অভিশপ্ত নগরী – ১৭

সতের

হঠাৎ একদিন দেখা গেল ক্যালদীয়েরা তাদের তাঁবু গুটিয়ে উধাও হয়ে গিয়েছে। কি ব্যাপার? শেষ পর্যন্ত শোনা গেল, মিসর থেকে সৈন্যবাহিনী এগিয়ে আসছে, এই খবর পেয়েই নাকি ওরা সরে পড়েছে। ক্যালদীয়েরা আগে থেকে এজন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না, বোধ করি সেইজন্যই ওরা শক্তি- পরীক্ষার ঝুঁকি নেয় নি।

যিরূশালেম নগরবাসীদের আনন্দধ্বনিতে পূর্ণ হয়ে উঠল। মিসরপন্থীরা বাবিলপন্থীদের বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিদ্রূপ করে বলতে লাগল, কিগো, কোথায় গেল তোমাদের বাবিল? মিসরের সৈন্যদের পায়ের শব্দ শুনেই ওদের হৃৎকম্প উঠল? সব ব্যাটা লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে।

নবী হানানিয়া প্রভুর মন্দিরপ্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে উচ্চ কণ্ঠে প্রচার করে চললেন : কোথায় গেল সেই ভাড়াটিয়া নবী, কোথায় গেল বাবিলের সেই নির্লজ্জ স্তাবক? তাকে ধরে নিয়ে এসো। আর সেই ভাঙ্গা যোয়ালটা তার গলায় বেঁধে তাকে নগরের পথে পথে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াও।

— শোন, প্রভু বলেছেন- শোন, আমার নির্বাচিত সন্তানেরা, আমি তোমাদের ক্রন্দন শুনেছি। আমি করুণাপরবশ হয়ে তোমাদের মাথার উপরে আমার অভয় হস্ত প্রসারিত করে দিয়েছি। তাই ভেঙ্গে পড়ল বাবিলেন যোয়াল। তোমরা আজ মুক্ত। দেখ, চেয়ে দেখ, দর্পী ক্যালদীয়েরা আজ মুক্ত-কেশে উত্তর দিকে ছুটে চলেছে, আর আমি অগ্নিবর্ষী মরুঝঞ্ঝার মত তাদের বিতাড়িত করে নিয়ে চলেছি।

—প্রভু বলেছেন- তোমরা আনন্দ-ধ্বনি কর, উৎসব কর, পুষ্পমাল্যে নগরীর তোরণ সাজাও। তোমাদের রক্তের রক্ত, প্রাণের প্রাণ, নির্বাসিত য়িহুদী ভাইবোনেরা আবার স্বদেশে ফিরে আসছে। যিরূশালেমের সুকণ্ঠী ক্রীতদাসী বালিকারা, তোমরা কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে সুললিত স্বরে সংগীতধ্বনি তোল। তোমরা ঝম্ফ বাজাও, বীণা বাজাও, বাঁশী বাজাও। মনোহরণ সজ্জায় সজ্জিত হয়ে তোমরা তাদের অভ্যর্থনার জন্য প্রস্তুত হও।

হানানিয়া আবার তাঁর সেই প্রথম স্তবকের পুনরাবৃত্তি করলেন : কোথায় গেল সেই ভাড়াটিয়া নবী, কোথায় গেল বাবিলের সেই নির্লজ্জ স্তাবক? তাকে ধরে নিয়ে এসো। আর সেই ভাঙ্গা যোয়ালটা তার গলায় বেঁধে তাকে নগরের পথে পথে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়াও।

কিন্তু যেরেমিয়া কোথায়? নগর অবরোধ-মুক্ত হয়েছে জানতে পেরে তিনি তাঁর জন্মভূমি বিন্নামিনের অন্তর্গত এ্যানাথোথের দিকে যাত্রা করেছিলেন। পুরদ্বারে এসে পৌঁছতেই সেনানী সেলিমিয়ার পুত্র ইরিয়া তাঁর পথ রোধ করে দাঁড়াল

: নগরের বাইরে যাওয়া আপনার নিষিদ্ধ।

: নিষিদ্ধ? কেন?

: রাজার আদেশ।

: রাজার আদেশ? এই আদেশের তাৎপর্য কি?

: তাঁরা সন্দেহ করছেন, আপনি ক্যালদীয়দের সঙ্গে যোগ দেবার জন্য নগরের বাইরে চলেছেন।

: এ কথা মিথ্যা। আমি বিন্নামিনে আমার জন্মস্থানে চলেছি। ক্যালদীয়দের কাছে আমি যাব কেন? তারা আমার কে?

কিন্তু সেনানী ইরিয়া তাঁর কোন কথাই শুনল না। সে তাঁকে ধরে নিয়ে অধ্যক্ষদের হাতে সমর্পণ করল। এরা সকলেই আচার্য পশহুরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, অতএব যেরেমিয়ার মর্মান্তিক শত্রু।

তারা দলবদ্ধ হয়ে রাজার কাছে গিয়ে বলল, আমরা আপনাকে অনুনয় করে বলছি, আপনি এই লোকটার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিন। এ নবী নয়, এ শত্রুপক্ষের লোক। দৈববাণীর নাম করে সে শুধু লোকসাধারণের মধ্যে নিরাশার বাণী প্রচার করে বেড়ায়। তার ফলে নগরবাসীদের মন ভেঙ্গে যায়, আর তার প্রতিক্রিয়া যোদ্ধাদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। এইভাবে বৎসরের পর বৎসর ধরে সে আমাদের শত্রু প্রতিরোধের শক্তি দুর্বল করে চলেছে। এ হতভাগ্য দেশের আশার কথা, মঙ্গলের কথা কিছুই বলে না; শুধু সর্বনাশের কথাই শোনায়। দেশের মঙ্গলের জন্য আপনি এর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিন দুর্বলমতি রাজা যেদেকিয়া উভয়সংকটে পড়লেন। মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিতে তাঁর ভয় হয়। কি জানি এত লোক-যে এত কথা বলে, সে কথা তো ভুল নাও হতে পারে। যদিও বা সে যিহোবার মানুষ হয়ে থাকে? কিন্তু যাদের দ্বারা তিনি ঘেরাও হয়ে আছেন, তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করেই তো রাজ- সিংহাসন দাঁড়িয়ে আছে। তাদের দাবী তিনি কি করেই বা ঠেকিয়ে রাখবেন? এতো শুধু কয়েকজন অধ্যক্ষের দাবীই নয়। রাজা জানেন, পেছন থেকে আচার্য পশহুরের দক্ষিণ হস্ত তাদের পরিচালিত করছে।

অনুপায় হয়ে তিনি তাদের বললেন : দেখ, সে তো তোমাদের হাতেই আছে। রাজা কি আর সকলের বিরুদ্ধে কোন কাজ করতে পারে? তোমরা তার সম্পর্কে যা ভাল বোঝ তাই কর। আমি আর কি করব?

এইভাবে রাজা তাঁর দায়িত্ব এড়িয়ে চলতে চাইলেন। কিন্তু তারাও প্রকাশ্যে যেরেমিয়াকে মৃত্যুদণ্ড দিতে সাহস করল না। গোপনে রাত্রির অন্ধকারে তারা তাঁকে কারাগার-প্রাঙ্গণে নিয়ে গেল। সেই কারাগার- প্রাঙ্গণের একধারে হ্যামলেফের পুত্র ম্যালাফিয়ার অব্যবহার্য পুরানো একটি কূয়ো ছিল। যেরেমিয়ার কোমরে দড়ি বেঁধে ওরা তাঁকে তার মধ্যে নামিয়ে দিল। এতদিনের পুরানো কূয়োটাতে জল ছিল না, ছিল শুধু কাদা। যেরেমিয়ার কোমর পর্যন্ত সেই কাদায় ডুবে গেল। নীরন্ধ্র অন্ধকার, সামান্য আলোকরেখাটুকুও সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। পচা কাদার ভ্যাঁপসা গন্ধ উঠছে, কত রকমের কীট আর কৃমি কিলবিল করছে, গা বেয়ে বেয়ে উঠছে, দংশন করছে। অনুপায় চলচ্ছক্তিহীন যেরেমিয়া স্তম্ভের মত অসাড় হয়ে এক কোমর কাদার মধ্যে দাঁড়িয়ে রইলেন। নগরবাসীরা ঘুণাক্ষরেও একথা জানতে পারল না।

নবী যেরেমিয়া হঠাৎ এমন করে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেলেন, এ চিন্তা করবার মত অবস্থা নগরবাসীদের ছিল না। পথাশ্রয়ী মানুষ, তাঁর কি চলাফেলার কোন ঠিকঠিকানা থাকে! তা’ছাড়া নগরে তখন এক নতুন পরিস্থিতি। মাঝে মাঝে ঘটনাগুলো এমন দ্রুত-গতিতে একটার পর একটা ছুটে আসতে থাকে যে, এদিকে ওদিকে চেয়ে দেখবার মত সময় তখন আর থাকে না। সবচেয়ে সামনের জিনিসটাই আর সবকিছুকেই আড়াল করে দাঁড়ায়।

নগরে প্রবল উত্তেজনা। ক্রীতদাসেরা চঞ্চল হয়ে উঠেছে। মালিকেরাও উদ্বিগ্ন এবং চিন্তাকুল। অবরোধের সময় ক্রীতদাসদের যে-সমস্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, আজই নাকি সে সম্পর্কে চূড়ান্ত ঘোষণা প্রকাশ করা হবে। পাঁচ জন ক্রীতদাস নেতাকে রাজসভায় ডেকে পাঠানো হয়েছে।

ক্রীতদাসেরা দলে দলে রাজসভার বাইরে এসে জড় হচ্ছে। দলের পর দল আসছেই, আসছেই। মেয়ে পুরুষ সবাই আসছে। নগরে-যে এত ক্রীতদাস আছে, কেইবা সে কথা ভাবতে পেরেছে! রাজপথের উপর এমন দল বেঁধে চলাফেরা করতে ওদের কমই দেখা যায়। নগরের আনন্দ উৎসবে ওদের কোন অংশ নেই। ওদের হাসি নেই, গান নেই, ওরা শুধু বেঁচে থাকে, সংখ্যায় বৃদ্ধি পায়, আর যখন সময় হয় নিঃশব্দে মরে যায়। ওরা ঘর-সংসারে, ক্ষেত- খামারে কর্মশালায় আর খনিতে দিনের পর দিন বিরামহীন একটানা তালে কাজের চাকা ঘুরিয়ে চলে, আর সেই চাকার নীচে নিজেরাও পিষ্ট হতে থাকে। কিন্তু এরা কি সেই তারাই? হ্যাঁ, তারাই তো। না, তবু তারা নয়। এদের গ্রীবার ভঙ্গী দৃপ্ত, এদের চোখের মণি উজ্জ্বল। ওরা-যে মুক্তির আশায় উন্মুখ।

কিন্তু কই নেতারা ফিরে আসছে না তো! সেই কখন গেছে— সকাল গেল, দুপুর গেল, বিকাল যায় যায়, রাজপ্রাসাদের ছায়া দীর্ঘ হয়ে ছড়িয়ে পড়েছে, মাঠ থেকে চারণের পশুগুলো ফিরে আসছে-কিন্তু কই তারা তো ফিরে আসছে না! প্রতীক্ষাকুল মানুষগুলো অধৈর্য আর অস্থির হয়ে উঠল। সারাদিন রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকে ওদের চোখ মুখ ঝলসে কালো হয়ে গেছে। ওরা অধীর হয়ে নানাজনে নানা রকম ধ্বনি তুলতে লাগল।

গোলমাল শুনে একজন রাজভৃত্য বেরিয়ে এল। সে ঘুরে ঘুরে ঘোষণা করতে লাগল, তারা এখন আসবে না, তাদের ফিরতে দেরী হবে। তোমরা এখানে দাঁড়িয়ে গোলমাল করে কাজের ব্যাঘাত করো না। শান্তিপূর্ণভাবে যে যার ঘরে ফিরে যাও।

অগ্নিতে যেন ঘৃতাহুতি পড়ল। না না না- ক্ষিপ্ত জনতা গর্জে উঠল

: আমরা তাদের না নিয়ে ফিরব না, তোমরা আমাদের নেতাদের ফিরিয়ে দাও। ওদের কোলাহলে আকাশ মুখর হয়ে উঠল। এবার ওরা বুঝতে পেরেছে, পর্দার আড়ালে কি যেন একটা ষড়যন্ত্রের খেলা চলছে। ওরা বুঝি আর ওদের ফিরিয়ে দেবে না। তাই উত্তেজিত জনতা সমুদ্রের মত গর্জে গর্জে উঠতে লাগল। ওরা যাবে না, ফিরে যাবে না।

জনতার চোখে মুখে আক্রমণের আভাস দেখে সন্ত্রস্ত রাজভৃত্য বাঁশীতে ফুঁ দিল। সমস্ত কিছুই আগে থেকে সুপরিকল্পিত। বাঁশীর সংকেত বেজে উঠবার সঙ্গে সঙ্গেই কয়েকজন অশ্বারোহী শান্তিরক্ষক ছুটে এসে লোকের ভিড় ভেঙ্গে সামনে এগিয়ে চলল। ওদের হাতের তরোয়ালগুলো শেষ সূর্যের আলোয় ঝলসে উঠল। কণ্ঠস্বর উচ্চে তুলে ওরা হুঁশিয়ারী দিয়ে চলল- ফিরে যা, ফিরে যা। কিন্তু একটা লোকও ফিরল না। ওদের ঘোড়ার গায়ের ধাক্কায় লোকগুলো এদিকে ওদিকে ছিটকে পড়তে লাগল। কেউ বা চাপা পড়ল ঘোড়ার পায়ের তলায়। ওরা ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল, কিন্তু তবু কেউ ফিরল না। পেছনের লোক ঠেলে সামনে এগিয়ে আসতে লাগল, যেন ঢেউয়ের পর ঢেউ তটভূমির উপর আছড়ে পড়তে চাইছে।

প্রতিদিনের সচল যন্ত্রগুলো আজ কোন্ মন্ত্রে সজীব মানুষ হয়ে উঠেছে। ওরা ফিরে যাবে না, ওরা লড়াই করবে, ওরা ছিনিয়ে নিয়ে আসবে ওদের নেতাদের। হাতে কোন অস্ত্র নেই, নাই থাক, খালি হাতেই ওরা লড়বে। আর কিছু না পেয়ে ওরা এদিক থেকে ওদিক থেকে পাথর ছুঁড়তে লাগল। ভিড় ভাঙ্গবার জন্য ঘোড়াগুলো ইতস্ততঃ ছোটাছুটি করছিল। হঠাৎ এক জায়গায় একটা ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেল। ক্ষিপ্ত লোকগুলো একটা অশ্বারোহীকে টেনে নামিয়েছে। সে আর আত্মরক্ষা করবার সুযোগটুকু পেল না। একজন তার হাত থেকে তরোয়ালটা ছিনিয়ে নিয়ে তার উপরেই চালিয়ে দিল। যুগ-যুগের সঞ্চিত রুদ্ধ বিক্ষোভের এই প্রথম রক্তাক্ত প্রতিক্রিয়া। প্রতিহিংসার তাড়নায় হিংস্র জনতা উন্মত্ত হয়ে উঠল। আরোহীশূন্য ঘোড়াটা ক্ষেপে গিয়ে দিগ্‌ বিদিকে ছুটতে লাগল।

আবার বেজে উঠল বাঁশী। বাঁশীর শব্দ ভয়ার্ত সুরে কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগল। বাঁশী বেজেই চলেছে। এবার একদল সশস্ত্র সৈনিক বেরিয়ে এল। কোন হুঁশিয়ারী না দিয়েই ওরা ঝাঁপিয়ে পড়ল। তারপর তাদের হাতের তরোয়ালগুলো শূন্যে বিদ্যুতের খেলা খেলতে লাগল। তখন সে কি দৃশ্য! চীৎকার, আর্তনাদ, ঠেলাঠেলি, ছুটোছুটি- উদ্যত কাস্তের মুখে ওরা যেন ফসলের মতই ঝরে পড়ছে। রক্তে সারা মাঠ লাল হয়ে গেল। পশ্চিমাকাশে সূর্য তখন অস্তাচলে। তার রক্ত-রশ্মিতে আকাশের পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘগুলো লাল হয়ে উঠেছে। আর তারই নীচে পৃথিবীর বুকে শক্তিমদে মত্ত মানুষ মানুষের বুকের লাল রক্ত নিয়ে হিংস্র খেলায় মেতে উঠল!

লোকের ভিড় থেকে একটু দূরে, একটু নিরালা হয়ে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল সে। একটা কচি মুখ, তরুণ কিশোর, আহা কতই বা বয়স হবে! হঠাৎ সংঘর্ষটা যখন বেধে গেল সে ভয় ভাবনার কথা ভুলে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে সেই ভীষণ দৃশ্য দেখছিল। সবাই ছুটোছুটি করছে, পালিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু তার যেন হুঁশ ছিল না। পালাবার কথা যখন মনে পড়ল, তখন আর তার সময় ছিল না। সে দেখল উদ্যতহস্ত মৃত্যু তার মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। সে আর নড়তে পারল না, যেমন ছিল তেমনি দাঁড়িয়ে রইল। সে কি এক ভয়ংকর মুহূর্ত, কি ভাবছিল সে, কে বলবে! আঘাত নামল, আর তীরবিদ্ধ পাখির মতই সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। মারাত্মক আঘাত! কিন্তু ফুলের পাপড়ির মত তার নরম ঠোঁট দু’টি তখনও মৃদু মৃদু নড়ছিল। যদি কোন দরদী মানুষ তার মুখের কাছে কান পেতে শুনত, তা হলে সে শুনতে পেত, সে অস্ফুট কণ্ঠে বলছে- গেদালিয়া! কিন্তু শুধু সেই একটি মুহূর্তের জন্যই, তারপরই তার ঠোঁট দু’টি নিশ্চল হয়ে গেল।

যে-উত্তেজনা এতক্ষণ এক জায়গায় সীমাবদ্ধ ছিল, সমস্ত নগরময় তা ছড়িয়ে পড়ল। ক্রীতদাসেরা পালিয়ে এসেছে, কিন্তু গর্তে ঢুকে পড়ে নি। ঘায়েল বাঘের মত ওরা যেখানেই পারছে, সেখানেই আঘাত করছে। এই নগরী, এর রাজপথ, এর উদ্যান, এর সুরম্য অট্টালিকা, ভাগ্যবানদের বিলাসনিকেতন গুলো, সবকিছুই তাদেরই হাতে গড়ে উঠেছে। কিন্তু তবু এই নগরী তাদের নয়। এই নগরী আজ তাদের দু’চক্ষের বিষ। যদি পারতো, তবে তারা একে গুঁড়ো গুঁড়ো করে ধুলোর সঙ্গে মিশিয়ে দিত। তাই তারা বিভ্রান্ত প্রতিহিংসায় অবুঝের মত নগরীর বুকে আঘাতের পর আঘাত করে চলল। সেদিন সন্ধ্যায় রাজপথে আর বাতি জ্বলল না। যারা প্রতিদিন বাতি জ্বালিয়ে অন্ধকার রাত্রিকে উজ্জ্বল করে তুলত, তারা নিজেরাই আজ সেই বাতিগুলোকে আছড়ে আছড়ে ভাঙ্গতে লাগল। সারা নগরী অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে রইল। সেই অন্ধকারে প্রতিহিংসায় উন্মত্ত ক্রীতদাসেরা দল বেঁধে মালিকদের বাড়িতে বাড়িতে আগুন ধরিয়ে ফিরতে লাগল। আর তাদের পেছনে পেছনে সশস্ত্র সৈনিক ও শান্তি রক্ষকেরা ধাওয়া করে চলল।

নগরবাসীরা যে যার ঘরে বসে বলির পশুর মতই কাঁপছে। এমন ঘটনা কেউ কোনদিন দেখে নি, শোনেও নি। মানুষগুলো কি সব ক্ষেপে গেল নাকি? আজ এই একটা রাত্রিতে কত কিছুই ঘটে যাবে কে জানে? অহিকম দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে উঠেছিলেন। রাত হয়ে গেছে, তবু গেদালিয়া এখনও ফিরছে না। এই হ্যাঙ্গামার মধ্যে কোথায় আটকে পড়েছে কে জানে? আজ রাত্রিতে মৃত্যু যেন পায়ে পায়ে ফিরছে। গেদালিয়াকে নিয়ে তাঁর যত দুর্ভাবনা। দাসেরা কেউ নেই, দাসীদের মধ্যে সারাকে খুঁজে পাওয়া গেল না। অহিকম উদ্বেগে ঘরে ঢুকতে পারছিলেন না। গেদালিয়া আসে কিনা দেখবার জন্য তিনি বাইরে দাঁড়িয়ে ছটফট করছিলেন, আর ভাবছিলেন- বাপ মা হওয়ার কত জ্বালা। এমন সময় ঘোড়ার খুরের খট্ খট্ শব্দ শুনে তিনি চমকে উঠে দেখলেন, জনকয়েক লোক ঊর্ধ্বশ্বাসে তাঁর বাড়ির দিকে ছুটে আসছে। দূর থেকে অন্ধকারে ওদের মুখ বোঝা যাচ্ছিল না। কে, গেদালিয়া নাকি? অহিকম চীৎকার করে ডাকলেন। উত্তেজনায় তাঁর কণ্ঠ বিকৃত হয়ে গেল। কিন্তু কেউ সাড়া দিল না। ওরা ক্রমেই এগিয়ে আসছে। একেবারে কাছে আসতেই তিনি চিনতে পারলেন, ওরা তাঁরই বাড়ির ক্রীতদাস। আর ঠিক তারই পেছন পেছন দু’জন অশ্বারোহী শান্তিরক্ষক তরোয়াল উচিয়ে তাড়া করে ছুটে আসছে। ওরা একেবারে ওদের গায়ের উপর এসে পড়েছে। সর্বনাশ, এখনই-যে ওরা মারা পড়বে।

অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা করবার সময়টুকু পর্যন্ত ছিল না। ‘করছ কি’, ‘করছ কি তোমরা’ বলতে বলতে অহিকম তাদের মাঝখানে গিয়ে পড়লেন। দু’দুটো তরোয়াল একই সঙ্গে তাঁর উপর এসে নামল। দাসেরা চীৎকার করে উঠল। এ আঘাত সহ্য করবার মত শক্তি অহিকমের ছিল না। তাঁর চোখে চিররাত্রির অন্ধকার নেমে এল।

জিল্লা তখন তাঁর নিজের ঘরে বসে প্রভুর সন্ধ্যাকালীন বন্দনা করছিলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *