৩৯. নলিনী সরকার মাঠে নামেন
নলিনী সরকার মিটিং থেকে বেরিয়ে কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে সোজা তাঁর অফিস, হিন্দুস্থান ইনসিয়োরেন্সে চলে আসেন। কোনো দিকে না তাকিয়ে তিনি তাঁর ঘরে ঢুকে যান তাঁর সেক্রেটারি একটা খোলা খাতা নিয়ে পেন্সিল তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন।
‘দেখো তো ঢাকার হবিবুল্লাহকে ট্রাঙ্ককল করা যায় কী না।’
হাবিবুল্লাহ ঢাকার নবাব। মুসলিম লিগের প্রায় সবচেয়ে বড় নেতা। এবার তাঁর ১২ জন আত্মীয়কে নিয়ে জিতে আইনসভায় এসেছেন। তিনি মুসলিম লিগের প্রাদেশিক কমিটির প্রেসিডেন্ট। ভোটের আগে জিন্নার পরামর্শে তাঁরা এক ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি খাড়া করে ফজলুল হককে পুরতে চেয়েছিলেন। হকশাহেব প্রথমে নিমরাজি ভাব দেখিয়ে লেজের এমন ঝটকা মারলেন যে ইউনাইটেড মুসলিম পার্টি একেবারে ছত্রখান। পটুয়াখালিতে নাজিমুদ্দিনকে এমন চোবানো চুবিয়েছে যে নাজিমুদ্দিনের এখনো শ্বাস পড়েনি। হ্যাঁ, মুসলিম লিগ অনেক সিট পেয়েছে, তাই বলে তো আর হবিবুল্লহ মন্ত্রী হতে পারবেন না। হতে হলে লিগকে হয় কংগ্রেসের সঙ্গে, না-হয় প্রজাপার্টির সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। তেমন সমঝোতা যদি হতেই পারত, তাহলে লঙ্কাকাণ্ডও হত না। কুরুক্ষেত্রও হত না।
সেক্রেটারি এসে বলেন, ‘আপনি কি স্যার এখন অফিসে বসবেন?’
নলিনী সরকারের মুখটা ঝুলে গেছে। তিনি যে বেশিরভাগ সময় মাথা হেঁট করে থাকেন, তাতে আগে তাঁকে চিন্তাশীল মনে হত, এখন মনে হয়, ঝিমুচ্ছেন নাকী। অথচ ওঁর প্রায় স্থবির চোখমুখে কী একটা গোপন ব্যস্ততা ধরা পড়ে যায়। ঠিক ব্যস্ততাও নয়—যেন গোপন আত্মরক্ষা। হুলো বেড়ালের মত—নিজের লক্ষ্য সম্পর্কে নিশ্চিত আর সেখানে পৌঁছুতে যে অনবরত দাঁড়ানোর জায়গা, বদলাতে হয় সেই জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা তাঁর শরীরের ভঙ্গিতে এসে গেছে। ফুটবল-খেলোয়াড়দের মত তিনি যেন জানেন—কখন দৌড়তে হয়, কখন পাস দিতে হয়, কখন পাস নিতে হয়, কখন কর্নার করে গোল ঠেকাতে হয়, কখন অফসাইড হয়ে যেতে হয়, আর কখন তিন খুটির ভিতর নির্ভুল শটটা নিতে হয়। ফুটবল-খেলোয়াড় আর হুলো বেড়ালের দৃষ্টান্ত সমার্থক নয়। কিন্তু বেড়ালটাকে খুলনা-বরিশালের ঘ্যাঙো বাঘ ভেবে নিলে হয়ত সমার্থকতা আসতেও পারে। এলে আসুক।
নলিনী সরকার নিজের সাফল্যে পূর্ণ বিশ্বাস করেন। নিজের বাইরে কাউকে বিশ্বাস করেন না। তাঁকেও যে কেউ বিশ্বাস করে না—সেটা তিনি একটু বেশিই জানেন। তিনি বিশ্বাস করেন না যে রাজবন্দীদের মুক্তি আর জমিদারি উচ্ছেদের কোনটা আগে তাই নিয়ে মতপার্থক্যে কংগ্রেস ফজলুল হককে সমর্থন দিল না। এমনকী শরৎ বোস যে সত্যি কথাটা বলল ওয়ার্কিং কমিটি কোনো প্রদেশেই যুক্ত সরকারের পক্ষপাতী নয়, তাই প্রদেশের হাত-পা বাঁধা, সেটাও তিনি বিশ্বাস করেন না। নলিনী সরকারের এটাই সবচেয়ে বড় জোর ও বড় অসুখ যে নিজেকে না জড়িয়ে কোনো ঘটনা তিনি বুঝতে চান না, পারেনও না। তিনি তাই নিশ্চিত জানে যে ফজলুল হক তাঁকে অর্থমন্ত্রী করবে এটা কংগ্রেস চায় না। কোন কংগ্রেস-ওয়ার্কিং কমিটি, না প্রদেশ, না শরৎ বোস, না গান্ধী, এটা তাঁর জানার কোনো ইচ্ছে নেই।
ফোন বেজে উঠতেই নলিনী সরকার তুলে বলেন, ‘নবাব শাহেবকে দিন। আমি কলকাতা থেকে নলিনী সরকার বলছি।’
‘নবাব শাহ তো আলাদা ঘরে নিদ্ যাইতেচ্ছেন। ফোন ধইরতে হলে তো তাঁক জাগাইয়্যা এই ঘরে ডাইকব্যার লাগে।’
নলিনী সরকার বিরক্ত হন—করবে পার্লামেন্টরি পলিটিকস আর দুপুরে ঘুমুবে! ফোনটোনের জন্য একটা সেক্রেটারিও রাখবে না—ঢাকার বাঙাল চাকর দিয়েই কাজ সারবেন। এই বিরক্তি সত্ত্বেও তিনি একবার ভেবে নিলেন–নবাবশাহেবকে দিবানিদ্রা থেকে তুলে ফোনের ঘরে টেনে আনাটা আদবকায়দা সম্মত হবে কী না। কিন্তু স্বার্থ তো নবাবশাহেবেরও। ঢাকার ফোন পাওয়া কি সোজা? না হলে তো হাতচিঠিতে বিস্তারিত লিখে লোক পাঠাতে হয় আজ রাতের ঢাকা মেলে।
‘হ্যালো। কলকাতা থেকে নলিনী সরকার বলছি। আপনি কি আমাকে চেনেন?’
‘আমার মত ছোট মানুষ আপনারে চিনব কী কইর্যা? আর নবাবশাহেবরে ডাকাও আমার খ্যামতায় নাই। যদি কন তাহাইলে আমি কাউরে ডাইকব্যার পারি।’
ফোনে আওয়াজ পাওয়া গেল লোকটা ফোনটা কাঠের ওপর রাখল। লাইন থাকবে কি থাকবে না। এবার আবার কে ধরবে। নলিনী সরকার সেক্রেটারিকে ডেকে রিসিভারটা দিয়ে বললেন, ‘ওদিকে হবিবুল্লাহ ধরলে আমাকে দিয়ো।’
সেক্রেটারি রিসিভার হাতে দাঁড়িয়ে নলিনী সরকার তাঁর রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে আঙুল-জড়ানো হাতদুটো থুতনিতে রাখা।
‘হ্যালো। হ্যাঁ। কলকাতা থেকে স্যার নলিনীরঞ্জন সরকার নবাবশাহেবের সঙ্গে কথা বলতে চান।’ সেক্রেটারি ওদিককার কথা শোনার জন্য চুপ করে থাকলে নলিনী সরকার বলেন, ‘ঘুম থেকে তুলতে বলো। বলো এমারজেন্সি।’
‘হ্যাঁ। কিন্তু খুব কি কষ্ট হবে নবাবশাহেবের? ব্যাপরাটা এমার্জেন্সি। স্যার বসে আছেন’, সেক্রেটারি টেবিলের সার্জের ওপর ফোনটা রাখতে-রাখতে বলে, ‘ডাকতে গেল বোধহয়।
সেক্রেটারি বেরিয়ে যাওয়া সত্ত্বেও নলিনী সরকার রিসিভার তোলেন না। নবাব-বাদশা-র ব্যাপার কতক্ষণ লাগবে কে জানে। মুখটায় বিরক্তি নিয়েই ফোনটা কানে চেপে রাখেন।
‘হেলো।’
‘হ্যাঁ, হ্যালো, নবাবশাহেব, আমার সেলাম নিবেন। আমি নলিনী সরকার, কলকাতা থেকে।’
‘হাঁ, হাঁ, সেলাম, সেলাম। আপকে ফোন উ তো মেহেরবান হো। ফরমাইয়ে জি—’
‘শুনুন, খুব তাড়াতাড়ি চূড়ান্ত একটা পোলিটিক্যাল ডেভেলাপমেন্ট হয়েছে, মিনিস্ট্রি মেকিংয়ের ব্যাপারে –’
‘মিনিস্ট্রি কি হয়ে গেল? হক ওথ নিয়ে নিল? আপনি কি শ্যামা মুখার্জির ব্যাপারে কিছু বলতে চান?’
‘মিনিস্ট্রি কী করে হবে? কংগ্রেসের সঙ্গে আজ সকালে মিটিং ছিল। ভেস্তে গেছে।’
‘প্লিইজ, সরকারজি, কিয়া মতলব? কিয়া তোড় গয়া? কৌনসে তোড়া? ওরা তো কেউ আমাকে কিছু জানাল না।’
‘ওরা এখনো জানেই না। জানবে কীনা এ নিয়েও সন্দেহ আছে। রোজই তো কত মিটিং হচ্ছে। আর সব মিটিংয়ের কথা তো একটাই মিনিস্ট্রি মেকিং। আমি মিটিং থেকে বেরিয়ে আপনাকে ফোন করছি। এর পরও কংগ্রেসের সঙ্গে হকশাহেবের মিটিং হতে পারে। তাতে কিছু এসে যাবে না। কংগ্রেস ফাইন্যালি বলেই দিয়েছে, তারা মিনিস্ট্রি মেকিং-এ নেই।
‘শোভানাল্লা! গোলমাল কী নিয়ে হল সরকারজি? মন্ত্রী নিয়ে না নাম নিয়ে?
‘কংগ্রেস চায় না আমাকে মন্ত্রী করা হোক। আপনারা কি চান?’
নবাবশাহেব একটু চুপ করে গেলেন। নলিনী সরকারও কোনো আওয়াজ করলেন না। তিনি নবাবশাহেবকে অস্বস্তিতে থাকতে দিলেন। তিনি তাঁর সম্পর্কে লিগের মতামতটা বুঝে নিতে চান। লিগেরও কি কংগ্রেসের মত তাঁর ব্যাপারে কোনো আপত্তি থাকতে পারে? কংগ্রেসের আপত্তির কারণ কি তিনি ধরতে পেয়েছেন? ভোটের জন্য ফজলুল হককে টাকা দেয়া? সে তো কংগ্রেসকেও দিয়েছেন। হকশাহেবকে কংগ্রেসও যদি গোপনে সাহায্য না করত, তাহলে কংগ্রেসও কি এতগুলো সিট পেত। আর, এতগুলো মুসলমান এমএলএ কি স্বতন্ত্র হয়ে দাঁড়াতে পারে?
‘আপনার মাফিক একজন আদমিকে কি আমি মিনিস্টার করার হক রাখি?’
‘নবাবশাহেব—কথাটা কিন্তু সিরিয়াস। কংগ্রেসের সঙ্গে হকশাহেবের কথা ভেঙে গেছে। কিন্তু কিছুতেই বুঝতে পারছি না—কংগ্রেস কেন রাজি হল না’
‘আপনি ভি সমঝালেন না?’
‘একটা কথা ক-দিন ধরে খুব রটেছিল যে আমাকে মন্ত্রী করলে কংগ্রেস হককে মন্ত্রিসভা করতে দেবে না। এটাও রটেছে যে হকশাহেব কংগ্রেসকে বলে দিয়েছেন—আমাকে ছাড়া উনি মন্ত্রিসভা করবেন না। কিন্তু হকশাহেব ও আমার মধ্যে কোনো কথা হয়নি।’
‘এটা কি কোনো হোনেবালা বাৎ হল? আপনার মত উমেদার আদমি বাংলামে ঔর কৌন আছে?’
‘সে না-হয় আপনি বললেন, আপনার পার্টি বা নেতা কি তা বলবেন?’
‘কৌনসে পার্টি সরকারজি? কৌন সে লিডার?’
‘অল ইন্ডিয়া মুসলিম লিগ আর মিস্টার জিন্না।
‘কিন্তু আপনি কি কংগ্রেসে থাকছেন ওর মিনিস্টারভি হচ্ছেন? সে তো মুশকিলের বাহ্।’
‘তা কী করে হবে? আমি কংগ্রেসে নেই।’
‘আপনি কংগ্রেস ছেড়ে দিলেন? পাবলিক জানে?’
‘জানে। জানা উচিত। সেই কারণেই হয়ত কংগ্রেস আপত্তি করেছে, আমার মন্ত্রী হওয়ায়।’
‘কংগ্রেসের এইটা তো খুব মুশকিলের বাৎ। কে কখন কংগ্রেসে আছে কী নাই, তা কারো হিশাব নাই। মালব্যজি কি কংগ্রেসের নেতা নাকী পুরাপুরি বাহিরালা—তার কি নিকাশ হল? ভোট তো হয়ে গেল।’
‘এখানকার কংগ্রেস তো বলছে না আমি কংগ্রেসের। আমিও বলছি না আমি কংগ্রেসের?’
‘হাঁ, দুটো পয়েন্ট তো সাফ হল আপনার বাতে। এক—কংগ্রেস আর হকের মিলমিশ হচ্ছে না। ঔর, দুই, আপনাকে মিনিস্টার আমরা চাই কী না চাই।’
‘ঐ দুই নম্বরে যদি আপনাদের সাপোর্ট থাকে, তাহলে, আমি হকশাহেবকে বলতে পারি যে আপনার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমার নামে আপনাদের আপত্তি নেই। এইটুকু জানলেই হকের পার্টির নেতারা আর আপনার পার্টির নেতারা কলকাতায় কথা শুরু করতে পারে। আর আপনি যদি ফোনে ইস্পাহানি বা সারোয়ার্দি বা নাজিমুদ্দিনকে ধরতে পারেন, আপনিও বলে দেবেন। একদিনও দেরি করা উচিত হবে না। যত তাড়াতাড়ি হয় জানানো দরকার যে সরকার তৈরি হচ্ছে।’
‘এ ভি জানকারি করনে হোগা যে আপনি-ভি মিনিস্টার হচ্ছেন।’
‘তার সঙ্গে প্রজাপার্টি-লিগের সরকারের সম্পর্ক কী?’
‘প্রজাপার্টি আর লিগের সরকার মানে তো ভোটের আগে আমরা নিজেরা মারামারি করে মুসলমান-সরকার তৈরির সব ফায়দা যে গোর দিলাম, তার মেরামতি। মুসলিম পাবলিক আমাদের উপর গোস্সা করছে। তারা চায় আমরা মিলমিশ হই। আপ তো উহি নই মুসলিম ইউনিটিকো ইমানদার। যো-ইউনিটি করলে সব মুসলিম লিডার লোক ফেইল কিয়া, আপ হামলোগকো মিলা দিয়া।’
নবাবশাহেবের কথাটা নলিনী সরকারের ভাল লাগল। এ ভাবেও তো ব্যাপারটিকে দেখা যায়। আগে তিনি কেন এটা ভাবেননি, এ নিয়ে তাঁর মনে কোনো পুনর্ভাবনা এল না। তিনি তো মুসলিম ইউনিটি তৈরি করতে ঢাকার নবাবকে ফোন করেননি। তিনি তো ফজলুল হককে ভোটের সময় টাকাপয়সা দিয়েছেন, তা তো বরং মুসলিম ইউনিটি ভাঙতে। ভাঙলে, কোনো দলই একা সরকার তৈরি করতে পারবে না। আর, না পারলে নলিনী সরকারের মত লোকদের ডাক পড়বেই। দু-নৌকোয় দুই পা রাখা যায় বিপদের ঝুক্কি নিয়েও। মানুষের তো আর তিনটি পা নেই–তিন নৌকোয় দখল রাখবে কী করে? সেখানে নলিনী সরকার তো চার নৌকোর সওয়ার হয়েছেন। প্রথম নৌকো কংগ্রেস-প্রজাপার্টির সরকার। কংগ্রেস যে তাঁকে এতটা ঠেকাবে, তা তিনি আন্দাজ করেননি। কংগ্রেসে কতকগুলি মোটা-মোটা কথা আছে—সারা ভারত, গণতন্ত্র, স্বরাজ, অহিংসা আর গান্ধী। কিন্তু এই মোটা কথাগুলিকে যে যার মত সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ভাগ করে নিতে পরে, নিজের সুবিধের জন্য। কংগ্রেসের তাঁর এতটা বিরোধী কোনো নেতা তো থাকতে পারে না। নলিনী সরকারের সন্দেহ কংগ্রেসে একমাত্র গান্ধীই পারেন, নিজের অপছন্দকে প্রমাণহীন চারিয়ে দিতে। নলিনী সরকারের তিন নম্বর নৌকো ছিল প্রজা পার্টি ও লিগের সরকার। সেই নৌকোতেই এখন তিনি আছেন। তাঁকে বাদ দিয়ে এরকম সরকার তৈরিই হবে না। তাঁর চার নম্বর নৌকো ছিল লাটশাহেবের ইচ্ছা। তিনি যদি মুসলিম ঐক্যের নতুন ভগীরথ হন, তাতে তাঁর আপত্তির কী আছে? তিনি তো হিশেবে বুঝে নিয়েছেন—এই আইনের বলেই কোনো একরকমের স্বাধীন বা স্বরাজ সরকার তৈরি হবে খুব তাড়াতাড়ি, হয়ত পরের ভোটেই। সেই স্বাধীন বা স্বরাজ সরকার মুসলমানদের পুরো সমর্থন ছাড়া হতেই পারে না। আবার উঁচু জাতের হিন্দুরা না থাকলে কোনো সরকারই এ প্রভিন্সে চলবে না। তেমন অদূর ভবিষ্যতে নলিনী সরকারই একমাত্র গ্রহণযোগ্য প্রধানমন্ত্রী। ঘটনা যদি তেমনই ঘটে, তাহলে তেমনই তো ঘটানো উচিত। নবাবশাহেব তো তাই-ই বললেন।
অথচ তেমন একটা ভবিষ্যৎ তৈরি করে তোলার কথা ভাবতেই নলিনী সরকারের রক্ত ঠান্ডা বইল। নলিনী সরকার ভয় পেয়ে গেলেন—উঁচু জাতের হিন্দুর একেবারে মৌলিক ভয়। মুসলমানদের ওপর এতটা নির্ভর করে যদি তিনি তাঁর জীবন ও দেশের, অন্তত বাংলা প্রভিন্সের ইতিহাস তৈরি করতে চান তাহলে হিন্দুরা তাঁকে ছেড়ে কথা বলবে না। হিন্দুদের সঙ্গে থাকবে কংগ্রেস। নলিনী সরকার জাতের ভয় পেলেন। কোনো হিন্দুই মুসলমানদের পক্ষে যেতে পারে না অথচ অনেক মুসলমানই হিন্দুদের পক্ষে যেতে পারে—যদি একটা নলচের আড়াল থাকে, তাহলে তো পারেই। ফললুল হক তেমন একটা নলচে তৈরি করেছেন। এখন এই পর্যন্তই। ‘না, নবাবশাহেব, আপনার যদি সম্মতি থাকে তাহলে আজ সন্ধেতেই কথা শুরু করা যায়। কিন্তু আমার নাম সরাসরি জড়াবেন না।’
‘সরাসরি কেন জড়াব? নিউজপেপারে হেডিং দেব না, লেকিন রটাব না কেন? কংগ্রেস তো রটাল আপনাকে মন্ত্রী বানানোর জিদেই হকশাহেবের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হল। কার মোকামে বসতে চান?’
‘আজকের মিটিংটা গোপনে হওয়া দরকার। যাতে দুই দলের মিটমাট না হলেও কেউ টের না পায় যে মিটমাটের চেষ্টাও হয়েছিল।’
‘আমার কলকাতার মোকামে বসতে পারেন। আমি নাই। কারো সন্দেহ ভি হবে না।’
‘সে তো আপনাকে এখানে আপনার বাড়িতে ফোন করতে হবে। ফোন পাবেন কী পাবেন না। এদিকে সবাই গিয়ে হাজির। একটা স্ক্যান্ডাল হয়ে যাবে। বরং আমার বাড়িতেই হোক। আমি কিন্তু সবাইকে জানাব আপনি প্রজা পার্টির সঙ্গে লিগের সরকারে রাজি।
‘হ্যাঁ। বলবেন। প্রজা পার্টির সঙ্গে সরকার তৈরির বাতচিতে রাজি বলেন। এটা তো পাবলিক হচ্ছে না। লিগের লিডার দু-চারজন তো? বলেন।’
