরার ছাতে দাঁড়িয়ে দৃশ্যটা দেখছিলেন মানিকচাঁদ। হরিণটির জন্য হঠাৎ খুব মায়া হল তাঁর। হেঁকে পাইক বরকন্দাজদের গুলি ছোড়ার আদেশ দিলেন। বন্দুকের গুলির শব্দে শান্ত নদীর বুক সহসা চঞ্চল হয়ে উঠল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত জিত হল কুমিরের। বিপদ বুঝে নিমেষে হরিণটিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল নদীর তলায়। আদিগঙ্গার শান্ত স্বচ্ছ জলে কেউ যেন আলতা গুলে দিল হঠাৎ। মানিকচাঁদের বুকটা কেমন যেন ছাঁৎ করে উঠল।
ওদিকে বজরা অভিমুখে দ্রুত এগিয়ে আসছিল একটা পালতোলা নৌকা। গোলাগুলির শব্দ শুনে দাঁড় টানতে থাকা মাঝির দল বেজায় ঘাবড়ে গেল। থেমে গেল দাঁড় টানার ছপাছপ শব্দ। ছইয়ের ভিতর থেকে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলল, ‘কী হল রে?’
‘বুঝতে পারছি না বাবু।’
‘গোলাগুলির শব্দ কীসের?’
মাঝিদের থেকে উত্তর না পেয়ে ছইয়ের ভিতর থেকে রাধাকৃষ্ণ বেরিয়ে এল। বজরার মাথায় উড়তে থাকা নিজামতের পতাকাটা দেখে সে বলল, ‘আরে ও তো মহারাজা মানিকচাঁদের বজরা। শিগগির এগিয়ে চল। জোরে দাঁড় টান।’
প্রাণপণে দাঁড় টানতে লাগল মাঝিমাল্লারা। একটি নিশান উড়িয়ে বজরার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতে লাগল রাধাকৃষ্ণ।
উড্ডীন নিশানটা চিনতে পারলেন মানিকচাঁদ। এ নিশান তাঁরই দেওয়া। মানিকচাঁদের বজরা থেকে পতাকা উড়িয়ে নৌকাটাকে এগিয়ে আসার নির্দেশ দেওয়া হল।
খানিকবাদে বজরার পাশে এসে দাঁড়াল রাধাকৃষ্ণ মল্লিকের নৌকো। নৌকো ও বজরার মাঝে কাঠে পাটাতন ফেলে দিল মাঝিরা। রাধাকৃষ্ণ দ্রুত উঠে এল মানিকচাঁদের বজরায়।
‘কী সমাচার রাধাকৃষ্ণ?’ উৎকণ্ঠার সঙ্গে প্রশ্ন করলেন মানিকচাঁদ।
‘সেলাম হুজুর, ফলতা থেকে ফিরে হুজুরের হাভেলিতে গিয়েছিলাম। শুনলাম আপনি কালীঘাটে মায়ের মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছেন। সেখান থেকে মূলাজোড়ে যাবেন। আপনার সঙ্গে মোলাকাত করার জন্য নদীতে ভেসে পড়ি।’
‘ফলতার খবর কী?’
‘জাহাজ এসেছে।’
‘ক’টা?’
‘তিন খানা। বিরাট জাহাজ হুজুর! এত বড় জাহাজ নদীতে দেখিনি আগে। শুনলাম আরও দুটো আসছে। অনেক গোরা পল্টন এসেছে। আরও নাকি আসবে।’
‘কত পল্টন?’
‘তা হুজুর হাজার পাঁচেক হবে।’ সংখ্যাটা একটু বাড়িয়েই বলে রাধাকৃষ্ণ।
মানিকচাঁদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। বললেন, ‘ঠিক বলছ?’
‘বিলকুল! আমি জাহাজে উঠে সব দেখে এসেছি।’
মানিকচাঁদ বিস্মিত হয়ে বলেন, ‘ইংরেজদের জাহাজে উঠলে কেমন করে?’
‘একটু ভুলের জন্য ধরা পড়ে গিয়েছিলাম হুজুর।’
‘তারপর?’
‘এতে লাভই হয়েছে। হুজুরকে সাহেবরা যে এতটা মান্যি করে ধরা না পড়লে বুঝতে পারতাম না। আপনার লোক শুনে ক্লাইভ সাহেব খুব খাতির করলেন আমায়।’
‘কী নাম বললে?’
‘ক্লাইভ সাহেব। কর্নেল ক্লাইভ। ওয়াটসন নামে আরও এক সাহেব এসেছেন। তাঁরও নাকি খুব নামডাক। জল থেকে গোলা ছোড়ে।’
মানিকচাঁদের চিন্তিত মুখখানা আড়চোখে লক্ষ করে রাধাকৃষ্ণ।
মানিকচাঁদ প্রশ্ন করেন, ‘অস্ত্রশস্ত্র সঙ্গে এনেছে কেমন? টের পেলে কিছু?’
‘জাহাজের খোলের মধ্যে ঢুকে সব দেখে এসেছি।’
মানিকচাঁদ আঁতকে ওঠেন। ‘অ্যাঁ? বলছ কী?’
‘এমনি কি আর দেখতে পেতাম হুজুর? ক্লাইভ সাহেবই আদেশ দিলেন গোলাবারুদ সব দেখিয়ে দিতে।’
মানিকচাঁদ অবাক হয়ে বলেন, ‘তুমি গুপ্তচর জেনেও অস্ত্রভাণ্ডার দেখালে তোমায়?’
‘এতে আমিও কম অবাক হইনি। ধরা পড়ে ভাবছিলাম প্রাণটা বুঝি গেল। এই ক্লাইভ সাহেব সত্যিই আজব লোক। কামানের গোলা যা দেখলাম, তা গৌড়ের পাকা তরমুজের চেয়েও বড়। পাল্লা জবরদস্ত হবে। গোলার চেহারা দেখেই মালুম পেয়েছি।’
উত্তেজিত হয়ে বজরার ছাতে পায়চারি করতে থাকেন মানিকচাঁদ। প্রশ্ন করেন, ‘কী বুঝলে? এরা চট করে লড়াই বাধাতে চায়, না কিছুদিন তম্বি করবে?’
‘মনে হল লড়াই বাধাতেই এসেছেন ক্লাইভ সাহেব। শুধু তর্জন গর্জন করে থেমে থাকবেন না। দক্ষিণে লড়াই করে সবিৎ জঙ্গ হিসেবে নাম কিনেছেন। এ আপনি শুনেছেন হয়তো।’
অন্যমনস্ক ভাবে মানিকচাঁদ বললেন, ‘হুঁ।’
‘বজবজের কেল্লাটা ছেড়ে দিতে বলেছেন। না হলে…’ থমকে যায় রাধাকৃষ্ণ।
মানিকচাঁদ প্রশ্ন করেন, ‘না হলে?’
‘বলেছেন চারিদিকে আগুন লাগিয়ে দেবেন।’
শঙ্কিত হয়ে পড়লেন মানিকচাঁদ। মুখের রেখায় ধরা পড়ল ভয়ের ছাপ। সেটা বেশ বুঝতে পারল রাধাকৃষ্ণ মল্লিক।
‘আর কিছু বলেছেন কর্নেল ক্লাইভ?’
‘একটা চিঠি দিয়েছেন। নবাবকে পৌঁছে দিতে হবে।’
‘কই দেখি।’ রাধাকৃষ্ণর হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে পড়তে থাকেন মানিকচাঁদ। চিঠি পড়তে পড়তে কাঁপতে থাকে তাঁর হাত। চোখ বিস্ফারিত হয়ে যায়। কী ভয়ংকর ভাষা এ চিঠির! পরিমার্জিত না করে এ চিঠি নবাবের কাছে সোজা পাঠিয়ে দিলে নির্ঘাত মানিকচাঁদের গর্দান যাবে। ক্লাইভ লোকটা কি উন্মাদ? নাকি তিনি এতটাই শক্তিশালী বাহিনী নিয়ে এসেছেন যে নবাবের ফৌজ এদের কাছে তুচ্ছ? ধন্দে পড়ে যান মানিকচাঁদ।
রাধাকৃষ্ণ মল্লিক প্রশ্ন করে, ‘চিঠিটা কি মুর্শিদাবাদে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করব হুজুর?’
‘না এ চিঠি এখন পাঠিয়ে লাভ নেই। নবাব পূর্ণিয়ায়। আগে ফিরুন। চিঠির বিষয়ে তার পরে ভাবা যাবে। পূর্ণিয়া থেকে যুদ্ধের খবর না আসা পর্যন্ত ইংরেজদের ফলতায় আটকে রাখতে হবে রাধাকৃষ্ণ।’
‘তা কী করে সম্ভব? ফলতা থেকে বজবজ তো নদী বেয়ে ইংরেজরা অনায়াসেই চলে আসবে।’
মানিকচাঁদ বললেন, ‘জল থেকে কেল্লা দখল করা যাবে না। স্থলবাহিনীর সাহায্য লাগবে। কামানের গাড়ি, বারুদ, সৈন্যদের রসদ এসব টেনে আনার জন্য মোষ, বলদ চাই। ধরো ইংরেজরা যদি সেসব না পায়?’
‘সে জোগাড় করা এমন কি শক্ত?’
‘কাজটাকে শক্ত করে তুলতে হবে রাধাকৃষ্ণ।’
কথাটা বুঝতে না পেরে মানিকচাঁদের মুখের দিকে হাঁ করে চেয়ে থাকে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক।
মানিকচাঁদ বলেন, ‘আমি একটা পরোয়ানা লিখে দিচ্ছি। তুমি এখনই ফের ফলতায় রওনা হয়ে যাও। ফলতার আশেপাশের গ্রামে-গ্রামে ঢোল শোহরত করিয়ে দাও। কেউ যেন ইংরেজদের বলদ, মোষ না জোগায়। যে এ কাজ করবে তার গর্দান যাবে। বলবে এটা নবাবের হুকুম।’
বজরার ছাতে বসেই পরোয়ানাটা দ্রুত লিখে দিলেন মানিকচাঁদ। সেটা নিয়ে বিদায় নিল রাধাকৃষ্ণ। মানিকচাঁদ বহরদারদের বললেন তাঁর বজরার মুখ ঘোরাতে। তবে কিছু পাইক-বরকন্দাজের পাহারায় পরিবারকে মূলাজোড়ে পাঠিয়ে দিলেন।
মানিকচাঁদ ফিরে চললেন গোবিন্দপুরের হাভেলিতে। মাথায় তাঁর আকাশ ভেঙে পড়ার উপক্রম। যুদ্ধের প্রস্তুতির জন্য হাতে সময় কম। যুদ্ধ নিয়ে কোনওদিন মাথা ঘামাননি মানিকচাঁদ। তাঁর ঠিক কতজন সৈন্য আছে ক’টা কামান আছে তাও ভালো করে জানা নেই। শিবপুর ও বজবজ দুর্গেও যাওয়া হয়নি অনেকদিন। ইংরেজরা ঢোঁড়া সাপে পরিণত হয়েছে মনে করে আলস্যে গা এলিয়ে ছিলেন মানিকচাঁদ। হঠাৎ কোথা থেকে একটা যুদ্ধ এসে পড়ল মাথায়। যুদ্ধ এড়ানোর একমাত্র উপায় পূর্ণিয়ায় শওকত জঙ্গের জিত। তা কী সম্ভব হবে? দুশ্চিন্তায় মানিকচাঁদের মুখে আঁধার নেমে আসে।
ওদিকে মানিকচাঁদের পরোয়ানা নিয়ে ফলতার উদ্দেশে ভেসে পড়ল রাধাকৃষ্ণ। সে তার পরবর্তী কর্তব্য স্থির করে ফেলেছে। পরোয়ানাটা নবমুনশির মারফত তুলে দিতে হবে কর্নেল ক্লাইভের হাতে। ফলতার আশেপাশের গ্রামের কেউ জানতে পারবে না এই পরোয়ানার কথা। হবে না ঢোল শোহরত। আশরফির স্বপ্ন রাধাকৃষ্ণর দুচোখে চকচক করে ওঠে।
