অভিশপ্ত নগরী – ১৪

চৌদ্দ

লোকপ্রধান অহিকমের কাছে লোকের পর লোক আসছে। সমস্ত লোকপ্রধানদের মধ্যে তাঁর উপরেই নগরবাসীদের সবচেয়ে বেশী আস্থা ও নির্ভর। কিন্তু আজ সবাই তাঁর উপর অপ্রসন্ন।

তারা বলল, লোকপ্রধান, সমাজশৃঙ্খলার প্রতিষ্ঠা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব আপনাদেরই উপরে ন্যস্ত। আর আজ আপনার ছেলে যদি এই সমস্ত অবাধ্য দাসদাসীদের উচ্ছৃঙ্খলতার সাহায্য করে চলে, এবং আপনি যদি তার কোন প্রতিবিধান না করেন, তাহলে কার উপর আমরা নির্ভর করব?

দলে দলে লোক আসে। এই একই অভিযোগ সবার মুখে। এই অভিযোগের কি উত্তর দেবেন, অহিকম কথা খুঁজে পান না। এতদিন গেদালিয়ার ব্যাপারটা গোপন ছিল, কিন্তু সেদিন যেহাজিয়ার বাড়িতে যে-ঘটনাটা ঘটে গেল, তারপর উপর থেকে নীচ পর্যন্ত প্রত্যেকের মুখে মুখে এই একই কথা। এর জবাবদিহি তো তাঁকেই করতে হবে।

সুখী লোকদের ঘরে ঘরে দুশ্চিন্তার কালো ছায়া পড়েছে। দাস প্রথার উপর প্রতিষ্ঠিত তাদের এই সুন্দর ও শান্তিপূর্ণ সংসারগুলো টলমল করে উঠেছে। এতদিনের এই সর্বংসহ ভারবাহী প্রাণীগুলো যদি আজ তাদের কাঁধের যোয়াল ভেঙ্গে ফেলে সরে দাঁড়ায়, তবে তাদের সংসার-রথ ছুটে চলবে কাদের টানে? যিরূশালেম এর জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। কিছুদিন ধরে চারদিকে একটা অস্পষ্ট কানাঘুষো চলছিল বটে, কিন্তু এদের যে সত্য সত্যই এতদূর স্পর্ধা হতে পারে এমন কথা কেই বা ভাবতে পেরেছে? মঙ্গলময় যিহোবার বিধানে ক্রীতদাসেরা চিরকালই নতমস্তকে তাদের মালিকদের সেবা করে এসেছে। এই ব্যবস্থার উপরেই এতদিন সমাজশৃঙ্খলা দাঁড়িয়েছিল। কোনদিন এর ব্যতিক্রম হয় নি। কিন্তু সম্প্রতি যে-সমস্ত ঘটনা ঘটে চলেছে, ইহুদীদের সুদীর্ঘ ইতিহাসে এমন কথা কোথাও উল্লিখিত হয় নি। কেই বা ভাবতে পেরেছে, এরা এমনভাবে জোট বাঁধবে; মালিকদের মুখের সামনে দাঁড়িয়ে এমনি করে হুমকি দেবে! সবাই বলল এবার যিরূশালেমের পাপের ভরা পূর্ণ হয়েছে।

এই সংকটের ফলে মিসরপন্থী ও বাবিলপন্থীদের বিরোধটা আপাততঃ ধামাচাপা রইল। রাজা, মন্দির-কর্তৃপক্ষ, অধ্যক্ষবর্গ, লোকপ্রধানগণ ও মুক্ত নাগরিকেরা এই সমস্যার চাপে পড়ে এক জায়গায় এসে দাঁড়ালেন। এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে বিন্দুমাত্র মতানৈক্য ছিল না।

এতবড় একটা সুযোগ পেয়ে ছেড়ে দেবেন, আচার্য পশহুর অত কাঁচা লোক নন। ক্রীতদাসদের এই ষড়যন্ত্রের পেছনে যেরেমিয়া ও লোকপ্রধান অহিকমের গোপন হস্ত রয়েছে, একথা তিনি প্রকাশ্যভাবেই প্রচার করতে শুরু করে দিলেন। অবস্থা তাঁর অনুকূলেই ছিল। যেরেমিয়া যে কোনদিন মালিকদের বিপক্ষে বা ক্রীতদাসদের সপক্ষে কোন বাণী দিয়েছেন, এমন কথা অবশ্য কেউ বলতে পারত না। কিন্তু লোকের এখন মনে পড়তে লাগল এবং তাদের মনে করিয়ে দেওয়া হতে লাগল যে, ধনীদের বিরুদ্ধে যেরেমিয়া চিরদিনই অত্যন্ত তীব্র ও আক্রমণাত্মক উক্তি করে এসেছেন। কাজেই তিনিই-যে ভেতরে ভেতরে মালিকদের বিরুদ্ধে ক্রীতদাসদের ক্ষেপিয়ে তোলেন নি, এমন কথাই বা কি করে বলা যায়? আর ক্রীতদাসদের ব্যাপারে লোকপ্রধানদের যোগাযোগ তো যেহাজিয়ার বাড়ির ঘটনাটা থেকেই সুপ্রমাণিত। বাপের প্রশ্রয় না থাকলে ছেলে কি কখনও এমন সাহস করতে পারে? তারপর এই কথা কেই বা না জানে, যেরেমিয়া আর লোকপ্রধান অহিকম পরস্পরের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তাঁরা যা কিছু করেন, এক সঙ্গে পরামর্শ করেই করে থাকেন। আচার্য পশহুরের এই যুক্তি কারও কাছেই খুব বেশী অসংগত বা অবিশ্বাস্য বলে মনে হল না। ফলে গেদালিয়ার নামটা পেছনে পড়ে গেল। আর যেরেমিয়া ও অহিকমের নাম যুক্তভাবে সবার মুখে মুখে ফিরতে লাগল। নাগরিকদের এই সমস্ত বলাবলি ক্রীতদাসদের কানে গিয়ে পৌঁছল। সংবাদটাকে তারা খুব আনন্দের সঙ্গেই গ্রহণ করল। নগরের এমন দু’জন বিশিষ্ট ও জনপ্রিয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সমর্থন ও সহানুভূতি তাদের পেছনে রয়েছে জানতে পেরে তাদের উৎসাহ দ্বিগুণ বেড়ে গেল। আবার সেই সংবাদ যখন তাদের মুখে মুখে অতিরঞ্জিত হয়ে সাধারণ নাগরিকদের এবং সেই সূত্রে উচ্চ স্তরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল, তখন যাদের মনে এ সম্বন্ধে কিছু কিছু সংশয় ছিল, তাও আর রইল না। তাদের আশঙ্কা আতঙ্কে পরিণত হল।

বেচারা যেরেমিয়া কিন্তু এ বিষয়ে বিন্দুবসির্গও জ্ঞাত ছিলেন না। তিনি সে সময় তাঁর জন্মভূমি বিন্নামিনে নানা কাজে এত ব্যস্ত ছিলেন যে, নগরের ঘটনাস্রোত-যে কোনদিকে প্রবাহিত হয়ে চলেছে, এই খবরটুকু পাওয়ার সুযোগও তাঁর ছিল না। তিনি ভাবতেও পারেন নি, তাঁর দৃষ্টির অলক্ষে কি এক বিপদের জাল তাঁকে ঘেরাও করে চলেছে।

অহিকম বিপদের সংকেত পেয়ে সচেতনও ছিলেন, বিশেষ চিন্তাযুক্তও ছিলেন। কিন্তু অবস্থা তাঁর আয়ত্তের বাইরে। গেদালিয়াকে তিনি একান্ত বাধ্য ও পিতৃভক্ত পুত্র বলেই জানতেন। কিন্তু পরীক্ষার সময় যখন এল, তখন তিনি বুঝতে পারলেন, জিন্না সেদিন সত্য কথাই বলেছিল- প্রিয় অহিকম, ছেলে তোমার, কিন্তু তোমার ছেলেকে তুমি চেনো না।

যেহাজিয়ার বাড়ির সেই ঘটনাটা যেদিন ঘটল, গেদালিয়া নিজেই তাঁর কাছে সমস্ত কথা খুলে বলল। শুনে অহিকম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। জিল্লার মুখে গেদালিয়ার সম্পর্কে যে-খবরটুকু তিনি পেয়েছিলেন, তাই নিয়েই তিনি যথেষ্ট আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন। ভেবেছিলেন এসব থেকে দূরে থাকবার জন্য তিনি গেদালিয়াকে ডেকে সতর্ক করে দেবেন। কিন্তু নানা কাজে সুযোগ হয়ে ওঠে নি। কিন্তু এইটুকু দেরীও সইল না! মাত্র কটা দিন যেতে না যেতেই তাঁর কাণ্ডজ্ঞানহীন পুত্র ও কী অঘটন ঘটিয়ে বসল।

কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে হঠাৎ ক্রোধে তিনি যেন ফেটে পড়লেন : মূর্খের মত কেন তুমি অনধিকারচর্চা করতে গিয়েছিলে?

অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পেরে গেদালিয়া নিজেও খুবই উদ্বিগ্ন ছিল। কিন্তু পিতার কথার ঝাঁঝে সেও একটু তেতে উঠল : কেন সে ওকে অমন করে মারবে?

: সে মালিক। সে তার দাসদাসীকে মারবে বা যা খুশী করবে, সে অধিকার তার আছে। তুমি তাতে বলবার কে?

: কে তাকে এই অধিকার দিয়েছে?

অদ্ভূত প্রশ্ন। অহিকম চমকে উঠলেন। এমন প্রশ্ন তিনি আর কোনদিন শোনেন নি। একটু থেমে, একটু ভেবে তিনি উত্তর দিলেন, দাসদাসী মালিকের নিজস্ব সম্পত্তি। সে তাদের নিয়ে যেমন খুশী ব্যবহার করতে পারে। এই ব্যবস্থাই চিরকাল চলে আসছে। তার নিজস্ব সম্পত্তিতে অপরের হস্তক্ষেপের কোন অধিকার নেই। এ আদেশ প্রভুর আদেশ।

: আমাদের প্রভু কি এতই নিষ্ঠুর? তিনি কি অত্যাচারের প্রশ্রয়দাতা?

: গেদালিয়া, প্রভুর কার্যের বিচার করবার অধিকার আমাদের নেই।

: আমি তাঁর কার্যের বিচার করছি না। আমি শুধু এই কথাই বলতে চাই, যারা অত্যাচারী, যারা উৎপীড়ক, নিজেদের স্বার্থ ও খেয়াল চরিতার্থ করবার জন্য তারা নিজেদের কথাকেই প্রভুর কথা বলে প্রচার করে বেড়ায়। আমি বিশ্বাস করি না, মানুষ হয়ে দুর্বলের উপর অত্যাচার করবার অধিকার তারা প্রভুর কাছ থেকে নিয়ে এসেছে। এ কথা যারা বলে তারা মিথ্যাবাদী, তারা প্রভুর নিন্দাকারী।

মানুষ যখন গভীর অনুভূতি নিয়ে কোন কথা বলে, তখন কখনও কখনও তা এমন প্রচণ্ড শক্তি নিয়ে বেরিয়ে আসে যে, তার সামনে যুক্তি-তর্ক যেন স্তব্ধ হয়ে আসতে চায়। গেদালিয়ার এই কথার উত্তরে অহিকম কিছুক্ষণের জন্য কোন কথা খুঁজে পেলেন না। তিনি জানতেন, গেদালিয়ার এই কথা কোন শাস্ত্রজ্ঞের কথা নয়, কারও শেখানো কথা নয়, এ এক নির্দোষ, সুন্দর, সুকোমল, বেদনা- বিগলিত হৃদয়ের স্বতঃস্ফূর্ত অভিব্যক্তি! আপনার প্রাণের সৌন্দর্য ও ভালবাসা দিয়ে সে তার অন্তরলোকে যে সুন্দর ও প্রেমময় প্রভুকে সৃজন করে তুলেছে, দুর্বলের উপর সবলের এই অত্যাচারকে সেই প্রভু কি কখনও প্রশ্রয় দিতে পারেন?

অহিকমের মনে পড়ে গেল তাঁর ছোটবেলাকার কথা। সে এক গোপন কথা, যা এক মাত্র জিল্লা ছাড়া আর কেউ জানে না। তখন তিনি গেদালিয়ার চেয়েও অনেক ছোট। তাঁর পিতা শোফান ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও দুর্দান্ত প্রকৃতির লোক। সামান্য একটু ত্রুটির জন্য, কখনো বা খেয়ালের বশবর্তী হয়ে তিনি দাসদাসীদের নির্দয়ভাবে প্রহার করতেন। দিনের পর দিন তাই দেখে দেখে কিশোর অহিকম কত কান্নাই-যে কেঁদেছেন! তাঁর এই নরম মনের জন্য বাড়ির সবাই হাসাহাসি করত। পিতা শোফান তিক্ত কণ্ঠে বিদ্রূপের ভঙ্গীতে বলতেন, এটা তো পুরুষ বাচ্চা নয়। এটাকে কেনই বা খাইয়ে পরিয়ে বড় করে তুলছি! পিতার এই গালি অহিকম কোনদিন ভোলেন নি। একদিন তিনি তাঁর এই গালির উপযুক্ত প্রত্যুত্তর দিয়েছিলেন। একটি ক্রীতদাস বালক অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। সে তাঁরই সমবয়সী, তাঁর খেলার সাথী, অহিকম তাকে বন্ধুর মতই ভালবাসতেন। শোফান কিন্তু তার এই অসুস্থতার কথা বিশ্বাস করেন নি তাকে সুস্থ করে তোলবার জন্য তিনি তাঁর প্রচলিত ব্যবস্থামত চাবুকের দাওয়াই প্রয়োগ করতে শুরু করলেন। অহিকম কাছেই দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। একবার দু’বার আর তিনি সহ্য করতে পারলেন না, তাঁর রক্তে যেন আগুন ধরে গেল। তাঁর তখন আর হিতাহিত-জ্ঞান ছিল না। এক লাফে সামনে এগিয়ে এসে তিনি তাঁর হাতের চাবুকটা কেড়ে নিয়ে ছুঁড়ে ফেলে দিলেন। সেই মুহূর্তেই তিনি প্রথম বুঝতে পারলেন, পিতার সম্পর্কে কী তীব্র ঘৃণা তিনি এতদিন বুকের মধ্যে পুষে রেখেছিলেন। শোফান দৈত্যের মতই শক্তিশালী ছিলেন। সেই দাসকে ছেড়ে উন্মাদের মতই তিনি অহিকমের উপরে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। অহিকম ধরাশায়ী হয়ে নিঃশব্দে পড়ে রইলেন। তাঁর উপর দিয়ে একটা দুরন্ত ঝাড় বয়ে গেল।

এখন সে কথাটা ভাবতে কেমন যেন একটু সংকোচ আর অস্বস্তি বোধ হয়। যে-কোন অবস্থাতেই হোক না কেন, পিতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাটাকে তিনি কোনমতেই সমর্থনযোগ্য বলে মনে করতে পারেন না। তাতে সমাজশৃঙ্খলা ব্যাহত হয়। আর যা সমাজ-শৃঙ্খলাকে ভয় করে তা কখনই লোককল্যাণকর হতে পারে না।

শোফানের মৃত্যুর পর সংসারের কর্তৃত্ব ও লোকপ্রধানের দায়িত্ব তাঁর উপরে এসে পড়ল। সেদিনকার সেই কিশোর আজ বার্ধক্যের দুয়ারে সমাগত। সেদিন যে-দৃশ্য দেখলে তাঁর রক্তে আগুন ধরে যেত, আজ সেইসব অত্যাচার দিনের পর দিন চোখের সামনে দেখতে দেখতে নিতান্ত সহজ ও স্বাভাবিক বলেই মনে হয়। না, আজও তিনি দাসদাসীদের গায়ে হাত তুলতে পারেন না, জিনিসটাকে তিনি পছন্দও করেন না। কিন্তু প্রতিবেশীরা যখন তাদের দাসদাসীদের প্রহার করে, সে দৃশ্য কই তাঁকে তেমন করে অস্থির করে তোলে না তো। আজ তা আর তাঁর রাত্রির সুখনিদ্রার কোনই ব্যাঘাত করে না। কোথায় গেল সেই দরদী মন? সেদিনের সেই কিশোর অহিকমই কি আজ গেদালিয়ার মধ্য দিয়ে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। কিন্তু একটু অস্পষ্টভাবে হলেও তিনি অনুভব করতে পারেন সেই কিশোর অহিকম আর এই গেদালিয়া এক ধাতু দিয়ে গড়া নয়। গেদালিয়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আজই তাঁর প্রথম মনে হল, এ এক অন্য জগতের লোক, যে জগৎ তাঁর কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত।

গেদালিয়া অহিকমকে নিঃশব্দ দেখে মনে করল, তিনি হয়তো ক্রোধের বশেই তার সঙ্গে কথা বলছেন না।

পিতাকে সে আন্তরিকভাবেই ভালবাসত। একটু অভিমানক্ষুণ্ণ কণ্ঠে জিল্লাকে উদ্দেশ করে বলল

: দেখছ মা, বাবা আমার সঙ্গে রাগ করে কথা বলছেন না।

: রাগ করবেন না? তুমি তাঁকে বলেছ, প্রভুর নিন্দাকারী। এতে মানুষের রাগ হয় না?

: বারে, আমি এমন কথা কখন বললাম? তুমি বড় বানিয়ে বানিয়ে কথা বলতে পার না।

: ও, তবে আমিই হলাম মিথ্যাবাদী?

গেদালিয়া হেসে উঠল : এবার সত্য কথা বলেছ তুমি। মার চেয়ে বড় মিথ্যাবাদী আবার কে আছে? মনে করে দেখ, সেই ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত আমাকে তুমি কত মিথ্যা সান্ত্বনা আর কত মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ভুলিয়ে আসছ। আমি তার সব কথা ভুলে যাই নি। তুমি তো মা মিথ্যার রানী। কিন্তু শোন মা, তুমিও যেন রাগ করে মুখ ফিরিয়ে থেকো না। আমার কথা তোমাদের শুনতেই হবে। তোমরা আমাকে দুষছ, কেন আমি অনধিকারচর্চা করতে গেলাম। অধিকার আর অনধিকার, অত কথা কি আর তখন ভেবে দেখার সময় ছিল। একটা অসহায় মেয়ে আঘাতের যন্ত্রণায় চীৎকার করে কাঁদছে, আমি কি করে তা চুপ করে দাঁড়িয়ে দেখব? কাছে গেলাম। গিয়ে দেখি পশুটা নেমাহর উপর চাবুকের উপর চাবুক মেরে চলেছে। আর ছোট ছেলেটা মায়ের দিকে তাকিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে।

—মা, শোন মা, আমার কি মনে হলো জান? মনে হলো ও তো নেমাহ্ নয়, G যেন মা তুমি। তোমাকে ও মারছে, আর আমি কি করে তা দাঁড়িয়ে দেখব! ইচ্ছে করছিল, ঐ পশুটাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলি। কি করে-যে আপনাকে সামলে রাখলাম, অবাক হয়ে সেই কথাই আমি ভাবি। তারপর, তারপর কি হল জান মা? চেয়ে দেখি ছেলেটা আর কাঁদছে না তো। বাঘের মত ওর চোখ দু’টো জ্বলে উঠল। তারপর লাফ দিয়ে পড়ে যেই হাতটা দিয়ে সে ওর মাকে মারছিল সেই হাতটা কামড়ে ধরল। সাবাস বাচ্চা, সাবাস! মনে হলো মা আমিই যেন সেই ছেলেটা।

: আহা, তারপর কি হলো রে?

: তারপর? তারপর সেই ছেলেটাকে পশুটা এমন আঘাত করল যে, সে অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল? আর নেমাহ্ একটা বুকফাটা চীৎকার করে ছেলেটার উপর আছড়ে পড়ল।

: আহা রে! আর তোমরা তুমি, তুমি, তুমি কি করলে?

: আমি কিছুই করি নি মা, শুধু ওকে ধরে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে বললাম— এই শয়তান, চুপ করে দাঁড়াও। আর য়ুসুফ ওর হাত থেকে চাবুকটা কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে ফেলল।

—মা, তোমরা আমাকে দুষছ, আমি হাঙ্গামা বাধিয়েছি বলে। কিন্তু আমি কে? আমি কিছুই না। এ হাঙ্গামা বাধতই, এ হাঙ্গামা বাধবেই, এ হাঙ্গামা চলবেই। মানুষ আর কত সহ্য করবে? কিন্তু জানো মা, তখন সেই উত্তেজিত ক্রীতদাসদের যদি আমরা সংযত করতে না পারতাম, তা হলে সেই পশুটার আর চিহ্নমাত্র বাকী থাকত না। কিন্তু ওই পশুটা তো নগণ্য, ওকে মেরে আর কিই বা হবে? ওর পেছনে ধর্ম ও সমাজের অনুমোদন নিয়ে যে-বিরাট রাক্ষসটা বংশ বংশ ধরে সহস্র সহস্র দাসদাসীর রক্ত পান করে চলেছে, আমরা তারই মৃত্যুবাণ খুঁজে খুঁজে ফিরছি। তাকে একদিন মরতেই হবে।

অহিকমের আবার মনে পড়ল জিন্নার সেই কথা- প্রিয় অহিকম, গেদালিয়া তোমার ছেলে, কিন্তু তোমার ছেলেকে তুমি চেনো না। সত্য কথাই বলেছিল জিন্না। গেদালিয়া এ কোন্ ভাষায় কথা কইছে? এসব কথার তাৎপর্য বুঝে ওঠা যেন তাঁর ক্ষমতার বাইরে। শাস্ত্রের কোথাও তিনি এমন কথা পান নি, কোন নবীর বাণীতে এমন কথা তিনি শোনেন নি। মনে হয় কথাগুলো যেন তাঁর অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসছে। য়ুসুফও এমনি করেই কথা বলে। ওদের কথাগুলো শুনলে পরে ভয় হয়, মনে হয় এসব কথার পরিণতি যেন ভাল নয়। এসব কথা কি সমাজ ও ধর্মের বিরোধী নয়? এসব কথা ওরা কোথায় পেয়েছে? তিনি যখন গেদালিয়ার বয়সী ছিলেন তখন তাঁদের চিন্তার ধারাই ছিল আলাদা। যৌবনের সেই বর্ণোজ্জ্বল দিনগুলোতে তাঁরা উৎসবে আমোদে আর প্রেমের খেলায় মত্ত থাকতেন, এ সমস্ত কথা ভাববার মত সময়ই তাঁদের ছিল না। কিন্তু গেদালিয়াই বা এমন হল কেন? যুগের ধারা তবে কি বদলে যাচ্ছে?

জিল্লা একবার অহিকমের মুখের দিকে তাকিয়ে নিয়ে তারপর গেদালিয়াকে বললেন : কিন্তু গেদালিয়া, এর পালটা আঘাত যখন ক্রীতদাসদের উপর শতগুণ তীব্র হয়ে নেমে আসবে, তখন তারা তা সহ্য করতে পারবে তো? সেজন্য তারা তৈরি আছে?

মায়ের প্রশ্ন শুনে গেদালিয়া আশ্চর্য হয়ে গেল। খুশীও হল : মা, তোমার গেদালিয়া কি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে? এ প্রশ্নের উত্তর দেবে এরাই। তুমি কি শোন নি মা, দেশ-বিদেশের ক্রীতদাসেরা জীবন পণ করে এই প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে।

: এ আঘাত যখন নামবে, তখন কি শুধু ক্রীতদাসদের মাথার উপরেই তা ভেঙ্গে পড়বে? ক্রীতদাসদের সঙ্গের সঙ্গী যারা তারা কি অক্ষত থাকবে?

: না, তারাই বা অক্ষত থাকবে কেন? আমার কথা বলছ মা? আমার কাজের ফলাফলের জন্য আমি অবশ্যই প্রস্তুত আছি। এ জন্য আমি কোনদিন অনুশোচনা করব না।

: তা আমি জানি। কিন্তু তোমার বৃদ্ধ পিতা কি সেজন্য প্রস্তুত আছেন? আপাততঃ সবচেয়ে বড় বিপদ-যে তাঁর উপরে। সমস্ত নগরের লোক তোমার কাজের জন্য তাঁর কাছেই কৈফিয়ৎ চাইছে। তোমার কাজের জবাবদিহি-যে তাঁকেই করতে হবে।

গেদালিয়া এ দিকটার সম্পর্কে একবারও ভেবে দেখে নি। চিন্তা করে দেখল, মায়ের কথা মিথ্যা নয়। কি বলবে ঠিক করতে না পেরে সে নিরুত্তর হয়ে রইল।

: অথচ তোমার সঙ্গে তাঁর মতের মিল নেই। কিন্তু সে কথা কে শুনবে?

এতক্ষণে অহিকম মাথা তুললেন : গেদালিয়া!

: বাবা, আমায় ডাকছো?

: শোন গেদালিয়া, তুমি জান না, কিন্তু তোমার মা জানেন, এই ক্রীতদাসদের উপর অত্যাচারের জন্য আমি একদিন নিজের পিতার বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছিলাম। তখন আমি তোমার চেয়ে অনেক ছোট। সেদিন যা করেছিলাম, শিশু-বুদ্ধিতেই করেছিলাম। কিন্তু আজও আমি আমার দাসদাসীদের ঘরের লোকের মতই মনে করি। কেউ যদি ওদের গায়ে হাত তোলে আমি ব্যথা পাই। কিন্তু তাই বলে গৃহের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে দাসদাসীদের নিয়ে দল বেঁধে হৈ চৈ করা, এ আমি কখনই ভাল মনে করি না। এতে আমাদেরও মঙ্গল নেই, ওদেরও না। ঝগড়াঝাঁটি বাদসিংবাদ নয়, দয়ামায়া ও সুবিবেচনার মধ্য দিয়েই এর সমাধান করতে হবে।

: বাবা-

: না, বাদ-প্রতিবাদ নয়, আমাকে আমার কথা কয়টা বলতে দাও। তোমরা তরুণ, ভবিষ্যৎ চিন্তা করে কাজ করবার বুদ্ধি তোমাদের এখনও হয় নি। আমি শুনেছি, তোমরা সমস্ত ক্রীতদাসদের মুক্ত করে দিতে চাও। কিন্তু তা কখনও সম্ভব নয়, সমাজের পক্ষে মঙ্গলকরও নয়। ক্রীতদাসদের বাদ দিয়ে সমাজ কোন দিন চলতে পারে নি, পারবেও না। আর আমাদের বাদ দিয়ে ক্রীতদাসেরাও বাঁচতে পারবে না।

: শুনুন বাবা-

: না, শোন আমার কথা। আমি য়ুসুফ আর তোমার কথার অর্থ বুঝতে পারি না। এ সব কথা তোমরা কোথায় পেয়েছ? এ সব কথা শাস্ত্রে নেই, কোন ধর্মজ্ঞ লোক এ সব কথা বলে না। আমার ভয় হয়, যিহোবার বিরোধী কোন অশুভ ব্যক্তি তোমাদের বিপথে পরিচালিত করছে।

সেদিনকার মত কথা এখানেই শেষ হয়ে গেল। অহিকম গেদেলিয়াকে কথা বলবার কোন সুযোগ না দিয়ে সেইখানেই বিতর্কের ছেদ টেনে দিলেন। এর কয়েকদিন বাদে। সকালবেলা বাইরে থেকে কারা যেন ডাকাডাকি করছিল। একজন দাস ঘরের মধ্যে এসে ত্রস্তভাবে সংবাদ দিল, নগর-রক্ষক লোকপ্রধানকে ডাকছেন। ক’দিন ধরে আবহাওয়াটা থমথম করছিল। তাই সবাই চমকে উঠল। এমন ভোরে হঠাৎ নগর-রক্ষক কেন?

অহিকম প্রশ্ন করলেন, তাঁর সঙ্গে আর কে আছেন?

দাস উত্তর দিল, জন কয়েক শান্তিরক্ষক।

অহিকম, জিল্লা আর গেদালিয়া অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে পরস্পরের মুখের দিকে তাকালেন। অহিকম একটু শুকনো হাসি হেসে বললেন, আমন্ত্রণের রকমটা যেন তেমন প্রীতিপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে না।

এ বিষয়ে সকলের মনেই সন্দেহ ছিল। গেদালিয়ার মুখ বিবর্ণ। মায়ের দিকে সে যেন আর চোখ তুলে তাকাতে পারছে না।

: বাবা, আমি তোমার সঙ্গে যাব।

: কোথায়?

: ওরা তোমাকে যেখানে নিয়ে যাবে।

: ওরা তোমাকে যেতে দেবে কেন? না, গেদালিয়া, কোথাও যাবে না তুমি। আমার এই আদেশ অমান্য করো না। তুমি এখন বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাবে না। এ সময় তোমার মায়ের কাছেই থাকা দরকার।

অহিকম বিদায় নিলেন। জিন্না কাঁদলেন না; রুদ্ধকণ্ঠে বললেন, যাও, তাড়াতাড়ি ফিরে এসো।

দু’পা এগিয়ে গিয়েই অহিকম কি মনে করে আবার ফিরে এলেন : গেদালিয়া!

: কি বাবা?

: শোন, আমাকে তুমি ভুল বুঝো না। তোমার উপর আমি কিন্তু রাগ করি নি, বরং তোমার সাহস দেখে খুশীই হয়েছি।

: বাবা!

: হ্যাঁ, আমি তোমার জন্য মনে মনে গর্ববোধ করি।

: বাবা!

: হ্যাঁ, কিন্তু আমি তোমাদের সঙ্গে একমত হতে পারবো না। আমি মনে করি, তোমরা ভীষণ ভুল করছ। এ পথ যিহোবার পথ নয়। তুমি আমার একটা কথা ভাল করে ভেবে দেখ। যিহোবার কাছে একান্ত মনে প্রার্থনা কর, তিনিই তোমার ভুল বুঝিয়ে দেবেন।

অহিকম চলে গেলেন।

কিছু বাদেই সংবাদ পাওয়া গেল, যা আশঙ্কা করা গিয়েছিল তাই। রাজার আদেশে লোকপ্রধান অহিকমকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আরও জানা গেল, নগরের আরও একজন লোককে একই সময়ে আটক করা হয়েছে। তিনি নবী যেরেমিয়া।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *