অভিশপ্ত নগরী – ১২

বারো

যিরূশালেমে মিসরপন্থী ও বাবিলপন্থীদের মধ্যে একটা ঠোকাঠুকি ক্রমশঃই বেড়ে চলেছে। নগরের রাজনৈতিক জীবন অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত। শুধু ভেতরে ভেতরেই নয়, ঘরে বাইরে, পথে ঘাটে, সর্বত্র এ নিয়ে বাকবিতণ্ডা চলে। মন্দিরের একটি ক্ষুদ্র অংশ এতদিন ইতস্ততঃ করছিল; অবশেষে তারাও তখন সোজাসুজি মিসরের পক্ষে এসে দাঁড়াল। মন্দিরের অধ্যক্ষ থেকে শুরু করে সাধারণ সেবক পর্যন্ত এক সুরে কথা বলতে লাগল। শোনা গেল, রাজার মাথা ডিঙ্গিয়ে মন্দির-কর্তৃপক্ষ ও ফেরাউনের মধ্যে নাকি গোপন বার্তা বিনিময় চলেছে।

মন্দির-কর্তৃপক্ষ অধ্যক্ষদের মধ্যে অধিকাংশকেই সপক্ষে টানতে পেরেছেন। বংশমর্যাদায় কুলীন ও অর্থশক্তিতে হীন একদল অধ্যক্ষকে কাঞ্চন-মূল্যে কিনে নেওয়া মন্দিরের পক্ষে বিশেষ কঠিন কাজ ছিল না। এরা সোনার গন্ধে উন্মুখ হয়ে মন্দিরের চারদিকে ঘুরে বেড়াত।

রাজা যেদেকিয়া দুর্বলচিত্ত লোক। স্বাধীন বিচারবুদ্ধি প্রয়োগ করবার ক্ষমতা তাঁর ছিল না। বাতাসের জোর যখন যেদিকে বেশী থাকত সেই দিকেই নুয়ে পড়তেন।

নগরের লোকপ্রধানেরা মিসরের ভরসায় বাবিলের বিরুদ্ধে মাথা তোলবার মত বিপজ্জনক ঝুঁকি নেবার পক্ষপাতী ছিলেন না। কিন্তু রাজনীতির কূটচক্রে তাঁদের স্থান কোথায়? সাধারণ নাগরিকগণ দিশাহারা। যে যেমন বোঝে, সে তেমন বলে। আর তাদের বলাবলিরই বা দাম কি।

কিন্তু একটা দুঃসাহসী মানুষের মুখকে কেউ ঠেকিয়ে রাখতে পারে না। রাজা যিহোয়াকীমের আমল থেকে বর্তমান আমল পর্যন্ত রাজশক্তি ও মন্দিরের বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ অবিরাম বিষোদ্‌গার করে আসছে। এই অপ্রিয়বাদী মুখটাকে বন্ধ করে দেবার জন্য চেষ্টা বড় কম হয় নি। কিন্তু সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছে। তাঁর প্রতিপক্ষের সব চেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হয়েছে এই যে, নগরের মানুষ নবী যেরেমিয়ার কথা আজও আগ্রহভরে শোনে। মন্ত্রমুগ্ধের মতই শোনে।

রাজা যিহোয়াকীমের আমলে নবী যেরেমিয়ার বিচারের পরিণতি কি দাঁড়িয়েছিল, মন্দির-কর্তৃপক্ষ আজও সে কথা ভোলেন নি। তাই এখনও তাঁর গায়ে হাত দেবার মত সাহস তাঁদের নেই। কিন্তু দিনের পর দিন লোকটার এত স্পর্ধা সহ্য করাও চলে না। তাঁর দীর্ঘকালের প্রতিদ্বন্দ্বী মন্দিরের অধ্যক্ষ আচার্য পশহুর যেরেমিয়ার বিরুদ্ধে নতুন এক অস্ত্র শানিয়ে নিয়ে এলেন। নগরবাসীরা দেখল, দিব্যকান্তি নতুন একজন নবী ময়দানে নেমে এসেছেন। নবী অজুরের পুত্র তরুণ নবী হানানিয়া। মৌমাছির দল নতুন ফোটা ফুলটাকে ঘিরে ধরল। হানানিয়ার তরুণ-সুলভ সতেজ সবল কণ্ঠ বৃদ্ধ যেরেমিয়ার কণ্ঠকে ছাপিয়ে উঠল। মন্দিরপ্রাঙ্গণে তিনি নিয়মিতভাবে তাঁর আসর জমাতে লাগলেন। লোকের ভিড় বেড়ে চলল।

নবী হানানিয়ার কণ্ঠে দেশাত্মবোধ ও মুক্তির বাণী ধ্বনিত হয়ে উঠল। বালিরাজ নেবুকাডনাজারের লুণ্ঠন, অত্যাচার ও হাজার হাজার নগরবাসীকে দাসদাসীরূপে শৃঙ্খলিত করে বেঁধে নিয়ে যাবার সেই নির্মম করুণ কাহিনী যখন তাঁর আবেগময়ী ভাষায় ঝংকৃত হয়ে উঠল, শ্রোতাদের মনে তা গভীরভাবে স্পর্শ করল, তাদের চোখে জল আর আগুন একই সঙ্গে দেখা দিল। শ্রোতাদের মুখের দিকে তাকিয়ে হানানিয়া বুঝতে পারলেন যে, তিনি কৃতকার্য হয়েছেন।

: এই অত্যাচার কি আমরা চিরকালই মুখ বুজে সহ্য করে চলব?

: না, না, আমরা সহ্য করব না, শ্রোতাদের মধ্য থেকে অনেক কণ্ঠের মিলিত ধ্বনি শোনা গেল।

: আমাদের সেই নির্বাসিত ভাই বন্ধুদের স্বদেশে ফিরিয়ে আনবার জন্য আমরা কি আমাদের বুকের রক্ত ঢেলে দিতে প্রস্তুত নই?

: প্রস্তুত, প্রস্তুত।

নবীদের পরস্পর-বিরোধী বাণীর তরঙ্গে তরঙ্গে ঘাত-প্রতিঘাত দেখা দিল। আর তারই মধ্য দিয়ে নবী হানানিয়ার প্রভাব দিন দিন বেড়ে যেতে লাগল। ফলে যেরেমিয়ার ভক্তবৃন্দের মুখ কালো হয়ে উঠল। ক্রমে দু’পক্ষ থেকেই দাবী উঠতে লাগল, আমরা পাশাপাশি দু’জনের কথা শুনতে চাই। হানানিয়ার দল উসকানি দিয়ে চলল। যেরেমিয়ার ভক্তরাও আর এ বিষয়ে পিছিয়ে থাকতে চাইল না। তারাও যেরেমিয়াকে ধরে পীড়াপীড়ি করতে লাগল।

প্রস্তাব শুনে যেরেমিয়া ক্রুদ্ধ হয়ে উঠলেন। এ কি ষাঁড়ের লড়াই পেয়েছ তোমরা? আমি প্রভুর নির্দেশে প্রভুর বাণী প্রচার করে বেড়াই। খেলা দেখান আমার কাজ নয়।

কিন্তু ভক্তের দল যখন ক্ষেপে ওঠে, তাদের হাত এড়ানো কি সহজ কথা? সময় বিশেষে খেলা দেখান ছাড়া উপায় থাকে না। তারা শেষ পর্যন্ত যেরেমিয়াকে মন্দিরপ্রাঙ্গণে এনে দাঁড় করিয়ে ছাড়ল। যিহোবার দুই মুখপাত্র আজ মুখোমুখি হয়ে পরস্পরের সঙ্গে মোকাবিলা করবেন। এ এক নতুন রকমের তামাসা। এমন তামাসা সচরাচর চোখে দেখা যায় না।

যেরেমিয়ার হাতে ছিল একটা কাঠের যোয়াল। এই যোয়ালটি ঊর্ধ্বে তুলে ধরে তিনি বললেন, এই যোয়াল বাবিলের যোয়াল। স্বয়ং প্রভুর নির্দেশে এই যোয়াল তোমাদের কাঁধের উপর চেপে বসেছে। যতদিন প্রভু তাঁর নিজের হাতে এই যোয়াল ভেঙ্গে না দেন, ততদিন একেই তোমাদের বহন করে চলতে হবে। -হা প্রভুর মূর্খ সন্তানগণ, কার কাছ থেকে তোমরা মুক্তির প্রত্যাশা কর? মিসর? তোমরা কি ভুলে গিয়েছ, এই মিসরই একদিন তোমাদের পূর্ব পুরুষদের গলায় দড়ি দিয়ে বেঁধে রেখেছিল? বংশের পর বংশ ধরে ফেরাউনের সেই গুরুভার যোয়ালের চাপে তাদের কাঁধ ক্ষত-বিক্ষত ও রক্ত-পুঁজে দূষিত হয়ে উঠেছিল। সেদিন তারা কি ফেরাউনের হাত থেকে নিষ্কৃতি পাবার জন্য ‘প্রভু পরিত্রাণ কর’, ‘প্রভু পরিত্রাণ কর’ বলে আর্তস্বরে চীৎকার করে কেঁদে মরে নি? সেদিন তাদের এই হাহাকারে বিচলিত হয়ে করুণাময় প্রভু আপন মহিমায় তাদের উদ্ধার সাধন করেছিলেন, কোন্ রিহুদী সন্তান সে কথা জ্ঞাত নয়? আর আজ, হায় প্রভুর আত্মবিস্মৃত সন্তানগণ, তোমরা নেবুকাডনাজারের হাত থেকে পরিত্রাণ পাবার আশায় সেই ফেরাউনের পদ চুম্বন করতে ছুটে চলেছ? ঘৃণা, ঘৃণা, ঘৃণা।

—হায় দুর্ভাগা যিরূশালেমের নির্বোধ রাজা, আর তার অধিকতর নির্বোধ মন্ত্রণাদাতাগণ, দেশকে এ কোন্ সর্বনাশের অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করতে চলেছ তোমরা? বাবিলের বিরুদ্ধে মিসর তোমাকে রক্ষা করবে? সেই মিসর নল খাগড়ার মত একটু বাতাসেই যার কোমর নুয়ে পড়ে। রাজা যিহোয়াকীমের রাজত্বের চতুর্থ বৎসরে ফোরাত্ নদীর তীরে কারকেমিনে নেবুকাডনাজার আর ফেরাউন নেকোর বাহিনীর মধ্যে যে-যুদ্ধ হয়েছিল, তার মধ্য দিয়েই মিসরের শৌর্যবীর্যের পরিচয় পাওয়া যায় না কি?

— মিসর এসেছিল বন্যার মত উত্তাল প্রবাহে, বড় গর্ব করে বলেছিল-আমি বাবিলের বাঁধ ভেঙ্গে সমস্ত পৃথিবী ভাসিয়ে নিয়ে যাব। আমি একের পর এক ধ্বংস করে চলব নগরগুলোকে, আর আমি সমস্ত ভূমিকে পদানত করব। বলেছিল, ধেয়ে চলো অশ্বারোহীরা, গর্জে ওঠো রথী-বৃদ্ধ, ইথিওপীয়ার বীর যোদ্ধাগণ এগিয়ে এসো, এগিয়ে এসো চর্মধারী লিবিয়াবাসী আর ধনুর্ধর লিবিয়াবাসী যোদ্ধারা।

—কিন্তু দেখ, কি হোল তার পরিণতি? সমস্ত পৃথিবীর মানুষ কি তার সাক্ষী নেই? হায় মিসর, বাবিল বাহিনীর প্রথম আঘাতে তোমার ব্যূহ শত খণ্ডে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। তোমার বাসর্বস্ব বীর পুরুষেরা মুহূর্ত দাঁড়াতে সাহস করল না; তারা প্রাণ বাঁচাবার জন্য ঊর্ধ্বশ্বাসে যে যার ঘরের দিকে ছুটল। মেদযুক্ত ষাঁড়ের মত ভাড়াটে সব সৈন্যদল, কোথায় সে সব মিলিয়ে গেল!

—সেদিন প্রভুর বাণী প্রকাশিত হয়েছিল, ‘ঘোষণা করে দাও সারা মিসরে, প্রচার কর মিগডোলে, প্রচার কর নোফে, প্রচার কর তাহপানহেসে-তোমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হও। বাবিলের অব্যর্থ তরবারী রক্ততৃষ্ণায় ছুটে আসছে। হায় মিসরকুমারী, তুমি গিলিয়াদে যাও, তোমার ক্ষতবিক্ষত দেহে ঘায়ের মলম লাগাও। কিন্তু বৃথাই তুমি মলম মাখছ, এ মলমে তোমার ও ঘা সারবে না। তোমার এই লজ্জা কি তুমি ঢাকবে? তোমার আর্তনাদ সমস্ত জাতির কানে গিয়ে পৌঁছেছে।’

—হায় দুর্ভাগ্য, যিরূশালেম, সেই মিসরের দিকে ভরসা করে তুমি তাকিয়ে আছ! যখন দুর্দিন আসবে, জেনো, মিসর তোমার দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে থাকবে, একটি আঙ্গুল তুলেও তোমাকে সাহায্য করবে না। একটি আঙ্গুল তুলেও সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে না। সে কি করবে, কি করতে পারে সে, সে যে নিজেই বাবিলের ভয়ে কাঁপছে! শুধু মিসর কেন, তোমার সমস্ত প্রতিবেশী জাতিগুলো যদি তোমার পক্ষে দাঁড়ায়, তবু তারা বাবিলের এই যোয়াল ভাঙ্গতে পারবে না।

নবী যেরেমিয়া আবার সেই যোয়াল ঊর্ধ্বে তুলে ধরে বললেন : যেদিন প্রভুর আদেশ হবে, সেই দিনই এই যোয়াল ভাঙ্গবে। তার আগে একে ভাঙ্গতে পারে, এমন শক্তি কারু নেই।

নগরবাসীরা ভয়ার্ত চিত্তে স্তব্ধ হয়ে তাঁর কথা শুনছিল। যেরেমিয়া বৃদ্ধ হয়েছেন, কণ্ঠস্বরের সেই উচ্চতা নেই, মাঝে মাঝে ভেঙ্গে পড়ে, মাঝে মাঝে কেঁপে উঠে, কিন্তু তাঁর কথার যাদু এখনও নিঃশেষ হয়ে যায় নি। লোকেরা পরস্পর বলাবলি করছিল, ঠিকই তো কথা। নবী যেরেমিয়া যে-কথা বললেন, তা কে অস্বীকার করতে পারবে? মিসরের উপর ভরসা করে আমরা অনেক ঠকেছি। নবী হানানিয়া শ্রোতাদের মনোভাব মনোযোগের সঙ্গে লক্ষ করছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, স্রোত তাঁর প্রতিকূলে চলে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত দেরী করলে তাকে আর ফেরানো যাবে না। তিনি লম্ফ দিয়ে এগিয়ে এলেন সামনে। তারপর যেরেমিয়ার হাত থেকে কাঠের যোয়াল এক টানে ছিনিয়ে নিয়ে তাকে দুই টুকরা করে ভেঙ্গে ফেললেন : এই-যে আমি ভেঙ্গে ফেললাম বাবিলের যোয়াল। প্রভুর আদেশ হয়েছে, তাই প্রভু আমার হাত দিয়েই এই চিহ্ন দেখালেন। শ্রোতারা এরকম নাটকীয় ঘটনার জন্য মোটেই প্রস্তুত ছিল না। ঘটনার অভিনবত্ব তাদের চমৎকৃত করে দিল। পালাটা এবার কিন্তু বেশ জমে উঠল। মন্দিরের লোকেরা উচ্চকণ্ঠে উল্লাস ধ্বনি করল। কিছু বুঝে, কিছু না বুঝে শ্রোতাদের একটা অংশ তাদের অনুসরণ করল।

যেরেমিয়া প্রথমে হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছিলেন। এরকম একটা ঘটনা যে ঘটতে পারে তা তিনি ভাবতেই পারেন নি। ক্রোধে আত্মহারা হয়ে ঊর্ধ্বে তর্জনী করে তিনি চীৎকার করে উঠলেন, কাঠের যোয়াল তুমি ভাঙ্গলে, কিন্তু তার পরিবর্তে লোহার যোয়াল চেপে বসল। মিথ্যাবাদী হানানিয়া, প্রভুর নাম করে যে-মিথ্যা তুমি ঘোষণা করলে, সেজন্য প্রভুর অভিসম্পাত বজ্র হয়ে তোমার মাথায় ভেঙ্গে পড়বে। তাঁর হাত থেকে কেউ তোমাকে রক্ষা করতে পারবে না।

হানানিয়া বিদ্রূপের হাসি হেসে বললেন, তোমরা এই উন্মাদের প্রলাপ শুনে বিচলিত হোয়ো না। এ বৃদ্ধ যদি সত্য সত্যই প্রভুর মানুষ হত, তা হলে যখন আমি তাঁর উপরে হস্তক্ষেপ করলাম, সেই মুহূর্তেই আমার এই হাত পঙ্গু হয়ে যেতো। আর যিহোবার অভিশাপ আকাশ থেকে বজ্র হয়ে আমার মাথার উপর ভেঙ্গে পড়ত।

যেরেমিয়ার ভক্তরা আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকাল। নীল, নির্মেঘ আকাশ, বজ্র দূরে থাক, একটু মেঘ-গর্জনও শোনা গেল না। ভক্তরা মনঃক্ষুণ্ণ হয়ে পড়ল। শ্রোতাদের এক ভাগ যেরেমিয়ার দিকে, আর এক ভাগ হানানিয়ার দিকে—এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছে। হানানিয়ার পক্ষের লোকেরা হানানিয়ার নাম করে জয়ধ্বনি করল। যেরেমিয়ার পক্ষের লোকেদের একটু যেন নিস্তেজ দেখা গেল। তাঁর পক্ষ থেকে কোন ধ্বনি উঠল না। আশাতীত সাফল্যে মন্দির-কর্তৃপক্ষ আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠলেন।

আচার্য পশহুরের তূণীরে নবী হানানিয়া একটি শক্তিশালী অস্ত্র বলে প্রমাণিত হলেন। কিন্তু চিরশত্রু যেরেমিয়ার বিরুদ্ধে শুধু এই অস্ত্রটিই নয়, আরও অস্ত্র তাঁর হাতে মজুত ছিল। এবার তিনি তাঁর সেই অস্ত্র ছাড়লেন। কিছুদিন আগে বাবিল থেকে লোক মারফৎ এক লিপি এসেছে প্রধান যাজক ম্যাসাইয়ার পুত্র জেফানিয়ার কাছে। নেহেলামবাসী-শেমায়া বাবিলে নির্বাসিত য়িহুদীদের মধ্যে একজন বিশিষ্ট ব্যক্তি। লিপিটি তিনিই পাঠিয়েছেন। বর্তমান অবস্থায় এই লিপি খুবই কাজে লাগবে, সে বিষয়ে পশহুরের মনে কোনই সন্দেহ ছিল না। লিপিটি নিম্নোক্তরূপ :

—‘প্রভুর ইচ্ছায় প্রধান যাজক যিহোইয়াদের স্থলে আপনি প্রধান যাজকের পদে অভিষিক্ত হয়েছেন। এ সংবাদে আমরা, বাবিলে নির্বাসিত য়িহুদীরা সবাই আনন্দিত। সম্প্রতি যিরূশালেম থেকে যে-সকল সংবাদ পাচ্ছি, তা থেকে আমরা জানতে পারলাম এনাথোথের অধিবাসী হিলফিয়ার পুত্র যেরোমিয়া তার চিরাচরিত রীতি অনুসারে যিহোবার নামে স্ব-পরিকল্পিত বাণী প্রচার করে বেড়াচ্ছে। এই উন্মাদকে খোঁয়াড়ে বা কারাগারে আবদ্ধ করে রাখা আপনাদেরই দায়িত্ব। আপনি তার সম্পর্কে এখনও উপযুক্ত ব্যবস্থা করছেন না কেন? তার এই অপপ্রচারকারী দুষ্ট মুখটাকে বন্ধ করবার মত শক্তি কি যিরূশালেমে কারও নেই? সে কি এইভাবেই অবাধে য়িহুদী জাতির মধ্যে নির্বীর্যতা ও হতাশার মনোভাব সৃষ্টি করে চলবে? আপনারা হয়তো জানেন না, সে কিছুদিন হয় এখানকার নির্বাসিত য়িহুদীদের উদ্দেশ করে এক দীর্ঘ লিপি প্রেরণ করেছে। সেই লিপির মধ্য দিয়ে সে আমাদের উপদেশ দিয়ে পাঠিয়েছে যে, দীর্ঘকাল ধরে আমাদের এ দেশে নির্বাসিত জীবন যাপন করতে হবে। অতএব আমরা যেন এখানে স্থায়ী ভাবে বাড়িঘর তুলে বসবাস করতে থাকি এবং চাষবাস করে শান্তিতে সংসার নির্বাহ করি। এই ব্যক্তির ধৃষ্টতা আমাদের ধৈর্যের সীমানা ছাড়িয়ে গিয়েছে। আমাদের সন্দেহ হয় সে নবীর ছদ্মবেশের অন্তরালে বাবিলরাজের ভাড়াটে প্রচারক মাত্র।

—রাব্বী, আমরা এমনিতেই যথেষ্ট দুঃখকষ্টে আছি। তার উপর আমাদের এই জ্বালাকর ক্ষতের উপরে যেন এই ধরনের উপদেশের লবণ প্রয়োগ করা না হয়। একথা বলাই বাহুল্য, এই লিপি এখানকার য়িহুদীদের মধ্যে প্রবল অসন্তোষ ও বিক্ষোভের সঞ্চার করেছে। তবে আমরা বিশ্বাস করি এই লিপি যিরূশালেমবাসী য়িহুদী ভাইদের মনোভাবকে প্রতিফলিত করে না। এ বিষয়েও আমাদের মনে কোনই সন্দেহ নেই যে, আপনারাও আমাদের মতই পুনর্মিলনের জন্য উৎসুক। প্রভুর কৃপায় সেদিন হয়তো আর বেশী দূরে নয়। নেবুকাডনাজার সর্বশক্তিমান নয় বা অমর হয়ে সে এই পৃথিবীতে আসে নি। সর্বশেষে আমাদের এই বক্তব্য যে, এইজাতীয় লিপি প্রেরণ করে যারা এখানকার য়িহুদী ভাইদের মনে হতাশা ও অবসাদ জাগিয়ে তুলবার চেষ্টা করছে, তাদের এই অপচেষ্টাকে যদি আপনারা কঠিন হস্তে দমন না করেন, তবে আমরা এই কথাই মনে করতে বাধ্য হব যে, আপনারা প্রকারান্তরে তাদের কাজেরই সহায়তা করছেন।’

এই লিপির বিষয়বস্তু নগরবাসীদের আলোচনার কেন্দ্রস্থল হয়ে দাঁড়াল। এই সুযোগে আচার্য পশহুর সুকৌশলে এই কথাটা ছড়িয়ে দিলেন যে, যেরেমিয়া বাবিলের ভাড়াটে প্রচারক। শুধু আজ নয় যিহোয়াকীমের আমল থেকেই তিনি বাবিলের ইঙ্গিতে নিজের দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে কাজ করে আসছেন। অনেকেই একথা বিশ্বাস করল না, কিন্তু কথাটা লোকের মুখে মুখে ফিরতে লাগল। যথাসময়ে এই কথাটা বাবিলে শাখাপল্লব-সমন্বিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ল। আচার্য পশহুর আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে লাগলেন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *