1 of 2

ফলতা থেকে পলাশি – ১০

১০

বালেশ্বরের জাহাজঘাটার একপ্রান্তে প্রশস্ত এক চাতালের উপর বসে জলের দিকে চেয়েছিলেন নবকৃষ্ণ। এদিকটায় বন্দরের শোরগোল অনেক কম।

রজার ড্রেকের নির্দেশে বালেশ্বরে এসেছেন নবকৃষ্ণ। তাঁর সঙ্গে এসেছেন লিউক স্ক্র্যাফটন। ছোকরা সাহেব। ছিলেন ঢাকা কুঠির কুঠিয়াল। বাংলায় কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন ফলতায়।

রোজই কোম্পানির জাহাজের প্রতীক্ষায় দক্ষিণপথে চেয়ে থাকতেন রজার ড্রেক। হঠাৎ একদিন তাঁর মনে হল, মাদ্রাজ থেকে ফৌজিদের জাহাজ যদি এসেও পড়ে, তবে মোহনা থেকে হুগলি নদী বেয়ে ফলতায় কী করে পৌঁছবে জাহাজ? মোহনা থেকে এতটা পথ গাইড করবে কে? পাইলট জাহাজ কোথায়?

মোহনা থেকে কলকাতা পর্যন্ত হুগলি নদীর পথ বেশ বিপজ্জনক। জলের তলায় লুকিয়ে আছে ভয়ংকর সব বালির ঢিবি। সে সবের হদিশ না জানলে যে কোনও সময় বালির ঢিবিতে ধাক্কা খেয়ে জাহাজডুবি ঘটতে পারে। পাইলট জাহাজের অভিজ্ঞ নাবিকরা হুগলির তলদেশের ভূগঠন না-জানা নাবিকদের পথ দেখায়। বাংলায় কোম্পানির ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ইংরেজদের পাইলট জাহাজের নাবিকদের কাজ থেকে ছুটি হয়ে গিয়েছে। খোজা ওয়াজিদের যে জাহাজ ধার নিয়ে নবকৃষ্ণ চুঁচুড়া থেকে খাবারের রসদ বোঝাই করে এনেছিলেন, খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, সেই জাহাজের ক্যাপ্টেন হুগলি নদী ভালোই চেনে।

প্রায় সপ্তাহ খানেক হয়ে হল, সেই জাহাজ নিয়ে বালেশ্বরে এসে মাদ্রাজ থেকে আসা ইংরেজ নৌবহরের প্রতীক্ষা করছেন নবকৃষ্ণ ও স্ক্র্যাফটন। কেননা সমুদ্রে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে আসা কলকাতাগামী জাহাজগুলো ডাঙার আস্বাদ নিতে বালেশ্বরে দিন দুয়েকের জন্য দাঁড়ায়।

তাজা ফলের সন্ধানে স্ক্র্যাফটন গিয়েছেন বাজারের দিকে।

জাহাজঘাটার একপ্রান্তে নির্জন এক চাতালে বসে নবকৃষ্ণ ভাবছিলেন নিজের কথা। ইংরেজদের ভাগ্যের সঙ্গে নিজের নসিবকে জড়িয়ে ফেলেছেন তিনি। কিন্তু কাজটা ঠিক হল কি? ফলতায় কোনওরকমে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে ইংরেজরা। মাদ্রাজ থেকে সাহায্য না এলে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কোনওমতেই সম্ভব নয়।

একসময় নবকৃষ্ণের মনে হতো ইংরেজরাই দেশের ভবিষ্যৎ। এই গোরা সাহেবরা যেভাবে এগোচ্ছে তাতে এরাই একদিন বাংলা দখল করে নেবে। এদেশে মুখ থুবড়ে পড়েছে মোগল শাসন ব্যবস্থা, ঘুণ ধরেছে তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গে। নবাবি ও নিজামতের হালও প্রায় একই। এ ব্যবস্থা আর খুব বেশিদিন টিকে থাকার কথা নয়, ভেঙে পড়বেই। এই পরিস্থিতিতে ইংরেজদের সঙ্গে থাকাই শ্রেয়। এমনই মনে হয়েছিল নবকৃষ্ণর। বিগত কয়েকদিন ধরে তাঁর এই বিশ্বাস যেন ফিকে হতে শুরু করেছে।

ছ’মাস হতে চলল কলকাতা হাতছাড়া হয়েছে। এত দিনেও মাদ্রাজ থেকে সাহায্য এল না কেন? তবে কি বাংলার বিষয়ে ইংরেজদের আর উৎসাহ নেই? কলকাতার আরও অনেক দিশি মানুষের মতো নবকৃষ্ণও যে মনে করত, কলকাতা থেকে ইংরেজদের পালানোটা সাময়িক, তারা ফিরে আসবে। টোপিওয়ালা এই সাহেবেরা একেবারে অন্যরকম। সহজে হার মানে না। কিন্তু এখন যে ঘটনার গতিপ্রকৃতি অন্যরকম মালুম হচ্ছে।

কয়েকদিন বাদে হয়তো বাংলার মায়া ত্যাগ করে, ফলতার বাস উঠিয়ে ইংরেজরা পাকাপাকি ভাবে দক্ষিণের দিকে সরে পড়বে। তখন কী হবে নবকৃষ্ণর? তিনি যে ইংরেজদের মদত দিচ্ছেন, সে কথা কারও আর অজানা নেই। ইংরেজরা বাংলা ছেড়ে চলে গেলেই নবাবের রোষের মুখে পড়তে হবে তাঁকে।

অথচ নবকৃষ্ণ ভেবেছিলেন অন্যরকম। মনে তাঁর অনেক উচ্চাশা। মুনশিগিরির সামান্য মাইনেতে, মামুলি এক আদমির মতো কালযাপন তাঁর পছন্দ নয়। অনেক বড় কিছু করতে চান তিনি। নকু ধর, গোবিন্দ মিত্তিরের মতো একদিন কলকাতার মুকুটহীন রাজা হয়ে উঠতে সাধ হয় তাঁর। ইংরেজরা পুনরায় কলকাতায় নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারলে সেটা অসম্ভব কিছু নয়। দুর্দিনের বন্ধুকে ইংরেজরা ইনাম দিতে জানে। সেই আশাতেই বিপদের ঝুঁকি নিয়ে ইংরেজদের সঙ্গে তাঁর পড়ে থাকা।

উত্তেজিত কণ্ঠে স্ক্র্যাফটনের হাঁকডাক শুনে নবকৃষ্ণর চটক ভাঙল। ‘মুনশি! মুনশি! মুনশি!’

নবকৃষ্ণ দেখলেন স্ক্র্যাফটন ছুটতে ছুটতে আসছেন তাঁর দিকে। ব্যাপার কী? শশব্যস্ত হয়ে উঁচু চাতাল থেকে নেমে এলেন নবকৃষ্ণ।

স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘তুমি এখানে? আমি কখন থেকে তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি মুনশি!’

‘কী হয়েছে সাহেব?’

‘জাহাজ এসেছে মাদ্রাজ থেকে। একটা নয় সাতটা।’

‘বলছেন কী সাহেব?’ নবকৃষ্ণও উত্তেজিত হয়ে পড়লেন।

‘জাহাজ ভিড়ছে বন্দরে। শিগগির চলো।’

স্ক্র্যাফটনের সঙ্গে ছুটতে লাগলেন নবকৃষ্ণ। কেন্ট, কাম্বারল্যান্ড ও সলিসবেরির আকার-আকৃতি দেখে নবকৃষ্ণর মাথা ঘুরে গেল। এত বড় জাহাজ তিনি দেখেননি কখনও।

‘উরিব্বাস! এত বড় জাহাজ।’

স্ক্র্যাফটন গর্বে বুক ফুলিয়ে বললেন, ‘আমাদের রাজার নওয়ারা। কামান-গোলাবারুদে ঠাসা। তোমাদের নবাব এবার টের পাবে।’

নবকৃষ্ণ অপলক চোখে জাহাজের দিকে চেয়ে রইলেন। জাহাজ দেখে ভরসা পাওয়া যাচ্ছে। তার মন আবার বলছে ইংরেজরা পারবে, আবার কলকাতায় ফিরবে তারা।

জাহাজের নাম কেন্ট, গায়ে বড় বড় করে খোদাই করা আছে নামটা। সেই জাহাজ থেকে নেমে এলেন এক সাহেব। পরনে হাঁটু পর্যন্ত লম্বা লাল কোট ও শাদা ব্রিচেস, মাথায় হ্যাট, ঠোঁটে পাইপ। দেহের ভঙ্গিতে ঝরে পড়ছে তীব্র আত্মবিশ্বাস। নবকৃষ্ণর মনে হল এই লোকটাই বাহিনীর অধিনায়ক। তার ঠিক পিছন পিছন যিনি নেমে আসছেন, নবকৃষ্ণ তাঁকে চেনেন। ফোর্ট উইলিয়ামে দেখেছিলেন আগে। ইনি লেফটেনান্ট লেবাম, কলকাতার খবর নিয়ে মাদ্রাজে গিয়েছিলেন।

ক্লাইভ মাটিতে পা দিতেই সামনে এগিয়ে গিয়ে অভিবাদন জানালেন স্ক্র্যাফটন।

‘গুড আফটারনুন স্যার।’

‘গুড আফটারনুন! কে তুমি?’

‘লিউক স্ক্র্যাফটন। ঢাকা কুঠির কুঠিয়াল ছিলাম।’

চকিতে প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ, ‘ছিলাম মানে?’

‘ঢাকার কুঠি হাতছাড়া হয়ে গিয়েছে। বাংলায় আমাদের ব্যবসা বন্ধ, আপনি শুনেছেন নিশ্চয়ই।’

ধোঁয়া ছেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ডোন্ট ইউজ পাস্ট টেন্স। সামনের দিকে তাকাও। বলবে আমি ঢাকা কুঠির কুঠিয়াল। আই অ্যাম প্রেসেন্ট, নট পাস্ট। ভেরি মাচ অ্যালাইভ অ্যান্ড এক্সিসটিং। কথাটা মনে মনে বলে দেখো, মনে জোশ আসবে। বাংলায় আমাদের হারিয়ে যাওয়া সব কিছু দ্রুত উদ্ধার করতে হবে। আমার হাতে সময় খুব কম। আই ওয়ান্ট হোল হার্টেড এফর্ট ফ্রম ইয়ং অফিসারস লাইক ইউ।’

ক্লাইভে কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘সিওর স্যার।’

ক্লাইভের সঙ্গে স্ক্র্যাফটনের পরিচয় করিয়ে দিলেন লেফটেনান্ট লেবাম। বললেন, ‘ইনি কর্নেল রবার্ট ক্লাইভ। লিডার অফ দ্য বেঙ্গল এক্সপিডিশন।’

‘এখানে কী করছ তুমি?’ স্ক্র্যাফটনের উদ্দেশে প্রশ্ন করলেন ক্লাইভ।

‘আপনাকে রিসিভ করতে এসেছি। সঙ্গে পাইলট জাহাজ আছে।’

মাথা নেড়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ভেরি গুড। পাইলট জাহাজ ছাড়া আমাদের জাহাজগুলোকে মোহনা থেকে ফলতায় নিয়ে যাওয়া যে সম্ভব নয়, তা আমি জানতাম। আই হার্ড অ্যাবাউট হুগলি রিভার। ইট ইজ ভেরি ডেঞ্জারাস।’

নবকৃষ্ণ মুগ্ধতার সঙ্গে ক্লাইভকে নজর করছিলেন। কলকাতায় যে ইংরেজ সাহেবদের এতদিন তিনি দেখেছেন, তাদের সঙ্গে রবার্ট ক্লাইভের কোনও মিল নেই। দেহের ভঙ্গিতে এমন ডাকাবুকো ভাব নবকৃষ্ণ ফোর্ট উইলিয়ামের আর কোনও ইংরেজের মধ্যে তিনি দেখেননি।

এবারে নবকৃষ্ণর দিকে চোখ পড়ল ক্লাইভের। হাতজোড় করে নমস্কার করলেন নবকৃষ্ণ। স্ক্র্যাফটনের দিকে চেয়ে ক্লাইভ শুধোলেন, ‘তোমার সঙ্গে এই নেটিভ লোকটি কে?’

‘মুনশি নবকিসেন। অ্যা রিয়েল ফ্রেন্ড অফ ইংলিশমেন।’

 নবকৃষ্ণর দিকে চেয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ইউ আর মুনশি? আই মিন ইউ নো কোর্ট ল্যাঙ্গুয়েজ অফ নবাব?’

‘ইয়েস স্যার।’

‘টু নাইট আই হ্যাভ টু ড্রাফট এ লেটার টু নবাব। তুমি আমাকে হেল্প করবে?’

‘বিলকুল স্যার।’

পাইপ থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উড়িয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘মুনশি, ইউ আর ভেরি এফিসিয়েন্ট। স্ক্র্যাফটন সেইড সো। ডু ইউ এগ্রি উইথ দিস?’

বিনয়ের সঙ্গে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সাহেব ভালোবাসেন আমায়। বাড়িয়ে বলেছেন। তবে কী করতে হবে বলুন, চেষ্টা করে দেখব।’

ক্লাইভ বললেন, ‘আমার সঙ্গে আসা সৈন্যরা হাংরি। জাহাজের রসদ শেষ হয়ে গিয়েছিল। চটপট রসদের জোগাড় করতে হবে। তোমাকে দুঘণ্টা সময় দিলাম মুনশি।’

জোড়হাত করে নবকৃষ্ণ বললেন, ‘সময় লাগবে না সাহেব। আপনার ফৌজের জন্য রসদ আগে থেকেই জোগাড় করা আছে।’

চমকে গিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘অলরেডি প্রোকিওরড? বলছ কী?’

ঠোঁটের ফাঁকে হাসি ঝুলিয়ে স্ক্র্যাফটন বললেন, ‘এটা মুনশির আইডিয়া।’

নবকৃষ্ণর দিকে অবাক চোখে তাকালেন ক্লাইভ। নবকৃষ্ণ বললেন, ‘আপনারা কি সামুদ্রিক ঝড়ে পড়েছিলেন?’

আরও চমকে গেলেন ক্লাইভ, ‘তুমি এ কথা জানলে কী করে মুনশি?’

‘বালেশ্বরে এসে মাদ্রাজ থেকে আসা এক ডাচ জাহাজের ক্যাপ্টেনের মুখে শুনলাম তেলেঙ্গানার উপকূল পার হওয়ার সময় আকাশে সে গাঢ় মেঘ দেখেছিল। তা আশ্বিনের ঝড় তো এদেশে নতুন কিছু নয়। মাদ্রাজ থেকে পরে রওনা হলে আপনাদের মাঝসমুদ্রে ঝড়ে পড়াই স্বাভাবিক।’

ক্লাইভ বিস্মিত চোখমুখ করে বললেন, ‘নট অনলি ইউ আর এফিসিয়েন্ট। ইউ আর ইন্টেলিজেন্ট অলসো।’

নবকৃষ্ণ অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, ‘সাহেব, বাংলার ব্যবসা আপনাদের কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ সে আমি ভালো করেই জানি। নবাবের এক গুঁতোয় আপনারা যে বাংলা ছেড়ে চলে যাবেন না সে বিশ্বাস আমার ছিল। তবে কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য মাদ্রাজ থেকে আপনাদের আসার দেরি দেখে খানিকটা হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। তবে একথাও মনে হয়েছিল, দেরি হওয়ার কারণ হতে পারে আবহাওয়া। তাই যদি হয়, তবে আপনাদের রসদের ঘাটতি দেখা দেবে। সেই জন্য আগে থেকেই সব মজুত করা আছে। আমাদের জাহাজে রয়েছে।’

সশব্দে হেসে উঠে নবকৃষ্ণর পিঠ চাপড়ে দিয়ে ক্লাইভ বললেন, ‘ইউ আর জিনিয়াস মুনশি। কী যেন নাম তোমার?’

‘নবকৃষ্ণ।’

‘ইয়েস ইয়েস নবকিসেন। শোনো আজ থেকে আমার মুনশি হিসেবে তোমাকে কাজে বহাল করলাম আমি। তোমার মতো লোককেই আমার দরকার। বেঙ্গলে যতদিন থাকব, তুমি ছায়ার মতো আমার সঙ্গে থাকবে।’

গঙ্গার বুকে ভেসে চলেছে সারি সারি নৌকো, বজরা। সবই সাগরদ্বীপ অভিমুখে চলেছে। মকর সংক্রান্তিতে সাগরসঙ্গমে ডুব দিলে মহাপুণ্য। সব পাপ, গ্লানি, অন্তরে পুঞ্জীভূত ক্লেদ ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যায়। এই বিশ্বাস নিয়ে প্রতিবছর ছুটে আসে লাখ লাখ মানুষ। কথায় বলে সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার। যাত্রাপথ দুর্গম। পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। পথে আছে জলদস্যুর ভয়, গভীর অরণ্যে আচ্ছাদিত সাগরদ্বীপে হিংস্র জন্তুর ভয়, উত্তাল নদীতে নৌকোডুবির ভয়। তবুও সব বিপদকে তুচ্ছ করে মকর সংক্রান্তির দিন অগণিত মানুষ এসে জড়ো হয় সাগরসঙ্গমে, কপিলমুনির দরবারে।

গ্রামের নাম বাসুলাট। গঙ্গার তীরে নোঙর ফেলেছে বড় একটা বজরা। নদীর পাড়ে রান্নার তোড়জোড় চলছে। তীর্থযাত্রীরা একটু জিরিয়ে নিয়ে আবার যাত্রা করবে। এ দলের সবাই নারী, সংখ্যায় তারা চারজন। তবে সঙ্গে রয়েছে পুরুষ ঠাকুর চাকর ও পাইক বরকন্দাজ।

এই নারীরা সমাজের চোখে ব্রাত্য, পতিতা। দিনের বেলায় সম্ভ্রান্ত পুরুষেরা এদের ছায়া মাড়ায় না, কিন্তু রাতের বেলা এদেরই নিয়ে ফুর্তি করে, তখন সোহাগ ভালোবাসা সব উজাড় করে দেয়। এরা আসছে হুগলি থেকে। সব থেকে বেশি হাঁকডাক যার, সেই দলনেত্রী, নাম সৌদামিনী।

সৌদামিনী হেঁকে বলে, ‘ও ঠাকুর এখনও রান্না চড়াওনি, সব খাবে কখন? তাড়াতাড়ি হাত চালাও।’

‘এই যে মা উনুন ধরিয়ে দিয়েছি। বেশি সময় লাগবে না।’

বটগাছের নীচে দাঁড়িয়ে পান মুখে ফেলে নদীর দিকে চেয়ে সৌদামিনী বলে, ‘অনেক স্নান হয়েছে এবারে উঠে আয় হিরে।’

পাড়ের কাছেই সাঁতার দিতে দিতে হিরেমন বলে, ‘আর কয়েকটা ডুব দিয়ে নি দিদি, বড় ভালো লাগছে।’

‘যত ঢং! উঠে আয় বলছি।’

নিজের মনেই গজরাতে থাকে সৌদামিনী, ‘আমার হয়েছে যত জ্বালা! এত লোককে সামলে নিয়ে চলা কি সোজা কথা? কী কুক্ষণে যে তীর্থে যেতে মন করেছিলাম!’

ভিজে কাপড়ে উঠে আসে হিরেমন। তার গায়ে লেপটে থাকা ভিজে কাপড় যৌবনের ঐশ্বর্যকে বড় বেশি প্রকট করে তুলেছে। সেদিকে চেয়ে সৌদামিনীর গা জ্বলে যায়। কারণটা মনোজগতের। হিরেমনের দেহে এখন ভরা জোয়ার। সৌদামিনীর দেহশ্রীতে ভাঁটার টান শুরু হয়েছে।

সৌদামিনীর বাঁধা বাবু, হুগলির নুনের আড়তের মস্ত কারবারি, চকবাজারের পতিতাপল্লির মালিক মহাদেব পাল যে তীর্থযাত্রার কড়ি জোগাতে রাজি হয়েছেন, তা যে কতকটা হিরেমনকে খুশি করার জন্যই, একথা সৌদামিনীর অজানা নয়। হুগলির চকবাজারে দিশেহারা হয়ে ঘুরতে থাকা হিরেমনের অসহায়তার কথা শুনে মহাদেব পালকে বলে তার জন্য একখানা ঘরের ব্যবস্থা করে দিয়েছিল সৌদামিনী। আজ সেই হিরেমনই তার কাছে গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে। ইদানীং হিরেমনের গতরের উপর নজর পড়েছে মহাদেব পালের। সৌদামিনীর রইস বাঁধা বাবু ফসকে যাওয়ার জোগাড়। সুযোগ পেলেই আজকাল হিরেমনকে দু’কথা শুনিয়ে ছাড়ে সৌদামিনী।

হিরেমন বলে, ‘আহা গঙ্গায় ডুব দিতে কী যে ভালো লাগে দিদি।’

‘আহা গতরখাগির আহ্লাদ দেখে বাঁচি না। এ আবার নতুন কথা কী?’

‘খামোখা গাল পাড়ছ কেন গো দিদি? আমি করেছি কী?’

হিরেমনের গায়ে লেপটে থাকা ভিজে কাপড় ভেদ করে বড় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যৌবনসম্ভার।

সৌদামিনী বলে, ‘এই আগলহীন জায়গায় নাইতে নামার নাম করে শরীর না দেখালে চলছিল না তোর? বলি এখানে তোর কোন নাগর রয়েছে যে তোর শরীর দেখে চোখের আরাম করবে?’

‘এসব কী কথা কইছ? যাচ্ছি ঠাকুরের থানে।’

‘সে কথাই তো বলছি আমি। ঠাকুরের থানে চলেছি, ধিঙ্গিপনা কমা। মন শান্ত কর।’

‘তোমার মেজাজ গরম কেন আমি জানি। জামাইবাবুকে অনেক দিন দেখোনি সেই জন্য তাই না দিদি?’ এ কথা বলে খিলখিল করে হেসে ওঠে হিরেমন।

ঝনঝন করে ওঠে সৌদামিনী, ‘খুব বুঝেছিস।’

সহসা ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে সচকিত হয়ে ওঠে দুজনে। হিরেমন দ্রুত শুকনো কাপড়ে বুক ঢাকে। হিরেমনের হাত টেনে ধরে সৌদামিনী গাছের আড়ালে সরে যায়। টগবগিয়ে ঘোড়া ছুটিয়ে তাদের সামনে দিয়ে চলে যান ওয়ারেন হেস্টিংস।

সৌদামিনী বলে, ‘বাপরে! লালমুখো ফিরিঙ্গি!’

হিরেমন বলে, ‘এখানে সাহেব কোথা থেকে এল দিদি? এটা কোন জায়গা?’

নদীতে জল নিতে এসেছে গ্রামের একটি মেয়ে। হিরেমন হেঁকে বলে, ‘ও মেয়ে তোমাদের গাঁয়ের নাম কী গো?’

মেয়েটি জবাব দেয়, ‘এ গায়ের নাম বাসুলাট। পাশের গাঁ ফলতা।’

হিরেমনের বুকটা ধক করে ওঠে। সে শুনেছিল নবাবের হাতে তাড়া খেয়ে ইংরেজরা ফলতা নামে এক গ্রামে পালিয়ে গিয়েছে। তাহলে কি এখানেই ইংরেজ সাহেবদের আস্তানা। তাই যদি হয়, তাহলে লরেন্স নামে সেই ছোকরা সাহেব হয়তো এখানেই আছে।

হিরেমন শুধোয়, ‘তোমাদের গাঁয়ে ফিরিঙ্গি এল কোত্থেকে গো মেয়ে?’

‘সামনে আধ ক্রোশ দূরে ফিরিঙ্গিদের ঘাঁটি, নবাবের ভয়ে কলকেতা থেকে পালিয়ে এসেছে।’

সৌদামিনী ভয় পেয়ে বলে ওঠে, ‘অ্যাঁ? ও হিরে চল চল পালিয়ে চল এখান থেকে। ফিরিঙ্গিদের হাতে পড়লে ধম্মটম্ম সব যাবে। কেরেস্তান করে ছাড়বে।’

‘আমাদের ধম্ম যেতে আর কি বাকি আছে দিদি?’

সৌদামিনী রেগে গিয়ে বলে, ‘তা বলে কী ফিরিঙ্গির বিছানায় গিয়ে উদোম হয়ে শুবি?’

‘আঃ দিদি! কী যে বলো?’

‘ও তোর তো আবার নজর উঁচু। সাহেব ছাড়া মন ওঠে না। হুঁ! মাগী ভাবে মেমসাহেব হবে।’

‘সাহেবরা খারাপ কিসে দিদি? বুড়ো বর মরলে তো সতী বলে জ্যান্ত পোড়ায় না।’

‘ও রে মেয়ে তলায় তলায় এত?’

হাঁক ছাড়ে সৌদামিনী, ‘ও বহরদার নোঙর তোল এখুনি। ঠাকুর, ও ঠাকুর, রান্না চড়াতে হবে না, একবেলা চিড়ে মুড়ি খেয়ে থাকবে সকলে।’

হিরেমন বলে, ‘খামাখা হুড়ো দিচ্ছ সকলকে। একটা বেলা এখানে কাটিয়ে গেলে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হবে শুনি?’

‘সব বুঝি রে মেয়ে। ভাবছিস কী তোর সেই পিরিতের সাহেব নাগরের দেখা পাবি এখানে?’

লরেন্সের প্রসঙ্গ উঠতেই হিরেমনের চোখে জল এসে যায়। সে উদাস গলায় বলে, ‘যার কথা বলছ, সে বেঁচে আছে কিনা কে জানে?’

হিরেমনের মন একেবারেই চাইছিল না এখনই জায়গাটা ছেড়ে চলে যেতে। পুরুষের প্রতি ভালোবাসা কী বস্তু, লরেন্সের সান্নিধ্যে এসে সেটা প্রথম টের পেয়েছিল হিরেমন। প্রৌঢ় স্বামীর সঙ্গে আর যাই হোক, তার ভালোবাসা গড়ে ওঠেনি। ঝাঁকড়া চুলওয়ালা নীল চোখের ছোকরা সাহেব সত্যিই ভালোবেসেছিল তাকে। ঘর বাঁধার কথা বলেছিল। ঘরের স্বপ্ন কাকে না বিভোর করে তোলে। ফিরিঙ্গিদের ডেরা যখন কাছেই রয়েছে। একবার কি খোঁজ করে দেখা যায় না, লরেন্স বেঁচে আছে কিনা?

হিরেমনের মনের আন্দাজ পেয়ে সৌদামিনী ঝনঝন করে বলে ওঠে, ‘তুই তাহলে তোর নাগরের তালাশ করে বেড়া। আমি চললুম।’

বজরায় উঠে পড়ে সৌদামিনী। অগত্যা হিরেমনকেও উঠতে হয় বজরায়। বহরদারেরা বজরার কাছি খুলে দেয়।

 ঘর বেঁধে থিতু হওয়ার আকাঙ্ক্ষা আজকাল লরেন্সের মনেও প্রবল হয়ে উঠেছে। নিজের ঘরের কথা মনে হলেই হিরেমনের মুখটা ভেসে ওঠে লরেন্সের মনের মধ্যে। সবই ঠিক ছিল, হিরেমনকে সে কথা দিয়েছিল—আমরা শাদি করব। নীরব টলটলে দুই চোখে সম্মতি দিয়েছিল হিরেমন।

 হঠাৎ কোথা থেকে সৈন্যসামন্ত নিয়ে ঝড়ের মতো ধেয়ে এলেন নবাব। সব তছনছ হয়ে গেল। যুদ্ধ বড় ভয়ানক, অনেক ছোট ছোট মানুষের ছোট ছোট আশাকে নির্মূল করে দেয়। হিরেমনকে আজ কোথায় খুঁজে পাবে লরেন্স?

 একটা ঝাঁকড়া তেঁতুল গাছের নীচে ঝোপের আড়ালে লরেন্স এতক্ষণ চুপ করে বসে ছিল। হিরেমনের কথা ভাবতে ভাবতে তার মনটা কেমন অস্থির হয়ে উঠেছে। উঠে দাঁড়াল সে।

গঙ্গা বেয়ে একের পর এক নৌকো, বজরা ভেসে চলেছে সাগরের দিকে। হিদেনরা এ সময় তীর্থে যায়।

একটা বজরা ভেসে চলেছে পাড়ের খুব কাছ দিয়ে। হঠাৎ যেন বিদ্যুতের পরশ লাগল লরেন্সের গায়ে। সে কেঁপে উঠল। বজরার ছাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে হিরেমন। দৃষ্টি অন্যদিকে।

 লরেন্স চেচিয়ে উঠল, ‘হিরেমন। মাই সুইটি!’

 নদীতে ভরা জোয়ার। বহরদাররা দাঁড় বাইছে প্রাণপণে। দ্রুত এগিয়ে চলেছে বজরা। নদীর পাড় বরাবর ছুটতে লাগল লরেন্স। বজরা ক্রমশ মাঝ নদীর দিকে সরে যাচ্ছে।

গাছের শিকড়ে বেঁধে লরেন্স হোঁচট খেয়ে পড়ল। হাত কেটে গিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল। পায়েও বেকায়দা চোট লেগেছে। শরীরটাকে টেনে হিঁচড়ে তুলে নিয়ে নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল লরেন্স। ততক্ষণে মাঝনদীতে চলে গিয়েছে বজরা।

দেখা দিয়েও আবার হারিয়ে গেল হিরেমন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *