৯. কংগ্রেসের পৈতে-তিলকের নখদাঁতের বদলা
বাটাজোড়ে পৌঁছুতে-না-পৌঁছুতেই সাইকেলে তাকে দেখে লোকজন ছুটে আসছিল। পুরুষকণ্ঠের কান্নার আওয়াজও পায়। তার মানে দত্তবাবু কি লড়াই ফৌত করে দিয়েছেন?
যোগেন কারো দিকে না তাকিয়ে সোজা এগতে থাকে। এই হাঙ্গামার তো নিশ্চয়ই একটা সীমান্ত তৈরি হয়ে গেছে—যোগেন সেই সীমান্তটায় পৌঁছে যেতে চায়। তার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে কী হয়েছে, সে-সব কখন হয়েছে শোনাজানার এখন সময় নেই। ভোট তো আর সারাদিন চলবে না। তার ভোটারদের ভোট দিতে আসার বাধাটা আগে ভাঙতে হবে।
যোগেন যে কারো দিকে না তাকিয়ে, কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে সাঁই সাঁই করে সাইকেল চালিয়ে সোজা নদীর সামনের ঘাটের দিকে গেল তাতেই তার লোকজন বুঝে যায় এবার কিছু হবে। তারা যোগেনের পিছনে-পিছনে দৌড়তে থাকে। যোগেনের ঘামে ভেজা সপসপে পাঞ্জাবিটা দেখে সেই ছুটন্ত ভিড়ের মধ্যে একটা কথা হাওয়ার মত পাক খেয়ে যায়—তাহলে তারা কি যা করা দরকার ছিল তা করেনি? এমন ধাবমান ভিড়ে কোনো প্রশ্নের মীমাংসা হয় না। যে কথা মনে আসে, সেটাই কাজ হয়ে যায়। ভিড়ের দৌড়নোর গতি বেড়ে যায়, প্রায় যোগেনকে ধরেই ফেলে। একজন কেউ চিৎকার করে ওঠে, ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়।’
যোগেন ঠিকই আন্দাজ করেছিল। সরল দত্ত যে লাঠিয়ালদের দিয়ে পাড় দখল করেছিল, তারা তখন তাদের কাজ শেষ হয়ে গেছে ধরে নিয়ে একটু শুয়ে বসেছিল। পাড়ের নীচে নৌকোর ওপরে ছিল বলে তারা দেখতে পায়নি—পাড়ের ওপরে কী ঘটছে। তাদের দলের কেউ-কেউ চলে গিয়ে থাকবে। তাদের ভিতর কোনো উদ্বেগ বা উত্তেজনাই ছিল না। কিন্তু, মানুষের এত উঁচু গলা শুনে তাদের দু-একজন লাফিয়ে পাড়ে উঠে দেখার চেষ্টা করতেই যোগেন ও তার লোকজন হামলে পড়ে। এক-এক ধাক্কায় তারা সরল দত্তের এক-একজন লেঠেলকে পাড় গড়িয়ে জলে ফেলে দেয়। তাদের পেছন-পেছন যোগেনের লোকজন পাড় বেয়ে নৌকোগুলির দিকে ছুটতেই যোগেন সাইকেলটা মাঠের ভিতর ফেলে বরিশাল-gun-এর আওয়াজে চিৎকার করে ওঠে——ভোটারের নৌকা আডকায় কে? নৌকা ধইর্যা বাইচ দাও গাঁওয়ে। একডা ভোটারও য্যান বাদ না যায়।’
যোগেনের লোকজনের তখন আর ঐ নির্দেশের দরকার ছিল না। সরল দত্তের ঐ তিন লেঠেলকে পাড়ের মাথা থেকে এক-এক ধাক্কায় জলে ফেলে দেওয়া মাত্র এই সমাবেশ পেশিতে-পেশিতে জেনে গেছে, কী করতে হবে। দাঙ্গা-হাঙ্গামার সময় একদল আর-এক দলকে মারতেও পারে, জিততেও পারে। কিন্তু হারা দল যদি ঘুরে দাঁড়ায় তাহলে জেতাহারার লড়াই হয়ে যায় বাঁচামরার লড়াই। হারা দল ফিরে এলে মরা পর্যন্ত যাবে বলেই ফিরে আসে। তা ছাড়া এই ভিড় এই অপমানের জন্য তৈরিই ছিল না। যোগেন মণ্ডল দাঁড়িয়েছে বলেই তারা ভোট করেছে পাগলের মত, মাতালের মত। এই একটা লোক নমশুদ্দুর হয়েও যদি সাত-পুরুষের জমিদারের টক্কর নিতে পারে, তাহলে আমরা তার পেছনে খাড়া হতে পারব না? তাদের পার্টি নেই, নিশান নেই, হিল্লিদিল্লিতে তাদের কোনো নেতা নেই, লোক নেই। তাদের শুধু জমিদার আছে—সে হিন্দুই হোক আর মুসলমানই হোক, তাদের শুধু বাপঠাকুরদার ঋণবন্ধকি আছে, তাদের শুধু গর্ভের ছেলের ঘাড়েও ঋণ-চাপানো আছে, তাদের ফলনের ভাগ প্রতি ফলনেই কমে—নদীর ভাঙনের মত। আরে, নমশূদ্রদের কত মানুষই তো বড় অফিসার বড় উকিল হয়েছে। কিন্তু যোগেন মণ্ডলের আগে তো কেউ বলেনি, হ্যাঁ, আমি শুদ্দুর হয়েও বামুন-কায়েত জমিদারদের টক্কর নেব।
চোখের পাতা ফেলতে-না-ফেলতে ঐ চরাচরে একটুকরো জলের দৃশ্যটা বদলে যায়। প্রায় সকলেই জলে, কোনো নৌকোতেই কেউ নেই। কংগ্রেসের নিযুক্ত লেঠেলরা জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ডুবসাঁতার দিয়ে পালাচ্ছে। যোগেনের লোকরা কেউ-কেউ তাদের ধাওয়া করছে আর কেউ-কেউ নৌকোগুলির দিকে সাঁতরে যাচ্ছে। ঐ জলটুকুর মধ্যে শুধুই আলোড়ন। যোগেনের সেই নির্দেশের গর্জন যেন দরকারও ছিল। নইলে সকাল থেকে মার-খাওয়া এই মানুষজন পালটা মারের উত্তেজনায় হয়ত ভোট ভুলে যেত। বা, যাচ্ছে।
আবার চিৎকার করে ওঠে যোগেন—’এই নৌকা নিয়্যাই সব ফেরত-ভোটারগ নিয়া আইস, আরো নৌকা বাহির করো, বাইচের বেগে যাও, বাইচের বেগে যাও।’
যোগেনের লোকজনেরও নৌকো-ডোঙা এদিক-ওদিক লুকনো ছিল হয়ত। দেখতে-দেখতে নদীর জল ভরে ওঠে নৌকোয় আর নৌকোয়—ডোংগা থেকে কুইশ্যা নৌকো। সব নৌকোতেই অনেকগুলি করে বৈঠা। নদীর তো মোটে দুটো মুখ। নৌকোগুলি যেন নদীর দশমুখের দিকে ছুটছে। ‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়।’
যোগেনের লোকজনের সকলেই তো আর পাড় ভেঙে নদীতে ঝাঁপাতে পারেনি। কেউ-কেউ পেছনে ছিল, বুঝতে পারেনি সামনে কী হচ্ছে। কেউ-কেউ পেছিয়ে গেছে, তাদের বয়স একটু বেশি—এতটা মারামারি করে উঠতে পারবে না। কয়েকজন আবার ঘাটের দিকে পেছন ফিরে মাঠ বেয়ে ছুটছে—নানা দিকে। যোগেনের ভোটারদের লুকিয়ে রাখা হয়েছে যে-সব জায়গায়, সেখান থেকে এখন বের করতে।
তাকে ঘিরে যারা ছিল তাদের ওপর যোগেন রাগে ফেটে পড়ে, ‘ভোটের পাট তুইল্যা দিয়্যা তো হরির লুটের আসর বসাইছেন। অদ্ধেকখানি বেলা আর আপনারা সিকি ভোটও কইরব্যার পারেন নাই? ইডা একডা ভোট?’
যোগেনের ঘাম তেলতেলে মুখ, ঘামে ভেজা সপসপে জামা, তার গলার একটা আওয়াজে নৌকোয়-নৌকোয় নদী ভরে ওঠা আর সরল দত্তের মাঝি-লেঠেলদের দু-চারজনের এখনো সাঁতরে পালানো—দেখে, কেউই তার মুখের ওপর কিছু বলতে পারে না। পেছন থেকে কারো একটা উঁচুগলা শোনা যায়—’আরে, জাইনত্যাম যদি ভোটের দাঙ্গায় আর জমির দাঙ্গায় কুনো তফাত নাই তাহাইলে তো অগ মুন্ডুগুল্যা কাইট্যা সাজায়্যা রাইখতাম! কেউ তো কইব, কী করার লাগে।’
যোগেন খুঁজতেও যায় না, কে বলেছে, ‘আহা রে, মনখান জুড়াইয়্যা গেল! এ কী বাল্যবিবাহ? বাবা কইছে তাই বিয়্যায় বসছি, বিয়্যার পর বৌয়ের লগে কী কইরতে হইবে জানি না, বাবা তো কয়্যা দেয় নাই! কতগুলো বাপ লাগে আপনাগ? এক হাট বাপেও যে কুল্যাইবে-পসন্দ হয় না। শুনছি নাকী খুনাখুনি হইছে—কয়জন হইছে খুন?’ জবাব না পেয়ে যোগেন যোগ করে, ‘আমাগ। আমাগ’
খুব পাতলা ও সরু একটা গলায় পেছন থেকে কেউ কিছু বলার চেষ্টা করে, ‘না, ঠিক যথাযথ খুন বা হত্যা কিছু ঘটে নাই। তবে তেমন ঘইটলে তা এক বা দুইডা খুনে শ্যাষ হইত না…’
কথাটা শেষ হওয়ার আগেই মাঠের নানা দিক থেকে লোকজন যোগেনের দিকে আসতে শুরু করে, কেউ-কেউ দৌড়তে-দৌড়তে, কেউ-কেউ হেঁটে—’যোগেন মণ্ডলের জয় জয়।’
তারা যোগেনের কাছাকাছি হতেই যোগেন তাদের বলে ওঠে, ‘আর জয়কার দিব্যার কাম নাই। লাইন লাগান, লাইন লাগান, না হয় তো ভোটের খোঁয়াড়ে ঢুইকব্যার পাইরবেন না। দ্যাহেন গা, উহানে আবার কী কইর্যা থুইছে আপনাগ জমিদার মশাই। লাইন লাগান, লাইন লাগান।’
যোগেন বোঝে, তার কথাটা কেউ ধরতে পারছে না। লাইন কী করে লাগাতে হবে বা ভোটের খোঁয়াড়টা কী? এখন তো আর সব বোঝানোর সময় নেই। এরা কেউই তো এবারের মত করে ভোট কখনো দেয়নি। কিন্তু এখনই যদি ভোটের লাইনে সারি দিয়ে ঢোকা না যায় তাহলে ডুবতে হবে।
হাতের কাছে যে-দুজনকে পায়, তাদের কব্জি ধরে টানতে-টানতে যোগেন একটু দূরে নিয়ে গিয়ে হাত দেড়েক তফাতে পাশাপাশি তাদের দাঁড় করিয়ে দিয়ে দুই হাত ঐ দুজনের মাথার ওপর তুলে চেঁচাতে থাকে—’সারি বান্ধেন, সারি—।’
যোগেন যে খুব ভেবেচিন্তে, ‘লাইন’ বলেছিল আর পরে ভেবেচিন্তেই ‘সারি’ বলেছে- একেবারেই তা নয়। ভোটের জন্যই হয়ত ‘লাইন’ কথাটি জিভে এসে গেছে আর ‘সারি’ কথাটি এসেছে অভ্যেসে। লোকজন ‘লাইন’ কথাটি ধরতে না-পারায় ‘সারি’ কথাটি ধরে ফেলে আর হু-হু করে লাইনটা তৈরি হয়ে যেতে থাকে। যোগেন একটু ঘাবড়েই যায়। এত ভোটার যদি ভোট দিতে এসে ভোট দিতে না-পেরে পালিয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে নৌকায়-নৌকায় আরো কত ভোটার ভেগে গেছে? তাদের কি আবার গুছিয়ে আনতে পারবে?
কিন্তু যোগেন আর একমুহূর্তও দেরি করতে চায় না। বুথের মুখে আবার কী কল করে রেখেছে জমিদার মশায় কে জানে। তার প্রাসাদেই ভোট। ‘এই চলো সব, চলো। এরপর যারা নৌকাত্ কী হাঁইট্যা আসব তাগ এই লাইনখানই ধইরতে কইব্যা। লাইন য্যান না ছাড়ে!’ যোগেন হাঁটতে শুরু করে, ভোটের লাইনও তার সঙ্গে চলে। প্রথম কয়েক পা-র মধ্যেই লাইনে একটু হাসাহাসি ওঠে—এরকম করে তাদের হাঁটাচলার অভ্যেস নেই। পায়ে-পায়ে লেগে যায়, নিজের পায়ের সঙ্গে নিজের পা জড়িয়ে যায়, সামনের মানুষের গোড়ালিতে নিজের বুড়ো আঙুল ঠেকে যায়, পেছনের লোক যেন হাঁটু দিয়ে গুঁতোয়। সকাল থেকে এখানে যে-যুদ্ধ চলছে, এইমাত্র, এইমাত্র নদীর পাড়ে যে-যুদ্ধ ঘটে গেল বা এখনও ঘটছে, সে সব ভুলে গিয়ে এরা লাইন ধরে হাঁটতে-হাঁটতে হেসে ফেলে। কারো গলা শোনা যায়—’ভোটের হাঁটনে হাসন নাই।’
যোগেন ঘাড় ঘুরিয়ে চিৎকার তোলে, ‘আরে, জয়কার দ্যাও।’
‘যোগেন মণ্ডল জয় জয়’
জয়কারটার দরকার ছিল—মানুষ দিকও পাবে, দিশাও পাবে, লোকজন কোনদিকে আছে—যোগেনের লোকজন।
যোগেন নানা কিছু পড়তে ভালবাসে—টাইপটাই ভাল ছাত্রের, হাতে পেলে পড়ে ফেলো। অঙ্ক আর সংস্কৃত তো তার বি এ পাশের বিষয়। গড়গড়িয়ে সংস্কৃত পড়তে-পড়তে, মানে বলে যেতে পারে, নাগরী হরফে। আর, যখন আর-কোনো পথ দেখতে পায় না, পাবে বলে আঁচও পায় না—তখন অঙ্ক কষতে বসে—ইনটিজার আর ভেক্টর নিয়ে। যোগেনের পড়াশুনোর দিকে স্বার্থহীন এই মোক্ষম যান, নিজের পড়ার অভ্যেস তৈরি করা, অঙ্ক আর সংস্কৃতে এই দক্ষতা ও সেই দক্ষতা কোনো কাজে আসবে না জেনেও নিজের মনেই একা-একা সেই দক্ষতা বাড়িয়ে চলা—এই সব, গুণ বা স্বভাব বা অভ্যেস, বড়হিন্দু বা বর্ণহিন্দু বা বামুন-বদ্যিদের বাড়ির ছেলেমেয়েদের কারো কারো থাকতে বা ঘটতে পারে। সবার না, কারো কারো। কোনো একটা কারণে নয়, অনেক কারণে, অনেক কাটাকুটি কারণেও। ‘তোর ছোট্দাদু, মানে ঠাকুরদার কাকাও মুখে-মুখে জমির পাই-পর্যন্ত হিশেব এমন করে দিতেন যে তাকে বিক্রমপুর থেকে তুলে এনে এখানে জমিদারি দিয়ে বসিয়ে দিলেন শেয়ানকাঠির জমিদার। তার সেই শুভয়ংকরীর জোরেই চার পুরুষ ধরে বালাম চাল খাচ্ছ’–এই সব পুরুষানুক্রমিক গালগল্পের কারণেও। ‘আমি আমার ছোট্ঠাকুরদাদার মত হব’, কথাটা একবার তার মাথায় ঢুকে গেলে আর ছোটঠাকুরদাদা হতে কদিন লাগে। আর, হওয়াও যায়। নিজে নিজের ছোট্ঠাকুরদার মত হতে চেয়ে যা হল সেটাকেই ছোটঠাকুরদার মত হওয়া ধরে নিতে বাবুদের বাড়িতে আর বাধা কোথায়?
যোগেনদের তো ছোট্ট্ঠাকুরদা নেই। থাকে না। যোগেনদের মত শুদ্দুর-চাঁড়ালদের ছোঠাকুরদা আর যোগেনের বড় ভাইদের মধ্যে কোনো তফাত নেই—মাঝখানের বছর সত্তর সময় ছাড়া। যোগেনদের বংশ পুরুষানুক্রমিক হয় না। বলা যায়, একটাই পুরুষ, সে-পুরুষের আর শেষ নেই। তাই, যোগেনের ভাল ছেলে হওয়া, ক্লাসে বারবার ফার্স্ট হওয়া, প্রত্যেকটা পরীক্ষায় জিলার মধ্যে সবচেয়ে ভাল রেজাল্ট করে মেডেল পাওয়া, আইন পরীক্ষাতেও মেডেল পাওয়া—তার একার ব্যাপার, এক তারই ব্যাপার। সে, যোগেন মণ্ডল, শুধু যে ভদ্রলোক বা বাবুদের বাড়ির ছেলেদের মত মেডেল-পাওয়া গ্র্যাজুয়েট, তাই নয়, ল-পাস করা বি-এলও বটে, তাই নয়—সে বাবুদের বাড়ির গল্পকথার তিন পুরুষ আগের দাদু-ছোঠাকুরদাদের মতই, কোনো কাজেই লাগবে না, এমন পড়াশুনোও করে। নম-র ছেলের-এর আগেও বিএ, এমএ পাশ করে বড়-বড় চাকরি নিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছে। কিন্তু তারা কি তাদের সেই খ্যাতি ক্ষমতার কাজে লাগে না এমন কিছু কখনো জানতে চেয়েছে, যা শুধুই জানার জন্য জানা বা শখের জানা? জানার কাজ বা নেশা কি অতটাই মাতাতে পারে, তাদের, যেমন যোগেনকে মাতাচ্ছে।
তবে, যোগেন, মানুষের সমাবেশ তৈরি, নানারকম যুদ্ধে সেনাপতিদের আক্রমণ পরিকল্পনা আর আত্মরক্ষা-আক্রমণ—এগুলো নিয়ে কিছু তখনো জানে না।
অথচ, সব পরিস্থিতিই তো নিজের-নিজের বিদ্যা তৈরি করে, যে পারে সে প্রত্যুৎপন্ন সেই বিদ্যা আয়ত্ত করে নেয়।
এই ১৯৩৭-এর ভোটের মত ভোট এর আগে কখনো হয়নি। এই ভোটবিদ্যা যোগেন তাহলে আয়ত্ত করবে কোথা থেকে? ভোটবিদ্যাই তো আর-এক অর্থে মানুষের মত তৈরির বিদ্যা। এই ভোটের সাতষট্টি বছর পর যোগেনের শতবর্ষ জয়ন্তী পালনের প্রাক্কালে, ঐ, যাকে যোগেনের আমলে ‘ব্রিটিশ ভারত’ বলত, সেই ভূখণ্ডে সকলেরই জানা হয়ে গেছে যে ভোট-করাটা শুধুই মতগঠন নয়, নির্মিত মত ভোটবাক্সের ভিতর দিয়ে বের করে আনাটাও ভোট-করার মধ্যেই পড়ে। যোগেনের জন্মশতবর্ষ (২০০৪)-নাগাদ নানাভাবে এই ‘ভোটবিদ্যা’র অনেক ওতপ্রোত কাজে, নতুন পরিভাষা, প্রধানত ইংরেজিতে ও হিন্দিতে, ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে। যোগেন জানত না–ভোটের দিন সকালে প্রতিপক্ষের প্রধান জায়গায় মিথ্যে কথা রটিয়ে বা মিথ্যে বাধা তৈরি করে প্রতিপক্ষের ভোটারদের ঘাবড়ে দিতে হয়। তাকে বলা হয়, ‘লাস্ট গেম’, ‘শেষ কেরামতি’। সেটাই সরল দত্ত করেছিল। ঐ লোকটি যদি যোগেনের কাছে না-পৌঁছুত, তাহলেই তো হয়ে গিয়েছিল! সরল দত্তকে কেউ ঠেকাতে পারত না। যোগেন জানত না—সে-যে সাইকেল থেকে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে গর্জন করে উঠল, সেটাই ‘প্রত্যাঘাত’, ‘কাউন্টার অ্যাটাক’। যোগেনের দলের আক্রমণের সামনে সরল দত্তের দল যে কুটোর মত ভেসে গেল সেটাই হচ্ছে, ‘লাস্ট বেট’ ও শেষ দান। আর, যোগেন যে তার ভোটারদের লাইন করে সাজিয়ে বুথে নিয়ে যাচ্ছে—একেই বলা হবে ‘বুথজ্যাম’, বুথে প্রতিপক্ষের কাউকে থাকতে-ঢুকতে না-দেওয়াকে যোগেনের শতবর্ষকালে বলা হবে ‘বুথ দখল’। আর, ব্যালট পেপারে নিজের প্রার্থীর চিহ্নে সিল লাগিয়ে ব্যালট বাক্সে ফেলে দেওয়াকে ততদিনে বলবে, ‘ছাপ্পা ভোট’, যদিও, তখন, সেই ২০০৪ সালে মতনির্মাণ-প্রক্রিয়া, ব্যালট পেপার, ব্যালট বক্স, সিল—এই সবই, অবান্তর হয়ে গেছে। তখন কম্পিউটারের বোতাম টিপে ভোট দেওয়া চালু হয়ে গেছে।
যোগেন এর আগে লোক্যাল বোর্ডের ভোট করেছে। সে আর কী ভোট! এই ১৯৩৭-এর প্রথম প্রাদেশিক আইনসভার এমন ব্যাপক ভোটের ভিতর দিয়ে যোগেন জেনে ফেলে—ভোটপদ্ধতির ভিতর ফাঁক তৈরি করে সুযোগ নেওয়ার অপরিহার্য কৌশল—ঐ ‘লাস্ট মিনিট গেম’, ‘কাউন্টার অ্যাটাক’, ‘বুথজ্যাম’, ‘বুথদখল’, ‘ছাপ্পা ভোট’। বছর পাঁচ-ছয়ের মধ্যে সে ‘ক্যান্ডিডেট গুম’, ‘ভোটার গুম’, ‘রেসকিউ অপারেশন’—এগুলো শুধু জেনেই যাবে না, ব্যবহারও করবে দক্ষভাবে।
যোগেন তার লাইনকে বুথে সামিল করে দিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে দেখতে পায়—যারা নৌকো নিয়ে ফেরত-ভোটারদের আনতে গিয়েছিল, তাদের প্রথম দল আসছে দৌড়ে-দৌড়ে। একবার ফিরিয়ে দেওয়ার পর তার ভোটাররা ফিরে আসছে, যারা লুকিয়ে ছিল তারা লাইন লাগিয়েছে—তাহলে, কানের পাশ দিয়ে হলেও জিতে যেতে পারে?
যোগেন আন্দাজ করতে চাইল—সেটা বুঝতে পেরেই কি সরল দত্ত এই কাণ্ডটা করল লোকজন নামিয়ে?
যোগেন এই আন্দাজটা মনে-মনেও পাকিয়ে তুলতে পারল না।
ভোটই হোক আর যাই হোক—সরল দত্ত তো সরল দত্ত-ই, দত্তবাড়ির কর্তা, অশ্বিনীকুমারের ভাইপো, জিলা কংগ্রেসের সভাপতি। তার পক্ষে এই মারামারি দাঙ্গা-হাঙ্গামার বুদ্ধি কষা কি সম্ভব? এই বুদ্ধি, এই গায়ের জোরে ভোট যদি একটা বুদ্ধি বলে মেনেই নেয় সবাই, তাহলে তো, সে, যোগেন, নমশূদ্র, চাঁড়াল তো গৌরনদী ঠেসে দিতে পারত মানুষের শবে? যোগেন .একটা আঁচ পেতে চায়—সরল দত্তই এটা করেছে নাকী সে জানেই না, তার অজান্তে কংগ্রেসের লোকরা করেছে?
যে-ঘটনা যোগেনকে জানাতে সাতসকালে বাটাজোড় থেকে লোক ছোটে বরিশালে–সে-ঘটনা সরল দত্ত জানে না এটা মেনে নিতে যোগেনের ওকালতি বুদ্ধিতে বাধে। বড়জোর তার পক্ষে বলা যায়—জানত, কিছু বলেনি।
জেনে থাকুন, বা ‘না’-বলে না থাকতে পারে, সে নিয়ে যোগেন ভাবছে কেন? যেন, তার ভিতরে-ভিতরে পুরনো কোনো টান কাজ করছে! সরল দত্ত। কংগ্রেস।
কংগ্রেসের মত দুনিয়াজোড়া দল, মহাত্মা গান্ধীর দল, না থাকলে, সরল দত্তই হোক আর যেই হোক, এ ঘটনা ঘটাতে পারে না। যোগেনের কোনো দল নেই। যে-কোনো দলের সঙ্গে বোঝাপড়ার দরজা যোগেন খোলা রেখেছে। কংগ্রেসও তাকে বলতে তো পারত—দাঁড়াচ্ছই যখন, তুমি কংগ্রেসের হয়েই দাঁড়াও। তেমন কোনো কথার আভাস দেওয়া দুরে থাক-চাঁড়ালের ছেলে জেনারেল সিটে দাঁড়ায়—এতে কংগ্রেসের পৈতে-তিলকের আড়ালের নখ-দাঁত বেরিয়ে পড়েছে।
