অভিশপ্ত নগরী – ১

এক

: যেরেমিয়া, যেরেমিয়া, আঃ তুমি কি বিষাক্ত সাপের মত তোমার ওই তীক্ষ্ণ জিহ্বাটাকে একটু বন্ধ রাখতে পার না? তোমার ওই তীব্র ফুৎকারে যে-আগুন তুমি জ্বালিয়ে তুলছ, সে আগুন আর কারু গায়ে লাগবে না, সে আগুনে তোমাকে নিজেকেই জ্বলে পুড়ে মরতে হবে।

: আঃ ব্যভিচারের সন্তান, বিষ্ঠাভোজী, শূকরশিশু, আর কত দিন তোমার পরমায়ু? যিহোবার ক্রোধাগ্নি প্রজ্বলিত হয়েছে, বিদ্যুদ্‌গর্ভ মেঘের মধ্য থেকে তাঁর বজ্রকণ্ঠ ধ্বনিত হয়ে চলেছে। তুমি বধির, তুমি শুনেও শুনতে পাও না। ওই শোন, দিগ্‌দিগন্ত মুখরিত করে প্রভু গর্জন করে উঠেছেন, সিংহের মতই গর্জন করে উঠেছেন— “না না না, আমার ক্ষমার পাত্র নিঃশেষিত হয়েছে, আমি আর ধৈর্য মানব না। আমি আর সহ্য করব না। আমি আমার করুণার দ্বারে দৃঢ় অর্গল দিয়ে দিয়েছি। পাপ, পাপ, পাপ! পাপের পাহাড় জমে উঠেছে। আমি তাকে চূর্ণ করব, ধূলির সঙ্গে মিশিয়ে দেব। সে আঘাতে পর্বত কেঁপে উঠবে, মাটি বিদীর্ণ হয়ে ধূম উদ্‌গিরণ করবে, সমুদ্রের তরঙ্গ লাফিয়ে উঠে আকাশ স্পর্শ করবে, আর পাপের নগরী যিরূশালেম প্রসব বেদনায় ধরালুণ্ঠিত রমণীর মত তীব্র আর্তনাদ করে উঠবে।”

: যেরেমিয়া, যেরেমিয়া, যিহোবার দিব্য, শোন-

: আঃ ওই-যে রক্তবর্ণ ঘোড়াগুলো ছুটে আসছে বিদ্যুদ্‌বেগে। আরোহীদের উজ্জ্বল বর্মগুলো সূর্যের আলোয় ঝকঝক করে উঠছে। তোমাদের পরমায়ুর মত তোমাদের চোখের জ্যোতিও ক্ষীণ, তোমরা দেখতে পাচ্ছ না। আমি, আমি যেরেমিয়া দেখছি। ঐ, ঐ যে আসছে দুর্ধর্ষ ক্যালদীয়েরা, স্বয়ং প্রভু অগ্রবর্তী হয়ে তাদের চালনা করে নিয়ে আসছেন। আপন সন্তানের বিরুদ্ধে তাঁর ক্ষমাহীন বাহু প্রসারিত।

ঐ আসছে, ওরা আসছে। ওদের হাতের বর্শাগুলো রক্তের গন্ধে উন্মত্ত হয়ে উঠেছে। ওদের ঘোড়াগুলো তীক্ষ্ণ হ্রেষা ধ্বনি করে ছুটে আসছে, ওদের খুরের টগবগ শব্দ যিরূশালেমের প্রাচীরের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠছে।

শোন যিরূশালেমবাসী পাপের সন্তানগণ। তোমাদের প্রাচীর ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, স্বয়ং যিহোবা ওদের হাতে ধরে নিয়ে আসবেন। তারপর উঃ, হত্যা-হত্যা-হত্যা! চাষীর হাতের ধারালো কাস্তে যেমন করে ফসল কেটে চলে, ওদের হাতের তরোয়ালও তেমনিভাবেই যে-পথ দিয়ে যাবে, সব কিছু সাফ করে নিয়ে যাবে। প্রাচীর মাটির সঙ্গে সমান হয়ে যাবে। ধনীর অট্টালিকা আর দরিদ্রের পর্ণকুটীর কেউ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবে না। শূন্য নগরী রৌদ্রদগ্ধ মরুভূমির মত খাঁ খাঁ করতে থাকবে।

: থাম, থাম যেরেমিয়া। হায় মূর্খ বন্ধু, আমি কি করে তোমাকে বাঁচাব? দেখছ না পথে কত লোক জমে গিয়েছে। তোমার বজ্র-কণ্ঠের সর্বনাশা বাণী শোনবার জন্য লোকের ভীড় ক্রমেই বেড়ে চলেছে। রাজপ্রাসাদ আর মন্দিরের গুপ্তচরেরা হিংস্র পশুর মত গন্ধ শুঁকে শুঁকে ফিরছে। যেরেমিয়া, ভেতরে এসো। ওরা যদি এখন আমাকে তোমার সঙ্গে দেখতে পায়, তাহলে আমার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হবে। তোমাকে আমি বাঁচাতে পারব না। হয়তো বা আমাকেও মরতে হবে।

: আঃ ওকি দৃশ্য! দুর্ভিক্ষের আগুনে দাউ দাউ করে জ্বলছে সারা দেশ। ক্ষুধা, ক্ষুধা, ক্ষুধা! ওই-যে নগ্নদেহ যিরূশালেম-কন্যা মৃত্যু-যন্ত্রণায় ধুঁকছে। শিশুগুলো স্তন টানছে, কিন্তু সেই শুকিয়ে আসা স্তনে এক বিন্দু দুধ নেই। দুরন্ত ক্ষুধায় ওরা সেই স্তনের কোমল মাংসে দাঁত ফুটিয়ে দিচ্ছে। রক্ত! রক্ত! শিশুদের কচি মুখ সেই রক্তে লাল হয়ে উঠেছে। যিহোবা, যিহোবা, তুমি আমায় কত দেখাবে, আমি-যে আর পারি নে। আমার চোখ জ্বলে গেল, বুক জ্বলে গেল, আমার উদরের অস্ত্র অসহ্য জ্বালায় গলে গলে পড়ছে।

যেরেমিয়া তাঁর প্রিয় ভক্ত রেহুমের বাড়ীর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন-দর্শকের মত কি যেন দেখছেন। তাঁর বাণী শোনবার জন্য পথে লোক জমে গেছে। যেরেমিয়ার বিশিষ্ট বন্ধু নগরীর অন্যতম লোকপ্রধান অহিকম পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। যেরেমিয়াকে এ অবস্থায় দেখে থমকে দাঁড়ালেন তিনি। সৰ্বনাশ, এ-যে মরিয়া হয়ে মরণের দিকে ছুটে চলেছে। অহিকম তাঁকে থামাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কে থামবে!

এ তো শুধু বাণী নয়, এ যেন এক সংগীত তরঙ্গ উঠছে, নামছে, দুলছে, ফুলছে, আর তীব্র আবেগে ভেঙ্গে শতধা বিকীর্ণ হয়ে পড়ছে। যেন পাখীর মত পাখার উপর ভর দিয়ে ঊর্ধ্বাকাশে উঠতে উঠতে যিহোবার সিংহাসনের চরণদণ্ড স্পর্শ করছে, আবার নামতে নামতে অস্পষ্ট হয়ে কোন্ অতলে মিলিয়ে যাচ্ছে। অব্যক্ত যন্ত্রণায় যেরেমিয়ার মুখমণ্ডল বিকৃত। তাঁর অর্ধোন্মাদ দৃষ্টি মুহূর্তে ক্রোধের আগুনে জ্বলে উঠেছে, আবার পর মুহূর্তেই উষ্ণ অশ্রুর প্রবাহ দুই চোখ বেয়ে নেমে আসছে, ঝরে পড়ছে। সমুদ্রের লবণাক্ত বাতাসে তাঁর উচ্ছৃঙ্খল দীর্ঘ কেশ উড়ছে, মুখের উপর এসে পড়ছে। তাঁর মসিনার কাপড় আর ঢিলে আঙরাখা বাতাসে লটপট করছে।

ভীড় বাড়ছে, ক্রমেই বাড়ছে। বৃদ্ধ, যুবা, বালক-বালিকা, পুরুষ-নারী, মুক্ত নাগরিক আর ক্রীতদাস, য়িহুদী আর পরজাতীয় লোক রাস্তার উপর কাতারে কাতারে এসে দাঁড়িয়েছে। যেরেমিয়ার বাণী কিছু বোঝা যায়, কিছু বা দুর্বোধ। শুনলে রোমাঞ্চ জাগে আতঙ্কে, তবু অজগরের উজ্জ্বল চোখের মত তীব্র তার আকর্ষণ। ঘরের মানুষকে পথে আনিয়ে দাঁড় করিয়ে ছাড়ে।

অহিকম যেরেমিয়ার হাত ধরে টানলেন, “যেরেমিয়া, শোন, আমার দিকে একবার তাকাও, আমি তোমার বন্ধু অহিকম।”

এক ঝটকায় হাত ছাড়িয়ে নিয়ে হিস হিস করে উঠলেন যেরেমিয়া।

: বন্ধু? এই অভিশপ্ত নগরীতে বন্ধু বলে কোন কথা নেই। এখানে প্রতিবেশী প্রতিবেশীর শত্রু, শয্যাসঙ্গিনী ব্যভিচারিণী, বন্ধুর দাঁতের গোড়ায় সাপের বিষ, বন্ধুত্বের আলিঙ্গনের সুযোগে ওরা সেই বিষ ঢেলে দেয়।

বাইরে একটা কোলাহল শোনা যাচ্ছে। শব্দটা ক্রমশঃই বাড়তে লাগল। উৎকণ্ঠিত অহিকম রাস্তার উপর ঝুঁকে পড়ে দেখতে লাগলেন। তিন জন শান্তি রক্ষক ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে আসছে। তাদের হাতের চাবুক শপাশপ্ নামছে ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে। ব্যথায়, আতঙ্কে চিৎকার করছে লোকগুলো, আর যে যেদিকে পারে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে। একপাল ভেড়ার উপর যেন একদল নেকড়ে এসে হামলা করেছে।

শান্তিরক্ষকদের উচ্চকণ্ঠের আওয়াজ শোনা গেল

: তোদের মায়ের গর্ভ খসে পড়ুক। বেজন্মার দল, এটা কি মন্দির প্রাঙ্গণ? ওখানে সমাবেশ করবার জন্য কে তোদের ঘোষণা জানিয়েছে? এ ভাবে পথে চলাচলের বিঘ্ন করে নগরের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করবার দুঃসাহস কে যোগাল তোদের? পিঁপড়ে হয়ে আকাশে পাখী হয়ে উড়বার সাধ হয়েছে যার, তার দিন ঘনিয়ে এসেছে, ঘনিয়ে এসেছে। রাস্তার দু’ধারের ঘরের কপাটগুলো দড়াম দড়াম করে বন্ধ হয়ে যেতে লাগল। যেরেমিয়ার স্বপ্নাবেশ ভেঙ্গে গেল। বিস্ময়ে চারদিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, একি! মানুষগুলো এমন করে ছুটছে কেন? উৎসব দিনের বলির পশুর মত কে ওদের অমন করে তাড়িয়ে নিয়ে চলেছে?

চুপ, একটি কথাও নয়, অহিকম তাঁকে জোর করে রেহুমের ঘরের ভেতর টেনে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

ঘোড়ার খুরের খট খট শব্দ ক্রমেই এগিয়ে আসতে লাগল, কাছে, আরও কাছে। শেষকালে ওই বাড়ির মুখোমুখি এসে শব্দটা একেবারেই থেমে গেল। ঘরের ভেতর থেকে উঁকি মেরে অহিকম দেখলেন, সমস্ত পথ ধোয়ামোছা পরিষ্কার। মধ্য রাত্রির নির্জনতা। জনপ্রাণীর চিহ্নমাত্র নেই। একটা খেঁকী কুকুরকেও দেখা যাচ্ছে না। শান্ত সমুদ্রের বুকে দ্বীপপুঞ্জের মত শুধু ক’জন লোক পথের মাঝে এক জায়গায় জড় হয়ে এই দিকেই তাকিয়ে আছে। তিন জন অশ্বারোহী শান্তিরক্ষক। একজন শান্ত সৌম্য চেহারার যাজক গাধার উপর চেপে বসে নির্বিকার প্রশান্ত মুখে প্রভুর নাম জপ করছেন। আর শেয়ালের মত ধূর্ত চেহারার একটা লোক এই বাড়ীটার দিকে অঙ্গুলি সংকেত করে দেখাচ্ছে। অহিকম শিউরে উঠলেন।

: অহিকম, কি হয়েছে? লোকগুলো অমন ছুটোছুটি করে পালিয়ে গেল কেন? আর তোমার চোখেমুখেই বা এই উদ্বেগের ছায়া কেন? তুমি কি ভয় পেয়েছ? কিন্তু তুমি তো সহজে ভয় পাও না।

: এ কথা আবার জিজ্ঞাসা করছ? যেরেমিয়া, এজন্য তুমিই দায়ী।

: আমি? বল কি অহিকম, আমি দায়ী?

: হ্যাঁ হ্যাঁ, তুমি, যেরেমিয়া তুমি। তুমি ছাড়া আর কে? বালকেও জানে আগুনে হাত দিতে নেই। তুমি বালকের চেয়েও বালক, তুমি জেনে শুনে সেই আগুনে ঝাঁপ দিতে চলেছ। আর শুধু তুমিই নও, যারা তোমাকে ভালবাসে, তাদের শুদ্ধ টেনে নিয়ে চলেছ সেই আগুনের মুখে।

: কেন, আমি কি করেছি অহিকম?

: হায় দূরদর্শী নবী, ভবিষ্যতের দিকে তোমার দৃষ্টি নিবদ্ধ। আর যেই মাটির উপর ভর করে তুমি দাঁড়িয়ে আছ, তার খবরটুকু তুমি রাখ না। যেরেমিয়া, তুমি কি জান না, তোমাকে মারবার জন্য ওরা ছুরি শানাচ্ছে?

: কাকে, কাকে মারবে?

: তোমাকে’।

: কেন, কেন আমাকে মারবে? আমি কি করেছি?

: না, তুমি কিছুই কর নি, তুমি নিরীহ মেষশিশু। অহিকমের চিন্তাচ্ছন্ন মুখে মেঘের আড়ালে রোদের মত হালকা একটু হাসির রেখা দেখা দিল।

: তুমি কিছুই কর নি যেরেমিয়া, শুধু রাজাকে তাঁর কলঙ্কিত সিংহাসন থেকে আর আচার্যকে তাঁর ধর্মাসন থেকে টেনে নামাবার আহ্বান জানিয়েছ। তুমি গর্বোন্মত্ত অত্যাচারীদের বুকে কাঁপন ধরিয়েছ, পরস্বভোজীদের মনে ত্রাসের সঞ্চার করেছ। তুমি কি যিরূশালেমকে অভিশপ্ত নগরী বলে ঘোষণা কর নি? তুমি কি প্রকাশ্য রাজপথে দাঁড়িয়ে এ কথা বল নি- যিরূশালেমের প্রাচীর ধ্বসে পড়বে, প্রভুর মন্দির ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে, আর বাবিলরাজ নেবুকাডনাজারের ক্যালদীয় সৈন্যদের দ্বারা যিরূশালেম ও য়াহুদা লাঞ্ছিতা ও ধর্ষিতা হবে?

: আমি বলেছি, হ্যাঁ আমি বলেছি।

: আর সেইজন্যই ওরা তোমার বিরুদ্ধে রাজদ্রোহী, ধর্মদ্রোহী ও দেশদ্রোহী বলে অভিযোগ এনেছে। সেই অভিযোগপত্রের খসড়া আমি স্বচক্ষে দেখেছি। রাজা যিহোয়াকীমের পূর্ণ সম্মতি আছে বলেই আমি শুনেছি। ওরা তোমার মৃত্যুদণ্ডের দাবী করেছে। সবাই তোমার বিরুদ্ধে জোট পাকিয়েছে। তোমার পক্ষে কে আছে?

: সকল শক্তির উপরে যিনি সেই যিহোবাই আমার পক্ষে আছেন। প্রভু আমাকে দিয়ে যে-কথা বলিয়েছেন, আমি তো সেই কথাই বলেছি। না অহিকম, তুমি জান না, এজন্য কারও মৃত্যুদণ্ড হতে পারে না।

: যেরেমিয়া এমন অনেক কথা আমি জানি, যে-কথা তুমি জান না। এই যিরূশালেমে, য়াহুদায়, প্রভুর প্রত্যাদেশ ঘোষণা করবার জন্য তোমার আগে আরও কত কত নবীকে প্রাণ দিতে হয়েছে! হে প্রভুর অনুগৃহীত মানুষ, প্ৰভু কি তোমাকে একথা বলেন নি?

: আমার সে খবরে প্রয়োজন কি?

: ইউরারাকে জান তুমি যেরেমিয়া? কিরিযাথযিধারিমের শেমাইয়ার পুত্র ইউরায়া। সেও তোমার মতই নবী ছিল। সেও তোমার মতই রাজার বিরুদ্ধে কথা বলত। বেশী দিনের কথা তো নয়। সে আজ কোথায়? বলতে পার যেরেমিয়া, সে আজ কোথায়?

: লোকে বলে, সে নাকি মিসরে আছে। লোকে বলে যে, প্রাণভয়ে সে দেশে পালিয়ে গেছে।

: সত্য কথা। মিসরেই গিয়েছিল বটে। কিন্তু তারপর কি হয়েছে তার জান তুমি? না, জান না। তবে শোন। ইউরায়া মিসরে পালিয়ে গেছে এই সংবাদ পেয়ে রাজা যিহোয়াকীম আকবরের পুত্র এলনাথনকে কয়েকজন সশস্ত্র লোক দিয়ে পাঠিয়ে দিলেন। বন্য জন্তুকে যেমন করে ফাঁদ পেতে ধরা হয়, তেমনি ফাঁদে ধরা পড়ল ইউরায়া। ইউরায়াকে বন্দী করে আনা হোল যিরূশালেমে। কেউ সে কথা জানতে পারল না। বন্য পশুর মতই তাকে শিকল দিয়ে বেঁধে আনা হয়েছিল। তারপর রাজপ্রাসাদের এক গুপ্ত কক্ষে রাজা যিহোয়াকীমের সামনেই তাকে নিহত করা হয়। তারপর রাত্রির অন্ধকারে সাধারণ লোকের কবরস্থানে কোথায় নাকি তাকে সমাহিত করে রাখা হয়। কিন্তু যারা তাকে বন্দী করে আনতে গিয়েছিল, তাদের মধ্যে একমাত্র এলনাথন ছাড়া আর কাউকেই যিরূশালেমের লোকেরা চোখে দেখতে পায় নি। প্রেরিত পুরুষের পবিত্র রক্তে কলঙ্কিত হস্তে সেই কলঙ্কী রাজা আজও রাজ্য-শাসন করছে। তার কাছ থেকে কি আশা কর তুমি? যেরেমিয়া, বন্ধু, এখনও সাবধান হও। কিন্তু আমার ভয় হয় সাবধান হবার সময় হয়তো বা উত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

: তোমার উদ্দেশ্য কি অহিকম, স্পষ্ট করে বল, সোজা ভাষায় বল। ইউরায়ার দৃষ্টান্ত দেখিয়ে আমাকে ভয় দেখাতে চাও তুমি? বৃথা তোমার এই চেষ্টা, আমি ভয় পাব না। ইউরায়ার মৃত্যু-কথা আমাকে দ্বিগুণ সাহসী করে তুলবে। ওরা কাপুরুষ, ওরা ভয় পায়, তাই ওরা গুপ্ত হত্যা করে। কিন্তু সেদিন দূরে নয়, যেদিন রাজদণ্ড আর মুকুট ধুলায় লুণ্ঠিত হবে, সিংহাসন উলটে পড়বে। আমি প্রভুর নির্ভীক আজ্ঞাবাহী, প্রভুই আমাকে পথ দেখাবেন। আমি আর কারু সাহায্য চাই না।

যেন এক অপার্থিব আলোয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল যেরেমিয়ার মুখ। অহিকম সব কিছু ভুলে গিয়ে মুগ্ধ হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই কি তাঁর সেই আবাল্য বন্ধু যেরেমিয়া? কিন্তু আজ তো আর তাকে বন্ধু বলে দুহাত দিয়ে জড়িয়ে ধরা যায় না। এ যে এক অন্য জগতের মানুষ, যেন তাঁর ধরাছোঁয়ার গণ্ডীর বাইরে। যেরেমিয়া কি যাদু জানে? কি করে তাঁর মনকে এমন করে টানে? কিন্তু যে উন্মাদ এভাবে মৃত্যুর দিকে ছুটে চলেছে, তাকে তিনি কি করে বাঁচাবেন?

: যেরেমিয়া, বন্ধু, আমার দিকে তাকাও।

: এই-যে আমি অহিকম। আমি কি তোমার মনে দুঃখ দিয়েছি? বেশ, তোমার যা বলার আছে বল। কিন্তু আমার অনুরোধ তুমি আমাকে ভয় দেখিও না। আমি ভয় করতে ঘৃণা করি।

: যেরেমিয়া, তোমাকে বাঁচতে হবে।

: আমার জীবন মরণের নিয়ন্তা কি আমি? যিহোবা যাকে বাঁচাবেন, সে বাঁচবে। যাকে মারবেন, সে মরবে। কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। জীবন আর মরণ যেই পথ দিয়েই প্রভু আমাকে ডাকুন না কেন, আমি তাঁর ডাকেই সাড়া দেব। তিনি কি আমার জীবন মরণেরও উপরে নন? কিন্তু একটা কথা জিজ্ঞাসা করি, কেন তুমি আমাকে বাঁচতে বলছ? কেন আমাকে বাঁচতেই হবে?

: কেন, বলছি? তুমি জান এই যিরূশালেম আর য়াহুদার কত লোক তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছে? তুমি জান, তোমার অভাবে কত লোকের জীবন শূন্য হয়ে যাবে? সেই বোধশক্তি কি তোমার আছে?

: কি তুমি বলছ অহিকম, আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি না। আমার কে আছে? আমার দিকে কেউ চেয়ে নেই। আমার অভাবে একটি সবুজ পাতাও পাণ্ডুরাভ হয়ে উঠবে না। তুমি এমন একজনেরও নাম করতে পার?

অহিকম একটু ইতস্ততঃ করল, শেষে বিচলিত কণ্ঠে বলল, পারি বই কি। যে তোমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যাকে তুমি দেখেও দেখছ না। কিন্তু সে কথা কি তুমি বিশ্বাস করবে?

দীর্ঘায়ত চোখ দুটি বিস্তার করে যেরেমিয়া গভীর দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। কতক্ষণ একইভাবে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখে পলক পড়ছিল না।

যেরেমিয়ার চোখের দৃষ্টি স্বাভাবিক নয়। অহিকমের আশঙ্কা জাগছিল, কি জানি, হয়তো এখনই দৈববাণী দুকূল ভাসিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠবে। কিন্তু না, একটি প্রশান্ত মধুর হাসি ফুটে উঠল যেরেমিয়ার মুখে।

: আমি বিশ্বাস করি অহিকম, আমি বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করি, বিশ্বাস করি।

: কিন্তু তুমি অমন করে কি দেখছিলে আমার মুখের দিকে চেয়ে?

: অদ্ভুত, অদ্ভুত, সে কথা ভাবা যায় না, আমি কেমন করে সে কথা বলব!

আমি তোমার চোখে দেখলাম-কি দেখলাম জান অহিকম, দেখলাম আমার প্রভুর প্রতিচ্ছবি। তিনি একবার দেখা দিয়েই চকিতে মিলিয়ে গেলেন।

: তুমি জেগে জেগে স্বপ্ন দেখ বন্ধু।

: তাই কি? কি জানি, আমার জীবনটাই হয়তো স্বপ্ন দেখা।

: যেরেমিয়া, শোন, আমি বলছি, তোমায় বাঁচতে হবে। আমি মরতে দেব না। তুমি জান না, যিরূশালেমের দীন দুঃখী সাধারণ মানুষগুলো তোমার ডাকে সচকিত হয়ে জেগে উঠেছে। তুমি তাদের অমন করে পথের মাঝে ফেলে রেখে চলে যেতে পার না।

: যিরূশালেমের সাধারণ মানুষ? তুমি বলছ কি অহিকম, কে তাদের ডাক দিয়েছে? তাদের কাছে আমার কি বলবার আছে?

: তুমি নিজেই তা জান না। কিন্তু তবু তুমিই তাদের ডেকেছ। রাজা আর মন্দিরের জুলুমের বোঝার ভারে ওদের পিঠ ভেঙ্গে আসছে। রাজা আর মন্দিরের বিরুদ্ধে তোমার এই সিংহগর্জন শুনে ওরা সচকিত হয়ে উঠেছে। এর মধ্য দিয়েই ওরা তোমার ডাক শুনতে পেয়েছে। হায় নবী, তুমি তো জান না, কি আগ্রহ নিয়ে ওরা তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে! ওরা আশা করছে, এই সংকট সময়ে তুমি ওদের পথের দিশা যোগাবে, তুমি ওদের বাঁচাবে।

: আমি? আমি বাঁচাব? বল কি তুমি! না, না, ওদের কেউ বাঁচাতে পারবে না। আমি জানি ওরা মরবে। জাতির সঞ্চিত পাপ সমস্ত জাতিকে পুড়িয়ে ছাই করবে। এখানে দোষী-নির্দোষের কোন ভেদ করা হবে না।

: দোষী-নির্দোষের কোন ভেদ করা হবে না? একি কখনও সত্যি হতে পারে? যিহোবার কি ন্যায় অন্যায়ের বিবেচনা নেই?

: তোমার বুদ্ধি আর বিচার শক্তি দিয়ে যিহোবার বিচার করতে যেও না।

: আর তোমার কথাই কি শেষ কথা?

: হ্যাঁ, কেননা এতো আমার কথা নয়, একথা-যে প্রভুর কথা।

: সে কথা এখন থাক। কিন্তু যেরেমিয়া শোন, আমার কথা, তোমাকে বাঁচতেই হবে। আমার অনুরোধ তিনটা দিন তুমি আপনাকে বাঁচিয়ে চলো। তোমার নিজের জন্য নয়, মনে কর শুধু আমার অনুরোধেই।

: কেমন করে আমি আপনাকে বাঁচাব, আমি তোমার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না অহিকম।

: মাত্র তিনটি দিন তুমি আপনাকে বাঁচিয়ে চলো, ওদের হাতে ধরা দিও না। একটা দিন তুমি আমাকে একটু শক্তি সঞ্চয় করে নিতে দাও। তারপর আমি দেখব, দেখব কে কেমন খেলোয়াড়!

যেরেমিয়া একটু ভেবে শেষে বললেন : আমি জানি না, তুমি কি করতে চাও আমাকে নিয়ে। কেনই বা বাঁচাবে, কি করেই বা বাঁচাবে! কিন্তু আজ আমার কী-যে হয়েছে, তোমার অনুরোধ আমি ঠেলচে পারছি না। আচ্ছা, আমি কথা দিচ্ছি, শুধু তোমার একটা কথা রাখবার জন্যই আমি আপনাকে বাঁচিয়ে চলতে চেষ্টা করব। কিন্তু কেমন করে আপনাকে বাঁচাব, আমি তো এসব জানি না।

: সে ভার আমার, তুমি ভাবনা করো না। একটা দিন, আমি যা বলি, সেই ভাবেই তুমি চলবে। আর কিছু না।

: কিন্তু এর কোনই অর্থ হয় না। বৃথাই তুমি ভয় পাচ্ছ অহিকম। ওরা এখন আমার উপর হামলা করবে, একথা আমার মনে হয় না।

: না, আমি বৃথা ভয় করি নি। ওই শুনতে পাচ্ছ, বাইরে একটা গোলমাল না? আমার ভয়-যে অমূলক নয়, তার প্রমাণ বোধ হয় এখনই মিলবে। কি এত তাড়াতাড়ি? এতটা-যে আমিও ভাবতে পারি নি।

বাইরে কিছু লোকের কথা শোনা গেল। গৃহস্বামী দ্রুত এসে ঘরে প্রবেশ করলেন। ঘরে ঢুকেই যেরেমিয়াকে উদ্দেশ্য করে তিনি কম্পিত কণ্ঠে বললেন, প্রভু, কয়েকজন শান্তিরক্ষক রাজার মুদ্রাঙ্কিত আদেশপত্র নিয়ে এসেছে। তারা আমার ঘরে ঢুকে অনুসন্ধান করে দেখতে চাইছে। তারা বলছে, আমি নাকি কোন এক দেশদ্রোহীকে আশ্রয় দিয়েছি।

যেরেমিয়া এগিয়ে এসে বললেন

: চলো, আমি যাই। আমি ওদের সঙ্গে নিজেই গিয়ে দেখা করব।

অহিকম বাধা দিলেন : না, যেরেমিয়া, না। তুমি আমার কাছে প্রতিশ্রুতিতে আবদ্ধ। আপাতত আমার কথা তোমাকে মেনে চলতে হবে। তিনি রেহুমকে ডেকে বললেন

: আপনার দাসকে বলুন, বাড়ির পেছন দিকের পথ দিয়ে আমাদের বের করে দিক। আর আপনি সামনে যান, ওদের আদর আপ্যায়ন করে ঘরের মধ্যে ডেকে নিয়ে আসুন। ওরা ওদের ইচ্ছামত দেখে-শুনে যাক্। আর দেখুন, আপনি আমাকে চেনেন?

রেহুম উত্তর দিলেন : আপনাকে? যিরূশালেমে আপনাকে না চেনে কে?

: আজকের দিনে এটা আমার পক্ষে মোটেই শুভ সংবাদ নয়। দেখুন, যদি আপনার ভাল চান, নবী যেরেমিয়া বা আমার কথা কারু কাছে ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করবেন না। জিভে কড়া লাগাম দিয়ে রাখবেন। খুব হুঁশিয়ার, সময়টা কিন্তু মোটেই ভাল নয়। যাকে বলে দুঃসময়। আবার বলছি হুঁশিয়ার! দাস পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। আহকম আর যেরেমিয়া তার পেছন পেছন বেরিয়ে গেলেন। একটু বাদেই শান্তিরক্ষকরা সদলবলে হুড়মুড় করে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *