সাত
অবরুদ্ধ যিরূশালেম। বাবিলরাজের ক্যালদীয় সৈন্যরা চারদিক ঘেরাও করে বসে আছে। হায় অবরুদ্ধ নগরী। যিরূশালেমের আজ এমন শক্তি নেই যে, দুর্ধর্ষ শত্রুবাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধের ময়দানে প্রকাশ্যে মুখোমুখি হতে পারে, তার সৈন্যদের বীর্য নেই, অস্ত্রে ধার নেই। রথ জীর্ণ, অশ্বশালা শূন্য। লোকে বলে একদিন প্রভুর আশীর্বাদ তাকে অক্ষয় বর্মের মতই ঘিরে রাখত। কিন্তু পাপাসক্ত এই অবাধ্য নগরী প্রভুর বিরাগভাজন হয়েছে। তিনিও আজ তাঁর সন্ত ানদের দিকে মুখ ফিরিয়েছেন। কিছুই নেই, তবে আছে কি? আছে শুধু এক সুউচ্চ প্রাচীর। কিন্তু ঝড়ের পর ঝড়ের তাণ্ডব তার ভিত্তিমূল শিথিল করে দিয়েছে। এবার উত্তর থেকে যে-দুরন্ত মরুঝড় বয়ে এসেছে, তা কি আর তাকে উন্মূলিত না করেই ছাড়বে।
প্রাচীন শাস্ত্রজ্ঞ নাগরিকেরা বলাবলি করেন, দূরদৃষ্ট য়িহুদী জাতির জীবনে শান্তি নেই। যুগের পর যুগ ধরে আমরা শাস্তির আগুনে জ্বলে পুড়ে মরছি কিন্তু কাকেই বা দোষ দেব? সবই-যে আমাদের পাপের ফল। প্রথম পিতা আদমের পদস্খলনের জের আজও আমরা টেনে টেনে চলছি।
জনপ্রিয় কথক পথের মোড়ে বসে প্রাচীন দিনের কাহিনী শোনান। নগরের লোক তাঁর চারদিকে এসে ভিড় জমায়। সবার আগে ক্ষুদে নাগরিকেরা, তাদের আগ্রহ সবচেয়ে বেশী। ওদের চোখে ভয় বা দুশ্চিন্তার ছায়াটুকুও নেই। এই দুর্দিন ওদের জীবনে এক নতুন বৈচিত্র্য এনে দিয়েছে। মনে হয় যেন ছুটি, চারদিকেই শুধু ছুটি। তাই ওরা উৎসাহে চঞ্চল হয়ে উঠেছে। ওদের ধৈর্য বাঁধ মানে না। ওরা অধীর হয়ে বলে : বল বল কথক বাবা, তারপর? তারপর?
: তারপর? বৃদ্ধ কথকের স্তিমিত চোখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। কাহিনীর ধারা এগিয়ে চলে। কথক মাঝে মাঝে তাঁর হাতের তারের যন্ত্রটায় টুং টাং করে শব্দ তোলেন, আর দু’এক কলি গান গেয়ে ওঠেন, গল্প জমে যায়।
বাইরে সশস্ত্র মৃত্যু তার রক্তাক্ত থাবা বাড়িয়ে দিয়ে শিকারের সন্ধান করে ফিরছে। আর সেই উদ্যত থাবার কালো ছায়ার নীচে গল্প-ভাললাগা মানুষগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প শোনে।
তখন আসীরিয়ার রাজা সেনাচেরিবের আদেশে তার্তান আর বর্শারিম আর ববশাকেহ্ লাকিশ থেকে যিরূশালেমের দুয়ারে এসে হানা দিল। এক বিরাট সৈন্যবাহিনী এসে তাঁবু খাটিয়ে বসল। কি চায় তারা? তাদের উদ্দেশ্য জানবার জন্য আর তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনা করবার জন্য রাজা হেজেফিয়ার পক্ষ থেকে রাজপ্রাসাদের অধ্যক্ষ হিলফিয়ার পুত্র এলিয়াকীম, লেখক শেবন আর ইতিহাস-রক্ষক আসফের পুত্র যোয়াহ্ প্রাচীরের বাইরে তাদের সঙ্গে এসে দেখা করলেন। ববশাকেহ্ তাদের যেন দেখেও দেখলেন না। তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন : তোমরা যাও, তোমাদের হেজেফিয়ার কাছে গিয়ে এ কথা বল, রাজাধিরাজ আসীরিয়রাজ সেনাচেরিব তোমার কাছে জানতে চাইছেন—’নির্বোধ হেজেফিয়া, কার উপর তুমি ভরসা করে বসে আছ? আমার হাত থেকে কে তোমাকে রক্ষা করতে পারবে? তুমি বলছ, তুমি যুদ্ধ করতে প্রস্তুত আছ, কিন্তু কার উপর নির্ভর করে তোমার এত সাহস, সেই কথাটিই তুমি আমাকে বল। মূর্খ, তুমি কি ওই থেঁতলে যাওয়ার নলখাগড়ার মত মিসরের উপর ভরসা করে বসে আছ? মিসরের খবর জানতে কি তোমার এখনও বাকী আছে? যে দুর্ভাগা তার উপর নির্ভর করতে যাবে, মিসর তার হাতের মধ্যে বিঁধে বসবে। ফেরাউনের আশ্বাসের উপর যারা নির্ভর করে, তাদের এই দশাই ঘটে থাকে। তাদের কাছ থেকে সাহায্য নিয়ে তোমরা আমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চাইছো! এতই তোমাদের শৌর্যবীর্য? বেশ তো তুমি শুধু একবার বল, আমরা তোমাদের দু’হাজার যুদ্ধাশ্ব দিয়ে সাহায্য করতে প্রস্তুত আছি। কিন্তু তুমি তোমাদের যিহোবার দিব্য করে বল, সেই দু’হাজার অশ্বের আরোহী যোগাবার সামর্থ্য কি তোমাদের আছে? আমার নিম্নতম সেনানীকে পরাজিত করবার শক্তিও তোমার নেই। আর তুমি কার সঙ্গে যুদ্ধ করবার স্পর্ধা করছ, ভেবে দেখেছ একবার?’ তখন হিলফিয়ার পুত্র এলিয়াকীম, লেখক শেবন ও আসফের পুত্র যোয়াহ্ নম্রভাবে ববশাকেকে বললেন : ভদ্র, আমরা মিনতি করি আপনি আমাদের সঙ্গে অরামীয় ভাষায় কথা বলুন। আমরা তা বুঝতেও পারি, বলতেও পারি। আপনারা যদি এ সমস্ত কূটনৈতিক কথাবার্তা হিব্রু ভাষায় বলেন, তাহলে প্রাচীরের উপর যে-নগরবাসীরা এসে জড় হয়েছে, তারা সবাই সব কথাই বুঝতে পারবে।
তাদের এই কথায় ববশাকেহ বিদ্রূপের অট্টহাসি হেসে বললেন : তোমাদের সঙ্গে আবার কূটনৈতিক আলাপ! আমার প্রভু কি শুধু তোমাদের প্রভুর কাছেই বা তোমাদের কাছেই এ সব কথা বলতে পাঠিয়েছেন? আর ওই-যে প্রাণীগুলো যারা তোমাদের সঙ্গে আপনাপন বিষ্ঠা ভোজন করবার জন্য এবং আপনাপন মূত্র পান করবার জন্য প্রাচীরের উপর এসে জমায়েত হয়েছে, তাদের সকলের কাছে এই সমস্ত কথা বলবার জন্য তিনি আমাদের পাঠান নি কি?
এই কথা বলেই ববশাকেহ্ তাদের উদ্দেশে হিব্রু ভাষায় বলতে লাগলেন : রাজাধিরাজ আসীরিয়রাজ যে-কথা তোমাদের কাছে বলে পাঠিয়েছেন, তা তোমরা শোন সবাই। তিনি বলেছেন, হেজেফিয়ার মিথ্যা আশ্বাসে তোমরা ভুলো না, আমার হাত থেকে কাউকে নিস্তার করবার শক্তি তার নেই। আমার এই আঙ্গুলের আঘাতটুকুও সে সহ্য করতে পারবে না। আমি জানি হেজেফিয়া তোমাদের বলবে : যিহোবা আমাদের রক্ষা করবেন। যিহোবা কি কখনও তাঁর নগরীকে শত্রুর হাতে তুলে দিতে পারেন? কিন্তু হেজেফিয়ার কথায় তোমরা কেউ কান দিও না। আমি আসীরিয়রাজ সেনিচেরিব, আমি তোমাদের বলছি, তোমরা সবাই আমার কাছে আত্মসমর্পণ কর। আমি তোমাদের দয়া করব, কাউকে প্রাণে মারব না। তারপর তোমরা নিশ্চিন্ত মনে আপন আপন দ্রাক্ষা ও ডুমুর ফল ভোজন কর আর আপন আপন কূপের জল পান কর।
তারপর যখন সময় হবে, আমি নিজে এসে তোমাদের এক দেশে নিয়ে যাব। সে দেশ শস্য আর দ্রাক্ষার দেশ, তৈলদায়ী জলপাই ও মধুর দেশ। সে দেশে গেলে তোমরা বেঁচে যাবে। মিথ্যাবাদী হেজেফিয়া তোমাদের আশ্বাস দিয়ে বলবে, কোন ভয় নেই, যিহোবা আমাদের অবশ্যই নিস্তার করবেন। কিন্তু তার সেই মিথ্যা আশ্বাসে তোমরা কেউ কান দিও না।
কোন জাতির কোন দেবতা কি তাকে আসীরিয়দের কবল থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে? হামাদ আর অর্পদের দেবতারা সব কোথায় গেল? কোথায় গেল সেফরবইম, হেনা আর ইভার দেবতারা? তারা কি শমরিয়াকে আমার হাত থেকে নিস্তার করতে পেরেছে? পৃথিবীর কোন দেশের কোন দেবতাই আমার আক্রমণকে প্রতিরোধ করতে পারে নি। তোমাদের যিহোবাই বা কি করে যিরূশালেমকে আমার হাত থেকে রক্ষা করতে পারবে?
প্রাচীরের উপর যে-সমস্ত নগরবাসী জড় হয়েছিল, ববশাকেহের মুখের এ সমস্ত কথা শুনে তাদের বুক ফেটে যেতে লাগল। তারা নিঃশব্দ হয়ে শুনল, কেউ কিছু বলল না। রাজার আদেশ ছিল, তোমরা কেউ কিছু বল না, রাজার আদেশ ছিল, তোমরা কেউ কোন কথার উত্তর দিও না।
তখন হিলফিয়ার পুত্র এলিয়াকীম, লেখক শেবন আর ইতিহাস-রক্ষক আসফের পুত্ৰ যোয়াহ্ অবনত মস্তকে নগরের মধ্যে ফিরে এলেন। ক্ষোভে দুঃখে লজ্জায় তাঁরা আপন আপন বস্ত্র ছিঁড়ে রাজা হেজেফিয়ার কাছে এই সমস্ত কথা নিবেদন করলেন।
বৃদ্ধ কথক বসে ছিলেন। বলতে বলতে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর দু’চোখ দিয়ে জল ঝরছে। দু’বাহু ঊর্ধ্বে তুলে তখন তিনি হা হা করে কেঁদে উঠলেন : হা প্রভু, তুমি কি এখনও মুখ ফিরিয়ে থাকবে? ওই সমস্ত পরজাতীয় বিধর্মীরা শক্তিমদে প্রমত্ত হয়ে তোমাকে তুচ্ছ করবে, ব্যঙ্গ করবে, আর অনুপায় হয়ে তাই আমাদের শুনতে হবে।
কথকের সঙ্গে সঙ্গে শ্রোতারাও কাঁদতে লাগল। সবাই আপন বস্ত্র ছিঁড়ল। একদিক থেকে আর একদিক পর্যন্ত কান্নার রোল পড়ে গেল। নির্বোধ শিশুগুলো কোন কথা বুঝল না, তবু তারা ডাক ছেড়ে কেঁদে উঠল। কিন্তু ওকি? হঠাৎ কথকের গলায় সুর বদলে গেল। “ধন্য যিহোবা, ধন্য যিহোবা!” কথকের কণ্ঠে আর তাঁর তারের যন্ত্রে যিহোবার বন্দনা গান বেজে উঠল।
—“ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে প্রভু মন্দিরের বেদীর তলায় ভূলুণ্ঠিত রাজা হেজেফিয়ার দিকে তাকালেন। বিলাপকারী নগরবাসীদের দিকে দৃষ্টিপাত করে প্রভুর করুণার পাত্র উছলে উঠল। আসীরিয়দের ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত তাঁবুগুলো ও উদ্ধত নিশান-দণ্ডের দিকে তাকিয়ে প্রভু তীব্র ক্রোধে গর্জন করে উঠলেন
: “কাকে তুমি ভয় দেখাও? কার বিরুদ্ধে তুমি তোমার দুর্বিনীত কণ্ঠধ্বনি উচ্চগ্রামে তুলছ? আঃ মদগর্বী, ঊর্ধ্বে কার দিকে চেয়ে তুমি চোখ রাঙাও? ইসরায়েলের মহিমময় প্রভুর বিরুদ্ধে তুমি তোমার স্পর্ধা ঘোষণা কর এতই তোমার দুঃসাহস? তোমরা কি শোন নি সৃষ্টির প্রত্যুষে এই আমি স্ব-ইচ্ছায় সমস্ত বিশ্বচরাচর সৃষ্টি করেছিলাম। আর আজ সেই আমারই নির্দেশে তোমরা ধ্বংসের বাহন হয়ে ছুটে চলেছ, সুরম্য নগরী আর শস্য-শ্যামল প্রান্তর তোমাদের পদপ্রান্তে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে চলেছে। কিন্তু তোমরা জান না কার নির্দেশে তোমরা ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছ। তোমরা জান না কার শক্তিতে তোমরা শক্তিমান। সেইজন্যই তোমাদের সমস্ত শক্তি হরণ করে নিলাম। আমি তোমাদের মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেব।
আমি জানি তোমার নিবাস কোথায়। আমি জানি কোন পথে তোমার যাওয়া আসা। যে-পথ দিয়েই যাও, তুমি আমার দৃষ্টি এড়াতে পারবে না। আঃ দম্ভী, আমার নামে তুমি গর্জন করে উঠেছ! তোমার সেই গর্জন আমার কানে এসে পৌঁছেছে। তুমি আমায় ক্ষিপ্ত করে তুলেছ। আমি বঁড়শি দিয়ে তোমার নাকের ডগা বিদ্ধ করব। বলগা এঁটে তোমার মুখের চোয়াল বন্ধ করে দেব। তারপর তুমি যেই পথ দিয়ে এসেছিলে, সেই পথ দিয়ে পশুর মত তোমায় তাড়িয়ে নিয়ে যাব।”
: দেখ, দেখ, প্রভুর কি বিচিত্র লীলা। সেই মুহূর্তেই প্রভুর নবীরা বাণী দিলেন- ভয় নেই, আর ভয় নেই। আসীরিয়রা নগরে ঢুকতে পারবে না। তারা যেই পথ দিয়ে এসেছিল, সেই পথ দিয়েই তাদের ফিরে যেতে হবে। প্রভু নিজেই তাঁর নগর রক্ষা করবেন।
তারপর সেই রাত্রিতেই প্রভুর ধ্বংস-দূত আসীরিয়দের শিবিরের উপর অব্যর্থ আঘাত হানল। আর তারপর সে এক বিচিত্র কাহিনী। পরদিন সূর্যের প্রথম আলো যখন পৃথিবীর বুকে নেমে এলো, তখন সেই আলোয় দেখা গেল আসীরিয়দের শিবির শবদেহে সমাকীর্ণ হয়ে আছে।
আসীরিয়রাজ আতঙ্কে প্রাণ দিয়ে পালিয়ে এলেন নিনেভায়, কিন্তু প্রভুর কালদণ্ড সেখানেও তার পেছন পেছন ছুটে আসছে- অব্যাহতি নেই। নিনেভার দেবমন্দিরে রাজা সেনাচেরিব তাঁর দেবতার পুজো দিচ্ছিলেন। এমন সময় প্রভুর ইঙ্গিত রাজার দুই পুত্র এড্রায়েলেক ও শারেজের পেছন থেকে তরোয়ালের আঘাতে তাঁকে হত্যা করল। এ সংবাদ যখন যিরূশালেমে গিয়ে পৌঁছল, সমস্ত নগরে আনন্দধ্বনি উঠল-ধন্য প্রভু, তুমিই নিস্তারকর্তা।
‘ধন্য ধন্য মঙ্গলময় যিহোবা’—কথক দু’হাত তুলে আনন্দধ্বনি তুললেন। আর শ্রোতারা শিশু থেকে বৃদ্ধ পর্যন্ত সবাই সমস্বরে সাড়া দিল-ধন্য ধন্য মঙ্গলময় যিহোবা।
কথক আবেগে গান গেয়ে উঠলেন। গান গাইলেন কি কাঁদলেন ঠিক বোঝা গেল না। –প্রভু, প্রভু, প্রভু, তুমি চিরকাল আমাদের শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে এসেছ। আজও এই সংকটে আমাদের দিকে ফিরে তাকাও। হে প্ৰভু, তোমার অপ্রসন্ন মুখ প্রসন্ন হোক, এই দুঃসময়ে তুমি তোমার বরাভয়দানকারী দক্ষিণ হস্ত প্রসারিত কর।
মন্দিরপ্রাঙ্গণে বলির পশুর রক্তের বন্যা বয়ে চলেছে। দলে দলে পশু আসছে, আর তারা অপ্রসন্ন প্রভুর মুখে হাসি ফোটাবার জন্য যূপকাষ্ঠে প্রাণ দিয়ে চলেছে। মন্দিরে বিরাম নেই, অষ্টপ্রহরব্যাপী পুজো চলেছে। স্বয়ং রানী প্রতিদিন পুজোর অর্ঘ্য সাজিয়ে নিয়ে আসছেন, আর তাঁর পেছন পেছন দাসদাসীরা ভারে ভারে সেই নৈবেদ্য বহন করে মিছিল করে আসছে। নগরবাসীরাও সবাই যে যার সাধ্যমত পুজো দিয়ে চলেছে। প্রভু কি এতেও তুষ্ট হবেন না?
পাড়ায় পাড়ায় খাদ্যাভাব শুরু হয়ে গিয়েছে। কাজ নেই-নিঃস্ব শ্রমজীবীরা কাজ খুঁজে খুঁজে বেড়ায়। এ দুর্দিনে কাজ করাবে কে? নগরের সঙ্গে পল্লীর সংযোগ কেটে গিয়েছে, ব্যবসা-পত্র, দোকান-পাট অচল। অভাব সমাজের তলদেশ থেকে স্তরের পর স্তর আক্রমণ করতে করতে ক্রমশঃই উপরের দিকে উঠে আসছে। ঘরে খাবার নেই, উনুনে ধোঁয়া ওঠে না; গরীবের ঘরে যেটুকু সঞ্চয়, সবই নিঃশেষিত। ক্ষুধার্ত শিশুগুলো ক্ষুধার জ্বালায় ককিয়ে ককিয়ে কাঁদছে। অনুপায় গৃহিণীরা মনের ক্ষোভে চুল ছিঁড়ছে। এ ভাবে কত দিন যাবে? আক্রমণের সংবাদ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সাহায্য প্রার্থনা করে মিসরে দূত পাঠানো হয়েছিল। কতদিন হয়ে গেল, আজ পর্যন্ত কোন সাড়া পাওয়া যায় নি। উৎসুক দৃষ্টিতে সবাই মিসরের দিকে তাকিয়ে আছে, যেমন করে ব্যাকুল কৃষক ঊর্ধ্বমুখী হয়ে তাকিয়ে থাকে বর্ষণহীন মেঘের দিকে। বিদ্রূপের ভঙ্গীতে মেঘ ভেসে চলে যায়, আর কৃষক হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে। মিসরের দিকে চেয়ে চেয়ে নগরবাসীদের চোখ ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। এমন করে মানুষ কতদিন আর অপেক্ষা করে থাকতে পারে?
তবু হঠাৎ একদিন অবরুদ্ধ নগরীর মাঝে আনন্দধ্বনি উঠল। ঐ আসছে, আসছে! নগরবাসীরা উল্লসিত হয়ে প্রাচীরের উপর উঠে ব্যগ্র দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। ঠিকই তো, ওই দক্ষিণ দিকে বহুদূরে ধূলি উড়ছে দেখা যাচ্ছে। একদল লোক এগিয়ে আসছে সন্দেহ নেই। মিসরের সৈন্য ছাড়া আর কারাই বা এখন আসবে? মৃতের বুকে যেন প্রাণ সঞ্চার হোল। এতদিন পর নগরবাসীদের মুখে হাসি ফুটছে। ওরা হাসল, নাচল, গান গাইল, আর যিহোবার নামে জয়ধ্বনি দিল। আর সেই ধ্বনি শুনে আসীরিয়রা সচকিত হয়ে উঠল। তাদের শিবিরে প্রস্তুতির সংকেত স্বরূপ মুহুর্মুহু রণশিঙ্গা বাজতে লাগল। কিন্তু একটু বাদে সকলেরই ভুল ভেঙ্গে গেল। হা অদৃষ্ট! কোথায় মিসরীয় সৈন্য? একদল আরব বণিকের বিরাট এক কাফেলা যিরূশালেমকে বাঁয়ে রেখে ইয়েমেনের দিকে চলে গেল। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত উত্তাপ জমে হিম হয়ে গেল। আসীরিয়রা প্রাণ খুলে হাসল।
প্রেরিত পুরুষ যেরেমিয়ার বাণী পথে পথে ঘোষিত হয়ে চলেছে, তার বিরাম নেই। এ বাণী বড় তিক্ত, বড় নির্মম : হায় মূর্খের দল, কোন্ আশায় মিসরের দিকে তাকিয়ে আছ? বন্ধ্যা গরুর বাঁট থেকে দুধের আশা কর তোমরা? মিসর কবে তোমার বন্ধু ছিল? ফেরাউন বিষাক্ত সর্পের মতই তোমার চির শত্রু। হায় দুর্দৈব, প্রাণের আশায় সেই সাপকেই তুমি আলিঙ্গন করে জড়িয়ে ধরতে চাও। কিন্তু ভুলে যেও না তার চুম্বনে বিষ।
—তোমাদের স্মৃতিশক্তি কি এতই ক্ষীণ? এই সেদিনের কথা তোমরা এখনই ভুলে গেলে যে, মিসরের ফেরাউন নেকোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েই রাজা যিহোয়াকীমের পিতা পুণ্যাত্মা রাজা যোশিয়াকে রণক্ষেত্র মৃত্যুবরণ করতে হয়েছিল। আহা, সেদিন কি শোকের দিন! রাজ-অনুচরেরা রাজার মৃতদেহ রথে করে মেগাড্ডার রণক্ষেত্র থেকে যিরূশালেমে নিয়ে এল। নগরবাসীর হাহাকার ধ্বনির মধ্যে তাঁকে রাজকীয় সমাধি ভূমিতে সমাধিস্থ করা হোল। তারপর নগরবাসীরা রাজা যোশিয়ার পুত্র যিহোয়াহাজকে রাজপদে অভিষিক্ত করল। কিন্তু মাত্র তিন মাস। মাত্র তিন মাস বাদেই মিসরের ফেরাউন নেকো সৈন্যদল যিরূশালেমে এসে প্রবেশ করল। আর তারা রাজা যিহোয়াহাজকে সিংহাসনচ্যুত করে রাজা যোশিয়ার অপর পুত্র ইলিয়াকীমকে রাজা বানাল। সেই ইলিয়াকীমই কি বর্তমান রাজা যিহোয়াকীম নয়? মিসরীয়েরাই কি তার পৈতৃক নাম কেড়ে নিয়ে আপনাদের দেওয়া যিহোয়াকিম নাম তার উপর চাপিয়ে দেয় নি? তারপর সিংহাসনচ্যুত যিহোয়াহাজকে তারা বন্দী করে মিসরে নিয়ে গেল, আর সেখানে সেই পরজাতীয়দের মধ্যে তার শোচনীয় জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটল।
—এ সমস্ত ইতিহাস সবই কি তোমরা ভুলে গিয়েছ? তারপর ফেরাউন নেকো যিরূশালেমকে আপনার পদানত করে তার উপর বার্ষিক একশত তালেস্ত রৌপ্য ও এক তালেও স্বর্ণ রাজকর ধার্য করল। রাজা যিহোয়াকীম সেই আদেশ শিরোধার্য করে নাগরিকদের মাথার উপর গুরুভার-কর চাপিয়ে দিয়ে ফেরাউন নেকোর ক্ষুধার গহ্বর পূর্ণ করে চললেন। তোমরা মনে মনে আশা করছ, তোমাদের এই বিবাদের সময় মিসর রক্ষাকর্তা হয়ে তোমাদের সামনে এসে দাঁড়াবে? বৃথা আশা। চেয়ে দেখ বাবিলরাজ নেবুকাডনাজারের রণোন্মাদ সৈন্যবাহিনীর গর্জন শুনে মিসর আজ বায়ুতাড়িত নলখাগড়ার মতই কেঁপে কেঁপে নুয়ে পড়ছে। শ্রোতারা ব্যাকুল হয়ে প্রশ্ন করে : নবী, বলুন কি করে আমরা এই বিপদ থেকে রক্ষা পেতে পারি?
নবী যেরেমিয়া উত্তর দেন : কেউ তোমাদের রক্ষা করতে পারবে না। যিহোবার বিধানের বিরুদ্ধে কে দাঁড়াতে পারে? নগর অধিকৃত হবে। কঠিন দুঃখের মধ্য দিয়ে পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে। তোমরা দেখতে পাচ্ছ না, কিন্তু আমি দেখতে পাচ্ছি, স্বয়ং যিহোবা ক্যালদীয়দের পরিচালিত করছেন। শ্রোতারা হাহাকার করে উঠে
: নবী, আপনি প্রভুর মানুষ, প্রভু আপনার সঙ্গে কথা বলেন। আমাদের সকলের হয়ে আপনি প্রভুর কাছে ক্ষমা ভিক্ষা করুন। আপনি প্রভুর অনুগ্রহের পাত্র, প্রভু আপনার কথা শুনবেন।
: না। প্রভুর বিধান অলঙ্ঘ্য। ক্ষমা নেই। সকল প্রার্থনা ব্যর্থ হবে।
