আট
রাজা যিহোয়াকীমের মন্ত্রণাসভার ঘন ঘন অধিবেশন চলছে। কিন্তু সমস্যা যেমন ছিল, তেমনই আছে। কোন সমাধানে পৌঁছান যায় নি।
এ সম্পর্কে বহু আলোচনা হয়েছে। প্রথম পন্থা, অনির্দিষ্টকাল পর্যন্ত এইভাবে অপেক্ষা করা। হয়তো এর মধ্যে মিসর থেকে সাহায্য এসে যেতেও পারে। হয়তো বা ক্যালদীয়েরা দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে করতে অবশেষে ধৈর্য হারিয়ে অবরোধ তুলে নিয়ে ফিরে যেতেও পারে। ইতিমধ্যে তাদের দেশেও নানারূপ অভ্যন্তরীণ সংকটও দেখা দিতে পারে। এ-রকম ঘটনা-যে ইতিপূর্বে আর কখনও ঘটে নি, তা তো নয়।
দ্বিতীয় পন্থা, ক্যালদীয়দের কাছে আত্মসমৰ্পণ।
তৃতীয় পন্থা হিসেবে রাজা যিহোয়াকীম যে-প্রস্তাব করেছিলেন, সেই প্রস্তাবের পক্ষে কেউ ছিল না। তিনি বলেছিলেন, আমাদের যেটুকু শক্তি আছে, তাই নিয়ে আসুন আমরা সম্মুখ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। এভাবে আটকে থেকে দিনে দিনে পচে মরার চেয়ে মুখোমুখি লড়াইয়ের ঝুঁকি নেওয়া-যে অনেক ভাল। সেনাপতি প্রতিবাদ করে বললেন : এ হবে নিছক আত্মহত্যা। আমাদের আছে কি? কি নিয়ে আমরা এই দুর্ধর্ষ ক্যালদীয়দের সঙ্গে যুদ্ধ করবো?
রাজা যিহোয়াকীম বললেন : সময়-বিশেষে এ রকম আত্মহত্যা বীরেরই ধর্ম। কিন্তু তার এই কথা কারুরই মনঃপূত হলো না।
এইভাবে দিনের পর দিন গড়িয়ে চলল। নগরে সঞ্চিত শস্যের পরিমাণ কমতে কমতে সংকটজনক পর্যায়ে এসে দাঁড়ালো। যতই দিন যাচ্ছিল, এ জিনিসটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে আসছিল যে, অনির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত এইভাবে অপেক্ষা করে চলা শুধু কথার কথাই মাত্র, কার্যতঃ সম্ভব নয়।
পরিস্থিতি যতই কঠিন হয়ে আসছিল, নগরের অভ্যন্তরীণ অবস্থাও ততই জটিল হয়ে উঠছিল। প্রাণ বাঁচাবার জন্য নীচের তলার মানুষগুলো ছটফট করতে শুরু করে দিয়েছে। ক্ষুধার তাড়নায় তারা পাগল হয়ে উঠেছে। অপরদিকে উপরতলার উঁচু মহলের লোকেরা আপনাদের জানমাল বাঁচাবার জন্য যে যে-পথ দিয়ে পারেন, নিত্য নতুন সুরঙ্গ পথের সন্ধানে ব্যস্ত। এই নিয়ে নিজেদের মধ্যে দলাদলি ও ষড়যন্ত্র দিন দিনই তীব্র হয়ে উঠতে লাগল।
ইতিমধ্যে কাদমিয়েল একদিন এসে সংবাদ দিল, অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর। নিরুদ্বেগ প্রশান্ত কণ্ঠে রাজা যিহোয়াকীম উত্তর দিলেন, তা জানি।
: না, সবটুকু জানেন না। হয়তো বা দু’একদিনের মধ্যেই সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
: সমস্যার সমাধান হয়ে যাওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। যে-ভাবেই হোক, বৰ্তমান অবস্থার পরিসমাপ্তি ঘটুক, এটাই আমি কামনা করি। আমি বড় ক্লান্ত। কাদমিয়েল, আমি আর এইভাবে টেনে টেনে চলতে পারছি না। তাই তো সেদিন বলেছিলাম, চল যাই, খোলা তরোয়াল নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ি। কিন্তু কেউ তাতে রাজী নয়। সেনাপতি বললেন, এ হবে আত্মহত্যা। আরে, এ-যে আত্মহত্যা, তা কি আর আমি জানি না? শোন কাদমিয়েল- কাদমিয়েল, তুমি আজ আমার দাস নও, তুমি আমার নিকটতম বন্ধু। শোন তোমাকে বলছি, যেদিন থেকে এই পাপ-সিংহাসনে আমি বসেছি, সেদিন থেকেই তিলে তিলে আত্মহত্যা করে চলেছি। আর শুধু কি আমি? আমার মনে হয় এই হতভাগ্য য়িহুদী জাতিও আমার মতই আত্মহত্যা করে চলেছে। এর চেয়ে একটা উজ্জ্বল ও গরিমাময় আত্মহত্যার মধ্য দিয়েই পৃথিবীর বুক থেকে নিঃশেষ হয়ে যাওয়াটাই কি ভাল ছিল না?
: কিন্তু মালিক, আপনি আত্মহত্যা করবার জন্য প্রস্তুত থাকলে কি হবে? আর কেউ-যে তাতে রাজী নয়। কিন্তু তারা সবাই নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে নেই। আমি-যে সংবাদ বহন করে এনেছি, তা বলতে আমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে।
: কোন চিন্তা করো না কাদমিয়েল। আমি যে-কোন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। তুমি স্বচ্ছন্দে বল।
: মালিক, আচার্য পশহুরের সৈন্যবাহিনীর মধ্যে প্রভাব আছে এ কথা আপনি বিদিত আছেন।
: অবশ্যই আছি। কিন্তু শুধু কি তাই, আচার্য পশহুর কোথায় নেই? এমন কি রাজকুল ও রাজ-অন্তঃপুরের মধ্যেও তাঁর অদৃশ্য হস্ত নিরবধি কাজ করে চলেছে। আমি কি তার কিছুই জানি না? কিন্তু কি করব? চক্ষু, কর্ণ, জিহ্বা থাকতেও আজ আমাকে অন্ধ, বধির, মূক হয়েই থাকতে হচ্ছে। রাজার মত অসহায় আর কে আছে? রাজা এখানে পুত্তলিকার মতই সিংহাসনের শোভা মাত্র।
: শুনুন তবে। আচার্য পশহুর আর সৈন্যবাহিনীর অধ্যক্ষেরা একমত হয়ে স্থির করেছেন, আপনাকে বাবিলরাজের হাতে তুলে দিয়ে তাঁরা যিরূশালেমকে রক্ষা করবার চেষ্টা করবেন। সেনাপতি প্রথমতঃ এতে রাজী ছিলেন না। কিন্তু তিনি একা আর কি করবেন? শেষ পর্যন্ত তাঁকেও সম্মতি দিতে হয়েছে। আর শুনতে পাচ্ছি রাজকুলের কেউ কেউ নাকি এ ব্যাপারে জড়িত আছেন।
রাজা হাসলেন : তা থাকাই সম্ভব। কিন্তু আমি ভাবছি, আমার এই রাজকীয় দেহটা কি এমনই মহামূল্য সম্পদ যে, শুধু আমাকে নিয়েই তারা খুশী হয়ে ঘরে ফিরে যাবে!
: তারা তাই মনে করে। বাবিলের চিরশত্রু মিশরের ফেরাউন-কর্তৃক অভিষিক্ত রাজা যিহোয়াকীমকে বাবিলরাজের হাতে উপঢৌকনরূপে তুলে দিয়ে তারা তার কাছ থেকে অনুগ্রহলাভের আশা করে।
: একদিকে মিসর, আর একদিকে বাবিল, আর হায় দুর্ভাগ্য নগরী, তুমি মাঝখানে তাদের ক্রীড়নক। তোমাকে নিয়ে তারা শক্তির খেলা খেলে চলেছে। আর রাজা যিহোয়াকীম, তুমি যিরূশালেমের সকল পাপের প্রতিভূ। জাতির সবকিছু অপরাধ, দোষ-ত্রুটি, পতন-স্খলন, সবকিছুর উপলক্ষ ও কেন্দ্রস্থল তুমি। তোমাকে বলি দিয়ে তোমার রক্ত দানে জাতির পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে।
: ওরা বলছে মিসরের জন্যই যিরূশালেমের বুকে অভিশাপের কালো ছায়া নেমে এসেছে। আর রাজা যিহোয়াকীম সেই মিসরেরই সৃষ্টি।
: আজ থেকে এগার বছর আগে ভাগ্যের দোষে আমাকে এই সিংহাসনে বসতে হয়েছিল। কিন্তু সেদিন কি মন্দির-কর্তৃপক্ষ ফেরাউন নেকোর পদ চুম্বন করতে কম আগ্রহ প্রকাশ করেছেন? যিরূশালেমের একটি প্রাণীও কি সেদিন তার বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র প্রতিবাদ জানিয়েছিল? একথা কি সত্য নয়, যিরূশালেম নগরী আজও মিসরের দিকে উন্মুখ হয়ে তাকিয়ে আছে? আর এখন যদি দক্ষিণ দিকে মিসরের সৈন্যদের রণদামামা বেজে ওঠে, তাহলে সমস্ত নগরী ফেরাউনের জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠবে না? তখন যিহোবার প্রতিনিধি মন্দির-প্রভুদের মনোভাব আর মুখভঙ্গি কি দেখতে দেখতে বদলে যাবে না? কাদমিয়েল, এই প্রশ্ন ফিরে ফিরে আমার মনের উপর এসে আঘাত করে, এই এমন দুর্বল ও পরমুখাপেক্ষী জাতির এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকবার অধিকার আছে কি?
: মালিক, আমাদের কিছুই কি করবার নেই?
: অনেক তো করে দেখলাম কাদমিয়েল, এখন কিছু না করেই দেখি, দেখি তাতেই বা কি হয়? মনে হচ্ছে কি জান, এবার আমার ছুটির দিন এসে গেছে—সমস্ত দায়িত্ব আর দুর্ভাবনা থেকে ছুটি। কিন্তু সব কিছু থেকে ছুটি নেবার আগে একটা কাজ আমাকে করে যেতেই হবে। কাদমিয়েল, সে কাজে তুমি কিন্তু আমাকে বাধা দিতে পারবে না।
: আপনাকে বাধা দেব আমি! এমন কি কাজ আছে মালিক, যাতে আমি আপনাকে বাধা দিতে পারি?
: আমার বহুদিনের একটা সংকল্প পূর্ণ করবো। কিন্তু আমার সময় শেষ হয়ে এসেছে! এখন সময় হারালে আর সময় মিলবে না, একথা তোমাকে আগেও একদিন বলেছিলাম। আগামী কাল, হ্যাঁ আগামী কালই আমি মন্দিরে প্রবেশ করব। মন্দিরের রহস্যটা উদ্ঘাটন না করে আমার মরতে মন সরছে না। কাদমিয়েল বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে রাজার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। কথাটা যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিল না। তার বাক্যহীন মুখের দিকে তাকিয়ে রাজা বললেন : কি বলবে, বলেই ফেল।
: আপনি যাবেন না, আমার অনুরোধ আপনি যাবেন না।
: তোমার ওই অনুরোধ ফিরিয়ে নাও কাদমিয়েল, আমাকে যেতেই হবে।
: মালিক, আমি আজন্ম আপনার সেবা করেছি, কিন্তু নিজে থেকে কোনদিন কোন অনুগ্রহ চেয়েছি?
গভীর আবেগে রাজার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল। ধরা গলায় তিনি উত্তর দিলেন : না, তুমি তা চাও নি। চিরদিন নিঃশব্দে তুমি শুধু দিয়েই এসেছ।
: তবু—তবু আপনি আমাকে এই অনুগ্রহটুকু করবেন না?
রাজার চোখ দুটি ছলছল করে উঠলো : কেন তুমি এত উতলা হচ্ছ কাদমিয়েল? মৃত্যুপথযাত্রীর শেষ ইচ্ছাকে পূর্ণ করতে বাধা দিও না।
: কিন্তু একথা কে না জানে, একমাত্র লেবীয় সম্প্রদায়ভুক্ত লোক ছাড়া আর কেউ মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশের অধিকারী নয়। এই আদেশ অমান্য করলে প্রভুর অভিসম্পাত বজ্র হয়ে নেমে আসে।
: এ সব মন্দিরের প্রভুদের প্রচার।
: না, একথা শাস্ত্রে লিখিত আছে।
: তুমি শাস্ত্র দিয়ে আমার মুখ চাপা দেবে? তা পারবে না। তুমি কি জান না, ধর্ম-ব্যবসায়ীদের প্রয়োজন দেখা দিলে শাস্ত্রের পরিবর্তন পরিবর্ধন ও নব নব রূপান্তর গ্রহণে বেশী সময়ের দরকার হয় না।
: আপনার কথা শুনতে আমার ভয় হয়।
: এই ভয়কে পুঁজি করেই তো ওরা ওদের কারবার চালায়। আচ্ছা, ওকথা রাখো। কাদমিয়েল একটা কথা শোন। আচার্য পশহুরকে তো তুমি রগে রগে চেন। ওর মত পাষণ্ড তুমি কোথাও দেখেছ?
: না, দেখি নি।
: সেই পশহুর যদি প্রভুর মন্দিরে ঢোকবার অধিকারী হয়ে থাকে, আমি কি তবে সেখানে ঢুকতে পারি না?
কাদমিয়েল এবার হেসে বলল : আমার উপর যদি বিচারের ভার থাকতো আমি নিশ্চয়ই আপনাকে ঢুকতে দিতাম।
: যিহোবা কি তোমার চেয়েও নির্বোধ, আর তোমার চেয়েও অবিচারী?
: মালিক, আমার সহজ বুদ্ধি দিয়ে সংসারের কাজকর্ম পর্যন্তই চলে, ধর্মীয় ব্যাপারে তার প্রবেশ অনধিকারচর্চা। আমার বিচার দিয়ে আমি যখন প্রভুর বিচারকে যাচাই করতে পারবো না, তখন আমার শাস্ত্রকেই প্রামাণ্য বলে মানতে হবে।
: এবার তুমি আমাকে হার মানালে কাদমিয়েল। আমি আমার সহজ বুদ্ধি দিয়েই সবকিছুর বিচার করে থাকি। কিন্তু তুমি তোমার এক কথায় তার পথও আটকে দিলে। কিন্তু তাই বলে তুমি মনে করো না-যে তাই দিয়ে তুমি আমার মন্দির প্রবেশের পথ আটকাতে পারবে। তুমি আমার সর্বশেষ যুক্তিটা শোন। প্রভুর অভিসম্পাত তো নিয়তই আমার উপর বর্ষিত হচ্ছে। তবে আমার আর কিসের বা ভয়? জিজ্ঞাসা করো নবী যেরেমিয়াকে, জিজ্ঞাসা করো আচার্য পশহুরকে। যিরূশালেমের এই দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তি সর্ববিষয়েই পরস্পরের ঘোর বিরুদ্ধবাদী। কিন্তু কি আশ্চর্য দেখ, আমার সম্পর্কে তাঁরা উভয়েই এ বিষয়ে একমত। এছাড়া যিরূশালেমের যে-কোন নাগরিককে জিজ্ঞাসা কর, সবাই তাদের এই কথায় সায় দেবে।
: আমি তাদের কথা বিশ্বাস করি না।
: প্রভুর মন্দিরের অধ্যক্ষ এবং প্রভুর নবীর উক্তি-সম্পর্কে তোমার এই মন্তব্য বিশেষ আপত্তিকর। তোমার বিশ্বাস আর অবিশ্বাসে কিইবা এসে যায়! তোমার অবিশ্বাস কি প্রভুর অভিসম্পাতকে ঠেকিয়ে রাখতে পারবে? কিন্তু ওসব কথা থাক। একটা কথা শোন কাদমিয়েল। তুমি তো বুঝতে পারছো পতন আমার অবশ্যম্ভাবী। তুমি আর আমি যতই চেষ্টা করি না কেন, এই পতনকে ঠেকাতে পারবো না। কিন্তু যাবার আগে আমি আমার এই শেষ আকাঙ্ক্ষাটি পূর্ণ করে যেতে চাই। আমার অনুরোধ, তুমি তাতে বাধা দিও না। মন্দির-সম্পর্কে বিশ্বাস্য ও অবিশ্বাস্য অনেক কাহিনী শুনেছি। আমি তাকে একবার নিজের চোখে পরখ করে দেখতে চাই। আচার্য পশহুরের বহু মূর্তিই আমার দেখা আছে। কিন্তু মন্দিরের মধ্যে অতি সঙ্গোপনে তাঁর যে-সব লীলাখেলা চলছে তা আমাকে দেখতেই হবে।
: তাতেই বা কি লাভ? কিসের জন্য আপনি এই বিপজ্জনক ঝুঁকি নিতে চলেছেন?
: কিসের জন্য? নিছক কৌতূহল-নিবৃত্তি। রহস্য চিরদিনই মানুষকে টানে। এ কোন নতুন কথা নয়। তবে হ্যাঁ, যদি একটু সময় ও সুযোগ পাই—
: আপনি কি মনে করেন, তাই দিয়ে স্রোতের মোড় ঘোরাতে পারবেন? অসম্ভব, স্বচক্ষে দেখলেও আপনি তা প্রমাণ করতে পারবেন না। আপনি প্রকাশ্যে সে কথা বলতেই পারেন না। কারণ মন্দিরের অভ্যন্তরে প্রবেশের অধিকার স্বয়ং রাজারও নেই।
: হ্যাঁ, সেই আশা কমই করি। জানি সাধারণের মন পশহুরের হাতের মুঠোর মধ্যে বন্দী, পার্থিব রাজার হাত সেখানে পৌঁছায় না। কিন্তু ব্যর্থ চেষ্টা হলেও এই আমার শেষ চেষ্টা। এই চেষ্টা আমাকে করতেই হবে।
: মালিক, আমি-যে কি বলবো বুঝতে পারছি না। কিন্তু মন্দিরে প্রবেশ করা কিভাবে আপনার পক্ষে সম্ভবপর হবে? আপনি তো জানেন, মন্দির রাজার রাজত্বের সীমানার বাইরে। মালিক, আপনার কাছেই আমি শিক্ষা গ্রহণ করেছি, আপনার প্রতিভা আমার অজ্ঞাত নয়। কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না…
: বেশ, বুঝিয়ে দিচ্ছি। রাজা তিন বার হাততালি দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে পাশের ছোট্ট একটি দরজা খুলে গেল। ভিতর থেকে লেবীয় বস্ত্র-পরিহিত খর্বাকৃতি একটি লোক বেরিয়ে এল।
: আসুন, লেখক যোনাথন, আসন গ্রহণ করুন।
লেখক যোনাথন! কাদমিয়েল অবাক হয়ে তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সত্যিই তো লেখক যোনাথন। আচার্য পশহুরের পরম বিশ্বাসভাজন লেখক যোনাথন রাজপ্রাসাদে!
কাদমিয়েলের মুখের দিকে চেয়ে রাজা হেসে ফেললেন : খুবই আশ্চর্য হয়ে গেছ লেখক যোনাথনকে এই অবস্থায় দেখে? লেখক যোনাথন অনুগ্রহ করে আমাকে তাঁর সঙ্গে মন্দিরের অভ্যন্তরে নিয়ে যেতে সম্মত হয়েছেন। আমি অবশ্য লেবীয়দের ছদ্মবেশেই যাব।
: আপনাকে কে না চিনবে?
: এ তোমার ভুল ধারণা। রাজাকে লোকে চেনে না, তারা চেনে তাঁর রাজকীয় পোশাকটাকে।
: কিন্তু আচার্য পশহুর? আপনার ছদ্মবেশ কি তাঁকেও ভোলাতে পারবে।
: না, তা পারবে না। কিন্তু তিনি কাল সন্ধ্যার পরে মন্দিরে অনুপস্থিত থাকবেন। সেই সময়েই আমি মন্দিরে প্রবেশ করব স্থির করেছি।
এবার রাজা লেখক যোনাথনের দিকে তাকিয়ে বললেন, এখন ভেবে দেখুন লেখক যোনাথন, বড় বিপজ্জনক কাজ কিন্তু জীবন নিয়ে খেলা। ধরা পড়ে গেলে আপনি বা আমি দু’জনেরই প্রাণ-সংশয়। আমি আপনাকে আবার ভাল করে ভেবে দেখতে অনুরোধ করছি।
: রাজা, একদিন আপনি আমার জীবন দান করেছিলেন। সে কথা কি আমি ভুলে যেতে পারি? নগরের মানুষ, যে যাই ভাবুক, যে যাই বলুক আমি আপনাকে চিনবার সুযোগ পেয়েছি। আপনার জন্য যদি জীবন দিতে পারি, তবে তাকে আমার সৌভাগ্য বলেই মনে করব। তা ছাড়া-
: তা ছাড়া কি লেখক যোনাথন?
: তা ছাড়া বাঁচতে আর ইচ্ছা হয় না। মনে বড় গ্লানি জাগে রাজা। মাঝে মাঝে মনে হয় বেরিয়ে আসি এই মন্দির ছেড়ে। প্রভুর নাম করে এই ভণ্ডামি আর মিথ্যাচার আমার সহ্য হয় না। কিন্তু মন্দির ছেড়ে কোথায় যাব? এর বাইরে-যে আমাদের স্থান নেই। এই এক অন্ধকার গোলোকধাঁধাঁর মধ্যে আজন্ম ঘুরে মরছি। আমার দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। মনে হয় যেন আমার অঙ্গে অঙ্গে পচন ধরেছে। কিন্তু আমি-যে বেরিয়ে যাবার পথ জানি না। আমার মুক্তি নেই। শেষ পর্যন্ত এই যন্ত্র আমাকে জীর্ণ করে ফেলবে।
কাদমিয়েল আর একবার শেষ চেষ্টা করে দেখল
: লেখক যোনাথন, আপনি রাজাকে নিয়ে মন্দিরে যাবেন, আপনার ভয় নেই প্রাণে?
: কিসের ভয়?
: মন্দিরের বাইরের লোক মন্দিরের ভিতরে প্রবেশ করলে প্রভুর ক্রোধ বজ্র হয়ে ভেঙ্গে পড়বে না? লেখক যোনাথন শিশুর মত তরল কণ্ঠে হেসে উঠলেন কাদমিয়েল ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, হাসলেন-যে?
: সরলমতি শিশু! আপনারা কি যা কিছু শোনেন, সবই বিশ্বাস করেন?
: কেন মন্দিরের লোক হয়েও এ কথা কি আপনি মানেন না?
লেখক যোনাথনের মুখে মৃদু হাসি খেলা করে গেল : না। মন্দিরের লোক বলেই তো একথা আরও বেশী করে মানি না। আমি দেখে আসছি অনেক বাইরের লোক গোপনে এই মন্দিরে প্রবেশ করেছে; এখনও করে। কিন্তু তারা সম্পূর্ণ অক্ষত ও নিরাপদ অবস্থায় আছে-আমার আপনার মতই। রাজা হেসে উঠলেন। কিন্তু কাদমিয়েল হাসল না। সে ঝাঁঝাঁলো সুরে বলে উঠল
: এ কি কখনও হতে পারে? তবে শাস্ত্রে এমন কথা লিখবে কেন? সে কথার উত্তর দিন।
: আমি উত্তর দিতে যাব কেন? লেখক যোনাথনের কণ্ঠে উত্তেজনার সুর লক্ষ করা গেল। জিজ্ঞাসা করুন তাঁদের কাছে যাঁরা এ সমস্ত শাস্ত্র রচনা করেছেন। আমরা সামান্য সহজ বুদ্ধির মানুষ, যেমন দেখি তেমন বলি।
কাদমিয়েল একেবারেই নিভে গেল। এর উত্তরে বলবার মত আর কোন কথাই সে খুঁজে পেল না।
রাজা কাদমিয়েলকে ডেকে বললেন : কাদমিয়েল, এখন তুমি যাও। এই রইল ঠিক, কাল সন্ধ্যায় আমি আমার গম্যস্থলে যাব। তুমি এতে বাধা দিও না।
: মালিক, আমার উপর কোন আদেশ নেই?
: আদেশ? আদেশ দেবার দিন ফুরিয়ে এসেছে কাদমিয়েল। এখন থেকে তুমিই তোমার মালিক।
