1 of 4

৪৮. ‘কংগ্রেস যেন স্পিকারপদে প্রার্থী না দেয়’

৪৮. ‘কংগ্রেস যেন স্পিকারপদে প্রার্থী না দেয়’

নমাজ সেরে বা আনুমানিক হিশেবে নমাজ যখন শেষ হতে পারে বেলা দুটো নাগাদ গাড়ি ঢুকতে শুরু করে, কেউ-কেউ পায়ে হেঁটেও।

হকশাহেবের গাড়ি তাঁকে নিয়ে একটু এগিয়ে গিয়েছিল, পেছনে আর-একটা গাড়ি এসে পড়ায়, তাঁর গাড়িটা পেছুনো গেল না। সেই গাড়িটা থেকে সারওয়ারদি নেমে দুই ধাপ একসঙ্গে পেরিয়ে বারান্দায় উঠে পড়ে। হকশাহেব গাড়ি পেছতে বারণ করে পায়ে হেঁটে পেছিয়ে এসে বারান্দায় উঠতে না-উঠতে সেলাম আলে কুম ও নমস্কার শুনতে-শুনতে দাঁড়িয়ে পড়লেন। সামনে পেলেন কুমিল্লার ধীরেন দত্তকে। সামনে অনেকেই ছিলেন তবে হকশাহেব ধীরেন দত্তকেই বাছলেন, ‘ধীরেন, ঐ-যে এড্ডা কি অঙ্ক আছে না, কচ্ছপ আর খরগোশের দৌড়ে শেষ পর্যন্ত কচ্ছপই জেতে, ঐডা বদলাও।’

‘ঐডা ইসপস ফেবলসের গল্প-না? মোরাল স্টরি। স্লো বাট স্টেডি উইনস দি রেস—’

‘থোও তোমার মোরাল টেল। বেসিক্যালি তো ম্যাথমেটিক্স—যহন এডডা রেস ইনভলভড়, যে-জিতব তারে তো আগে পৌঁছবার লাগবই। শুদাশুদি ইষ্ট নাম জপ কইরলে তো রেস জেতা যাইব না। অঙ্কডা বদলাও। মোরাল হইব—অনলি এ স্টেডি টাইম উইনস দি রেস-

‘অঙ্ক যদি বদল্যাবার লাগে হকশাহেব, তাইলে আপনারই উচিত আপনার স্যাররে বলা। আমি আপনার মুখোমুখি পইড়্যা গেছি বইল্যা আমারে ক্যান অঙ্কে ঠ্যালেন’—ধীরেন দত্ত বলেন।

স্যার মানে, স্যার প্রফুল্লচন্দ্র রায়, পি সি রায়। হকশাহেব তাঁর প্রিয় ছাত্র ছিলেন। ‘আরে কইতেছি সারওয়ার্দির কথা— দ্যাহ, সব সময় ফাস্ট, ছোড ফিগার তো, রাইট ইনে ভাল খেইলব। এর মইদ্যে তুমি আবার স্যারের কথা তোলো ক্যান। আরে, সত্তি অ্যাকডা অঙ্ক আছে। ভুইল্যা গেছি। অ্যাহন কি বুড়া বয়সে স্ট্যান্ড আপ অন দি বেঞ্চ হব?’

হকশাহেবের একটু জানাচেনা মহলে একটা কথা চালু আছে—’দরকারি কাম থাইকলে হকশাহেবেরে তোমার চক্ষুর লগে চক্ষু মিল্যাইবার দিয়ো না। এমন কথা ফান্দব, তার মাথা ল্যাজা বাইর কইরতে একবেলা কাইট্যা যাবে।’

বর্ধমানের আবুল হাসিম তাড়াতাড়ি হেঁটে শরৎ বোসের কাছে গিয়ে বলেন, ‘আপনার সঙ্গে একটু কথা—’

‘হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন-না’-

হাসিম শাহেবের ভঙ্গিতে বোঝা গেল, তিনি শুধু শরৎ বোসের সঙ্গেই কথাটা বলতে চান। হাসিমশাহেব তাঁর বাপখুড়োর সুবাদেই পরিচিত। বর্ধমানে উকিল হিশেবে মান্যগণ্য। ওঁকে কেউ সাম্প্রদায়িক বলে না যদিও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কোনো অসত্য অভিযোগ করলে, তিনি স্পষ্টভাষায় জবাব দেন।

শরৎবাবু একটু সরে এলে হাশিম শাহেব বলেন, ‘আমার কোনো অ্যাসেমব্লি স্ট্যাটাস নেই, আমি কেবলই একজন ইনডিপেনডেন্ট মুসলিম মেম্বার—’

‘দ্যাট মে বি ইয়োর গ্রেটেস্ট স্ট্যাটাস। বলুন। আমি কংগ্রেস লেজিসলেচার পার্টির লিডার বলে ডোন্ট স্ট্যান্ড অন ফর্মালিটিজ—’।

‘আপনারা কি স্পিকার ইলেকশনে ক্যানডিডেট দেবেন?

‘হ্যাঁ। নিশ্চয়ই! শিবশেখরেশ্বর তো ক্যানডিডেট। ওর তো কাউন্সিলের চেয়ারিং-করার অভিজ্ঞতাও আছে। কেন, বলুন তো?’

‘এটা তো কোনো চাকরির ভেকান্সি নয়। এক্সপিরিয়েন্সে কী হবে। মেম্বারদের যে-কেউই ভাল স্পিকার হবেন।

‘নিশ্চয়ই। অন দ্যাট কাউন্ট অলসো শিবশেখরেশ্বর ডাজন ফেইল—’

হাসিম শাহেব নিজেকে সামলান। কথার পিঠে কথা বলে তিনি ইস্যুটাকে হালকা করে দিলেন কেন? তিনি তো একটা রাজনীতির কথা বলতে এসেছেন।

‘আমি, মানে, আমরা অনেকেই এটা ঠিক চাইছি না যে মুসলিম মাসের কাছে কংগ্রেস শুধুই হিন্দুপার্টি হয়ে থাক। হিন্দুমাসের তুলনায় বাংলায় মুসলিমমাস শিক্ষাদীক্ষায় পেছিয়ে আছে। তাদের তো অবাঙালি মুসলিম নেতাদের নেতৃত্ব মেনে নেয়া ছাড়া কোনো উপার নেই। উপায় থাকলে কী হতে পারে, হকশাহেব তো তা প্রমাণ করে দিয়েছেন। মুসলিমমাসকে অলটারনেটিভ দিলে তারা নিজেদের লয়্যালটি ঠিক করতে পারে। নিজেরা তো সেই অলটারনেটিভ তৈরি করতে পারে না। আপনি কি আমার এই ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত?’

‘বলতে পারেন, সম্পূর্ণ দ্বিমত নই। মুসলিম ভোটারদের ডিভিশন বিটউইন লিগ অ্যান্ড কেপিপি, ইজ এ কমপ্লেক্স ঘটনা। এটা চট করে বুঝে যাওয়া ঠিক নয়। অল ইন্ডিয়ার পার্সপেকটিভ মাছিমারা কেরানির মত বাংলা, পাঞ্জাব বা সিন্ধের মত মুসলিম মেজরিটি প্রভিন্সে কপি করাটাও যেমন ঠিক নয়। অথচ, আমার পার্টি তো তাই করল—’

‘এই পর্যন্ত একমত হলেই আপাতত চলবে। কংগ্রেস যে অ্যান্টি-মুসলিম নয় তা প্রমাণ করার এই সুযোগটা আপনারা ব্যবহার করছেন না কেন? স্পিকার ইলেকশনে আপনারা কেন ক্যানডিডেট দিচ্ছেন? আপনারা কোনো হিশেবেই জিততে পারবেন না। লিগ আর কেপিপির জয়েন্ট ক্যানডিডেট আজিজুল হককে সাপোর্ট দিলে সেটা তো গুডউইল জেশ্চার হিশেবেই সবাই মেনে নিতে বাধ্য হত।’

‘সেটা তো হয় না হাসিম শাহেব, হিন্দুমাসও তো একটা মাস। সেটার সঙ্গে কংগ্রেসমাসের একটা ওভারল্যাপিং হচ্ছে, এটাও বিপদের। তারা এটা মেনে নেবে না যে লিগকে কংগ্রেস ওয়াকওভার দিল।’

‘তাহলে আপনারা কেপিপি ডিসিডেন্টদের তমিজউদ্দিনকে সাপোর্ট করুন। আপনার মাসকে তো আপনি বোঝাতে পারবেন—লিগকে আটকাতেই আপনারা ডিসিডেন্ট কেপিপিকে সাপোর্ট দিচ্ছেন। কংগ্রেস মাসের সেই অংশটাই হিন্দু-আইজ্‌ড হয়নি, যারা হকশাহেবকে অ্যান্টি- কমিউন্যাল মনে করে।’

‘কিন্তু তমিজউদ্দিন তো অ্যান্টি-হকশাহেব –’

‘হ্যাঁ। বাট ফ্রম দি লেফট। তারা প্রধানত অ্যান্টিলিগ’।

‘হ্যাঁ—আ-আ। আমরাও তো গবমেন্টকে লেফ্‌ট থেকেই চাপব। তাহলে তমিজউদ্দিনের ডিসিডেন্ট-কেপিপি আর কংগ্রেস মিলে লিগকে আইসোলেট করা যায়। কিন্তু এ-বুদ্ধিটা আমাদের পার্টির কারো মাথায় এল না কেন?

‘সেটাই বোধহয় কংগ্রেসিদের, মানে কংগ্রেস পার্টির মৃত্যুবীজ। গান্ধীজির মডেলে প্রত্যেকেই নিজেকে পার্টির ওপরে ভাবেন। কিন্তু গান্ধীজি তো আর দুটো হয় না। ফলে, শেষে, দেখা যায়—যে যার নিজের কথা ভাবছেন, পার্টির কথা কেউই ভাবছেন না।’

শরৎ বোস এবার হো-হো হেসে উঠলেন আর তাঁর হাসির সঙ্গে মিল রেখেই যেন অ্যাসেমব্লির ঘণ্টা বেজে উঠল—অধিবেশন শুরু হবে।

হাসিমশাহেব বলে উঠলেন, ‘এত হাসির কথা তো কিছু বলিনি।

‘না। সে কারণে হাসিনি। এটা তো টু উ সিম্পল অ্যান্ড কমন এক্সপ্ল্যানেশন টু কাম ফ্রম ইউ। কথাটা এভাবে বললে তো সিকিভাগ সত্য বড়জোর। লিগের জেনারেল আছেন, এ জেনারেল ইন সার্চ অব অ্যান আর্মি। কংগ্রেসের জেনারেলও আছেন, আর্মিও আছে, নেই এরিয়া-কম্যান্ডার। কিন্তু আমি হেসে উঠেছি, আপনার কথা ভেবে—আপনার ইনটারেস্টটা কী? আপনি তো কংগ্রেসেরও নন, লিগেরও নন, কেপিপিরও নন। স্পিকার হিশেবে কংগ্রেস প্রার্থী দেবে কীনা বা কাকে সমর্থন করবে—এ নিয়ে আপনার কী এসে যায়?’

‘আমার পলিটিক্সের তো এসে যায়।’

‘সেটা কী?’

‘কংগ্রেসকে যেন মানুষজন শুধুই মুসলিম বিরোধী ভেবে না নেয়।

‘চ-লু-ন। ভেতরে যেতে হবে। আমি একটা লাস্ট মিনিট ড্রামার চেষ্টা করব, শিবশেখরেশ্বরকে ড্রপ করে তমিজুদ্দিনকে সাপোর্ট দিতে। তবে আমাদের পার্টি তো! মনে হয় না—কেউ রাজি হবে। থ্যাঙ্ক ইউ ফর এ গুড সাজেশন।’

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *