1 of 4

৮. সাইকেল : জলপথে ওপারে, বাটাজোড়ে

৮. সাইকেল : জলপথে ওপারে, বার্যাজোড়ে

রহমতপুরে এসে যোগেনকে সাইকেল থেকে নামতে হয়। নদীর ঘাট দেখা যায় ডানদিকে। লোকজন আছে দু-চারজন। সাইকেল চড়ে নদীর পাড় ভেঙে রাজগুরুর ঘাটে যাওয়া যাবে না।

সাইকেল থেকে নেমে রাস্তার ঢাল ঘেঁষে জঙ্গল মাড়িয়ে সাইকেল নিয়ে মাটিতে গিয়ে দাঁড়াতে যোগেনের সারা জামার কোমরের তলাটুকু বাদ দিয়ে ঘামে একেবারে জবজবে হয়ে যায়। জোরে-জোরে শ্বাসও পড়ে। এতটা রাস্তা একবেগে সাইকেল চালিয়ে এসে, একটু না জিরিয়ে ঢাল বেয়ে নেমেছে। যোগেন হেলেচাষী-ঘরের ছেলে নয়। ওদের হালও নেই, চাষও নেই! তবু ক্লাস নাইন-টেনেও স্কুল থেকে ফিরে তাকে কোনোদিন খালে নেমে মাছ তুলতে হত, রান্নার জন্য গাছের গুঁড়ি কুপিয়ে ফালাফালা করতে হত। যোগেন তার শরীরের ব্যবহার থেকেই জেনে গিয়েছিল—বড় খাটনি যখন চলে, তখন ঘাম বেরবার টাইম পায় না। খাটনি থামানোর পর ঘাম গলগলিয়ে বেরতে থাকে। সেই জন্য বড় খাটনি একবারে হঠাৎ থামাতে নেই। খাটনি ধীরে-ধীরে ধীরে-ধীরে কমিয়ে আনলে ঘাম বন্ধ হয়ে যায়। এখন, সাইকেলে না উঠে, হেঁটে নদীর পাড়ে গেলে শরীরটা জুড়িয়ে যাবে। পারলে, নৌকোয় একটু ঘুমিয়েও নিতে পারে।

পাড়ে এসে পৌঁছুবার পর দেখে—দূর থেকে যা মনে হয়েছিল, তার চাইতে বেশ বড় একটা ভিড়। যোগেনকে দেখে দু-চারজন এগিয়ে এল। ‘আরে, আপনে এই রাস্তায় অ্যাহন আইজ?’

পাঞ্জাবির হাতায় মুখটা মুছে যোগেন বলে, ‘আরে, আমহোঁর কথা শুইনবেন পরে, কিন্তু খেয়া বন্ধ দিছে?’

‘না। আছে তো। দুইখান নৌকা ভোটের বাদে নিয়্যা গিছে।’

‘এই খাইছে। এইডা তো মাথায় আসে নাই। আমার তো আবার অ্যাহনি ফিরব্যার লাগব—’

‘যাবেন কই?’

‘যাব তো বাটাজোড়। শুইনল্যাম না কি ঘাটে নৌকা ভিড়াব্যার দ্যায় না।’

‘হয়। মারামারিও তো হইছে। দত্তবাবুর লোকরা পিটাইছে ভোটারগ।’

‘অ। তয়?’

‘দেহি। আপনার তো যাইব্যার লাগে। বরং একখান ডোংগা কী ট্যাবইর্যা লইয়্যা আপনি সাইকেল নিয়্যা পার হন তো।’ বলে সেই লোকটি নৌকোর খোঁজ করতে চলে গেলেও আরো দু-চারজন যোগেনের কাছে এলে যোগেন তাদের জিজ্ঞাসা করে, ‘কী? ভোট নাই?’

‘হ্যাঁ। দিয়্যাথুয়্যা আসছি। আপনার বাক্সে। আর আইস্যা দেখি আপনি এইখানে খাড়াইয়া। দ্যাহেন কাণ্ড।’

‘কাণ্ডখান কোনডা? আমার বাক্সে না আমার এইখানে খাড়াইয়্যা থাকা?’

‘বাক্সেও আপনি খাড়াইয়্যাই আছেন।’

‘খাড়াইয়্যা আর থাকবডা কী? শুইনল্যাম বাটাজোড়ে ভোটারগুলাক পিটাইছে।’

একটি কমবয়েসি মাঝি এসে যোগেনের সাইকেলটায় হাত দিতেই যোগেন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, একটা টাবইর্যা নিয়ে আগের লোকটি দাঁড়িয়ে। মাঝি ছেলেটি যোগেনের সাইকেলটা কাঁধে তুলে নেমে যায়। যোগেনকে একটু সাবধানে কাত হয়ে নামতে হয়।

নৌকোয় ওঠার আগে যোগেন বলে, ‘উবগার কইরলেন ভাই। আর কেউ যাবে না পারে?’

‘সে যার যাওয়ার যাইবেনে। আপনি কামে আগান।’

‘এতখান নৌকায় আমি একা?’

‘মানুষখানও তো বড়’

শীতের নদী পেরতে আর কতক্ষণ। এতটা পথ সাইকেল করার পর নদীর ওপর দিয়ে আসা হাওয়ায় যোগেনের ঝিম ধরে একটা চিন্তার মাঝখানে—বাটাজোড়ে যদি মারামারি হয়ে থাকে তাহলে যোগেনের কী করা ঠিক হবে। যোগেন যে ওখানে এমন হাজির হয়ে যাবে—এটা নিশ্চয়ই কেউ ভাবেনি। দত্তবাবু কি বাটাজোড়ে? বরিশ্যাইল্যা মারামারির কুনো ঠিকানা নাই। হয়ত লাঠি-লাঠি ঠকাঠকি শুধু। আবার হয়ত দুডা-চাইরড্যা লাশ ভাইস্যা গেল। নৌকো ভেড়ার একটা দোলা আছে—সরে আসার মত।

মাঝি কিছুতেই পয়সা নেবে না। ‘আরে, পয়সা না নিলে খাবাডা কী? ধরো, ধরো।’

‘না। আমারে না কইর‍্যা দিছে। আপনি আমাগ মেম্বার হইবেন।’

‘আরে বাপধন, আমি মেম্বার হইলে তোমার প্যাট ভরব?’

‘ভরব। আপনি মেম্বার হইলে আমরা কইব্যার পারব শুধু বামুন-কায়েতরাই মেম্বার হয় না, আমাগ নমশূদ্ররাও হয়।’

যোগেন একটু থমকে যায়। এই ভোটে দাঁড়ানোর পর থেকে এমন থমকে তাকে যেতে হচ্ছে মাঝে মাঝে। তার দিক থেকে, এই কথাটা তো, ভোট পাওয়ার একটা কৌলনও হতে পারে। নমশূদ্র আর অন্যান্য শূদ্র আর মুসলমানদের ভোট এক হলে বামুন-কায়েত কংগ্রেসকে হারান যায়। কিন্তু এই ছেলেটির কাছে তার জেতাটা এতটা ব্যক্তিগত হয়ে উঠছে কেন?

যোগেন তো একটু বেশি বয়সেই পাস করেছে, ওকালতিও শুরু করেছে সবে। বাড়িঘরের অবস্থা-ব্যবস্থা সঙ্গীন। অত বড় সংসার কী করে চলে! সে তো এখনো বাড়িতে কোনো পয়সাকড়িই দিতে পারে না—অন্তত ছ-সাত বছর আগে থেকেই বাবা তো ভাবতে শুরু করেছিল, এই যোগেন খাড়াইল, এই যোগেন খাড়াইল। কাকা-কাকিমার জেদ না থাকলে তার কি কলেজে পড়া হত? ওকালতিটা না-হয় সে একাই কষ্ট করে কলকাতায় থেকে নিজের খরচা নিজে চালিয়েছে। সেটা তো কোনো হিশেব না—যোগেন্ত্রের তো সংসার চালানোর কথা, শুধু নিজেরটা চালানোর কথা না। তার স্ত্রীও তো বাড়ির ভাতের ভাগিদার। বরিশাল কোর্টে প্র্যাকটিস শুরু করার পর এত তাড়াতাড়ি যে তার পশার হয়ে যাবে—যোগেন সে-কথা ভাবতেও পারেনি। ফি-ও সে কম রেখেছে, গরিব মানুষের ফি ছেড়েও দেয়, তাই লোকে হয়ত তার কাছে আসতে ভরসা করে। ভরসা করুক আর যাই করুক—মামলায় তো লোকে জেতা ছাড়া কিছু চায় না। দুটো-একটা কঠিন কেসে জেতার ফলেই তার ওপর হয়ত ভরসা হচ্ছে। একটা মুসলিম-সম্পত্তি ভাগের মামলা জিতেই যোগেনের নাম বেড়ে যায়। যোগেনও বুঝতে পারে—বরিশালে জমির মালিকানা এত পুরনো ও প্যাঁচালে। যে দলিল-কবলার ভিতর উঁইয়ের মত ঘুরে বেড়াতে না পারলে আইনের কথায় পৌঁছনো যাবে না। সে-সব পড়ার দিকেই তার মন ঢুকে পড়েছে। যোগেন যুক্তিকে আইনের খোপে সাজানোর গভীর ওকালতিবিদ্যা, কৌশল নয়, বিদ্যা, সবেমাত্র আয়ত্ত করছে তার সিনিয়র কুলদারঞ্জন দাশগুপ্তের কাছে। কী তার ঢোকার ক্ষমতা আইনের ভিতর থেকে ভিতরে। মনে ভয় হয়, এই গেল বুঝি সুতো ছিঁড়ে, আর বেরতে পারবে না। যোগেন সবে দাশগুপ্তের চিন্তার ধরণটা ধরতে শুরু করেছে আর তার মধ্যে এল এই ভোট। যোগেনের উচিত ছিল, আরো কয়েক বছর দাশগুপ্তের কাছে শিখে নিজেকে দাঁড় করানো, বাড়িঘর সামলানো। দিল দশজন মিলে তাকে ভোটে দাঁড় করিয়ে। তবে তার নিজের ইচ্ছে না-থাকলে দশজন কি আর পারত? তেত্রিশ বছর বয়সের অস্থিরতায় যোগেন দেখতে পাচ্ছিল—প্রাদেশিক আইনসভার প্রথম ভোট, মন্ত্রিসভা, দেশশাসনের বদল ঘটাতে যাচ্ছেই। সরকার, কর্তৃত্ব, ক্ষমতা। যেন, এ-সুযোগ ছেড়ে দিলে আর-একবার নাও আসতে পারে। ভোটে নেমে ও ভোটের জন্যে প্রচার করতে-করতে, বাজারে-বন্দরে মানুষজনের সঙ্গে কথা বলতে-বলতে, মিটিঙে-মুটিঙে ব্রিটিশ, কংগ্রেস, গান্ধী, জিন্না এ-সব কথা একবারও না-বলে শুধু বরিশালের কোথায় একটা খাল কাটলে কত একর জমি বাঁচে আর কোথায় একটা স্কুল করলে কত ছাত্রের পড়া হয় এই সব ঘরোয়া কথা তুলে তুলে যোগেন তার সেই নতুন অনুশীলনের চিন্তাবিদ্যায় বুঝে ওঠে—যেন মানুষজন ভাবতে শুরু করেছে এটাই যেন ছিল অশ্বিনীকুমারের ইচ্ছা। আর, বরিশালের সেই মহাপুরুষের প্রতি আনুগত্য থেকেই আরো একটা চিন্তা মানুষজনের মনে ঘুরতে শুরু করেছে—সে-চিন্তা হয়ত প্রথম চিন্তার বিপরীতও, বা অন্তত কৌণিক—নামডাকওয়ালা সব জমিদার-তহশিলদারদের দেখা হয়ে গেছে, এখন যোগেনের মত শুদ্দুরের ছেলে, গরিব ছেলেরই লিডার হওয়া উচিত। যোগেন বোঝে—এই দ্বিতীয় চিন্তাটি থেকে আরো একটা চিন্তা গোপন জোয়ারের মত অবর্ণহিন্দু সমাজের নমশূদ্র ও আরো এমন অজলচল জনগোষ্ঠীর মধ্যে, এক রাতে নদীর খাত বদলে দেওয়ার বেগে, পাড়ে আছড়ে পড়ছে। তার আইনবিদ্যা অনুশীলন থেকে যোগেন এই তৃতীয় চিন্তার ভিতরে-ভিতরে এক গর্ভচিন্তা ও অনুভব করছে, চক্রবৃদ্ধি সুদের হিশেব কষার মহাজনি নির্ভুলতায়—যদি শূদ্র ভোটের ‘সঙ্গে মুসলমান ভোট মেলে তাহলে তাদের লিডারই হবে লিডার। বাটাজোড়ের খবর নিয়ে যে-ছেলেটি আজ বরিশাল গিয়েছিল সে কেন তাকে বলল, আপনি লিডারি ছাড়বেন না, এই মাঝিছেলেটি কেন বলল, নমশূদ্ররাও পারি। তাহলে যোগেন কি না-জেনেই একটা উত্থানের উপলক্ষ হয়ে উঠছে? যোগেন তার চিন্তাগুলিকে নম্বর দিয়ে রাখছে, ভোটের পর ভাববে বলে, ভোটের ফলের প্রতিক্রিয়া থেকে পরীক্ষা করার সুযোগ থাকবে—কোন্ চিন্তাগুলি সে ঠিকঠাক চিনতে পেরেছে। গরিব, খেটে-খাওয়া, অপূর্ণ-আহার ও অদ্যজীবী মানুষের ভয় থাকে না। তার বাঁচার প্রতিটি মুহূর্তই ভয়ংকর—এই বুঝি শেষ হয়ে গেল তার বাঁচা। মরণের অধিক তো কোনো ভয় নেই। সেই ভয় নিয়ে যাকে জীবনধারণ করতে হয়, তার পক্ষে আরো ভয়ের অতিরিক্ত কারণ খোঁজার সময় পাওয়া কঠিন। যোগেন ক্ষুধা কাকে বলে তা নিজের ক্ষিদে দিয়ে জানত, অভাব কাকে বলে তা নিজের অভাব থেকে জানত, শ্রম কাকে বলে তা একেবারে ছাট বয়সেই জানত—স্কুল থেকে ফিরে তাকে খালে নামতে হত, কলকাতায় এক আশ্রয়দাতার দুটি ছেলেকে পড়িয়ে তার থাকা-খাওয়াটুকু হত ও আরো টিউশন, প্রুফ দেখার কাজ, চাঁদসীর ডাক্তারি তাকে করতে হত। যোগেনের কোনো ভয় ছিল না। কিন্তু তার ওকালতিবিদ্যার গুণে এই এখন তার অবস্থানবিন্দু থেকে পরিধিকে একটু আবছা ও ঘোলাটে লাগছে। অশ্বিনীকুমারের ঐতিহ্য, জমিদারি নেতৃত্বের বিরোধিতা, বর্ণহিন্দু বিরোধিতা, শূদ্র হিন্দু ভোট ও মুসলমান ভোটের যোগফলের নতুনতম নির্বাচকসমাজ—যোগেন নিজের স্থানাঙ্ক পাচ্ছিল না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *