অভিশপ্ত নগরী – ৬

ছয়

বিন্নামিন প্রদেশের এ্যানাথোথ-নিবাসী হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া, আপনার অবগতির জন্য বিজ্ঞাপিত করা হচ্ছে যে, এই বিচারসভায় আপনার বিরুদ্ধে কয়েকটি অভিযোগ উপস্থিত করা হয়েছে। এই অভিযোগগুলো এতই গুরুতর যে, রাজা ও মন্দিরের পক্ষ থেকে এজন্য আপনার মৃত্যুদণ্ডের দাবী করা হয়েছে। এই বিচারসভায় মন্দিরের প্রতিনিধিগণ, অধ্যক্ষগণ ও লোকপ্রধানগণ উপস্থিত আছেন। সকল পক্ষের বক্তব্য শোনবার পর তাঁরা তাঁদের অভিমত জ্ঞাপন করে বিচারকার্যের সহায়তা করবেন। হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া, ন্যায়ের বিধান-অনুসারে আপনাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে, আপনি কি আপনার পক্ষ সমর্থন করার মত বক্তা বা আপনার পক্ষে সাক্ষ্য দেবার মত কোন সাক্ষী উপস্থিত করবেন? বিচারপতি তাঁর প্রাথমিক বক্তব্য শেষ করে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে যেরেমিয়ার দিকে তাকালেন।

: একমাত্র যিহোবাই আমার পক্ষসমর্থনকারী বক্তা, একমাত্র যিহোবাই আমার সাক্ষী। কোন মানুষের উপর আমার কোন নির্ভরতা নেই। যেরেমিয়ার উচ্চ কণ্ঠের বজ্রগম্ভীর ধ্বনি বিচারগৃহের প্রাচীরের গায়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল। কিছু কালের জন্য সমস্ত ঘরটা স্তব্ধ হয়ে রইল। উপস্থিত প্রতিনিধিগণ পরস্পরের মুখের দিকে তাকালেন। বহুদিন থেকে বহু বিচারের কাজ তাঁরা চালিয়ে এসেছেন, কিন্তু স্বয়ং যিহোবাকে কারও পক্ষ-সমর্থনে বক্তৃতা করতে বা কারও পক্ষে সাক্ষ্য দিতে তাঁরা কেউ কোনদিন দেখেন নি। তাঁদের মধ্যে একটু অস্ফুট গুঞ্জন শোনা গেল।

বিচারপতি আবার বললেন : হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া, এই পার্থিব বিচারসভার কাজ এতকাল আমাদের মত মানুষেরাই চালিয়ে এসেছে। যিহোবা বিচারসভার কাজ পরিচালনার যাবতীয় ভার আমাদের মত মানুষের উপরেই ন্যস্ত করে এসেছেন। কিন্তু তিনি নিজে কোনদিন কারও পক্ষ নিয়ে কোন কথা বলতে আসেন না। যেরেমিয়া প্রতিবাদ করে বললেন : না, এ কথা ঠিক নয়। মিসরের ফেরাউনের মোষাল থেকে যেদিন প্রভু ইসরায়েল সন্তানদের মুক্ত করে দিয়ে এলেন, সেদিন থেকে শুধু বিচারের বিষয়ে নয়, সর্ব বিষয়েই প্রভুকে কথা বলতে হয়েছে। যারা তাঁর বিরুদ্ধে অবাধ্যতা করেছে, ঘাড় শক্ত করে দাঁড়িয়েছে, তাদের তিনি ভর্ৎসনা করেছেন, অভিসম্পাত করেছেন, কঠিন হস্তে শাসন করেছেন, এ কথা কার অবিদিত?

একজন মন্দিরের প্রতিনিধি এই কথার উপরে বললেন : প্রভু কথা বলেছেন, তা মানি। কিন্তু নিজ মুখে বলেন নি। তিনি যা কিছু বলেছিলেন, তাঁর আপন মানুষ মোশির মুখ দিয়ে বলেছিলেন। কিন্তু আজ সেই মোশিও নেই, সেই দিনও চলে গিয়েছে।

: না, সে দিন চলে যায় নি। প্রভুর বাণী নিত্য ধ্বনিত হয়ে চলছে। তাঁর আপন ভৃত্য তিনি সর্বযুগেই সৃষ্টি করেন। তাঁদের মুখ দিয়েই তিনি কথা বলেন।

: সম্প্রতি তিনি বুঝি আপনার মুখ দিয়েই বলছেন। একজন বিদ্রূপোক্তি করল।

: হ্যাঁ, আমার মুখ দিয়েই। আমি-যে তাঁর কথা শুনতে পাই।

কয়েকজন এক সঙ্গে কলরব করে উঠল : স্পর্ধা দেখেছ লোকটার! ভয় নেই প্ৰাণে!

যেরেমিয়া স্থির কণ্ঠে উত্তর দিলেন : না, ভয় নেই, আমি কেন ভয় করব? প্রভু যাকে অনুগ্রহ করেন, তার আর ভয় থাকে না, সে চির নির্ভয়।

প্রতিপক্ষ স্তব্ধ হয়ে গেল। কতক্ষণ কারু মুখে কোন কথা ফুটল না।

বিচারপতি প্রশ্ন করলেন : হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া, আপনি কি আপনাকে নবী বলে ঘোষণা করেন।

: নবী কাকে বলে আমি জানি না। তবে প্রভু আমাকে যেমন দেখান, আমি তেমনি দেখি, যেমন বলান, তেমনি বলি, যেমনি করান তেমনি করি। আমার নিজের কোন স্বাতন্ত্র্য্য নেই।

আচার্য পশহুর এতক্ষণ কোন কথা বলেন নি। এবার তিনি মুখ খুললেন : হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া, আপনি যদি সত্য সত্যই নবী হয়ে থাকেন, তাহলে যিহোবার দিব্য, এই পবিত্র ধর্মসভায় দাঁড়িয়ে সুস্পষ্টভাবে বলুন, আপনি কোন দৈবচিহ্ন দেখাতে পারেন বা কোন অলৌকিক কার্য করতে পারেন?

: কোন দৈবচিহ্ন দেখানো বা কোন অলৌকিক কার্য করা আমার পেশা নয়। আমি যাদুকর, ডাইন বা গুপ্তমন্ত্রবিদ নই। আমি শুধু প্রভুর প্রত্যাদেশ ঘোষণা করে বেড়াই। এই আমার কাজ, এই আমার জীবন।

কয়েকটি উত্তেজিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

: ধর্মদ্রোহী, মিথ্যাবাদী, ভণ্ড।

: প্রভুর মানুষ মোশি কি কোন দৈবচিহ্ন দেখান নি বা অলৌকিক কার্য করেন নি?

: আইজাইয়া ও অন্যান্য প্রেরিত পুরুষরা কি ব্যবসা ফাঁদবার জন্য অলৌকিক কার্যাদি করেছেন?

: নবীদের সম্পর্কে কি জঘন্য অপবাদ! এই অপরাধের জন্যই এর প্রাণদণ্ড হওয়া উচিত। কোলাহল বেড়ে উঠল। বিচারপতি গোলমাল থামাবার জন্য তাঁর ন্যায়দণ্ড ঊর্ধ্বে তুললেন। প্রতিবাদকারীরা সংযত হল। বিচারপতি ধীর গম্ভীরকণ্ঠে বললেন, অভিযুক্ত নবী কিনা আপাততঃ সে প্রশ্ন স্থগিত থাকুক। এবার বিচারকার্য আরম্ভ হবে। আমি এখানে উপস্থিত অভিযোগকারী, অভিযুক্ত এবং বিচারার্থে আহৃত মন্দিরের প্রতিনিধিগণ, অধ্যক্ষগণ ও লোকপ্রধানগণের উদ্দেশে বলছি, এই মহাপবিত্র ধর্মাধিকরণের সম্মুখে আপনারা যে-সমস্ত উক্তি বা সিদ্ধান্ত করবেন, তার মধ্যে যদি বিন্দুমাত্র মিথ্যা বা কপটতা থাকে, তাহলে পরলোকে অনন্ত নরকাগ্নি আপনাদের জন্য প্রজ্বলিত থাকবে। এই কথা স্মরণ রেখে আপনারা আপনাদের কর্তব্য সম্পাদনে প্রবৃত্ত হোন। প্রথমে মন্দিরের অধ্যক্ষ মেলেফিয়ার পুত্র পশহুর, আপনি আপনার অভিযোগ উত্থাপন করুন। আচার্য পশহুর উঠে দাঁড়ালেন।

“পশহুর, পশহুর, শোন শোন, কি বলছেন”-চারদিকে কানাকানি পড়ে গেল।

: হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া প্রকাশ্য জনসমাবেশের মধ্যে প্রভুর মন্দিরের বিরুদ্ধে অনর্গল মিথ্যা কুৎসা প্রচার করে বেড়াচ্ছেন। তিনি রাজপথের উপর দাঁড়িয়ে সকলের সামনে মন্দিরের অধ্যক্ষ, যাজক ও সেবকদের নামে থুথু ফেলেন, আমাদের হোম ও বলিদানকে শয়তানের পূজা বলে আখ্যা দেন।

: ধিক ধিক, মিথ্যা কুৎসাকারীর উপর প্রভুর অভিসম্পাত নেমে আসুক, মৃত্যুদণ্ড, একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই এর উপযুক্ত শাস্তি-মন্দিরের লোকেরা গর্জন করে উঠল।

বিচারপতি যেরেমিয়ার মুখের দিকে চেয়ে প্রশ্ন করলেন : হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া, এ অভিযোগ গুরুতর। আপনি বলুন, এ কি সত্য?

যেরেমিয়া উত্তর দিলেন : আচার্য পশহুর যা বলেছেন তা অসত্য নয়। কিন্তু আমার বক্তব্যকে যথাযথভাবে উপস্থিত করা হয় নি।

: বেশ, আপনার যা বক্তব্য আপনি নিজ মুখেই বলুন।

: বলছি। কিন্তু আমি নয়, আমার কণ্ঠ দিয়ে প্রভুই বলছেন; আঃ, আমার ঘৃণ্য সন্তানগণ, তোমরা আমার মন্দিরে স্বর্ণময় দীপবৃক্ষের উপর শত শত রত্নদীপ জ্বালাও, সুগন্ধি ধূপ পুড়িয়ে সুবাস ছড়াও, তোমরা আমার ভোগের জন্য স্তূপীকৃত অর্ঘ্য সাজাও আর বলির পশুর রক্তে মন্দির-প্রাঙ্গণ কর্দমাক্ত করে তোল। আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি, না তোমরা আমাকে সৃষ্টি করেছ যে, তোমরা আমাকে শিশুর মত ভুলিয়ে রাখতে চাও? তোমাদের এই উজ্জ্বল আলোকচ্ছটা কি আমার চোখকে ধাঁধিয়ে দিতে পারে? তোমাদের লেবীয় বাদকদের সন্ধ্যারতির উচ্চ দক্ষ-মৃদঙ্গ-করতাল-কাংস্যধ্বনি কি আমার কর্ণকে বধির করে রাখতে পারে? আমি কি দেখতে পাই না, তোমাদের ওই পবিত্র মসিনা-বস্ত্রের যবনিকার অন্তরালে ব্যভিচারের কি গোপন স্রোত বয়ে চলেছে? আমি কি জানি না, কত পূজার্থিনী রমণীর সতীত্ব-ধর্মকে মন্দিরের সেবকদের কামাগ্নিতে আহুতি দেওয়া চলেছে?

প্রধান যাজক মেসায়ার পুত্র জেফানিয়া আর ধৈর্য ধরে থাকতে পারলেন না। স্থান কাল অবস্থা ভুলে গিয়ে চীৎকার করে উঠলেন : আঃ, এই ক্ষিপ্ত গরলস্রাবী কুকুরটার মুখটাকে কেউ বন্ধ করে দিতে পারে না! একজন তরুণ অধ্যক্ষ প্রধান যাজকের এই আপত্তিতে বাধা দিয়ে বললেন, না, এ কখনই সংগত কথা নয়। বিচারপতি আদেশ দিয়েছেন, অভিযুক্তকে তাঁর বক্তব্য অবশ্যই বলতে দিতে হবে। বিচারপতি তাঁর কথায় সায় দিয়ে বললেন, অভিযুক্তের মুখ বন্ধ করবার অধিকার আমাদের নেই। আপনারা ভুলবেন না অভিযুক্তের মাথার উপর মৃত্যুদণ্ডের খড়গ ঝুলছে। তাঁর পক্ষ সমর্থন করবার মত কোন বক্তা নেই, তাঁর পক্ষে সাক্ষ্য দেবার মত কোন সাক্ষী নেই। কাজেই তাঁর বক্তব্য বলবার পুরোপুরি সুযোগ তাঁকে দিতেই হবে। এতে কারও অধৈর্য হলে চলবে না।

যেরেমিয়া বলে চললেন : তোমরা আমার নাম করে প্রথমজাত পশু ও ফলশস্যাদি এবং উৎপন্নের দশমাংশ প্রজাদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে আস। আর সেই সম্পদের অধিকাংশ দিয়ে তোমরা আপন ঐশ্বর্যের পাহাড় গড়ে তুলছ। তোমরা শুনে রাখ, এই পাহাড় একদিন তোমাদেরই কবর স্তূপে পরিণত হবে।

কে একজন চীৎকার দিয়ে উঠল : মিথ্যা কথা।

: ‘আকাশ, পৃথিবী, সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ, তারা থেকে শুরু করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কীটপতঙ্গ পর্যন্ত আমার দৃষ্টিগোচরে। এ হেন আমি, আমার কাছ থেকে কি তোমরা লুকিয়ে থাকতে পার? একদিন আমি আপন হাতে বিশুদ্ধ বীজ বপন করে এক উন্নত দ্রাক্ষালতাকে লালন করে তুলেছিলাম। আজ তা বন্যলতার মত জটিল শাখা প্রশাখা ছড়িয়ে মন্দিরকে পর্যন্ত আচ্ছন্ন করে ফেলেছে। আর তারই আড়ালে মন্দিরের মধ্যে গোবৎস, পক্ষী ও নাগদেবতারা গোপন ভূগর্ভে এসে আশ্রয় নিয়েছে। একদিন আমি এই মন্দিরের একচ্ছত্র অধিপতি ছিলাম, আর আজ তোমরা পরজাতীয়দের পূজিত মিথ্যা দেবতাদের আমার ঘরে এনে ঠাঁই করে দিয়েছ। একদিন সুন্দরী যিরূশালেম আমার একনিষ্ঠ শয্যাসঙ্গিনী ছিল, আর আজ সে নিত্য নতুন উপপতি সংগ্রহ করে আমার গৃহকে বেশ্যালয়ে পরিণত করছে, আমি কি তা জানি না?’

মন্দিরের পক্ষ থেকে প্রতিবাদের কলরব উঠল।

বিচারপতি প্রশ্ন করলেন : হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া, মন্দির-সম্পর্কে আপনি যে-সমস্ত কথা বলছেন, আপনি কি তার কোন প্রমাণ দিতে পারেন?

: না, প্রভুর কথার উপর কোন সাক্ষী বা প্রমাণের প্রয়োজন করে না। বিচারপতি বাম দিকে মুখ ফিরিয়ে বললেন

: রাজার পক্ষ থেকে যিনি অভিযোগ উপস্থিত করবেন, তিনি তাঁর বক্তব্য বলুন।

রাজার প্রতিনিধি একজন প্রবীণ অধ্যক্ষ এগিয়ে এলেন। যেরেমিয়া রাজদ্রোহী। তিনি রাজার বিরুদ্ধে ‘প্রজাদের উত্তেজিত করে তুলতে চেষ্টা করেছেন। যেরেমিয়া জাতিদ্রোহী, দেশদ্রোহী। তিনি যিরূশালেম ও য়াহুদার একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত প্রচার করে বেড়াচ্ছেন যে, আমাদের দেশ বিদেশী আক্রমণকারীদের দ্বারা বিধ্বস্ত হবে, মন্দির ধ্বংস হবে এবং যিরূশালেম পৃথিবীর জাতিবর্গের সম্মুখে অভিশপ্ত নগরী বলে গণ্য হবে।

: আপনার সাক্ষী আছে?

: সাক্ষীর অভাব নেই, কিন্তু সম্ভবত তার কোন প্রয়োজন হবে না, যেরেমিয়া নিজেই বলুন আমার এই অভিযোগ সত্য কিনা।

বিচারপতি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে যেরেমিয়ার দিকে তাকাতেই যেরেমিয়া বললেন : এ কথা দিনের আলোর মত সত্য। কিন্তু আমি প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। আমি কোন কথা বলতে চাই নি। একদিন প্রভু আমার নাম ধরে ডাকলেন, যেরেমিয়া, যেরেমিয়া!

—প্রভু, এই-যে আমি।

—তোমাকে আমি কি বলতে পাঠিয়েছিলাম? তুমি কথা বলছ না কেন যেরেমিয়া? তুমি এমন ভয় করছ কেন? তুমি কাকে ভয় করছ? আমি তো তোমার সঙ্গে আছি। আমি তোমাকে রক্ষা করব। এই বলে প্রভু তাঁর দীর্ঘ বাহু বাড়িয়ে দিলেন। তাঁর অঙ্গুলীর অগ্রভাগ এসে আমার ওষ্ঠ স্পর্শ করল। আর তিনি বললেন, যেরেমিয়া, দেখ এই-যে আমার বাণী তোমার মুখে দিয়ে দিলাম। আর তোমার কি চাই?

হ্যাঁ, আমি তখন গর্জে উঠলাম। আমার আর ভয় রইল না, দ্বিধা রইল না।

আমি বললাম : রাজা, তুমি তোমার ঐশ্বর্য আর শক্তির গর্বে প্রমত্ত। আমিই তোমাকে একদিন রাজপদে বসিয়েছি। কিন্তু তুমি আজ আমার কথা ভুলে গিয়েছ। রাজা, তুমি অত্যাচারী, প্রজাদের জীবন তুমি অশান্তিময় করে তুলেছ। তোমার এই দুঃসাহস আমি আর কত দিন নিঃশব্দে সহ্য করব! যেদিন আমার প্রবল হস্তের আঘাত দুর্নিবার বেগে নেমে আসবে, সেদিন মায়ের গর্ভে প্রবিষ্ট হবার আগে যেমন ছিলে, তেমনি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে তুমি। আর তোমার এই রাজত্ব আর ঐশ্বর্য আর প্রতাপ জল-বুদের মতই ফুৎকারে মিলিয়ে যাবে। আর পৃথিবীর মানুষ তাই দেখে হাসবে, কেউ তোমার জন্য এক ফোঁটা চোখের জলও ফেলবে না।

প্রভু আমাকে ডাক দিলেন, – যেরেমিয়া, যেরেমিয়া!

—প্রভু, এই-যে আমি।

— যেরেমিয়া, তোমার চোখের সামনে তুমি ওটা কি দেখছ?

— আমি দেখছি বাদাম গাছের বিশাল এক দণ্ড।

—ঠিকই দেখছ তুমি। আমি তোমাকে যে-কথা বলেছি, ওই দণ্ড দিয়েই আমি

তা সুসম্পন্ন করব। আমি ধ্বংসের প্রতিজ্ঞা নিয়ে এসেছি। আমি কিছুতেই নিবৃত্ত হব না।

প্রভু আবার আমাকে ডাকলেন, –

যেরেমিয়া, যেরেমিয়া!

—প্রভু, এই-যে আমি।

—তোমার চোখের সামনে তুমি কি দেখছ যেরেমিয়া?

—আমি দেখছি একটা ধাতুপাত্র। তার মধ্যে একটা তরল পদার্থ টগবগ করে ফুটছে। পাত্রের মুখ দিয়ে রক্তবর্ণ ধূম উদ্‌গীরিত হচ্ছে।

—পাত্রের মুখ কোন্ দিকে?

— উত্তর দিকে।

প্রভু বললেন

: হ্যাঁ, তুমি ঠিকই দেখছ। ধ্বংসের বাহিনী তো উত্তর দিক থেকেই আসবে। তাদের আক্রমণ সারা দেশের উপর মহামারীর মতই ভেঙ্গে পড়বে। যিরূশালেম আর য়াহুদাদের সমস্ত নগরের প্রাকারের চতুর্দিকে আর দ্বারের মুখে মুখে তারা তাদের সিংহাসন স্থাপন করবে। আর তখন সেই চূড়ান্ত মুহূর্তে আমি আমার চরম দণ্ড ঘোষণা করব। তখন আমার এই অবাধ্য সন্তানেরা যারা দুষ্টবুদ্ধি দ্বারা পরিচালিত হয়ে আমার পথ পরিত্যাগ করে অধর্মের পথ গ্রহণ করেছে, যারা আমার দিকে পেছন করে অন্যান্য দেবতাদের সামনে ধূপ পুড়িয়েছে, আর নিজেদের হাতেগড়া ধাতু কাঠ আর পাথরের মূর্তিকে পুজো করছে, তাদের উপর এমন কঠিন দণ্ড নেমে আসবে যার তুলনা নেই। সমস্ত মানুষের কাছে তা এক বিভীষিকাপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এই সময় আচার্য পশহুর উঠে দাঁড়িয়ে বললেন : এই প্রলাপোক্তি আমাদের আর কত শুনতে হবে? আমাদের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণের পক্ষে এই কি যথেষ্ট নয়?

বিচারপতি যেরেমিয়াকে উদ্দেশ্য করে বললেন : আপনি আপনার বক্তব্যের মধ্য দিয়ে রাজা ও মন্দিরের বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ করেছেন, কিন্তু এই সমস্ত অভিযোগের সপক্ষে আপনি কোন প্রমাণ উপস্থিত করতে পারেন? প্রমাণ ছাড়া এসব কথার মূল্য কি? আপনি ভাল করে ভেবে দেখুন।

: আমার প্রমাণ যিহোবা।

দক্ষিণ দিকের আসনগুলো থেকে বিদ্রূপের হাস্যধ্বনি শোনা গেল। অহিকম সচকিত হয়ে প্রথমে দক্ষিণ দিকে, পরে বাম দিকে তাকালেন। দক্ষিণে মন্দিরের প্রতিনিধিদের মুখে বিজয়োল্লাসের চিহ্ন। বামদিকে অধ্যক্ষদের মধ্যে একটু বাদ-প্রতিবাদ চলেছে। রাজপ্রতিনিধি হিসেবে যেই প্রাচীন অধ্যক্ষ অভিযোগ উপস্থিত করেছিলেন, তিনি তরুণ অধ্যক্ষটিকে কি যেন বোঝাবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কিছুতেই তাঁকে বাগে আনতে পারছেন না। বয়সে তরুণ হলেও মর্যাদায় তিনি ছোট নন। সকলেই জানেন তিনি রাজার বিশেষ প্রিয়পাত্র।

অহিকমের মুখ একটু উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অধ্যক্ষদের ভেতরে এ নিয়ে-যে কোনরূপ মতভেদ ঘটতে পারে এ কথাটা তাঁর হিসেবের মধ্যে ছিল না। বিচারপতি বললেন : অভিযুক্ত হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া তাঁর বিরুদ্ধে যে- সমস্ত অভিযোগ আনা হয়েছে তার খণ্ডন করবার জন্য বা আত্মপক্ষ সমর্থন করবার জন্য বিন্দুমাত্র চেষ্টা করলেন না। ফলে আমাদের কাজটা খুবই সংক্ষিপ্ত হয়ে গেল। এখন আপনারা সমস্ত দিক বিবেচনা করে আপন আপন অভিমত জ্ঞাপন করুন।

মতামত জানবার জন্য তিনি দক্ষিণে মন্দিরের প্রতিনিধিদের দিকে তাকালেন। তাঁদের অভিমত পেতে একটুও দেরী হোল না। তাঁরা সবাই একমত হয়ে যেরেমিয়ার প্রাণদণ্ডের পক্ষে অভিমত দিলেন। বিচারপতি এবার জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বাম দিকে তাকালেন। অধ্যক্ষেরা তখনও পরস্পর বাদানুবাদ রত। ইতিমধ্যে তাঁদের মধ্যে কয়েকজন তরুণ অধ্যক্ষটির পক্ষ নিয়েছেন। ফলে তাঁরা কোন ঐক্যবদ্ধ সিদ্ধান্তে আসতে পারছেন না। তাঁরা তাঁদের মতামত স্থির করবার জন্য আরও একটু সময় চাইলেন। অহিকম লক্ষ করলেন আচার্য পশহুরের চোখ দুটো যেন জ্বলছে। যদি সম্ভব হত, তিনি ওই তরুণ অধ্যক্ষটিকে তাঁর চোখের আগুনে ভস্ম করে ফেলতেন। অহিকম আচার্য পশহুরের ভেতরকার হিংস্র পশুটাকে আর কখনও এমন নগ্নমূর্তিতে দেখেন নি।

বিচারপতি সবার পেছনে-পড়া লোকপ্রধানদের দিকে তাকালেন। এ যুগের লোকপ্রধানেরা সর্ব ব্যাপারেই পেছনে থাকাটা পছন্দ করেন। বিচারপতির এই নিঃশব্দ প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে তাঁরা উসখুস করতে লাগলেন। যেরেমিয়ার প্রাণদণ্ড তাঁরা কেউ চান না, এ বিষয়ে তাঁরা সবাই একমত। কিন্তু কেউ সাহস করে উঠতে চাইছিলেন না। আচার্য পশহুরের দুটো চোখ-যে জ্বলজ্বল করে তাঁদের দিকেই তাকিয়ে আছে। অহিকম বুঝলেন এতগুলো প্রাচীন ব্যক্তির তুলনায় অপ্রাচীন হলেও তাঁকেই উঠতে হবে। তিনি বিচারপতির কাছে আবেদন জানিয়ে বললেন, আমাদের অভিমত জ্ঞাপন প্রসঙ্গে আমার কিছু বলবার আছে। বিচারার্থে উপস্থিত প্রতিনিধিদের উদ্দেশেই আমি আমাদের পক্ষের এই কথাগুলো বলতে চাই। যদি অনুমতি পাই, তবেই বলতে পারি। বিচারসভায় একটা কানাকানির বাতাস বয়ে গেল – অহিকম, অহিকম- যেরেমিয়ার বন্ধু অহিকম।

বিচারপতি অহিকমকে তাঁর বক্তব্য বলবার অনুমতি দিলেন। অধ্যক্ষ পশহুর অহিকমকে উঠতে দেখে একটু তিক্ত ও বাঁকা হাসি হেসে বললেন, লোকপ্ৰধান অহিকম কি অভিযুক্তের পক্ষ সমর্থন করবার জন্য উঠেছেন?

এর উত্তরে অহিকম বক্তব্য করলেন, আচার্য পশহুর প্রবীণ ও পদস্থ লোক। বিচারসভার কার্যপদ্ধতি-সম্পর্কে তাঁর একটু বেশী অভিজ্ঞতা থাকবে, এইটাই আমরা আশা করি। আমরা প্রতিনিধিরা এখানে বিচারার্থে আহূত হয়েছি। সুবিচারের জন্য আমরা দায়ী। আমরা যা কিছু বলব সুবিচারের সহায়তার জন্যই বলব। অভিযোগকারী বা অভিযুক্তের পক্ষ সমর্থন করা আমাদের কাজ নয়।

প্রধান যাজক জেফানিয়া বলে উঠলেন

: লোকপ্রধান অহিকম-যে অভিযুক্তের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, এ কথা কি কারও কাছে অবিদিত আছে?

বিচারপতি ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন : এ কথা অবান্তর। লোকপ্রধান অহিকম, আপনি আপনার বক্তব্য বলুন। এমন সময় বাইরে বহু লোকের কোলাহলের শব্দ শোনা গেল। শব্দটা দূর থেকে এগিয়ে আসছে। বিচারসভার সমস্ত লোক সচকিত হয়ে উঠল।

বিচারপতি ডাকলেন : দ্বারপাল!

দ্বারপাল এসে অভিবাদন জানাল।

: বাইরে ও কিসের গোলামাল?

: অনেক লোক এসে জড় হচ্ছে। হয়তো বিচারের ফলাফল জানবার জন্য আসছে।

সমস্ত বিচারগৃহে একমাত্র অহিকম ছাড়া আসল কথাটা কেউ বুঝল না। আশায় উল্লাসে উজ্জ্বল হয়ে উঠল তাঁর চোখ। মঙ্গলময় যিহোবাকে ধন্যবাদ! য়ুসুফ মিথ্যা আশ্বাস দেয় নি।

বিচারপতি ব্যস্ত হয়ে আদেশ দিলেন : দ্বার বন্ধ করে দাও।

অহিকম তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। আমরা এই জাতীয় বিচার-সমস্যার সঙ্গে আর কোনদিন মুখোমুখি হই নি। অভিযুক্ত হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়া লোকসমাজে নবী বলে পরিচিত ও সম্মানিত। তিনি স্পষ্টভাষী, সত্যবাদী ও নির্ভীক। তাঁর জীবন বিপন্ন এ কথা জানা সত্ত্বেও সমস্ত অভিযোগ তিনি সত্য বলে স্বীকার করে নিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য এই যে, তিনি যা কিছু বলেছেন সবই যিহোবার আদেশে বলেছেন এবং জাতির কল্যাণের জন্যই বলেছেন। সাধারণ প্রচলিত দৃষ্টি নিয়ে এর বিচার করা চলে না। আমরা জানি ইসরায়েল জাতির ইতিহাসে বিভিন্ন যুগে বহু নবী লোককল্যাণ ও জাতির নিস্তারের জন্য এইজাতীয় এমন অনেক উক্তি করে গেছেন, যা আপাত দৃষ্টিতে ধর্মদ্রোহ, রাজদ্রোহ, দেশদ্রোহ বলে মনে হলেও তাঁরা আজ জাতির পথদর্শক ও বন্ধু বলে বিবেচিত হয়ে আসছেন। আমাদের পবিত্র শাস্ত্রগ্রন্থে, রাজমালায় ও বংশমালায় সেই সব কথা স্পষ্টাক্ষরে বর্ণিত আছে। অনুরূপ অভিযোগে নবী আইজাইয়াকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া চলত। কিন্তু আমরা কি তা সমর্থন করতাম? বাইরের গোলমালটা ক্রমশঃই বেড়ে উঠছে। কোলাহল এবার আর অস্পষ্ট নয়, সুস্পষ্ট ধ্বনি শোনা গেল।

বিচারসভায় সমবেত ব্যক্তিগণ বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে শুনলেন, ওরা ধ্বনি তুলছে- যেরেমিয়ার মুক্তি চাই! যেরেমিয়ার মুক্তি চাই! অহিকমের স্নায়ুগুলো আবেগে টনটন করে উঠল। একবার কটাক্ষে তাকিয়ে দেখলেন আচার্য পশহুরের দিকে। ক্রোধে বিকৃত তাঁর মুখভঙ্গি, উত্তেজনায় সর্বশরীর কাঁপছে। আচার্য পশহুর ক্ষিপ্তের মতই বলে উঠলেন : ষড়যন্ত্র-একটা বিরাট ষড়যন্ত্র! পবিত্র ধর্মাধিকরণের উপর হামলা করে বিচারকে প্রভাবিত করতে চাইছে এরা। লোকপ্রধান অহিকম আপনি অনেক বক্তৃতা করেছেন। এখন অকারণে সময় ক্ষেপণ না করে আপনাদের অভিমতটা জানিয়ে আপনাদের স্বরূপ উদ্ঘাটিত করুন।

অহিকম শান্ত কণ্ঠে বললেন : আচার্য পশহুরের মত প্রবীণ ব্যক্তির পক্ষে এতটা অসংযম শোভা পায় না। আমার বক্তব্য এখনও শেষ হয় নি। মাননীয় বিচারপতি যদি অনুমতি করেন, তবে বলি। বিচারপতি বললেন : আপনি বলুন। আমরা অত্যন্ত গুরুতর একটা সিদ্ধান্ত নিতে চলেছি। এ তো শুধু ব্যক্তিবিশেষের প্রশ্ন নয়, সমগ্র জাতির কল্যাণ অকল্যাণের প্রশ্ন এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে। কাজেই অমন ব্যস্ততার কিছু নেই।

অহিকম বলে চললেন : আমি আপনাদের স্মরণ করাতে চাই, রাজা হেজেফিয়ার আমলে অনুরূপ সমস্যাই একবার দেখা দিয়েছিল। যোরাস্থীয় নবী মিকা লোককল্যাণের উদ্দেশে অভিযুক্ত যেরেমিয়ার মতই মুক্তকণ্ঠে প্রভুর প্রত্যাদেশ ঘোষণা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সেদিন দূরে নয় যখন সমগ্ৰ য়াহুদা ভূমি দুর্ধর্ষ শত্রু-কর্তৃক কর্ষিত হয়ে যাবে, পবিত্র যিরূশালেম ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। য়িহুদী জাতি পৃথিবীর জাতিবর্গের সম্মুখে হাস্যাস্পদ ও করুণার পাত্র বলে বিবেচিত হবে। সে তো বহুদিনের কথা নয়। এই যিরূশালেমের বুকের উপর দাঁড়িয়ে নবী মিকা যখন প্রকাশ্যে এই বাণী প্রচার করলেন, তখন আজকের মত সেদিনও তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনীত হয়েছিল। তাঁর বিরুদ্ধেও এই রকমই মৃত্যুদণ্ডের দাবী তোলা হয়েছিল। কিন্তু সেই দাবী পূর্ণ করা হয়েছিল কি? না, নবী মিকার পবিত্র অঙ্গ স্পর্শ করবার মত দুঃসাহস সেদিন কারও হয় নি। মাননীয় বিচারপতি আমার বক্তব্য শেষ হয়েছে। এবার উপস্থিত লোকপ্রধানদের নির্দেশে তাঁদের সকলের পক্ষ থেকে আমি এই পবিত্র ধর্মাধিকরণের সম্মুখে নিবেদন করছি যে, আমরা মনে করি অভিযুক্ত যেরেমিয়াকে মুক্তিদান করাই সংগত।

‘যেরেমিয়ার মুক্তি চাই’-বহু কণ্ঠের মিলিত উচ্চধ্বনি মন্দিরের প্রাচীরের গায়ে এসে আছড়ে পড়ছিল। দ্বারপাল ছুটে এসে সংবাদ দিল, বাইরে হাজার হাজার লোক এসে জড় হচ্ছে। লোক আসছেই শুধু আসছেই, বন্যাধারার মত ছুটে আসছে।

বিচারপতি বাম দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন : আপনারা?

বিচারসভায় উপস্থিত সবাইকে বিস্মিত করে দিয়ে অধ্যক্ষগণ তাঁদের অভিমত জানালেন : সকলের সমস্ত বক্তব্য শোনবার পর এবং সমস্ত দিক বিবেচনা করার পর আমরা মনে করি অভিযুক্ত যেরেমিয়াকে মুক্তিদান করাই সংগত। এবার বিচারপতি তাঁর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলেন : বিচারার্থ সমবেত প্রতিনিধিদের অধিকাংশের সঙ্গে একমত হয়ে আমি অভিযুক্ত হিলফিয়ার পুত্র যেরেমিয়াকে মুক্তির আদেশ দিলাম।

মুহূর্তের মধ্যে সংবাদটা বিদ্যুদ্বেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার উচ্ছ্বসিত জনতার আনন্দরোল আকাশ স্পর্শ করল। আনন্দে উল্লাসে যেন ওরা সমস্ত আকাশটাকে লুটে পুটে নিতে চাইছে। এমন দৃশ্য যিরূশালেম কি আর কোন দিন দেখেছে? একটা বিপুল বিস্ময় ও অননুভূত ভাবাবেগে আলোড়িত অহিকম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখছিলেন। এই দুর্বার প্রাণাবেগে এতদিন ওরা কোথায় লুকিয়ে রেখেছিল? এরাই কি শান্তশিষ্ট নিরীহ প্রাণীগুলো যাদের সঙ্গে প্রতিদিন পথ চলতে মুখোমুখি দেখা হয়ে যায়, আর যারা মাথা নুয়ে তাঁকে অভিবাদন জানায় সেই পরিচিত সাধারণ মানুষগুলোকে আজ যেন আর তিনি চিনে উঠতে পারছেন না। অহিকম ভিড় ঠেলে যেরেমিয়াকে খোঁজ করতে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু কোথায় পাবেন তাঁকে? যেরেমিয়াকে কোন কথা বলবার সুযোগ না দিয়ে ওরা তাঁকে ছিনিয়ে নিয়ে গেছে আপনাদের মাঝখানে। এর মধ্য থেকে তাঁকে বের করে নিয়ে আসার চেষ্টা করা বৃথা। কে জানে, কেমন করে জোগাড় করে নিয়ে এসেছে—বেজে উঠল বাঁশী, করতাল আর জগঝম্প। বাজনা বেজে চলল। আর তারই তালে তালে আনন্দে উন্মত্ত লোকগুলো হাতে হাত ধরে নাচতে লাগল। যেন যুদ্ধজয়ের নৃত্য।

হঠাৎ তাদের সমস্ত আনন্দরোল ছিন্নভিন্ন করে দিয়ে শিঙ্গার উচ্চ ও তীক্ষ হুঁশিয়ারী বেজে উঠল। বিপদের ঘণ্টা বাজতে লাগল-ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং! কি হয়েছে! কি হয়েছে! এই আকস্মিক বিপদ সংকেতে আনন্দমুখর জনতা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। সকলের মুখে আতঙ্কের ছবি।

সঙ্গে সঙ্গে ঘোষণাকারীদের উচ্চ কণ্ঠের ঘোষণা শোনা গেল। দ্বার বন্ধ কর, দ্বার বন্ধ কর, নগরীর দ্বার বন্ধ কর। য়াহুদা আক্রান্ত, যিরূশালেম আক্রান্ত, বাবিলরাজ নেবুকাডনাজারের সৈন্যগণ য়াহুদার সীমান্ত অতিক্রম করে ভেতরে এসে প্রবেশ করেছে। ওরা ঝড়ের বেগে ছুটে আসছে। নাগরিকগণ, শান্তি পূর্ণভাবে যে যার ঘরে ফিরে যাও। প্রাচীর-প্রহরীগণ নিজ নিজ স্থানে মোতায়েন থাকো। দ্বার বন্ধ কর, দ্বার বন্ধ কর, নগরীর দ্বার বন্ধ কর।

বিপদের ঘণ্টা বেজে চলল-ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *