তেরো
কিন্তু সবাই যে যার আপন আপন ক্ষেত্র প্রস্তুত করে চলছিল। যিরূশালেমের এতদিনের ঘুমন্ত ক্রীতদাস সমাজ এই প্রথম গা মোড়ামুড়ি দিয়ে জেগে, উঠেছে। এতদিনের বোবা লোকগুলো এখন কথা বলতে শুরু করেছে। গৃহস্বামী ও গৃহস্বামিনীরা দাসদাসীদের চোখমুখের দিকে তাকিয়ে দুশ্চিন্তা বোধ করেন। কিন্তু সমস্যাটা এখনও ঘরোয়া সমস্যাই আছে, সাধারণ সমস্যায় রূপ পায় নি।
দাহ্য পদার্থ সকলের দৃষ্টির অগোচরে দিনে দিনে স্তূপীকৃত হয়ে উঠেছিল। একটু স্ফুলিঙ্গের অপেক্ষা মাত্র। বিশেষ পরিস্থিতিতে, বিশেষ মুহূর্তে, বিশেষ একটি ঘটনা সেই স্ফুলিঙ্গের কাজ করল। সঙ্গে সঙ্গেই যা জ্বলবার তা জ্বলে উঠল। সমস্ত নগরবাসী চমকে উঠে সেই জ্বলে উঠা আগুনের আলোয় যে-দৃশ্য দেখল, কোন দিন তা তাদের চোখে পড়ে নি।
অহিকমের পুত্র গেদালিয়া, য়ুসুফ আর দু’জন ক্রীতদাস আলাপ করতে করতে পথ দিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ একটা আর্ত চীৎকার শুনে তারা থমকে দাঁড়াল। শব্দটা যেহাজিয়ার বাড়ির দিক থেকে আসছে। পথের ধারেই যেহাজিয়ার বাড়ি। ওরা উৎকর্ণ হয়ে শুনল, কে যেন থেকে থেকে আর্তনাদ করে উঠছে। এমন আশ্চর্য হওয়ার কিছুই নয়। হয়তো গৃহস্বামী বা গৃহস্বামিনী ছেলেমেয়ে বা দাসদাসীদের উপর শাসন করছেন। না, ছেলেমেয়ে নয় তো, কোন বয়স্কা নারীর কণ্ঠস্বর বলেই মনে হচ্ছে। কি-যে মনে হোল গেদালিয়ার, এক ছুটে সে বাড়ির মধ্যে গিয়ে ঢুকে পড়ল। বাকি তিন জন তার পেছন পেছন ছুটল। এ একটা সাধারণ নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। যেহাজিয়া অবাধ্যতার জন্য তার দাসী নামাকে চাবুক মারছে। এক এক ঘা চাবুক পড়ছে, আর নামাহ্ লাফিয়ে চীৎকার করে উঠছে, আর হাউমাউ করে কাঁদছে। এই দৃষ্টান্ত দেখে যাতে সুশিক্ষা লাভ করতে পারে, সেজন্য অন্যান্য দাসদাসীদের সামনে সারি বেঁধে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। নিয়মিতভাবে চাবুক না মারলে দাসদাসীদের শায়েস্তা করা যায় না, যিরূশালেমের ছোট ছেলেটাও এ কথা জানে। গেদালিয়া কি সে কথাটা জানে না? কিন্তু সময়টা কেমন যেন ঘুলিয়ে উঠেছে। এই সামান্য ঘটনাকে সে আজ আর সামান্য বলে মনে করতে পারল না। সে গর্জন করে উঠল, থামুন, আপনি ওকে অমন করে মারবেন না।
যেহাজিয়া চমকে উঠল। চমকে উঠল সবাই। নামার আর্তনাদও থেমে গেল। সে নির্বাক বিস্ময়ে গেদালিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
মুহূর্তের মধ্যে যেহাজিয়ার সংবিৎ ফিরে এল। সে তার উত্তেজিত কণ্ঠ আর এক পর্দা উপরে তুলে প্রতিগর্জন করল : কে তোমরা? কেন তোমরা আমার বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়েছ? বেরোও, বেরিয়ে যাও!
কিন্তু পর মুহূর্তেই তার গলার সুরটা একেবারেই নেমে এল। এতক্ষণে চিনতে পেরেছে : আরে কে ও, লোকপ্রধান অহিকমের পুত্র গেদালিয়া না? তা তোমরা এ সময়ে এখানে কি মনে করে?
: আপনি বেচারাকে এমন করে মারবেন না, আমরা এই কথাটাই আপনাকে বলতে এলাম।
যেহাজিয়া তার জীবনে এমন কথা কোনদিন শোনে নি : এই কথাই বলতে এলে! আমার দাসীকে আমি মারব, তাতে কার কি বলবার থাকতে পারে? তোমরা যখন তোমাদের দাসীদের প্রহার কর, আমি কি তখন কোন কথা বলতে যাই?
: আমরা আমাদের দাসদাসীদের কখনই প্রহার করি না।
: প্রহার কর না? বেশ কর। সেটা তোমাদের খুশী। আর আমি কিন্তু প্রয়োজন মনে করলেই এদের প্রহার করি। এ হোল তোমার নিজের জিনিস, একে তোমার যেমন খুশী ব্যবহার করতে পার। তবে শায়েস্তা যদি করতে চাও, প্রহার করতেই হবে। এ বেটী মার না খেলে কোন কথা শোনে না। এ ওর চিরকালের স্বভাব। সেই জন্যই যে-রোগের যেই দাওয়াই তা প্রয়োগ করতে হয়।
: আহা, একি মানুষ নয়?
: মানুষ, মানুষ তো বটেই। মানুষ বলেই তো এমন অবাধ্যতা! পশু একবার পোষ মানলে তাকে নিয়ে এত বেগ পেতে হয় না। তাকে বেশী মারপিট করবার দরকারও করে না। কিন্তু মানুষ কখনও পোষ মানে না। তাকে শুধু চাবুকের উপর রাখতে হয়। একটু ঢিলে দিয়েছ কি অমনি বিগড়ে যাবে। কিছুদিন ধরে লক্ষ করছি, এদের ভেতরে ভেতরে কি যেন একটা বদমাইসী চলেছে। কথা বললে কেমন তেড়া তেড়া জবাব ছাড়ে। আর সারাদিন নিজেদের মধ্যে কেবল কানাকানি ফিসফিস, কি যেন একটা শয়তানী মতলব আঁটছে। দাঁড়াও, বের করছি তোমাদের বদমাইসী।
যেহাজিয়ার হাতের চাবুক আবার তার কাজ শুরু করল। গেদালিয়া ধৈর্য হারিয়ে ফেলেছিল। কিছু একটা করেই বসত। কিন্তু তার আগেই একটা ঘটনা ঘটে গেল। দাসদাসীদের সারিতে নেমার ১০/১২ বৎসরের অর্ধ-উলঙ্গ ছেলেটা মার অবস্থা দেখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছিল। আবার মার শুরু হতেই সবাইকে চমকে দিয়ে সে এক লাফে সামনে এগিয়ে এল, তারপর যেহাজিয়া যেই হাতটা দিয়ে চাবুক তুলছিল, সেই হাতটা কামড়ে ধরে ঝুলে পড়ল। যন্ত্রণায় যেহাজিয়া চীৎকার করে উঠে ছেলেটাকে আছড়ে ফেলল মাটির উপরে। তারপর লাথির পর লাথি। মা ব্যাকুল হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে পক্ষিণীর মত তাকে ডানা দিয়ে ঘিরে ধরল। যেহাজিয়ার প্রচণ্ড একটা লাথি তার উপরেও পড়ল। মারের নেশায় যেহাজিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তার চেয়েও বেশী শক্তিশালী দুটো হাত প্রবল একটা ঝাঁকুনি দিয়ে তাকে স্থির করে দাঁড় করিয়ে দিল। কে যেন তার হাত থেকে চাবুকটা কেড়ে নিয়ে টুকরো টুকরো করে ভেঙ্গে ফেলল।
এবার যেহাজিয়ার বিস্মিত হবার পালা। সে বিস্ফারিত দৃষ্টিতে চেয়ে দেখল ইতিমধ্যে অনেক লোক জমে গেছে। পথের লোক কৌতূহলী হয়ে এসে ভিড় জমাচ্ছে। তারপর দেখা গেল আর এক দৃশ্য। সে দৃশ্য যিরূশালেম কোনদিন দেখে নি। যেহাজিয়া দেখল চারদিক থেকে লোকের পর লোক আসছে। দাসদাসীরা দল বেঁধে আসছে। কার সংকেতে আসছে? তারা নিঃশব্দে এগিয়ে আসছে। তাদের দৃষ্টিতে ইস্পাতের মত ধার। সেই দৃষ্টিতে কি কথা লেখা ছিল কে জানে, যেহাজিয়া শিউরে উঠল।
তারা আসছেই, আসছেই। সারা নগরের দাসজনতার মুক্ত প্রবাহ যেন উদ্বেল হয়ে যেহাজিয়ার গৃহপ্রাঙ্গণে এসে ভেঙ্গে পড়ছে। প্রাঙ্গণ ভরে গেল, প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে প্রশস্ত উদ্যান ভরে গেল, উদ্যান ছাড়িয়ে রাজপথের উপর লোক জমতে লাগল। নগরবাসীরা অবাক হয়ে দেখল দাসদাসীদের এই নিঃশব্দ সমাবেশ। একটা অনিশ্চিত আশঙ্কায় সকলের মন দুরু দুরু করে উঠল। য়িহুদী আর কনানীয়, ফিলিস্থীয় আর আসীরিয়, ইথিওপীয় ও লিবিয়াবাসী দাসদাসীরা নানা ভাষার, নানা বর্ণের, নানা রঙ্গের নরনারী একই মর্মবেদনা আর আশা- আকাঙ্ক্ষা বুকে নিয়ে পাশাপাশি পা ফেলে এগিয়ে আসছে। এদের এমন করে একই সূত্রে গ্রথিত করে তুলল কে?
আজ আর রাত্রির অন্ধকারের আড়ালে গোপন সভায় নয়, দুঃসাহসী দাসদাসীরা প্রকাশ্য দিবালোকে নগরবাসীদের চক্ষের সম্মুখে যেহাজিয়ার গৃহপ্রাঙ্গণে তাদের সভা করল। আর সেই সভায় প্রকাশ্যভাবে ঘোষণা করা হোল-এরপর থেকে দাসদাসীদের উপর শারীরিক অত্যাচার করা হলে তা নিঃশব্দে সহ্য করা হবে না। এই ঘোষণার কথা শুনে অনেক মালিক বিদ্রূপের হাসি হাসলেন। কিন্তু তাদের সেই হাসির মধ্যে আন্তরিকতা ছিল না।
