৪১. নলিনী সরকারের অসাম্প্রদায়িক ডিনার
নলিনী সরকার আবার সেই ঢেকুর তোলার মত আওয়াজ করলেন। প্রায় সঙ্গে-সঙ্গেই ম্যানেজারবাবু এলেন। নলিনী সরকার জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী? তোমাদের হল।’
‘হ্যাঁ, পাত তো পাতা হয়েছে। আপনারা গিয়ে বসলেই হয়।’
‘হ্যাঁ। তাহলে চলুন সবাই।’
সামসুদ্দিন হঠাৎ নলিনী সরকারের পেছনে এসে বলেন, ‘স্যার, আমারে একটু মাপ দিতে হবে।’
‘কী হল?’
‘আমি একদিন এইসে একা খেয়ে যাব। আজ তো আমাকে যেইতেই হবে।’
‘খেয়ে যাও। কোথায় যাবে?’
‘আমার দিদি তো থাকে চাঁপদানিতে। আইজ তলব দিছিল্যাম, যাব বইল্যে। ভাইগন্যা-ভাইগনি গুইল্যা না-খাইয়্যা থাইকবে, স্যার, আমারে মাপ দ্যান।’
‘আরে এটা কোনো কথা হল? সংসারের ব্যাপার। তুমি আর-একদিন এসো। কিন্তু তুমি যাবে কীসে?’
‘ট্রামবাসে হাওড়া পৌঁছাইলেই তো ট্রেন পাব।’
‘তাহলে তোমাকে হাওড়ায় পৌঁছে দিয়ে আসুক’, নলিনী সরকার আবার ঢেকুর তুললেন। ম্যানেজারবাবু এলে বললেন, ‘ও থাকতে পারছে না। চাঁপদানিতে দিদির কাছে যেতে হবে। হাওয়া স্টেশনে পৌঁছে দিয়ে টিকিট কেটে ট্রেনে তুলে দেয় যেন।’
‘স্যার, এসবের দরকার নেই। আমি তো যাতায়াত করি।’
‘এত ভাবছ কেন–দিদির কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছে যাবে। আমি না আটকালে তো এতক্ষণ পৌঁছে যেতে।’
ম্যানেজারবাবু সামসুদ্দিনকে ডাকেন, ‘আসুন’।
নলিনী সরকারের বাড়িতে খাওয়ার টেবিল নেই। কোনো হিন্দুনেতার বাড়িতেই নেই। শাহেবসুবো গোছের কাউকে আপ্যায়ন করতে হলে তিনি।…এই যান। তাঁর অফিস থেকে কাছে হয়। কিন্তু বাড়িতে রান্না করে ওড়িশার বামুন। রান্নাঘরের কাজও করে দুই বামুন। আসন পেতে খাওয়া হয়। তাঁর সেটাই পছন্দ। অনেক বছর আগে এই ঠাকুর-চাকর যখন কাজে ঢোকে তখন নাকী ম্যানেজরবাবুকে বলেছিল—হোটেলের মত খাওয়া হলে তারা কাজ করবে না। হোটেলের মত মানে টেবিল-চেয়ারে।
আসন দেখে ইস্পাহানি বলে ওঠেন, ‘দাদা, দিস ইজ ক্রুয়েলটি টু এনিম্যালস। বেটার ইউ ইসু এ ড্রেসকোড—ফর মুসলিমস, লুঙি অনলি।
নলিনী সরকার বসলেন না। এঁদের প্রত্যেকের সামনে চওড়া জলচৌকি দেয়া হল।
তারপর বেশ দামী সেরামিক ডিশে এঁদের সামনে পোলাও রাখা হল। তার সঙ্গে মেলানো সেরামিকের বাটিতে মাছ-মাংস-ব্যঞ্জন ও একটা ডিশে একজোড়া তপসে ভাজা সাজিয়ে দেয়া হল।
নলিনীরঞ্জন খুব একটা নজর করলেন না, তিনি জানেন, এমনই হয়ে আসছে। বামুনঠাকুর ও চাকর দুটি রান্না করে দিয়েছে মাত্র, যেহেতু, যা রাঁধতে হয়েছে তা বামুনদেরও খাদ্য। কিন্তু মুসলমানরা খাবে বলে এ রান্না তারা করবে না বলার মত জাতি-অভিমান দেখানো আর্থিক দিক থেকে পোষায় না। ম্যানেজারবাবু এসব মধ্যপথ ঠিক করে রেখেছেন। পার্কের ওদিককার বস্তিতে বাঙালি মুচিদের একটা মহল্লা আছে। খবর দিলেই ওরা খাবারগুলো সাজিয়ে নিমন্ত্রিতদের সামনে দিয়ে আসে। খাওয়াদাওয়া পর যে-খাবার বাকি থাকে, সেটা বাড়ি নিয়ে যেতে একটা-দুটো ডেকচিগোছের তারা সঙ্গেই নিয়ে আসে। আলাদা-আলাদা খাদ্যের জন্য আলাদা-আলাদা পাত্র তাদের থাকে না। খাওয়া হয়ে গেলে—সব বাসন ধুয়ে সাজিয়ে রেখে চলে যায়।
এগুলো সবই ম্যানেজারবাবু উপস্থিত বুদ্ধির ফল। মুসলমানদের জন্য রান্না ও খাওয়ার বাসন আলাদা। রান্নার বাসন আলাদা না করলেও চলত কারণ কারা সেই রান্না খাবে এটা জানা ঠাকুরমশায়ের অধিকারের মধ্যে পড়ে না। কিন্তু খাবারগুলো রান্নার পর যে-পাত্রে ঢালা হয়, সেটা তো আবার মুচিরা ছোঁয়। মুচিদের দিয়ে পরিবেশন করে মুসলমানদের খাওয়ানো যায় কারণ মুচিরা তো মুসলমানের অচ্ছুৎ নয়। কিন্তু মুচির ছোঁয়া বাসন ফের হেঁশেলে নেবে কী করে বামুনঠাকুর, কারণ মুচিরা তো বামুনের অচ্ছুৎ। ম্যানেজারবাবু একবার যেন কবে কী রকম করে জানতে চেয়েছিলেন—মুচিদের সঙ্গে ছোঁয়াছুঁয়ির সীমাটা কোথায় ধরা হবে। রান্না পাত্রে ঢালার পর চৌকাঠের ওপারে, যদি মুচিরা ধরে তাহলে সে-খান তো অচ্ছুৎ। সমস্যাটার সঙ্গে ম্যানেজারবাবুরও সায় ছিল। নলিনী সরকারও হয়ত সমস্যাটা মানতেন—নইলে তিনি কেন মুসলমানদের সঙ্গে খেতে পারেন না। কিন্তু বাড়ির রান্নাঘর পর্যন্ত তিনি সমস্যাটাকে ছড়িয়ে দিতে চান না। ম্যানেজারবাবুকে বলে দিয়েছিলেন—’গঙ্গাজলে ধুয়ে নিলে তো হয়।’ তেমনই চলছে।
ইস্পাহানি আর সারওয়ারদির কোনো অসুবিধে হচ্ছিল না, ওরা তো স্যুট পরে আছে। হকশাহেব আর নাজিমুদ্দিনের ছিল চুড়িদার আর শেরোয়ানি পরা। তাও নাজিমুদ্দিন ছোটখাটো মানুষ, একরকম গুছিয়ে নিয়েছেন, হকশাহেবের বড় শরীর—একেবারে হাঁফিয়ে গেছেন। বলে উঠলেন, ‘আরে, মাছভাজা দিছ, ডাইল নাই? ডাইল না থাইকলে খামু কী দিয়া?’
‘তাছাড়া, ডাল না খেলে তো আপনার ইলেকশন প্লেজ ব্রেক করা হবে—বাঙালির ডালভাত।’ সারওয়রদি বলেন।
ডাল আসতে দেরি হওয়ায় নলিনী সরকার সন্দেহ করলেন কিছু একটা গোলমাল হয়েছে। ঠাকুররা কি তল্লাটেই নেই? তিনি একটু এগিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখেন— ভাঁড়ারে মুচিরা দাঁড়িয়ে আর রান্নাঘরে ম্যানেজারবাবু ডালের বাটি হাতে।
‘কী হল?’
‘এটা তো তুলে যায়নি’, মানে পরিবেশনের পাত্রে। ম্যানেজারবাবুও পরিবেশন করতে সংকোচ করছেন। নলিনী সরকার হাতটা বাড়িয়ে বাটিটা নিয়ে খাওয়ার ঘরে গিয়ে নিজেই নিচু হয়ে হকশাহেবের ডিশে এক হাতা ডাল দিলেন। ‘আবার ভ্যারাইটি চাইবেন না।’
‘আরে, আপনারে আইনতে হইল। ডাইল কত দুর্মূল্য দ্যাহেন। এক্ষেত্রে ডাইলডা অনুপান, তপসে ভাজার।
‘আপনাদের কারো লাগবে নাকী?’
‘নো দাদা, লেট ইট বি এক্সক্লুসিভ টু হকশাহেব,’ ইস্পাহানি বলাতে ডালের বাটিটা একটু আলগা ধরে রেখে নলিনী সরকার আর-একহাতে গড়ানো বালাপোশের কোণাটা কাঁধে ফেলেন। ম্যানেজারবাবু এসে ডালের বাটিটা নিয়ে গিয়ে একটা কাঁসার বাটিতে জল এনে নলিনীরঞ্জনের সামনে ধরলে তিনি এঁটো আঙুলগুলো ডুবিয়ে নেন।
খাওয়া সেরে বেরবার আগে নাজিমুদ্দিন গোপনে সারওয়ারদিকে কিছু বলেন। সারওয়ারদি স্বাভাবিকের চাইতেও নিচু গলায় বলেন, ‘কাল সকালে তো এগারটায়? আমাকে তো একটা কনস্টিটুয়েন্সি ছেড়ে দিতে হল। সেখানে নাজিমুদ্দিনশাহেবকে দাঁড় করানো ঠিক ছিল। কিন্তু হকশাহেব ওখানে সেকেন্ড পটুয়াখালি করার জন্য আলতাফকে দাঁড় করানোয় …।’
