অভিশপ্ত নগরী – ১৫

পনের

শত শত দাসদাসী প্রভুর মন্দিরপ্রাঙ্গণে গিয়ে হত্যা দিয়ে পড়ল! প্রধান যাজক ব্যাপার দেখে ঘাবড়ে গেলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কি গো, কি হয়েছে তোমাদের? এমন দল বেঁধে এসেছ যে! চাও কি তোমরা?

তারা বলল : আমরা প্রভুর কাছে বিলাপ করতে চাই।

: কিসের বিলাপ? আর এমন দল বেঁধেই বা কেন?

: আপনারা নবী যেরেমিয়া আর লোকপ্রধান অহিকমকে কারাগারে বদ্ধ করে রেখেছেন, তাঁদের মুক্তির জন্য আমরা প্রভুর কাছে কাঁদতে এসেছি।

: আমরা? আমরা তো তাদের আটকে রাখি নি, আমরা আটকে রাখবার কে? তারা রাজার আদেশে আটক আছে।

: ও একই কথা। আপনারা আর রাজা কি আলাদা? এ সব আমাদের জানা আছে।

ওদের কথার সুরটা সুবিধার নয়, চোখ মুখের ভাবটাও যেন কেমন কেমন। প্রধান যাজকের কাছে ব্যাপারটা বেশী ভাল ঠেকল না। তিনি নগর-রক্ষককে সংবাদ দিলেন। সংবাদ পেয়েই নগর-রক্ষক হন্ত-দত্ত হয়ে দলবল নিয়ে মন্দিরে এসে দর্শন দিল! অবস্থাটা দেখে সেও একটু চিন্তিত হল। কিন্তু দুশ্চিন্তার ভাবটাকে চাপা দেবার জন্য সে খুব হাঁকডাক আর তম্বী করতে শুরু করে দিল, এই ব্যাটারা, তোদের সর্দারেরা কোথায়? তাদের ডেকে নিয়ে আয়। তারা বলল

: আমাদের কোন সর্দার নেই।

: সর্দার নেই? সর্দার নেই, তবে তোদের চালায় কে?

: আমাদের কেউ চালায় না। আমরা সবাই মিলে চলি।

: পালের গোদারা তো ধরা পড়েছে। ওরাই তোদের ক্ষেপিয়ে তুলেছিল বুঝি?

: না গো, না, ওরা ক্ষ্যাপাবে কেন? আমাদের ক্ষেপিয়ে তুলেছে আমাদের মালিকেরা। এমন কুকুর মারা করে মারলে মানুষ ক্ষেপে ওঠে না? আমাদের গায়ে কি মানুষের রক্ত নেই?

একটি মেয়ে এগিয়ে এসে বলল, হ্যাঁগো, ভাল মানুষের ছেলেরা, আমরা যদি ভাল মন্দ দোষ ঘাট কিছু করেই থাকি, তাই বলে এদের তোমরা আটকে রাখবে কেন? এরা তো আমাদের মত ক্রীতদাস নয়। এরা তো তোমাদেরই লোক। আর নবী যেরেমিয়া প্রভুর নিজের মানুষ। তাঁর গায়ে হাত দিতে একটু ভয় হল না তোমাদের মনে? তোমরা কি প্রভুর মাথা ছাড়িয়ে উঠতে চাও? আরও কয়েকজন তার কথা সমর্থন করে বলল; প্রভুকে তোমরা-যে এমন ক্রুদ্ধ করে তুলেছ, এর ফল কখনও ভাল হবে বলে মনে কর?

বৃদ্ধ নবীকে আটক করায় নগরবাসীদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল, নগররক্ষকের সে কথা অজানা ছিল না। এ বিষয়ে তার নিজের মনেও একটু খুঁতখুতি ছিল। কি দরকার ছিল তাঁকে ঘাঁটিয়ে? নগরের লোকেরা বলে, প্ৰভু- যে তাঁর মুখ দিয়েই কথা বলেন। নিজের সাফাই গাইবার জন্য সে তো কথাই বলল

: তা আমরা কি জানি বল? আমাদের কাজ হুকুম তামিল করা। রাজা যেমন হুকুম দিয়েছেন, আমরা সেই মত কাজ করেছি।

: রাজার প্রাণে কি ভয় নেই?

নগররক্ষক এবার একটু ভ্রূ কুঞ্চিত করে বলল, তোদের সাহস তো কম নয় দেখছি। রাজার বিরুদ্ধে কথা বলছিস!

: ওমা, রাজার বিরুদ্ধে আমরা কখন বললাম! আমরা বলছি আমাদের দুঃখের কথা। আমরা আমাদের প্রভুর কাছে বিলাপ করতে এসেছি, বিচার চাইতে এসেছি। তোমরা কি আমাদের চোখের জলও ফেলতে দেবে না?

এই সমস্ত সংবাদ রাজার কানে গিয়ে পৌঁছল। রাজা যেদেকিয়া বিচলিত হয়ে উঠলেন। নবী যেরেমিয়াকে কারাগারে পাঠাবার ব্যাপারে প্রথম থেকেই তাঁর অমত ছিল। কিন্তু আচার্য পশহুর আর জনকয়েক অধ্যক্ষের চাপে পড়ে নিতান্ত বাধ্য হয়েই তাঁকে তাঁদের কথায় সম্মতি দিতে হয়েছে। সিংহাসনে বসবার পর থেকে কোন দিনই তিনি নিজের ইচ্ছানুয়ায়ী কাজ করবার সুযোগ পান নি। তাঁকে যেন হাত পা বেঁধে সিংহাসনে বসিয়ে রাখা হয়েছে। রাজা দু’এক সময় বিগড়ে যেতে চান, কিন্তু বিগড়ে যাওয়া কল কি করে ঠিক করতে হয়, সে কৌশল এদের ভাল করেই জানা আছে।

ওদিকে সারা নগরে ঘরে ঘরে অশান্তি। মালিক আর ক্রীতদাসদের ঠোকাঠুকি লেগেই আছে। এতকাল যারা নিরীহ মেঘের মত মুখ বুজে সমস্ত নির্যাতন সহ্য করে এসেছে, আজকাল তারা কথায় কথায় উত্তর দিতে শিখেছে। মালিকদের সঙ্গে চোখে চোখ মিলিয়ে তারা স্বচ্ছন্দে তর্ক বিতর্ক করে। তারাও যে মানুষ, কথায় কথায় সেই কথাটা জানিয়ে দেয়।

মালিকেরা আফশোষ করে বলে, ঘর সংসারের শৃঙ্খলা আর রইল না। কড়ি দিয়ে কেনা গোলাম সেও কিনা আজ মুখ ঘুরিয়ে কথা বলে। ঘরের গৃহিণীরা ঝংকার দিয়ে ওঠে, দাসদাসীদের কথা শোন একবার! অমন জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলতে হয়, কেটে কুচি কুচি করে কুকুর দিয়ে খাওয়াতে হয়। কিন্তু সেই সমস্ত সুখের দিন কি আর আছে! মারপিট কি আর চলে না? তাও চলে। কিন্তু চাবুকের ধার যেন কমে গেছে। যত গর্জন তত বৰ্ষণ হয় না। মালিকেরা কেমন যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। তাদের মারের হাত এগিয়ে গিয়েও আবার পিছিয়ে আসে। ওদের এই দুর্বলতা ক্রীতদাসদের কাছেও ধরা পড়ে গেছে।

কিন্তু বদমেজাজী মালিকেরা ঘণ্টা শুনেও শুনতে পায় না। পুরোনো দিনের অভ্যাস ছাড়তে না পেরে মাঝে এক একটা কাণ্ড বাধিয়ে বসে। তারা চেঁচিয়ে পাড়া মাত করে। একজনকে মারলে সঙ্গে সঙ্গে এ বাড়ি ও বাড়ি থেকে দাসদাসীরা দলে দলে এসে ভিড় জমিয়ে তোলে। একটা কাক ধরা পড়লে তল্লাটের আর সমস্ত কাক যেমন দল বেঁধে সহানুভূতির ‘কা কা’ শুরু করে দেয়, তেমনি কোথাও কোন অত্যাচার ঘটতে দেখলে সবাই মিলে বিষম একটা হুলুস্থুল বাধিয়ে তোলে। যত বড় জল্লাদ মালিক হোক না কেন এতগুলো লোক এক সঙ্গে এসে ঘেরাও করে ধরলে অন্তত তখনকার মত তাকে পিছিয়ে যেতে হয়। লোকে বলাবলি করে, নবী যেরেমিয়া ও লোকপ্রধান অহিকমকে বন্দী করে রাখবার পর থেকে ওরা যেন আরও ক্ষেপে উঠেছে।

এই সমস্ত পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করবার জন্য মাঝে মাঝে শান্তিরক্ষকদের ডাক পড়ে। মালিকদের ক্রীতদাস শাসনের এই ঐতিহাসিক ও বৈধ অধিকারকে সর্বপ্রকারে বিঘ্নমুক্ত করে নগরের শান্তি রক্ষা করবার কাজে শান্তিরক্ষকদের কোনরূপ শৈথিল্য নেই। ফলে এই সমস্ত অবৈধ ও আপত্তিকর জমায়েতের উপর মাঝে মাঝেই হামলা হয়, দু’চারটা মাথা ভাঙ্গে, বেছে বেছে ধাড়ী বদমাইসগুলোকে আটক করাও হয়। কিন্তু ওদের প্রতিরোধ তবু থামে না; একই ভাবে চলতে থাকে। অদ্ভূত ওদের এই ধৈর্য আর সহিষ্ণুতা। চরম উত্তেজনার অবস্থাতেও ওরা মাথা হারায় না। ওদের এই একটানা ধৈর্যের সঙ্গে সংঘাত লেগে মালিকদের ধৈর্য ভেঙ্গে পড়তে থাকে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ মুখে এ কথা স্বীকার না করলেও কার্যতঃ ওদের দাবীর কাছে আত্মসমৰ্পণ করতে থাকে। আবার কেউ কেউ ক্ষিপ্ত হয়ে ওদের মুণ্ডপাত করবার জন্য নিত্য নতুন ফন্দিফিকির খুঁজতে থাকে।

মালিকদের কাছে একটা খবর এসে পৌঁছায়; ক্রীতদাসদের সংঘ নাকি মালিকদের সাদা আর কালো এই দুই ভাগে ভাগ করেছে। যাদের নাম কালো দাগ দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে, তাদের সঙ্গে নাকি কঠিন হাতে বোঝাপড়া করতে হবে। খবরটা ঠিক খবর নয়, জনরব মাত্র। তবে যে-দিনকাল পড়েছে, জনরবের মূল্যও বড় কম নয়। কাল যেটা জনরব মাত্র ছিল, দেখতে দেখতে আজই তা সত্য খবরে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। কোন কিছুকেই উপেক্ষা করা চলে না।

মালিক মহলে এই নিয়ে গুরুতর রকমের আলোড়ন পড়ে গেল। কার কার নামের আগে কালো দাগ পড়তে পারে, তাই নিয়ে প্রচুর গবেষণা চলল। কঠিন হাতে বোঝাপড়া বলতে কি বুঝায়, সে বিষয়ে মতবৈষম্য থাকলেও কথাটার অর্থটা খুবই খারাপ, সে সম্পর্কে সবাই এক মত। কাজেই মালিকদের মধ্যে এই নিয়ে প্রবল উত্তেজনা।

কিন্তু এর চেয়েও প্রবলতর উত্তেজনার বিষয় নগরবাসীদের জন্য অপেক্ষা করছিল। এটা জনরব নয়, একেবারে সঠিক খবর। ব্যাবিলরাজ নেবুকাডনাজারের দুরন্ত ক্যালদীয় বাহিনী যিরূশালেমের দিকে বিদ্যুদ্‌বেগে ধেয়ে আসছে। আসছে নয়, একেবারে এসে পড়েছে। তাদের অশ্বারোহী অগ্রবাহিনী মাত্র একদিনের পথ দূরে আছে।

বাবিলপন্থীরা বলল, আমরা তো আগেই বলেছিলাম। আবার কাল পর্যন্ত যারা মিসরপন্থী ছিল, তারাও অনেকে রাতারাতি ভাল বদলে বাবিলপন্থী সেজে বসল।

রাজা যেদেকিয়া তাঁর উপদেষ্টা-মণ্ডলীর উপদেশ-অনুসারে বাবিলে কর দান বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সেইজন্যই কি এই আক্রমণ? কিন্তু তার চেয়েও বড় কারণ ছিল। মিসরের সঙ্গে গোপন প্রণয়ের কথা তো আর এখন গোপন নেই। সে কথা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। বাবিলরাজের কানে কি আর এ কথা গিয়ে পৌঁছায় নি? কিন্তু এখন বাঁচবার উপায় কি? অধিকাংশ লোকই এই কথা বলল- আমরা তো আগেই একথা বলেছিলাম। প্রভুর মানুষ নবী যেরেমিয়া দিনের পর দিন তোমাদের হুঁশিয়ারি দিয়ে এসেছেন। কিন্তু যেমন আমাদের দুরদৃষ্ট, তোমরা তাঁর কথায় কান পাতলে না, আরও তাঁকে কারাগারে আটক করে রাখলে। এখন সবাইকে মিলে তার পরিণাম ভোগ করতে হবে। ক্যালদীয়েরা এসে গেল। যিরূশালেম অবরুদ্ধ। নগরবাসীরা আতঙ্কে দিন কাটায়, কি আছে অদৃষ্টে কে জানে! ক্রীতদাসেরাও সময় বুঝে মাথা নাড়া দিয়ে উঠল।

ওরা বলল, আমাদের আর ভয় কি? আমরা তো চিরকাল মার খেয়েই এসেছি, হয় পরের হাতে, নয় তোমাদের হাতে। ওদের রোখ কিন্তু তোমাদের দিকেই বেশী। তোমাদের বিষয়সম্পত্তি আছে, ঐশ্বর্য আছে, ওদের হামলা তোমাদের উপরেই আসবে। আমাদের আছেই বা কি, নেবেই বা কি? তোমাদের ওই প্রজাপতির মত রং বাহার, ফুলের মত সুগন্ধি আর মাখনের মত নরম মেয়েগুলোর দিকেই ওদের দৃষ্টি পড়বে। আমাদের দিনরাত্রি খেটে খেটে আর আধপেটা খেয়ে চুপসে যাওয়া রুক্ষ চেহারার মেয়েগুলোর দিকে ওরা ফিরেও তাকাবে না। এই পৈত্রিক প্রাণটুকু ছাড়া আর কি আছে আমাদের? আমাদের মেরে ওরা ওদের হাত নোংরা করতে যাবে না। আর যাবার সময় গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধেই যদি দিয়ে যায় যাক না। এখানেও তোমাদের লাথি ঝাঁটা খেয়ে চলেছি, সেখানেও তাই খাব। আমাদের আবার পছন্দ আর অপছন্দ। ওদের লাথির চেয়ে তোমাদের লাথি আমাদের কাছে বেশি মিষ্টি লাগে না।

এখন প্রকাশ্যেই ওরা এই সমস্ত কথা বলে বেড়ায়, রেখে ঢেকে কোন কথা বলে না। উপরওয়ালারা এসব কথা শুনে আঁতকে উঠে। তারা নরম করে মিষ্টি সুরে বলে, ছি ছি, এসব কথা কি বলছ তোমরা? বিদেশীরা আমাদের মাতৃভূশি আক্রমণ করেছে। এই দুর্দিনে আজ সবাইকে এক হয়ে দাঁড়াতে হবে। আমাদের নিজেদের ভাইয়ে ভাইয়ে কোন গোলমাল যদি থেকেই থাকে, তা নিয়ে ঝগড়া করবার এই কি সময়?

ওরা হেসে বলে, ক্রীতদাসদের আবার স্বদেশ! এ যদি আমাদের স্বদেশ হত, তবে কি আমাদের এই হাল হয়? আমাদের জমিজমা নেই; ভিটেমাটি নেই, পুঁজিপাটা নেই, বিদ্যাবুদ্ধি নেই, আমাদের বর্তমানও নেই, ভবিষ্যৎও নেই। আমাদের নিজের বলতে আছে কি? আমাদের বাপ-মাদের সন্তানের উপর কোন অধিকার নেই, স্ত্রীর উপর স্বামীর কোন দাবী নেই। আমাদের হাত পা, তাও আমাদের নিজের নয়, তাও মালিকদের কাছে বাঁধা। তোমরা আজ আমাদের ‘ভাই’ বলে ডাকছ। হ্যাঁ, এতকাল ‘ভাই’র মতই কাজ করে এসেছ বটে! আমাদের সন্তানদের তোমরা ছাগ আর মেষ শাবকদের মত বাজারে নিয়ে বিক্রী কর, আমাদের মুখ বুজে তাই সইতে হয়। আমাদের স্ত্রীদের আর কন্যাদের নিয়ে তোমরা শয়ন কর, আমাদের চোখ মেলে তাই দেখতে হয়। তবু বলছ, তোমরাই আমাদের ভাই! তোমাদের লজ্জা হয় না?

ক্রীতদাসদের প্রতিটি কথায় কি জ্বালা। জ্বলন্ত আগুনের মত যেন তা পুড়িয়ে মারে। এই সমস্ত দুর্ভাগাদের চোখমুখের ভাব দেখে আর কথা শুনে ভাগ্যবানদের প্রায় ভয়ে দুরু দুরু করে ওঠে। গুপ্তচরেরা সংবাদ নিয়ে আসে-ক্রীতদাসেরা নাকি ষড়যন্ত্র করছে, ক্যালদীয়দের নগরের মধ্যে অভ্যর্থনা করে নিয়ে আসবার জন্য।

তারা অতর্কিতে নগরের দ্বার খুলে দেবে। সংবাদটা সত্য কি মিথ্যা কে জানে! আতঙ্কগ্রস্ত মানুষ বিভীষিকার ঘোরে কত স্বপ্নই না দেখে! আর সত্য হওয়াটাই বা বিচিত্র কি! নগরের ভেতরে দ্বারের মুখে ইহুদী সৈন্যদের ঘাঁটি বসল। অষ্টপ্রহর ধরে কড়া পাহারা চলল।

কিন্তু বিপদ কি শুধু একদিকে? নগরের সমস্ত বিভাগে ক্রীতদাসদের শ্রমশক্তি নিয়োজিত। বাইরের সঙ্গে সংযোগবিহীন এই নগরের পক্ষে এদের শ্রম অপরিহার্য। যত সামান্যই তারা হোক না কেন, এখানকার জীবনযাত্রার গুরুভার বোঝাটা এরাই তো বহন করে চলেছে। যারা গড়তে জানে তারা ভাঙ্গতেও জানে। শুধু বাইরের শত্রুকে ডেকে আনা নয়, এই দুঃসময়ে এরা যদি বিদ্রোহী হয়ে বেঁকে বসে, নগরের জীবনযাত্রা বিপর্যস্ত করে দেওয়াও এদের পক্ষে অসম্ভব নয়।

ঘরে আর বাইরে দুইদিকে শত্রু নিয়ে এগোনো চলে না। ক্রীতদাসদের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতেই হবে, একথা এখন সবাই বুঝতে পারছে! অবশেষে সত্যসত্যই একদিন রাজসভায় ডাক পড়ল ক্রীতদাস নেতাদের। এমন কথা কেউ কোনদিন ভাবতে পেরেছে? কিন্তু এই বিচিত্র পৃথিবীতে অভাবনীয় কত কিছুই না ঘটে যায়, কত অসম্ভবই না সম্ভব হয়ে ওঠে! ক্রীতদাস নেতারা তিনটি দাবী উপস্থিত করল- সকল ক্রীতদাসদের পরিবারসহ মুক্তি, তাদের জমি ও জীবিকার ব্যবস্থা এবং নবী যেরেমিয়া ও লোকপ্রধান অহিকমের মুক্তি। রাজার পক্ষের লোকেরা এদের দাবীর বহর শুনে চক্ষু কপালে তুলল। এরা বলে কি, আস্পর্ধার কথা শোন একবার!

: এটা কি একটা সমঝোতার কথা হল? দাসদাসীরা না থাকলে ক্ষেতখামারের কাজ আর ঘরসংসারের কাজ চলবে কি করে?

ক্রীতদাস নেতারা উত্তর দিল, কাজকর্ম হয়তো আমরাও করতে পারি। কিন্তু সেদিন আমাদের সঙ্গে নতুন ব্যবস্থায় আসতে হবে।

: তোমরা ক্ষেপেছ! এভাবে কোন নিষ্পত্তি হতে পারে?

ক্রীতদাস নেতারা এক পা হটতে রাজী হল না। আলোচনা ভেঙ্গে গেল। রাজকীয় প্রতিনিধিরা রাগে গরগর করতে লাগলেন। রাগ করবার কথাই তো! কিন্তু রাগ করলে কি হবে? ওদের রক্ত চক্ষুকে এখন কেই বা ভয় করে? হাওয়াটা বরঞ্চ উল্টে গেছে। মালিকেরাই ভয়ে সন্ত্রস্ত। কী-যে দিন পড়েছে, মানী লোকের মান আর থাকে না। কিন্তু অপমানটা ষোল কলায় পূর্ণ হবার যতটুকু বাকী ছিল, তাও পূর্ণ হয়ে গেল। হঠাৎ অপ্রত্যাশিতভাবে একদিন জানা গেল, ক্রীতদাসেরা যে-সমস্ত দাবী তুলেছিল, তার সবগুলোই নাকি মেনে নেওয়া হয়েছে। কথাটা বিশ্বাস করবার মত নয়। কিন্তু বিশ্বাস না করেই বা উপায় কি? একদিন সকলের সমস্ত সন্দেহ ভঞ্জন করে রাজাজ্ঞা ঘোষিত হয়ে গেল, দেশ শত্রুমুক্ত হলেই ক্রীতদাসদের সবাইকে সপরিবারে মুক্তি দেওয়া হবে এবং তাদের জমি ও জীবিকার ব্যবস্থাও করে দেওয়া হবে।

কারাগারের দরজা খুলে গেল। নবী যেরেমিয়া এবং লোকপ্রধান অহিকম মুক্তি পেয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেন। এত সহজেই-যে এত দিনের জগদ্দল পাথরটা বুকের উপর থেকে নেমে যাবে, এমন কথা কে ভাবতে পেরেছিল?

ক্রীতদাসদের মধ্যে উৎসব শুরু হয়ে গেল। নবী যেরেমিয়া আর লোকপ্রধান অহিকমকে সামনে নিয়ে তারা জয়োল্লাস মিছিল বের করল। সদ্যমুক্ত যেরেমিয়া ও অহিকম প্রথমতঃ কিছুই বুঝতে পারছিলেন না। ব্যাপারটা বুঝতে তাঁদের অনেকটা সময় লেগে গেল। বলে কি, তাঁরাই ক্রীতদাস আন্দোলনের নেতা? কক্ষনো না। মিথ্যা কথা। ক্রীতদাসদের মুক্তি? কোনদিন তাঁদের এতে সমর্থন ছিল না। আজও নেই। এ কখনও সম্ভব নয়, এ কোনদিন হতে পারে না। প্রাণপণ চেষ্টা করে তাঁরা আপনাদের বক্তব্য বোঝাতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু কে শোনে তাঁদের কথা! কথা শোনবার মত সময় তখন কারোর নেই। নেই উৎসবমত্ত হাজার হাজার লোকের জয়ধ্বনি ও কোলাহলে তাঁদের কণ্ঠ চাপা পড়ে গেল। মিছিল চলতে লাগল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *