অভিশপ্ত নগরী – ৪

চার

অহিকমের বিশ্রাম নেই। মাত্র দুটি দিন। এরই মধ্যে যা কিছু করবার করে নিতে হবে। একজন একজন করে সব ক’জন লোকপ্রধানের সঙ্গেই তিনি দেখা করলেন। সকলের মুখেই যেরেমিয়ার কথা। যেরেমিয়ার মৃত্যুদণ্ডের সবাই বিরোধী। ইতিপূর্বে বহু নবীর রক্তপাতে যিরূশালেমের পবিত্র ভূমি কলঙ্কিত হয়েছে। প্রভুর বাণী ঘোষণা করবার অপরাধে ফুলের মত নিষ্পাপ যেরেমিয়াকে হত্যা করা হলে য়িহুদী জাতির পাপের ভরা পূর্ণ হবে। প্রভু আর কত সহ্য করবেন? তাঁর ক্রোধাগ্নির মুখে সব কিছুই তৃণের মত ভস্ম হয়ে যাবে। এই কথাই তাঁরা বলাবলি করেন।

কিন্তু রাজার এই দুষ্ট সংকল্পকে বাধা দিতে পারে এমন শক্তি কার? প্রভুর মন্দিরের সেবকগণ? তারাই তো যেরেমিয়ার বিরুদ্ধে সব চেয়ে বেশী আক্রমণ- মুখর। তারাই তো রাজাকে এ বিষয়ে প্ররোচিত করে চলেছে, এ খবরটুকু আজ আর কারু কাছে অজানা নয়। লোকপ্রধানগণ? তাঁরা তো নামেই প্রধান। কি ক্ষমতা আছে আজ তাঁদের? হ্যাঁ, সে একদিন ছিল যখন লোক-সাধারণের মঙ্গলামঙ্গলের সমস্ত দায়িত্ব তাঁদের হাতেই ন্যস্ত ছিল। কোথায় গেল সে দিন? অহিকম অবাক হয়ে দেখলেন, যেরেমিয়ার ব্যাপারটাকে উপলক্ষ করে একটা বহু পুরানো ঘুমন্ত সমস্যা যেন আবার আস্তে আস্তে মাথা তুলে উঠতে চাইছে। অহিকমের ঘরে লোকপ্রধানেরা মিলিত হয়েছিলেন এক গোপন সভায়। কথার পিঠে কথা বাড়তে বাড়তে শেষকালে সেই সমস্যাটাই যেন আলোচনার কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়াল। লোকপ্রধানদের মধ্যে বয়সে যিনি প্রাচীনতম তিনি বলছিলেন-

: আমাদেরই তো দোষ। একদিন সমাজের সব কিছু ভালমন্দ দেখবার ও বিধিব্যবস্থা করবার ভার তো এই লোকপ্রধানদের উপরেই ছিল। সেদিন কোথায় ছিল রাজা? আর সমস্ত জাতির মধ্যে রাজা ছিল, কিন্তু য়িহুদীরা এক যিহোবা ছাড়া আর কাউকে রাজা বলে মানত না, আর কারু কাছে মাথা নোয়াত না। বিচারপতি শামুয়েলের আমলে আমাদের পূর্বপুরুষদের কি-যে মতিভ্রম ঘটল! তাঁরা দল বেঁধে বৃদ্ধ শামুয়েলকে ঘিরে ধরে বললেন, দেখুন, আপনি বৃদ্ধ হয়েছেন। আপনার পুত্রেরা আপনার পথে চলে না। অন্য অন্য জাতির মত শাসন ও বিচার করবার জন্য আপনি আমাদের একজন রাজা দিন।

: কি বললেন শামুয়েল?

: তিনি বললেন, হায় মন্দভাগ্য, তোমরা এসব কি কথা বলছ? তোমাদের মাথার উপর একজন রাজা আছেন, যিনি সকল রাজার রাজা। তিনি যিহোবা। তিনি তোমাদের শাসন করছেন, পালন করছেন। তিনি থাকতে আবার অন্য রাজার কি প্রয়োজন হল তোমাদের? কিন্তু শামুয়েলের কথা তাঁদের মনঃপূত হোল না। অবুঝের মত মাথা নেড়ে তাঁরা বায়না ধরলেন, না, ওদের সবার রাজা আছে, আমাদেরও রাজা চাই। রাজা না হলে আমাদের চলবে না।

: তারপর? শামুয়েল কি তাঁদের রাজা দিলেন?

: তিনি ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন, আবার তোমরা রাজার কথা বলছ? তোমাদের ভয় নেই? রাজার নিয়ম কি তোমরা জান? তাঁরা বললেন না, আমরা জানি না।

: তিনি বললেন, তবে আমার কাছে শোন। তোমাদের উপর যেই রাজা থাকবেন তাঁর এই নিয়ম থাকবে যে, তিনি তোমাদের নিয়ে আপনার রথ ও অশ্বের জন্য নিযুক্ত করবেন। তারা তাঁর রথের আগে আগে দৌড়াবে। আর তিনি তাদের আপনার সহস্রপতি ও পঞ্চাশৎপতি নিযুক্ত করবেন। আবার কেউ কেউ তাঁর ভূমি চাষ ও শস্য কাটবার কাজে এবং যুদ্ধের অস্ত্র ও রথের সজ্জা নির্মাণ করবার কাজে নিযুক্ত হবে। আর তিনি তোমাদের মেয়েদের নিয়ে তাঁর সুগন্ধ-প্রস্তুতকারিণী, পাচিকা ও রুটিওয়ালীর কাজে নিযুক্ত করবেন। আর তিনি তোমাদের শস্যক্ষেত্র, দ্রাক্ষাক্ষেত্র ও জলপাই গাছগুলোকে আপন দাসদের হাতে সমর্পণ করবেন। আর তোমাদের শস্যের ও দ্রাক্ষার দশমাংশ নিয়ে আপন কর্মচারী ও দাসদের দেবেন। আর তিনি তোমাদের দাসদাসী ও উত্তম যুবা পুরুষদের এবং তোমাদের গাইগুলোকে আপন কার্যে নিযুক্ত করবেন। তিনি তোমাদের মেষসমূহের দশমাংশ গ্রহণ করবেন। সেদিন তোমরা আপনাদের মনোনীত রাজার কারণে উচ্চস্বরে ক্রন্দন করবে। কিন্তু প্রভু সেদিন তোমাদের এই ক্রন্দনে কোন সাড়া দেবেন না।

একজন লোকপ্রধান শামুয়েলের এই কথার সমর্থন করে বললেন, ঠিক কথাই বলেছিলেন শামুয়েল। আজ তো আমাদের সেই দশাই চলছে। আমাদের পূর্বপুরুষেরা সেদিন যে-ভুল করেছিলেন, এখন তার ফল ফলছে। কোন্ প্রয়োজন ছিল আমাদের রাজার? যেন ভিটেমাটি বিক্রী করে গয়না পরবার শখ।

আর একজন প্রশ্ন করলেন, বিচারপতি শামুয়েলের এই কথার উত্তরে কি বললেন আমাদের পূর্বপুরুষেরা?

: তাঁরা কিন্তু এই সুযুক্তিতে কর্ণপাত করলেন না। তাঁরা তাঁদের শক্ত ঘাড় বাঁকিয়ে বললেন, না, আমাদের একজন রাজা না হলেই চলবে না। তবেই আমরা পৃথিবীর আর সকল জাতির সমান হতে পারব। আমাদের রাজা আমাদের শাসন করবেন, পালন করবেন, আর শত্রুরা দেশ আক্রমণ করলে আমাদের অগ্রগামী হয়ে যুদ্ধ করবেন। অবশেষে আমাদের পূর্বপুরুষদের মনস্কামনা সিদ্ধ হোল। তাঁরা রাজা পেলেন। আর সেদিন থেকেই য়িহুদী জাতির লোকপ্রধানদের গৌরবসূর্য ক্রমে ক্রমে অস্তাচলে যেতে লাগল। ‘লোকপ্রধানদের সেই মহিমার অবসান হয়েছে, তাকে কি আর পুনর্জীবিত করে তোলা যায় না? যে-সূর্য একবার অস্ত গিয়েছে রাত্রির অন্তে পূর্বদিগন্তে আবার কি তার উদয় হয় না?’- অহিকমের মনে হোল, এই একটি জিজ্ঞাসা যেন সকলের মনের মধ্যে চাপা পড়ে যাওয়া আগুনের মত ধিকি ধিকি জ্বলছে। যেরেমিয়ার প্রশ্নটা আজ আর শুধু যেরেমিয়ার ভাল মন্দের মধ্যেই আবদ্ধ হয়ে থাকতে পারছে না। এ যেন একটা বৃহত্তর, ব্যাপকতার আলোড়নের পূর্বাভাস, যার তাৎপর্য পুরাপুরি বোঝবার মত সামর্থ্য অহিকমের নেই। তবু তীক্ষ্ণ- ঘ্রাণশক্তি-বিশিষ্ট পশুর মত একটা সংঘাত সংঘর্ষময় সম্ভাবনার আঘ্রাণ অহিকমের সমস্ত ইন্দ্রিয়কে সচকিত করে তুলল।

কিন্তু কারা তুলবে সেই ঝড়? এই লোকপ্রধানেরাই? একজন একজন করে সকলের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি হতাশ হয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলেন। এরা শুধু পেছন দিকে তাকিয়ে অলস স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে। এদের চোখে ঝড়- বিদ্যুতের আভাস ইঙ্গিত নেই।’ কিন্তু তবু আসন্ন ঝড়ের সেই অস্পষ্ট সংকেত তাঁর মনটাকে এমন প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে তা কি একেবারেই মিথ্যে? না, ঝড় একটা উঠবেই। কিন্তু কোন্ দিক থেকে?

অতীতের স্মৃতি নিয়ে বহু চর্বিতচর্বণ করবার পর অবশেষে উপস্থিত সমস্যাদি নিয়ে কিছুক্ষণ আলোচনা এবং আলোচনান্তে একটা সিদ্ধান্তও নেওয়া গেল। যেরেমিয়া যদি ধৃত হন এবং বিচারসভার সম্মুখে তাঁকে অভিযুক্ত করা হয়, তবে লোকপ্রধানেরা তাঁর মুক্তির স্বপক্ষেই অভিমত দেবেন। কিন্তু তাঁদের অভিমতের আজ কতটুকুই বা মূল্য, এই প্রশ্ন সকলের মনেই ছিল। এই অভিমত দেওয়ার অতিরিক্ত আর কিই বা তাঁদের করণীয় থাকতে পারে? অহিকম ভাবছিলেন অন্য কথা। অক্ষম মেরুদণ্ডবিহীন এই প্রাণীগুলোর দিকে তাকিয়ে তিনি মনে মনে ভাবছিলেন, এই সিদ্ধান্তটুকু শেষ পর্যন্ত কতটুকু কার্যকর হবে, তাই বা কে বলতে পারে? প্রকাশ্য বিচারসভায় রাজপ্রতিনিধি ও মন্দিরের আচার্য পশহুরের রক্ত-চক্ষুর সম্মুখে এই গলিত-নখদন্ত স্থবিরদের মনোবল কতটা দৃঢ় থাকতে পারবে তাই বা কে জানে। এই মিলিত ষড়যন্ত্রের হিংস্র থাবা থেকে যেরেমিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে আসা বড় সহজ কাজ নয়। কিন্তু কোথায় যেরেমিয়া? লোকপ্রধানেরা পরস্পরকে প্রশ্ন করতে লাগলেন। রাজরোষ থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য তিনি কি দূর গ্রামাঞ্চলে লুকিয়ে আছেন, না কি ভাববাদী ইউরায়ার মত আশ্রয় লাভের জন্য মিসরের দিকে ছুটেছেন? পরস্পরকে প্রশ্ন করলেও সকলের দৃষ্টি অহিকমের মুখের দিকে নিবদ্ধ। অহিকম-যে যেরেমিয়ার ঘনিষ্ঠ বন্ধু এ কথা কি কারু কাছে অজ্ঞাত আছে? অহিকম বললেন, নবী যেরেমিয়া নগর ছেড়ে পালিয়েছেন, এ কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। আপনারা কি শোনেন নি, রাজপুরুষেরা এখনও ঘোষণা করছে যে, যেরেমিয়া এই নগরের মধ্যেই আছেন। তিনি নগর থেকে বাইরে যাবার সুযোগ পান নি। এখনও তারা ঘোষণা করে ফিরছে-যে নাগরিক এই দেশদ্রোহীকে আশ্রয় দিয়েছে, তার পদমর্যাদা যত উঁচুই হোক না কেন, এই অপরাধে তাকে কঠিন দণ্ডভোগ করতে হবে।

লোকপ্রধানদের মধ্যে একজন মন্তব্য করলেন, এই সন্দেহ-যে শেষ পর্যন্ত লোকপ্রধানদের উপর এসে পড়বে না, তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? এ কথা সকলেরই নিঃশব্দ অনুমোদন লাভ করল। অহিকম দেখলেন, কথাটা উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সকলের মুখেই কালো ছায়া পড়ল। সভা ভাঙ্গবার জন্য সবাই উসখুস করতে লাগলেন। সভা ভেঙ্গে যেতে সময় লাগল না। একটু ক্ষীণ বিদ্রূপের হাসি অহিকমের ঠোঁটের উপর খেলা করে গেল। তিনি ভাবছিলেন, আমি কি কঞ্চি দিয়ে তরোয়ালের বিরুদ্ধে লড়াই করতে চলেছি?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *