অভিশপ্ত নগরী – ৫

পাঁচ

অহিকমের বিশ্রাম নেই। মাত্র একটি দিন। ঘটনার প্রবাহ অত্যন্ত দ্রুতবেগে ছুটে চলেছে। অহিকমের মনে হচ্ছে তিনি যেন তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলতে পারছেন না। পথে ঘাটে যাদের সঙ্গে দেখা হয় তাদের চোখে মুখে একই কথা। নগরবাসীরা যেন আর সব কথা ভুলে গেছে। একই কথা নিয়ে কানাকানি। চোখে চোখে সেই একই ইশারা আর ইঙ্গিত।

পথের মোড়ে মোড়ে রাজভৃত্যেরা রাজকীয় ঘোষণাবাণী পাঠ করছে : নবী বলে অভিহিত বিন্নামিন প্রদেশের এ্যানাথোথ-নিবাসী হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়াকে দেশদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে। ধর্ম ও রাজার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদকারী এবং নগরের শান্তি ও নিরাপত্তা-ভঙ্গকারী হীনমতি এই যেরেমিয়া প্রাণভয়ে এই নগরের মধ্যেই আত্মগোপন করে আছে। নগরবাসীদের যে তাঁর সন্ধান দিতে পারবে, তাকে পুরস্কৃত করা হবে।

ঘোষণাকারীদের ঘিরে লোকের ভীড় বেড়ে চলেছে। তারা ঘোষণা শুনছে আর অর্থসূচক ভঙ্গিতে মাথা নাড়ছে। নানা জনে নানা কথা বলছে, : তাঁকে ওরা কোথায় পাবে? প্রভু যাকে রক্ষা করেন, রাজার হাত সেখানে পৌঁছতে পারে না

: যেরেমিয়া সর্বত্যাগী, নিজের জন্য তিনি কিছুই চান না। আমাদের মত দুঃখী মানুষের জন্যই তিনি তাঁর জীবন পণ করেছেন। তাই অত্যাচারী রাজা আর পেটমোটা যাজকের দল তাঁকে হত্যা করে আপনাদের পথ পরিষ্কার করে নিতে চাইছে।

: চুপ, চুপ চুপ, মনের কথা মনেই চাপা দে। রাস্তা ঘাটে এসব কথা বলতে নেই। এ কথা যদি ওদের কানে যায়, তবে আর রক্ষা থাকবে না।

: আরে রেখে দে, অত ভয় কিসের? মরতে তো একদিন হবেই।

: যিহোবার নাম নিয়ে এই অনাচার আর কতদিন চলবে? যিহোবা কি নেই? তিনি কি সব কিছু দেখছেন না? ওরা ভেবেছে কি? এমনি করে নিজেদের সর্বনাশ নিজেরাই ডেকে আনবে।

: আমরা অনেক সহ্য করেছি কিন্তু তারও তো একটা সীমা আছে। আমরা আর সহ্য করব না। ওরা যদি নবী যেরেমিয়ার গায়ে একটি আঙ্গুল ছোঁয়ায় আমরা চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখব না। হ্যাঁ, আমরাও প্রাণ দিতে জানি।

কত লোকে কত কথাই না বলছে! অহিকম পথে পথে ঘুরে ঘুরে কান পেতে শুনছেন, আর চোখ মেলে দেখছেন। নগরের রং যেন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। নগরবাসীদের চোখে মুখে সংকল্পের দৃঢ়তা ফুটে উঠছে

: ‘যেরেমিয়া আমাদের মানুষ, তাঁকে আমরা মরতে দেব না। কিছুতেই না।’ এই একটি কথা সকলের মনের কথা। কি মন্ত্র জানে সেই আত্মভোলা নিঃসম্বল যেরেমিয়া, কোন্ গুণে সে এদের এমন করে বশ করে নিয়েছে? অহিকম অবাক হয়ে ভাবেন মনে মনে, এত শক্তি ছড়ানো রয়েছে নগরের পথে পথে! এই নগরীর সাধারণ মানুষের এত বীর্য এতদিন কোথায় লুকিয়ে ছিল? আজ মনে হচ্ছে, এতদিন লোকপ্রধান থেকেও লোকের যথার্থ পরিচয় লাভ করতে যেন অনেক বাকী ছিল তাঁর। এরা তো লোকপ্রধান নয়, এরা যে লোক।

বেলা বাড়তে লাগল। আবহাওয়া উত্তপ্ত হয়ে উঠল। উত্তেজনাও ক্রমেই উঁচু গ্রামে উঠতে লাগল। রাজভৃত্য ও শান্তিরক্ষকদের কর্মব্যস্ততা ও চঞ্চলতা অস্বাভাবিক রকম বেশী দেখা যাচ্ছে। ওরা কি কোন রকম অশান্তির আশঙ্কা করছে?

অহিকম ঘরে ফিরলেন। এখনও অনেক কাজ বাকী। তাঁর অনুরক্ত প্রচারকের দল নগরময় ছড়িয়ে পড়েছে। সমস্ত নগর যেন কানাকানি করে কথা বলছে। এ পর্যন্ত যেটুকু সংবাদ পেয়েছেন, তাতে মনে হয় ওদের কাজ ভালই চলছে। অবস্থা গরম হয়েই আছে প্রয়োজন একটু স্ফুলিঙ্গের। কিন্তু অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে গুনে গুনে পা ফেলতে হচ্ছে। বিপদ পদে পদে। রাজার লোকেরা আর মন্দিরের সেবকরা শিকারী কুকুরের মত গন্ধ শুঁকে শুঁকে ফিরছে। ঘরে ফিরে এসে যা দেখলেন, অহিকমের চক্ষুস্থির। দলে দলে লোক লোকপ্রধানদের সঙ্গে দেখা করতে আসছে। তারা বলে, আপনারা লোকপ্ৰধান, আপনাদের প্রধান বলে আমরা মান্য করি। কিন্তু যিরূশালেমের এই দুর্দিনে আপনারা এমন নিশ্চেষ্ট হয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছেন কেন? এত রক্ত পান করেও রাজাদের তৃপ্তি হয় নি? এবার যিহোবার নিজের মানুষ যেরেমিয়াকে হত্যার চক্রান্ত চলছে। নবী যেরেমিয়া যদি সত্য সত্যই ধরা পড়েন, আর তাঁর বিচার হয়, তাহলে আপনারা লোকপ্রধানেরা তখন তাঁর পক্ষে থাকবেন কিনা, আপনাদের মুখ থেকে এ কথা আজ আমরা স্পষ্ট করে শুনে নিতে চাই।

শান্ত ভেড়ার মত নিরীহ লোকগুলো এমন করেও কথা বলতে পারে! অবস্থা দেখে লোকপ্রধানদের মুখ চুন হয়ে গিয়েছে। এ সমস্ত খবর যদি রাজার কাছে বা মন্দির-প্রভুদের কাছে গিয়ে পৌঁছায়, তখন যেরেমিয়ার ভবিষ্যৎ যাই হোক আর না হোক তাদের নিজেদের অবস্থাটা হবে কি? আর এ সমস্ত খবর কি কখনও চাপা থাকে? ওদের চরেরা কোথায় নেই? উপরওয়ালারা নিশ্চয় মনে করবেন, এই লোকপ্রধানেরাই লোকগুলোকে উসকিয়ে তুলছেন। রাজা যিহোয়াকীম কি আর তা নিঃশব্দে সহ্য করে যাবেন? কোথা থেকে এক বিপত্তি এসে ঘাড়ে চাপল? লোকপ্রধানেরা এতদিন নিশ্চিন্ত মনে মোড়লী করে এসেছেন, কিন্তু তার মধ্যে-যে এত ঝামেলা থাকতে পারে সে কথা কে জানত? এখন এই মারমুখো লোকগুলোকে তাঁরা কি বলে বুঝ দেবেন? অবস্থা বেগতিক বুঝে তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বাড়ি নেই বলে অন্তঃপুরে আশ্রয় নিলেন, কেউ বা রোগশয্যায় শয়ান হলেন। অহিকমের দুয়ারেও লোকের ভীড়। অহিকম তাদের বুঝিয়ে বললেন

: দেখুন, লোকপ্রধান বলুন আর যাই বলুন, আমরা সামান্য প্রাণীমাত্র। এ যুগে আমাদের বিন্দুমাত্র ক্ষমতা নেই। যেখানে গেলে সত্যিকারের কাজ হবে সেই রাজা আর মন্দিরের কর্তাদের কাছে গিয়ে বলুন। তারা বলল

: হ্যাঁ, আমরা যাব। যখন সময় আসবে তখন যাবই তো। আর যখন যাব, যাওয়ার মত করেই যাব, কিন্তু আপনারা তো আর রাজভৃত্য নন, আপনারা আমাদেরই মানুষ। আমাদের দশ জনকে নিয়েই আপনাদের চলতে হবে। সেই কথাটাই আপনাদের জানিয়ে দিতে এলাম।

অহিকম স্থির দৃষ্টিতে তাদের মুখের দিকে তাকালেন। এর মধ্যে কাউকে তিনি চেনেন। একজনের পর একজন সবার মুখের উপর দিয়ে তিনি তাঁর দৃষ্টি বুলিয়ে নিলেন। কিন্তু এক জায়গায় এসে তাঁর চোখ যেন আটকে গেল। ওই- যে লোকটি পেছন দিকে গলাটা লম্বা করে দাঁড়িয়ে আছে, তিনি-যে চেনেন, হ্যাঁ চেনেন তিনি ওকে। কিন্তু ঠিক মনে করতে পারছেন না, কোথায় ওকে দেখেছেন। কোথায়? কোথায়?-মুহূর্তে অন্ধকারের মধ্যে পরিচিতির বিদ্যুদ্দীপ্তি ফুটে উঠল। হ্যাঁ, এইবার তিনি চিনেছেন। ওই-যে ওর ঠোঁটের ধারে লম্বা কাটা দাগটা, যা ওর মুখের উপর একটা ক্রুরতার ছাপ এঁকে দিয়েছে, ওই দাগটাই চিনিয়ে দিয়েছে ওকে। আশ্চর্য পশহুরের একজন বিশ্বস্ত অনুচর। লেবীয় সম্প্রদায়ের লোক। পবিত্র মসিনার কাপড় ছেড়ে সাধারণ নাগরিকদের পোশাকে দিব্যি তাদের সঙ্গে মিশে গিয়েছে। কিন্তু ঠোঁটের ওই কাটা দাগটা সে গোপন করতে পারে নি

অহিকম বুঝলেন, পেছনে মাছি লেগেছে। এ মাছি মন্দিরের মাছি। রাজপ্রাসাদের মাছিরাও-যে এর মধ্যে নেই, এমন কথাই বা কে বলতে পারে?

এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই, ছায়ালোকের অধিবাসীরা পদে পদে তাঁকে অনুসরণ করে চলছে। হুঁশিয়ার অহিকম, হুঁশিয়ার। যে ঐশ্বর্য তুমি তোমার পাতালঘরে লুকিয়ে রেখেছ, এই একটি দিন তাঁকে চোখের মণির মত সযত্নে রক্ষা করে চলতে হবে। এই একটি দিন, এখনও অনেক কাজ বাকী। তারপর আগামী কাল। আগামীকাল একটি নতুন ও চমকপ্রদ দৃশ্য উদ্‌ঘাটিত হবে, এ বিষয়ে তাঁর মনে কোনই সন্দেহ ছিল না। যে-সমস্ত সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে, সবই অনুকূলে।

জিল্লাকে ডেকে বললেন, শোন জিল্লা, খুব সাবধান। ওরা চারদিকে জাল ফেলেছে। সে জাল আমাদেরও ঘিরে ফেলেছে। আমাদের বাড়ির আনাচে কানাচে ওদের আনাগোনা শুরু হয়ে গেছে। সাবধান, দাস-দাসীরা যেন ঘুণাক্ষরেও জানতে না পারে। আজকের এই দিনটির মত পাতালঘরের তোমার প্রিয় বন্ধুটিকে রক্ষা করে চলবার দায়িত্ব তোমার।

জিল্লা চমকে উঠলেন। চোরের চমক। পরক্ষণেই আপনাকে সংযত করে ঠোঁটের আগায় একটু মিষ্টি হাসি টেনে এনে বললেন, প্রিয় বন্ধু আমার না তোমার?

অহিকমের চোখ দুটি সুমিষ্ট কৌতুকে হেসে উঠল। জিল্লার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগলেন।

: আমাদের দু’জনেরই। এবার কোন আপত্তি নেই তো? ভুল বলেছি আমি? জিল্লা স্থির দৃষ্টিতে অহিকমের মুখের দিকে তাকালেন। অহিকম কিন্তু আর কোন কথাই বললেন না। শুধু তাঁর চোখ দুটি হাসতে লাগল। আস্তে আস্তে জিল্লার চোখের পাতা দুটি নেমে এল।

: তোমার আর কিছু বলার আছে প্রিয়?

: না, কিছুই নেই।

: কিছু নেই? কেন নেই? যদি বলার কিছু থাকেই, মন খুলে বলে ফেলাই কি ভাল নয়?

: না, আমার বলার কিছুই নেই। কেন মিছে ভাবছ জিল্লা? আমি ওকে এত বেশী ভালবাসি যে, ঈর্ষা করার কথা ভাবতেই পারি না। ও কি মানুষ? ও-যে- ঈর্ষা দ্বেষের সীমানার বাইরে। আর ওকে না ভালবেসে পারা যায় না। ও যেন কি যাদু জানে।

: কিন্তু-

: না, কিন্তু নয়। আজ তোমার কাছ থেকে কোন ‘কিন্তু’ আমি শুনতে চাই না। জিল্লা, আজ আমরা অতিক্রান্ত-যৌবন, প্রবীণ, সন্তানের জনক-জননী, কত বিচিত্র অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই সংসারের সঙ্গে আমাদের পরিচয় লাভ ঘটেছে। আজ সেই সুদূর শিশু-যৌবনের আনন্দ বেদনায় উজ্জ্বল দিনগুলোকে যদি একটু সস্নেহ প্রশ্রয়ের হাসিতে বরণ করে নিতে না পারি তবে মিথ্যা আমাদের এই ভালবাসা।

জিল্লা কাঁপতে লাগলেন যেন আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেন না। হঠাৎ উচ্ছ্বসিত হয়ে অহিকমের বুকের উপর ভেঙ্গে পড়লেন, গুন গুন করে গানের মতই গুঞ্জন করে চললেন। প্রিয়, তুমি এত মহৎ, এত সুন্দর! তোমার এই উদার প্রশস্ত বুকে আমাকে একটু প্রাণভরে কাঁদতে দাও। আমি বহু দুঃখ পেয়েছি, অনেক অশ্রু আমার এই বুকে জমে আছে। তোমার এই বোঝা আমাকে একটু নামাতে দাও।

: আঃ কর কি, কর কি জিল্লা, ওরা দেখবে যে।

: দেখুক।

অহিকম অবাক হয়ে ভাবছিলেন, এ সংসারে একদিকে রাজত্ব, প্রভুত্ব আর ধর্মের নামে চলেছে প্রাণ নিয়ে নিষ্ঠুর হানাহানি, ষড়যন্ত্র, শোষণ, লুণ্ঠন, অত্যাচার, ব্যভিচার। আর তারই এক পাশে অন্তঃশীলা নদীর মত প্রেমের ধারা বয়ে চলেছে জীবনের দুই কূল সঞ্জীবিত করে, এর মধ্যে সামঞ্জস্য কোথায়? কিন্তু এই দার্শনিক সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামাবার মত সময় নেই। অহিকম আবার বেরিয়ে পড়লেন। রাজপথ তাঁকে ডাকছে। পথ দিয়ে কয়েকজন লোক কথা বলতে বলতে এগিয়ে আসছিল। অহিকম ডাকলেন, য়ুসুফ, য়ুসুফ শোনো। ওদের মধ্য থেকে একটি যুবক সামনে এগিয়ে এল। বছর ত্রিশেক বয়স হবে।

: তোমার বন্ধুদের বিদায় করে দিয়ে চট করে ওই খাবারের দোকানটায় চলে এস য়ুসুফ।

: এক্ষুনি আসছি।

অহিকম খাবারের দোকানটায় ঢুকে পড়লেন। কিছু খাবার আর দ্রাক্ষারসের ফরমায়েস করবার সঙ্গে সঙ্গেই য়ুসুফ তাঁর পাশের আসনে এসে বসে পড়ল।

: তারপর, তোমরা সব তৈরি তো?

: সব ঠিক আছে, কোন চিন্তা করবেন না।

: ধর কাল সকালেই যদি তিনি ওদের হাতে ধরা পড়ে যান? চমকে উঠল য়ুসুফ। কাল সকালেই? কখন? কোথায়?

: এই দেখ, যে-কথা কেউ জানে না সে কথা আমি কেমন করে বলব? আমি বলছি একটা কথার কথা।

গলার সুর নামিয়ে য়ুসুফ ধীরে ধীরে বলল : লোকে বলে লোকপ্রধান নাকি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু। কেউ কেউ এমন পর্যন্ত মনে করে থাকে, তাঁর সম্পর্কে যে-কথা কেউ জানে না, লোকপ্রধানের হয়তো বা তেমন কথাও জানা থাকতে পারে।

: বটে, কি সর্বনেশে লোক সব। এখন বুঝি আবার আমার পেছনে লেগেছ? পাগল হয়েছ তোমরা! নবী যেরেমিয়ার আবার বন্ধু! একমাত্র যিহোবা ছাড়া আর কাউকে চেনেন নাকি তিনি? আমি বলছিলাম, ধর হয়েই যদি যায়। সব রকম অবস্থার জন্যই তৈরি থাকতে হবে তো।

য়ুসুফ হাসিমুখে উত্তর দিল

: বেশ ধরেই নিলাম, কাল সকালে হয়েই যদি যায়?— হ্যাঁ, তবু আমরা তৈরি আছি।

: বেশ, কত লোক জড় করতে পারবে?

: অত অঙ্ক কষে বলতে পারব না। তবে হ্যাঁ, এ কথা বলতে পারি, আমরা নিজেরা যদি অন্তত শ’খানেক লোকও যোগাড় করতে পারি, হাজার লোক নাকি এমনিতেই আমাদের সঙ্গে এসে যোগ দেবে। লোকের মনের ভাবটা দেখেছেন, অনেক দিনের জমানো রাগ। ক্ষেপে আগুন হয়ে আছে।

: কিন্তু একটা কথা য়ুসুফ, কোন রকম দাঙ্গা হাঙ্গামা বাধাতে পারবে না। লোকপ্রধানেরা মুখে যে যাই বলুন না কেন, মনে মনে তোমাদের সঙ্গেই আছেন এ কথাটা ভুলে যেও না। মাথা গরম করে যা তা একটা কিছু যদি করে বস, তাহলে তোমরা কিন্তু তাঁদের সমর্থন হারাবে।

: না, না, হাঙ্গামা করবার কি দরকার আমাদের? তবে একটা কথা, ওরা যদি আগে এসে হামলা করে বসে, তখন-যে কি হবে, এটা কিন্তু কেউ বলতে পারে না।

: না, না, ওরা তা করবে না। আমার এই কথাটা তুমি বিশ্বাস করতে পার।

: বেশ, তাহলে আমরাও কিছু করব না।

য়ুসুফ চলে গেল। দোকানের সামনের দিকে একটি লোক বসে ছিল, সেও সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। একটু খটকা লাগল অহিকমের মনে। আবার নিজের মনেই তিনি ভাবলেন যে, আজ অতিরিক্ত মাত্রায় সন্দেহ রোগে ভুগছেন না তো?

সন্ধ্যা হয় হয়। অহিকম দোকান ছেড়ে পথে নামলেন। কয়েক পা এগোতেই কে যেন পেছন থেকে নাম ধরে ডাকল-লোকপ্রধান, যিহোবা আপনার মঙ্গল করুন।

অহিকম পেছন ফিরে চেয়ে দেখলেন হশরিয়ের পুত্র কাদমিয়েল। রাজার অতি বিশ্বস্ত অনুচর, কাদমিয়েল। সবার কাছেই পরিচিত। ‘যিহোবা আপনার মঙ্গল করুন’, অত্যন্ত অপ্রসন্ন চিত্তে অহিকম তার এই সম্ভাষণের প্রত্যুত্তর দিলেন। জোঁকের মত এরা যেন তাঁরই সঙ্গে আটকে আছে, মুহূর্তের জন্যও ছাড়তে চায় না।

: লোকপ্রধানকে এ ক’দিন যেন একটু অতিমাত্রায় ব্যস্ত দেখা যাচ্ছে? কাদমিয়েলের কথার ভঙ্গীটা বাঁকা।

: ঠিকই বলেছেন। ফসল ওঠবার সময় প্রতি বছরই এই অবস্থা। এই সময়টা চোখে মুখে আর পথ দেখা যায় না।

: বাড়িতে আপনার বাজে লোকের উৎপাত বড় বেশী। একটু শান্তিতে থাকতে দেয় না, না? ওদেরও তো একটু বিবেচনা থাকা উচিত।

: লোকপ্রধান হলে লোকের ঝামেলা একটু পোয়াতে তো হবেই। আমার অসুবিধা হচ্ছে বলে তাদের তো আর ফিরিয়ে দেওয়া যায় না।

: তা অবশ্য যায় না। একটা জিনিস কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, লোকপ্রধানেরা সম্প্রতি আগেকার দিনের চেয়ে অনেক বেশী সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। এ সম্বন্ধে নানা লোকে নানা কথা বলছে। সেদিন মন্দিরের লোকেরা বলাবলি করছিল, লোকপ্রধানেরা নাকি অতি উৎসাহের ঝোঁকে তাঁদের নিজেদের সীমানা ডিঙ্গিয়ে চলছেন।

: উঁচু মহলে আজকাল আমাদের নিয়ে এই ধরনের কথাবার্তাই চলছে বুঝি? কাদমিয়েল বিনয়ে একেবারে গলে পড়ল।

: দেখুন আমরা সামান্য বেতনভোগী রাজভৃত্য। উঁচু মহলের আলাপ আলোচনা তো আমাদের জানবার কথা নয়। আর উঁচু মহল বলতে আমরা যা বুঝি আপনারা লোকপ্রধানরা তো তারই একটা অংশ। আপনি বুঝি তা থেকে বাইরে থাকতে চান?

তার কথা শেষ হবার আগেই কাদমিয়েল সশব্দে হেসে উঠল। অহিকম আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, হাসলেন যে, কি হয়েছে?

: আপনারা লোকপ্রধানেরা আজকাল বুঝি অনুচর ছাড়া এক পাও চলেন না? এর পরেও উঁচু মহল থেকে বাইরে থাকতে চান?

: তার মানে?

: পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখুন তাহলেই মানেটা বুঝতে পারবেন। অহিকম পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, সেই ঠোঁটকাটা মন্দিরের লোকটা তাঁর পেছন পেছন আসছে। হঠাৎ তাঁকে ফিরে দাঁড়াতে দেখে লোকটা থতমত খেয়ে থেমে গিয়ে অন্যদিকে মুখ ফেরাল।

কাদমিয়েল আবার হেসে উঠল। অহিকমও হাসলেন। অহিকম বললেন : হৃতগৌরব লোকপ্রধানদের মর্যাদা আপনারাই বাড়িয়ে দিলেন। কিন্তু আমাকে এখনই বাড়ি ফিরতে হবে। যিহোবা আপনার মঙ্গল করুন।

কাদমিয়েলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অহিকম দ্রুত পা চালিয়ে দিলেন। ব্যাপারটা তাঁর কাছে কিছুটা দুর্বোধ্য বলেই মনে হচ্ছিল। মন্দির আর রাজপ্রাসাদ দু’দিক থেকেই তাঁর উপর নজর পড়েছে। কিন্তু একটা জিনিস বিশেষভাবে লক্ষ করবার মত। এই দুই পক্ষের পরস্পরের মাঝখানে কেমন যেন একটা গরমিল দেখা যাচ্ছে। দু’পক্ষের ভিতরকার ঠোকাঠুকিটা তো আর আজকার নয়। এ-যে ঐতিহাসিক ধারা বেয়ে চলে আসছে। সে-সব কথা অহিকমের অজানা নয়। কিন্তু বর্তমান ক্ষেত্রে যেরেমিয়ার ব্যাপারে এই দু’পক্ষ তো একপক্ষ। কিন্তু এই জায়গাতেও কি ওরা ঠিক গায়ে গায়ে মিলতে পারছে না? কেন? এর অর্থই বা কি?

যে যাই হোক, এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই যে, দু’পক্ষই তাঁকে পায়ে পায়ে ছায়ার মতই অনুসরণ করে চলেছে।

ঘরে বাইরে যেখানেই যান না কেন, ওদের এড়িয়ে চলবার উপায় নেই। একটা দারুণ অস্বস্তির সঙ্গে তিনি অনুভব করতে লাগলেন, ওরা যেন তাঁর চারদিকে জালটা ক্রমেই গুটিয়ে নিয়ে আসছে। আজকের দিনটা ভালোয় ভালোয় কাটবে তো?

একবার পেছন ফিরে দেখলেন। ঠোঁটকাটা লোকটা খসে পড়েছে। খসে কি আর সত্যিই পড়েছে? একটু আড়ালে আছে হয়তো। কাদমিয়েল কোথায় তাই বা কে বলবে! অন্ধকার গাঢ় হয়ে আসছে। জায়গা নির্জন। অহিকম এইবার একটু স্বস্তিবোধ করলেন। এতক্ষণে দুষ্টগ্রহের হাত থেকে বোধ হয় মুক্তি পেয়েছেন।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই। সেই মুহূর্তেই, কোথায় ওৎ পেতে বসে ছিল কে জানে, কয়েকটা লোক ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে জাপটে ধরল। আচমকা এভাবে আক্রান্ত হয়ে অহিকম আত্মরক্ষার সামান্য চেষ্টাটুকুও করতে পারলেন না। প্রতিরোধের শেষ চেষ্টায় শুধু একটা অস্ফুট আর্তনাদ তাঁর কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে মাথায় প্রচণ্ড একটা আঘাত পড়ল। তাঁর সমস্ত শরীর ঝিম ঝিম করতে লাগল। অচৈতন্যের ঘোরে ক্রমশঃই তিনি তলিয়ে যেতে লাগলেন।

কিন্তু তবু তিনি পুরোপুরি জ্ঞান হারান নি, চেতন-অচেতনের সীমান্তে অবস্থান করছিলেন। সেই অবস্থাতেও বুঝতে পারছিলেন, ওরা কাপড় দিয়ে তাঁর মুখ বাঁধছে। তারপর ওরা ক’জন তাঁকে কাঁধে নিয়ে ছুটে চলল। কারা এরা? কোথায় নিয়ে চলেছে তাঁকে? কেন? হঠাৎ দৃশ্যের রূপান্তর ঘটল, ঘোড়ার খুরের খট্ খট্ শব্দ। কারা যেন ওদের ঘিরে ধরেছে। কে যেন চিৎকার করে কি বলল, আর তাঁর বাহকেরা তাঁকে পথে নামিয়ে রেখে ছুটে পালিয়ে গেল। কারা যেন তাঁকে টেনে ঘোড়ার উপর তুলছে। তারপর ঘোড়াটা ছুটল। কে যেন তাঁকে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। কিন্তু মাথায় বড় যন্ত্রণা। যন্ত্রণাটা ক্রমশঃই বাড়ছে। তিনি আরও আরও গড়িয়ে তলিয়ে যেতে লাগলেন। পাতাল- ঘর-যেরেমিয়া-জিল্লা-তারপর? তারপর সীমাহীন অন্ধকার।

অহিকম যখন চোখ মেললেন তখন দেখলেন ঘরটি একেবারেই অপরিচিত কিন্তু তাঁর সামনে যে-লোকটি বসেছিল, সে তাঁর খুবই পরিচিত। চিনতে দেরী হল না- কাদমিয়েল। হশরিয়ের পুত্র কাদমিয়েল। অহিকম উঠে বসলেন। কাদমিয়েল একটু উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, একি, উঠে বসলেন কেন?

অহিকম অধৈর্যের সঙ্গে বলে উঠলেন, একি, আমি এখানে কেন? পরক্ষণেই তাঁর সব কথা মনে পড়ে গেল।

: ও, আপনিই বুঝি আমাকে বন্দী করে নিয়ে এসেছেন?

: সে কথা আর বলবেন না। কি দুর্ভোগের মধ্যেই পড়েছিলেন আজ। ভাগ্যিস ঘটনাচক্রে ঠিক সেই সময়টায় আমরা সেখানে গিয়ে পড়লাম। যিহোবা সদয়, তাঁরই অনুগ্রহে আপনাকে ওদের হাত থেকে মুক্ত করে নিয়ে আসতে পেরেছি। তা না হলে-

: মুক্ত? আমি কি মুক্ত? আপনার কথাই যদি সত্য হবে তা হলে আমি আমার নিজের ঘরে নেই কেন?

: কেন মিছে আপনি ভাবছেন? নিজের ঘরের মতই নিরাপদ স্থানে আপনি আছেন। আপনার সঙ্গে আমাদের একটু প্রয়োজন আছে। সেইটুকু মিটে গেলেই আপনাকে আপনার গৃহে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

: প্রয়োজন? আমার সঙ্গে আপনাদের কিসের প্রয়োজন?

: তাও আপনার অজানা নয়, বলাটা বাহুল্য মাত্র। তবুও বলছি, আপনার বন্ধু নবী যেরেমিয়া গুরুতর অভিযোগে অভিযুক্ত। কিন্তু তিনি তিনদিন থেকে নিরুদ্দেশ। আমরা এ বিষয়ে নিশ্চিত যে, তিনি নগর থেকে বাইরে যেতে পারেন নি, এর মধ্যেই কোথাও আছেন। আমরা এ বিষয়েও নিশ্চিত যে, আপনিই তাঁকে গোপনে আশ্রয় দিয়ে বিচারকার্যে বাধা সৃষ্টি করছেন। রাজার আদেশ, আপনি তাঁকে আমাদের হাতে দিয়ে দিন। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, এজন্য আপনাকে কোন দণ্ডভোগ করতে হবে না। আর বিচারে নবী যেরেমিয়া যদি নির্দোষ বলে প্রমাণিত হন, তবে কেউ তাঁর কেশ স্পর্শ করতে পারবে না।

: আমার সম্পর্কে এ রকম অদ্ভুত ধারণা পোষণ করবার কারণটা কি? আমার সঙ্গে তাঁর সৌহার্দ্য ছিল, এইটাই কি আমার অপরাধ? এই নগরীতে নবী যেরেমিয়ার অনুরাগী লোকের সংখ্যা বড় কম নয়, এ কথাটাও কি আপনারা জানেন না? আপনারা কি সত্য সত্যই মনে করেন যে, আমি তাঁকে আমার গৃহে লুকিয়ে রেখেছি?

: প্রথমে কেউ সেই রকমই সন্দেহ করেছিলেন বটে। কিন্তু পরে আপনার গৃহ তল্লাস করে দেখা গেল, সেই ধারণাটা ঠিক নয়। অত কাঁচা কাজ আপনি করেন নি।

: আমার গৃহে তল্লাস? সে কি? কখন?

: আপনাকে এখানে নিয়ে আসবার পরেই। না, না, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। আপনার পরিবারের কারু উপর কোনরূপ অসম্মান বা অমর্যাদা করা হয় নি। তল্লাসীর ব্যাপারে যতটুকু না করলেই নয় ঠিক ততটুকুই করা হয়েছে।

: আমার অনুপস্থিতিতে আমার গৃহ তল্লাস করা কি আপনাদের উচিত কাজ হয়েছে? একজন লোকপ্রধানের গৃহে যদি এ ভাবে হামলা চলতে পারে তবে সাধারণ নাগরিকদের মানমর্যাদার নিশ্চয়তা কোথায়?

: রাজ্যের স্বার্থরক্ষার জন্য অপ্রীতিকর হলেও অনেক কাজ করতে হয়। কিন্তু দেখুন, আমি তো রাজার সামান্য একজন আজ্ঞাবাহক মাত্র। এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর তো আমার দেবার কথা নয়।

: বেশ, বুঝলাম। কিন্তু প্রথমেই আমাকে যারা আক্রমণ করেছিল, তারা কারা? তাদের কাছেই বা আমি কি অপরাধ করেছিলাম?

: আপনি অভিজ্ঞ ও বিচক্ষণ লোক। আমাকে এ প্রশ্ন না করে আপনি নিজে চিন্তা করলেই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাবেন। কিন্তু আমি কি আজ এই ঘটনা ঘটবার একটু আগেই আপনাকে একবার সতর্ক করে দিই নি?

: তা দিয়েছিলেন। অস্বীকার করব না। কিন্তু সেই সতর্কতায় আমার লাভ কি? আপনিও তো আমার মিত্রপক্ষ নন।

: আপাততঃ তাই মনে হচ্ছে বটে। কিন্তু কোন কথাই জোর করে বলা চলে না। নগরীর আবহাওয়া অত্যন্ত অস্থির। ঘটনার মোড় যে-ভাবে ঘুরে চলেছে, তাতে যে-কোন সময় শক্তি-সমন্বয়ের প্রকৃতি রূপান্তরিত হয়ে যেতে পারে। আজকার এই একটি দিন চিন্তার অনেক নতুন উপাদান সংগ্রহ করে এনেছে।

: আপনার এই কথাটি কিন্তু সামান্য আজ্ঞাবহের মত শোনাচ্ছে না। সে যাই হোক, এখন আপনারা আমাকে নিয়ে কি করতে চান, তাই বলুন।

: আপনার মুক্তি সম্পূর্ণভাবে আপনার ইচ্ছার উপর নির্ভর করছে। আপনি এই মুহূর্তে মুক্তি পেতে পারেন, যদি-

: যদি আমি অসাধ্য সাধন করি, তাই না? যা জানি না, তা বলা আমার পক্ষে, শুধু আমার পক্ষেই বা কেন, কারু পক্ষেই সম্ভব নয়।

: তাহলে আপনাকে কিছুদিন এইখানেই অপেক্ষা করতে হবে। তবে আপনি রাজ-অতিথির মর্যাদায় থাকবেন।

: কত দিন?

: যতদিন নবী যেরেমিয়ার সন্ধান না মেলে। কথা বলতে বলতে কাদমিয়েল হঠাৎ উৎকর্ণ হয়ে উঠল। বাইরে দেউড়ীর কাছে কি একটা শোনা যাচ্ছিল। একটু বাদেই একজন প্রহরী দৌড়ে এসে ঘরে ঢুকল। কাদমিয়েলকে ঘরের এক পাশে সরিয়ে নিয়ে সে তার কানে কানে কি কথা বলল। সঙ্গে সঙ্গে দু’জনেই ঘর ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেল। অহিকম অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন, হঠাৎ এমন উত্তেজনার কি কারণ ঘটল।

বেশ কিছুক্ষণ বাদে কাদমিয়েল প্রসন্নমুখে ঘরের মধ্যে এসে প্রবেশ করল।

: লোকপ্রধান অহিকম, আপনার জন্য সুসংবাদ।

: সুসংবাদ?

: হ্যাঁ, সুসংবাদ। আপনি মুক্ত। এখনই আপনাকে আপনার গৃহে পাঠাবার ব্যবস্থা করছি। বলুন, এ কি সুসংবাদ নয়? অহিকম কথাটা ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।

: মুক্ত? আপনি কি বলছেন? তবে-যে এইমাত্র বললেন-

: না, আর তার প্রয়োজন হবে না। নবী যেরেমিয়া এইমাত্র নিজেই আমাদের কাছে এসে আত্মসমর্পণ করেছেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *