৪৭. আইনসভার প্রথম অধিবেশন ৭ এপ্রিল, ১৯৩৭ : নামাজহেতু বিলম্ব
মন্ত্রিসভা হল পয়লা কিন্তু আইনসভা ডাকা হল সাত তারিখে। দেড়টায় অধিবেশন। স্পিকার-ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন।
যোগেন ট্রামে উঠে বসে ঝিমুতে ঝিমুতে কার্জন পার্কে নামল একটায়। কার্জন পার্কের পশ্চিম সারির কৃষ্ণচূড়া গাছগুলিতে লালরং ফেটে পড়ছে। তার মধ্যে ঝাঁকড়া একটা গুলমোহর গাছ থেকে সোনারঙের ফুলের ঝালর যেন আগুন লাগিয়ে দিয়েছে। দেশে গাছের কি এত বাহার আছে? কী করে থাকবে? দেশে তো সব গাছই মাটি ফুঁড়ে ওঠা। সব জায়গাতেই তো তাই। মাটির তলায় কোন্ গাছ আছে—সেটা আর বোঝা যাবে কী করে। কিন্তু এ-গাছ তো মাটিতে চারা লাগিয়ে বানানো। যে-বানায় তাদের তো এটুকু জানতে হয়—কোন্ গাছে কী ফুল ফোটে কোন্যাসে। শহর ছাড়া বাগান হয় না, শাহেব ছাড়া শহর হয় না। সব জিলা সদর ও জজকোর্ট—কেমন লাল ইঁটের ঢালু ছাদের সব দালান ঘিরে কতটা সবুজ মাঠ আর রঙিন ফুল। দেখালে তো মানুষ দেখবে, না হলে সবুজ ঘাস আর লাল ফুল তো সবখানেই আছে।
আইনসভার লোহার গেটটা আটকানো ছিল—তবে বারান্দায় অনেক মেম্বার দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ-কেউ নিচু রেলিঙের ওপর বসেই আছেন।
যোগেন লোহার গেটটায় হাত দিতেই তার পেছনে এত জোরে একটা হর্ন বেজে ওঠে যে সে লাফিয়ে সরে যায়—হ্যাঁ, একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। যোগেনও তো যাবে—তবে তাকে হর্ন দিল কেন। পাগড়ি আর খাকি জামায় এক লম্বা দারোয়ান ছুটে এসে গেটটা খুলে দেয়, দুটো পাল্লাই। গাড়িটা ঢুকেই যাচ্ছিল কিন্তু যোগেন তার হাত তুলে গাড়িটাকে থামিয়ে রেখে আগে ঢুকে যায়। গাড়িটাও তাকে অনুসরণ করে কিন্তু পেরিয়ে যায় না। যোগেনের পাশে এসে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়ে। ‘যোগেনবাবু’ বলে ডেকে গাড়ি থেকে নামেন মৈমনসিঙের এক-ডাকে চেনা জমিদার বীরেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী। ফিনফিনে আদ্দির ভিতর থেকে নেটের গেঞ্জি ফুটে বেরচ্ছে। ধুতির পাড়ে জরি আছে, কোঁচাটা হাতে ধরে আছেন পাঞ্জাবির তলার বোতামটার কাছে। সেই বোতাম থেকে একটু কমলা আভা ধুতির ওপর পড়েছে। একে বলে, রাজসজ্জা। শুধু দেখতেই কতটা সময় লাগে!
বীরেন্দ্রকিশোর গাড়ির ভিতর থেকে বাঁ-পা-বাড়িয়ে ফুটবোর্ডে রেখে ডান পাটা সরাসরি মাটিতে নামান। সুতরাং দেখার সময়টা যোগেন পায়। লজ্জাটা কাটিয়ে ওঠার সময়টুকুও পায়। বীরেন্দ্রকিশোর বুঝতে পেরেছেন—তাঁর গাড়ির হর্নে যোগেন ক্ষুণ্ণ হয়েছে, তাই এখানে, তার পাশে নেমে পড়ছেন। যোগেনের একটু খারাপ লাগে—তারই-বা এমন বিধবার একাদশী নষ্ট হওয়ার ভাব কেন?
‘চলেন যোগেনবাবু, কয়-পা হাঁটি আপনার সঙ্গে, তাইলে আর আপনি আগে-আগে যাইবার পারেন না।’
‘কী যে কন, দুইডা পায়ে হাঁইট্যা আর কদ্দুরডা যাওয়া যায়?’
‘আদি ও অকৃত্রিম—। মোস্ট ডিপেনডেবল। নিজের বইল্যা কথা? যে জীবজন্তুরা আদি ও অকৃত্রিম চার পাইয়্যা, তাগো সঙ্গে মানুষ পাল্লা দিবার পারে বানানো চার পা নিয়্যা?’
ওঁরা একসঙ্গেই হাসতে হাসতে বারান্দায় ওঠেন।
‘এই তো পণ্ডিত এসে গেছেন, বসেন। ছোট মতন একটা তুক হৌক-না মহারাজ। শুকনো মুখে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকব?’ এগিয়ে এলেন, নদীয়ার হরিপদ চট্টোপাধ্যায়। আসলে কৃষ্ণনগরের। গানের বাড়ি।
‘ক্যা? খাড়া থাইকবেন ক্যা? দরজা খুলে নাই নাকী মিটিঙের—’
‘দরজা তো খুলেছে কিন্তু ভেতরে তো কেউ নেই—’
‘আপনারা বারবাড়িতে থাইকলে অন্তঃপুর তো শূন্য থাইকবেই,’ বীরেন্দ্রকিশোর গুনগুনিয়ে উঠলেন, দরওয়াজা তোড় দে বাবুল—’
হরিপদবাবু চোখ বুজে ফেললেন, কিন্তু তাঁর মুখটা এমন আলোমাখা হয়ে গেল, যেন চোখ বন্ধ করেই তিনি বেশি দেখছেন, ‘আহা-হা’। আরো দু-চারজন তাঁদের দিকে এলেন।
যোগেন একটু এগিয়ে যায়। উপেন বর্মণ, জলপাইগুড়ির ক্ষত্রিয় সমিতির, দাঁড়িয়েছিলেন, ‘আইসেন মণ্ডলমশায় কিন্তু আমরা বোধহয় একটু আগে এসে গেছি।’
‘কেন? কী হইল? এহানেই তো?’
‘তাছাড়া আর কোথায় হবে? আপনাদের অ্যাসেমব্লি হবে কী না-হবে, তা ঠিক হওয়ার চার-বছর আগেই-না লেজিসলেচারের বিল্ডিং তৈরি হল। আমি অবশ্য জানি না—কাউন্সিল তো টাউনহলে বসত।’
‘এই যোগেন,’ ত্রিপুরার জগৎ মণ্ডল ডাকে।
যোগেন তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করে, ‘বিষয়ডা কী? জায়গা ভুল? সব কাউয়া-বামুনগো নাগাল বইস্যা আছে ক্যান? বেত্তান্তডা কী?’
‘আমারে কে জানাইছে যে আমি তোমার জানাব?’
‘আমার আগে তুমি আইস্যা যদি ঠাহর না পাইয়া থাকো তাইলে তোমার দৃষ্টিশক্তির খুব-একটা প্রশংসা করা যায় না—’
‘বেশ। আমারে যে তুমি কানা কইল্যা তাতে আমার আপত্ত নাই। কিন্তু তুমি অ্যাহন চারিদিগ ভাল কইর্যা দেইখ্যা-শুইন্যা যদি চোখের পাত সাতবার ফেলার আগে বেত্তান্তের আন্দাজ না পাও, তাইলে হানিফ-খলিফার দুকানে যাইয়্যা মগজখান মাইপ্যা আইসো –’
যোগেন লোকজন দেখার জন্য চোখ ঘোরাতে ঘোরাতে বলে, ‘হানিফ খলিফা? বইসে কুথায়? আরে, মান্যিগণ্যি সব মানুষজন তো আইসব্যার ধইরছে—এরা তো সব মন্ত্রী হইল স্যাদিন, না? মল্লিকদের বড় ভাই, বর্ধমানের মহারাজা, সাইরছে—কইল্যা-না, কই বসে হানিফ খলিফা?’
‘এড্ডা বটপাকুরের বিয়্যা হইল না, তার তলায়।’
যোগেন তখনো আনমনে দেখছে—কারা আসছে। কারা আসেনি। নাকী সকলেই আসছে। কোনো গোলমাল নেই। তাহলে গোলমাল একটা কিছু ঘটেছে বলা হচ্ছে কেন। ত্রিপুরার জগৎ সেটা বেশি জানে কী করে?
‘চেনা যাইব কী কইর্যা—কুনডা তোমার হানিফ খলিফার মিয়াবিবি বটপাকুড়?’
‘ক্যা? হানিফ খলিফা যে বটপাকুড়ের তলায় মাপ নেয়, সেই বটপাকুড়। হানিফ খলিফা কিন্তু পাঁচগাছির মঙ্গলবারের হাটে মাপ নেয় আর শুকুরবারের হাটে ডেলিভারি। ডেলিভারির হাটের দিন মাপ দিব্যার গ্যালে মাপ নিব না।’
যোগেন একবারও জগতের দিকে তাকাচ্ছিল না—সে জগতের সামনে থেকে নড়ছিল ও না। শালিখ পাখির মত চারদিকে তাকাচ্ছিল—’আমারে তো কইল্যা মগজ মাপাইতে। মগজের মাপের আবার ডেলিভারি কী? আমি ঐ মাপামাপির দিনই যাব। সত্যিই, মগজ মাপানো লাগে। কইয়্যা দ্যাও তোমার এই পাঁচগাছিডার নদীর নামডা কী?’
‘ক্যা? সেডা তো বিশ্ববিখ্যাত নদী, ভুলাগাদা-নুলিয়াডা।’
‘নদীর মুন্সিগঞ্জের তলায়?’
‘মাথা আর তলা কি ঠিকঠাক কওয়া যায়? সে-তুমি তো মতলবের মাথায়ও কইব্যার পারো। তাইলে সাব্যস্ত, হইলডা কী, মগজখান তোমার মাপাইবার লাগবই?’
‘লাইগ-না? এই মগজ নিয়্যা কইলকাতা শহরে দিকদিশা ঠিক থাহে? এইডা একখান্ মগজ? এতডা টাইম দিল্যা—এড্ডু খুইলল না—’
‘তা মাপাও হানিফ খলিফার কাছে পাঁচগাছির ভুলাগাদা—নুলিয়াডা নদীর পাড়ে বিয়াতি বটপাকুড়ের তলাতে। মঙ্গলবারের হাটে মাপ আর শুক্কুরবারের হাটে ডেলিভারি।’
‘কইল্যাম যে আমার ডেলিভারি নাই –’
‘আরে, যাইবি নে এতখান দূর কুমিল্লায়, এড্ডা ডেলিভারি নিবা না? অন্তত মগজ ঢাকা একখান নমাজি খুলিটুপি ডেলিভারি ন্যাও। সুতার না। দাম পাইয়া যাইব, ছিটের নিও।’
‘আরে জগৎ! এবারের মত মগজডা বাইচ্যা গেল।’
‘এবার বাইচলে, পছন্দ হয়, জন্মের মতনই বাইচল্যা। বুঝলাডা কী?’
‘বুইঝল্যাম—টুপি-মাথায় কেউ নাই, শাহেবরাও নাই, মিয়াশাহেবরাও নাই। গেল কই সব?’
‘মাত্তর একজনের মুখ থিক্যা বিত্তান্ত শুইন্যা দশরথরাজার সংসারও গেল, রাবণরাজার সংসারও গেল। এবার তুমি দশমুখের বিত্তান্ত যাচাই কইর্যা আইয়্যা আমারে কও।’
এর মধ্যে আরো অনেকে এসে গেছেন, ব্যাপারটা একটু গোলমেলেই হয়ে উঠছিল। শরৎ বোস আসতেই ন্যাশন্যাল চেম্বারের স্যার হরিশঙ্কর পাল তাঁর কাছে গিয়ে নিচু গলায় কথা শুরু করলেন। শরৎ বোস তাঁর কথা শুনে দুই হাত উলটে দিলেন। কোনো কথা না-বলে একটু সরে গেলেন। স্যার হরিশঙ্করও ইশারাটা বুঝলেন—ঘটনাটা নিয়ে শরৎ বোস কোনো কথা বলতে চান না। রাজা শিবশেখরেশ্বর তো স্বরাজ্য পার্টির আমল থেকেই মন্ত্রী, এবার তো স্পিকারের জন্য কংগ্রেসপ্রার্থী। স্যার হরিশঙ্কর পাল তাঁকে নমস্কার করে, তাঁর সঙ্গেও একটু কথা বললেন, সেটা ঠিক সৌজন্য বিনিময়ের মত দেখাল না। শিবশেখরেশ্বর, স্যার হরিশঙ্করের সঙ্গে একটুক্ষণ কথা বললেন। ততক্ষণে কানাকানিতে জানা হয়ে যাচ্ছিল যে জোহরের নমাজ সেরে সবাই নিজের-নিজের মশজিদ থেকে দেড়টার মধ্যে পৌঁছুতে পারবে না, অথচ, আজ স্পিকার ইলেকশন—যদি অ্যাসেমব্লি বসতে দেয় কংগ্রেস। তাই সময়টা পেছিয়ে হয়েছে দুটো পনের।
শ্যামাপ্রসাদ আসতেই স্যার নলিনীরঞ্জন তাঁর কাছে গিয়ে নিচু গলায় কিন্তু আঙুল নাচিয়ে কিছু বললেন। শ্যামাপ্রসাদ আর স্যার নলিনীরঞ্জন কারো মুখেই হাসি খেলে না—অনেকের মুখমণ্ডল এমন হয়, যে-কোনো কারণে, মুখের ওপরটায় হাসি বয়ে যাওয়ার মত কোনো নিশ্চিত জায়গা পায় না। তবু যদি হাসতেই হয়, তাহলে বেশিরভাগ সময়ই মনে হয়, ঠাট্টা করছেন অথবা ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদ হাসলেন, হাসলেন শুধু না—নলিনীরঞ্জনের বাহুতে হাত রাখলেন। ওঁরা খুব চাপা স্বরে কথা বলছিলেন না। পাশাপাশি যাঁরা ছিলেন তাঁরা তো শুনছিলেনই, আরো অনেকে শোনার জন্য তাঁদের পাশে চলে আসছিলেন।
শ্যামাপ্রসাদ বললেন, ‘এ কী নলিনীদা, আপনি তো ট্রেজারিতে, এসব কথা আপনি ক্যাবিনেটে বলতেও পারেন, কিন্তু আপনি অ্যাসেমব্লি বসার আগেই এরকম একটা কথা তুলবেন না।’
‘দেখো শ্যামাপ্রসাদ, আমি তো শুধু কথা তুলছি, আর যারা ঘটনাটা ঘটিয়ে দিল, তারা তো তোমার সৎ-পরামর্শের জন্য অপেক্ষা করেনি। নমাজপড়ার টাইম দিতে অ্যাসেমব্লি-বসার নোটিফায়েড সময় পেছিয়ে যাবে?’
‘আগে দেখুন, সত্যি কি পিছিয়েছে, কে পিছিয়েছে। আপনি তো এই ক্যাবিনেটের ফাদারফিগার—’
‘সে তো তোমাদের কংগ্রেসিওয়ালাদের ফ্যাকসন্যালিজমের দৌলতে। কংগ্রেস মন্ত্রিসভায় না-এসে দায়িত্বহীনতা না-দেখালে আজ নমাজের জন্য অ্যাসেমব্লির টাইম পেছুত না।’
‘নলিনীদা, প্লি-ই-জ, আপনি তো গবমেন্ট ফাংশন করার আগেই নো-কনফিডেন্স আনছেন। ‘আমি না শ্যামাপ্রসাদ, নো-কনফিডেন্স আনছে কংগ্রেস। তারা মেম্বারদের সই নিচ্ছে। ওদের নিজেদের তো ৫৪। আর ২৯টা ভোটের জন্য ওরা ইনডিপেনডেন্ট এস-সি আর কেপিপি ডিসেনড্যান্টদের ওপর নির্ভর করছে। তাহলে আজ স্পিকার ইলেকশন হতেই পারবে না।’
কানাকানিতে তত নয়, যতটা এখন মুখেমুখেই রটছে বারান্দায়।
দুপুরের নমাজের জন্য অ্যাসেমব্লির সময় পিছিয়ে দেয়ার কথা শুনে লাটশাহেব নাকী এত রেগে যান যে বলেন যে ৭৫ বছর ধরে এতগুলো অ্যামেন্ডমেন্টের মধ্য দিয়ে নমিনেটেড কাউন্সিল থেকে ইলেকটেড কাউন্সিল হয়েছে, তাতে তো মন্ত্রীরাও ছিলেন কিন্তু নমাজের জন্য কাউন্সিলের মিটিঙের সময় বদলাবার কোনো পূর্বদৃষ্টান্ত নেই। এসব সাম্প্রদায়িক ব্যাপারে কোনোভাবেই গবমেন্ট নিজেকে জড়াবে না। টেল দি পি এম
শুনে পি এম, মানে হকশাহেব, নাকী সোজা লাটশাহেবের কাছে গিয়ে বলেন—আমরা কোথায় কাউন্সিলের দৃষ্টান্ত নিচ্ছি? আপনিই তো কাউন্সিলের কথা তুললেন। কাউন্সিলে কি এত বড় ভোট হত? কাউন্সিল কি রিপ্রেজেনটেটিভ গবমেন্ট ছিল? কাউন্সিলে কি পি এম থাকত বা লিডার অব দি হাউস থাকত? এটা তো আপনার স্পেশ্যাল পাওয়ারের মধ্যে পড়ে না। আমি কি তাহলে ভোটমারানি প্রাইম মিনিস্টার?’
এসব গল্পের সুবিধে হচ্ছে—পাত্রপাত্রীদের স্বভাব জানা থাকলে গল্পটা ক্রমেই লম্বা হতে থাকে। হকশাহেব যে প্রতি মুহূর্তে বদলে যেতে পারেন সেটা যার জানা, তার কাছে এটা বিশ্বাস্য ঠেকে। ‘ভোটমারানি’-র কারণেই। অনেকে জানতেও চায়, ভোটমারানির কী ইংরেজি করেছিলেন হকশাহেব।
যাঁরা কোনো কারণে গল্পটা বিশ্বাস করতে চান, তারা একটা মত দেন যে ভোটমারানির কোনো ইংরেজি হয় না, হকশাহেব বরিশালি ভাষায় ‘ভোটমারানি’—শব্দটিই বলেছিলেন, বরিশালি অঙ্গভঙ্গিসহ। তাতেই নাকী লাটশাহেব বুঝে ফেলেন যে হকশাহেব, রিপ্রেজেনটেটিভ গবমেন্ট, অ্যাসেমব্লির সার্বভৌমতা ও লিডার অব দি হাউসের অধিকার নিয়ে একেবারে আইনি কথা তুলেছেন। লাটশাহেব যদি জিদ করেন, তাহলে লাটশাহেবের মুখে চুনকালি পড়বে যে তিনি কনসটিটিউশন্যাল গবমেন্টকে কাজ করতে দিচ্ছেন না। তিনি হকশাহেবকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘আপনার কি মনে হয় না এতে কমিউন্যাল টেনশন তৈরি হবে।’
হকশাহেব তাতে নাকী বলে ওঠেন, ডেফিনিটলি। আমাগো বেবাক ভোটার কি হুদাওনইয়া গিছে। দে ভোটেড ফর অলমোস্ট হাফ দি নামবার অব টোট্যাল সিটস ফর দি মুসলিমস। আমি তাগোই আগে সংবাদ দিব যে এ গবমেন্ট নমাজ-সরিয়তির গবমেন্ট নাকী নিজের হোগায় আউখ্যাওয়ালা বাঁশ দিব? ফজলুল হক ছাড়া আছে কেউ বাপের বেটা যে লাটশাহেবরে ইংরাজিতে হোগায় আউখ্যাওয়ালা বাঁশ দিতে পারে?
লাটশাহেব তখন বলেন, তাহলে হোক। সে দেখুন, আপনি যা ভাল মনে করেন, কিন্তু কারেকশনে কারণটা না বলে, এরকম বলাই ভাল যে বিশেষ পরিস্থিতির কারণে ইত্যাদি।
অনেক মেম্বার দ্বিতীয় নোটিশটা হাতেই পায়নি, অনেক মেম্বার বুঝেও উঠতে পারেনি ঘটনাটা কী। সেই কবে ভোট গিয়েছে এখনো অ্যাসেমব্লিতেই বসা হল না—অনেক মেম্বারের মনে এমন একটা আক্ষেপ ছিল, তাই, মিনিট পঁয়তাল্লিশ সময় পেছুনো এগুনো গ্রাহ্য না করে, বেলা একটা থেকেই তাঁরা একে-একে আসা শুরু করেছেন। শেষে দেখা গেল, অনেকেই জানেন না সময় পেছুনো হয়েছে। আর যাঁরা জানেন, তাঁরাও আসল কারণটা জানেন না, মানে, লাটশাহেব-প্রধানমন্ত্রীর কথাবার্তা। সেটা যাঁরা জানেন তাঁদেরও অনেকে জানেন না—আসল কারণটা হল দুই নমাজের ফাঁক।
তবে, সব মেম্বার তো আর একসঙ্গে আসেননি, তাই গল্পটা ছড়াচ্ছিল। এসব গল্প একবার গড়ালে গড়াতেই থাকে। ইয়োরোপীয় ব্লকের একজনও যখন আসেনি, তখন তাদের খবর দেয়ার ব্যবস্থাটা তাদের স্বজাতরা খেয়াল রেখেছে, বোঝা গেল।
এর ভিতর যে একটা হিন্দু-মুসলমানি ব্যাপার আছে—সেটা নলিনীরঞ্জনই প্রথম এমন খোলাখুলি বললেন। তবে বলার জন্য তাঁকে শ্যামাপ্রসাদের জন্য অপেক্ষা করতে হল—হিন্দু নিয়ে আর কোনো পার্টির কোনো নেতা তো কথা বলে না। তাঁরা মুখে কিছু না-বলে কাজে করে। শ্যামাপ্রসাদ এখনো আশা করে আছে—সে মন্ত্রী হবে। তাই নলিনীরঞ্জনকে প্রকাশ্যে নিষেধ করল—এ-কথা বলতে। মুসলিম লিগের নাজিমুদ্দিন-সারওয়ারদি-হবিবুল্লা ও প্রজা পার্টির হকশাহেবের কাছে ঠিকঠাক খবর পৌঁছে যাবে যে নলিনীরঞ্জন কতটা মুসলিমবিদ্বেষী ও শ্যামাপ্রসাদ, অন্তত ব্যক্তিগতভাবে, কতটাই অসাম্প্রদায়িক। এতে হুমায়ুন কবিররা জোর পাবে জিদ ধরতে যে শ্যামাপ্রসাদকে ক্যাবিনেটে নেয়া হোক। শ্যামাপ্রসাদকে কি নলিনীরঞ্জনও চান, মন্ত্রিসভার হিন্দু-মুসলমানের অনুপাতটা বদলাতে। নইলে তো বোঝা যাচ্ছে না—নলিনী সরকার আগে এসে বারান্দায় সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছেন কেন। তাঁকে না-জানিয়ে তো আর সময় বদলানো সম্ভব নয়।
