নয়
লেখক যোনাথন আর তাঁর সঙ্গী যখন মন্দিরপ্রাঙ্গণে এসে প্রবেশ করলেন, বাইরে তখন সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে নেমে এসেছে। আকাশের এখানে ওখানে দুটি একটি করে তারা দেখা যাচ্ছে।
সারা মন্দির আলোয় আলোয় ঝলমল করছে। সন্ধ্যার অন্ধকার সেখানে এসে পা ফেলতে পারে নি। সন্ধ্যাবন্দনার শিঙ্গা থেকে পূজার্থীদের আহ্বান জানাচ্ছে। অবরোধের আগে এ সময় মন্দির-প্রাঙ্গণের খোলা চত্বরে মেলা বসে যেত। নগরের বাইরের গ্রামাঞ্চল থেকে রিহুদী ও পরজাতীয় দোকানীরা কত রকম মালপত্র নিয়ে দোকান সাজিয়ে বসতো। সোনা রূপার কাজ থেকে শুরু করে সৌখিন মনিহারী, ফলফলারী, তরিতরকারী হরেক রকমের জিনিসই এখানে উঠত। এই বাজারের তোলা খাজনা মন্দিরের আয়ের অংশ বলে গণ্য ছিল। কিন্তু এখন এই অবরুদ্ধ নগরীতে বাইরে থেকে মালপত্র আসা যাওয়ার পথ বন্ধ। মেলা আর জমে না। ছোট খাটো দুটো একটা দোকান নিয়ম মত খোলে বটে, কিন্তু কেনাকাটায় মানুষের মন নেই, সামর্থ্যও নেই। আসন্ন মৃত্যুর আশঙ্কায় খোঁটায় বাঁধা বলির পশুগুলো কাতর সুরে ডেকে ডেকে উঠছে। সারাদিন ধরে কত-যে বলি পড়ছে! যূপকাষ্ঠের চারদিকে রক্তাক্ত কর্দম তারই চিহ্ন বুকে ধরে আছে। পচা রক্তের দুর্গন্ধে বাতাস ভারী হয়ে আছে। ঘাতকের খড়গ এখনও নিবৃত্ত হয় নি। পাপার্থে বলি, শান্তির জন্য বলি, প্রায়শ্চিত্তের বলি, মানতের বলি, নিত্য নৈমিত্তিক বলি-বলির পর বলি চলছে। তবু কি যিহোবা তুষ্ট হবেন না?
পবিত্র মসিনা বস্ত্রধারী মন্দিরের দু’জন সেবককে আসতে দেখে বাইরের পূজার্থীরা সসম্ভ্রমে পথ ছেড়ে সরে দাঁড়াল। লেখক যোনাথন, আর তাঁর পিছে ছদ্মবেশী রাজা যিহোয়াকীম অঙ্গনের সীমানা ছাড়িয়ে মন্দিরের ভেতর প্রবেশ করলেন। দুঃসাহসী ছদ্মবেশীর বুকটা একবার কেঁপে উঠল। এই মন্দির রাজার রাজত্ব সীমার বাইরে। মন্দিরের সেবকগণ এখানে সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী। বাইরের লোকের এখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ। যে দূরদৃষ্টি এই বিধি লঙ্ঘন করে, প্রভুর ক্রোধে বজ্রাগ্নির মত তাকে মুহূর্তে দগ্ধ করে।
মোশির যুগে এমনি ঘটনাই ঘটেছিল, কোন্ য়িহুদী সন্তান সে কথা জ্ঞাত নয়? রাজা মনে মনে নিজেকে লক্ষ্য করে নিজেই হাসলেন। যুগ যুগ ধরে সমগ্র জাতির মনে যে-সংস্কার বদ্ধমূল হয়ে আছে, তিনিও তা থেকে মুক্ত নন। তিনি- যে বেশ ভয় পেয়েছেন, একথা নিজের কাছে কিছুতেই অস্বীকার করতে পারলেন না।
মন্দিরের পবিত্রতম কক্ষটিতে ঢুকতেই রাজার চোখ ঝলসে উঠল। সোনা, সোনা, সোনা, চারদিকেই শুধু সোনা-সোনার ছড়াছড়ি! ঘরের দেয়াল আগাগোড়া সোনার পাত দিয়ে মোড়াই করা। শত শত রত্নপ্রদীপের উজ্জ্বল আলো প্রাচীরের গায়ে প্রতিহত হয়ে ঠিকরে আসছে। মনে হয় সেই উজ্জ্বল কাঞ্চন-প্রাচীর যেন সমস্ত ঘরটিকে আলোকিত করে রেখেছে। দৈববাণী ঘোষণার স্থানটির সম্মুখে সূক্ষ্ম সোনার সুতো দিয়ে তৈরী একটি যবনিকা ঝুলছে। উজ্জ্বল আলোকে সেই যবনিকা সোনার হাসি হাসছে। ঘরের মধ্যে দুটি দশ হাত উঁচু পক্ষী-আকৃতি চেরাব মূর্তি। চেরাবদের পাঁচ হাত-বিশিষ্ট এক একটি ডানা। চারটি পাখা মিলে ঘরের এক দেয়াল থেকে আর এক দেয়াল পর্যন্ত বিস্তারিত। আর সেই পাখার ছায়ায় প্রভুর পবিত্র সিন্দুক বিরাজ করছে। লোকে বলে, এই সেই পবিত্র সিন্দুক যাকে নবী মোশি নিজ হস্তে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ঘরের দেয়ালের গায়ে নানা রকম ছোট বড় চেরাব মূর্তি, তালগাছ ও প্রস্ফুটিত ফুল ক্ষোদিত রয়েছে।
প্রভুর সেবার জন্য অসংখ্য স্বর্ণ, রৌপ্য ও পিতল পাত্র থরে থরে সজ্জিত আছে। শাখা-প্রশাখা-সমন্বিত দীপ-বৃক্ষগুলোর উপর রত্ন-প্রদীপ জ্বলছে। স্বর্ণময় ধূপপাত্রে ধূপ পুড়ছে। ধূপের ধোঁয়ায় সমস্ত ঘর সুবাসিত।
লেবীয় বাদকেরা মৃদঙ্গ, করতাল ও কাঁসির সহযোগে সন্ধ্যারতির বাজনা বাজাচ্ছে। আর সেই সবকিছু মিলে এমন একটি রহস্যময় পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে যে, মনটা গভীরভাবে অভিভূত হয়ে পড়ে। এক অদৃশ্য পরম সত্তার সম্মুখে মাথা যেন আপনা থেকেই নুয়ে আসতে চায়। রাজা মুহূর্তের জন্য আত্মবিস্মৃত হয়ে গিয়েছিলেন।
: এগিয়ে আসুন, লেখক যোনাথন ডাক দিলেন, এই যে সম্মুখে প্রভুর বেদী রাজা চেয়ে দেখলেন, প্রভুর বেদীর উপরে যজ্ঞাগ্নি প্রজ্বলিত করা হয়েছে। তিনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতে লাগলেন। একজন যাজক নিহত পশুর তাজা রক্তে অঞ্জলি পূর্ণ করে বেদীর সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। তিন সেই রক্ত বেদীর উপরে আর চারদিকে ছড়িয়ে দিলেন। আর সেই বেদীর শৃঙ্গ রক্তে রঞ্জিত করলেন। তারপর নিহত পশুটাকে টুকরো টুকরো করে কেটে প্রথমে মাথা, তারপর চর্বি শৃঙ্খলা মত স্তরে স্তরে জ্বলন্ত কাঠের উপর সাজিয়ে দিলেন। কিন্তু তিনি পশুর অস্ত্র ও পাগুলোকে জল দিয়ে ভাল করে ধুয়ে শোধন করে নিয়ে তারপর আগুনের উপর চাপালেন। পোড়া মাংসের সুগন্ধ বাতাসে ভাসতে লাগল। যিহোবা এই সুঘ্রাণে পরিতৃপ্ত হয়ে থাকেন।
ঘরে বহু লোক। কেউ তাঁদের দিকে লক্ষ করল না। রাজা প্রধান যাজকের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর ঐশ্বর্য রাজাকেও হার মানিয়েছে। মন্দিরের সেবকদের পবিত্র মসিনার বস্ত্র পরতে হয়, তাই তিনি মসিনার বস্ত্র পরেছেন। কিন্তু সেই মসিনার বস্ত্রের মাঝে মাঝে কত সূক্ষ্ম জরির কাজ। গলায় দুলছে চার লহর মালা। মরকত মণি, বৈদূর্য মণি, নীলকান্ত মণি, পোখরাজ, চুনী, পান্না-কত রকমের মহামূল্য মণি দিয়ে গাঁথা সেই মালা। এক রাজার ঐশ্বর্য যেন গলায় দুলছে। মাথায় রত্নমণ্ডিত স্বর্ণমুকুট, উজ্জ্বল আলোয় ঝলমল করছে।
: এগিয়ে চলুন, এগিয়ে চলুন, আপনার দ্রষ্টব্য এখানে নয়, লেখক যোনাথন ইঙ্গিতে ডাক দিলেন। রাজা সম্বিত ফিরে পেয়ে লেখক যোনাথনের পেছন পেছন দ্রুতপদে এগিয়ে চললেন। পেছনে লেবীয় বাদকদের ঐকতান সংবলিত বাজনা বাজতে লাগল। ধূপের ধোঁয়া কুণ্ডলীর পর কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠতে লাগল। যজ্ঞাগ্নিতে উৎসর্গীকৃত পশুর মাংস দগ্ধ হয়ে সুগন্ধ ছড়াতে লাগল, আর প্রধান যাজকের গলায় চার লহরের মণি মালা দীপালোকে ঝলমল করতে লাগল।
রাজা অবাক হয়ে দেখলেন, ঘরের পর ঘর, গলির পর গলি, ডাইনে বাঁয়ে, সামনে পেছনে-কেমন ধাঁধা লেগে যায়। মন্ত্রমুগ্ধের মত তিনি লেখক যোনাথনকে অনুসরণ করে চললেন। এ যেন মর্ত্যলোকের সীমানার বাইরে এক রহস্যের মায়াপুরী। অবশেষে লেখক যোনাথন একটা দেয়ালের মুখোমুখি হয়ে থেমে গেলেন।
: রাজা, এবার তবে প্রস্তুত হোন।
: কিসের প্রস্তুতি? বিপদের জন্য? সে তো হয়েই আছি। এ বিষয়ে আপনি কখনই আমাকে অপ্রস্তুত অবস্থায় পাবেন না।
: না, না, বিপদের কথাই কি আমি বলছি? আপনি যা দেখতে এসেছে, এবার তা দেখবার জন্য প্রস্তুত হোন।
দেয়ালের গায়ে ছোট একটা গর্ত। লেখক যোনাথন সেই গর্তের মধ্যে আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে দিয়ে কি যেন টানলেন। রাজার বিস্ময়চকিত দৃষ্টির সামনেই দেয়ালটা আস্তে ফাঁক হয়ে গেল। এ কি যাদুর খেলা!
: প্রবেশ করুন রাজা।
রাজা মন্ত্রমুগ্ধের মত পেছনে পেছনে প্রবেশ করলেন। এখান থেকে একটা সিঁড়ি ঘুরতে ঘুরতে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। নামছেন, নামছেনই, এ কোথায় চলেছেন? ধাপের পর ধাপ নামতে নামতে হঠাৎ চমকে উঠলেন রাজা। তাঁরা বড় একটা ঘরের খোলা দরজার মুখে এসে দাঁড়িয়েছেন। সারাটা ঘরে মাত্র দুটি ক্ষীণ বাতি জ্বলছে, এত বড় একটা ঘরকে সম্পূর্ণ আলোকিত করে তোলা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। ঘরের বাতাস ধূপের ধোঁয়ায় যেন মূর্ছিত হয়ে পড়ে আছে। কেমন একটা গুরুভার অস্বস্তির বোঝা তাঁর বুকের উপর চেপে বসল। এ কোথায় এসেছেন তিনি? সেই রহস্যময় আধ-আলো আধ- অন্ধকারের মধ্যে অস্পষ্ট দেখা গেল, কয়েকটি ছায়ামূর্তি শ্রেণীবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে। শিউরে উঠলেন রাজা। তবে কি তাঁরা জীবলোকের সীমানা ছাড়িয়ে প্রেতলোকে প্রবেশ করেছেন? ছায়ামূর্তিদের কাছে একটি করে ধুনুচি, তা থেকে সুবাসিত ধূপের ধোঁয়া উঠছে।
একটু কেঁপে ওঠা কণ্ঠে রাজা মুদুস্বরে জিজ্ঞাসা করলেন : এঁরা, এঁরা কারা? লেখক যোনাথন একটু হেসে উত্তর দিলেন
: আমাদের য়িহুদী সমাজেরই লোক। নাম উল্লেখ করতে চাই না। এঁরা সবাই বিশিষ্ট ও সম্পন্ন নাগরিক।
: এঁরা এই মৃত্যুপুরীতে দাঁড়িয়ে কি করছেন?
: মৃত্যুপুরী নয়, এ গুপ্ত মন্দির। এঁরা বর্তমান সংকট থেকে রক্ষা পাবার জন্য ও আপন আপন উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য পুজো দিচ্ছেন।
: পুজো? কার কাছে?
: সম্মুখের দেয়ালের দিকে তাকিয়ে দেখুন। কী দেখছেন?
: গোবৎস, ঈগল, সাপ আর নানা জাতির সরীসৃপদের মূর্তি।
: ঠিকই দেখেছেন। এই সমস্ত দেবতাদের প্রীত্যর্থেই পুজো দেওয়া হচ্ছে।
: পশু পাখি পুজো? যিহোবার মন্দিরে?
: হ্যাঁ, কিন্তু প্রভুর চক্ষুর আড়ালে।
লেখক যোনাথন রাজার হাত ধরে টানলেন : ডান দিকে এগিয়ে চলুন। একটা গলি ধরে এগোতে এগোতে তাঁরা একটা দেয়ালের মুখোমুখি এসে থামলেন। দেয়ালের গায়ে তেমনি এক গর্ত। লেখক যোনাথন সেই গর্তে আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে দিয়ে টানলেন। দেয়াল ফাঁক হয়ে গেল। তার মধ্য দিয়ে তাঁরা আর একটি কক্ষে এসে প্রবেশ করলেন। ঘরটি উজ্জ্বল আলোকে আলোকিত। আবছা অন্ধকারের মধ্য থেকে হঠাৎ এত আলোর মধ্যে প্রবেশ করে তাঁদের চোখ ঝলসে গেল। সেই আলোকে রাজা দেখলেন কয়েকজন লোক পূর্বদিকে মুখ করে বদ্ধাঞ্জলি হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন।
: এঁরা আবার কারা? এঁরাও কি পুজো করছেন?
: পুবের দেয়ালের দিকে চেয়ে দেখুন-স্বর্ণনির্মিত সূর্যমূর্তি। এঁরা মিসর-রাজের কাছ থেকে সাহায্যের প্রত্যাশায় মিসরের সূর্যদেবতা ‘রা’-এর কাছে প্রার্থনা করছেন।
: আচার্য পশহুর কি তবে পশুপূজা ও সূর্যপূজায় বিশ্বাসী?
: আচার্য পশহুর বহু ঊর্ধ্বলোকে বিচরণ করেন। তিনি সাধারণের বুদ্ধির অধিগম্য নন। তিনি কী-যে বিশ্বাস করেন এবং কীইবা বিশ্বাস করেন না, একমাত্র তিনি ছাড়া আর কেউ সে কথা বলতে পারে না। তবে এই সমস্ত গুপ্ত পূজকদের তাঁদের পুজোর জন্য খুব ভারী হাতেই দক্ষিণা দিতে হয়। যে সে লোকের এখানে প্রবেশের অধিকার নেই।
: লেখক যোনাথন, আর কত বিস্ময় আমার জন্য সঞ্চিত রয়েছে?
: বিস্ময়ের সমুদ্রে থই পাবেন না রাজা। কিন্তু সময় আমাদের অত্যন্ত সীমাবদ্ধ। খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। বাম দিকে এগিয়ে চলুন।
বেশ কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে আবার তাঁরা দেয়ালের মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালেন। এখানেও সেই একই ব্যবস্থা। একই নিয়মে দেয়ালটা ফাঁক হয়ে গেল। এখান থেকে সোজা ওপরের দিকে একটা সিঁড়ি উঠে গিয়েছে। তাঁরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠলেন। আবার সেই দেয়াল। লেখক যোনাথনের আঙ্গুলের ছোঁয়ায় দেয়ালটা ফাঁক হয়ে তাঁদের পথ করে দিল।
সামনে খোলা অঙ্গন। অঙ্গনের দিকেই মুখ করে পাশাপাশি কয়েকটি কক্ষ। এখান থেকে বাইরের পৃথিবীর কিছুই দেখা যায় না। বাইরের শব্দও কমই শুনতে পাওয়া যায়। শুধু মাঝে মাঝে মন্দিরের কাঁসি ঘণ্টার অস্ফুট শব্দ ভেসে আসছিল।
হঠাৎ উপলাহত ঝরনার মত মধুর কলহাস্যের ঝংকার শুনতে পেয়ে রাজা চমকে উঠলেন। কয়েকটি লাবণ্যময়ী তরুণী হাসাহাসি করতে করতে তাঁদের দিকেই এগিয়ে আসছে। সব কয়টিই অপরূপ সুন্দরী। যৌবনের অসংযত প্রবাহ যেন দু’কূল ছাপিয়ে উপচে উঠছে। মন্দিরের সেবকগণ, আমাদের অভিবাদন গ্রহণ করুন।
লেখক যোনাথন নিয়ম রক্ষার হাসি হেসে তাদের অভিবাদন গ্রহণ করলেন। একটা মেয়ে একেবারে রাজার গা ঘেঁষে এসে দাঁড়াল। রাজা একটু পিছিয়ে গেলেন। নিঃসংকোচ দৃষ্টিতে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে মুখরা মেয়েটা বলে উঠল : আমাদের মধ্যে কোন ভাগ্যবতী কি প্রভুর এই কমনীয়-কান্তি সেবকটির নৈশ প্ৰসাদ কামনা করতে পারে না?
তার এই কথায় আর সব মেয়েরা হাসির ধাক্কায় ভেঙ্গে পড়ল। লেখক যোনাথন কণ্ঠস্বরে কাঠিন্য ঢেলে দিয়ে বললেন, তোমরা শিষ্টতা রক্ষা করে কথা বলো। মুখরা যুবতী এই শাসনে বিন্দুমাত্রও অপ্রতিভ বোধ করল না। সে আদুরে মেয়ের ভঙ্গিতে ঘাড় বাঁকিয়ে আধ আধ সুরে বলল : হ্যাঁগো, আমি কি তোমাদের সঙ্গে কোন অশিষ্টতা করেছি? কিন্তু প্রভুর ওই সেবকটি এমন ভীতু কেন? আমি কি সাপ না বাঘ যে, আমার গায়ের হাওয়া লাগতেই ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল?
তারপর আর একটি যুবতীকে কাছে টেনে নিয়ে এসে তাকে দেখিয়ে বলল
: আমাদের প্রধান যাজককে বলবেন, তিনি ক’দিন ধরে আসছেন না কেন? তাঁর অভাবে তাঁর এই ফুলটি-যে শুকিয়ে যাচ্ছে।
তার কথা শুনে মেয়েরা হাসির রোল তুলে পাশ কাটিয়ে আর একদিকে চলে গেল।
রাজা সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে লেখক যোনাথনের দিকে তাকালেন।
লেখক যোনাথন তাঁর প্রশ্ন বুঝতে পারলেন, এরা? এরা প্রভুর দাসী।
: এদের কাজ?
: সব কথাই কি মুখ ফুটে বলতে হবে? ওদের কাজ প্রভুর সেবকদের চিত্তবিনোদন।
: য়িহুদী?
: য়িহুদীও আছে, পরজাতীয়াও আছে।
তাঁরা প্রভুর দাসীদের সুরম্য সুসজ্জিত কক্ষগুলোর পাশ দিয়ে চলেছেন, এমন সময় দেখলেন, একটি যুবতী ঘরের মধ্যে একটি কাঠের পুতুলের সামনে এলোচুলে মাথা নত করে বিড় বিড় করে কি যেন বকছে।
: ও কি? এ কি করছে? এতবড় মেয়ে, পুতুল খেলছে নাকি?
: পুতুল খেলা কোথায় দেখলেন? এ-যে পুজো করছে।
: কার পুজো?
: এ মেয়েটি পরজাতীয়া। তম্মুজ দেবতার পুজো করছে।
রাজা মনে মনে ভাবলেন, যিহোবার মন্দিরে সবার অবারিত দ্বার। সকলেরই এখানে স্থান আছে। শুধু রাজার প্রবেশটাই কি অনধিকার-প্রবেশ?
চলতে চলতে অপর প্রান্তে তাঁরা আবার একটা দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়ালেন। রাজা এতক্ষণে বুঝতে পেরেছিলেন, কোন বাধাই বাধা নয়। লেখক যোনাথনের অমোঘ স্পর্শে এই দেয়ালও পথ করে দেবে।
: লেখক যোনাথন, আমার দেখার কাজ হয়ে গেছে। আপনি এখন আমাকে এখান থেকে বাইরে নিয়ে চলুন।
: আর কিছু দেখবেন না, রাজা?
: না, আমি আর দেখতে চাই না।
রাজা মন্দির থেকে বাইরে বেরিয়ে এলেন। তাঁর যেন দম বন্ধ হয়ে আসছিল। তিনি বুক ভরে বাইরের বাতাস টেনে নিলেন। রাস্তায় তখন লোকের ভীড়। লেখক যোনাথন মন্দিরেই রয়ে গেলেন। সাথীহীন রাজা যিহোয়াকীম মন্দিরের সীমানা ছাড়িয়ে রাজপথ ধরে চলতে লাগলেন। চিন্তাচ্ছন্ন মনে তিনি এগিয়ে চলেছেন। একটি সন্ধ্যা তাঁর জীবনে এ কি অভিজ্ঞতা এনে দিয়েছে! মন্দির ছাড়িয়ে রাজপথ ধরে কিছুটা এগিয়েছেন এমন সময় কে যেন তাঁকে ডাকল-রাজা!
চমকে উঠলেন তিনি। না, নিশ্চয়ই তিনি ভুল শুনেছেন। এই পোশাকে কে তাঁকে চিনবে? আবার তিনি পা বাড়ালেন।
: দাঁড়ান!
এবার আর কোন সন্দেহ নেই। রাজা পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখলেন, তাঁর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন আচার্য পশহুর।
কতক্ষণ অপলক নেত্রে দু’জন দু’জনের মুখের দিকে চেয়ে রইলেন।
: এতই আপনার দুঃসাহস রাজা?
: আপনার চেয়ে বেশী নয়, আচার্য পশহুর।
: আপনি মন্দির-সেবকের ছদ্মবেশে কেন?
: আমার বেশভূষা-সম্পর্কে কৈফিয়ৎ চাইবার অধিকার কে আপনাকে দিয়েছে?
: স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে আপনি মন্দির থেকে বেরিয়ে আসছেন। নিশ্চয়ই কোন সদুদ্দেশ্য নিয়ে আপনি ছদ্মবেশে মন্দিরের ভিতর প্রবেশ করেন নি। জানেন এর শাস্তি কি?
: আমি তা জানতে চাই নে। আমার যা জানবার প্রয়োজন ছিল, তা আমি জেনেছি।
: কি জেনেছেন আপনি?
: আপনাকে জেনেছি। আপনার সম্পর্কে ইতিপূর্বে অনেক কিছুই জানতাম। যেটুকু বাকী ছিল, তাও আজ জানলাম। আজ আমার কৌতূহল পূর্ণ হয়েছে। রাজা দেখলেন, মুহূর্তে আচার্য পশহুরের চোখ থেকে যেন তীব্র একটা আলোকচ্ছটা বিকীর্ণ হয়ে পড়ল। পশহুর বাঘের মতই গর্জন করে উঠলেন : ধরো, ধরো তোমরা একে। এই পাপাত্মা মন্দির-সেবক প্রভুর মন্দিরের পবিত্র শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে শাস্তির ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। তোমরা একে বন্দী করে প্রভুর মন্দিরের মধ্যে নিয়ে যাও।
আচার্য পশহুরের সঙ্গে চার পাঁচজন মসিনাবস্ত্রধারী অনুচর ছিল। এই আদেশ পেয়ে তারা রাজাকে ঘেরাও করে ফেলল। প্রকাশ্য জনবহুল রাজপথের উপরে এমন একটা সংকটজনক অবস্থায় পড়তে হতে পারে, রাজা তা একেবারেই ভাবতে পারেন নি। অভ্যাসের বশে আত্মরক্ষার জন্য তিনি তাঁর কোমরে হাত দিলেন। কিন্তু হায় ছদ্মবেশী, কোথায় তোমার তরবারী!
আর ঠিক সেই সময়েই চারদিকে একটা চেঁচামেচি শোনা গেল, সর, সর, ঘোড়া আসছে, ঘোড়া আসছে? আরে লোকটা কি ক্ষেপে গেছে নাকি? ভিড়ের মধ্য দিয়েই কেমন করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিয়েছে!
ঘোড়ার খুরের খট্ খট্ শব্দ শুনে রাজা সচকিত হয়ে চেয়ে দেখলেন, একজন ঘোড়সওয়ার ভিড় ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে তাঁর দিকেই ছুটে আসছে। ঘোড়সওয়ারের হাতের খোলা তরোয়াল রাস্তায় বাতির আলোয় ঝিলিক মেরে উঠল। লোকজন ভয়ে দু’পাশে সরে গিয়ে তাকে পথ করে দিল। সেই ধাক্কায় আচার্য পশহুরের অনুচরেরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ল।
আরোহী ঘোড়া থেকে লাফ দিয়ে পড়ে রাজার কাছে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানাল।
: কে, কাদমিয়েল?
: মালিক, এক মুহূর্ত দেরী নয়, এখনই এই ঘোড়া ছুটিয়ে চলে যান।
: আর তুমি?
: আমার জন্য ভাববেন না। ওরা আমার কি করবে?
ভাববার সময় ছিল না। রাজা লাফ দিয়ে ঘোড়ার উপর উঠে পড়লেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই শিক্ষিত ঘোড়া আরোহীর ইঙ্গিতে টগবগ করে প্রাসাদের দিকে ছুটল। রাজার লোক এর মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে না পেরে অবাক হয়ে হা করে রইল।
আচার্য পশহুর ঘায়েল বাঘের মত হিংস্র দৃষ্টিতে সেই দিকে তাকিয়ে রইলেন। একটুর জন্য শিকারটা হাত থেকে ফসকে গেল। তখনও দেখা যাচ্ছিল, ঘোড়াটা ছুটে চলেছে, আর অশ্বারোহীর মসিনার কাপড়ের আঁচলটা বাতাসে লটপট করে উড়ছে। ক্রোধোন্মত্ত পশহুর দাঁতে দাঁত চেপে তীব্র চাপা কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন-বটে, আচ্ছা!
