অভিশপ্ত নগরী – ২

দুই

: তাকে কোথাও পাওয়া গেল না?

: না, রাজা, সমস্ত নগর তন্ন তন্ন করে খোঁজ করিয়েছি। কিন্তু কি আশ্চর্য, এই ছিল, মুহূর্তের মধ্যে কোথায়-যে অদৃশ্য হয়ে গেল! সে কি যাদু জানে!

: যাদু? আচার্য পশহুর কি সম্প্রতি যাদুতেও বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন নাকি? যাদুর কথা বাদ দিয়ে কাজের কথা বলুন। অবস্থাটা আঁচ করতে পেরে নগরের বাইরে সরে পড়ে নি তো? সেটা খোঁজ নিয়ে দেখেছেন?

: না, রাজা, নগরের বাইরে যেতে পারে নি। আমি আগে থাকতেই নগরের সব কটা দ্বারে লোক মোতায়েন করে রেখেছিলাম। তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে সরে পড়া অসম্ভব।

রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরে এক গোপন কক্ষে এই পরামর্শ চলছিল। যিরূশালেম ও য়াহুদার দুজন ভাগ্যবিধাতা গভীরভাবে পরামর্শে রত-রাজা যিহোয়াকিম আর মন্দিরের অধ্যক্ষ আচার্য পশহুর। জীর্ণবস্ত্র, নিঃসম্বল পথাশ্রয়ী নবী যেরেমিয়া রাজপ্রাসাদ ও মন্দির উভয়কেই চিন্তাকুল করে তুলেছেন।

: আচার্য, আমি আগেই বলেছিলাম, নবী যেরেমিয়ার সঙ্গে আমাকে একটু বোঝাপড়া করে নিতে দিন। তাতে এদিক বা ওদিক একটা কিছু নিষ্পত্তি হয়ে যেত। কিন্তু সেদিন আমার কথাটা আপনার পছন্দ হয় নি। আপনি তাতে বাধা দিলেন। কি জানি, হয়তো বা আপনার নিজস্ব কোন পরিকল্পনার সঙ্গে তার বিরোধিতা ছিল।

: না, রাজা, এ আপনি অন্যায় কথা বলছেন। আমার আবার কিসের পরিকল্পনা! তবে শেমাইয়ার পুত্র নবী ইউরায়ার ব্যাপারটা নিয়ে ইতিমধ্যে নানা লোক নানারকম বলাবলি করছে। তাতে যেন আর ইন্ধন যোগান না হয়, সেইজন্যই আমি আপনাকে এই পরামর্শ দিয়েছিলাম। সে তো আপনারই ভালোর জন্য।

: আমার ভালো! নতুন কথা নয়। মন্দিরের অধ্যক্ষ ও যাজকরা চিরদিনই আমাদের ভালই চেয়ে এসেছেন। য়াহুদার রাজবংশের ইতিহাস তারই কাহিনীতে ভরপুর। ইউরায়ার মত ভাড়াটে নবীদের তারা চিরকাল রাজাদের ভালোর জন্যই ব্যবহার করে এসেছেন। কিন্তু আচার্য, ইউরায়ার তিক্ত প্রসঙ্গটা কি আজ আবার না তুললেই চলত না?

: রাজা, আমি জানি এ আপনার এক বদ্ধমূল ধারণা। জানি না কেমন করে আমি আপনার এই ভ্রান্ত ধারণা দূর করতে পারব। কিন্তু যিহোবা জানেন, ইউরায়ার সঙ্গে আমার কোনই সম্পর্ক ছিল না।

: আচার্য, যিহোবার পবিত্র নামটা আর এই ব্যাপারের সঙ্গে নাই বা জড়ালেন। আপনি অত্যন্ত তীক্ষ্ণবুদ্ধি, অত্যন্ত কৌশলী, যারা আপনাকে ভালভাবে জানবার সুযোগ পেয়েছে, তারা কেউ একথা অস্বীকার করতে পারবে না। আপনি অনেকের চোখেই ধুলো দিতে পারবেন, কিন্তু তাহলেও আমার চোখে ধুলো দেওয়া আপনার পক্ষেও সম্ভব নয়। কেন জানেন? রাজপ্রাসাদ আর মন্দিরের মধ্যে শক্তি প্রতিযোগিতার খেলা আজই তো প্রথম শুরু হয় নি। এ এক দীর্ঘ ইতিহাস। এই ইতিহাসের আলোকেই আমরা পরস্পরকে স্পষ্টভাবে চিনবার সুযোগ পেয়েছি।

: রাজা, আমরা কি বিবাদ করবার জন্যই আজ মিলিত হয়েছি?

: না, না, বিবাদ কোথায়? এ তো শুধু পুরানো দিনের লেন-দেন আর বাকী- বকেয়ার একটু হিসেব নেওয়া হচ্ছে মাত্র। কিন্তু ইতিপূর্বে যাই কিছু হয়ে থাক না কেন, আমি বিশ্বাস করি, আপাতত আজ আমাদের মধ্যে কোন বিবাদ নেই। আজ আমরা উভয় পক্ষই বুঝতে পারছি যে, নবী যেরেমিয়া আজ আমাদের উভয়েরই স্থিতি ও শান্তির পক্ষে সবচেয়ে বড় অন্তরায়। এই কণ্টককে উৎপাটন করতেই হবে, এ বিষয়ে আমরা একমত। আর আমাদের নিজেদের ভেতরে যে-সমস্ত গরমিল রয়ে গেছে, বৃহত্তর বিপদের সামনে তা আজ তুচ্ছ।

: আপনার স্পষ্টবাদিতার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

: রাজা যিহোয়াকিম খোলা মন আর সোজা কথার মানুষ। আপনাদের মন্দিরের ওই আঁকা বাঁকা অলিগলিগুলোর পাকের পর পাক খেয়ে শেষে এক গোলোকধাঁধার মধ্যে পৌঁছে দেয়। দিনের মুক্ত আলো সেখানে প্রবেশের পথ পায় না। বাতাস যেটুকু আছে, তাও ধূপের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। আর সেখানকার বাসিন্দা যারা, তাদের মনের গতিও তেমনি কুটিল, দুর্বোধ ও রহস্যময়। সোজা কথাটাকে তারা সোজা করে বলতে পারে না।

আচার্য পশহুর একটু তিক্ত হাসি হেসে বললেন : রাজকীয় দৃষ্টিতে প্রভুর মন্দির কি এই ভাবেই রূপ পেয়েছে? রাজপ্রাসাদের বাসিন্দা হবার সৌভাগ্য হয় নি। রাজপ্রাসাদের সুস্থ, সুন্দর ও পবিত্র পরিবেশের বর্ণনা আপনার কাছ থেকে শুনতে পারলে সুখী হব।

আচার্য, আপনার কাছে কোন কথা বলতেই আমার দ্বিধা নেই। শয়তান যদি শয়তানের মুখোমুখী এসে দাঁড়ায়, তখন সংকোচের কোন প্রশ্নই উঠে না। আমরা দু’জনে দু’জনকে ভাল করেই চিনি। আমাদের মাঝখানে যেটুকু পর্দা ছিল এতদিনে তাও খসে পড়ে গেছে। রাজপ্রাসাদের খবর আর আমার কাছে কি শুনবেন? সেখানকার গোপনতম খবরটুকুও তো আপনার নখদর্পণে। তবু শুনুন, বলছি। সময় সময় রাজপ্রাসাদ রাজার কাছেও কারাগারের মতই মনে হয়। ভোগবিলাস, নিষ্ঠুরতা আর মাৎসর্য রাজার নিত্য পরিচ্ছদ। কিন্তু তবু তা আমাকে অস্থির করে তোলে। দেশের মানুষ আমাকে অত্যাচারী ও কলঙ্কী রাজা বলেই জানে। তাদের এই জানাটা ভুল নয়, আমি সত্য সত্যই যা তাই বলেই তারা আমাকে জানে। কিন্তু আচার্য, রাজা কোনদিন পবিত্র ও শুক্ল মসিনার বসনের নীচে বিষাক্ত ছুরিকা লুকিয়ে রাখবার সুযোগ পায় না।

: রাজা, আপনি কি আজ আমাকে অপমান করবার জন্যই ডাকিয়ে এনেছেন?

: আমি? আমার সাধ্য কি আপনাকে অপমান করি? সাধ্য কি আপনার কেশাগ্রও স্পর্শ করি। আমি কি জানি না, এমন একটা ক্ষেত্র আছে যেখানে আপনি আমার চেয়ে বহুগুণে শক্তিশালী! এমন একটা জগতে আমরা বাস করি সেখানে আপনাদের উপর নির্ভর না করে রাজা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।

: সত্যি বলছেন? আপনি জানেন সে কথা?

: জানি, জানি, অনেক কিছুই জানি। বড় বেশি জানি আচার্য, এত বেশী না জানলেই বুঝি ভাল ছিল। তাই মাঝে মাঝে মনে হয় ছেঁড়া পাদুকার মত এই রাজত্বটাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে নিঃসম্বল ওই নবী যেরেমিয়ার পেছনে পথে পথে ঘুরে বেড়াই। শুধু সঙ্গে থাকবে আমার সাথী সেই তারের যন্ত্রটি যাকে আমি যত্ন করে নিজের হাতে বেঁধেছিলাম।

: রাজা, এসব আপনি কি বলছেন?

: আরে না, না, এ তো স্বপ্ন। স্বপ্ন কখনও সত্যি হয় নাকি? আমি যে রাজা, আমার কি মুক্তি আছে? ওঃ! পার্বত্য ঈগলের মত এমন কি কেউ কোথাও নেই যে, আমাকে ছোঁ মেরে এখান থেকে তুলে নিয়ে যেতে পারে? তারপর যেখানে খুশী ছুঁড়ে ফেলে দিক। যেরেমিয়া, তোমার ওই অভিসম্পাত আমার উপরে নামুক, নামুক, বজ্রাগ্নি বুকে নিয়ে উল্কামুখী হয়ে নামুক।

: হা দুর্ভাগ্য! যিহোবা আমাকে এমন কি শোনাচ্ছেন? রাজা সত্যি করে বলুন, আপনি কার সঙ্গে আছেন-যিহোবার সঙ্গে না কি ওই মতিভ্রষ্ট যেরেমিয়ার সঙ্গে?

: নিশ্চিন্ত থাকুন আচার্য, আমি আপনার সঙ্গেই আছি। যতক্ষণ আমি রাজা, ততক্ষণ আমার আপনার সঙ্গে থাকা ছাড়া উপায় নেই। আপনার সঙ্গে আমার আপোস করে থাকা চলে, কিন্তু যেরেমিয়া তো কোনরকম আপোস রফা করতে জানে না। আপনি আর আমি যেই জগতে আছি, যেরেমিয়া সেই জগতে বিচরণ করে না। কাজেই তাঁর বিরুদ্ধে আমাদের উভয়কে মিলতেই হবে। কিন্তু একটা কথা আপনাকে বলি, আপনি যেরেমিয়ার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিচারের যে-দাবী করেছিলেন, আমি তাতে সম্মতি দিয়েছি, কিন্তু তবু বলছি তাতে আপনার উদ্দেশ্য সিদ্ধ নাও হতে পারে।

: কেন হবে না? কে বাধা দেবে? বিচারসভায় মন্দিরের পথ থেকে যাঁরা আসবেন, তাঁরা সবাই আমাদের পক্ষ সমর্থন করবেন। অধ্যক্ষদের সম্পত্তির ব্যাপারটা অনেকাংশে আপনার উপরে নির্ভর করছে।

: তা হয়তো করছে। কিন্তু লোকপ্রধানেরা?

: মন্দির আর অধ্যক্ষেরা যদি একমত হন, লোকপ্রধানেরা কি আর তার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো সমীচীন মনে করবেন?

: সে কথা ঠিক। লোকপ্রধানদের প্রাধান্য তো আজ অতীতের স্মৃতি মাত্ৰ। কিন্তু ধরুন, তবুও যদি তাঁরা বেঁকে বসেন? হাওয়ার গতিটা কোন্‌দিকে লক্ষ করেছেন? যতই দিন যাচ্ছে, লোকের মন ততই যেরেমিয়ার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

: লক্ষ করেছি বই কি! সেইজন্যই তো অঙ্কুরেই বিনাশ করতে চাই।

: চাই তো আমরা কত কিছুই। কিন্তু ‘চাই’ বললেই কি সব জিনিস পাওয়া যায় আচার্য? ভেবে দেখুন, আপনি যা যা করতে চেয়েছেন, সবই কি করতে পেরেছেন?

: এ কথার অর্থ কি রাজা? এ তো খোলা মন আর সোজা ভাষার কথা নয়।

: এ কথার অর্থ অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট। খোলা মনের লোক বলেই সোজাসুজি এমন কথা বলে ফেললাম। কূটবুদ্ধির লোক হলে চেপেই যেত।

: আচ্ছা, আপাতত সে কথা থাক। কিন্তু রাজা, একটা সংশয় থেকে থেকে আমায় কাঁটার মতই বিঁধছে। আমার চোখের আড়ালে কোথায় যেন একটা জট পাকাচ্ছে, ধরতে পারছি না। নির্বোধ যেরেমিয়ার এরকম অদ্ভুতভাবে অদৃশ্য হয়ে যাবার পেছনে কি যেন একটা রহস্য রয়ে গেছে। কে তাকে লুকিয়ে রেখেছে? সেই রহস্যের সন্ধান যতক্ষণ খুঁজে বের করতে না পারছি, ততক্ষণ আমার মনে শান্তি নেই, স্বস্তি নেই। যেরেমিয়ার চাইতে তাকেই আমার আগে খুঁজে পাওয়া দরকার। রাজা, রাজা, সময়টা বড় খারাপ। এ সময়ে আগুন নিয়ে খেলা করতে যাওয়াটা আমাদের কারু পক্ষেই নিরাপদ হবে না।

: অদ্ভুত, আচার্য, অদ্ভুত আপনার প্রতিভা! অদ্ভুত আপনার নির্লজ্জতা! আমি আপনাকে যতই দেখছি, ততই বিস্মিত হয়ে যাচ্ছি। যেরেমিয়ার অদৃশ্য হওয়ার ব্যাপারে আমিও আপনার সন্দেহ থেকে মুক্ত নই। আপনার প্রতিভা অসাধারণ। কিন্তু তাহলেও এ ক্ষেত্রে আপনার প্রতিভা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। মনে রাখবেন, তা আপনার বিরুদ্ধ শক্তির অনুকূলেই কাজ করবে।

: ছি ছি, আমি ওভাবে কথাটা বলি নি। আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন না।

: এর চেয়ে কত সুষ্ঠু করেই বা বলবেন? কিন্তু আচার্য, সমস্ত কথার পরেও একটা সত্যি কিন্তু অকাট্যই থেকে যাচ্ছে, আমরা পরস্পরকে মনে মনে যতই সন্দেহ করি না কেন, এই দুর্দিনে আমরা পরস্পরের বন্ধু।

: যথার্থ বলেছেন। এ কথার উপর আর কোনও কথা নেই। আমাদের দু’জনকেই এ কথা স্মরণ রাখতে হবে। কিন্তু ওদিকে মন্দিরে সন্ধ্যা-বন্দনার শিঙ্গা বেজে উঠেছে, আমাকে এখনই বিদায় নিতে হবে।

: আচ্ছা, আচ্ছা, শীগগিরই আবার দেখা হবে। আশা করছি সেদিন আপনার কাছ থেকে ভাল সংবাদ পাব।

রাজার নির্দেশে প্রহরী আচার্য পশহুরকে প্রাসাদের বাইরে পৌঁছে দেবার জন্য নিয়ে গেল। রাজা যিহোয়াকীম চিন্তিত মনে ঘরের মধ্যে পদচারণা করতে লাগলেন।

যিহোয়াকীম আর পশহুর! মন্দির আর রাজপ্রাসাদের সেই সনাতনী প্রতিযোগিতা। এ তো নতুন কিছু নয়। যিরূশালেমের বুকে এই দৃশ্য কতবার কত ভাবেই না দেখা দিয়েছে। কিন্তু যেরেমিয়া? কোথায় গেল সে? তাকে আড়াল করে কে দাঁড়িয়ে আছে? ব্যাপার সহজ নয়। আচার্য পশহুর ঠিকই বলেছেন, যেরেমিয়ার চাইতেও তার সন্ধানটাই আগে পাওয়া দরকার।

প্রহরী এসে সংবাদ দিল, হশরিয়ের পুত্র কাদমিয়েল সাক্ষাৎ-প্রার্থী। রাজা মাথা নেড়ে তাকে নিয়ে আসবার জন্য ইঙ্গিত করলেন। একটু বাদেই কাদমিয়েল এসে অভিবাদন জানালেন।

: এসো কাদমিয়েল। আমি তোমার কথাই ভাবছিলাম। রাজপ্রাসাদে আসবার পথে বা দ্বারের মুখে আচার্য পশহুরের সঙ্গে তোমার দেখা হয়েছে?

: না, মালিক। আমি গুপ্তপথে এসেছি।

ঠিক করেছ। এবার বল নগরের সংবাদ কি?

: নতুন ফসলের উৎসব আসন্ন। সেই নিয়েই এখন সবাই ব্যস্ত।

: ঘরে ঘরে বুঝি আনন্দের রোল পড়ে গিয়েছে?

: না, মালিক, আনন্দ কোথা থেকে আসবে? এবারকার ঘোর অজন্মায় হতভাগ্য চাষীদের বহু ফসল মারা পড়েছে। লোকেরা চোখের জল ফেলছে আর অভিসম্পাত দিচ্ছে।

: অভিসম্পাত? কাকে-রাজাকে নয় তো?

: মালিক, ঠিকই অনুমান করেছেন।

: কেন, রাজার অপরাধ?

: তারা বলছে-আমাদের রাজা অধার্মিক। রাজার অপরাধের ফলে যিহোবা প্রজাদের প্রতি বিরূপ হয়ে মুখ ফিরিয়েছেন। সেইজন্যই আমাদের এই দুর্গতি।

: কার মুখ দিয়ে যিহোবা তাঁর এই সন্তুষ্টি জ্ঞাপন করছেন? নবী যেরেমিয়াই কি এই প্রত্যাদেশ বহন করে এনেছেন?

: অসম্ভব নয়। কিন্তু হয়তো তাঁর কথাই একমাত্র কথা নয়। আমি যতটা অনুসন্ধান করতে পেরেছি, তাতে মনে হচ্ছে হয়তো বা প্রভুর মন্দির থেকেও আভাসে ইঙ্গিতে, কখন বা সশব্দে একই কথা প্রচারিত হচ্ছে। কথাটা বেশ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।

: কাদমিয়েল, তুমি বিচক্ষণ। তোমার এই সন্দেহ সত্য হোক আর নাই হোক, সংকট-সংকুল যিরূশালেমের সমস্যার মূল সূত্রগুলো তোমার দৃষ্টি এড়াতে পারে নি। কিন্তু অধার্মিক রাজা কোন্ ধর্ম-বিরোধী কাজে লিপ্ত? তার বিরুদ্ধে মূল অভিযোগটা কি? কাদমিয়েল, তুমি যখন এতটাই বুঝতে পেরেছ, এ কথাটুকুও নিশ্চয়ই তোমার কানে এসেছে।

: এসেছে বই কি। তারা বলছে, আপনার পিতা রাজা যোশিয়ের আমলে তাঁর আদেশে সমগ্র য়াহুদা প্রদেশে ও যিরূশালেমে পরজাতীয় কল্পিত দেবতা বাল ও আশেরার উচ্চ বেদীগুলো ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল। এবং তাদের ও অন্যান্য পরজাতীয় দেবতাদের উদ্দেশে পূজা ও বলিদান নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আর আজ তাঁরই পুত্র রাজা যিহোয়াকীমের কাছ থেকে প্রশ্রয় পেয়ে সেই সমস্ত বিতাড়িত দেবতারা আবার নির্বিবাদে আসর জমিয়ে বসেছে। পরজাতীয়দের এই পাপাচার ও দুর্নীতি প্রতিবেশী য়িহুদী সম্প্রদায়কে পর্যন্ত সংক্রামিত করে তুলেছে। যিহোবা তাই ক্রুদ্ধ হয়েছেন। তারই ফলে যিরূশালেমের এই দুর্দশা।

: হ্যাঁ, এ অভিযোগ মিথ্যা নয়। আমি আমার পরজাতীয় প্রজাদের নিজ নিজ দেবতাকে পূজা করতে কোন রকম বাধা দিই নি। তাদের দেবতাদের ও পুণ্যস্থানগুলোকে ধ্বংস করে দেবার আদেশ দিই নি। আমার কাছে আশ্বাস পেয়েই আবার তারা তাদের ভাঙ্গা দেউলগুলোকে গড়ে তুলেছে। কিন্তু সেজন্য যিহোবার ক্রোধাগ্নি যদি প্রজ্বলিত হয়ে উঠে থাকে, তবে তা আমাকেই ভস্ম করুক, নির্দোষ প্রজারা তার ফল ভোগ করতে যাবে কেন? যিহোবার কি কোন বিচার নেই? এও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?

: মালিক, এসব কথা আমার মুখে হয়তো সাজে না, কিন্তু তবু আমি না বলে থাকতে পারছি না, আপনার সত্যিকারের শুভার্থী যারা, তাঁরা কিন্তু মনে করে সংখ্যালঘু পরজাতীয়দের প্রতি আপনি যে-অনুগ্রহ প্রদর্শন করেছেন, আপনার প্রতিপক্ষের হাতে সেইটাই সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।

: হুঁ। ভাল, কাদমিয়েল, যেরেমিয়ার সন্ধান পেয়েছ কিছু?

: না, মালিক, এ বিষয়ে এখনও সম্পূর্ণ অন্ধকারে আছি।

: শোন কাদমিয়েল, আচার্য পশহুর তাঁকে শিকার করবার জন্য হন্যে হয়ে ফিরছেন। কিন্তু তোমার যোগ্যতার উপর আমার বিশ্বাস আছে। আমি আশা করছি, এই শিকারের প্রতিযোগিতায় তিনি তোমাকে হটাতে পারবেন না। যদি তুমি তাঁকে ধরতে পার, তবে শুনে রাখ, সেই খবরটা প্রকাশ হবার আগেই আমি তাঁর সঙ্গে একবার গোপনে দেখা করতে চাই। কিন্তু সাবধান, সেই সাক্ষাৎকারের কথা তুমি ছাড়া আর একটি জনপ্রাণীও যেন জানতে না পারে।

: আপনার আদেশ প্রতিপালনের জন্য চেষ্টার ত্রুটি হবে না। কিন্তু ব্যাপারটা আমার কাছে বড়ই রহস্যময় বলে মনে হচ্ছে। নবী যেরেমিয়াকে আমি যতটা জানি, তাতে তাঁর সম্পর্কে একথা আমি চিন্তাই করতে পারি না যে, তিনি প্রাণের ভয়ে পালিয়ে থাকবেন। ভয় কাকে বলে তিনি তা জানেন না।

: হ্যাঁ, এই রহস্যের চাবিকাঠিটা অবশ্যই খুঁজে বার করা দরকার। আচ্ছা, তুমি যাও, কাদমিয়েল, অবিলম্বে কাজে হাত লাগাও। ভুলো না, আচার্য পশহুরের সঙ্গে তোমার প্রতিযোগিতা। যাও।

: কিন্তু আমার-যে আরও কথা বলবার আছে। এই মাত্র সংবাদ পেলাম বাবিলরাজ নেবুকাডজারের সেনাপতি সসৈন্যে এগিয়ে আসছেন।

: বল কি কাদমিয়েল! এতক্ষণ বাদে এই কথাটা তুমি আমাকে বললে!

: সংবাদটা তেমন নির্ভরযোগ্য নয়। উড়ো খবর হওয়াই সম্ভব। তা ছাড়া যিরূশালেমই-যে তাদের লক্ষ্য এ কথাই বা কেমন করে বলা যাবে? সেইজন্যই খবরটা-সম্পর্কে তেমন গুরুত্ব দিই নি।

: না, না, অবহেলা কোরো না। সঠিক খবর জানবার জন্য এখনই লোক পাঠাও।

: এই আমি যাচ্ছি।

কাদমিয়েল চলে গেল।

সন্ধ্যার অন্ধকার নেমে এসেছে। রাজপ্রাসাদের বাতিগুলো একে একে জ্বলে উঠল। ঝলমল করে উঠল রাজপ্রাসাদ, রত্নভূষণা সুন্দরীর মত। সেই আলোকে রাজা দেখতে পেলেন সুসজ্জিতা রানী নেহুশতা সহচরীদের সঙ্গে নিয়ে কোথায় চলেছেন।

রাজা ডাকলেন : রানী, ও আমার রানী, ওগো রানী, শোন, একটু দাঁড়াও। রানী এগিয়ে এলেন

: আমাকে ডাকছো?

: হ্যাঁ, ডাকছি। কোথায় চলেছ এমন রূপের ঢেউ তুলে? ইস্, আমার চোখ দুটোকে একেবারে ঝলসে দিলে! তুমি কি আমাকে পাগল না করে ছাড়বে না?

: ঠাট্টা রাখো। মন্দিরে চলেছি, এখন ওসব কথা বলতে নেই।

: তাই নাকি? থাক তবে আর বলব না। কিন্তু তোমার সঙ্গে এরা সব কারা?

: কেন, আমার দাসীরা সব। এরা প্রভুর অর্ঘ্য বহন করে নিয়ে চলেছে।

: কি প্রার্থনা করবে প্রভুর কাছে?

: কে, আমি? আমি বলব-হে প্রভু, আমার সমস্ত পাপ মার্জনা করো…

: রানী, অনেক পাপ করেছ বুঝি?

: বল কি, পাপ করি নি? প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে পাপ করে চলেছি যে।

: আহা, তবে তো জমে জমে একেবারে পাপের পাহাড় হয়ে উঠেছে। এত পাপ কর কেন রানী?

: ইস্, নিজে যেন কত ভাল। তুমি পাপ কর না? তোমার জন্যই তো আমার যত দুশ্চিন্তা।

: আমি? বারে, আমি আবার কি পাপ করলাম?

: নাঃ, তুমি কিছু কর না। তবে লোকে এত সমস্ত কথা বলে কেন? শুনতে শুনতে আমার কান-যে একেবারে ঝালাপালা হয়ে গেল। আমার এমন কান্না পায়-

: কান্না পায়? আহা, কি বলে গো লোকে?

: বলে, এত অনাবৃষ্টি, অজন্মা আর শস্যহানি, সব নাকি তোমারই পাপে। আচ্ছা, বল না, এসব কি সত্যি?

: কে বলেছে এসব কথা? বল না তাদের নাম।

: আহা, আমি কি তাদের চিনি নাকি? এ কথা তো সবাই বলে।

: আচার্য পশহুর বলেন না কিছু?

: আহা, এমন মানুষ আর হয় না। সারা দেশের মধ্যে এই একজন লোকই তোমাকে সবচেয়ে বেশী ভালবাসেন।

: ও মা, তোমার চেয়েও বেশী?

: তোমার কথা নিয়ে কত দুঃখ করেন। কত চিন্তা করেন তোমার জন্য। সব সময় শুধু তোমার কথাই জানতে চান। রাজপ্রাসাদের খুঁটিনাটি সমস্ত খবর তাঁর জানা চাই।

: আমাকেও তিনি খুবই অনুগ্রহ করে থাকেন।

: তাই নাকি? হ্যাঁ, ঠিকই বলছে, আচার্য পশহুরের মত মানুষ হয় না। পাপীদের প্রতি চিরদিনই তাঁর আসক্তি, বিশেষ করে পাপিনীদের প্রতি।

: কি বলছ? এক এক সময় এমন করে কথা বল তুমি যে, আমি তার মানে বুঝতে পারি না।

: থাক, তোমার আর বুঝে কাজ নেই। সব কথারই কি মানে থাকে নাকি? তুমি তোমার শুভ কর্মে যাও, দেরী হয়ে যাচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *