১২
ওয়ারেন হেস্টিংস কাজের লোক। কাজ ছাড়া হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকা একেবারেই তাঁর সহ্য হয় না। কাজ না থাকলে তাঁর প্রাণ হাঁকপাক করে। আড্ডা, মজলিশ গুলতানি করে সময় কাটানো তাঁর ধাতে নেই। প্রকৃত পেশাদার বলতে যা বোঝায় হেস্টিংস হলেন তাই। সহকর্মীদের পিছনে ফেলে উন্নতির শিখরে ওঠা তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
সে যাই হোক, কোম্পানির বড় সাহেবদের কাছে কিন্তু হেস্টিংসের দারুণ কদর। কারণ, কোম্পানির কাজটা তিনি অনেকের চেয়ে ভালো বোঝেন, নিজের কাজটা গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে করে থাকেন ওয়ারেন হেস্টিংস। এমন লোকের দ্রুত উত্থান অবধারিত। হেস্টিংসও তরতর করে উপরে উঠছিলেন। অল্প সময়েই রাইটার থেকে ফ্যাকটর।
কিন্তু হঠাৎই বিপর্যয় ঘটল। কাশিমবাজার কুঠি অবরোধ করলেন নবাব। প্রাণ বিপন্ন হল হেস্টিংসের। কৃষ্ণকান্ত নন্দীর সাহায্যে পালিয়ে এলেন ফলতায়।
ফলতায় বিশেষ কাজ কিছু নেই। বসে বসে শুধু অনন্ত অপেক্ষা। কবে মাদ্রাজ থেকে সৈন্য আসবে, কবে কলকাতা পুনরুদ্ধার হবে, কবে নবাব তুষ্ট হয়ে ইংরেজদের বাংলায় ব্যবসার উপর থেকে অবরোধ তুলে নেবেন। এই মুহূর্তে শুধু দক্ষিণপথে চেয়ে থাকা ছাড়া কিছু করার নেই।
রজার ড্রেক, হলওয়েলের মতো কলকাতা কাউন্সিলের যাঁরা বড় মাথা, তাঁরা দক্ষিণ থেকে সাহায্য আসার আশায় বুক বেঁধে দিন কাটিয়ে চলেছেন। আর বাকিরা? হয় নিজেদের মধ্যে কোন্দল করছে, নিজেদের এই দুর্গতির জন্য কাউন্সিলের বড়কর্তাদের মুণ্ডপাত করছে, না হলে মদের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকছে। দিশি মদ দামে সস্তা। জোগান অঢেল। অল্প খরচে নেশা বেশ জমাট হয়।
ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছে এই জীবনযাত্রা বড় অসহ্য ঠেকে। পাঁকে আবদ্ধ জীব বলে মনে হয় নিজেকে। তিনি মার্জিত রুচির মানুষ। সমবয়সি আর পাঁচজন রাইটার-ফ্যাক্টরের মতো মদের স্রোতে ভেসে হইহুল্লোড় করার মতো প্রবৃত্তি তাঁর নেই।
ফলতার এই শিবিরে আজকাল বড় নিঃসঙ্গ বোধ করেন ওয়ারেন হেস্টিংস। মনের কথা খুলে বলার মতো কেউ নেই। শুধু একজনের সঙ্গ পাওয়ার ইচ্ছে হেস্টিংসের মনে উঁকি দেয়, কিন্তু তাঁর নাগাল পাওয়া দুষ্কর, মনের তল পাওয়া কঠিন। তিনি হলেন মেরি বুকানন। সদ্য স্বামীহারা মেরি মেমসাহেব নিজের চারিদিকে এমন একটা অদৃশ্য দেওয়াল তুলে রেখেছেন, যে সেটা ভাঙার সাহস হেস্টিংসের নেই। হেস্টিংস জানেন আরও অনেকেই একান্তে মেরির সান্নিধ্য চায়, পায় না কেউই।
দিনযাপনে বৈচিত্র্যের খোঁজে হেস্টিংস বেশ কিছু সময় ঘোড়া ছুটিয়ে আশেপাশে ঘুরে বেড়ান। এর মধ্যেও একঘেয়েমি আছে, তবে ঘোড়া দাবড়ালে শরীরটা তরতাজা থাকে, এই যা।
কোনও কোনওদিন আবার ছিপ নৌকো নিয়ে নদীতে ভেসে পড়েন হেস্টিংস। কাছেই একটা খাল আছে। দাঁড় বেয়ে সেই খালে ঢুকে পড়ে তিনি দুপাশের নেটিভ ভিলেজের দৃশ্য উপভোগ করেন।
‘কোথায় যাচ্ছ ওয়ারেন?’ বামাকণ্ঠ শুনে ছিপ নৌকোয় উঠতে গিয়ে বাধা পেলেন হেস্টিংস।
ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন প্রশ্নটা করেছেন স্বয়ং মেরি বুকানন। অবাক হলেন হেস্টিংস। মুহূর্তের জন্য তাঁর চোখ স্থির হয়ে গেল।
শাদা লং গাউন, উপরে ক্রিম কালারের ওভারকোট, মাথায় লেস দেওয়া হ্যাট। বড় অপূর্ব দেখাচ্ছে মেরি বুকাননকে। ঠিক যেন এঞ্জেল।
শীতের নিস্তেজ আলো এসে পড়েছে মেরির মুখে। সে মুখে বিষণ্ণতার ছাপ। হেস্টিংস চোখ নামিয়ে নিলেন। কোনও যুবতীর মুখের দিকে এমন হাঁ করে চেয়ে থাকাটা ভালো দেখায় না।
বাঁধের ঢাল বেয়ে পা পর্যন্ত লুটিয়ে পড়া গাউন সামলে ঝরনার মতো নেমে আসছেন মেরি বুকানন। খুব সহজ গলায় ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘হ্যালো! হাউ আর ইউ ম্যাডাম?’
‘ভালো। তুমি যাচ্ছ কোথায়?’
‘কাছেই একটা ক্রিক আছে। আই অ্যাম গোইং ফর রোয়িং। বসে বসে বড্ড আইডল হয়ে পড়ছি। কিছুক্ষণ রোয়িং করলে খানিকটা ফিজিকাল এক্সারসাইজ হবে।’
‘ঠিক বলেছ। মৃদু হাসলেন মেরি বুকানন।’
‘আপনি?’
‘কী আর করব? এমনি ঘুরে বেড়াচ্ছি।’
আর কথা খুঁজে পেলেন না ওয়ারেন হেস্টিংস। কেমন একটা অস্বস্তি মনের মধ্যে। বুকের মধ্যে রক্ত ছুটছে। ইচ্ছে করছে পলকহীন চোখে মেরি বুকাননের মুখপানে চেয়ে থাকতে। নির্লজ্জ বেহায়ার মতো কোনও সুন্দরীর দিকে চেয়ে থাকাটা মোটেই সামাজিক শিষ্টাচার নয়। ভাববেন কি মেরি ম্যাডাম? মেরির থেকে দৃষ্টি ঘোরাতে ছিপ নৌকোর কাছি খোলার কাজে যেন বড় বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন ওয়ারেন হেস্টিংস।
‘তোমার সঙ্গে যেতে পারি?’ হাসি মুখে খুব সহজভাবে প্রশ্ন করলেন মেরি বুকানন।
বুকের মধ্যে যেন একসঙ্গে আছড়ে পড়ল উত্তাল সমুদ্রের সহস্র ঢেউ। এই বৈকালিক নৌভ্রমণে প্রায় সমবয়সি একজন লেডির সঙ্গ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তার উপরে তিনি যদি মেরি বুকাননের মতো ডাকসাইটে সুন্দরী হন তো কথাই নেই।
হেস্টিংসের সঙ্গে নৌবিহারে গিয়েছেন মেরি। এ ঘটনা জানাজানি হলে অনেক এলিজিবল ব্যাচেলারই তাঁকে হিংসে করবে। করুক, তাতে ক্ষতি নেই। যে কোনও কাজে সবাইকে হারিয়ে পিছনে ফেলে দিতে ভালো লাগে হেস্টিংসের।
মনের উচ্ছ্বাসকে দমন করে ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘ইট উইল বি অ্যা প্লেসার ফর মি। আসুন ম্যাডাম।’
‘থ্যাঙ্কস!’ মুচকি হাসলেন মেরি বুকানন। অসামান্য হাসি। হেস্টিংসের মনে হল এই হাসি পৃথিবীর যে কোনও পুরুষের বুকের রক্তকে বেসামাল করে দিতে পারে।
দুপাশে দুহাত ছড়িয়ে, টলমলে পায়ে কাঠের পাটাতন বেয়ে নৌকোয় এসে উঠলেন মেরি বুকানন। হেস্টিংস দাঁড় বাইতে শুরু করলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে নদী ছেড়ে খালের মধ্যে ঢুকল নৌকো।
সরু খাল। দুপাশে ঘন গাছপালা। সবুজের ফাঁকে জেগে আছে নেটিভদের বাড়ির ধূসর রঙের খড়ের চাল। খুব ধীর গতিতে ভেসে চলল ছিপ নৌকো।
‘বড্ড একা লাগছিল ওয়ারেন। খানিকটা জোর করেই তোমার সঙ্গে এলাম। তুমি বোধহয় বিরক্ত হয়েছ।’
‘না না, বিরক্ত হব কেন?’
‘তোমার একা একা বেড়ানোটা স্পয়ল করলাম।’
‘একা বেড়াতে কার ভালো লাগে? আপনার সঙ্গে দুটো কথা বলা যাবে। সেটা মন্দ কী?’
‘যাক ভরসা পেলাম।’
‘কীসের ভরসা?’
মৃদু হেসে মেরি বুকানন বললেন, ‘তুমি বিরক্ত হওনি।’
চকিতে মুখ তুলে হাসি মুখে হেস্টিংস বললেন, ইউ আর পুলিং মাই লেগস ম্যাডাম।’
‘মোটেই লেগ পুলিং নয়। এখানে প্রথম যখন তোমাকে দেখলাম, কথা বলতেই ভয় লাগত। বয়স আন্দাজে তুমি বেশ রাশভারী, গম্ভীর। ক্যাম্পে অনেকে তোমাকে কী বলে জানো?’
হেস্টিংস মুচকি হেসে বললেন, ‘জানি। আংকল হেস্টিংস।’
মেরি বুকানন হেসে ফেললেন। হাসি থামিয়ে বললেন, ‘সত্যিই তোমার হাবভাব একেবারে আংকেলদের মতো।’
‘সেটা ভালো না খারাপ?’
‘তোমার কী মনে হয়?’
‘আপনিই বলুন।’
‘আমার মনে হয় তোমার মধ্যে একজন পোয়েট লুকিয়ে আছে। পোয়েটরা ইনট্রোভার্ট হয়। তাছাড়া তোমার চেহারার সঙ্গে গাম্ভীর্যটা বেশ মানায়।’
‘থ্যাঙ্কস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট।’
মেরি বুকানন প্রশ্ন করলেন, ‘বিয়ে তো করোনি শুনেছি, দেশে ফিঁয়াসে আছে?’
প্রশ্নটা শুনে থমকে গেলেন ওয়ারেন হেস্টিংস। হাতের দাঁড়টা মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। আবার দাঁড় টানতে টানতে হেস্টিংস বললেন, ‘না। এমনিতে দূর দেশে পড়ে রয়েছি। ফিঁয়াসে রেখে এলে ইলোপ হয়ে যেত।’
‘ওয়েল সেইড। ফলেন ইন লাভ উইথ এনি কান্ট্রি লেডি?’
‘নো ম্যাডাম।’
‘এতদিন তাহলে করলে কী কাশিমবাজারে? শুধুই কাজ?’
‘কাজের জন্যই তো এদেশে আসা। এবারে আপনার কথা বলুন ম্যাডাম।’
‘কী শুনতে চাও বলো।’
‘আপনি সারাদিন চুপচাপ থাকেন। কারও সঙ্গে বড় একটা কথা বলেন না। আপনার একা লাগে না?’
‘লাগলেই বা উপায় কী?’
হঠাৎ উলু ও শঙ্খধ্বনি শুনে চমকে উঠে পাড়ের দিকে তাকাল দুজনে। নিরিবিলি জায়গা সহসা মুখর হয়ে ওঠায় আশেপাশের গাছ থেকে দুদ্দাড় করে উড়ে পালাল একদল পাখি।
নতুন বউ শ্বশুরবাড়ি চলেছে। ছোট্ট মেয়েটির পরনে লাল শাড়ি। মাথায় চেলি ও কনের টোপর। বরের মাথায় টোপর। দুজনে গাটছড়া বাঁধা। বরের পিছনে পা টিপে টিপে নৌকোয় উঠে মেয়েটি জড়সড় হয়ে বসল।
‘বিউটিফুল! এনি ফেস্টিভাল?’ প্রশ্ন করলেন মেরি বুকানন।
‘ম্যারেজ রিচুয়াল। মেয়েটি তার ইন লজ হাউসে চলেছে। হিদেনরা এভাবে বিয়ে করে। আমি কাশিমবাজারে দেখেছি।’
মেরি বুকানন উদাস গলায় বললেন, ‘তার মানে ওরা ঘর বাঁধতে চলেছে।’
হঠাৎ যেন আধার নেমে এল মেরির মুখে।
‘চলুন ম্যাডাম ফেরা যাক। আমরা অনেক দূরে চলে এসেছি।’
নৌকোর মুখ ঘোরালেন ওয়ারেন হেস্টিংস। উলটো পথে চলতে শুরু করল নৌকো। হেস্টিংসের সঙ্গে মেরি বুকাননও নীরবে দাঁড় বাইতে শুরু করলেন। কারও মুখে কথা নেই। কোথায় যেন সংলাপের সুর কেটে গিয়েছে।
‘কখনও কাউকে ভালোবেসেছ ওয়ারেন?’ নিস্তব্ধতা ভেঙে আচমকা প্রশ্ন করলেন মেরি বুকানন।
‘বেসেছি। তবে কাছে যাওয়ার সাহস এখনও হয়নি।’
‘ভয়টা কীসের?
‘রিফিউসালের।’
‘তোমার মতো স্মার্ট হ্যান্ডসাম ইয়ংম্যানের মুখে তো এ কথা মানায় না।’
‘সাহস দিচ্ছেন ম্যাডাম?’
চোখ তুলে হেস্টিংসের মুখের দিকে চাইলেন মেরি বুকানন।
ক্ষণিকের স্তব্ধতা-তবুও এ যেন অনন্তকাল। নৌকোর গায়ে ধাক্কা খাওয়া জলের ছলাৎ ছলাৎ শব্দ বেশ তীব্র শোনাল মেরি বুকাননের কানে। খালে হু হু করে জোয়ারের জল ঢুকছে।
আনত মুখে ওয়ারেন হেস্টিংস বললেন, ‘মেরি, আই অ্যাম ফলেন ইন লাভ উইথ ইউ।’
ভিতরে ভিতরে কেঁপে উঠলেন মেরি বুকানন। চোখ নামিয়ে নিলেন। ফরসা মুখটা রক্তিম আভায় উদ্ভাসিত হল। সেই সঙ্গে শিথিল হয়ে গেল হাত। হাত থেকে পিছলে গেল বইঠা। সেটা বাঁচানোর জন্য প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লেন ওয়ারেন হেস্টিংস। নৌকো কাত হয়ে গেল। মেরি বুকানন টাল সামলাতে না পেরে হেস্টিংসের গায়ের এসে পড়লেন। বইঠা ভেসে গেল জলে।
হেস্টিংসের বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হলেন মেরি বুকানন। হেস্টিংস গাঢ় স্বরে বললেন, ‘মেরি আমরা কী ঘর বাঁধতে পারি?’
চোখ তুলে হেস্টিংসের মুখের দিকে তাকালেন মেরি বুকানন। সেই চাহনিতেই নিজের প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।
মেরি আঁকড়ে ধরলেন হেস্টিংসকে। অস্ফুট স্বরে বললেন, ওয়ারেন ইউ আর ভেরি সুইট।
রমণীর হৃদয় জয়ের আনন্দ পুরুষের কাছে যুদ্ধ জয়ের চেয়ে কম কিছু নয়। আকাশের দিকে মুখ তুলে ঈশ্বরকে অজস্র ধন্যবাদ জানালেন হেস্টিংস। তাঁর প্রশস্ত বুকের মধ্যে মাথা রাখলেন মেরি, খুশিতে দুচোখ জলে ভরে উঠল। জীবনের সব অবসাদ কোথায় যেন ভেসে চলে গেল।
ঠিক এই সময় পর পর তিনবার তোপধ্বনি হল- দুম! দুম! দুম!
ছিপ নৌকো তখন খাল থেকে বেরিয়ে সবে হুগলি নদীর বুকে এসে পড়েছে। মেরি ও হেস্টিংস অবাক হয়ে দেখলেন নোঙর ফেলার উদ্যোগ করছে পাঁচটি যুদ্ধ জাহাজ। তাদের মাথায় পতপত করে উড়ছে ইউনিয়ন জ্যাক। ফৌজি ব্যান্ডে বেজে উঠল রুল ব্রিটানিয়া।
শিবিরের উদ্দেশে দ্রুত দাঁড় বাইতে লাগলেন ওয়ারেন হেস্টিংস।
মানিকচাঁদ ফলতায় বাজার বসানোর পরোয়ানা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠেছে ফলতার হাট। দূর দূর থেকে ছুটে আসছে ব্যাপারীরা। রংদার হয়ে উঠেছে বাজার। পয়সা উড়ছে চারদিকে।
ইংরেজ সাহেবরাই এ হাটের বড় খদ্দের। তাদের হরেক কিসিমের জিনিস চাই। সব কিছুর চাহিদা মেটাতে একমাত্র ভরসা এই হাটখানা। এর সুযোগ ভালোমতো নিচ্ছে ব্যবসায়ীরা। দাম মনমতো না হলেও বাধ্য হয়েই সাহেবদের চড়া দামে কিনতে হচ্ছে জিনিসপত্র।
দুম দুম দুম! পর পর তিনবার তোপধ্বনির শব্দে কেঁপে উঠল গোটা হাট। চমকে গেল ভরা হাটের লোক। শশব্যস্ত হয়ে সরে পড়ল অনেকে।
এক কাপড়ের কারবারির দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে রেজাইয়ের দরদাম করছিল নীলকণ্ঠ। শব্দটা শুনে ভ্রুকুঞ্চিত হল তার।
ফলতার হাট থেকে নদী দেখা যায় না। নদী বেশ কিছুটা দূরে। বড় বড় গাছ, বাঁশের ঝাড়, উঁচু উঁচু ঢিবি হাট ও নদীর মাঝে আগল তুলেছে। হাট থেকে চওড়া একটা মাটির পথ ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে এঁকেবেঁকে নদীর দিকে গিয়েছে। নৌকোয় বোঝাই হয়ে আসা মাল ঘাটে নামিয়ে গো-গাড়িতে চাপিয়ে এ পথেই হাটে নিয়ে আসতে হয়।
রেজাইয়ের দাম মিটিয়ে দ্রুত নদীর পথ ধরল নীলকণ্ঠ। শব্দটা এসেছে নদীর দিক থেকে। এ যেন উচ্ছ্বাস প্রকাশের শব্দ। তোপ এল কোথা থেকে?
ইংরেজরা ফলতায় পালিয়ে এসেছিল এককাপড়ে। কামান, অস্ত্রশস্ত্র তেমন কিছু নিয়ে আসতে পারেনি। সে অবকাশও ছিল না। তবে কি মাদ্রাজের সৈন্য এসে পড়ল? তাই পলাতক সাহেবদের এত খুশি? খুশিতে তোপের গর্জন?
নব মুনশি বালেশ্বরে গিয়েছেন স্ক্র্যাফটনের সঙ্গে। ফলতায় রেখে গিয়েছেন নীলকণ্ঠকে। যাওয়ার আগে বলে গিয়েছেন, একটু খেয়াল রেখো কণ্ঠ। মানিকচাঁদের গুপ্তচরেরা ঘুরছে ফলতায়, হাটে তারা আসবে। এদের উপর নজর রেখো ভালো করে। তুমি বুদ্ধিমান যুবক। চোখ কান খোলা রাখলেই চিনে নিতে পারবে গুপ্তচর কারা।
নব মুনশির আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে চলেছে নীলকণ্ঠ। হাটের কাছেই একটি বাড়িতে ঘর ভাড়া নিয়েছে সে। নিজেকে বানজারা বলে পরিচয় দিয়েছে স্থানীয় মানুষের কাছে।
নদীর দিকে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ নীলকণ্ঠর চোখে পড়ল, বেশ কিছুটা দূরে বাঁশঝাড়ের মধ্যে দিয়ে চুপিসাড়ে দ্রুত নদীর দিকে এগিয়ে চলেছে একটা লোক। তার হাঁটার মধ্যে কেমন যেন একটা সতর্ক ভঙ্গি রয়েছে। নদীর দিকে যাওয়ার পায়েচলা পথ এড়িয়ে ঝোপজঙ্গল ঠেলে নদীর দিকে যাওয়ার অর্থ সাধারণের নজর এড়িয়ে চলা। কিন্তু কেন? অদম্য কৌতূহলে নীলকণ্ঠও প্রধান পথ ছেড়ে বুনো ঝোপ ডিঙিয়ে লোকটার পিছু নিল।
যেতে যেতে হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল লোকটা। ঘুরে পিছন দিকে তাকাল। চকিতে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল নীলকণ্ঠ। না লোকটা তাকে দেখতে পায়নি। কিন্তু পিছনে কারও পায়ের শব্দ কি সে শুনেছে?
থমকে দাঁড়িয়ে লোকটা সতর্ক দৃষ্টি চালাল চারিদিকে। কান খাড়া করে যেন কিছু শোনারও চেষ্টা করল। চারিদিক চুপচাপ। ঝিঁঝির ডাক ও শেষবিকেলে পাখির কিচিরমিচির ছাড়া কোনও শব্দ শোনা যাচ্ছে না।
নুয়ে পড়া বাঁশের ঝাড়ের পাতার ফাঁক দিয়ে লোকটার মুখে এসে পড়েছে শেষ বিকেলের মরা আলো। আড়াল থেকে লোকটাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে নীলকণ্ঠ। পরিচিত মুখ। ফলতার হাটে অনেকবার দেখেছে, সামান্য কথাবার্তার আভাসে টের পেয়েছে সাহেবদের বিষয়ে তার অনেক কৌতূহল। স্থানীয় মানুষজনের কাছ থেকে কণ্ঠ জেনেছে, লোকটার বাড়ি এ তল্লাটে নয়।
তবে কি সে মানিকচাঁদের গুপ্তচর? নীলকণ্ঠ লোকটার সঙ্গে আলাপ জমানোর চেষ্টা করেছিল, কিন্তু লোকটা তেমন আমল দেয়নি।
বাঁশঝাড় বেশ ঘন। আলো কমে এসেছে। বুনো শুয়োরের ভয় তো আছেই, এই ঘনায়মান অন্ধকারে বাঘের আবির্ভাবও অসম্ভব কিছু নয়। সে সব উপেক্ষা করে কোথায় চলেছে লোকটা? গতিবিধি বেশ সন্দেহজনক।
জঙ্গলের পথের মধ্যে বাঁক নিতে গিয়ে আচমকা লোকটাকে হারিয়ে ফেলল নীলকণ্ঠ। আজব কাণ্ড! জলজ্যান্ত লোকটা মিলিয়ে গেল কোথায়? ভয়ে নীলকণ্ঠর গায়ে কেমন যেন কাঁটা দিয়ে উঠল।
গা ছমছমে এই জংলি পথে অস্ত্র বলতে সঙ্গে রয়েছে সরু একটা বাঁশের লাঠি। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে লোকটাকে খোঁজার চেষ্টা করল নীলকণ্ঠ। না, লোকটাকে দেখা যাচ্ছে না।
সহসা পিছন থেকে কে যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল নীলকণ্ঠর উপরে। তার হাতের লাঠিটা খসে গেল। মাথার পিছনে জোরালো একটা আঘাত লাগল। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল সে।
লোকটা ঝুঁকে পড়ল নীলকণ্ঠর উপরে। নাকের কাছে হাত নিয়ে দেখল শ্বাস পড়ছে কিনা। তারপরে নীলকণ্ঠর লাঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই চমকে গেল।
তার দিকে বন্দুক তাক করে অদূরে দাঁড়িয়ে আছে লরেন্স। লোকটা দুহাত উপরে তুলে পিছিয়ে গেল।
