৪৬. হকশাহেবকে ডাকেন ছোটলাট, পরদিন মন্ত্রী হওয়ার লাইন
৩১ মার্চই সকালে অ্যান্ডারসন হকশাহেবকে ডেকে পাঠিয়ে বললেন, ‘আজ সন্ধ্যাতেই মন্ত্রিসভা তৈরি করতে হবে। আপনার লিস্ট দিন।’
আজ সকালে ডেকে স্যার বলছেন সন্ধ্যায় মন্ত্রিসভা? একটু তো সময় দেবেন স্যার? আমার তো লিস্ট শেষ হয়নি।’
‘এত সময় পেয়েও যদি লিস্ট না-হয়ে থাকে, তাহলে আর-কোনোদিনই হবে না। যা হয়েছে সেটাই দেখান। তারাই আজ মন্ত্রী হবে। বাকিরা না-হয় পরের কোনোদিন হবে।’
‘মন্ত্রির পদ না-বাড়ালে স্যার এরকম কোয়ালিশন সরকার তৈরি করা যায় না।
‘এটা একটা কোনো কাজের কথা হল? যত জন মন্ত্রী হতে চান, মন্ত্রিসভায় ততগুলো খালি পোস্ট বানাতে হবে? এ তো ভালো আবদার!’
হকশাহেব একটু হেসে বলেন, ‘তাহলে স্যার, পিএসসি-কে বলুন—একটা ইনটারভিউ নিয়ে লিস্ট বানাতে!’
‘কমিউন্যাল প্রোপরশন কী রেখেছেন?
‘স্যার, লিগ কিছুতেই ৫ : ২-এর বেশি রাজি না। পাঁচজন মুসলমান পিছু দু-জন হিন্দু।’
‘এ কখনো হতে পারে? হিন্দুরা এমনিতেই ক্ষেপে আছে, তারপর মাত্র দুই মন্ত্রি। আপনার মন্ত্রিসভা আপনি করতে পারেন। তার আগেই হিন্দুরা দাঙ্গা বাঁধিয়ে দেবে। প্রোপরশন ৪ : ৩ করে দিন।’
‘আমার খুব আপত্তি নেই, তবে লিগকে ডেকে বোঝান।’
‘তাহলে আজ সাড়ে ছটায় আসুন।’
‘তাহলে তো আজ মন্ত্রিসভা হচ্ছে না?’
‘সময় থাকলে হবে কিন্তু কোনো অবস্থাতেই কাল সন্ধ্যার পর নয়। বেটার, আপনারা কাল লাঞ্চ সেরেই আসুন। দুই পার্টির দু-জন করে। আপনি আর আমি। আপনারা তো আজ কথা বলবেন। কতক্ষণ আর লাগবে। আমি আমার সেক্রেটারিদের বলে রাখছি। প্রেসকেও বলে রাখতে বলব। আপনারা একেবারে মন্ত্রির মেকআপ নিয়ে আসবেন। চেঞ্জ করার জন্য আর বাড়ি যেতে চাইবেন না।’
পরদিন বেলা একটা থেকেই একে-একে সবাই আসতে লাগলেন এবং সেজেগুজেই। নলিনী সরকারই প্রথম এলেন—আদ্দির ধুতিপাঞ্জাবির ওপর শাল জড়িয়ে। গভর্নরের সেক্রেটারি তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন, ‘আসুন স্যার, অলওয়েজ প্যাংচুয়্যাল—’। নলিনী সরকার খুব একটা সৌজন্য দেখাতে পারেন না, তার ওপর তাঁর গাল-কপালের ভাঁজে-ভাঁজে বিরক্তি যেন স্থায়ী হয়ে গেছে। সেক্রেটারির নির্দেশে তিনি কোঁচাটা একটু তুলে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলেন। সিঁড়ির মাঝামাঝি যখন তিনি, তখন এলেন কাশিমপুরের মহারাজা শ্রীশ কুমার নন্দী। ছোটখাটো মানুষটি যেন আরো ছোট হতে চেষ্টা করেন, সকলেই নমস্কার করেন—কারো দিকেই না তাকিয়ে। তাঁর গায়ে বেনারসির কাজ করা একটা ভারী শাল—সেটার ভারে তিনি যেন আরো নুয়ে গেছেন।
মুকুন্দবিহারী এলেন একটা ট্যাক্সিতে। তিনি পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করতেই সেক্রেটারি এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমাদেরই ভুল হয়ে গেছে স্যার। কনভেয়ান্সের কথাটা জিগগেস করা হয়নি।’ সেক্রেটারি কাউকে ইঙ্গিত করলেন, ভাড়া মিটিয়ে দিতে, তারপর মুকুন্দবিহারীকে বললেন, ‘এই দিকে, প্রফেসর।’ মুকুন্দবিহারী তাঁর দিকে তাকিয়ে হাসলেন, সরকারি জায়গায় ‘স্যার’-এর বদলে ‘প্রফেসর’ শুনতে তাঁর ভাল লাগল। তাঁর একটা গলাবন্ধ তসরের কোট, কাঁধে একটা নকশাহীন চাদর ভাঁজ করা। লম্বা মানুষ, সোজা উঠে গেলেন, সিঁড়ির দিকে একবারও না-তাকিয়ে।
ফজলুল হকের গাড়ি আসতেই, যাঁরা এঁদের অভ্যর্থনা করছিলেন তাঁদের মুখে হাসি ফোটে। গাড়ি থেকে নামতে তাঁর একটু সময় লাগে। একটু মেটে রঙের আচকান, লম্বা ঝুলের, মাথায় একই রঙের টুপি। তিনি নামার আগেই সারওয়ারদি তাঁর ছোট গাড়ি থেকে নেমে তরতরিয়ে সিঁড়ি ভেঙে উঠে গেছেন। সারওয়ারদি টেরই পাননি—হকশাহেব নামছেন। হকশাহেব ততক্ষণে নেমে, দাঁড়িয়ে, সিঁড়ির মাথায় সারওয়ারদির দিকে আঙুল তুলে, সেক্রেটারি ও তাঁর দলবলকে বলছেন, ‘ছোটখাটো হওয়ার সুবিধা কত’, বাঙালিরা হাসলেন, শাহেব-সেক্রেটারি হাসি-হাসি মুখে তাকিয়ে থাকলেন। হকশাহেব তাঁর দিকে তাকিয়ে ইংরেজিতেই বললেন, ‘একটা গল্প শুনুন, গল্প না ফ্যাক্ট। সেকেন্ড রাউন্ড টেবল কনফারেন্সে গেছি। একদিন শুনলাম রাজপ্রাসাদে,বাকিংহামেই, সম্রাট আমাদের চা-পানে আপ্যায়িত করবেন। ছাপা কার্ডও এল। যাওয়াও হল সবাই মিলে। আমরা ঘুরেফিরে চা খাচ্ছি, কথা বলছি। আমি যখন রাজমাতার সামনে পড়েছি, উনি আমার বৃহদাকার মাথা থেকে পা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন—আমাদের ইনডিয়ার কোন্ প্রদেশ থেকে আপনি আসছেন? আমি বললাম—ফ্রম দি প্রোভিন্স অফ বেঙ্গল, ইয়োর মেজেস্টি। উনি বললেন—ওখানকার সব লোকই কি তোমার মত লম্বা-চওড়া? আমি বললাম—লজ্জার কথা, ইয়োর মেজেস্টি, তাদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে ছোটখাটো।’
কেতা ভুলে সবাই জোরে হেসে উঠেই থেমে যায়। সেক্রেটারি হকশাহেবকে নিয়ে সিঁড়ি ভাঙেন।
এ সবই হচ্ছিল গভর্নরস প্লেসের উত্তর গেটে। ধুতি পাঞ্জাবি পরা, কাঁধে একটা চাদর, হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে একজন হেঁটে আসছিলেন। গভর্নরস প্লেসের আঙিনা জোরা মারাম পাথরের জন্য তিনি তাড়াতাড়ি আসতে পারছিলেন না। সেক্রেটারি তাঁর দলবলের দিকে তাকিয়ে চাপা গলায় বললেন, ‘পায়ে হেঁটে যাঁরা আসবেন, তাঁদের জন্য গেটে গাড়ি রাখোনি কেন।’ নিজেই আগন্তুকের দিকে এগলেন, ‘সরি স্যার। আমাদের উচিত ছিল কনভেয়ান্সের কথা জেনে নেয়া। আপনার নামটা স্যার?’
‘যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল। আমি তো আমার কনভেয়ান্সেই এসেছি। আমার বাড়ির সিঁড়ির গোড়া থেকে উঠেছি। আপনাদের বাড়ির সিঁড়ির গোড়ায় নেমেছি, বাই দি কার্টসি অব ক্যালক্যাটা ট্র্যামওয়েজ কোম্পানি।’
শাহেব একগাল হেসে সোপানরাজি দেখিয়ে বলেন, ‘আসুন, স্যার।’
গভমেন্ট প্লেসের একতলার দরবার হলে সবাই দেয়ালে সারি দেয়া সোনালি হাতলের মেরুনগদির চেয়ারে বসে আছেন। কিন্তু এঁরা সকলে তাঁরা কেন একটাই কারণ জানেন না, তাঁরা কেন এখানে এসেছেন। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি এসে হকশাহেবের পাশের খালি চেয়ারটাতে বসে হকশায়েবের কাঁধ চাপড়ালে একটু অবাক হন অনেকেই কারণ বেশিরভাগই জানেন না, হকশাহেবের সঙ্গে স্যার আশুতোষের পারিবারিক সম্পর্ক।
শ্যামাপ্রসাদের প্রবেশে—যাঁরা যা জানতেন, এখানে তাঁর নিজের আসার কারণ কী, তাও গুলিয়ে ফেললেন। কেউ-কেউ ভেবেছিলেন—মন্ত্রি হতে ডাকা হয়েছে। যাঁদের প্রচেষ্টা ও প্রত্যাশার মধ্যে সেটা ছিল, তাঁরা নতুন করে ভাবলেন–হয়তো দু-চারজনকে অতিথি হিশেবেই ডাকা হয়েছে। কিন্তু অতিথি হিশেবে যদি কাউকেই ডাকা হয়ে থাকে, তাহলে যাঁরা অনিবার্য, তাঁদের তো অনেকেই নেই। বিশেষত কংগ্রেসের। কংগ্রেসের একজনও নেই। হতে পারে, প্রদেশ কংগ্রেস বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হতে পারে, ওয়ার্কিং কমিটি থেকে নিষেধ এসেছে। মন্ত্রিসভা ঘোষণা হলে তো তার একটা বন্দবস্ত থাকবে। দেখে তো মনে হচ্ছে না। কিন্তু এখানে তো কাউকে জিজ্ঞাসা করাও সম্ভব নয়।
স্যার বি পি সিংহ রায় আর স্যার ফারুকি বসেছিলেন পাশাপাশি। ওঁরা বহুকালের মন্ত্রি। গবমেন্ট প্লেসে তাঁরা এসেওছেন অনেক বার। তাঁরা স্বচ্ছন্দ ছিলেন। স্যার ফারুকি স্যার বি পিকে বললেন, ‘আচ্ছা, একবারও না আটকে আপনি ছোট-বর্ধমানের নামটা বলতে পারবেন?’
‘আপনি বলাতে সন্দেহ হচ্ছে পুরো নামটা আমি বোধহয় জানিই না।’
ঢাকার নবাব হবিবুল্লাকে শাহেবরা যেখানে বসালেন, তিনি সেখানেই বসলেন কিন্তু বসে খুশি হলেন না। তাঁর বাঁ হাতের লোকটিকে তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, ‘আপনার সঙ্গে বোধহয় পরিচয় হয় নাই আমার। আপনার জায়গার নামটা বলবেন?’ ‘কবিরুদ্দিন। মৈমনসিং’। বসার জায়গা নিয়ে নবাবশাহেবকে তো কখনো ভাবতে হয়নি। মিটিং যারা ডাকে তারা অথবা নবাবশাহেবের নিজের লোকরাই আগে থেকে চেয়ারটেয়ার ঠিক করে রাখে আর তাঁর পাশে চেয়ারে কারা বসবেন, তাও ঠিকই থাকে। এটা তো লাটশাহেবের ডাকা মিটিং। এখানে তো তাঁর লোকজনকে ঢুকতেই দেবে না। তাঁর একটু দেরিই হয়েছে—সময়ে এলে নিজের পছন্দমত জায়গায়, নিজের পছন্দমত লোকজনের মধ্যে বসতে পারতেন।
তিনি তাঁর ডানহাতি লোকটিকেও তার পরিচয় জিজ্ঞাসা করায় সে ভদ্রলোক পরিস্থিতি- শোভন গলা নাবিয়ে বললেন, ‘নোয়াখালি-র। মানে সৈয়দ গোলাম সারওয়ার হোসেইনি’। এঁকেও নবাবশাহেব চিনতে পারলেন না আর এঁরাও এমন কোনো জানান দিলেন না যে এঁরা নবাবশাহেবকে ঢাকার নবাব বলে চিনেছেন। তাঁর ডান হাতে যিনি, তাঁর নিজের নাম ছোট না করায় ও নিচু স্বরেও গলাটা একইরকম শোনানোয় মনে হয় তিনি অন্তত আশা করেছিলেন, তাঁর নাম শুনলেই তাঁকে চেনা যাবে।
নবাবশাহেব দু-জনের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বললেন, ‘এইটাই সবসে বড়া বাহ্। হামনে—এতনা মুসলিম লোগ, হামাদের জানপয়চান নাই। লেকিন আভি ইসলাম ইউনিটি কো বাদ হামলোগকে জানপয়চান হবে। এইটাই সবসে বড়াবাত্। মুসলিম ইউনিটি।’
‘হুজুর, জমিদার যদি মুসলিম হয় তয় এই ইউনিটি থাকব তো?’ শাহেবরা বলে।
‘কেন? শোচতা কিয়া?’
‘ধরেন, হিন্দু জমিদারের জইন্য এক আইন আর মুসলমান জমিদারের জইন্য এক আইন হওয়ার দুষ কী?’
‘উ কেইসে হোনা শেকতা? আইন জরুর এক হোগা।’
‘হুজুর, মুগল-বাদশাগো টাইমে ছিল তো এমন আইন? অ্যাহন যুদি মুসলমানের রাজত্ব হয় তেমন আইন হওনের বাদা কী?’
‘হুজুর’ বলায় নবাবশাহেব বুঝতে পারেন, লোকটি তাকে চিনেছে। এতে খুশি হয়ে তিনি বলেন, ‘বাদশাকো বেটা বাদশাজাদা। আপ তো ভোট কো বেটা ভোটজাদা, নবাবশাহেব নিজেই যথাযথ হেসে তাঁর ডান ও বাঁকে জানিয়ে দিলেন এটা রসিকতা। বাঁ হাসলেন না।’ ডান হাসলেন।
যে-দরজা দিয়ে ঢুকেছে, তার ডান হাতি সারির মাঝামাঝি বসেছিল। সে খানিকক্ষণ এই দরবার ঘরের গড়নটা দেখে। চার দেয়ালে চারটি বিশাল সিংহদ্বার। যোগেন যেখানে বসেছিল সেখান থেকে দক্ষিণের দরজার ওপারে পাথরের বারান্দা আর সিঁড়ি খানিকটা দেখতে পায়। দক্ষিণই তো হবে ওদিকটা। এত বড় বাড়ি, এত বড় দরজা, এত বড় ঘর, এত বড়-বড় চেয়ার—যোগেনের মত যারা বসে আছে তাদের সবাইকেই ছোট লাগছে। নলিনী সরকার মশায়, খাজা নাজিমুদ্দিন, স্যার ফারুকি, স্যার বিপি—এরা যখন, জনসভা করে বা ঘরের মধ্যে মিটিং করে, তখন তো সবাই সমান। সেই সমানের মধ্যেও ওঁরা সমান থাকেন না। নিজেরা যে নিজেদের আলাদা করেন, তা নয়। সব মিলিয়ে ওঁরা আলাদা হয়ে যান। যারা মিটিং ডাকে, তাদেরও দেখাতে হয় যে কত বড় নেতাকে তারা এনেছে। যাঁরা আসেন, তাঁরাও দেখান যে তাঁরা এসেছেন। কিন্তু এখানে কেমন শ্মশানের একতা—কারণ, যিনি সভা ডেকেছেন, তাঁর, লাটশাহেবের, মাপ অনুযায়ী মাথা পিছু একটা চেয়ার। যোগেন আলো দেখছিল। এক পশ্চিমের দরজাটাই বন্ধ। সেখানে শাহেবসুবো অফিসাররা দাঁড়িয়ে। পাগড়িপরা চাপরাশিরা কাচের গ্লাসে ঠান্ডা জল আর চিনেমাটির কাপে চা নিয়ে ঘুরছে। আলো তো কিছু কম না, যদিও মাঝখানের ঝাড়টা জ্বলানো হয়নি। তবু ঠিক চেনাই যাচ্ছে না—কোন্ চেয়ারে কে বসে। অথচ দাঁড়ানো শাহেবদের মুখগুলো তো দিব্যি পরিষ্কার। সে হয়তো তাঁরা যোগেনের কাছাকাছি বলে। বা, শাদা চামড়ায় আলো ঠিকরয়।
যোগেন তার বাঁয়ে বাখরগঞ্জেরই আফতাব খাঁকে বলে, ‘এই একখান ঘর যদি আপনারে দেয়া হয়, নিবেন?
‘শুদু ঘরখান? নাকী লাটশাহেবের বেতনসহ?’
‘আপাতত ঘরখানই থাউক। বেতনটা মুলতুবি থাক।’
‘বেতন না হইলে এই ঘরখান ধোয়ামোছার খরচা আইসবেনে কোখন?
‘এইডা তো বরিশাইল্যা বুদ্ধি। দিল্যাম একখান ঘর, কয় যে ধোয়ামোছার পয়সা দ্যাও। লাটশাহেবের ব্যাতন যত বেশিই হোক গা, উনি কি বেতন খরচা কইর্যা ঘর মোছেন।’
‘তয়? এমন একখান মোকানের ঘরদ্বার সাফ রাহা কি চাড্ডিখান পয়সার কথা?’
‘স্যায় খরচা তো সরকার দ্যায়।’
‘কুন সরকার?’
‘য্যায় লাটশাহেব চাকরি দ্যায়—’
‘এই যে-সরকার হইব আইজ, হকশাহেবরে নিয়্যা?’
‘সে-সরকার তো হকশাহেব আর আর-আর মন্ত্রীগ মায়না দিব্যার পারে। হকশাহেব তো মন্ত্রী কইরব্যার পারে, লাটশাহেব পাইব কোথায়?’
‘তাহাইলে তুমিই-বা এই ঘরখান আমারে দিব্যার চাও কোন সুবাদে? লাটশাহেবি বাদ, শুদু ঘর? এ তো তোমার বরিশ্যাইল্যা বাণিজ্য। পাথরডাঙা জমিরে দ্যাও ব্রহ্মোত্তরে।’
যোগেন হেসে ফেলে মুখ চাপা দেয়, ‘দিল্যাম একখান এমন ঘর। ব্রহ্মোত্তর কইরা নিল্যা না? না-নিল্যা!’
‘অত দানছত্র না-বাঁধায়ইয়া কও তো আমাগ এইহানে ইদের কোরবানির উটের নাগাল খাড়াইয়া থুইছে ক্যান? জানো কিছু?’
‘আমি নি জীবনে লাটশাহেবের দাওয়াত খাইছি তোমার থে বেশি? ক্যামনে জানি?’
‘এটুক্ তো জানা লাগে—কোরবানি দিলে আজই দিব তো?’
‘এইটুকুই জানি—বামুনবাড়ি নেমন্তন্ন, না-আঁচাইলে বিশ্বাস নাই।’
দরবার ঘরের পশ্চিমের দরজাটা খুলে গেল, যেন নিজের থেকেই। অত বড় দরজাটার খুলে যাওয়াটাও তো দেখার মত। সেই দরজা দিয়ে ঘরের ভিতর এগিয়ে এলেন সুট-বুট-টাইয়ে গণ্ডাখানেক শাহেব। যোগেন কাছাকাছি ছিল বলে চিনতে পারে—এঁদের মধ্যে লাটশাহেব নেই, কারণ, লাটশাহেবের সঙ্গে তার একদিন কথা হয়েছে অল বেঙ্গল সিডিউল্ড কাস্ট লেজিসলেচার পার্টির সম্পাদক হিশেবে—লাটশাহেবই ডেকে পাঠিয়েছিলেন।
মাঝখানের শাহেব কয়েক পা এগিয়ে এসে বলেন, ‘লেডিজ অ্যান্ড জেনটেলমেন’, তারপর সবার ওপরই খুব তাড়াতাড়ি চোখ বুলিয়ে হেসে বলেন, ‘কিন্তু এখানে একজনও মহিলা নেই বলে আমি সরি বলছি না। মহিলারা না থাকলে জেন্টেলমেনেরাও জেন্টেলমেন হন না।’ কেউ-কেউ বুঝল, কেউ-কেউ বুঝল না, ছোট্ট একটা হাসি যে-উঠল, সেটাও শাহেবরাই হাসলেন।
‘ওয়েল। হিজ এক্সেলেন্সি আমাকে আপনাদের সবাইকে ওয়েলকাম ও থ্যাঙ্কস জানাতে বলেছেন। আপনারা যে এত শর্ট নোটিশে সবাই এখানে এসেছেন, তাতে তিনি খুবই আশাবাদী। হিজ এক্সেলেন্সি আজই তাঁর নতুন মন্ত্রিসভার নাম প্রকাশ করবেন ও মন্ত্রিরা আজ থেকেই তাঁদের দায়িত্ব বুঝে নেবেন। মন্ত্রিসভা ঘোষণার আগে হিজ এক্সেলেন্সি একটা আলাদা বৈঠকে এই আসন্ন মন্ত্রিসভার কোয়ালিশনের প্রধান দলগুলির সঙ্গে একটা মিটিং করে নেবেন ও আমরা আশা করি সে-মিটিংটা খুব তাড়াতাড়ি শেষ হবে। আমি মিস্টার এ-কে ফজলুল হক, মিস্টার নৌসের আলি, মিস্টার তামিজ-উদ্দিন আহমেদ, স্যার নাজিমুদ্দিন, মিস্টার সারওয়ারদি অ্যান্ড মিস্টার জে.এন. মণ্ডল—এই ছয় ভদ্রলোককে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি আমাকে অনুসরণ করে হিজ এক্সেলেন্সির কাছে নিজেদের উপস্থিত করতে—টু ফলো মি টু প্রেজেন্ট দেমসেলভস বিফোর হিজ এক্সলেন্সি। আমাদের পরবর্তী ঘোষণার আগে আপনারা পরস্পরকে সঙ্গ দিন।’
যাঁদের নাম বললেন চিফ সেক্রেটারি তাঁদের সকলেই নিজের-নিজের চেয়ার থেকে উঠে এগিয়ে গেলেন। হয়, যে-চেয়ার থেকে তাঁরা উঠলেন, সেই চেয়ারগুলির গড়নের কারণেই সেটাতে বসা ও সেটা থেকে ওঠা বেশ স্মার্ট দেখায়, নয়তো ঘর জোড়া নরম কার্পেটই তাঁদের অমন হাঁটিয়ে দিল—যেন তাঁরা জানেন তাঁদের আলাদা মিটিঙে ডাকা হবে। যোগেন দরজাটার সবচেয়ে কাছে ছিল। তার নামটাও ডাকা হয়েছে শেষে। সে সত্যি জানত না, তাকে ডাকা হবে। এর ভিতর তার ডানপায়ের স্যান্ডেলটা খুলে গিয়েছিল, সেটা আর পায়ে না নিয়ে সে বরং বসে-বসে কার্পেটটার নরম স্বাদ নিচ্ছিল ডানপায়ের আঙুলগুলির তলায়। ফলে, তার নাম শুনে একটু চমকে ডানপায়ের স্যান্ডেলটা আবার গলিয়ে নিতে-নিতে স্যার নাজিমুদ্দিন আর তামিজউদ্দিন দরজা দিয়ে গলে গেছেন, সারওয়ারদির পেছনে হকশাহেব, যোগেন হকশাহেবের পেছন-পেছন ঢোকে। দু-জন শাহেব বাদে বাকিরাও এঁদের সঙ্গে ঢোকেন। যোগেন ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, তাদের পেছনে সেই দরজার প্রকাণ্ড পাল্লাদুটো আস্তে-আস্তে জোড়া লেগে যাচ্ছে, যতক্ষণ তারা ডানহাতি একটা ঘরে ঢুকে দেখে বেশ একটা বড় টেবিলের ওধারে লাটশাহেব বসে, তাঁর চোখের সামনে একটা কাগজ। ঐ হলঘরের চেয়ারের মতই চেয়ার সাজানো—একটু উঁচু পিঠ, একটু লম্বা বাঁকানো হাতল ও সামনের পায়া দুটি থাবার মত এগনো। পিঠের মাথা, হাতল ও পায়ার বাঁক সোনালিতে চকচক করছে। হকশাহেব, সারওয়ারদি, নৌসের আলি প্রথম সারিতে বসে গেছেন। দ্বিতীয় সারিতে যে তাঁকে বসতে হল এতে স্যার নাজিমুদ্দিন খুশি হননি—তিনি দ্বিতীয় সারির প্রথম চেয়ারটিতে বসতেই তমিজউদ্দিন এসে তাঁকে ইঙ্গিত করে সরে বসতে কিন্তু স্যার নাজিমুদ্দিন হাত দেখিয়ে তাকে ভিতরে বসতে বলেন। এমন সারি দেয়া চেয়ারে সাধারণত ভিতরে ঢোকার জায়গা থাকে না। এখানে অবিশ্যি অনেকটা ফাঁক ছিল। যোগেন অন্য দিক দিয়ে ঢুকে তমিজউদ্দিনের পাশের চেয়ারে বসে পড়ল। একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, না, চেয়ারের কোনো অভাব নেই, সে পেছনেও বসতে পারত।
ততক্ষণে লাটশাহেব চাপা গলায় গরগরাতে শুরু করেছেন আর শাহেবরাও একটু ছড়িয়েছিটিয়ে বসে কাগজ কলম ধরেছে।
‘ওয়েলকাম। আপনারা বুঝতেই পারছেন, আমার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে আজ মন্ত্রিসভাকে কর্মভার দেব। মিস্টার ফজলুল হক-যিনি এই মন্ত্রিসভার প্রধান হবেন বলে কোয়ালিশন পার্টিগুলি, অল ইনডিয়া মুসলিম লিগ ও কৃষক-প্রজা পার্টি একমত হয়েছেন—তাঁকে আমি জানিয়েছিলাম যে আজই মন্ত্রিসভা গঠিত হবে। মিস্টার হক আমাকে জানিয়েছিলেন যে মন্ত্রিসভার হিন্দু-মুসলমান অনুপাত এখনো স্থির হয়নি ও কারা-কারা মন্ত্রী হবেন সেটাও পাস হয়নি। আমি এগুলোকে মন্ত্রিসভা গঠনের কাজ পেছিয়ে দেয়ার পক্ষে যথেষ্ট কারণ মনে করি না। আপনারা নিজেদের মধ্যে নিশ্চয়ই অসংখ্যবার কথা বলেছেন। সুতরাং এখনো ঐ দুটি বিষয় আলোচনা চলতেই থাকলে, খুবই আশঙ্কা হচ্ছে, একই যুক্তি ফিরে-ফিরে আসবে। মিস্টার হকের সঙ্গে কথা বলে মন্ত্রিসভার সদস্য হিশেবে আপনারা যাঁদের নামে একমত হয়েছেন ও যাঁদের নাম নিয়ে মতভেদ আছে—তাঁদের সকলকেই আমি আজ এখানে আসতে বলেছি। কাদের আসতে বলা হবে—সেটা আমি নিজের দায়িত্বে স্থির করেছি। সে-বিষয়ে মিস্টার হকের কোনো দায়িত্ব নেই। আমি আপনাদের অনুরোধ করছি, মন্ত্রিসভার ধর্মীয় আনুপাতিক হার নিয়ে পুরনো যুক্তিগুলির পুনরুক্তি করবেন না। মনে করুন সকলেরই হ্যাঁ ও না-বলার অধিকারটুকুমাত্র আছে। আমারও তাই। আমি কিছু কারণ জানতে চাইলে, জানাবেন। আপনারা কোনো কারণ নিয়ে কিছু বলবেন না যেহেতু আপনারা কারণগুলি জানেন। মিটিঙের কাজ দ্রুত শেষ করার উদ্দেশ্যে আমরা আমাদের আলাপ-আলোচনার পরিধি ছোট করে আনতে চাই। যে-নামগুলি নিয়ে কোনো মতান্তর নেই, সেইগুলো আমরা আগে নিচ্ছি। জেন্টলমেন, নতুন বাংলা সরকারের নেতা আপনারা। আপনারা আপনাদের প্রথম কাজটি সম্পন্ন করুন।’
লাটশাহেব তাঁর চোখের সামনে ধরা কাগজটি থেকে পড়তে থাকেন, ‘মিস্টার ফজলুল হক, মিস্টার নলিনীরঞ্জন সরকার, স্যার নাজিমুদ্দিন, স্যার হবিবুল্লাহ, স্যার বি পি সিংহ রায় অ্যান্ড মিস্টার সারওয়ারদি। এই ছ-জনকে নিয়ে কোনো মতান্তর নেই।’
একটা আঙুল তুলে দাঁড়িয়ে সারওয়ারদি বলেন, ‘মন্ত্রিসভায় আমার থাকা-না-থাকা নির্ভর করে আমাকে কোন্ দপ্তর দেয়া হয় তার ওপর।
‘আপনি প্লিজ বসুন। যখন দপ্তর নিয়ে কথা হবে, তখন দপ্তরের কথা বলবেন। আমরা এখন ব্যক্তি নিয়ে কথা বলছি—এটা ধরে নিয়ে যে এই ছ-জন যে-কোনো দপ্তরের দায়িত্ব নিতে সমর্থ। যে-নামগুলি জানালাম তাতে ধর্মীয় অনুপাত দাঁড়ায় ৪ : ২। আমরা মুসলমান সমাজ থেকে আরো দু-জন ও হিন্দু সমাজ থেকে আরো তিনজন নেব। আমার সুপারিশ—নৌসের আলি, স্যার ফারুকি, এস-পি মুখার্জি, মুকুন্দবিহারী মল্লিক আর মিস্টার রায়কত। নো রিজ আমরা সবাইই তা জানি। আপনারা কি আমার সুপারিশের সঙ্গে একমত? তাহলে, আমি মিস্টার হককে দপ্তরগুলো কীভাবে ভাগ করতে চান সে-কথা বলতে বলব।
হকশাহেব বলে ওঠেন, ‘সে তো বলছি। কিন্তু ফারুকির সঙ্গে এক মন্ত্রিসভায় আমি কাজ করতে পারব না। আমি যাদের কাছে টাকা ধার করেছি, উনি তাদের একজোট করে আমার বিরুদ্ধে কোর্টের ডিক্রি বের করেছেন’
‘মিস্টার হক, প্লিজ নো রিজন। আপনার সাজেশনটা বলুন।’
‘সামসুদ্দিন। তাতে পার্টি প্যারটিটাও থাকবে।
‘ঠিক আছে। অন্য কোনো নাম নিয়ে তো আপনার আপত্তি নেই?’
‘না। ঠিক আছে।’
‘আর কারো কি কোনো নামে আপত্তি আছে অ্যাজ সিভিয়ার অ্যাজ হকশাহিস? আমি আবার পড়ছি—নৌসের আলি, সামসুদ্দিন, এস পি মুখার্জি, মুকুন্দবিহারী আর রায়কত।’
নাজিমুদ্দিন জিজ্ঞাসা করেন, ‘এস পি মুখার্জি বলছেন? কী, শ্যামাপ্রসাদ?’
‘হু এলস? দি ভাইসচ্যান্সেলর।’
‘ওঁকে নিলে তো মুসলমানরা এতটাই অপমান বোধ করবেন যে ব্যাপারটা ল অ্যান্ড অর্ডার প্রবলেম হয়ে যেতে পারে। দরকারটা কী?’
‘মন্ত্রিসভার প্রত্যেকেই নিশ্চয়ই যোগ্য। এঁদের প্রত্যেকের পেছনেই জনসাধারণের এক-এক অংশের সমর্থন আছে। তৎসত্ত্বেও আপনাদের তো এমন কিছু অত্যন্ত দক্ষ ও অভিজ্ঞ মন্ত্রী দরকার। এঁদের পেছনে হয়তো রাজনৈতিক জনসাধারণের কোনো গোষ্ঠী নেই। কিন্তু এঁদের দক্ষতা-কৃতিত্ব নিয়ে কারো কোনো সন্দেহ নেই। মিস্টার নলিনীরঞ্জন সরকার ও ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যুক্ত থাকলে এ মন্ত্রিসভার গ্রহণযোগ্যতা রাতারাতি বেড়ে যাবে।
‘সঙ্গে-সঙ্গে তো কমিউন্যাল টেনশনও বেড়ে যাবে। এটা জনমতের বিরুদ্ধতা করা হবে -বার আনি, মুসলমানদের পুরো মানে আট আনি, আর হিন্দুদের অন্তত চার আনি’।
‘বুঝেছি। আপনাদের মত নেই,’ এক শাহেব এসে লাটশাহেবের সামনে একটা ছাপানো কাগজ রেখে দিল। লাটশাহেব চোখ নামিয়ে দেখেন আর তারপর কাগজটা হাতে তুলে নিয়ে বললেন, ‘আপনাদের নজরে পড়েছে নাকী? ক্যালকাটা মজলিশের খবর। কাল সন্ধ্যায় ওদের নেতারা মিটিং করে বলেছেন যে আমরা খবর পেলাম অধ্যাপক হুমায়ুন কবির ও আরো কয়েকজন নেতা মন্ত্রিসভায় শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জিকে ঢোকাবার ষড়যন্ত্র করছেন। আমরা এতে তীব্র আপত্তি জানাই। কিছুদিন যাবৎ কলকাতা বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষক নিয়োগ ও শিল তৈরি নিয়ে ডক্টর মুখার্জি যে সাম্প্রদায়িক একগুঁয়েমির প্রমাণ দিয়েছেন তাতে নিশ্চিতরূপে বলা যায়-শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি যদি বাংলার মন্ত্রিসভায় নিযুক্ত হন তাহলে আমরা অন্তত রক্তগঙ্গা বইয়ে দেব।’
লাটশাহেব কাগজটা রেখে বললেন, ‘যদিও আমার মনে হয় মিস্টার মুখার্জিকে মন্ত্রিসভায় রাখলে অ্যাডমিনিস্ট্রেশন উপকৃত হত, তবু আমি আপনাদের অসম্মতি মেনে নিলাম। সেখানে মহারাজ শ্রীশ কুমার নন্দীকে নেয়া হোক। পুরনো মানুষ, অনেক দিন কাউন্সিলে আছেন আর সম্ভবত ওঁর সবচেয়ে বড় গুণ—ওঁর কোনো বিরোধী পক্ষ নেই।’
কেউ কোনো কথা বললেন না। লাটশাহেব বললেন—’বাকি দুজনের একজন সবচেয়ে বড় শিডিউল্ড কাস্ট, রাজবংশীদের প্রতিনিধি, আরেকজন প্রায় সমপরিমাণ বড় নমশূদ্রদের প্রতিনিধি। তাহলে চলুন। আমরা ওদের অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। মিস্টার হক এখনই দপ্তর ঘোষণা করতে পারেন। নইলে, আজই একটু পরে, বা কাল, সকালে।’ লাটশাহেব উঠে দাঁড়ালেন, সঙ্গে-সঙ্গে এঁরাও।’
সবাই দাঁড়ানোয় যোগেন পেছনে ও আড়ালে পড়ে যায়। সে চেয়ারের সারির শেষ সারি ঘুরে : লাটশাহেবের পথ আগলে দাঁড়ালে লাটশাহেব থেমে যান।
‘ইয়োর এক্সেলেন্সি, আমাকে কেন ডাকা হয়েছিল বুঝতে পারলাম না।’
যোগেনকে চেনার কোনো কারণ ছিল না। লাটশাহেব অফিসারদের দিকে তাকালে চিফ সেক্রেটারি চাপাস্বরে তাঁকে কিছু বলেন। লাটশাহেব আবার কিছু জিজ্ঞাসা করেন। কিন্তু চিফ সেক্রেটারির জবাব পুরোটা না শুনেই ঘাড় ঘুরিয়ে যোগেনকে হেসে বলেন ও তার কাঁধে হাত দেন, ‘দে উইল এক্সপ্লেন। বাট ফর আস, টু গিভ কোম্পানি।’
যোগেনের কাঁধে হাত রেখে পরের পা ফেলতেই লাটশাহেবের হাতটা খসে গেল। এঁরা সকলেই সেই বড় দরজার দিকে চললেন কিন্তু লাটশাহেব তাড়াতাড়ি হাঁটায় এঁদেরও তাড়াতাড়ি হাঁটতে হচ্ছিল। এইটুকু আসতেই কেউ-কেউ পেছিয়ে পড়ছিলেন, তাঁরা আবার দু-পা দৌড়ে ভিড়টায় ভিড়ছিলেন। দরজাটা খুলতে শুরু করে।
দরবার-ঘরের সবাই দাঁড়িয়ে পড়েন। লাটশাহেব বসেন না—তাই কেউই আর বসেন না। নবাব হবিবুল্লার দাঁড়িয়ে থাকায় হাঁটুর সমস্যা আছে। তিনি পেছনে হাত দিয়ে চেয়ারের হাতলটা ধরে সোজা থাকেন। ‘আপনাদের একটা শুভসংবাদ দেব বলে এতক্ষণ বসিয়ে রেখেছি। ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন অনুযায়ী অনুষ্ঠিত প্রথম নির্বাচনের ফলাফল ও বিভিন্ন পার্টির সঙ্গে আলোচনার পর মিস্টার ফজলুল হককে মন্ত্রিসভা গঠন করতে আহ্বান করি ও আজ সেই মন্ত্রিসভা ঘোষিত হচ্ছে।’
হাততালির জন্য লাটশাহেব থেমেছিলেন। তাঁর পেছনে শাহেবরা হাততালি শুরু করলে, হাততালি ছড়িয়ে পড়ে ও ক্রমোচ্চ হয়।
পেছন থেকে চিফ সেক্রেটারি একটা কাগজ লাটশাহেবের সামনে মেলে ধরেন। একটু ভুরু কুঁচকে পড়ে লাটশাহেব কাগজটা হাতে নেন। তখনই হাততালিটা সবচেয়ে উঁচুতে। তার পাশে দাঁড়ানো হকশাহেবকে লাটশাহেব কাগজটা পড়ান। অভ্যাসবশে হকশাহেব পড়লেন— ‘সামসুদ্দিনের বিরুদ্ধে উগ্রপন্থী রাজনীতির রিপোর্টের কোনো নিষ্পত্তি হয়নি।’
হাততালি থেমে আসছিল। লাটশাহেব হকশাহেবকে বললেন, ‘হি মাস্ট বি ড্রপড। ডু ইউ হ্যাভ এনি আদার নেম?’ হকশাহেব চুপ করে থাকলেন। হাততালি থেমে যেতেই লাটশাহেব বলতে শুরু করেন, ‘মিস্টার ফজলুল হক, প্রাইম মিনিস্টার।’ আবার হাততালি ওঠে। সেই বিরতিতে চিফ সেক্রেটারি পেছন থেকে আবার একটা স্লিপ এগিয়ে দেন। লাটশাহেব পড়ে হকশাহেবকে দেখান। হকশাহেব তখন হাততালির জবাবে হাত নাড়াচ্ছিলেন। তার মধ্যেই লাটশাহেব কাগজটা তাঁকে দেখালে তিনি পড়েন, ‘নবাব মুসারফ হোসেন। হাত নাড়াতে-নাড়াতেই হকশাহেব লাটশাহেবের দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে সম্মতি জানিয়ে ঘাড় হেলান।
