অভিশপ্ত নগরী – সত্যেন সেন
অভিশপ্ত নগরী – সত্যেন সেন
[যিরূশালেমকে কেন্দ্র করে ‘অভিশপ্ত নগরী’ উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে। কিন্তু এর কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুতে রয়েছে য়িহুদী জাতির পতনের সময়কার তার সমাজব্যবস্থা, ধর্ম, রাজতন্ত্র এবং সর্বোপরি রাজতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্রের মধ্যে বিরোধের নিগূঢ় ভাষ্য। য়িহুদী জাতি গড়ে তুলেছে। বস্তুত য়িহুদীদের ঐ দ্বৈপায়ন চরিত্র অনুধাবন তাবৎ বাইবেলের নির্যাসকে আতস্থ করা থেকেই সম্ভব। উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে এখানেই লেখকেই কৃতিত্ব।
অথচ সকলের ক্ষেত্রে য়িহুদী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য আর তারই সমান্তরালভাবে যিরূশালেমের উত্থানপতন এক কথায় অভিশপ্ত জাতি ও অভিশপ্ত নগরীর মধ্যকার যোগসূত্রের পুনরুদ্ধার আপামর অভাজন ব্যক্তিদের পক্ষে সম্ভবপর নয়। শ্রীসত্যেন সেন ‘অভিশপ্ত নগরী’ সেই অভাব মোচনের জন্য যেন একটা দৃঢ় সংকল্পের স্বাক্ষর।
‘ইতিহাসের যে ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে ভেলভেটের জুতো নিচে নামছে আর কাঠের জুতো উপরে উঠছে’ সেই ইতিহাস-চেতনা ‘অভিশপ্ত নগরী’র সূত্রধার।]
প্রথম প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ১৯৬৮
Abhisapta Nagari (A Novel) By Satyen Sen
.
প্রকাশকের নিবেদন
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তানের ধনিক ও বণিক শ্রেণী সাম্রাজ্যবাদীদের পৃষ্ঠপোষকতায় পূর্ব বাংলাতে শাসন ও শোষণের ষড়যন্ত্র চালিয়ে এসেছে। তাকে উপনিবেশে পরিণত করার ও দাস শিবিরে রূপান্তরত করার সকল চেষ্টাই কুচক্রীরা প্রথম থেকে করেছে। বাঙ্গালীর শিক্ষা-সংস্কৃতি, ভাষা-সাহিত্য, ঐতিহ্য-কৃষ্টি, সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্রের বিকাশ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কার্যকলাপ, সামাজিক আদর্শ ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি—এক কথায় জীবনের সর্বক্ষেত্রে স্টীম রোলার চালিয়ে তাকে ভেঙ্গে দিতে চেয়েছে। এ অত্যাচার বাঙ্গালী কি নীরবে সহ্য করেছে? তারা কি মুখ বুজে শুধু মার খেয়েছে? এক কথায় এর উত্তর, ‘না’। বাঙ্গালীর প্রতিরোধের প্রমাণ মিলবে, (ক) ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে রাষ্ট্রভাষার প্রশ্নে ছাত্রসমাজ কর্তৃক মোহাম্মদ আলী জিন্নার বিরোধিতায়, (খ) ১৯৫২ সালের ২১-এ ফেব্রুয়ারী রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনে বরকত, সালাম, রফিক, জব্বারের আত্মদানে, (গ) ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবিতে, (ঘ) ১৯৬১ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব খানের উপস্থিতিতে ঢাকায় ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে, (ঙ) ১৯৬৪ সালে বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও ছাত্রদের ‘বাঙ্গালী রুখিয়া দাঁড়াও’ বলে দাঙ্গাবিরোধী আন্দোলনে, (চ) ১৯৬৫ সালে আইয়ুব-বিরোধী নির্বাচনী প্রচেষ্টায়, (ছ) ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ৬-দফা কর্মসূচীতে, (জ) ১৯৬৯ সালে ছাত্রদের ১১-দফা আন্দোলন ও মিথ্যা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার জাল ছিন্ন করে আইয়ুব খানকে ক্ষমতা হস্তান্তরে বাধ্য করার সর্বাত্মক সংগ্রামে, (ঝ) ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের অভূতপূর্ব ও নজীরবিহীন নির্বাচনী সাফল্যে, (ঞ) ১৯৭১ সালের ১লা মার্চ হতে ২৫-এ মার্চ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু কর্তৃক আহূত ঐতিহাসিক অহিংস অসহযোগ আন্দোলনের অভূতপূর্ব সাফল্যে, (ট) মৌলানা ভাসানী ও শেখ মজিবুর রহমান- কর্তৃক পূর্ব বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণায়, (ঠ) ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠায় এবং (ড) পশ্চিমা হানাদারদের বিরুদ্ধে মুক্তিফৌজের সশস্ত্র যুদ্ধের সফলতায়।
এর একটিও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলির এবং আরও বিভিন্ন ঘটনার পেছনে আছে গত ২৪ বছরের শোষিত-বঞ্চিত ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সরকারী-বেসরকারী কর্মচারী ও আপামর জনতার একটানা আন্দোলন-যা সর্বশেষে রূপ নিয়েছে বর্তমান সশস্ত্র-সংগ্রামে। এই আন্দোলন ও প্রতিরোধের ইতিহাস ও মর্মবাণী বিধৃত হয়েছে পূর্ব বাংলার প্রগতিশীল সাহিত্যে। বাংলাদেশকে জানবার এবং বুঝবার জন্যে তাই একান্ত প্রয়োজন এর সাহিত্যের সঙ্গে একাত্মতার। ওপার বাংলার সঙ্গে এপার বাংলার সমঝোতাকে দৃঢ় ভিত্তির ওপর স্থাপন করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা সাধ্যমত বাংলাদেশের সমস্ত ধরনের প্রগতিশীল লেখা প্রকাশে ব্রতী হয়েছি।
বরেণ্য ঔপন্যাসিক সত্যেন সেনের ‘অভিশপ্ত নগরী’ কথা-সাহিত্যের নতুন দিগ্দর্শন। বাংলাদেশে বিশেষ সমাদৃত এ গ্রন্থ এ বঙ্গেও নতুন চিন্তার খোরাক জোগাবে।
.
ভূমিকা
যিরূশালেমকে কেন্দ্র করে “অভিশপ্ত নগরী” উপন্যাসের কাহিনী গড়ে উঠেছে। কিন্তু এর কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তুতে রয়েছে য়িহুদী জাতির পতনের সময়কার তার সমাজব্যবস্থা, ধর্ম, রাজতন্ত্র এবং সর্বোপরি রাজতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্রের মধ্যে বিরোধের নিগূঢ় ভাষ্য। য়িহুদী জাতি কালের আক্রমণে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে দেশে দেশে সমুদ্রের মধ্যে ক্ষুদ্র দ্বীপের মত এক স্বতন্ত্র জগৎ গড়ে তুলেছে। বস্তুত য়িহুদীদের ঐ দ্বৈপায়ন চরিত্র অনুধাবন তাবৎ বাইবেলের নির্যাসকে আত্মস্থ করা থেকেই সম্ভব। উপন্যাসের চরিত্র চিত্রণে এখানেই লেখকের কৃতিত্ব।
অথচ সকলের ক্ষেত্রে য়িহুদী চরিত্রের বৈশিষ্ট্য আর তারই সমান্তরালভাবে যিরূশালেমের উত্থানপতন—এক কথায় অভিশপ্ত জাতি ও অভিশপ্ত নগরীর মধ্যেকার যোগসূত্রের পুনরুদ্ধার আপামর অভাজন ব্যক্তিদের পক্ষে সম্ভবপর নয়। শ্রীসত্যেন সেনের “অভিশপ্ত নগরী” সেই অভাব মোচনের জন্য যেন একটা দৃঢ় সংকল্পের স্বাক্ষর। একাধারে রাজনীতিবিদ, সমাজ সচেতন কর্মী ও সাহিত্যিকের অসিধার প্রতিভার সমন্বয় তাঁর মধ্যে ঘটেছে। “ইতিহাসের যে ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে ভেলভেটের জুতো নিচে নামছে আর কাঠের জুতো উপরে উঠছে” সেই ইতিহাস-চেতনা “অভিশপ্ত নগরী”র সূত্রধার।
সকল প্রাচীন ধর্মের মত য়িহুদীরাও প্রাচীনত্বের গৌরব ও ধর্মের সনাতন রীতির জন্য গর্বিত। কিন্তু ধর্মের ক্রমবিকাশেরও ইতিহাস রয়েছে। আর তা একটা নির্দিষ্ট সময়ে বিভিন্ন ভূখণ্ডে ধর্মীয় বিকাশে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি, অধিবাসীদের রীতিনীতি সাশ্রয়ী। একটা উদাহরণই যথেষ্ট
: ‘প্রোফেট’ হল গ্রীক শব্দ, গ্রীক ওল্ড টেস্টামেন্টে এর ব্যবহার রয়েছে, হিব্রু ‘নবী’ থেকে এটা নেয়া হয়েছে। হিব্রু ভাষায় নবী শব্দের আদি মানে উন্মাদ অবস্থায় বা আনন্দাতিশয্য বশতঃ ভাবাবেগে বাণী দান। ভবিষ্যদ্বক্তা হিসেবে সাধারণতঃ এর ব্যবহার দেখা যায় বিভিন্ন ধর্মে। নবী শব্দের আদি উৎপত্তির ইতিবৃত্ত অস্পষ্ট। সাধারণতঃ একে সেমিটিক ভাষাগোষ্ঠীজাত ধরা হলেও তা ঠিক নয়। সম্ভবতঃ হিটাইটদের কাছ থেকে এটা নেয়া। সেমিটিক ভাষা-গোষ্ঠীর মধ্যে আরবী ভাষায় ‘নাবা’ শব্দ দেখতে পাওয়া যায়; তার মানে হল
: ‘ঐশী বাণীর প্রবক্তা। সম্ভবতঃ প্যালেস্টাইন-সিরীয় ধর্মে এই ঐশী বাণী প্রচারের প্রচলন থেকে স্যামুয়েলের সময় য়িহুদীদের মধ্যে এর প্রচলন শুরু হয়। পরবর্তী কালে য়িহুদী সমাজে দিব্যোন্মাদ নবীদের বিষয়টি প্রাধান্য পায় ও য়িহুদী সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। দেখা গেছে যে প্যালেস্টাইন ও সিরীয়দের সংঘর্ষে এই নবীদের বাণী জাতির ভাগ্য নির্ধারণের সহায়ক হয়েছে। তাদের উত্তেজনাকর বক্তৃতা, উন্মত্তবৎ আচার ব্যবহার দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছে সমগ্র সমাজকে। কিন্তু সাথে সাথে একথাও মনে রাখতে হবে আসুর ও বাবিল শক্তির অভ্যুদয় আর তাদের গতিশীল প্রচণ্ডতা যা তাদের ধর্মবোধেও সংক্রমিত সেখানে এ ধরনের ঐশী বাণী প্রচারের স্থান ছিল না। অথচ য়িহুদী সমাজের দীর্ঘপতনের যুগে এই ঐশী বাণী সম্বল ছিল বিদেশ বিভূঁয়ে নির্বাসনে। আর য়িহুদী সমাজ আশ্চর্যজনকভাবে নিজেকে রক্ষা করেছে প্রতিকূল পরিবেশেও। স্যামুয়েলের সময় থেকেই য়িহুদীদের মধ্যে রাজতন্ত্রের সূচনা হয়। তার সময়েই প্যালেস্টাইনীদের বিরুদ্ধে য়িহুদীদের চালিত করা হয়, প্রতিষ্ঠা করা হয় রাজতন্ত্রের। “অভিশপ্ত নগরী”র চতুর্থ অধ্যায়ে য়িহুদী সমাজে রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। মিশর থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে যিরূশালেমের মালভূমিতে আগত য়িহুদীদের বিবর্তনের ধারায় বহু ওলটপালট হয়ে গেছে। অপরাপর প্রাচীন ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর মত য়িহুদীরাও বহু ঈশ্বরবাদ থেকে একেশ্বরবাদে চলে আসে। যিহোবা (মূল হিব্রু ইয়াওয়ে) প্রথমে ছিলেন তাদের অগ্নিদেবতা। গ্রীক পুরাণের দেবদেবীর মত শুধু আশীর্বাদও নয় অভিশাপও বহন করতেন যিহোবা। এজন্য তাকে ধ্বংসের দেবতাও বলা হত। আবার বারংবার যুদ্ধ বিগ্রহ ও নিগ্রহের মধ্য দিয়ে য়িহুদীদের চলতে হয়েছে। প্রাচীন ইতিহাসে তারাই বহু ভাগ্য বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে অস্তিত্বের রথকে টিকিয়ে রেখেছে রক্ত আর অশ্রুর মূল্যে। আর এজন্য যিহোবা (মূল হিব্রু ইয়াওয়েহ) আবার যুদ্ধের দেবতাও বটে। দেশ থেকে দেশান্ত রে বিতাড়িত য়িহুদীদের আদি বহু ঈশ্বরবাদী বিশ্বাসে বৈদিক দেবতার মত পুরুষ দেবতাদেরই প্রাধান্য ছিল। বৈদিক আর্যদের মত য়িহুদীরাও প্রথমে শিকার ও পশুপালন এবং দেশান্তরে গিয়ে স্থানীয় প্রভাবে ও দীর্ঘকালীন অভিজ্ঞতায় কৃষিজীবী জাতিতে পরিণত হয়।
একটি জাতির পতনের যুগে যে অবক্ষয় লক্ষ করা যায় নবী যেরেমিয়ার প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত বাণীতে তার হুবহু চিত্র পাওয়া যায়। বাইবেলের ‘বুক অব দি প্রোফেট’
: যেরেমিয়ার খণ্ডের ভিত্তিতে লিখিত “অভিশপ্ত নগরী” উপন্যাসের ঘটনাকাল। বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার দু’ দুবার যিরূশালেম অবরোধ করেন আর ধ্বংস করে মাটির সাথে গুঁড়িয়ে দেন। নবী যেরেমিয়ার চিত্তে এই দৃশ্যের প্রতিক্রিয়া গভীর হয়েছে। ‘Prophecy had already taught its truths, its last effort was to reveal itself in a life’ – the life of Jeremiah. প্রথমাবধি বারংবার বিপর্যস্ত য়িহুদীরা নিজেদেরকে ঈশ্বরের অনুগৃহীত জাতি বলে গর্ববোধ করতো। পরবর্তী কালে ঈসায়া থেকে যেরেমিয়ার সময় পর্যন্ত (খৃঃ পূঃ ৭৪০-৫৮৬) এর রূপান্তর ঘটল, অনুগৃহীতের সাথে যুক্ত হল দায়িত্ববোধ। প্রসঙ্গতঃ উল্লেখযোগ্য, নবীগণ কখনও বলতেন না যে, ‘আমি দেখেছি’, ‘আমি জানি’, তার পরিবর্তে তাঁরা বলতেন, ‘ঈশ্বর আমাকে দেখাচ্ছেন।’
ঐতিহাসিকগণ যেরেমিয়ার কাল নির্ধারণ করেছেন খৃঃ পূঃ ৬২৬ থেকে খৃঃ পূঃ ৫৮৬ পর্যন্ত। খৃঃ পূঃ ৫৮৬ সালে বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার যিরূশালেম দখল করে তাকে ধ্বংসপুরীতে পরিণত করেন। যিরূশালেমরাজ যিহোয়াকীমের সময় নেবুকাডনাজার সসৈন্যে শহরের দিকে এগিয়ে আসেন। এ সময়ে যিয়োহাকিম মারা যান। তাঁর পুত্র যিহোয়াকীন সিংহাসনারোহণ করেন। তখন বাবিলরাজ সেনাপতি যিরূশালেম অবরোধ করেন কিন্তু তিন মাস পর অবরোধ তুলে নেন (খৃঃ পূঃ ৫৯৭)। এতে সাহসী হয়ে যিহোয়াকীন ইতিপূর্বে প্রদত্ত আত্মসমর্পণের চরমপত্র উপেক্ষা করেন। এর আগে যিহোয়াকীনের সময় কারসেমিশা ( Carchemisha) রণাঙ্গনে বাবিলরাজের ক্যালদীয় সৈন্য মিসরীয় বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে।
যিরূশালেমের মন্দিরের পুরোহিত পশহুর যেরেমিয়ার এক প্রতিদ্বন্দ্বী নবী হানানিয়াকে দাঁড় করান। এর মধ্য দিয়ে (অভিশপ্ত নগরী
: ১৩শ অধ্যায়) যিরূশালেমের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের চরিত্রকে প্রকট করেছে। নবী ও ধর্মমন্দির এ দুটো য়িহুদী সমাজে পরস্পরের পরিপূরক না হয়ে, পরস্পর বিরোধী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর কারণ… ‘the covenant relation with God, which is Israel’s glory, is broken by disobedience
: the law, which is the pride of Israel, merely emphasizes man’s inability to fulfil it: the sacrifices of the temple cannot cleanse man’s conscience; and the prophet teaching concerning social justice is far too lofty for the nation to understand or to obey.’
আগের কথায় ফিরে আসা যাক। যিহোয়াকীন পরাস্ত ও বন্দী হয়ে বাবিলনে নীত হলেন। যিহোয়াকীমের ভাই যেদেকিয়া (যিহোয়াকীনের পিতৃব্য) বশ্যতা স্বীকার করলেন। কিন্তু তিনি মিসররাজের উপর ভরসা করে বাবিলরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্ত করেন। বাবিলরাজ তাঁকে পরাস্ত করে বন্দী করেন ও হত্যা করেন এবং জনৈক গেদালিয়াকে যিরূশালেমের গভর্ণর নিযুক্ত করেন। এই গেদালিয়া “অভিশপ্ত নগরী”র লোকপ্রধান অহিকমের পুত্র। গেদালিয়া অবশ্য যিরূশালেমের রাজবংশের চক্রান্তে ইসমাইলের হস্তে নিহত হন। আমনরাজ বালিস এই চক্রান্তের মূলে ছিলেন। নবী যেরেমিয়ার দূরদৃষ্টি এবং বাবিলে নির্বাসিত য়িহুদীদের যিরূশালেমে প্রত্যাবর্তন না করার জন্য উপদেশ দিয়ে লিখিত পত্র য়িহুদীদিগকে সমূহ সর্বনাশ থেকে রক্ষা করেছে, ঘটনাবলীর পরবর্তী ইতিহাস এর সাক্ষ্য।
উপন্যাসে বিদ্যুৎ চকিতের মত হলেও দাস বিদ্রোহের যে চিত্র আঁকা হয়েছে, সমাজের স্তরে স্তরে আসন্ন পরিবর্তনের ইঙ্গিত সূক্ষ্মভাবে সেখানে সমুপস্থিত। বস্তুতঃ ইতিহাসের ক্রান্তিলগ্নে যিরূশালেম যে-বিরাট পরিবর্তনের মধ্যে এসে তৎকালে দাঁড়িয়েছিল তার সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য এখানে লক্ষণীয়। লোকপ্রধান অহিকীমের দোদুল্যমানতা একটা যুগের অবসানের পূর্বেকার দ্বিধাজড়িত চেতনার স্বাক্ষর। য়িহুদীদের আগমনের পূর্বে উরূশালিম (শান্তিনগরী) নামে অভিহিত এই নগরী খৃঃ পূঃ ২৫০০-তে স্থাপিত হয়েছে বলে জানা যায়।
“অভিশপ্ত নগরী” যিরূশালেমের পতনের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু একখানি ঐতিহাসিক উপন্যাস নয়। এখানে য়িহুদী সমাজের ধারাবাহিক ট্র্যাজেডির পেছনে সমাজের কোন কোন শক্তি কিভাবে কাজ করেছে; রাজতন্ত্র ও পুরোহিততন্ত্রের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব; ধর্মের আচার অনুষ্ঠানসর্বস্ব অন্তঃসারহীনতার বিরুদ্ধে বিবেকের বিদ্রোহ-এখানে যা নবী যেরেমিয়ার প্রত্যাদেশে উচ্চারিত; সংক্ষেপে রাজতন্ত্র, পুরোহিততন্ত্র ও নবী—এই ত্রিমুখী সংঘাত য়িহুদী সমাজের বৈশিষ্ট্য—তার নিখুঁত বিশ্লেষণ এখানে সমুপস্থিত।
অপরদিকে বিজেতারা যেরেমিয়ার ভবিষ্যদ্বাণীর যে-সুযোগ গ্রহণ করেছিল তার প্রতিদান নবী যেরেমিয়াকে দেয়ার জন্য আগ্রহ থেকে য়িহুদী চরিত্রের ট্র্যাজেডিকে আরও গভীর করেছে। নবী যেরেমিয়ার বিলাপের মধ্যে (উপন্যাসের শেষ অধ্যায়) এক সংশয় আর দ্বিধার পদধ্বনি শোনা যায়। এর মূলে রয়েছে
: “The task entitled for him desparate loneliness, hatred and persecution… sufficient torment to a man of shrinking and sensitive temperament. But further he was tortured at times by doubt of his inspiration. Was he but self-deceived of God? এই সংশয় থেকে উত্তরণ ঘটে… In his ultimate peace in God an Victory over “fears without and fighting within.” এখানেই আমরা ধর্ম-বিশ্বাসের আধুনিক যুক্তিবাদে উপস্থিত হই।
বাইবেলের চরিত্রগুলোকে উপন্যাসের মানুষের রক্তমাংসের রূপ দেয়া, শোকহীন, হৃদিহীন স্বর্গকে ধরার সুখ-দুঃখের রসে মণ্ডিত করার প্রতিভাই নয় তার মূল তাৎপর্যকে উদ্ঘাটন করে এ কালের পারানির নৌকায় তুলে দিয়েছেন লেখক। এর পটভূমিতে রয়েছে আকাশের মত বিশাল মানবেতিহাসের আধারে সমাজের ক্রমবিকাশের বহতা নদীর গতিধারা ও তার বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটন।
এই কারণেই এ ধরনের উপন্যাসের ভূমিকা লেখা দুরূহ। এর জন্য দরকার প্রখর ইতিহাস চেতনা ও মানব সমাজের বিবর্তনে বিভিন্ন শ্রেণীর ঐতিহাসিক ভূমিকা কোন্ পরিবেশে কিভাবে উদ্ভূত হয়েছে ও বিলয় প্রাপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে তার সম্যক জ্ঞান। এছাড়া এ যাবৎ লেখকের প্রকাশিত উপন্যাস, কিংবা উপন্যাসের অন্যান্য পাণ্ডুলিপির মধ্যে বইখানি রচনার প্রসাদগুণে, অথচ প্রাচীন কাহিনীর বর্ণনায় ভাষার গথিক রীতিকে-সর্বত্র সমভাবে নির্বাধ করে দেয়ার সার্থকতায় সর্বশ্রেষ্ঠ। লেখকের এই ভাষাশৈলীর সাথে হাওয়ার্ড ফার্স্টের স্পার্টাকাসের ভাষারীতি তুলনীয়। লেখকও এর শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে নিঃসন্দেহ-অহঙ্কারে আত্মস্ফীত হয়ে নয়—ইতিহাস সচেতন ও মনননিষ্ঠ অকপট ভাষণের ফলশ্রুতি হিসেবে। অথচ এর কোনরূপ ভূমিকা লেখা আমার পক্ষে একান্তই ধৃষ্টতা। এটা বিনয় প্রকাশের কোন চিরাচরিত প্রথা হিসেবে বলছি না। এটা হল আমার স্বীকারোক্তি। কারণ আমি একথা মানি, আমাদের অনবধানতা ও অক্ষমতা অহঙ্কারের মতই বেশি। দীর্ঘকাল ধরে বইটির পাণ্ডুলিপি আমার কাছে পড়ে ছিল। মনে মনে দুরাশা ছিল এই বইয়ের উপযুক্ত ভূমিকা লেখার জন্য লেখকের উপস্থিতি ঘটবে আমাদের মধ্যে। কিন্তু আরো বহু আশার মত এটাও নিস্ফলে মাথা কুটে কুটে মরেছে। প্রকাশকের তাগিদ ছিল সাত দিনের মধ্যে ভূমিকা শেষ করার। কিন্তু সাহসে কুলায় নি। নিরুপায় হয়েই শেষপর্যন্ত বসতে হয়েছে। এর মধ্যে সাত আট মাস পার হয়ে গেছে। যুদ্ধক্ষেত্রে সন্তানকে পাঠিয়ে দিয়ে চিঠি না পেলে মায়ের যে উৎকণ্ঠা-
লেখকের সেই উদ্বেগ মাঝে মাঝে পত্রালাপে প্রকাশ পেয়েছে প্রকাশকের কাছে
: ‘কবে বই বেরুবে’। সুতরাং দেখা গেল আমার ত্রুটি দ্বিবিধ
: প্রথমতঃ, ভূমিকার নামে যা লিখেছি তা মুখবন্ধ না হয়ে অনেকেরই মুখবন্ধ করার জন্য উপযুক্ত। দ্বিতীয়তঃ, দীর্ঘসূত্রিতার আশ্রয় নিয়েছি—
যদিও পরিত্রাণের আশায়; নিজের অক্ষমতার স্বাক্ষর মুদ্রিতাক্ষরে না দেখার ভীরুতায়।
তাই উপসংহারে একথা সংকোচের সাথেই বলছি, ভূমিকার উদ্দেশ্য যদি ব্যর্থ হয় তার জন্য আমিই সর্বাংশে দায়ী। লেখকের সাহায্য ও প্রকাশকের ধৈর্যের উপযুক্ত মূল্য আমি দিতে পারি নি।
সন্তোষ গুপ্ত
১লা বৈশাখ, ১৩৭৪
.
সত্যেন সেন
জন্মঃ সোনারঙ গ্রাম, মুন্সিগঞ্জ, ১৯০৭। সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদ, পিতা: ধরনীমোহন সেন। সোনারও স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য কলকাতায় গমন। সেখানে যুগান্তর দলের বিট্রিশবিরোধী গোপন রাজনৈতিক তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত হন। আই.এস.সি এবং বি.এ. পাস করার পর ইতিহাসে এম.এ ক্লাসে ভর্তি হন।
ছাত্রজীবন শেষ হতে না হতেই তাঁর জেলজীবনের শুরু। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি রাজবন্দি হিসেবে বিভিন্ন জেলে আটক থাকেন। জেলে বসেই তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে এম.এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এবং পরে শান্তিনিকেতনে গবেষণাবৃত্তি লাভ করেন। শান্তিনিকেতনে প্রবেশ না করে সমাজতন্ত্রের পক্ষে মেহনতি মানুষকে সংগঠিত করার জন্য সোনারঙে প্রত্যাগমন করেন। ১৯৩১ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত তিনি কৃষক আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি সমাজের নিচুতলার মানুষের দুঃখদুর্দশা আশা আকাঙ্ক্ষাকে সাহিত্যে প্রতিফলনের জন্য প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন এবং বহু গণসংগীত রচনা করেন।
১৯৪৯ সালে তিনি আবার গ্রেফতার হন এবং ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কারাগারে আটক থাকেন। কিছুদিন মুক্ত থাকার পর ১৯৫৪ সালে তিনি আবার কারাবরণ করেন এবং ১৯৫৫ সালে মুক্তি পান। ১৯৫৮ সালের অক্টোবর থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন। ১৯৬৫ সালে পুনরায় গ্রেফতার হন এবং ১৯৬৭ সালের শুরুতে মুক্তি পান। কারান্তরালেই তিনি অধিকাংশ বই লেখেন।
প্রধানত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত সত্যেন সেনের সাহিত্য-কৃতীর উল্লেখযোগ্যতা অনস্বীকার্য। উপন্যাসে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন ১৯৭০ সালে। ১৯৮১ সালের ৫ জানুয়ারি এই চিরকুমার মানবদরদী সাহিত্যিক পরলোক গমন করেন।



Leave a Reply