অভিশপ্ত নগরী – ১৬

ষোল

আর যাদের যাদের আসবার কথা ছিল, কেউ এখনও এসে পৌঁছায় নি। শুধু ওরা দু’জন। ছোট একটি অপরিচ্ছন্ন কুঠরী। একটা বাতি মিট মিট করে জ্বলছে। রাত্রি এক প্রহর গড়িয়ে গেছে। য়ুসুফ আর গেদালিয়া কথা বলছিল।

: জীবনের কালো দিকটাই কি সবচেয়ে বেশী করে তোমার চোখে পড়ে য়ুসুফ? রাজার ঘোষণা বিশ্বাস কর না তুমি, কেন?

: কি করব ভাই, জীবনভর তো শুধু দুঃখ-দাগাই পেয়ে এসেছি। তাই আমার সর্বদাই সন্দেহ আর সংশয়। আজন্ম ওদের কাছ থেকে শুধু বঞ্চনাই তো পেয়ে এসেছি, সহৃদয়তার পরিচয় কোনদিন পাই নি। না, এ ঘোষণায় আমার বিন্দুমাত্র বিশ্বাস নেই।

: সবাই যাকে বিশ্বাস করে মেনে নিল, তুমিই বা তাকে বিশ্বাস করতে পারছ না কেন?

: কেন পারছি না, শোন তবে। যে-দাবী ওরা মুখে মেনে নিয়েছে, এত সহজে তা মেনে নেওয়া তাদের পক্ষে স্বাভাবিকও নয়, সম্ভবও নয়। আমাদের মুক্ত করে দিয়ে ওরা কি ওদের সুন্দর আর সুখী হাতকে সাংসারিক কাজের মধ্যে নোংরা করতে পারে?

: তবে রাজার এই ঘোষণার কি কোনই মূল্য নেই?

: মূল্য নেই? নিশ্চয়ই আছে। তবে মূল্যটা আমাদের পক্ষে নয়, ওদের পক্ষে। আমরা সুযোগ পেয়ে ওদের কণ্ঠটা চেপে ধরেছিলাম। ওরা বেগতিক বুঝে পরাজয়ের ভাণ করে বুদ্ধির প্যাঁচে আমাদের চিৎ করে ফেলে দিল। আমরা জিতে গিয়েছি মনে করে হাসতে হাসতে ফিরে এলাম। একবার ভেবে দেখ গেদালিয়া, ওদের যখন চরম দুঃসময়, তখন আমরা সামান্য একটা সুবিধাও আদায় করে নিতে পারলাম না। আর হাওয়া যখন ওদের অনুকূলে আসবে তখন কি ওদের এই প্রতিশ্রুতির কানাকড়িও মূল্য দেবে ওরা?

: কিন্তু সেদিনকার সেই আলাপ-আলোচনার মধ্যে তুমিও তো ছিল। তুমিই বা কি করলে?

: আমি আর কি করব? আর যারা যারা গিয়েছিল, এই আশ্বাসটুকু পেয়ে তারা আনন্দে একেবারে দিশাহারা। আমি প্রশ্ন তুলেছিলাম, আমাদের মুক্তি দেবার সিদ্ধান্ত যদি আপনারা করেই থাকেন, তবে এখনই তা কার্যকর করুন না কেন? অবরোধ তুলে নেওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবার কারণটা কি? কিন্তু ওপক্ষ আর এপক্ষ, কোন পক্ষই আমার কথায় আমল দিল না।

: তা হলে তোমার মতে আমরা কি সত্যসত্যই ওদের কাছে হেরে গেলাম?

: আমি তো তাই মনে করি। জানো গেদালিয়া, বুদ্ধির খেলায় আমরা ওদের কাছে এখনও শিশু। আমরা ক্রীতদাসেরা মুখের কথা পেয়েই আনন্দে বিভোর হয়ে আছি। আর ওরা-যে উপযুক্ত মুহূর্তের অপেক্ষায় পর্দার আড়ালে বসে ওদের ছুরিতে শাণ দিয়ে চলেছে, আমাদের লোকদের ভুলেও সে কথা একবার মনে জাগে না। তুমি যদি একথা বলতে যাও ওরা হেসেই উড়িয়ে দেবে। আমি তো মনে করি, যতদিন এই অবরোধ চলবে, ততদিন ওরা মিষ্টি কথা দিয়ে আমাদের মন ভুলিয়ে রাখবে। আর বিপদ থেকে মুক্ত হবার সঙ্গে সঙ্গেই ওরা আবার স্বমূর্তি ধারণ করবে। গেদালিয়া, তোমার বাবা আজকাল কি বলছেন?

: তিনি তাঁর সেই পুরানো কথাকেই আঁকড়ে ধরে আছেন- ক্রীতদাস ছাড়া সমাজ চলতে পারে না। তিনি বলেন-মানুষের পক্ষে যেমন হাত পা, সমাজের পক্ষে তেমনি ক্রীতদাস। যিহোবা ক্রীতদাসের জন্য মেহনতের কাজ, আর আমাদের জন্য বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তির কাজ বরাদ্দ করে দিয়েছেন। এই দু’টিকে নিয়েই সমাজ পূর্ণাঙ্গ হয়ে ওঠে।

য়ুসুফ হেসে বলল, লোকপ্রধান অহিকম স্বভাবতঃই সৎপ্রকৃতি ও দয়ালু হৃদয়ের লোক। কিন্তু তা হলেও তিনি মালিক। মালিক পক্ষের বক্তব্যটাকে তিনি ভালভাবেই উপস্থিত করেছেন।

: কিন্তু আমিও তো সেই মালিক পক্ষেরই একজন। য়ুসুফ, তুমি সকল বিষয়ে এত সন্দিগ্ধচিত্ত, তবু আমার সম্পর্কে তোমার কি কখনই সন্দেহ জাগে না? আমি কিন্তু মাঝে মাঝেই একথা ভাবি। য়ুসুফ মাথা নেড়ে বলল, তোমার গোড়াতেই ভুল। তুমি তো মালিক পক্ষের লোক নও। তুমি আমাদের পক্ষের লোক। এই কথাটা জানি বলেই আমার কখনই সন্দেহ হয় না।

: কেন হয় না? আমি কি কখনও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারি না?

: কখনোই পার না, এমন কথা কি কেউ বলতে পারে? কার সম্পর্কেই বা এমন কথা বলা চলে? তেমন যদি বুঝি কখনও, আমরাও তোমাকে সেই চোখেই দেখব।

: ও কথা থাক। একটা মজার ব্যাপার দেখ গেদালিয়া। আজ রাজা, তাঁর অধ্যক্ষগণ, নগরের হোমরা চোমরারা, এমন কি হাড়ে হাড়ে পাজি মন্দির- কর্তৃপক্ষ পর্যন্ত আমাদের দাবী অন্ততঃ মৌলিকভাবে হলেও মেনে নিয়েছেন। কেবলমাত্র দু’জন লোক এখনও প্রকাশ্যভাবে বিরোধী। এই দু’জন হচ্ছেন নবী যেরেমিয়া আর লোকপ্রধান অহিকম। তাঁরা কিন্তু প্রথম থেকেই বলে আসছেন এবং আজও স্পষ্টভাবেই বলেছেন যে, ক্রীতদাসদের কিছুতেই মুক্তি দেওয়া যেতে পারে না। অথচ ক্রীতদাসদের উস্কানি দিয়ে ক্ষেপিয়ে তোলার অভিযোগে এই দু’জনকেই কারাগৃহে পাঠানো হয়েছিল।

: য়ুসুফ, একটু আগেই তুমি ওঁদের বুদ্ধির তারিফ করছিলে। এটা কি তারই পরিচয়?

: আমি কিন্তু এখনও তাঁদের বুদ্ধির তারিফ করি। এঁদের সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছতে হলে অত সোজা পথ দিয়ে চিন্তা করলে চলে না। ক্রীতদাসদের বিদ্রোহের আভাস দেখে নাগরিকরা সবাই সশঙ্ক, শশব্যস্ত। আর তারই সুযোগ নিয়ে ওরা ওদের পুরাতন প্রতিপক্ষের হাত থেকে ভবিষ্যৎকে নিষ্কণ্টক করবার চেষ্টায় ছিল। যেহাজিয়ার বাড়ির ব্যাপারটার সঙ্গে তুমি জড়িত হয়ে পড়বার ফলেই ওরা লোকপ্রধান অহিকম এবং সঙ্গে সঙ্গে নবী যেরেমিয়াকে ক্রীতদাসদের নেতা বলে প্রতিপন্ন করে ছাড়ল। এ সমস্ত আচার্য পশহরের লীলা। রাজা যেদেকিয়া তো উপলক্ষ মাত্র। ব্যাপারটাকে আমি এইভাবেই চিন্তা করেছি।

: কিন্তু এত বুদ্ধি প্রয়োগ করেও ওরা শেষপর্যন্ত সামলাতে পারবে কী?

: যদি বুদ্ধি দিয়েই সব কাজ সম্ভব হোত, তা হলে হয়তো বা পারত। কিন্তু সাফল্যের পক্ষে বুদ্ধি যত বড়ই শক্তি হোক না কেন, এটাই একমাত্র শক্তি কখনই নয়। ওরা বুদ্ধির জোরে আমাদের কুকুর বানিয়ে রেখেছে, হয়তো আরও অনেকদিন এই ভাবেই রাখতে পারবে। কিন্তু চিরকাল রাখতে পারবে কী? আমি বিশ্বাস করি না।

: কিন্তু একটা জিনিস তুমি নিশ্চয়ই লক্ষ করেছ, য়ুসুফ। এই দু’টি ব্যক্তিকে নিয়ে যিরূশালেমের ক্রীতদাসেরা সবচেয়ে মাতামাতি করছে। তারাই এঁদের মুক্ত করে নিয়ে এলো কারাগার থেকে। আর বেরিয়ে এসে তেমনি জোর গলায় বলছেন- ক্রীতদাসদের মুক্তি? অসম্ভব। এ কেমন এক প্রহসন, বল দেখি। কারাগার থেকে বেরিয়ে আসবার পর থেকে বাবা এই কথাটা আমাকে বোঝাবার জন্য উঠে পড়ে লেগেছেন। এই নিয়ে রোজ একচোট কথা- কাটাকাটি চলছে। আর তাঁদের দু’জনের মুক্তির দিনে তাঁদের নাম করে ক্রীতদাসেরা কি জয়ধ্বনিটাই না দিয়েছে! সেদিন রাজার সিংহাসন যদি খালি পেত, তা হলে ওরা এঁদের দু’জনের একজনকে তার উপর না বসিয়ে ছাড়ত না।

য়ুসুফ হেসে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই বিমর্ষ কণ্ঠে বলল : তা জানি গেদালিয়া, চিরদিন পরের অনুগ্রহের উচ্ছিষ্টে পালিত এই হতভাগ্য প্রাণীগুলো এখনও অনুগ্রহের প্রত্যাশী হয়ে এদের মুখের দিকেই তাকিয়ে আছে। অন্যের কথা আর কি বলব, আমি নিজেই বা কি? এই সেইদিন পর্যন্ত লোকপ্রধান অহিকাকে আমি একান্তভাবে আমাদের আপন লোক বলেই মনে করে এসেছিলাম। তিনি-যে আমার মত দাসদাসীদের মালিক, সে কথা আমি যেন ভুলেই গিয়েছিলাম।

: মুসুফ, জীবনে বহু তিক্ত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তুমি মানুষ হয়ে উঠেছ। এ শুধু তোমার বঞ্চনা নয়, সম্পদও বটে। এই অভিজ্ঞতা তোমার দৃষ্টি শক্তিকে তীক্ষ্ণ ও অন্তর্ভেদী করে তুলেছে। সেইজন্যই এসব কথা আমার চেয়ে অনেক বেশী বোঝ তুমি। আমার একটা কথার উত্তর দাও। নবী যেরেমিয়া আর লোকপ্রধান অহিকম, তাঁরা কি আমাদের প্রতিপক্ষ, তাঁরা কি আমাদের শত্রু? য়ুসুফ এই প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল।

: উত্তর দাও, য়ুসুফ।

: কিন্তু আমার উত্তরটা কি তোমার কাছে প্রীতিপদ হবে?

: আমি সত্য কথা জানতে চাইছি, য়ুসুফ, শ্রুতিসুখকর কথা শুনতে চাই নি।

: ধন্যবাদ। তবে শোন। আমার বিচারবুদ্ধিতে যেটুকু আসে সেইটুকুই বলব। যিরূশালেমের ক্রীতদাসেরা নবী যেরেমিয়া আর লোকপ্রধান অহিকমের গুণগানে পঞ্চমুখ। তারা তাঁদের নিজেদের লোক বলেই মনে করে। তোমাকে এইমাত্র বলেছি, একদিন এই চিন্তা আমার নিজের মনেও ছিল। আজও পবিত্র হৃদয় যেরেমিয়া এবং দরিদ্র ও দুর্গতদের বন্ধু লোকপ্রধান অহিকমকে শত্রু বলতে আমার কেমন যেন মুখে বাধে। তুমি তো জান, লোকপ্রধানকে আমি ব্যক্তিগতভাবে কত শ্রদ্ধা করি। কিন্তু ক্রীতদাসদের এই মুক্তিসংগ্রামে তাঁরা তাদের প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চলবেন বলেই আমি বিশ্বাস করি। আর সেদিন তাঁরাও আমাদের শত্রু বলে মনে করবেন।

: তোমার এই স্পষ্ট কথার জন্য ধন্যবাদ। ক’দিন ধরে এই প্রশ্নটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে।

দু’জন লোক এসে ঘরে ঢুকল। তাদের কাছে খবর পাওয়া গেল, আজ আর কারও আসবার সম্ভাবনা নেই। সবাই আনন্দ উৎসবে মেতে আছে। কয়েকজন অতিরিক্ত দ্রাক্ষারস পান করে বেসামাল হয়ে পড়েছে সংবাদ শুনে য়ুসুফের চোখ জ্বলে উঠল। দাঁতে দাঁত চেপে সাপের মত চাপা গর্জনে সে বলে উঠল, মূর্খের দল, তোমাদের সর্বনাশের সময় উপস্থিত। কেউ তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না।

তারপর গেদালিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল : গেদালিয়া, এরা তো কেউ আর আসবে না। তুমি এখন যাও, ভাই। আমাকে একটু বেরোতে হবে।

গেদালিয়া ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নানা কথা চিন্তা করতে করতে সরু রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। এই দরিদ্র পল্লী অন্ধকার। রাস্তায় আলোর কোন ব্যবস্থা নেই। আঁকাবাঁকা পথটা দিয়ে চলতে চলতে সে একটা খোলা জায়গার মধ্যে এসে পড়ল। এতক্ষণ পথ, মাঠ, ঘরবাড়ি সমস্ত কিছু অন্ধকারে ডুবে ছিল। এমন সময় দূরের আকাশে চাঁদ মাথা তুলল। দেখতে দেখতে সারা পৃথিবী জ্যোৎস্নার হাসিতে হেসে উঠল।

পথে লোক নেই, কোন শব্দ নেই, ঝিম ঝিম করছে রাত্রি। শুধু কোথায় দূরে একটা পাখি থেকে থেকে ডেকে উঠছে। অদ্ভূত, অদ্ভূত সুন্দর এই পৃথিবী! এর কতটুকু দেখা যায়, কতটুকু শোনা যায়, কতটুকু ছোঁয়া যায়? শিশুর মতই মানুষের ছোট হাতের মুঠো এর কতটুকুই বা ধরে রাখতে পারে! বাইশ বছর বয়সের গেদালিয়া। মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকে, পা চলতে চায় না। কে যেন পেছন থেকে ডাকে, গেদালিয়া! গেদালিয়া চমকে ফিরে দাঁড়ায়। এ কে? একটি কিশোর মূর্তি। ছবির মত দাঁড়িয়ে আছে। গেদালিয়ার সর্বদেহ শিউরে উঠল। এই জনমানুষহীন পথের মাঝখানে এ আবার কে? কোথাও কেউ ছিল না- সাড়া নেই, শব্দ নেই, হঠাৎ এ কোথা থেমে নেমে এল, কেমন করেই বা এল? আকাশ থেকে নেমে এল নাকি? যিহোবার সৃষ্ট যে-সমস্ত সূক্ষ্মদেহী প্রাণীর পাখার উপর ভর করে আকাশে উড়ে বেড়ায়, এ কি তাদেরই একজন? তা না হলে তার নামই বা কেমন করে জানল!

: বীরপুরুষ, তুমি ভয় পেয়েছো?

মানুষের কণ্ঠস্বর বটে। যে-ভয়টা এসেছিল, কেটে গেল।

গেদালিয়া এবার আপনাকে সামলে নিল : ভয় পাব কেন? কিন্তু তুমি কে?

: চিনতে পারছ না?

: না তো।

: কিন্তু আমি তো তোমায় চিনি। কাছে এসো না, এত ভয় কিসের?

: এ কে? গলার স্বরটা-যে বড় বেশি পরিচিত। এবার তার মনে একটা সন্দেহ জাগল। কাছে গিয়ে দেখল, তাই বটে।

: এ্যা, কে, সারা? তুমি? এ বেশে?

: হ্যাঁ, আমি সারা। তোমার সারাকে চিনতে তোমার এতক্ষণ লাগল? ছি ছি! আমি-যে দূর থেকে বাতাসে তোমার গায়ের গন্ধ পেলেও বুঝতে পারি।

: কিন্তু তুমি কোত্থেকে এলে? কেমন করে এলে?

: খুব চমকে দিয়েছি, না?

সারা আরও কাছে সরে এল। গেদালিয়ার কাঁধের উপর মাথা রেখে বলল : তোমাকে পেতে হলে যে অসাধ্য সাধন করতে হয়। তুমি তো আমার সহজলভ্য নও।

: কেন এসেছ বল না?

: তোমার খোঁজে।

: কেন?

: এর আবার কেন কি? তুমি কি জান না, তোমার জন্যই আমার তপস্যা?

: আর কোন কথা নেই? সারা, তুমি আমায় ফাঁকি দিচ্ছ। কি যেন একটা হয়েছে।

: হ্যাঁ, একটু কথাও আছে।

: বল।

: হুঁ, এমনি করে বলা যায় বুঝি? অনেক কথা। বসে বলব।

: বেশ তো এখানেই বসো না। কি সুন্দর জ্যোৎস্না!

: না, না, এখানে নয়, এখানে নয়। এমন ফুটফুটে জ্যোৎস্নায় আমাদের মত উদ্‌ভ্রান্ত নিশাবিহারী আরও দু’একটি যুগলও তো এসে পড়তে পারে।

: তবে কোথায় বসবে?

: ঐ-যে উত্তর দিকে ঝোপড়া মত বড় গাছটা দেখছ না, ঐটের তলায় বসব। ওখানে সন্ধ্যার পর ভূত আর অপদেবতারা নেমে আসে! সেই ভয়ে ওখানে আর কেউ যাবে না।

: তোমার ভয় নেই?

: ভীষণ ভীতু ছিলাম আগে। এখন তুমি আমার সমস্ত ভয় দূর করে দিয়েছ। এখন আমার ভয় শুধু তোমাকে নিয়ে।

দু’জন হাতে হাত ধরে গাছটার তলায় গেল। গাছটার নীচে পরজাতীয়েরা তাদের দেবতার পূজো করে। একটা বিকৃত চেহারার কাঠের মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ দেখলে আঁতকে উঠতে হয়।

: এ আবার কি? গেদালিয়া চমকে উঠে দু’পা পিছিয়ে এল।

: এ তুমি আমায় কোথায় নিয়ে এলে?

: তুমি দেখছি আমার চেয়েও ভীতু। আরে, এ-যে দেবতা। অমন করে বলতে নেই, রাগ করবে-যে!

: এ কাদের দেবতা?

: কনানীয়দের। কিন্তু তেমন বেশী বিপদে পড়লে আমাদের ইহুদী ভাইবোনেরাও আর সকলের চোখের আড়ালে চুপি চুপি পূজো দিয়ে যায়।

: গাছের তলায় দু’জনে পা ছড়িয়ে বসে পড়ল।

: তুমি কি করে এমন জায়গায় আমার সন্ধান পেলে সারা?

: আমি বুঝি জানি না, এ সময় তুমি কোথায় যাও? তোমার গতিবিধি আমার জানা নেই? দামী জিনিস কিনা, তাই সব সময় চোখে চোখে রাখি।

: তুমি বুঝি য়ুসুফের ওখানে গিয়েছিলে?

: তা না হলে কি করে তোমাকে পাব? বাড়িতে তো তোমাকে পেয়েও পাই না। হাতের কাছে থেকেও তুমি আমার ধরাছোঁয়ার বাইরে। সে-যে কি কষ্ট!

: হ্যাঁ, তারপর?

: ঘরের পেছনে গাছটার আড়ালে চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তোমাদের কথা একটু একটু শুনতে পাচ্ছিলাম। তারপর তুমি বেরিয়ে এলে আমি পেছন নিলাম।

: গুপ্তচরের মত?

: হ্যাঁ, গুপ্তচরের মতই। তুমি তো একটুও টের পাও নি। আশ্চর্য, কি অন্যমনস্ক লোক তুমি! আমি আর একবার তোমাকে ডেকেছিলাম, তুমি শুনতে পাও নি।

: আচ্ছা, এবার বল তোমার কথা।

: শোন, সংক্ষেপে বলব। আমি বলব আর তুমি শুনে যবে। মাঝখানে কোন কথা বলতে পারবে না। তোমার বাবা আজ সকালবেলা আমাকে ডাকিয়ে এনে কোন রকম ভূমিকা না করে সোজাসুজি বললেন- সারা, আমি তোমাকে মুক্তি দিলাম। তুমি এখন স্বাধীন, তুমি তোমার যেখানে খুশী চলে যেতে পার।

: এ্যা, বলছ কি! বাবা-

: চুপ, আমার কথায় বাধা দিও না। নিঃশব্দে শুনে যাও। আমি বললাম- মালিক, আমি কোথায় যাব? আমার কি কেউ আছে? আমাকে আপনি এমন করে তাড়িয়ে দেবেন না।

তিনি বললেন- তোমরা তো মুক্তিই চাইছ। আমি বললাম, মুক্তি কি শুধু আমারই জন্য? আমি কি শুধু একাই মুক্তি চাইছি?

তিনি বললেন- হ্যাঁ, আমি শুধু তোমাকেই মুক্তি দিলাম। আমি তাঁকে প্রশ্ন করলাম- মালিক, আমি কি কোন অপরাধ করেছি? আমি অল্পবুদ্ধি মেয়েমানুষ, আমাকে সহজ করে বুঝিয়ে বলুন।

তিনি কতক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, আমিও চেয়ে রইলাম। আমি তখনও বুঝতে পারি নি। আমি তাঁর মনের কথাটা বুঝতে চেষ্টা করেছিলাম।

একটু ইতস্ততঃ করে শেষে তিনি বললেন- সত্য কথা শুনতে চাও? বেশ, সত্য কথাই আমি তোমাকে বলছি। তুমি আমার সংসারে এক দুর্যোগ এনে দিয়েছ। আমাদের একমাত্র পুত্র ভবিষ্যতের একমাত্র আশা, তাকে তুমি আমাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নিতে চাইছ। আমি তোমাকে নিজের মেয়ের মতই দেখে এসেছি, ক্রীতদাসীর মত ব্যবহার তোমার সঙ্গে কোনদিনই করি নি। আর তার প্রতিদান তুমি এই ভাবেই দিচ্ছ?

: বল কি সারা, বাবা এ সমস্ত কথা বললেন?

: আরে চুপ করো। চুপ করে কথা শোন। আমি বললাম- আপনি স্পষ্ট করে বলুন, আমি এমন কী অপরাধ করেছি যে, আপনি মুক্তির নাম করে আমার মত একটা অনাথা মেয়েকে এই নির্বান্ধব পৃথিবীতে ভাসিয়ে দিতে চাইছেন? এতদিন মেয়ের মত দেখে এসেছেন, আর আজ এইটাই কি তার উপযুক্ত কাজ হবে?

: তারপর? তারপর?

: তিনি বললেন— গেদালিয়া ক্রীতদাস নয়, কিন্তু ক্রীতদাসদের নিয়ে সে এমন মাতামাতি করছে কেন? আর তারই ফলে আমার মান মর্যাদা, এমন কি আমার জীবন পর্যন্ত বিপন্ন।

আমি প্রশ্ন করলাম— মালিক, এ প্রশ্নের উত্তর কি আমাকে দিতে হবে? তিনি উত্তর দিলেন- হ্যাঁ, তোমাকেই দিতে হবে। কারণ তুমি তাকে এই পথে টেনে নিয়ে এসেছ। এ পথ তার পক্ষে স্বাভাবিক পথ নয়।

গেদালিয়া একটু চমকে উঠল : থামো থামো! সারা, বাবা যা বলেছেন, তা কি ঠিক? তুমিই কি আমাকে এই পথে টেনে নিয়ে এসেছ?

: না, ঠিক নয়, কখনও ঠিক নয়। এত বড় মিথ্যা আর কিছুই হতে পারে না। শোন, আমি তখন বললাম- মালিক, আমার মত সামান্য একটা ক্রীতদাসী তাঁকে পরিচালনা করবে, একি একটা বিশ্বাস করবার মত কথা?

তিনি বললেন— বাজে কথা বলে আমাকে ভোলাবার চেষ্টা করো না। মেয়ে, তা সে যত সামান্যই হোক না কেন, পুরুষকে স্বর্গের দুয়ারেও নিয়ে যেতে পারে, আবার নরকের দুয়ারেও পৌঁছে দিতে পারে।

: তুমি তুমি কি বললে?

: আমাকে কোন কথা বলতে না দিয়ে তিনি বলে চললেন,– সারা, শোন, তোমাকে আমি একটা ভাল প্রস্তাব দিচ্ছি। তোমার পক্ষেও ভাল, আমাদের পক্ষেও ভাল। তুমি আমার মেয়ের মত; আমি তোমাকে সৎপাত্র দেখে বিয়ে দিতে চাই। এই সপ্তাহের মধ্যেই আমি পাত্র স্থির করব। তোমার উপযুক্ত পাত্রই আমি দেখব। তুমি এতে রাজী হয়ে যাও। অমত করো না। আমরা সবাই এতে সুখী হব।

গেদালিয়া সারাকে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিল। সারার বুকটা ভীরু পাখির মতই কাঁপছিল

: সারা, তুমি ভীষণ কাঁপছ।

: কাঁপছ বুঝি? হ্যাঁ, কাঁপছি। এইজন্যই তো আশ্রয় নিতে তোমার কাছে ছুটে এলাম। তারপর শোন, আমি বললাম- আপনি মালিক আমি ক্রীতদাসী। আপনি ইচ্ছা করলেই জোর করে আমাকে যেখানে খুশী বিয়ে দিতে পারেন। তবে আর আমার মতামত জানতে চাইছেন কেন?

: কি বললেন বাবা?

: তিনি আমার কথা শুনে ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন। শেষে বললেন- না আমি চাই তুমি স্বেচ্ছায় রাজী হয়ে যাও। তাতে সবদিকের শান্তি বজায় থাকবে। আমি এসব বিষয়ে কোনদিন তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে চাই নি। কিন্তু তুমি যদি আমাকে বাধ্য কর, তবে শেষ-পর্যন্ত তাও আমাকে করতে হবে। একটা কথা তুমি স্থির জেনো সারা, তুমি মনে মনে যে-আশা করেছ, তা কিছুতেই হবে না। আমি যতদিন বেঁচে আছি, আমার বংশের মানমর্যাদা রক্ষা করেই চলব। আমার একমাত্র উত্তরাধিকারী এক অজ্ঞাতকুলশীলা বাজার থেকে কিনে- আনা ক্রীতদাসীকে বিয়ে করতে পারে না। একটু থেমে আবার তিনি বললেন, সে যদি তোমায় নিয়ে শুধু খেলাই করত আমি হয়তো তাতে কিছু বলতাম না। এ বয়সে এমন খেলা অনেকেই খেলে। কিন্তু গেদালিয়া-যে খেলতে জানে না, সে অন্য ধাতে তৈরী। সে-জন্যই আমি তাকে ভয় করি।

: সারা, থামো।

: আহা, দুঃখ লাগছে বুঝি? লাগবেই তো। কিন্তু জান গেদালিয়া, এসব কথা আমাকে আর তেমন দুঃখ দিতে পারে না। তুমি তো জান আমার দুর্ভাগ্যের ইতিহাস। আমার মা কে, বাবা কে তা আমি জানি না। ক্রীতদাসের আবার মা বাপ! শুধু একটি মাত্র আমার পরিচয়- আমি ক্রীতদাসদের সন্তান। ক্রীতদাসী সে তো মালিকদের খেলারই সামগ্রী। আমার এই জীবনে আমি কম লাঞ্ছনা সহ্য করি নি। তারই জ্বালা আমি বুকের মাঝে বহন করে চলেছি। আমি দগ্ধ হয়ে চলেছিলাম। এমন সময় কোথা থেকে ঘন-বর্ষণ মেঘের মত তুমি নেমে এলে।

: আর তুমি আমাকে ওদের ওই উঁচু আকাশ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে এলে।

: তোমাকে ছিনিয়ে নিয়ে আসব এমন সাধ্য কি আমার? তুমি আপনি এলে, দয়া করে এলে, ভালবেসে এলে, আমাকে ধন্য করে দিয়ে এলে।

গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে এক টুকরো জ্যোৎস্না সারার মুখের উপর এসে পড়েছে। গেদালিয়া মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল- এই কি ক্রীতদাসী? সারা হাসল। গেদালিয়ার মুগ্ধ দৃষ্টি সে অনুভব করতে পারছে। গেদালিয়ার বাহুর বন্ধন আরও ঘন হয়ে এসেছে। তাই সারা পরিতৃপ্তির হাসি হাসল। আর চাঁদের আলোয় ওর উজ্জ্বল দাঁতগুলো ঝিকমিক করে উঠল।

: তুমি আমার দিকে চেয়ে অমন করে কি দেখছ?

: দেখছি তোমাকে। তোমায় দেখে আমার সাধ মিটছে না। তোমাকে এমন করে তো দেখতে পাই না।

সারা আবার হাসল : গেদালিয়া, সত্যি করে বল আমার মধ্যে দেখবার মত কি কিছু আছে? আমাকে নিয়ে অনেকেই খেলা করেছে, কিন্তু এমন করে কেউ কখনও দেখতে চায় নি। গেদালিয়া, আমার বুকের মধ্যে যে-মনটা আছে, তা যদি আমাকে খুলে দেখাতে পারতাম!

: সারা, তুমি আমাকে প্রথমে ফিরিয়ে দিয়েছিলে, মনে পড়ে? উঃ, কি নিষ্ঠুর ছিলে তুমি সেদিন। কি কঠিন কথাই না বললে আমাকে!

: আমি কি করব? গেদালিয়া, আমি-যে বেচাকেনার সামগ্রী ছিলাম। পুরুষের চোখে আমি যে শুধু কুৎসিত লালসাই দেখেছি। আমি তাকে শুধু ভয় করতে আর ঘৃণা করতেই শিখেছিলাম। আমি কি জানতাম! কিন্তু তোমাকে চিনে নিতে আমার তো বেশী দেরী হয় নি।

: তারপর কেমন করে তুমি আমার হয়ে গেলে। আর কি তুমি আমায় ফিরিয়ে দিতে পারবে?

: তোমাকে ফিরিয়ে দিলে আমি নিজেই-যে শূন্য হয়ে যাবো। গেদালিয়া, তুমি জান, আমি তোমার চেয়ে বয়সে বড়।

: এ কথা তো তুমি প্রায়ই আমাকে শোনাও। কিন্তু তুমি তো নিজেই জান না তোমার বয়স কত।

: সে কথা ঠিকই। কিন্তু তবু আমি বুঝতে পারি। মাঝে মাঝে তোমাকে শিশুর মতই মনে হয় আমার। তখন কোথা থেকে আমার মধ্যে একটা ছোট্ট মা জেগে উঠে, যে তোমাকে দু’হাত দিয়ে বুকের মাঝখানে জড়িয়ে ধরতে চায়। সকল দুঃখ আর সকল আঘাত থেকে তোমাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। তখন মনে হয় তুমি কত অসহায়, আর আমার উপর কত নির্ভরশীল। স্নেহের আবেগে আমার বুকটা তখন টনটন করে ওঠে, আর সঙ্গে সঙ্গে চোখ দু’টি জলে ভরে যেতে চায়। গেদালিয়া, বল, কেন এমন হয়?

: সারা, তোমার গেদালিয়া তোমারই। তুমি তাকে যে-ভাবেই চাও, সে-ভাবেই নাও। তোমার কাছ থেকে কেউ তাকে ছিনিয়ে নিতে পারবে না। না, লোকপ্রধান অহিকমও নয়।

: গেদালিয়া, আমি তোমার মুখ থেকে এই কথাটুকু শোনবার জন্যই অস্থির হয়ে ছুটে এসেছিলাম। আমি জানি, তুমি আমাকে ছেড়ে যেতে পার না। তবুও মাঝে মাঝে কোথা থেকে এমন ভয় আসে? চিরদিনের বঞ্চিত কিনা, এত সৌভাগ্য যেন আমি বিশ্বাস করতে পারি না। কিন্তু বললে কি তুমি বিশ্বাস করবে গেদালিয়া, আমার আরও একটা মন আছে। সে মনটা কি বলে জান? সে বলে,- না প্রিয়তম, তুমি তোমার নিজের জায়গায় যাও। এত দুঃখ তোমার সইবে না। আমাদের দাসদাসীদের অদৃষ্টে যা হয় হোক, তুমি তার সঙ্গে আপনাকে আর এমন ভাবে জড়িও না। তুমি আমাকে ছেড়ে, আমাদের ছেড়ে চলে যাও, তোমার নিজের জায়গায় চলে যাও। তুমি সুখী হও, তুমি সুখী হও। কতবার তোমাকে এ কথা বলতে চেয়েছি। কিন্তু কই পারি না যে! বলতে গেলে আমার বুক ভেঙ্গে যেতে চায়। গেদালিয়া, বল, বল, কেন এমন হয়?

: সে আর হয় না সারা। আমার পথ নির্ধারিত হয়ে গেছে। শোন সারা, একটা কথা তুমিও জানতে না আমিও জানতাম না, কিন্তু বহুদর্শী লোকপ্রধানের দৃষ্টি এড়ায় নি। তিনি ঠিকই দেখেছেন। হ্যাঁ, তুমিই আমাকে এই পথে নিয়ে এসেছ, সে কথা তুমি স্বীকার করো আর নাই করো! এতদিন বাদে আমি আজ প্রথম বুঝতে পারলাম, তোমাকে ভালবেসেই আমি সমস্ত ক্রীতদাস সমাজকে ভালবেসে ফেলেছি। তোমাকে ভালবেসেছিলাম বলেই আমি আজ তাদের একজন। তুমি আর তোমরা কেমন করে যেন আমার কাছে এক হয়ে গেছ। তুমি যদি আমার সামনে তোমার গভীর রহস্যময় ওই দু’টি চোখ নিয়ে এসে না দাঁড়াতে, তবে হয়তো আমি লোকপ্রধান অহিকমের সুযোগ্য উত্তরাধিকারী হয়েই বেঁচে থাকতে পারতাম। সারা, সেই দুর্ভাগ্য থেকে তুমি আমায় মুক্তি দিয়েছ। আশ্চর্য, এতদিন বাদে আমি আজ এই কথা প্রথম অনুভব করতে পারছি।

: গেদালিয়া, বল, আবার বল, এ কথা কি সত্য?

: হ্যাঁ, এ কথা সত্য। আমাদের ভালবাসা যেমন সত্য, এ কথাও তেমনি সত্য।

: এ কি আমাদের গৌরব না লজ্জার কথা?

: তোমারও নয়, আমারও নয়, এ গৌরব ভালবাসার গৌরব।

: তোমার কথাই সত্য।

আমি তো দেখছি তোমার ভালবাসা আমাকে নতুন করে গড়ে তুলছে। আমি তো আগে এমন ছিলাম না। আমার সমস্ত অপূর্ণতা যেন পূর্ণ হয়ে উঠেছে কিন্তু গেদালিয়া, রাত্রি-যে অনেক হয়ে গেল। আমরা কি আর ঘরে ফিরব না?

: না, ফেরবার সময় চলে গেছে। আর ঘরে ফিরব না সারা। ঘরে ফিরে গেলে সারাকে আর কোথায় পাব? প্রতি রাত্রিতেই তো ঘরে ফিরি, আজ একটা রাত্রি নাই বা ফিরলাম! এমন রাত্রি কি আর কখনও আসবে?

: সত্যি বলছ তুমি? সারারাত- শুধু তুমি আর আমি? আজ তুমি আমাকে গ্রহণ করবে? এতদিনের স্বপ্নসাধ পূর্ণ হবে সারার? গেদালিয়া, আমার কেমন যেন ভয় করছে। না, না, ভয় নয়, আমি এত আনন্দ যেন সইতে পারছি না।

: ছদ্মবেশী, এবার তোমার ছদ্মবেশ খুলে ফেল। তোমার এই ছদ্মবেশ তোমাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে রাখছে।

: আগে বল নি কেন?

সারা উঠে দাঁড়িয়ে তার পুরুষের পোশাক ছেড়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গেই সেই আলোছায়ার ঝিলিমিলির মধ্যে একটি পূর্ণযৌবনা রমণীমূর্তি ফুটে উঠল। এবার গেদালিয়াও উঠে দাঁড়ায়

: সারা, এই-যে এখানে এসে দাঁড়াও। এখান দিয়ে একফালি জ্যোৎস্না নেমেছে। সেই আলোয় তোমাকে একটু ভাল করে দেখতে দাও। তোমার এই ঢেউতোলা চুলগুলোকে ছেড়ে দাও, ভেঙ্গে পড়ক তোমার পিঠে। সারা, এই-যে এখানে এসো। সারা তার কাছে এসে দাঁড়াল।

: এই-যে গেদালিয়া, এই-যে আমি। তুমি আমাকে দেখবে? দেখ। আমি তোমার জন্যই সৃষ্ট হয়েছিলাম।

: সারা, এই দেবতা সাক্ষী থাকুন, আর আকাশে সাক্ষী থাকুক চাঁদ, আজ আমাদের মিলন-লগ্ন; সারা, আজ আমাদের মধু-রজনী।

এমন সময় হু হু করে একটা দমকা বাতাস গাছের শাখাগুলো দুলিয়ে দিয়ে চলে গেল। সেই দোলার সঙ্গে সঙ্গে জ্যোৎস্নার ফালিগুলো এদিক থেকে ওদিকে নেচে নেচে বেড়াতে লাগল। সারার মুখের উপর থেকে জ্যোৎস্না সরে গেল, আর ঠিক সেই মুহূর্তেই একফালি জ্যোৎস্না দেবতার মুখের উপর এসে পড়ল। এতক্ষণ অন্ধকারে দেবতার মুখ দেখা যাচ্ছিল না। এবার চাঁদের আলো পড়ে তাঁর বীভৎসতা সম্পূর্ণ উদ্‌ঘাটিত হয়ে পড়ল। হিংস্র, ক্রুর সেই বিকৃত মুখমণ্ডল— কোন্ বর্বর শিল্পীর কল্পনার সৃষ্টি কে জানে? মুখের দু’পাশ দিয়ে দু’টো দাঁত বেরিয়ে আছে। ঠোঁটের দু’ধার দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। চোখ মুখ থেকে কি কুৎসিত একটা হাসি ফুটে বেরোচ্ছে। সে হাসি দেখলে আতঙ্ক জাগে।

দু’জনেই ভীষণ চমকে উঠল। সারা ভয়ে চীৎকার করে দু’হাত বাড়িয়ে গেদালিয়াকে জড়িয়ে ধরতে চাইল; কিন্তু পারল না, ভর সামলাতে না পেরে উপুড় হয়ে পড়ে গেল। গাছের একটা উঁচু শিকড়ের উপর পড়ে কপাল কেটে ঝরঝরিয়ে রক্ত ঝরতে লাগল।

গেদালিয়া তাকে ধরতেই সারা আতঙ্কে চীৎকার দিয়ে উঠল : গেদালিয়া, গেদালিয়া!

: এই-যে আমি, সারা। ভয় কিসের?

: তুমি? ও তুমি! আমি ভাবছিলাম ওটা বুঝি-

: না, না, ওটা আবার কি করবে? এই-যে আমি তোমাকে ধরে আছি।

: হ্যাঁ, ধরে থাকো, শক্ত করে ধরে থাকো। আমার বড় ভয় করছে। গেদালিয়া আবার তার মাথাটা কোলের উপর টেনে নিয়ে তাকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরল, আর অনুভব করল সে তখনও থরথরিয়ে কাঁপছে।

: গেদালিয়া, আজ না আমাদের মিলন-লগ্ন, আজ না আমাদের মধু-রজনী? এ কেমন হল গেদালিয়া, এ কেমন হল?

ঝিরঝির করে বাতাস বইছিল। আকাশ থেকে মুক্তাধারায় জ্যোৎস্না ঝরতে লাগল। কি সুন্দর রাত্রি! এমন রাত্রি কি আর কখনও ফিরে আসবে? সারাকে নিয়ে গেদালিয়া তেমনি করে বসে রইল। সারা তাকে আঁকড়ে ধরে তখনও কাঁপছে। আর তারই এক পাশে সেই ভয়ংকর দেবতা দাঁত বের করে তাদের দিকে ব্যঙ্গভরে তাকিয়ে সেই কুৎসিত হাসি হাসতে লাগল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *