1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ১৩

১৩

মাঝগঙ্গায় অ্যাংকর করল মাদ্রাজ থেকে আসা ইংরেজদের তিনটে জাহাজ—কেন্ট, টাইগার ও ওয়ালপোল। ১৭৫৬ সালের ১৫ ডিসেম্বর। অবশেষে ফলতায় এসে পৌঁছলেন রবার্ট ক্লাইভ। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার ধকলে শরীরটা ক্লান্ত। অল্প জ্বর এসেছিল কাল রাতে। এখনও গরম হয়ে আছে গা। শীত-শীত বোধ হচ্ছে শরীরে। সারা গায়ে হাত-পায়ে ব্যথা। আবার বোধহয় জ্বর আসবে।

জীবন নিয়ে বাজি খেলতে ভালোবাসেন রবার্ট ক্লাইভ। যুদ্ধলড়াই এসব নিয়ে তাঁর ভয়ডর নেই। কারও ভয়ে কুঁকড়ে থাকার পাত্র তিনি নন। এই বাংলায় ভয় তাঁর একটাই। তা হল বাংলার কুখ্যাত ম্যালেরিয়া জ্বর। স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া ও জমা জল যে জ্বরের আঁতুড় ঘর। ফলতায় পৌঁছেই ক্লাইভ শুনলেন বাংলার অসহায় ইংরেজদের সাহায্য করার জন্য মেজর কিলপ্যাট্রিকের নেতৃত্বে যে আড়াইশো জনের ফৌজ এসেছিল তাদের মধ্যে প্রায় শ’খানেক লোক মারা গিয়েছে ম্যালেরিয়ায়। একেবারে চমকে ওঠার মতো তথ্য। নিজের বাহিনীর ভবিষ্যৎ ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়লেন ক্লাইভ।

তোপধ্বনি হচ্ছে ঘন ঘন। পাড়ে দাঁড়িয়ে উল্লাসে মেতেছে ফলতায় বন্যজন্তুর মতো বেঁচে থাকা ইংরেজরা। তাদের বাঁচাতে পল্টন এসেছে মাদ্রাজ থেকে। কামানের গর্জন শুনে আশেপাশের গ্রামের লোকও ছুটে এল নদীর পাড়ে। জোরদার গর্জন। কানে তালা লেগে যায়। যুদ্ধ লাগল না কি? সদ্য নোঙর করা ইংরেজদের জাহাজ তিনটে দেখে চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল অনেকের। এইরকম বিশাল আকৃতির জাহাজ স্থানীয় মানুষ হুগলি নদীতে আগে কখনও দেখেনি।

ওদিকে মাঝগঙ্গায় তুমুল হইচই। বেজায় ব্যস্ততা। জাহাজ থেকে ঝুপঝাপ করে নৌকো নামানো হচ্ছে নদীতে। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর আরোহীদের অনেকেই ডাঙার সবুজ দেখে আনন্দে আত্মহারা। জাহাজ থেকে নৌকোয় চড়ার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে গিয়েছে গোরা পল্টনদের মধ্যে। ডাঙায় নেমে পায়চারি করবেন বলে ওয়াটসনও একটি সুলুপে চড়ে বসলেন। তবে ক্লাইভ নামলেন না নীচে। কেন্ট জাহাজে এসে কর্নেল ক্লাইভকে অভ্যর্থনা জানিয়ে গেলেন রজার ড্রেক ও হলওয়েল।

মাদ্রাজে বসে কর্নেল ক্লাইভ বাংলায় বিপর্যয়ের কথা শুনেছিলেন ম্যানিংহামের মুখে। এখানকার পরিস্থিতি প্রত্যক্ষ করে এবং ড্রেক ও হলওয়েলের মুখে নবাবের কলকাতা অভিযানের আরও বিস্তারিত বিবরণ শুনে চোখ কপালে উঠে গেল তাঁর। পরিস্থিতি যে এতটা ভয়ানক তা তিনি কল্পনাও করতে পারেননি।

কর্নেল ক্লাইভের মনে হল, এদেশের রাজশক্তির কাছে এভাবে অপদস্থ হওয়াটা গোটা ইংরেজ জাতির অপমান। ডেকের রেলিংটা শক্ত করে চেপে ধরলেন ক্লাইভ। প্রবল জাত্যাভিমানে গায়ের রক্ত টগবগ করে ফুটতে লাগল। হাতে সময় খুব কম। এই জলাজঙ্গলে বেশিদিন বসে থাকলে মাদ্রাজ থেকে আসা সেনারাও অসুখে পড়বে।

ডেকের রেলিঙের পাশ থেকে সরে এসে ক্লাইভ হাঁক দিলেন, ‘মুনশি!’

ছুটে এলেন নবকৃষ্ণ। হাতে একতাড়া কাগজ। তার যে ডাক পড়বে আগেই আন্দাজ করেছিলেন, অল্পদিনেই ক্লাইভ সাহেবের মতিগতি খুব ভালোই বুঝে নিয়েছেন তিনি।

‘চিঠি তর্জমা হয়েছে?’

‘হ্যাঁ সাহেব।’

‘কী লিখেছ পড়ে শোনাও। ফারসি আমি অল্প অল্প বুঝি।’

নবকৃষ্ণ পড়ে শোনালেন চিঠি। বিষয়বস্তু এরকম—আমি বাংলায় এসে পৌঁছেছি। দক্ষিণে কী কাণ্ড ঘটিয়ে এসেছি সে আপনি হয়তো শুনে থাকবেন। বিরাট এক ফৌজ আছে আমার সঙ্গে। এমন জবরদস্ত ফৌজ বাংলা আগে কখনও দেখেনি। কলকাতার হাঙ্গামায় কোম্পানি ও ইংরেজদের কী পরিমাণ তকলিফ হয়েছে আপনি ভালোই জানেন। অবিলম্বে এর উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ আপনাকে দিতে হবে। কোম্পানি ব্যবসার যে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করত ফ্যাক্টরিসহ সব ফিরিয়ে দিতে হবে। ইংরেজদের কলকাতায় ফেরার বন্দোবস্ত করতে হবে আপনাকে। ইংরেজদের দোস্ত হিসেবে এই কাজগুলি আশা করি আপনি করবেন। অন্যথায় আগুন জ্বলবে বাংলায়। এতে কোনও পক্ষেরই ভালো হবে না।

‘ওয়ান্ডারফুল! দাও মুনশি সই করে দিই।’ এই বলে কুরসিতে বসলেন ক্লাইভ। সামনে টেবিলের উপর রয়েছে কালির দোয়াত। পাখির পালকের কলম। চিঠিটা টেবিলের উপর রেখে দোয়াতে কলম ডোবালেন কর্নেল।

এ চিঠি ফারসিতে তর্জমা করতে গিয়ে হাত কাঁপছিল নবকৃষ্ণর। বাংলায় পা দিয়েই নবাবকে কী ভাষায় চিঠি লিখছেন কর্নেল! ভয়ানক রকমের ঔদ্ধত্য। এ চিঠি নবাবকে যে পড়ে শোনাবে, তার গর্দান যেতে পারে। নবকৃষ্ণ ইতস্তত করে বললেন, ‘সাহেব, একটা কথা বলার ছিল।’

চিঠি সই করতে গিয়ে থমকে গেলেন ক্লাইভ। নবকৃষ্ণর মুখের দিকে চাইলেন।

হাত কচলে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সাহেব ল্যাঙ্গোয়েজটা বড্ড কড়া হয়ে গেল না?’

ক্লাইভ গম্ভীর গলায় বললেন, ‘কী বলতে চাও, স্পষ্ট করে বল মুনশি!’

‘বলছিলাম নবাবকে প্রথম লিখছেন। ল্যাঙ্গোয়েজ একটু পোলাইট হলে ভালো হতো না কি?’

মুচকি হেসে ক্লাইভ বললেন, ‘ইউ ওয়ান্ট সফটার টোন?’

‘ইয়েস সাহেব। আফটার অল নবাব বলে কথা।’

কালি শুকিয়ে গিয়েছে। কলমটা আবার কালির দোয়াতে ডুবিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘তোমাদের নবাবকে কি আমি ভয় পাই? আমার কোড একটু অন্যরকম মুনশি। রজার ড্রেক বা হলওয়েলের মতো ওয়ার্থলেস পোলাইট ইংলিশম্যান নই আমি।’

সাহেবের মেজাজটা চট করে বুঝে নিয়ে একগাল হেসে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনি কড়া ধাতের লোক। আপনাকে দেখেই বুঝেছি।’

‘নবাব সিরাজদ্দৌলাকে একটু চমকে দিতে চাই আমি। কাজেই আমার লেটার সফট হবে না।’ এই বলে চিঠিতে সই করে দিলেন ক্লাইভ। ‘চিঠিটা নবাবকে দেওয়ার জন্য কলকাতার গভর্নরের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেওয়া চাই। কী যেন নাম লোকটার?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘মানিকচাঁদ হুজুর।’

‘যুদ্ধটুদ্ধ বোঝে? লোকটা কেমন?’ প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।

‘ষাঁড়ের গোবর স্যার। একেবারে ওয়ার্থলেস। একসময় ছিল বর্ধমান রাজার গোমস্তা। নিজামতের নোকরিতে ঢুকে আঙুল ফুলে কলাগাছ হয়েছে। আপনি ডেকে একবার ধমক দিলে হাউহাউ করে ক্রাই করবে। আই থেকে ওয়াটার ঝরবে।’

হঠাৎ পাড়ের দিক থেকে ভীষণ একটা গোলমালের শব্দ এল ক্লাইভের কানে। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন ক্লাইভ। নবকৃষ্ণ ছুটে গিয়ে কর্নেলের দূরবিনটা নিয়ে এল। সাহেবের কখন কোন জিনিসটা দরকার তা বিলক্ষণ বোঝেন নবকৃষ্ণ।

ক্লাইভ দেখলেন কয়েকজন ইংরেজ সৈন্য একটি লোককে ধরে টেনেহিঁচড়ে নৌকোয় তুলছে। ক্লাইভ বললেন, ‘হোয়াট হ্যাপেন্ড মুনশি? দ্যাখো তো?’

দূরবিনে চোখ লাগিয়ে নবকৃষ্ণ দেখলেন, একটা লোকের দুটো হাত পিছমোড়া করে বাঁধা। কোমরে দড়ি। লোকটাকে ধাক্কা মেরে নৌকোয় তুলল লরেন্স। ছিপ নৌকোটা দ্রুত এগিয়ে আসতে লাগল জাহাজের দিকে।

‘নেটিভ লোকটা কে? চেনো?’

‘এ যে দেখছি রাধাকৃষ্ণ মল্লিক!’

‘হু ইজ হি?’

‘মানিকচাঁদের লোক। মনে হচ্ছে জাহাজের খবর নিতে এসেছিল। ধরা পড়ে গেছে।’

ক্লাইভ বললেন, ‘স্পাই অফ মানিকচাঁদ? ওয়ান্ডারফুল!’

নৌকোটা এসে ভিড়ল জাহাজের গায়ে। কর্নেল ক্লাইভের সামনে হাজির করা হল রাধাকৃষ্ণ মল্লিককে। কর্নেল ক্লাইভ গম্ভীরভাবে পাইপের ধোঁয়া ছাড়তে লাগলেন।

লরেন্স বলল, ‘হি অ্যাটাকড অ্যা নেটিভ ইন দ্য ফরেস্ট। আই কট হিম স্যার। হি ইজ অ্যা স্পাই।’

রাধাকৃষ্ণ মল্লিক কাঁপতে-কাঁপতে জোড় হাতে ক্লাইভে উদ্দেশে বলল, ‘মাফ করে দেন হুজুর।’

নবকৃষ্ণ প্রশ্ন করলেন, ‘কী ব্যাপার রাধাকৃষ্ণ? তুমি এ তল্লাটে?’

‘বাঁচান মুনশিজি। চোলমণ্ডল থেকে জাহাজ এল কিনা খোঁজ নিতে এসেছিলাম।’

‘কার হুকুমে?’ প্রশ্ন করলেন নবকৃষ্ণ।

‘মানিকচাঁদজি বলেছিলেন খোঁজ নিতে।’ বলির পাঁঠার মতো কাঁপছে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক।

ক্লাইভ বললেন, ‘ভয় নেই। জানে মারব না। আমার একটা কাজ করে দিতে হবে।’

‘ফরমায়েস করুন হুজুর।’

‘এই চিঠিটা পৌঁছে দিতে হবে মানিকচাঁদের হাতে। তাঁকে বলবে, এই চিঠি যেন ইমিডিয়েটলি নবাবকে ডেসপ্যাচ করে দেন। আর একটা কথা মানিকচাঁদকে বলবে, বজবজের কেল্লাটা যেন ছেড়ে দেন। লড়াই বাঁধলে তোমরা কেউ বাঁচবে না।’

‘জি হুজুর।’

ক্লাইভ বললেন, ‘জাহাজের খবর যখন নিতে এসেছ, সব কিছু ভালো করে দেখে যাও বাবু। একে আমাদের আর্মারিটা ভালো করে দেখিয়ে দাও স্ক্র্যাফটন। আমাদের কামানের রেঞ্জ ও ক্যানন বলের সাইজ দুটোই ভালো করে বুঝিয়ে দিও।’

রাধাকৃষ্ণকে সঙ্গে নিয়ে চলে গেলেন স্ক্র্যাফটন সাহেব।

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘দুশমনের কসিদকে কামান-বন্দুক এসব গোপন খবরের হদিশ যেচে দেওয়াটা কি উচিত হল সাহেব?’

নবমুনশির পিঠে স্নেহের একটা চাপড় মেরে ক্লাইভ বললেন, ‘এসব তুমি বুঝবে না মুনশি। স্টাইল অফ মাই ওয়ার্ক ইজ ডিফারেন্ট। দুশমনের মনে ভয় ঢোকাতে পারলে অর্ধেক কাজ হয়ে যায়।’

ক্লাইভের নির্দেশে ফেরার পথে ছিপ নৌকায় রাধাকৃষ্ণকে পাড়ে পৌঁছে দিলেন নবকৃষ্ণ। পাড়ে নেমে নবকৃষ্ণ শুধোলেন, ‘কেমন বুঝলে রাধাকৃষ্ণ?’

‘এত বড় কামানের গোলা কস্মিন কালে দেখিনি কখনও!’

‘শুধু তুমি কেন? নবাবও দেখেননি। ক্লাইভ সাহেব একা নন, সঙ্গে ওয়াটসনও আছেন। দুজনেই জবরদস্ত জঙ্গবাজ।

রাধাকৃষ্ণ মল্লিক প্রশ্ন করে, ‘লড়াই তাহলে বাঁধতে চলেছে?’

‘সে তো নবাবের মর্জি। ক্লাইভ সাহেবের কথা মেনে নিলে লড়াই হবে না।’

দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাধাকৃষ্ণ মল্লিক বলে, ‘দেখা যাক কী হয়। আমি তাহলে আসি মুনশিজি।’

‘এই নাও তোমার ইনাম।’

রাধাকৃষ্ণ মল্লিক অবাক হয়ে বলে, ‘ইনাম?’

‘ক্লাইভ সাহেব দিয়েছেন। মানিকচাঁদের চিঠি পৌঁছে দেওয়ার ইনাম।’ এই বলে কোমরের গেঁজের থেকে বের করে রুপোর টাকায় ভরা ছোট একটা থলে রাধাকৃষ্ণর হাতে তুলে দিলেন নবকৃষ্ণ।

রাধাকৃষ্ণর মুখে একটা চওড়া হাসি খেলে গেল। সঙ্গে থাকা একটা কাপড়ের পুঁটুলিতে টাকার থলেটা ঢুকিয়ে সে বলল, ‘ক্লাইভ সাহেবের কাণ্ডকারখানা দেখি সবই অদ্ভুত।’

‘ইনাম আরও পাবে। এখন রুপোর টাকা পেলে পরে আশরফি পাবে।’

‘আশরফি?’ রাধাকৃষ্ণর চোখ চকচক করে ওঠে।

‘যা দেখলে দশগুণ বাড়িয়ে বলবে মানিকচাঁদকে। ক্লাইভ সাহেব বলেন, ভয় দেখাতে পারলেই অর্ধেক কাজ হয়ে যায়। মনে রেখো আজ না হোক কাল ইংরেজরা কলকাতায় ফিরবে। নবাব সিরাজদ্দৌলা কতদিন মসনদে থাকবেন আমি জানি না। তবে তোমাকে তো পরিবার নিয়ে থাকতে হবে গোবিন্দপুরে। ইনাম নিয়ে সন্তুষ্ট থেকো। বেইমানি কোরো না যেন। খবর পাঠিও।’

একগাল হেসে রাধাকৃষ্ণ বলে, ‘বিলকুল মুনশিজি।’

‘সাবধানে যেও।’

লাঠি হাতে নিমেষে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল রাধাকৃষ্ণ মল্লিক।

নিকষ কালো অন্ধকার নেমে এসেছে নদীর বুকে। নদীর পাড়ে খোলা জায়গায় এসে দাঁড়ালেন নবকৃষ্ণ। মাথার উপর অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে স্মরণ করলেন কুলদেবতা গোবিন্দ জিউকে। প্রাণের ঠাকুর ভবিষ্যৎ কী লিখে রেখেছেন জানা নেই। ঘোর বাস্তববাদী নবকৃষ্ণ একথা ভালো করেই জানেন, ইংরেজদের সুদিন ফিরলে তাঁরও সুদিন ফিরবে। আর ইংরেজরা ডুবলে তিনিও ডুববেন। জীবনের লড়াইয়ে হারতে চান না নবকৃষ্ণ।

তবুও মাঝে-মাঝে অজানা আশঙ্কায় বুকটা কেমন যেন কেঁপে ওঠে। ভরসার জায়গা শুধু কর্নেল ক্লাইভ। লোকটা জাদু জানে। ফলতায় পা দিয়েই হাঁকডাক ছেড়ে ধুঁকতে থাকা হতোদ্যম ইংরেজদের কেমন চাঙ্গা করে দিয়েছেন। নবকৃষ্ণর মন বলছে পারলে ক্লাইভ সাহেবই পারবেন, বাংলার রাজনীতির পাশার দান ঠিক উলটে দেবেন তিনি।

জাহাজের ঘন্টি বাজল। ডিনারের সময় হয়েছে সাহেবদের। ঘন্টির শব্দে হুঁশ ফিরল নবকৃষ্ণর। মাঝি অপেক্ষা করছে ঘাটে। এখনই নবকৃষ্ণকে ফিরতে হবে কেন্ট জাহাজে। নব মুনশি ছাড়া ক্লাইভ সাহেবের একদণ্ডও চলে না।

‘মুনশিজি!’ অন্ধকারের মধ্যে থেকে কেউ ডাকল। গলাটা চেনা চেনা লাগল নবকৃষ্ণর। অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে এল লোকটা। মশালের আলোয় আগন্তুককে চিনতে পারলেন নবকৃষ্ণ। নীলকণ্ঠ।

‘নবকৃষ্ণ বললেন, ‘কণ্ঠ? কেমন আছ? কী করছ এই অন্ধকারে?’

নীলকণ্ঠ বিরস গলায় বলল, ‘লোকটাকে ছেড়ে দিলেন? নিশ্চয়ই জাহাজের খবর নিতে এসেছিল।’

‘হুঁ। মানিকচাঁদের চর। নাম রাধাকৃষ্ণ মল্লিক। গোবিন্দপুরে বাড়ি।’

‘ছেড়ে দিলেন কেন?’

‘ক্লাইভ সাহেবের হুকুম। কিন্তু তুমি কী করছ এই আঁধারে?’

‘তোপের শব্দ শুনেই ঘাটের দিকে আসছিলাম। জঙ্গলের মধ্যে রাধাকৃষ্ণ মল্লিককে দেখে সন্দেহ হয়। চুপিসাড়ে এগোচ্ছিল ঘাটের দিকে। ঠিকই আন্দাজ করেছিলাম মানিকচাঁদের চর। আমি ওর পিছু নিই। জঙ্গলের মধ্যে হঠাৎ হারিয়ে যায় সে। তারপর হঠাৎই পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ে আমার ওপর। লাঠির ঘায়ে মূর্ছা যাই আমি।’

‘কী সর্বনাশ! এখন সুস্থ বোধ করছ তো?’

‘হ্যাঁ মুনশিজি।’

‘ফাঁড়াটা অল্পের উপর দিয়ে গিয়েছে নীলকণ্ঠ। আরও হুঁশিয়ার হয়ে চলতে হবে। তবে যা হয়েছে, একদিক থেকে ভালোই হয়েছে। গোবিন্দ যা করেন, তা সকলের মঙ্গলের জন্যই করেন।’

নীলকণ্ঠ অবাক হয়ে বলে, ‘এতে মঙ্গলের কী দেখলেন?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘জঙ্গলে শিকারে গিয়েছিল ছোকরা রাইটার লরেন্স। তোমাকে আক্রান্ত হতে দেখেই তো বন্দুক নিয়ে ছুটে আসে সে। তাই রাধাকৃষ্ণ ধরা পড়ে যায়। জেরার মুখে চরবৃত্তির কথা স্বীকারও করে। তোমার সঙ্গে গোলমালে না জড়ালে রাধাকৃষ্ণ হয়তো ধরা পড়ত না।’

‘আপনি কি আবার জাহাজে ফিরবেন?

‘না ফিরে উপায় কী? বড্ড জড়িয়ে পড়েছি নীলকণ্ঠ। কর্নেল ক্লাইভ মুনশির কাজে বহাল করেছেন আমায়। এসেই নবাবকে কড়া-কড়া চিঠি ঠুকে দিচ্ছেন ক্লাইভ সাহেব। দিনরাত তর্জমা করতে হচ্ছে।’

‘শুনলাম ইংরেজদের বিরাট ফৌজ এসেছে।’

‘ঠিকই শুনেছ। আরও আসছে। লড়াই বাঁধল বলে।’

‘নবাবের ফৌজও তো কম বড় নয়। দেখলেন না কলকাতার যুদ্ধে কেমন কচুকাটা করে দিল ইংরেজদের।’

‘সেবার শ্রীকৃষ্ণ ইংরেজদের সঙ্গে ছিলেন না। এবারে আছেন।’

নীলকণ্ঠ অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, ‘শ্রীকৃষ্ণ?’

‘কর্নেল ক্লাইভ। বালেশ্বর থেকে দেখছি লোকটাকে। দেখছি আর অবাক হচ্ছি। এমন ডাকাবুকো সাহেব আর দেখিনি আগে। সঙ্গে ওয়াটসন সাহেব আছেন। শ্রীকৃষ্ণের ভাই বলরাম।’

‘আপনি বালেশ্বর থেকে না ফেরা পর্যন্ত এখানে থাকতে বলেছিলেন আমাকে। এখন কী করব?’

নবকৃষ্ণ বললেন, ‘কিছুদিন অপেক্ষা করো। পরে তোমার সঙ্গে ক্লাইভ সাহেবের মোলাকাত করিয়ে দেব। তোমার জন্যই তো ধরা পড়ল নবকৃষ্ণ। কথাটা তুলতে হবে ক্লাইভ সাহেবের কানে। কোম্পানির কাজে ঢুকিয়ে দেব তোমায়। আমাকে সাহায্য করবে। অনেক রাত হল। এবার ঘরে যাও।’

হাতে ধরা নিভু-নিভু মশালটাকে জলে ফেলে দিয়ে দ্রুত ছিপ নৌকোয় চেপে বসলেন নবকৃষ্ণ। তির বেগে দাঁড় টেনে ছিপ নৌকো এগিয়ে যেতে লাগল কেন্ট জাহাজের দিকে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *