1 of 4

৪২. খবর ফাঁসাতে সামসুদ্দিন অমৃতবাজারে

৪২. খবর ফাঁসাতে সামসুদ্দিন অমৃতবাজারে

সামসুদ্দিনকে নলিনী সরকারের ড্রাইভার টিকিট কেটে তুলে দিয়েছিল। সামসুদ্দিন পরের স্টেশন সাঁতরাগাছিতে নেমে, বাসস্ট্যান্ডে চলে গিয়ে বাগবাজারের বাস ধরলেন। এত রাতের বাস- তাড়াতাড়িই যাচ্ছিল। যেতে-যেতেই সামসুদ্দিন আরো ভাবতে লাগলেন—কেপিপি-লিগ সরকার তৈরি আটকানোর জন্য আর কী কী করা যায়। সে-ই নবাবজাদা নাজিমুদ্দিন আর কলকাতার ব্যারিস্টার সারওয়ারদি যদি সরকারে আসে, তাহলে কৃষকের ঋণসালিশিরই-বা কী হবে, জমিদারি উচ্ছেদেরই-বা কী হবে। হকশাহেব তাদের কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে লিগকে প্রস্তাব দিয়ে বসলেন? লোকের কাছে মুখ দেখাবেন কী করে? কংগ্রেস কেন রাজি হল না? তাই তো ঠিক ছিল। ওয়ার্কিং কমিটি নাকী অনুমতি দেয়নি। সেটা তো কথার কথা, ভোটের আগে তো শরৎ বোসরা চেয়েছিল—ইলেকশনে তারা কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডের বিরোধিতা করবে—নইলে হিন্দু ভোটও পাবে না। কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট জওহরলাল সোজা জানিয়ে দিলেন, সেটা করা চলবে না। তাহলে এবার কেন চিঠি-প্রস্তাব কিছু এল না যে হকশাহেবের সঙ্গে মন্ত্রিসভা করা যাবে না। কংগ্রেসের কেন্দ্ৰীয় পার্লামেন্টারি বোর্ডই তো তাদের প্রার্থী ঠিক করেছে। তাহলে, কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতারা জানতেন না যে কৃষক-প্রজার সঙ্গে কংগ্রেসের বোঝাপড়া আছে। নইলে কংগ্রেস কোনো মুসলিম আসনে প্রার্থী দেয়নি কেন। ভোটের আগের বোঝাপড়া ভোটের পরই বাতিল? কংগ্রেসই-বা মুখ দেখাবে কী করে? নাকী কংগ্রেসও জমিদারি-উচ্ছেদ চায় না? কিন্তু কোনো দলিল ছাড়া, প্রস্তাব ছাড়া কংগ্রেস বলতে পারে যে কোনো সরকার করব না, কোনো সরকারকে সমর্থনও দেব না? ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’র অফিসে ঢোকার আগে সামসুদ্দিনের মনে পড়ে যে ভোটের আগেও তো প্রজাপার্টি আর কংগ্রেসের মধ্যে কোনো লেখালেখি হয়নি। নিউজ ডিপার্টমেন্ট খুঁজে বের করে যিনি দায়িত্বে আছেন তাঁর সামনের চেয়ারে বসতে-বসতেও সামসুদ্দিনের সন্দেহ হয়—এগারটি প্রদেশে জিতে মন্ত্রিসভা করার খোয়াবে, কংগ্রেস কোথাও আর-কাউকে স্বীকার করবে না। পাঞ্জাবে তো ফেডারেশন পার্টি আর বাংলায় নতুন কেপিপি। জওহরলাল তো বলে দিয়েছেন—ভোটে এটাই প্রমাণ হল যে দেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে কথা বলতে দুটি পার্টিই আছে—গবমেন্ট আর কংগ্রেস।

তাহলে কি প্রধানত মুসলমানদের পার্টি বলেই কংগ্রেস হকশাহেবকে মেনে নিল না? হকশাহেব যদি লিগে চলে যান! আর তাই তো গেলেন।

‘আমি আপনাদের একটা চূড়ান্ত রাজনৈতিক খবর দিইতে এইসছি।’

‘দিয়ে যান। কাল নিউজ-এডিটার দেখে যা করার করবেন।’

‘খবরটা তো কাল সকালেই বেরনো দরকার।’

‘কালকের কাগজ তো এখন ছাপা হচ্ছে।’

‘সব তো আর ছাপা হয়নি। যেগুলো ছাপা হয়নি, সেগুলোতে তো দিতে পারেন।’

‘সেটা যে একেবারে অসম্ভব, তা নয়। কিন্তু সেটা, করার এক্তিয়ার আমার নেই।’

‘কার আছে?’

‘সম্পাদকদের। আমাদের কাগজের মালিকের।’

‘তাঁদের জানানো যায় না?’

‘তা যায়। কিন্তু আপনার পরিচয় বা খবর কিছুই তো আপনি বলেননি।’

‘আমার নাম ও পরিচয়টা গোপন রাখতে চাই।’

‘খবরটাও?’

‘তাহলে আর আসা কেন?’

‘খবরটা আমি কর্তাব্যক্তিদের জানাব এমন কথা দিচ্ছি না। এরপরও যদি খবরটা বলতে চান, বলতে পারেন।’

‘কিন্তু ব্যাপারটা তো দেশের ব্যাপার।’

‘দেশ? মানে?’

‘বাংলাপ্রদেশের।’

‘রাজনীতি ঘটিত? আজও তো কোনো ডিসিশন হয়নি। বোধহয়, আরো কথা হবে।’

‘ডিসিশন হয়ে গেছে। কিন্তু কেউই সেটা প্রকাশ করছেন না।’

‘প্রকাশ আবার করবে কে? এ-কাগজদের মালিকরা তো ডিসিশনের শরিক। এঁরা জানবেন না?’

‘কংগ্রেস কেপিপিকে সমর্থন করবে না।’

‘তা তো কংগ্রেস বলেনি। আমাদের তো নিউজ আছে। প্রোগ্রামও ঠিক হয়েছে। কোন্টা একনম্বর আর কোন্টা দুই নম্বর এই নিয়ে কথা চলছে।’

‘কথা চইল্‌ছে না, কথা চইলবেও না। এখন দুই পার্টিই ওজর খুঁজচ্ছে। আইজ সন্ধ্যায় নলিনী সরকারের বাড়িতে লিগের নেতাদের সঙ্গে হকশাহেবের মিটিং ছিল। তাতে লিগ হকশাহেবকে নিঃশর্ত সমর্থন দেইবে বলে কথা পাকা হইয়ে গেইছে।’

ভদ্রলোক এত বড় খবরটা শুনে একটাও কথা বললেন না। কথাটা যে তিনি জানেন না সেটা তাঁর মুখ দেখে সামসুদ্দিন বুঝলেন। গায়ে একটা আলোয়ান ছিল, সেই আলোয়ানের একটা কোণ দিয়ে চিবুকটা ঢেকে চশমাটা নামালেন। সামসুদ্দিন তাঁর দিকেই তাকিয়ে আছে দেখে তিনি সামসুদ্দিনের চোখে চোখ মেলালেন না। টেবিল থেকে একটা কাগজ তুলে চোখের সামনে মেলে আবার রেখে দিলেন। একবার তাঁর টেবিলের ফোনটার দিকেও তাকালেন। তারপর, চেয়ারটা টেনে সোজা হয়ে বসে টেবিলে দুই কনুই রাখলেন। এতক্ষণ ওঁর চেয়ারটা তেরছা ছিল।

‘খুব সম্ভবত আপনার খবরটা ঠিক।’ কিছু বলার জন্য সামসুদ্দিন হাঁ করেছিল, ভদ্রলোক হাত তুলে তাঁকে থামতে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আপনার পরিচয় আপনি দেননি। আমার অনুরোধ, দেবেন না। আমি আপনাকে ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করব কিন্তু হয়ত পারব না। আপনি নিশ্চয়ই কেপিপির খুব বড় নেতাদের একজন। তাই আপনাকে ভুলে-যাওয়া কঠিন। খবরটা আমরা ছাপার কোনো চেষ্টা করব না—আমার স্বার্থে ও আপনার স্বার্থে। আমার স্বার্থটা কোথায় বলছি। এই কাগজ যাঁরা বের করেন, তাঁরা শুধু কাগজই করেন না, তাঁরা রাজনীতির নেতা রাজনীতির প্রকাশ্য কাজকর্মে যত, এঁদের আগ্রহ তার চাইতে অনেক বেশি নেপথ্যে। বাংলাপ্রদেশে নতুন ও প্রথম মন্ত্রিসভা হচ্ছে আর ওঁরা তা জানেন না, এটা ওঁরা কখনো মানতে পারবেন না। এঁদের হাত আছে,—শেষ মুহূর্তে কংগ্রেসকে ঠেকিয়ে দেয়ায়। আমি দেউলি, হ্যাঁ, রাজপুতানার দেউলি ক্যাম্পে ছিলাম। বছর খানেক হল ছাড়া পেয়েছি আর এঁরা জেনেশুনেই আমাকে প্রায় ডেকে এই চাকরি দিয়েছেন—সেটা বোধহয় ইংরেজির এমএ পরীক্ষার রেজাল্টের গুণে—জেল থেকে দিয়েছিলাম। যে বিপ্লবী রাজনীতির অপরাধে দেউলিতে ছিলাম। দেউলিতেই সেই রাজনীতি থেকে সরে এসেছি, বিপ্লব বলতে যা বুঝেছিলাম, তাও বদলেছে। কিন্তু আমরা অনেকেই এখনো খুব পরিষ্কার জানি না, এখন আমরা রাজনীতি ও বিন্যাস বলতে কী বুঝতে চাই। সেই বোঝার পক্ষে এই চাকরিটা আমাকে সাহায্য করবে। বইপত্র আসেও কম, দামও এত বেশি। এখন যদি কর্তাব্যক্তিদের কাছে সব জানাই ও আমাকে কী করতে হবে, জানতে চাই—তাহলে তাঁরা অপমানিত বোধ করতে পারেন—আরে, এত বাসি খবর এত রাতে কোত্থেকে পেলে। উলটোটাও হতে পারে—আরে, তাই নাকী, দাঁড়াও, দাঁড়াও, লোকটাকে আটকে রাখো। এতটা উলটোপালটা। ব্যাপারে আমি যেতে চাই না। আপনিও তোতাহলে নিজের নাম-পরিচয় গোপন রাখতে পারবেন না। সুতরাং আমাদের দু-জনেরই স্বার্থ—এমন কোনো ব্যাপার, মানে আপনার-আমার দেখাশোনা কথাবার্তা যে হয়েছে সেটা এই মুহূর্তেই ভুলে যাওয়া। আমি ভুলে যাব ও কখনো বিশ্বাসই করব না যে আপনি এই খবর নিয়ে এসেছিলেন। তবে, আপনি তো রাজনীতি করেন। তার প্রয়োজনে আপনি বলতে পারেন যে আপনি এই পত্রিকায় এসেছিলেন অথচ এরা খবরটি ছাপেনি। আপনি আমার নাম জানেন না। আমিও তো আপনার নাম জানি না।

সামসুদ্দিন বাঁ হাতের বুড়ো আঙুলে ও তর্জনীতে কপালের মাঝখানটা চেপে ধরে—’তাহলে বাংলার মুসলমান কৃষককে এখন শুধু মুসলমান হতে হবে। কৃষক না-হলেও চলবে?’

ভদ্রলোক চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন, সামসুদ্দিনকেও দাঁড়াতে হল।

‘আপনার কথা শুনতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু এখানে কেউ আপনাকে চিনে ফেলতে পারে। আমাকেও একটু টেলিপ্রিন্টারের খবরগুলি দেখতে হবে। খবরের কাগজে খবর ফাঁস করে কি কৃষকের মুসলমান হওয়া ঠেকাতে পারবেন? কৃষককেই সেটা ঠেকাতে হবে।’

‘আমাদের না-খেতে-পাওয়া, নিরক্ষর, ধার আর সুদে নাকও ডুবে গেছে, এর বেইশি কত ঠেকাবে? না অইলে আমরা দিইতাম নাকী হকশাহিবই জিইতত? পশ্চিমা উলেম, আইল্যা কত নামাজ যে পড়াইল। তাও তো ঠেইকেছে?

দোতলা থেকে নামার সিঁড়ির সামনে এসে ভদ্রলোক দাঁড়ালেন, ‘তাহলে আসুন।’

সামসুদ্দিন সিঁড়ি বেয়ে তাড়াতাড়ি নেমে এলেন। তাকে তো সত্যিই চাঁপদানি যেতে হবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *