৩৮. হকশাহেবের জনসাধারণ ও তুলসী গোঁসাইয়ের বক্তৃতা
‘না, না, না—এই সব অ্যানো না। শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত কইলে কী বেশি বুঝায়? কৃষক বললে কি প্রজারে বুঝায়? জমিদাররা কি মধ্যবিত্ত? গরুর গাড়োয়ান কি শ্রমিক? উকিল-ব্যারিস্টাররে কী ডাইকব্যা? চালু নাম চালু রাখো, নতুন সব নাম দিয়া বিভ্রাট বাধাইও না,’ হকশাহেব দু-হাত মাথার ওপর তুলে এমন ঘোরাতে থাকেন যেন আচমকা ধুলোর ঘূর্ণিতে পড়ে গেছেন, চোখমুখ বাঁচাচ্ছেন।
বিধান রায় বললেন, ‘আরো কিছু বাকি থাকল?’
শরৎ বোস বলেন, ‘ঐ প্রোগ্রামের আয়টেমগুলো দিতে হবে।
‘প্রোগ্রামের আয়টেম আবার কী?’
‘মানে গবমেন্ট কোন-কোন কাজ আগে করবে-
‘কোনো কাজই তো করা হয়নি। তার আবার আগে পরে কী? যে কাজ করবেন, সেটাই কাজ হবে। দেখুন-
‘ডাক্তার শাহেব, আমি তো ভোটে কয়্যা দিচ্ছি—জমিদারি উচ্ছেদ হচ্ছে আমাগো এক নম্বর কাজ।’
তুলসী গোঁসাই ইংরেজিতেই চিবিয়ে বলে ওঠেন কিছু কিন্তু ওঁর উচ্চারণ এত শাহেবি যে কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারেন না।
‘অ্যারে এর লগেই তো জমিদারি উচ্ছেদ চাই সর্বাগ্রে। দ্যাহো, এই বাড়িডা তো একডা খাশ মেমশাহেবের বাড়ি। না? দ্যাহো, কতগুলা বিলাত ফেরত এক লগে বইসচ্ছে। তাতে তো বাতাস কম পড়ার কথা। যারা বিলাত যায় নাই, অথচ ইংরাজি কয় য্যান কাল বৈশাখীতে কচি আমের মতন। কিন্তু তুলসী গোঁসাই একমাত্র মানুষ যার ইংরাজি এক নিজেই কয়, নিজেই শোনে’–হকশাহেব বলে ওঠেন, তারপর নিজেই হেসে ওঠেন। তুলসী গোঁসাইয়ের ফরসা মুখ, এই ভিড়ে একটু বেশিই ফরসা দেখাচ্ছিল, লালচে হয়ে উঠেছিল। তাঁর ঠোঁট একটু নড়ে কিন্তু কিচ্ছু শোনা যায় না।
‘এই ধাঁধাড়ার কেউ জব দিবার পারো?’ হকশাহেব জিজ্ঞাসা করেন।
‘পারি’, বলে যোগেন হাসিমুখে তাকিয়ে থাকে যেন আদেশের অপেক্ষায়।
‘অ, মণ্ডল, ভোটে না-হয় জিতচ্ছই, তাই বইল্যা এই ধাঁধাড়াও পারবা? পারো তো কও।’
‘সব বিলাতফেরতেরই মক্কেল আর খরিদ্দার তো দেশি মানুষ। কথা না বুইঝলে শরৎ বোসরেও মোহর দিব না, বিধান রায়রেও ভিজিট দিব না। গোঁসাই শাহেবের না আছে মক্কেল, না আছে খরিদ্দার। ওনার কথা তো শুনে এক চাষাভুষা। তাগো তো কুনো ভাষাই নাই। ইংরাজি কইলে যা শোনে, জার্মান কইলেও তাই শোনে। তুলসীবাবু তাই ঐ বিড়বিড়াইয়্যা সাপের মন্ত্র পড়েন,’ যোগেনের তো কথার পিঠে কথা বলার মাপ একেবারে গণেশ জননীর সন্তান প্রসবের মত নিখুঁত, নিবেদনা।’
একটা হাসির কোরাস তৈরি হয়। সেটা হঠাৎ একটা ঢেউয়ের মত উঠতেই থাকে, ভাঙে আর না। শেষে কলকল করে যেন জলে ফিরে যায়।
শরৎ বোস মিটিংটা গোছাতে বলেন, ‘দাদা, ইন কার্টেসি টু তুলসী, এ নিয়ে আর কথা তুলবেন না। রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিটা প্রথম যাক আর তারপর চিরস্থায়ী বন্দবস্ত উচ্ছেদ করুন।’
তুলসী গোঁসাই আঙুল তুলে জানান তিনি কিছু বলবেন। বলেন, ‘আমি ইংরেজিতে বলতেই সুবিধে পাই। কিন্তু এই অট্টহাস্যের পর সাহস পাচ্ছি না। থ্যাঙ্ক ইউ অল ফর দি লাফ অ্যান্ড থ্যাঙ্ক ইউ স্পেশ্যালি মিস্টার মণ্ডল। কিন্তু আমারও এখন মক্কেল ও খদ্দের দরকার। আমার পজিশনটার ব্যাখ্যা দিতে হবে তো। সেটা দেয়া আমার পক্ষে সুবিধের হত যদি আমার নিজের এমন একটা অভিশপ্ত জমিদারি না থাকত। কিন্তু আমার জমিদারি থাকার সুবিধে তো কংগ্রেসও ভোগ করে। আইন-অমান্য শুরু হতেই কংগ্রেসে আমার বন্ধুরা আরামবাগ থেকে দল পাঠালেন আমার জমিদারিতে নো-ট্যাক্স প্রচারে। কংগ্রেসিদের জমিদারি আর খাশমহলের জমি ছাড়া জমিদারি উচ্ছেদের বা নো-ট্যাক্স আন্দোলনের জায়গা তো কংগ্রেসের নেই। নিজের কথা দিয়েই কথা বলার সুবিধে বলে আমি নিজের কথা আর আমার দলের কথা বলছি। ‘জমিদারি তুলে দাও’—এই দাবিটা হয়ে উঠেছে সবচেয়ে অ্যাভেলেবল,’ তুলসী, শরৎ বোসের দিকে তাকালে তিনি বলে দেন, ‘হাতের মোয়া’, তুলসী বুঝে উঠতে পারেন না কথাটা ঠিক কী না, তিনি বলেন, ‘কাভার’ বলে তিনি আবার শরৎ বোসের দিকে তাকান, শরৎ বোস বলে দেন, ‘পালাবার গর্ত,’ তুলসী বলে যান, ‘যাতে আমাদের আরো জটিল ও কঠিন রাজনীতি না করতে হয়। আমাদের এই ভোটাভুটি, সরকার তৈরি করা—এসবই কিন্তু আমাদের সারা ভারতের জন্য স্বাধীনতা আদায়ের আন্দোলনের ভিতরে পড়ে। সেটা ভুলে যাবেন না। চিরস্থায়ী বন্দবস্ত তুলে দাও—এ-কথাটা তো রাজনীতি দিয়ে বলতে হবে। ভারতের সব জায়গায় তো চিরস্থায়ী বন্দবস্ত নেই। বেশিরভাগ জায়গাতেই নেই। বাংলা প্রদেশ, ওড়িশার উত্তর আর বিহারের পুবের কোনো-কোনো অংশ ছাড়া কোথাওই নেই। এই বাংলা প্রদেশেরও সব জায়গায়ই নেই। শুধু ইস্টবেঙ্গলের পাঁচটি আর সেন্ট্রাল বেঙ্গলের পাঁচটি জেলার একটা ল্যান্ড টেনিয়রকে সারা ভারতের রাজনীতি বলে গুলিয়ে ফেলবেন না। এটা তো কোনো রাজনৈতিক বিষয়ই না। আপনারা সরকার তৈরি করুন আর একটা আইন করে জমিদারি তুলে দিন। আমরা তো ক্ষমতার জন্য আন্দোলন করছি। ইংরেজ সরকার তার রেসিডিউয়্যাল পাওয়ার দিয়ে আমাদের দেশের মানুষদের জেলখানায় আটকে রেখেছে, আন্দামানে, বকশায়, দেওলিতে এক্সাইলে রেখেছে। বাংলার প্রথম এই লেজিসলেটিভ অ্যাসেমব্লি তো সবার আগে বলবে—তোমার রেসিডিউয়্যাল পাওয়ার তো আমার ফান্ডামেন্টাল পাওয়ারের বিরুদ্ধে যেতে পারে না। রাজবন্দীদের মুক্তি দিতে হবে—এর চাইতে ইমেডিয়েট রাজনৈতিক প্রোগ্রাম আর-কিছু হতে পারে না।’
তুলসী গোঁসাইয়ের বক্তৃতায় যেন মিটিংটা আচ্ছন্ন হয়ে থাকল। শরৎ বোস শুধু আপনমনে বলে উঠলেন, ‘ওয়ান্ডারফুল! কথা-বলার জোর যে এত, এক তুলসীর বক্তৃতা শুনলে বোঝা যায়।’
সভার আচ্ছন্নতা সম্পূর্ণ কাটার আগেই প্রজা পার্টির সম্পাদক সামসুদ্দিন জিজ্ঞাসা করেন, ‘সরকারটাকে তৈরি করা ও ঢেঁকানোটাই তো এখনকার সবচেয়ে বড় কাজ? নাকী? এটা আপনারা সাফ করে বলেন।’
কেউই কোনো জবাব না দেয়ায় সামসুদ্দিন নিজেই জবাব দেন, ‘রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিকে প্রথম ও প্রধান দাবি করলে গভর্নর তো ৯৩ ধারায় সরকার ভেঙে দেবে। সেটা তো হবে রাজনীতিরই পরাজয়। আমরা ভোট করলাম কিন্তু সরকার রাখতে পারলাম না। আরো আছে। যাদের কাছে কথা দিয়ে ভোটে জিতলাম, তাদের কিছু কাজ আমরা করতে চাই। সেটা জেনেশুনেই আমরা সরকার করতে পারি। সেটাও একটা রাজনীতি হতেই পারে। কংগ্রেস কি সেটাই করতে চায়? এটাকে একটু সোজা করে বলেন। আমরা সোজা করে বলছি—আমাদের রাজনীতি তা নয়। সেই কাজ করার মত পরিবেশও চাই।
একটু চুপচাপের মধ্যেই নলিনী সরকার বলেন, সে-কাজ করতে বাধা কোথায়? কথা তো হচ্ছে একটা জয়েন্ট প্রোগ্রাম নিয়ে। প্রজা পার্টি কি রাজবন্দীদের মুক্তি চায় না?’
হকশাহেব গুমরে বলেন, ‘তারা আমাদের ভাই ছেলে আর তাদের আমরা জেল থেকে ছাড়াতে চাব না? চলো, আমি এখনই প্রেসিডেন্সি জেলে গিয়্যা তালা ভাঙতে রাজি। চলো, কেডা যাবা?’ হকশাহেবের স্বরে যে একটা প্রতিকারমুখী অস্থিরতা থাকে, তাঁর গলায় সেটা এল না। বরং যেন একটু কূটনীতিই শোনা গেল। বোঝাই গেল তিনি জানেন, এ ভাবে রাজবন্দীদের মুক্তি আদায় করা যায় না।
‘তাতে রাজবন্দীর সংখ্যা কিছু বাড়তে পারে মাত্র। একজনও কমবে না।’ শরৎ বোস একটু হাসি মিশিয়ে বলেন, যেন বাতাসটাকে একটু হালকা করতে।
প্রজা পার্টির তসমুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সাপের গর্তডা যদি চেনাই থাহে শরৎদা, তাহাইলে আর ঝোপ খোঁজনের কাম কী?’
বিধান রায় হঠাৎ কিরণশঙ্করকে জিজ্ঞাসা করে বসেন, ‘এরা যে সাপের কথা বলছে, সাপটা কে?’
কিরণশঙ্কর হেসে ফেলে বলেন, ‘এ-কথা, সে-কথা, দে বুড়ি আলাপাতা। দেখুন ডাক্তারের চোখে পড়েছে ঠিক। ডাক্তার রায় জিজ্ঞাসা করছেন সাপটা কে?’
‘সাপের শঙ্খ লাগছে ডাক্তার। মেটিং মেটিং। ব্রিটিশ গবমেন্ট আর জমিদাররা। আমরা কই—মারো দুইডারে লাঠির এক বাড়িতে। আপনার পার্টি কয়—আরে শঙ্খ লাগা সাপ তো থাকবেনেই, শঙ্খ একবার লাগলে কি আর ছাড়ান যায়। কুত্তাগুলাক দেখেন না? থাউক অরা জট পাকাইয়্যা, আমরা চলো, রাম-লক্ষ্মণরে ডাইক্যা আনি গা। কই আছেন রাম-লক্ষ্মণ? ক্যা? লঙ্কায়।’ হকশাহেব বলেন।
বিধান রায় বলে ওঠেন, ‘আমাকে মাপ করবেন হকশাহেব। এত বড়-বড় সব অসুখ বুঝি, কিন্তু আপনার কথা বুঝি না। কোথাও বুঝি না–কর্পোরেশনে না, কাউন্সিলে না। প্রথমে ভাবতাম বোধহয় ভাষার জন্য বুঝি না। বাঙাল আর ঘটিদের ভাষা তো আলাদা। কিন্তু আপনি তো ভোলক্যানোর স্পিডে ইংরেজি বলেন। তাও বুঝি না।’
বিধান রায়ের কথা শেষ হতেই কিরণশঙ্কর একটু সরু গলায় বলে ওঠেন, ‘ডাক্তার রায় সাহস করে বলে ফেললেন, তাই বলছি। হকশাহেবকে নিয়ে এই এক অসুবিধে। তিনি সব গুলিয়ে দিয়ে এমন করে বলেন যেন কথাটা সত্য। অথচ তিনি যে গল্প বলছেন—সেটা আর কারো মনে থাকে না। এই যে উনি বললেন, আমাদের সবার সামনেই বললেন—ব্রিটিশ গবমেন্ট আর জমিদারদের স্বার্থ এক হয়ে গেছে। হয়তো কোনো-কোনো জমিদার ব্রিটিশ গবমেন্টের কর্তাভজা। কিন্তু বাংলার জমিদাররা ছাড়া আমাদের ন্যাশন্যাল মুভমেন্ট হত? ইউনিয়ন বোর্ডে যা একটু দেশগাঁয়ের উন্নতি হয়েছে, তা হত?’
‘হ। কথাডা তো সত্যি। কিন্তু এড়া তো আমার রক্তের দোষ। আব্বাজান ওয়াজেদ আলি শাহেবের সওয়ালের গল্প শুনতে-শুনতে জিলা জজের মেমশাহেব একদিন এজলাশে আইস্যা বইস্যা ছিলেন। আমিও তো বুঝি না কিরণ, আমার কথা মাইনষে বিশ্বাস করে ক্যান? তা আমি অ্যাডডা মীমাংসা পাইছি। শুনো। তোমরা সবাই ছোট-ছোট খাটো-খাটো কথা কও। বাড়ির কর্তাগো নাগাল। হ্যাঁ, এইডা হইব। না, ঐডা হইব না। আর আমি কই সব অসম্ভব কথা। দিব চিরস্থায়ী বন্দবস্তরে নোয়াখালির দরিয়ার পানিতে ফ্যালাইয়া। দিব রাইটার্সরে লালদিঘিতে ফ্যালাইয়া। আমার চাষাভুসার পাছায় পট্টি নাই, প্যাটে ভাত নাই। জমিদারবাবুর লগে হিশাবপত্তর শুইন্যা-শুইন্যা অয় তো অ্যাল্যায়া আছে। জিন-হুরী-পরী-এইসব লম্বাচওড়া কথা ছাড়া কিছু আর তার কানে ঢোকে? আর, তুমি কও মিটিং ডাইক্যা, আমি কই আইলে বইস্যা এক হুঁকায় তামাক টাইন্যা।’
শরৎ বোস বলে ওঠেন ডান হাত তুলে পাঁচটি আঙুল ছড়িয়ে, ‘ওয়েল, দাদা, উই অল নো, দ্যাট হাউ এভার উই ট্রাই, উই ক্যান্ট বি এ ফজলুল হক। কিন্তু আমাদের কংগ্রেসের তো বড় পরিবার, অনেক জ্যাঠা-কাকা, জ্ঞাতিগুতি। রাজবন্দীদের মুক্তি চাইটাকে প্রোগ্রামের প্রথমে না-রাখলে চলবে না। তাতে গভর্নর ৯৩ করলে ৯৩, সরকার না-হলে হবে না। তোমাদের সঙ্গে এগ্রিমেন্ট না হলে, আমরা পাবলিককে কিন্তু এই কথাই বলব, দাদা, যে প্রজা পার্টি রাজবন্দীদের মুক্তি চায় না।’
‘সে তো আমরাও বলব যে কংগ্রেস চিরস্থায়ী বন্দবস্ত বহাল রাখতে চায়। আর আপনাদের কাউন্সিলের ভোটেও তো দশ বছর আগে থেকে তার প্রমাণও আছে। কিন্তু কথাটা আপনারা এদিন পার খোলসা করলেন কেন?’ সামসুদ্দিন বলে ওঠে।
‘সামসুদ্দিন, জজশাহেব যদি শুনানির দিন ঠিক করে তাহলে সেদিনই তো মুখতিয়ার তার কথা বলবে। কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি পাকা করে ফেলেছে যে-কোনো প্রদেশেই কোয়ালিশন সরকারে যাবে না। বেঙ্গলে যদি তারা প্রদেশ-কংগ্রেসকে অনুমতি দেয় কোয়ালিশন করতে, তাহলে যুক্তপ্রদেশে মুসলিম লিগের সঙ্গে কোয়ালিশন ঠেকাবে কী করে? আমরা অল ইন্ডিয়া কংগ্রেস পলিটিকসের জাঁতাকলে পড়ে গেলাম।’
‘শরৎ তোমরা থাকতে, রাজা-মহারাজাদের কথা বাদ দাও, তোমাদের মত বাংলার মণিরত্ন থাকতে, এখনো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বটগাছের মতন আছেন, এতগুলো আসন আমরা মুসলিম লিগরে হারাইয়্যা আনলাম। তাও তোমরা আমাদের সঙ্গে একপাতে বসবা না? কংগ্রেসও কি মুসলিম লিগের মতন অবাঙালির স্বার্থ দেখার দল হইয়া গেল? তোমরা আমারে সেই নেকড়ে গুলানের হাঁ-মুখের সামনে ফেল্যায়া দিল্যা? শরৎ, এটাই কিন্তু আমাদের শেষ সুযোগ ছিল। শরৎ, চলো-না আমরা সবাই মিল্যা কবির কাছে যাই, তিনি অ্যাহন কুথায়? জোড়াসাঁকোয় না শান্তিনিকেতনে? শরৎ? যাবা?’
‘কবি তো তাঁর পজিশন পরিষ্কার করে দিয়েছেন পাঁচ বছর ধরে। উনি কমিউন্যাল অ্যাওয়ার্ডের বিরুদ্ধে। উনি রিজার্ভেশনের বিরুদ্ধে। উনি কাস্ট হিন্দুদের কালচারাল সুপিয়রিটির পক্ষে। উনি এ-ব্যাপারে কী করবেন? আমরাই-বা কী বলব?’ তুলসী গোস্বামী জানাল
মিটিংটা শেষ হয়ে গেল কী না সেটা সবাই পাকাপাকি বুঝে ওঠার আগেই নলিনী সরকার খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে গেলেন, তাঁর কোঁচা পকেটে গুঁজতে-গুঁজতে যেন এতক্ষণ ধরে তাঁর একটা জরুরি কাজ পড়ে আছে।
তাঁর এই প্রস্থানেই মিটিংটা ভেঙে গেল।
প্রায় সকলেই দাঁড়িয়ে। কেউ একজন ভিড়ের ভিতর থেকে বললেন, ‘রাজবন্দী আর জমিদারদের সিরিয়্যাল নাম্বার নিয়ে মত পার্থক্যের কারণে প্রজা পার্টি আর কংগ্রেসের সরকার হল না—এটা কি লোকে বিশ্বাস করবে?’
বিধান রায় একটু হাসি লাগিয়ে দরজার দিকে এগচ্ছিলেন। মাথায় তাঁর সমান বঙ্কিম মুখার্জি তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কংগ্রেস কী স্টেটমেন্ট করবে?’
বিধানবাবু বললেন, ‘ঐ যা ঠিক হল।’
‘কী ঠিক হল?’
‘যে গবমেন্ট হবে না।’
‘গবমেন্ট করার লোকের কি অভাব হবে? বলুন—কংগ্রেস গবর্মেন্ট করবে না।’
‘ঐ! যে-ভাবেই বলুন।
‘নাকী কংগ্রেস অন্য কোনো কমবিনেশন করতে চায়?’
‘না। নতুন কমবিনেশন মানে তো মুসলিম লিগের সঙ্গে।’
‘কংগ্রেস যে মুসলিম লিগের সঙ্গে কোথাও কোনো গবমেন্ট করবে না—এটা কিন্তু কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটি কোনো প্রস্তাবে বলেনি।’
‘বলেনি? তাহলে বলে দেবে।’
‘সে তো ভবিষ্যতের কথা। বলার আগেই তো ইউনাইটেড প্রভিন্সে আপনারা লিগকে মন্ত্রিসভায় নিলেন না। এখানেও গেলেন না।’
‘এখানে তো লিগ না। এখানে তো হকশাহেবের পার্টি। কী যেন নাম!’
‘যে নামই হোক, এঁরাও কিন্তু মুসলমান।’
‘হ্যাঁ। সে কী করা যাবে’
‘কংগ্রেস কি মুসলমানদের থেকে নিজেদের আলাদা করে নিচ্ছে না?’
‘না। না। কংগ্রেসে তো হিন্দু-মুসলমান নেই। শুধু কংগ্রেস আছে। কংগ্রেসে কত মুসলমান নেতা আছেন। ন্যাশন্যালিস্ট।’
‘সেটা বললেই লোকে বিশ্বাস করবে? খিলাফৎ আর বেঙ্গল প্যাক্ট ভাঙিয়ে আর মুসলমানদের ঠকানো যাবে না। আমি তো কংগ্রেসের নেতা। কংগ্রেসপ্রার্থী হিশেবে ভেটে জিতে এসেছি। আমিই তো বিশ্বাস করছি এখন যে কংগ্রেস এমনি আলাদা লোক হিশেবে কোনো মুসলমানকে খাতির করতে পারে, কিন্তু কোনো সংগঠিত মুসলিম শক্তিকে স্বীকার করবে না—সে লিগই হোক আর প্রজা পার্টিই হোক।’
‘ওসব হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপার নয়। ওদের সঙ্গে আমাদের মত মিলছে না। ওরা তো জমিদারি তুলে দিতে চায়। জমিদারি তুলে দিলে আমাদের কংগ্রেসে আর আসবে কে? কংগ্রেসি মানেই তো জমিদার। আপনিও তো বললেন কংগ্রেস। আপনিও জমিদার নাকী?’
‘সে আমার বাপ-ঠাকুরদাদারা হয়তো। আমি নই। আপনারও তো জমিদারি আছে, ডাক্তার রায়, টাকিতে।’
‘সে তো যারা ওখানে আছে, তাদের কাজে লাগে। উঠে গেলে, যাবে। কিন্তু জমিদারিই যাদের প্রধান বা একমাত্র আয় তারা কী তা মানতে পারে?’
‘শুধু জমিদারদের বাঁচাতে মুসলমানদের আলাদা করে দেবেন? কিন্তু বাংলায় তাহলে হবে কী? এখানে তো প্রতি তিনজনে দুজন মুসলমান।’
‘সে আমরা কী করব? একটা নীতি নিয়ে তো চলতে হবে।’
‘আপনারা কিন্তু মুসলমানদের মুসলমান করে দিচ্ছেন। এরপর আপনারা ডাকলেও তারা ফিরবে না। ইউনাইটেড প্রভিন্সে লিগ তো কোনো ক্ষমতা দেখাতে পারেনি। তাই তারা অচ্ছুৎ। বাংলায় হকশাহেব লিগ থেকে বেরিয়ে এসে একটা ক্ষমতা দেখালেন, সেই কারণে তিনি এখানে অচ্ছুৎ।’
‘সে ভাবে ভাবছেন কেন?’
‘ঘটনা যা হল তাতে আমার মত করেই যদি কংগ্রেসের কেউ-কেউ ভাবেন তাঁদের কি দোষ দেয়া যায়?’
‘সে তো একটা ডিসিশন হয়ে গেছে।’
‘বাংলার মানুষজন ভাবতে শুরু করছিল–হকশাহেব প্রধানমন্ত্রী, শরৎ বোস হোম মিনিস্টার আপনি হেল্থে, নৌসেরা আলি শাহেব আইনে—’
‘মন্ত্রিসভাও তৈরি করে ফেলেছেন?’
‘আমি করিনি। বাংলার জমিদাররাও ভেবেছে, চাষিরাও ভেবেছে। হকশাহেব, শরৎ বোস, নৌসের আলি বা আপনাকে কেউ কমিউন্যাল ভাবে না। বরং হিন্দুরা হকশাহেব-নৌসের আলিকে ভরসা করেন, মুসলমানরাও আপনাকে-শরৎ বোসকে ভরসা করে। সেটাই বোধ হয় কাল হল। বঙ্গজননী একটু বেশি রত্নপ্রসবা। তাই তিনি গঙ্গা পেলেন না। আপনারা এই কথাটুকু মানলেন না—কংগ্রেসে যেমন গোঁড়া হিন্দু ও স্বদেশী দুই-ই আছেন, লিগেও তেমন গোঁড়া মুসলমান ও স্বদেশী আছেন।
‘নিশ্চয়ই আছেন। এ দুটো তো শাদাকালো ভাগ নয়। ডাক্তারিতে আমরা বলি কনট্রা-সিনড্রোম। তা তো নয়। আপনার নামটা কিন্তু জানা হল না। জেনেও লাভ নেই। প্রপার নেমস আমার মনে থাকে না।’
‘তাহলে যখন জানার তখনই জানবেন। আমি কিন্তু আপনাকে জেনেই কথা বলছি।’
বিধান রায় খ্যাতিমানের বিড়ম্বিত হাসি হাসতেই বঙ্কিম মুখার্জি বললেন, একটা আঙুল উঁচিয়ে, ‘না, না, ডাক্তার হিশেবে নয়। আমি কংগ্রেসের এমএলএ। আপনি কংগ্রেস পার্লামেন্টারি পার্টির প্রেসিডেন্ট। এ সিদ্ধান্তের দায় আপনার।’
