অভিশপ্ত নগরী – ১১

এগারো

সংবাদটা বণিকদের মুখ থেকে শোনা গিয়েছে। বণিকরা পণ্য নিয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়ায়! তাদের মুখে দেশ-বিদেশের কাহিনী।

সীদনের বণিকেরা প্রতি বছরেই একবার করে য়িহুদী অঞ্চলগুলোতে এসে তাদের বাণিজ্যের ডিঙ্গা ভিড়ায়। এবারও তারা তাদের নিয়ম মত যিরূশালেমে এসেছে। তাদের মুখে শোনা গেল এক বিচিত্র কাহিনী, যে-কথা কেউ কোন দিন শোনে নি। কেউ বিশ্বাস করল, কেউ বা করল না। এথেন্সের ক্রীতদাসেরা নাকি তাদের মালিকদের বিরুদ্ধে বেঁকে দাঁড়িয়েছে। শুধু বেঁকে দাঁড়ানোই নয়, কোথাও কোথাও দু’পক্ষের মধ্যে খণ্ডযুদ্ধও নাকি চলেছে। প্রথম দু’একটা দিন লোকে সংবাদটাকে একটা কাহিনীর মতই গ্রহণ করল। সওদাগরদের ডিঙ্গা এসে ভিড়লেই সারা এলাকার লোকেরা তাদের এসে ঘিরে ধরে। এইটাই চিরকালের প্রথা। সওদাগরেরা কত দেশের কত উপকথা, ইতিহাস আর সত্যি মিথ্যায় মিশানো কত কাহিনী এমনি করে দেশে দেশে ছড়িয়ে বেড়ায়। এজন্যই তারা এত জনপ্রিয়, তাদের পেলে আর কেহ ছাড়তে চায় না। এইভাবে পণ্যের সঙ্গে সঙ্গে তারা সংবাদ ফিরি করে বেড়ায়। সীদনের বণিকেরা এবার এথেন্সের ক্রীতদাসদের লড়াইয়ের সংবাদটা দিয়ে বাজারটা একেবারে মাত করে দিয়েছে।এই গল্প সবার মুখে মুখে।

কিন্তু কি আশ্চর্য, কিছুদিন যেতে না যেতেই গল্প আর নিছক গল্প রইল না, কেমন একটা নতুন রূপ ধরতে লাগল। ক্রীতদাসদের মালিকেরা নাক সিঁটকে বলতে লাগল, ক্ষেপেছ তোমরা! যত সব আজগুবী কথা। ক্রীতদাসদের কখনও এত সাহস হতে পারে? বণিকদের সব কিছু নিয়েই ব্যবসা। এক একবার এক একটা গল্প নিয়ে এসে বাজার জমায়। ওদের কথায় বিশ্বাস করে কে?

ক্রীতদাসদের গলার স্বর কিন্তু উঠল না, বরঞ্চ নেমে গেল। একেবারেই খাদে নেমে গেল। তারপর চলল কানাকানি, চুপি চুপি কথা, নানা রকম শলা- পরামর্শ। সঙ্গে সঙ্গে তাদের চোখ মুখের ভাব দ্রুত বদলে যেতে লাগল। সীদনের বণিকেরা কি সর্বনাশের বীজই-যে বুনে গেল!

সওদাগরেরা মাল নিয়ে বিকিকিনি করতে এসেছিল। কাজ শেষ হয়ে গেলে তারা তাদের ভরা ডিঙ্গায় পাল তুলে নূতন বন্দর লক্ষ্য করে চলল। কিন্তু যে- বীজ তারা ছড়িয়ে দিয়ে গেল, তা কিন্তু সরল না। জমিন তৈরি ছিল, আবহাওয়া অনুকূল ছিল, মাটির তলার সেই বীজ একটু একটু করে অঙ্কুরিত হয়ে উঠতে লাগল।

কথা বাতাসে আসে বাতাসে যায়। কথা কি কেউ ধরে রাখতে পারে? দেখতে দেখতে এক মুখের কথা দশ মুখের কথা হয়ে দাঁড়ায়। মালিকপক্ষ কিন্তু নিশ্চিন্ত ছিল। যে-জিনিস কোনদিন হয় নি, তেমন জিনিস কোনদিন হতে পারে না; এই ধারণা তাদের মনে বদ্ধমূল ছিল। সেজন্য ব্যাপারটার উপর গুরুত্ব দেয় নি। তাছাড়া যিরূশালেমের ক্রীতদাসেরা এতই নিরীহ ও বশংবদ প্রাণী যে, তাদের সম্পর্কে কোন রকম সন্দেহ জাগাই কঠিন। আর এ কথাও সত্যি, উপর থেকে তলার ব্যাপারটা ভাল করে দেখাও যাচ্ছিল না।

লোকপ্রধান অহিকম নানা ধান্ধায় ব্যস্ত। এ সমস্ত খবর তিনি ঘুণাক্ষরেও জানতেন না। হঠাৎ কথায় কথায় য়ুসুফের কাছে একটু আভাস পেতেই তিনি দস্তুরমত চমকে উঠলেন। এ সব আবার কি ব্যাপার? রাত্রিতে রাত্রিতে নাকি ক্রীতদাসদের গোপন সভা চলছে। প্রথম প্রথম দু’দশজন লোক হোত। আর এখন এত লোক হয় যে, জায়গা দেওয়াই কঠিন 1

য়ুসুফ নিজে একজন ক্রীতদাস। ক্রীতদাস সমাজে তার প্রভাব কম নয়, যেরেমিয়ার বিচারের দিন সে তা ভালভাবেই প্রত্যক্ষ করেছে। ক্রীতদাসদের মধ্যে এ রকম কর্মঠ ও বুদ্ধিমান লোক খুবই কম আছে। অহিকম গুণীর আদর করতে জানতেন। সেইজন্য তিনি য়ুসুফকে খুবই পছন্দ করতেন। অপরপক্ষে অহিকমের উপরেও য়ুসুফের অগাধ বিশ্বাস, তার কেমন একটা বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গিয়েছিল যে, যে-কোন ন্যায়সংগত কাজে লোকপ্রধান অহিকমের সক্রিয় সহযোগিতা নাও যদি থাকে, সহানুভূতি ও সমর্থন থাকবেই। তাই মালিকপক্ষের লোক হলেও তাদের নিজেদের গোপন কথা তার কাছে প্রকাশ করতে য়ুসুফের মনে কোনই দ্বিধা জাগে নি। কিন্তু কথাটা তোলার পর অহিকমের মনের প্রতিক্রিয়াটা দেখে সেই খুবই চমকে উঠল।

অহিকম বিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়লেন কথাটা শুনে। সমস্ত যিরূশালেম নগরে অন্ততঃ পক্ষে হাজার দুয়েকের মত ক্রীতদাস তো আছেই। ওরা যদি সত্যসত্যই একজোট হয়ে একটা দাঙ্গাহাঙ্গামা বাধায়, তখন ব্যাপারটাকে সামলানো বড় সহজ হবে না। যেরিমিয়ার বিচারের দিনে বিচারসভার সামনে সেই বিপুল জন-বিক্ষোভের ছবিটা তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল। তাদের মধ্যে ক্রীতদাসদের সংখ্যা তো বড় কম নয়। আর সেদিনকার বিক্ষোভে তাদেরই ছিল উদ্যোগী ভূমিকা, এ কথা তাঁর চেয়ে আর বেশী কে জানে? সে দৃশ্যটা সেদিন তাঁর চোখে বড়ই মনোরম লেগেছিল। কিন্তু ক্রীতদাসেরা যদি আজ তাদের নিজস্ব দাবী দাওয়া নিয়ে মালিকদের বিরুদ্ধে তেমনি করেই দল বেঁধে রুখে দাঁড়ায়, তখন সেই দৃশ্যটা তাঁর কাছে সুখকর হবে কি?

এতদিনের যিরূশালেমের সমস্যা মূলতঃ এই প্রশ্নটিকেই কেন্দ্র করে ছিল- য়িহুদীরা বাবিলের সঙ্গেই থাকবে, না মিসরের আশ্রয় নেবে? নগরীর সুখ, শান্তি নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ এই প্রশ্নটির সুমীমাংসার উপরেই ঝুলছিল। মন্দির কর্তৃপক্ষ, অধ্যক্ষগণ, লোকপ্রধানগণ এবং সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে এই নিয়েই যথেষ্ট মতবিরোধ, মনকষাকষি, বাদপ্রতিবাদ ও আক্রমণ প্রতিআক্রমণ চলছে। এর মধ্যে ক্রীতদাসেরা আবার কোথা থেকে এক নতুন অশান্তির বীজ বহন করে নিয়ে এলো!

: তোমরা কি আর সময় পেলে না? যিরূশালেম ও সমগ্র য়াহুদা রাজ্য আজ একটা বিরাট বিপর্যয়ের সামনে। আমাদের রাজা যে-সর্বনেশে পথ ধরে চলেছেন, সে খবর কি বাবিলে গিয়ে পৌঁছতে বাকী আছে? বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার আর কতদিন তা নিঃশব্দে সহ্য করে চলবেন? আর তোমরা কিনা এই সংকটের সময়ে তোমাদের নিজেদের ঘরোয়া ব্যাপারটাকে হাওয়া দিয়ে উসকে তুলছ। আগুন নিয়ে খেলা করবার এই কি সময়?

অহিকমের কণ্ঠস্বরে উম্মা চাপা রইল না। য়ুসুফ তা লক্ষ করল। একটু ক্ষুব্ধ বোধ করল সে। কিন্তু বাইরে তা প্রকাশ না করে শান্ত কণ্ঠে বলল

: বিপর্যয়? বিপর্যয় তো এই দুর্ভাগা নগরীর উপর এই প্রথম আসছে না। কিন্তু আমাদের ক্রীতদাসদের জীবনে এই বিপর্যয়ের উপরে-যে আরও সহস্র বিপর্যয় চলেছে, আমরা তা আর কতদিন নিঃশব্দে সহ্য করে চলব? লোকপ্রধান, ভারবাহী পশু পর্যন্ত অত্যাচারের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ জানাতে চেষ্টা করে; আপনি কি তা দেখেন নি! আর আমরা তো মানুষ।

—আর আমরা তো মানুষ! এ যেন একটা নতুন কথা। অহিকম বিস্মিত হলেন। হোক না য়ুসুফ, তবু ও একজন ক্রীতদাস বই তো নয়। একজন ক্রীতদাসের মুখ থেকে এমন দৃঢ় ও সুস্পষ্ট উক্তি তিনি প্রত্যাশা করেন নি। অহিকম বললেন : না, অত্যাচার যেই করুক, আমি তা কখনই সমর্থন করি না। একথা সত্য ক্রীতদাস হলেও সে মানুষই। তুমি তো দেখেছ, আমার গৃহে দাসদাসীরা ঘরের ছেলে মেয়ের মতই আছে।

: আপনার কথা বা কোন লোক বিশেষের কথা হচ্ছে না। শুধুমাত্র দৈহিক অত্যাচারের কথাও হচ্ছে না। আমাদের দাবী তার চেয়েও অনেক বড়, অনেক বেশী মৌলিক।

: কি তোমাদের সেই দাবী?

: আমি মনে করি সে দাবী শুধু আমাদের নয়, আপনারও এবং প্রত্যেক স্বধর্মে আস্থাশীল য়িহুদীদেরও সেই দাবী হওয়া উচিত।

: তুমি কি বলতে চাও, স্পষ্ট করে বল য়ুসুফ।

: আপনি দুর্ভাগ্য য়িহুদী জাতির ভাগ্য-বিপর্যয়ের কথা বলছিলেন। সে কথা কে অস্বীকার করবে? নবীরা বলে আসছেন য়িহুদী জাতির নিজের পাপের ফলেই বিপর্যয়ের পর বিপর্যয় নেমে আসছে। আমিও সেই কথাই বলতে চাই। এই য়িহুদা রাজ্যে য়িহুদী তার য়িহুদী ভাইকে ক্রীতদাসরূপে ভোগ করে আসছে। যুগ যুগ ধরে প্রভুর রাজ্যে এই অপরাধ চলে আসছে, সেই অপরাধের কি কোন দণ্ড নেই!

: অপরাধ, তুমি বলছ কি য়ুসুফ? আমরা তো দক্ষিণ হস্তের সাহায্যে বলপ্রয়োগ করে কাউকে ক্রীতদাস বানাই না। আমরা ক্রীতদাসদের যথার্থ মূল্য দিয়েই ক্রয় করে থাকি। দাসদাসী না থাকলে গৃহের কাজ, ক্ষেত্রের কাজ এবং অন্যান্য শ্রমসাধ্য কাজ করবে কারা? বলদ বলদ ছাড়া কি হলকর্ষণের কাজ চলে? উষ্ট্র, অশ্ব ও অশ্বতর ছাড়া কি ভার বহনের কাজ চলে? সমাজের মঙ্গলের জন্যই প্রভু দাসদাসীর বিধান দিয়েছেন। এর মধ্যে অপরাধের তো কোন কথা নেই। য়ুসুফ হাসল। তিক্ত বিদ্রূপ সেই হাসির সঙ্গে মিশানো ছিল। সেই হাসি দেখে অহিকম ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন।

: লোকপ্রধান, প্রভু কি সত্য সত্যই এই বিধান দিয়েছেন?

অহিকম উত্তর দিলেন : অবশ্যই। প্রভুর বিধান না থাকলে এই ব্যবস্থা কি করে এত দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে? সমাজব্যবস্থা তো প্রভুরই সৃষ্টি।

য়ুসুফ তার প্রশ্নের পুনরাবৃত্তি করল : লোকপ্রধান, প্রভু কি সত্যসত্যই এই বিধান দিয়েছিলেন?

য়ুসুফের কথার সুরে অহিকম কেমন একটু অস্বস্তি বোধ করলেন। একটু ইতস্ত তঃ করেই বললেন, তুমি কি বলতে চাও?

: আমাদের পবিত্র শাস্ত্রগ্রন্থে কি এই কথাই লিখিত আছে? লোকপ্রধান সামান্য ক্রীতদাস হলেও প্রভুর অনুগ্রহে আমি যৎসামান্য শিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমি আমাদের শাস্ত্রগ্রন্থ কিছু কিছু পড়েছি। আপনি একটু ধৈর্য ধরে শুনুন। ক্রীতদাসদের সম্বন্ধে প্রভু তাঁর আপন মানুষ মোশির মুখ দিয়ে যে-কথা বলেছিলেন, যাত্রাপুস্তকে তা এইভাবে লিখিত আছে—“যদি তুমি কোন য়িহুদী দাসকে ক্রয় কর, ছয় বৎসর পর্যন্ত সে তোমার সেবা করবে। সপ্তম বৎসরে তুমি তাকে বিনামূল্যে মুক্তি দেবে। যদি সে একা থাকে, সে একাই মুক্তি পাবে। আর সে যদি বিবাহিত হয়, তবে তার স্ত্রীও সঙ্গে মুক্ত হবে।” এই আদেশ প্রচারিত হবার পর থেকে প্রভু-কর্তৃক নির্ধারিত সেই ছয় বৎসর আজও কি কারু পূর্ণ হোল না? এ পর্যন্ত কোন মালিক কি প্রভুর আদেশ পালন করে তার দাসদাসীকে বিনামূল্যে মুক্তি দিয়েছেন?

লোকপ্রধান অহিকম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। যে-কথা আজন্ম স্বতঃসিদ্ধ সত্যের মতই জেনে এনেছেন, তার বিরুদ্ধেও প্রশ্ন উঠতে পারে? যাত্রাপুস্তকে এমন কথা কি সত্য সত্যই লিখিত আছে? কই, তাঁর ঠিক মনে পড়ছে না তো। এমন অসংগত ও যুক্তিহীন কথা প্রভু কি করেই বা বলতে পারেন? তবে হ্যাঁ, শাস্ত্রের কোন কথার কি মানে, একমাত্র শাস্ত্রীয় আচার্যেরাই শুধু ব্যাখ্যা করতে পারেন। সামান্য একজন ক্রীতদাস তার কি বুঝবে?

কিন্তু যদি নাই থাকে, য়ুসুফ এমন কথা বলবেই বা কোন সাহসে? মিথ্যা কথা বললে তো ধরা পড়ে যাবেই। তাছাড়া য়ুসুফ তেমন প্রকৃতির লোকও নয়। কিন্তু তাঁর ভেতর থেকে একটা আশঙ্কা জেগে উঠেছে, হয়তো বা য়ুসুফের কথাই সত্যি হবে। তখন! কি আর তখন? সংসার নির্বাহ করতে গেলে শাস্ত্রের কথা অত অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলা যায় না। তাছাড়া শাস্ত্রের এমন অনেক আদেশ আছে, যার একটা মানতে গেলে আর একটাকে লঙ্ঘন করতে হয়। কিন্তু য়ুসুফকে বিশ্বাস নেই, এই কথা বললে সে হয়তো ফস করে এক বেয়াড়া প্রশ্ন করে বসবে-প্রভুর কোন্ আদেশটা মান্য করে চলতে হবে, আর কোন্‌টা মান্য না করলেও চলতে পারে?

য়ুসুফের কথার বিষম ধার, যেখান দিয়ে যায় যেন কেটে কেটে যায়। অহিকম বুঝতে পারছিলেন যে, তিনি তার কোন প্রশ্নেরই সদুত্তর দিতে পারছেন না। য়ুসুফের শাস্ত্রীয় দলিলটিকে মিথ্যা বলে উড়িয়ে দেবেন এমন জোরও তাঁর মনে ছিল না। নিজের কাছে নিজেই ঘা খেয়ে মেজাজটা তাঁর তিরিক্ষি হয়ে উঠল। নিজের সঙ্গে জবাবদিহি করতে করতে যতই তিনি ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলেন, ততই তিনি য়ুসুফের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছিলেন। কি প্রয়োজন পড়েছিল তাঁর একটা ক্রীতদাসকে এমনভাবে প্রশ্রয় দিয়ে চলবার? আজ সে কিনা তার সঙ্গে মুখে মুখে তর্ক করতে সাহস পায়।

অহিকম কল্পনার চোখে দেখতে লাগলেন। আচ্ছা ধর, ওরা যা বলছে তাই যদি হয়? সমাজে দাসদাসী বলে কেউ নেই, সবাই মুক্ত নাগরিক, সবাই স্বাধীনভাবে যে যার সংসারধর্ম প্রতিপালন করে চলেছে—একমাত্র পাগল ছাড়া এমন কথা ভাবতে পারে কেউ? লোকপ্রধানদের এতগুলো জমি চাষ করবে কে? অহিকম নিজে? সে কি করে হয়? অহিকমের বাপ, পিতামহ, কেউ কি কোনদিন নিজের হাতে চাষ করেছে? আর লোকপ্রধানেরা যদি নিজ নিজ জমি চাষেই ব্যস্ত থাকে, তবে সমাজরক্ষার কাজই বা করবে কারা? আবার এদিকে চাষের অভাবে জমিতে ফসল যদি না হয়, তবে লোকপ্রধান অহিকম, তাঁর পরিবার পরিজন তারাই বা খাবে কি?

অহিকম মনশ্চক্ষে দেখছিলেন, যেন লোকপ্রধান অহিকম স্বহস্তে ক্ষেতে জল দিচ্ছেন, জমি চাষ করছেন, বীজ বুনছেন, আগাছা তুলছেন, ফসল কাটছেন। আর এদিকে ঘরের কাজের জন্য যে-সব দাসদাসী ছিল, তারাও কেউ নেই। জিল্লাকে নিজেই সর কাজ করতে হচ্ছে। …সমস্ত চিত্রটা তার কাছে অদ্ভুত, অসংগত ও অসম্ভব বলেই মনে হতে লাগল। য়ুসুফেরা তাদের এমনি একটা অবস্থার মধ্যেই ঠেলে নিয়ে ফেলতে চায় নাকি? কি সাংঘাতিক ষড়যন্ত্র। য়ুসুফকে তো এতকাল তিনি ভাল লোক বলেই জেনে এসেছেন।

য়ুসুফ বারেবারেই এই কথাটা জোর দিয়ে বলছিল-আমরা কি মানুষ নই? হ্যাঁ, তোমরা মানুষ, অবশ্যই মানুষ। আমরা কি সে কথা কোনদিন অস্বীকার করেছি? কিন্তু প্রভুর অলঙ্ঘ্য বিধানে তোমরা তো শুধু মানুষই নও, ক্রীতদাসও বটে। সে কথাটাই বা তোমরা স্বীকার করতে চাও না কেন?

বাড়ি ফিরে এসে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত অহিকম জিল্লার কাছে সব কথা খুলে বললেন। বললেন : বড় নিশ্চিন্তে আছ, ওদিকে কী-যে সব হচ্ছে, খবর রাখ কিছু? জিল্লা ও কথা শুনে কিন্তু মোটেই আশ্চর্য হলেন না। একটা হাই তুলে গা মোড়ামুড়ি দিয়ে দেহের আলস্য ভেঙ্গে শেষ নিরুদ্বেগ প্রশান্ত কণ্ঠে বললেন : তুমি কি এইমাত্র এই কথা শুনলে?

: বারে, তুমি জানতে এসব কথা? কই, আমাকে কিছুই বল নি তো।

: ভাল কথা! আশ্চর্য মানুষ তুমি। আমি বলব তোমাকে তবে তুমি জানবে? তুমি একজন লোকপ্রধান, সারা নগরের মানুষের হাঁড়িতে কাঠি দিয়ে বেড়াও। যে-খবর সবাই জানে, তা-যে তুমি জান না আমি তা কি করে জানব? ঘরে ঘরে এই নিয়ে জটলা। কর্তা আর গিন্নীদের চোখ তো কপালে গিয়ে উঠেছে। ‘সোনা’ ‘বাছাধন’ বলে সবাই যে যার দাসদাসীদের গায়ে হাত বুলোচ্ছে। কে জানে কোনটা কখন বিগড়ায়।

: কিন্তু আমাদের ঘরে তো সে ভয় নেই। আমাদের দাসদাসীরা আমাদের ঘরের ছেলেমেয়ের মত। বাইরে অপর কানভাঙ্গানী কথায় ওরা ভুলবে না। তাই না জিল্লা?

: তা আর বলতে! দিনের বেলা কি শান্তশিষ্ট বাছারা আমার। হাসি মুখে কাজ করে চলেছে; একটু তেড়া বাঁকা কথা বলতে জানে না। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। মুস্কিলের কথা কিন্তু রাত্রিবেলা সবকটার পাখা গজিয়ে ওঠে। সবাই তখন সভা করতে ছোটেন। উঃ, কি দারুণ উৎসাহ!

অহিকম আঁততে উঠলেন : বল কি, সভায় যায়! তুমি কিছু বল না?

: বারে, আমি কি বলব! ওদের সভায় ওরা যাবে না? তুমি যখন তোমাদের সভায় যাও, আমি তখন কিছু বলতে যাই?

: নাঃ, তুমি দেখছি সর্বনাশ করবে। তুমি জান, ওরা গোপনে গোপনে সভা করে কি ভীষণ সব ষড়যন্ত্র করছে?

: ওমা, তাই নাকি? তা আমি অত সব কি করে জানবো বল? কিন্তু তোমার ছেলেই-যে ওদের বড় একজন পাণ্ডা, সে খবর তুমি রাখ? ক্রীতদাস-মুক্তির মহাব্রতে সে যে তার পেটের ক্ষুধা আর চোখের ঘুম দুই-ই উৎসর্গ করেছে।

: আমার ছেলে? কে? কে? গেদালিয়া?

: তোমার তো একটি ছেলে আছে বলেই এতদিন জানতাম। আরও দু’একটা আছে নাকি কোথাও, কারু কাছে? জিল্লা একবার চারদিকটা তাকিয়ে দেখে নিলেন। পরে দু’হাত দিয়ে অহিকমের গলা জড়িয়ে ধরে বললেন : বল না, লক্ষ্মীটি, আমি কারও কাছে বলব না-কারও কাছে না। অহিকম ব্যস্ত হয়ে লাফিয়ে উঠলেন, আরে ছাড় ছাড়, কি করে দেখ, দেখবে যে!

: দেখুক না। অত ভয় কিসের? আমি যাই করি না কেন, আমার স্বামীর সঙ্গেই করছি।

: হয়েছে, হয়েছে। বয়স কত হয়েছে হিসেব আছে?

: দায় পড়েছে আমার হিসেব করতে। সে হিসেব তুমিই করো।

: কিন্তু তুমি-যে আমাকে দারুণ দুশ্চিন্তার মধ্যে ফেললে। গেদালিয়ার ব্যাপারটা কি বল দেখি। দাসদাসীদের মুক্তির জন্য তার প্রাণই বা হঠাৎ এমন উথলে উঠল কেন? কি যেন একটা রহস্য আছে এর মধ্যে। আচ্ছা, পেছন থেকে কোন শ্রীমতী ইভ আবার কলকাঠি নাড়ছেন না তো? আমি ভাবছি হরিণীর মত কালো চোখ বেথেলহেমের ওই-যে সারা বলে অল্পবয়সী দাসীটি, এ ব্যাপারে তার কোন হাত নেই তো?

: ও বাবা, লোকপ্রধান, ধন্য দিই তোমাকে। ওই হরিণীর কালো চোখের দিকে তোমারও নজর পড়েছে?

: ঠাট্টা রাখো জিল্লা, বড়ই চিন্তার কথা। কিন্তু তুমি কি গেদালিয়াকে কোন কথাই বল নি এ ব্যাপারে? তুমি কেমন মা? সে যে-পথে চলেছে তার পরিণাম অত্যন্ত বিপজ্জনক। ওর সঙ্গে আমার তো প্রায় দেখাই হয় না। কদাচিৎ দু’একটা কথা হয়। ওর যত কথা সব তোমার সঙ্গে, তুমি ওকে কিছু বল না কেন?

: ও কি আমাকে কোন কথা বলতে দেয়? ও-যে ওর নিজের কথা বলেই শেষ করতে পারে না। আর ওর উজ্জ্বল মুখের দিকে চেয়ে ওর কথা শুনতে শুনতে আমি আমার নিজের কথা সবই ভুলে যাই।

: কিন্তু তুমি বুঝতে পারছ না জিল্লা, ও-যে আগুন নিয়ে খেলা করতে চলেছে।

: আমি তার কি করব? আর এই তো আগুন নিয়ে খেলা করবার বয়স। আমার বয়সে আমি আগুন নিয়ে খেলা করেছি। তোমার বয়সে তুমিও আগুন নিয়ে খেলা করেছ। আর আমাদের ছেলে যদি তার বয়সে আগুন নিয়ে খেলা করে, আমরা কি তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারব?

: কিন্তু চেষ্টা করে দেখতে হবে তো। গেদালিয়া যখন শিশু ছিল, আগুন দেখলেই ধরবার জন্য হাত বাড়াত। তুমি কি তখন তাকে বাধা দিতে না?

: গেদালিয়া আজ আর শিশু নয়, সে এখন শক্ত সবল মানুষ হয়ে উঠেছে। তাকে আর গড়ে পিটে মানুষ করবার সুযোগ নেই। প্রিয় অহিকম, ছেলে তোমার, কিন্তু তোমার ছেলেকে তুমি চেনো না। আমি ওকে বোঝাব কি, ও-যে ওর কথার তোড়ে আমাকেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অহিকম, তুমিও চেষ্টা করতে যেও না। কে জানে হয়তো তুমি শুদ্ধ ভেসে যাবে। শেষকালে কি স্বামী-পুত্র দুই-ই আমার হাতছাড়া হয়ে যাবে?

: জিল্লা, তোমার কি কিছুতেই ভয় নেই?

: ভয়? প্রিয়, আমার সবচেয়ে ভয় হয় কখন জান?-

: কখন?

: যখন আমি তোমাকে মুখ কালো করে দুর্ভাবনা করতে দেখি। তুমি এত বেশি ভাব কেন?

: কেন, দুর্ভাবনা করবার মত বিষয় কি এটা নয়? সত্য সত্যই দাসপ্রথা যদি বন্ধ হয়ে যায়, আমরা কি তবে সবশুদ্ধ অচল হয়ে পড়ব না?

: কেন, আমরা কি এতই অক্ষম, এতই অসহায়? না, আমি তা মনে করি না। আমি সেজন্য ভয় করি না। তুমি জান আমি গ্রামাঞ্চলের গরীব ঘরের মেয়ে। ছোটবেলা থেকে এই দু’টি সবল হাতে মাতৃহীনা আমি দরিদ্র সংসারের যাবতীয় কাজ করে এসেছি। দাসদাসীর স্বপ্ন আমি কোনদিন দেখি নি। তারপর ভাগ্যচক্রে কে জানে কি করে তোমার এই স্বচ্ছল সংসারে এসে পড়লাম। এখন আমি বেকার, শূন্য হাত। আমার এই পোশাকী জীবন আমার কোনদিনই ভাল লাগে নি। আমার ইচ্ছে হয় কি জান, আমাদের নিজের সংসার আমরা নিজেরাই চালাই। সেই সংসারে তোমাদের জন্য আমি কাজ করব: আর আমার জন্য কাজ করবে তোমরা।

: অদ্ভুত জিল্লা, অদ্ভুত তুমি। না, আমি আর কথা খুঁজে পাচ্ছি না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *