অভিশপ্ত নগরী – ২১

একুশ

: যেরেমিয়া, বাবিলরাজের সেনাপতি নেবুজার আদান আপনার সঙ্গে কথা বলছে। মহামহিম বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার আপনার নিকট যে-বার্তা প্রেরণ করেছেন, আপনাকে বিজ্ঞাপিত করার জন্য তাঁর এই দাস আদিষ্ট হয়েছে।

: আমার মত সামান্য একজন লোকের নিকট বাবিলরাজ কি বার্তা প্রেরণ করতে পারেন, তাই ভেবে আমি বিস্ময় বোধ করছি।

: আপনি সামান্য লোক নন, ইহুদীদের পক্ষেও নয়। যিহোয়াকিম, যিহোইয়াকীন ও যেদেকিয়া, এই তিন রাজার রাজত্বকালে আপনি যে-বিশ্বস্ততা ও আন্তরিকতার সঙ্গে বাবিলনের সমর্থন ও সেবা করে এসেছেন, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ আমাদের কাছে গিয়ে পৌঁছেছে। মহামহিম বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার সেইজন্যই তাঁর এই দাসের মারফৎ আপনাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন এবং আরও জানাচ্ছেন যে, তাঁর প্রতি আপনার এই ঐকান্তিক অনুরক্তি ও আনুগত্যের জন্য তিনি আপনাকে যথোচিত পুরস্কার করতেও ইচ্ছুক। অপমানে ও উত্তেজনায় যেরেমিয়ার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।

: বাবিল সেনাপতি, আমি আপনাদের বন্দী। আমাকে যে-কোন কথা বলবার বা আমার সঙ্গে যে-কোন ব্যবহার করবার সুযোগ আপনার আছে। কিন্তু আমার বক্তব্য যদি শুনতে চান, তা হলে আমি বলব, আমি এতকাল বাবিলরাজের সেবা করে এসেছি, আপনার এই কথা আমার পঙ্গে শ্লাঘ্য নয়, অসত্যও বটে। যেরেমিয়ার উষ্মা দেখে নেবজার-আদান কৌতুক বোধ করে মনে মনে হাসলেন।

: যেরেমিয়া, আপনি উত্তেজিত হবেন না। আমি বিদেশী, অরামীয় ভাষায় আমার পারদর্শিতা স্বভাবতই কম। কাজেই কোনরূপ শব্দ প্রয়োগের বিচ্যুতি অস্বাভাবিক বা সম্ভাবনার অতীত নয়। তবে এ সম্পর্কে কোন প্রশ্নই ওঠে না যে, আপনি দীর্ঘকাল ধরে যিরূশালেমের বসে আমাদের মিত্রোচিত কার্যই করে এসেছেন।

: কি রকম? আমি বুঝতে পারছি না, বুঝিয়ে বলুন।

: আপনি। এতদিন ধরে আপনার বাণীর মধ্য দিয়ে যিরূশালেমের অধিবাসীদের মনের মধ্যে নিরবচ্ছিন্নভাবে যে-ভীতি, দ্বন্দ্ব ও নিরাশার মনোভাবের সৃষ্টি করে এসেছেন, তাতে আমরা লাভবানই হয়েছি। আপনি, আপনার বন্ধু অহিকম এবং আপনার অনুবর্তীরা এইভাবে নগরের প্রতিরোধের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিয়ে আমাদের উদ্দেশ্য-সিদ্ধির সহায়তা করেছেন। বাবিল আর যিরূশালেম, উভয় পক্ষই এ কথা স্বীকার করবে।

: বাবিল সেনাপতি, আমি যিহোবার সেবক। আমি যা কিছু করেছি, যিহোবার নির্দেশ মতই করেছি। বাবিলের স্বার্থসিদ্ধির উদ্দেশ্য আমার কোন দিনই ছিল না।

নেবুজার-আদান ভ্রূ কুঞ্চিত করে বললেন : আপনাদের যিহোবাকে নিয়ে আমরা মাথা ঘামাই না। সে আপনাদের নিজস্ব ব্যাপার কিন্তু আপনি এবং আপনার বন্ধু অহিকম স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে আমাদের জন্য যা করেছেন, তার স্বীকৃতি আমরা অবশ্যই দেব। আমরা জানি এজন্য আপনাদে একবার মৃত্যুদণ্ডের সম্মুখীন হতে হয়েছে, এবং একাধিকবার কারাবাসও করতে হয়েছে। কিন্তু তবু আপনি শেষ পর্যন্ত আমাদের সঙ্গেই ছিলেন। আমরা সমস্ত খবরই রাখি। কিছু দিন আগে বাবিলে নির্বাসিত ইহুদীদের মধ্যে যখন একটা বিদ্রোহের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল, তখন বাবিলরাজের প্রতি অনুগত হয়ে চলবার জন্য নির্দেশ দিয়ে আপনিই কি তাদের কাছে একটি লিপি প্রেরণ করেন নি? আমরা কোন কথাই ভুলে যাই নি।

চিঠির প্রসঙ্গটা উঠতেই যেরেমিয়া একটু অস্বস্তি বোধ করলেন। এই চিঠিটার ব্যাপারে অনেক কথাই শুনতে হয়েছে

: এ কিন্তু আপনারা ভুল করেছেন। আমি যা কিছু করেছি জাতির মঙ্গলের জন্যই করেছি, আপনাদের সাহায্যের জন্য নয়।

: তাই নাকি? ভারী মজার কথা তো। আপনার জাতির মঙ্গলের জন্য আপনি দেশকে শত্রুর হাতে তুলে দিবেন? ইহুদীদের যিহোবার এইটাই কি বিধান নাকি? কিন্তু আপনারা যদি আমার দেশের নাগরিক হতেন, আমি একটু খোলাখুলি ভাবেই বলছি, তবে আপনারা যা করেছেন, তার জন্য আপনাদের অবশ্যই প্রাণদণ্ডের ব্যবস্থা হত। কিন্তু যেহেতু আপনি শত্রুপক্ষের লোক, সেহেতু আপনার সেই কাজটাই আমাদের কাছে পুরস্কৃত হবার যোগ্য বলেই বিবেচিত হবে। মহামহিম বাবিলরাজ জানাচ্ছেন, আপনি যদি বাবিলে গিয়ে বসবাস করতে সম্মত থাকেন, তবে তিনি খুবই সুখী হবেন। আপনি সম্মানিত রাজ-অতিথির মর্যাদা নিয়ে সেখানে বাস করতে পারবেন।

: আপনাদের মহামহিম বাবিলরাজ যদি ইচ্ছা করেন, আমাকে স্বচ্ছন্দে বন্দী করে বাবিলে নিয়ে যেতে পারেন। তাতে বাধা দিতে পারি, এমন শক্তি কি আমার আছে? আর আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছা-সম্পর্কে যদি প্রশ্ন করেন, তা হলে আমি বলছি-আমি প্রভুর পথাশ্রয়ী দাস। রাজকীয় সমাদর আমার সহ্য হবে না। সেনাপতি বললেন : আপনার কথা থেকে আমি এইটাই বুঝলাম যে, আপনি বাবিলে যেতে চান না। বেশ তো বলুন, আপনি তবে কি চান? মহামহিম বাবিললাজের পক্ষ থেকে আমি আপনাকে বলছি, আপনি আপনার স্বদেশে যে-পরিমাণ শস্যপ্রসূ জমি চান, আপনাকে তাই বন্ধুসুলভ উপহার দেওয়া হবে।

: বাবিল-সেনাপতি, আপনাদের নিষ্ঠুরতার তুলনা নেই। পৃথিবীর সমস্ত জাতি বিস্ময় ও আতঙ্কে স্তম্ভিত হয়ে আপনাদের এই বিভীষিকাময়ী রক্তাক্ত মূর্তির দিকে তাকিয়ে আছে। আপনারা যিরূশালেমের বুকের মণি আমাদের প্রভুর মন্দিরকে ভস্মসাৎ করেছেন, তার প্রাচীরকে ধ্বংস করে দিয়ে নগরীকে শূন্যতায় নিক্ষেপ করেছেন, নির্দোষ ও অসহায় নাগরিকদের হত্যা করে আপনাদের রক্তপিপাসা চরিতার্থ করেছেন, আর যারা বেঁচে আছে সেই হতভাগ্যদের তাদের মাতৃভূমির বুক থেকে উচ্ছন্ন করে পশুর মত দলে দলে বেঁধে নিয়ে গিয়েছেন। আর আপনাদের মহামহিম বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার নিজের দর্শন সুখের জন্য হতভাগ্য রাজা যেদেকিয়ার দুই চক্ষু উৎপাটিত করেছেন। আর তাতেও নিবৃত্ত না হয়ে এখন আমাকে বন্ধুসুলভ উপহার দিতে এসেছেন। কিন্তু কেন আমার উপরে এই অযাচিত অনুগ্রহ? কি পুরস্কার চাই? দিন তবে, এই মুহূর্তেই আমার প্রাণদণ্ডের আদেশ দিন। দেবেন পুরস্কার? আমার দুর্ভাগা ইহুদী ভাইবোনদের রক্তমাখা আপনাদের ওই কলঙ্কিত হাত থেকে এই পুরস্কারই আমার প্রার্থনীয়। সেনাপতি নেবুজার আদানের চোখে বিদ্যুৎ-তরঙ্গ খেলা করে গেল। কিন্তু মুহূর্তের মধ্যেই তিনি আপনাকে সংযত করে নিয়ে বললেন : যেরেমিয়া, আপনার ধৃষ্টতা অপরিসীম। কিন্তু আমার ধৈর্যও অসীম। আপনার এই প্রার্থনা আমি সানন্দেই পূর্ণ করতাম। আমার স্বদেশ ও স্বজাতির কুৎসাকারী মুখকে চিরতরে বন্ধ করে দিতে আমি একটুও ইতস্ততঃ করতাম না। কিন্তু কি করব, আপনার সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবার অধিকার আমার নেই। তবে আমি আপনার এই আবেদন যথাস্থানে, যথাসময়ে পৌঁছে দেব। কিন্তু আমি ভাবছি এত গর্ব, এত তেজ আর জাতির জন্য এত দরদ এতদিন কোথায় ছিল? যেরেমিয়া, আপনি আমার একটা কথার উত্তর দিন। ইহুদী জাতির সম্পর্কে গত কুড়ি বছর ধরে আপনি এই একই ভবিষ্যদ্বাণী করে আসেন নি কি?

: আপনি যথার্থই বলেছেন। আমি যা ভবিষ্যদ্বাণী করে আসছিলাম, সত্য সত্যই তা ফলেছে। কিন্তু তাই দিয়ে আপনাদের হাতের কলঙ্ক ঢাকা পড়ে না।

: ক্যালদীয় জাতি বীর। শত্রুর রক্ত তার হাতের কলঙ্ক নয়, তা তার মর্যাদাই বৃদ্ধি করে। কিন্তু একটা কথা আপনি জানেন না। মহামহিম বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার আপনার বন্ধু অহিকমের অতীত কার্যকলাপের কথা স্মরণ করে তাঁকেই য়াহুদার রাজপদে, অভিষিক্ত করবেন বলে স্থির করেছিলেন। কিন্তু নগরে প্রবেশ করবার পর জানা গেল তিনি নিহত। অতঃপর তাঁর পুত্র গেদালিয়াকে রাজপদে মনোনীত করা হয়েছে।

: গেদালিয়া? সে কোথায়? বেঁচে আছে তো?

: বেঁচে আছেন বই কি। তিনি এখন মিজপাতে আছেন। তিনি মহামহিম বাবিলরাজের এই অনুগ্রহ গ্রহণ করতে সানন্দে স্বীকৃত হয়েছে। এ বিষয়ে আপনার অভিমত কি?

: এ বিষয়ে আমার অভিমত জিজ্ঞাসা করে আমাকে আর বিদ্রূপ করার প্রয়োজন কি সেনাপতি? আমার লাঞ্ছনার পাত্র কি এখনও নিঃশেষিত হয় নি? আমাকে দয়া করে জানিয়ে দিন আমি কি বন্দী?

যেরেমিয়ার কণ্ঠস্বর শুনে নেবুজার-আদান একটু বিচলিত হয়ে বললেন : যেরেমিয়া, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আপনাকে আঘাত করবার অভিপ্রায় আমার ছিল না। মানুষ মানুষকে চিনবার সুযোগ কতটুকুই বা পায়, কতই না ভুল করে! আপনি মুক্ত। আপনি যেখানে খুশী স্বচ্ছন্দ মনে বিচরণ করুন। যেরেমিয়া পথে বেরিয়ে পড়লেন। বাবিল-সেনাপতির কথাগুলো এখনও বিষাক্ত ছুরির মতই বিদ্ধ করে চলেছে! গত কুড়ি বছর ধরে তিনি বাবিলরাজের সেবা করে এসেছেন, ইহুদী জাতির মনোবল ভেঙ্গে চলেছেন আর বাবিলরাজের দক্ষিণ হস্তকে সবল করে এসেছেন! এ মিথ্যা কথা-জঘন্য মিথ্যা। কিন্তু কই মন তো তবু নিষ্কৃতি পায় না। সন্দেহ, সংশয় থেকে থেকে কাঁটার মতই বাজতে থাকে। তাঁর চিরশত্রু পশহুর যখন দিনের পর দিন এই একই কথা প্রচার করেছে, তখন কই একথা তো তাঁর এতটুকু গায়ে লাগে নি। কিন্তু আজ বাবিল সেনাপতির কথাগুলোকে কিছুতেই গা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারছেন না।

—প্রভু, প্রভু, তুমি কোথায়? তুমি বল, নিজ মুখে বল, সোনার যিরূশালেমকে যারা ধ্বংসের হাতে তুলে দিয়েছে, আমি কি তাদেরই একজন? কিন্তু আমি তার কি জানি? তুমি আমাকে যা বলতে বলেছ, আমি তো শুধু তাই বলেছিলাম। তুমি আমাকে যা করতে বলেছ, আমি তো শুধু তাই করেছিলাম। তবে কেন এই সংশয়, কেন এই অনুশোচনা? প্রভু, তুমি তোমার হাতের প্রদীপটি তুলে ধর, আমি-যে অন্ধকারে!

কিন্তু কই, যেরেমিয়ার প্রভু তো কোন সাড়া দেন না। যেরেমিয়ার প্রভু কি যেরেমিয়াকে ছেড়ে চলে গেলেন? যেরেমিয়া চোখের জলে বুক ভাসান। তবু তাঁকে সান্ত্বনা দেবার জন্য প্রভু তাঁর মাথায় হাত রাখেন না। যেরেমিয়ার চিরদিনের বন্ধু তাঁকে এই সর্বনাশের মাঝখানে বসিয়ে রেখে কোথায় চলে গেলেন?

বিভ্রান্তের মতই ঘুরে ঘুরে মরতে লাগলেন যেরেমিয়া। পথের পর পথ, তার কোন শেষ নেই। কোথায় পৌঁছাবার জন্য তিনি চলেছেন, তার কোন দিশা নেই। রামাহ্ থেকে বিন্নামিন, বিন্নামিন থেকে ঘুরতে ঘুরতে শেষে যিরূশালেমে এসে পৌঁছলেন।

—সেই যিরূশালেম, ইহুদী জাতির গৌরব-সূর্য যেখানে অস্ত গেছে। দেখ তোমার নিজের হাতের কীর্তি দেখ— যেরেমিয়া নিজেকেই নিজে ডেকে বললেন। প্রথমেই জিল্লার কাছে গেলেন। অহিকমের মৃত্যুর পর এই তাঁদের প্রথম দেখা! জিল্লাকে দেখে চমকে উঠলেন। এ কেমন হয়ে গেছে সে? চেনাই যায় না। শুকিয়ে গেছে সেই আনন্দের প্রস্রবণ।

দু’জনে মুখোমুখি বসলেন। সময় কেটে যেতে লাগল; অনেকক্ষণ পর্যন্ত কেউ কোন কথা বলতে পারছিলেন না। শেষ পর্যন্ত যেরেমিয়াই প্রথম নিঃশব্দতা ভঙ্গ করলেন : জিল্লা, ভাল আছ তো?

: এর নাম ভাল থাকা!

: জিল্লা, শুনেছিলাম বাবিলরাজ গেদালিয়াকে য়াহুদার রাজা বলে মনোনীত করেছেন, এ কথা কি সত্য?

জিল্লা দুই হাতে মুখ ঢাকল। মাথা নেড়ে বলল : হ্যাঁ, সত্য।

: তুমি কি এতে সুখী হও নি?

: সুখী? তুমি বলছ কি যেরেমিয়া! আমার কি আর সুখ আছে? তুমি কি জান না যে, আমার গেদালিয়া আর নেই।

এ কেমন কথা! চমকে উঠল যেরেমিয়া

: নেই? কোথায় গেছে গেদালিয়া?

: তাকে হত্যা করেছে।

যেরেমিয়া চেঁচিয়ে উঠলেন

: হত্যা! কে হত্যা করেছে? ক্যালদীয়েরা?

: না, না, ওরা নয়, ওরা নয়। সে আমাদের ইহুদীদেরই একজন। এই রাজকুলেরই এক বংশধর – নেথালিয়ার পুত্র ইসমাইল। গেদালিয়া, তখন মিজপাতে ছিল। সেখান থেকে লোক মারফৎ আমাকে চিঠি পাঠাল। সে চিঠি তুমি শুনবে যেরেমিয়া?

: কোথায় সে চিঠি?

: এই-যে, এই আমার বুকের কাপড়ের তলায়। ওটি প্রায় সময়ই এইখানেই থাকে। আমার গেদালিয়ার শেষ স্মৃতি, ওরই হাতের স্পর্শমাখা! যেরেমিয়া, চিঠি পড়ছি শোন,-”মাগো, ও আমার মা মণি, অনেক দিন তো তুমি আমার জন্য অপেক্ষা করে আছ। বড় কষ্ট হচ্ছে, না? সে কি আমি বুঝি না? সে কষ্ট- যে আমারও। কতদিন তোমার মুখের একটু চুমা খাই না, মা! আর ক’টা দিন অপেক্ষা কর মা। হাতের কাজগুলো একটু গুছিয়ে নিয়ে, আমি এই এলাম বলে। তোমার কাছে এ খবর গিয়ে পৌঁছেছে কিনা জানি না, বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার আমাকে য়াহুদার রাজা বলে মনোনীত করেছে। প্রথমে বাবাকেই ওরা মনোনীত করেছিল, পরে যখন জানল যে, তিনি নেই, তখন তাঁর উত্তরাধিকারী হিসেবে আমাকেই মনোনয়ন করল। আমি জানি না তুমি এটাকে কি ভাবে নেবে, কিন্তু তোমাকে সত্যি করে বলছি মা, আমার একটুও ভাল লাগছে না। এ আমার সহ্য হয় না। তুমি তো জান আমি কি হতে ভালবাসি, কি করতে ভালবাসি, কাদের সঙ্গে চলতে ভালবাসি। আমার কোন কথা কি তোমার কাছে অজানা আছে মা? তুমি তো শুধু মা নও, তুমি-যে আমার বন্ধুও।

—কিন্তু যারা আমার সাথী, যাদের নিয়ে আমার জীবন, তারা সবাই বলছে এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে যেতে। এতেই নাকি ভাল হবে। কিন্তু আমার মন বলছে, এতে কখনও ভাল হতে পারে না। চিন্তার সংঘর্ষে সংঘর্ষে কি করে-যে দিনগুলো কাটল! এমন সময় সঠিক পন্থা নির্দেশ করতে পারত যে,

সেই বন্ধু য়ুসুফ আজ নেই। ওরা তাকে হত্যা করেছে। ক্রীতদাস বিদ্রোহের দিন যে-পাঁচ জন নেতাকে আলোচনার জন্য ডাক দিয়েছিল, সে ছিল তাদের মধ্যে। ওরা বিশ্বাসভঙ্গ করে সেই পাঁচ জনকেই হত্যা করেছিল। সেদিন প্রতিহিংসায় আমার বুক পাথরের মতই কঠিন হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আজ তা ভেঙ্গে জল হয়ে গিয়েছে। কার উপর আর প্রতিহিংসা নেব? বড় আর ছোট সবই-যে গুঁড়িয়ে ধুলো হয়ে মিশে গেছে।

—আমার বন্ধুরা সবাই একবাক্যে বলল, বাবিলরাজের এই প্রস্তাব গ্রহণ কর। শুধু তো তারাই নয়, দলে দলে ইহুদী ভাইয়েরা আমায় এসে অনুরোধ করতে লাগল, এই সুযোগ ফিরিয়ে দিও না। তুমি যদি রাজী না হও, ওরা হয়তো আমাদের উপর পরজাতীয় শাসনকর্তা চাপিয়ে দেবে। তখন আর দুর্গতির অবধি থাকবে না! একবার বাগে পেলে এই ইহুদী-বিদ্বেষী পরজাতীয়েরা ইহুদী জাতিকে আর কোনদিন মাথা তুলতে দেবে না। শেষ পর্যন্ত এত লোকের কথা আমি ঠেলতে পারলাম না। আমার নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমি রাজী হয়ে গেলাম। কিন্তু মনের মধ্যে দ্বন্দ্ব চলতেই লাগল। এখনও চলছে-ভাল করলাম, না, মন্দ করলাম। আর সেই সঙ্গে সঙ্গেই মনে পড়ছে, বন্ধু য়ুসুফ যদি থাকতো, তার কাছ থেকেই আমি সত্যিকারের পথের সন্ধান পেতাম। তার মত জ্ঞানী আমি কাউকেই দেখি নি।

—যে জ্ঞানে, বুদ্ধিতে আমাদের চেয়ে অনেক উঁচু ছিল, আমরা কেউ তার নাগাল পেতাম না। সবাই তার মূল্য বুঝত না। আমি তাকে চিনবার সুযোগ পেয়েছিলাম, তাই মনে তাকে কোনদিন ভুলতে পারব না।”

: য়ুসুফ কে, জিল্লা? আমি তো তাকে চিনতে পারছি না। যেরেমিয়া প্রশ্ন করলেন।

: ক্রীতদাসদের একজন নেতা।

: ক্রীতদাস? একজন ক্রীতদাস-সম্পর্কে এমন করে….

: হ্যাঁ, এমন করে কেউ বলে না। কি-যে কথা, যা কেউ বলে না, এমন অনেক কথা আমার গেদালিয়া বলত। আমি-যে সব বুঝতে পারতাম, তা নয়, কিন্তু আমার শুনতে বড় ভাল লাগত। যেরেমিয়া, চিঠি শেষ হয়ে এসেছে, শেষ ক’টা লাইন শোনো।

—“মা, য়ুসুফের কথা উঠলেই আমি অনেক কথা বলে ফেলি; আমার আর কথা ফুরোতে চায় না। এতে তুমি আবার কিছু মনে কর না তো? কিন্তু তোমার কাছে না বললে কার কাছে বলব? একথা তো সবাই শুনতে চায় না। মা, য়ুসুফ আমাকে অনেক কিছুই নতুন করে দেখতে শিখিয়েছে। সেই দৃষ্টি নিয়েই আমি আমাদের এই ভাঙ্গাচোরা, জীর্ণ আর রক্তমাখা সমাজে বসে আর একটি অপরূপ সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখি, যে-স্বপ্ন একদিন সত্য হয়ে উঠবে। এত দুঃখ, এত ব্যথা, এত অশ্রু, এত রক্ত—তার মাঝখানে বসেও আমি আমার স্বপ্নলোকের স্বাদ-গন্ধ অনুভব করি। এসব কথা শুনলে লোকে পাগল বলে হাসবে, না মা? হাসবে, আমি জানি। তাই তো এসব কথা সবার কাছে বলি না। দু’এক জনের কাছে বলি, তাও কানে কানে বলি। সেই দু’এক জনের মধ্যে একজন তুমি। আজ এখনই উঠতে হচ্ছে। বড় ব্যস্ত। যাই তবে। …আর, আর শোন মা, সারাকে আমার কথা বোলো। আর ওকে দেখো।…”

: সারা? সারা কে, জিল্লা?

: আমাদের একটি ক্রীতদাসী।

: ক্রীতদাসী? শুধু ক্রীতদাস আর ক্রীতদাসী। গেদালিয়া ওদের মধ্যে কি দেখতে পেয়েছে জিল্লা?

: সে তুমি বুঝবে না যেরেমিয়া। আমিই কি বুঝি? আমিও ঠিক বুঝি না। তা ছাড়া গেদালিয়া-যে সারাকে বড় ভালবাসত। কিন্তু সেও তো আজ নেই।

: নেই? কেন, কি হয়েছে তার?

: ক্রীতদাসদের হাঙ্গামার দিনে রাজপ্রাসাদের কাছে তাকে নিহত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কিন্তু গেদালিয়া সে কথা জানত না।

: হুঁ। তারপর, বল জিল্লা, গেদালিয়ার কথা বল।

: বলছি। আমি অপেক্ষা করতে লাগলাম। দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে লাগলাম। কিন্তু যেরেমিয়া, কই, আমার গেদালিয়া তো ফিরে এল না। তার কাজ কি এখনও শেষ হয় না? কত তার কাজ? অবশেষে একদিন মিজপাহ্ থেকে তার এক বন্ধু এসে আমায় সংবাদ দিল, নেথালিয়ার পুত্র ইসমাইল আমার গেদালিয়াকে হত্যা করেছে।

—যেরেমিয়া, আমার কি হয়েছে, আমি কাঁদতে পারি না। তুমি শুনে অবাক হবে, সেদিনও আমি কাঁদি নি। স্তব্ধ হয়ে বসে থেকে প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত সমস্ত শুনলাম। নেথালিয়ার পুত্র ইসমাইল তার দশ জন সঙ্গীসহ গেদালিয়ার কাছে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু তার সম্পর্কে অনেকের মনেই সন্দেহ ছিল। ফারারিয়ার পুত্র যোহানন গেদালিয়াকে ডেকে নিয়ে বলল, আপনি এ কী করছেন? এই হতভাগাদের কক্ষনো জায়গা দেবেন না। আমি বিশ্বস্তসূত্রে জানতে পেরেছি আমোনীয়দের রাজা বালিম আপনাকে হত্যা করবার জন্য ওকে পাঠিয়েছে। আপনি আমাকে শুধু আদেশ করুন, কেউ জানবেও না, কেউ শুনবেও না, আমি ওকে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় দিয়ে দেব।

গেদালিয়া তার উত্তরে বলল, না, আমি তোমার একথা বিশ্বাস করি না। এ দুর্দিনে কোন রিহুদী কি কোন রিহুদীর উপর অস্ত্র তুলতে পারে? আমি তাকে আশ্রয় দিয়েছি। এমন বিশ্বাসভঙ্গের কাজ আমি কখনই করতে পারব না। কিন্তু ফারারিয়ার পুত্র যে-কথা বলেছিল, ঠিকই বলেছিল। একদিন গেদালিয়া আর তার বন্ধুরা সবাই যখন একসঙ্গে খেতে বসেছে, এমন সময় নেথালিয়ার পুত্র ইসমাইল আর তার দশ জন সঙ্গী খোলা তরোয়াল নিয়ে তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। গেদালিয়া আত্মরক্ষা করবার সুযোগটুকুও পেল না। জিল্লা থামল। আবার দু’জন চুপ করে রইল। ওদের সব কথা যেন শেষ হয়ে গিয়েছে

: জিল্লা, ওরা সবাই চলে গেল, আমিই শুধু পড়ে রইলাম। বেঁচে থাকাটাও যে কতবড় শাস্তি হতে পারে, এবার তা বুঝতে পারছি।

: যেরেমিয়া, আমার কথাটা ভেবে দেখেছ?

: তোমার কথা কি না ভেবে পারি? তোমার স্বামী নেই, পুত্র নেই, কেউ নেই। এই শূন্যপুরীতে তুমি কি নিয়ে থাকবে, শুধু মনের আগুনে জ্বলে পুড়ে মরব। চল জিল্লা, তোমাকে এ্যানাথোথে রেখে আসি। সেখানে তোমার আপনজন যারা আছে, তাদের মধ্যে কিছুটা শান্তি যদি পাও।

: না, যেরেমিয়া, না। অহিকম আর গেদালিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এই গৃহ ছেড়ে আমি কোথায় যাব? আমি কোথাও যেতে পারব না।

: এখানে কে তোমাকে দেখাশোনা করবে?

: তুমি তো জান না যেরেমিয়া, আমার কত বন্ধু আজ আমাকে ঘিরে আছে। আমি-যে অহিকম আর গেদালিয়াকে হারিয়ে একেবারে ভেঙ্গে পড়ি নি, সে শুধু তাদের মুখের দিকে চেয়েই। তারাই আজ আমার নয়নের আলো।

: তারা কারা জিল্লা? আমি তো ভেবে পাচ্ছি না। কিছু কিছু নীচ শ্রেণীর লোক ছাড়া যিরূশালেমে আর তো কেউ নেই।

: তুমি ঠিকই বলেছ যেরেমিয়া। এরা ছাড়া এখানে আর আছে কে? পুরানো দিনের দাসদাসী, আর কিছু নিঃসম্বল দরিদ্র লোক। কিন্তু এরাই আজ আশ্রয়, এরাই বন্ধু। অহিকম দু’জন ক্রীতদাসের প্রাণ রক্ষা করতে গিয়ে নিজের প্রাণ দিয়েছে। আর গেদালিয়া ছিল ক্রীতদাসের আপন মানুষ। এরা ছোট মানুষ তাই এরা কিছুই ভুলে যায় না। এরাই আমাকে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। এরাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এদের মধ্যেই আমার অহিকম আর গেদালিয়ার স্মৃতি। এদের ছেড়ে আমি কোথায় যাব?

: এদের আমি তোমার মত করে দেখতে পাই না কেন জিল্লা? সমস্ত মানুষের মাঝখানে থেকেও আমি কত দূরে সরে গেছি। আমি যেন মানুষের ভাষা ভুলে গেছি, তাদের সঙ্গে কথা বলতে পারি না। এ দুস্তর ব্যবধান কেমন করে কাটবে?

: যেরেমিয়া, তুমি শাস্ত্রজ্ঞ, তুমি প্রভুর অনুগৃহীত মানুষ, তুমি জানতে চাইছ আমার কাছে? আমি বিদুষী নই, শাস্ত্রজ্ঞ নই, তবু আমি আমার সহজ বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারি, তুমি প্রভুকে নিয়ে এত বেশী ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলে যে, মানুষ কোনদিনই তোমার চোখে পড়ল না।

: আর আজ তার কঠিন দণ্ড আমাকে বহন করতে হচ্ছে।

অভিশপ্ত হোক সেই দিন, যেদিন আমার মা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন! অভিশপ্ত হোক সেই দিন, যেদিন আমি মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রথম আলোক দেখেছিলাম! কেন আমি জন্মেছিলাম! কেন ওই অগ্নিমুখী অভিশাপ বহন করে আমি এই পৃথিবীতে এসেছিলাম? প্রভু, আমার চিরজীবনের সাথী, এই দুর্দিনে তুমিও আমাকে ছেড়ে চলে গেছ! আম আজ কার দিকে মুখ তুলে তাকাব? কার পায়ের তলায় বসে কাঁদব?

হায় যিরূশালেম, একদিন তুমি জনপূর্ণ নগরী ছিলে। কিন্তু সে আজ শুধু অতীতের স্মৃতি। আজ তোমার পথ নির্জন, আজ তোমার গৃহপ্রাঙ্গণ সুখী নাগরিকদের কলকোলাহলে মুখরিত হয়ে উঠে না। একদিন তুমি জাতিসমূহের মাঝে রাজরানী বলে পরিচিতা ছিলে, আর আজ তুমি ক্রীতদাসী।

সমস্ত পৃথিবী যখন শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকে, এই হতভাগিনী সারা রাত্রি ভর লুটিয়ে পড়ে কাঁদে। আমার চোখেও নিদ্রা নেই, আমি তার সেই কান্না শুনতে পাই। সারা রাত্রি ধরে তার চোখের জল ঝরতে থাকে, সেই সঙ্গে আমার চোখেও জল ঝরে। যেখানেই থাকি, যত দূরেই থাকি, তার সেই কান্না এড়াতে পারি না। সে যেন আমার বুকের মধ্যে বাসা করে আছে।

অয়ি সুন্দরী নগরী, তোমার সেই রূপলাবণ্য আজ কোথায় গেল? তোমার আনন্দ-উজ্জ্বল চোখ দুটি এমন বিষাদ ভারে নত কেন? তোমার সাপিনীর মত কুণ্ডলীকৃত ঘনকুঞ্চিত কেশপাশ আজ আলুথালু হয়ে বাতাসে উড়ছে। তোমার বসনাঞ্চল অমন রক্ত আর কাদা দিয়ে মাখাল কে? তোমার ছিন্ন বসন, বারবার তোমার গা থেকে খসে খসে পড়ছে। সমস্ত জাতির কৌতূহলী দৃষ্টির সম্মুখে তুমি নগ্নতার লজ্জা ঢেকে রাখতে পারছ না।

সুন্দরী যিরূশালেম, কোন্ বর্বর তোমার যৌবনোদ্ধত পরিপুষ্ট তনুকে সুপক্ক দ্রাক্ষার মত মর্দিত করে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে? বায়ুতাড়িত নলখাগড়ার পল্লবের মত তুমি কেঁপে কেঁপে নুয়ে পড়ছ। কার সাহায্যের আশায় তুমি বাহু প্রসারিত করে দিয়েছ? যাদের শক্তি ছিল, বীর্য ছিল, তারা আজ নির্জীব পশুর মতই দেশে দেশে বিতাড়িত হয়ে ফিরছে। আর এতদিন যারা সম্ভ্রম ভরে তোমার দিকে তাকিয়ে থাকত সেই বিদেশীরা আজ তোমাকে ঘিরে ধরে কুৎসিত ইঙ্গিত করছে, হাসাহাসি করছে। পথে চলা পথিকেরা তোমার এই দুর্দশা দেখে হাততালি দিয়ে উঠছে, শিস দিচ্ছে, আর ব্যঙ্গভরে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে বলছে, “কে গো তুমি রূপসী? তুমি কি সেই নগরী যাকে লোকে বলত ‘সৌন্দর্যের রানী’, তুমি কে সেই নগরী যাকে লোকে বলত “জগতের আনন্দ’?”

যিরূশালেমের বিলাপঘর এখনও তেমনি দাঁড়িয়ে আছে, দায়ুদ আর শলোমনের দিনে যেমন করে দাঁড়িয়েছিল। কে জানে কেন, শত্রুরা তাকে ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দেয় নি। প্রভুর অভিশাপে যিরূশালেমের সব গেছে, কিন্তু প্রভু তাদের এই বিলাপঘরটা কেড়ে নেন নি। যুগের পর যুগ ধরে রিহুদীরা এই বিলাপঘরেই বিলাপ করে আসছে। কত যুগের কত চোখের জল আর দীর্ঘশ্বাস এইখানে জমা হয়ে আছে। কিন্তু এই বিলাপঘরের আজ আর কোন প্রয়োজন নেই। যিরূশালেমের পতনের পর মানুষ আর কাঁদবার জন্য এই বিলাপঘরে যায় না। যিরূশালেম আর সমস্ত য়াহুদা রাজ্যই-যে আজ এক বিরাট বিলাপঘরে পরিণত হয়েছে!

কিন্তু এতদিন বাদে এই বিলাপঘরে এমন করে বিলাপ করে কে? দেখ না গো, এ কে? একজন দু’জন করে লোক জমতে লাগল। ওরা বলাবলি করে, তাই তো এ কে? এমন করে কে কাঁদে? কাঁদতে কাঁদতে আমাদের গলা ভেঙ্গে গেছে, আর গলা ওঠে না। চোখের জল ঝরতে ঝরতে নিঃশেষ হয়ে গেছে, আমরা আর কাঁদতে পারি না। কিন্তু এ কে?

শিশু মাকে জিজ্ঞাসা করে : মা গো, ও অমন করে কাঁদে কেন? ওর মা নেই বুঝি?

মা এগিয়ে এসে প্রশ্ন করে : কি গো বুড়ো বাবা, এমন করে বিলাপ করছ কেন? তোমার কি হয়েছে? আহা, তোমার সবই বুঝি গেছে?

যেরেমিয়া তার কথা শুনতে পান না। তাঁর বিলাপ ঊর্ধ্বে উঠতে থাকে। মনে হয় আকাশটা যেন কাঁপছে

: প্রভু, চেয়ে দেখ, দেখ তুমি কি করেছ। তুমি কি অন্ধ? তুমি কি বধির? তুমি উপর থেকে আগুন ঢেলে দিয়েছ, আমাদের হাড় পর্যন্ত জ্বলে উঠেছে। দেখ, অসহায় প্রাচীনেরা মাটির উপরে মৌনতা অবলম্বন করে বসে আছে। তারা মুঠো মুঠো ধুলো তুলে মাথায় মাখছে। আর ওই দিকে চেয়ে দেখ, লাঞ্ছিতা কুমারীরা অবনতমুখী হয়ে মাটির দিকে অশ্রুসজল চোখে চেয়ে আছে। ওরা-যে আজ পরজাতীয় পুরুষদের খেলার সামগ্রী হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ওদের আজ চোখ তুলে তাকাবার সামর্থ্য নেই।

আবার বুক ভেঙ্গে যাচ্ছে, আমার চোখে অশ্রুর প্লাবন দেখা দিয়েছে, আমার দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে। আমার উদরের অস্ত্র আলোড়িত হয়ে উঠেছে, পিত্ত গলে গলে পড়ছে। তবু আমার মৃত্যু নেই।

আমার ভবিষ্যদ্বাণী সফল হয়েছে। য়াহুদা আর যিরূশালেমের বুকে করাল দুর্ভিক্ষ নেমে এসেছে। যেখানে যাই, এই একই দৃশ্য। আমি কোথায় যাব? ঘরে ঘরে মৃত্যুর নিষ্ঠুর পাখা ঝাপটানি। ক্ষুধার জ্বালায় মুমূর্ষু শিশু কাঁদছে। মায়ের প্রাণ ফেটে যায়। কি দেবে ওদের মুখে তুলে? বুকে দুধ নেই, শুকিয়ে গেছে। আপনার শিরা ছিঁড়ে রক্ত ঢেলে দিলে যদি ওর ক্ষুধা মিটত; হয়তো তাও দিত। ক্ষুধার জ্বালায় ধুঁকতে ধুঁকতে শিশু বড় অভিমানে মায়ের বুকে ঢলে পড়ে, মরে পড়ে যায়। আর যিহোবা, তুমি তোমার ঐ উচ্চ সিংহাসনে বসে উদাসীন হয়ে তাই দেখছ? হায় যেরেমিয়ার প্রভু, তুমি কি এতই নিষ্ঠুর? এ দৃশ্য দেখে আমার পাষাণ প্রাণ বিগলিত হয়ে গেল, কিন্তু কই, তুমি তো বিচলিত হলে না?

বিলাপের শব্দ শুনে বিলাপঘরে যারা এসে দাঁড়িয়েছিল, তারা সবাই এবার কেঁদে উঠল। এই দুর্দিনের বুকের ধন হারায় নি এমন কেই বা আছে? এমনি করেই কত মায়ের আঁচল থেকে কত মাণিক খসে পড়ে গেছে।

: রিহুদী জাতির মাথার উপরে, প্রভু, আমি তোমার অভিশাপ নিয়ে নেমেছিলাম। সারা জীবন আমি তোমার বাণী প্রচার করে বেরিয়েছি। তোমার আদেশ বিন্দুমাত্র লঙ্ঘন করি নি। প্রতিটি প্রভাতে তুমি আমাকে ডেকে তুলেছ, বলেছ-যেরেমিয়া, যাও, আমার বাণী ঘোষণা কর। তুমি যেমন বলিয়েছ, তেমনি বলেছি। নিজের বলতে তো আমার কোন কথা ছিল না।

তারপর আমার সেই বাণী যখন সত্য বলে প্রমাণিত হয়ে গেল, আমি চমকে উঠলাম। আমি তো এমন ভাবতে পারি নি। আমি আজ ভয় পেয়েছি। আমি ছুটে পালাতে চাই দূরে-অনেক দূরে, যেখানে লাঞ্ছিতা য়াহুদা আর যিরূশালেমের আর্তকণ্ঠ পৌঁছতে পারবে না। আমি য়াহুদার এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত উন্মাদের মত ছুটে বেরিয়েছি। কিন্তু কোথায় আমার শান্তি? প্রতিটি রিহুদীর চোখের মধ্যে আমি যেন এই নিঃশব্দ অভিযোগ দেখতে পাই-‘যেরেমিয়া, তুমি, তুমিই এজন্য দায়ী। রিহুদী জাতির মাথার উপরে এই অভিশাপ তুমিই টেনে নিয়ে এসেছ। উঃ, তীক্ষ্ণ ছুরির মত সেই দৃষ্টি আমার হৃৎপিণ্ডকে টুকরো টুকরো করে কেটে চলেছে।

এ অভিযোগ কি সত্য? আমি জানি না। প্রভু, তুমিই জান। কিন্তু আজ আমায় এই দুস্তর সংশয়-সমুদ্রে ফেলে কেন তুমি দূরে সরে রইলে? আমি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ দিনগুলো কি তোমার পায়ে উৎসর্গ করে দিই নি? আমি তোমার ভালবাসার জন্য আমার সমস্ত ভালবাসায় জলাঞ্জলি দিয়েছিলাম। সব কিছু ছেড়ে আমি তো শুধু তোমাকেই বেছে নিয়েছিলাম! কিন্তু তবু এই চরম সংকটের মুহূর্তে তুমি তো একবারও আমার দিকে ফিরে চাইছ না? তুমি বল, কোন্ পিতা তার সন্তানকে এমনভাবে নিরাশ্রয় করে চলে যেতে পারে? বল, কোন প্রিয় তার প্রিয়াকে এমন নির্মমভাবে ভুলে যেতে পারে? তবু কথা বলবে না? বল, শুধু একবার বল, সত্য করে বল, বল, তুমি কি সত্য সত্যই আছ, কোনদিন ছিলে? তবে কি তবে কি আমি শুধু এক আকাশ কুসুমের স্বপ্নে এই পৃথিবীর বর্ণে গন্ধে বিচিত্র জীবন্ত কুসুমকে উপেক্ষা করে এসেছি?

: যেরেমিয়া!

অপূর্ব সুর ঝঙ্কার! যেরেমিয়া চমকে উঠলেন : কে, প্রভু? প্রভু, তুমি কি এসেছ? আমি তোমার উপর রাগ করেছিলাম, বড় অভিমান করেছিলাম। তুমি আমার অভিমানের মর্যাদা রক্ষা করেছ। তুমি এসেছ। তবে বল, প্রিয়, তোমার কথা বল।

: আমি তো প্ৰভু নই যেরেমিয়া। আমি মানুষ-সামান্য জিল্লা।

: জিল্লা? তুমি এখানে? এখানে কি করে এলে?

জিল্লা বলল : পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম। তোমার কণ্ঠস্বর শুনে থমকে গেলাম। তুমি তো আমাকে ডাক নি, প্রভুকেই ডাকছিলে। তবু আমি চলে এলাম।

: যাকে আকুল হয়ে ডাকছিলাম সে তো এল না। আর তুমি না ডাকতেই এলে। তবে তোমাকেই জিজ্ঞাসা করি। জিল্লা, আমার একটা কথার উত্তর দাও। তোমার মনে কোনদিন এই প্রশ্ন কি জেগেছে—

: কি প্রশ্ন যেরেমিয়া?

: এই বিশ্বচরাচরের সৃষ্টিকারী, অনাদি অনন্ত সত্তা, যাকে আমরা যিহোবা বলে ভয় করি, ভক্তি করি, ভালবাসি, তিনি সত্য সত্যই আছেন, কোন দিন ছিলেন?

: যেরেমিয়া, ও কথা এখন থাক। তুমি আমার সঙ্গে চল। তোমাকে এখানে ফেলে রেখে যেতে আমার মন সরছে না। আমি এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তোমার বুকফাটা হাহাকার শুনেছি। অকারণে কেন আপনাকে অমন করে কষ্ট দাও? এসো, তুমি এসো আমার সাথে। আমি আমার প্রাণঢালা সেবা দিয়ে তোমার ঐ ক্ষত নিরাময় করে তুলব।

: তুমি আমায় ডাকছ জিল্লা, তোমার ঘরে যেতে? তোমার কথা শুনে আমার চোখ-যে জলে ভরে এল। বহুদিন আগে এমনি করেই কে যেন আমাকে ডেকেছিল। জিল্লা, সে কি তুমি?

: যাকে একদিন ফেলে চলে এসেছিলে, সে তো চিরদিন তোমার জন্য দরজা খুলে বসে আছে।

: না জিল্লা, তুমি যাও, তুমি তোমার ঘরে যাও। আমাকে আর লোভ দেখিও না।

: ছিঃ, আমি তোমাকে লোভ দেখাব! অমন কথা মুখে এনো না। আমি চাই তোমার সেবা করে আমার জীবনের একটা অতৃপ্ত সাধ পূর্ণ করতে। আমার সব হারিয়েও অনেক আছে। তোমার-যে আর কেউ নেই।

: জিল্লা, ক্ষমা কর, আমায় যেতে দাও। তুমি জান না—তুমি জান না—তুমি জান না-

: কি জানি না, কি জানি না যেরেমিয়া?

: এই আমাকে তুমি জান না। তোমার এই নির্মল ভালবাসা গ্রহণ করবার যোগ্যতা আমি হারিয়েছি। আজ আমার মন আমার আয়ত্তের বাইরে। এত দুঃখকষ্টের মধ্যেও যে-শান্তি তুমি খুঁজে পেয়েছ, আমি আর তাকে আবিল করে তুলতে চাই না। আমি আজই চলে যাব। খেনই চলে যাব; বহু দূরে কোথাও চলে যাব।

: না, যেরেমিয়া, তুমি কোথাও যাবে না। তুমি এখানেই থাকবে।

: অসম্ভব। এই অভিশপ্ত নগরীর দিকে আমি ফিরে তাকাতে পারি না। আমিই নাকি সেই অভিশাপ একদিন টেনে নিয়ে এসেছি। জান জিল্লা, সেই যিরূশালেমকে ধ্বংস করে অবশেষে আমার পিছু নিয়েছে। অভিশপ্ত রিহুদী জাতি দেশদেশান্তরে বিতাড়িত হয়ে ফিরছে। আর এই অভিশপ্ত নগরীর অভিশপ্ত আত্মা আমি, আমাকেও দেশে দেশে ছুটে বেড়াতে হবে। শান্তি নেই, কোথাও আমার শান্তি নেই।

অভিশপ্ত হোক সেইদিন, যেদিন আমার মা আমাকে গর্ভে ধারণ করেছিলেন। অভিশপ্ত হোক সেইদিন, যেদিন আমি মাতৃগর্ভ থেকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রথম আলোক দেখেছিলাম। আমার সান্নিধ্যে অভিশাপ, আমার নিঃশ্বাসে অভিশাপ, আমার সংস্পর্শে অভিশাপ। সেইজন্যই আমি আমার একান্ত প্রিয়জন থেকে বহুদূরে সরে থাকতে চাই।

: কে, কে তোমার সেই একান্ত প্রিয়জন যেরেমিয়া?

: তুমি কি তা জান না?

: হয়তো জানি, হয়তো জানি না। আমি তোমার মুখ থেকেই সে কথা শুনতে চাই।

: তুমি আমাকে এমন করে প্রলুব্ধ করো না। আমি যাই, জিল্লা, যাই।

: যেরেমিয়া, শোনো, আমার কথা শোনো-

: না না না।

***

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *